Banner
সোনালী স্বপ্নের দিনগুলি - লুৎফা তাহের

লিখেছেনঃ লুৎফা তাহের, আপডেটঃ February 8, 2010, 5:43 PM, Hits: 6095

১৯৭০-এর নির্বাচনের সময় আমি লণ্ডনে ছিলাম। আমার স্বামী কর্ণেল আবু তাহের তখন উচ্চতর সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য আমেরিকায়। ট্রেনিং শেষে তিনি লণ্ডনে আমাদের সঙ্গে যোগ দেন। ইতোমধ্যে নির্বাচন শেষ হয়েছে। নির্বাচন শেষ হওয়ার পর ডিসেম্বর মাসে আমরা পাকিস্তানে আমার স্বামীর কর্মস্থল “আটকফোর্ত”-এ আসি। আটকফোর্ত একটি ক্যান্টনমেন্ট এলাকা, রাওয়ালপিণ্ডি ও পেশোয়ারের মাঝামাঝি। তাহের ছিলেন সেপশাল সার্ভিস গ্রুপের একজন বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা। সে সুবাদে তিনি রাজনৈতিক মহলের এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যই জানতে পারতেন। তাই বিভিন্ন মহলের সঙ্গে মতবিনিময় করে তার বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভের পরও বেসামরিক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তানতর করা হবে না। সামরিক জানতা এবং জুলফিকার আলী ভূট্টো যার যার স্বার্থ হাসিল করার জন্য তখন চক্রানেতর জাল বুনছিল। কোন বাঙালি যাতে পাকিস্তানের রাজনৈতিক ক্ষমতা গ্রহণ করতে না পারে তার জন্য তারা বিভিন্ন প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। এদিকে তদানীনতন পূর্ব পাকিস্তানেও চলছিল অসহযোগ আন্দোলন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের পক্ষ সমর্থন করে বিভিন্ন কর্মসূচির খবর পাচ্ছিলাম। তাহের দুর্যোগের আগাম আভাস দেখতে পেলেন। তিনি আমাকে বললেন দেশে সাংঘাতিক একটা বিপর্যয় নেমে আসছে। বাঙালি জাতি একটি প্রতিবাদী জাতি, নির্বাচনের পক্ষপাতিত্ব কখনও তারা বিনা প্রতিরোধে মেনে নেবে না। এর মাঝে তিনি প্রত্যক্ষ করলেন বিপুল সংখ্যক পাকসেনা পূর্ব বাংলায় পোস্টিং দিচ্ছে, বাঙালি অফিসার ট্রুপস্‌দের দেয়া হচ্ছে না। একটি আসন্ন যুদ্ধাবস্থা যেন সামনে বিরাজ করছে। বললেন, “এ অবস্থায় তুমি দেশে চলে যাও, আমি সময় সুযোগ বুঝে চলে আসব”। আমি এরই মধ্যে আমার স্বামীর রাজনৈতিক দর্শন এবং চিনতা-চেতনার সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। আমি তার আজন্ম লালিত স্বপ্ন, নিপীড়িত বাঙালি জনগোষ্ঠীর জন্য একটি আবাসভূমির স্বপ্ন তার চোখে ফুটে উঠেছে দেখতে পাচ্ছি। তাই ৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ আমি আটকফোর্ত থেকে ঢাকায় চলে আসি। মার্চ মাস চলে এলো। ঢাকায় এসেও বাড়িতে যেতে পারছি না, লাগাতার হরতাল, অসহযোগ আন্দোলন ইত্যাদি। বোনের বাসায় কয়েকদিন কাটিয়ে, আমার বাবা ড. মোরশেদউদ্দিন আহমেদ তখন ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জ থানা হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার, আমি সেখানে চলে গেলাম। আমি তখন সনতানসম্ভবা। ঢাকার আন্দোলন বেগবান হচ্ছে, এর ঢেউ সমস্ত দেশে ছড়িয়ে পড়ছে, এমন কি ঈশ্বরগঞ্জের মত ছোট থানাতেও বিস্তার লাভ করছে। ঢাকার খবর রেডিও কলকাতা ও বিবিসিই ভরসা। লোক মারফতও খবর পাই। এর মাঝে গ্রামে-গঞ্জেও প্রতিরোধ গড়ে উঠতে শুরু করেছে। কারণ পাকিস্তানি শাসকরা শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ক্ষমতা দেবে না এটা তখন পরিষকার হয়ে গেছে। আমি ঈশ্বরগঞ্জ ও নেত্রকোনার কাজলায় শ্বশুরবাড়িতে যাওয়া আসা করছি। সব জায়গাতেই একটা অস্থিরতা বিরাজ করছে। আমার ভাইয়েরা পাড়ার অন্যান্য ছেলেদের সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রতিরোধের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, স্বামীর ভাইদেরও একই অবস্থা। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আসা অবধি তাহেরের কোন চিঠিপত্র বা খবর পাই না। নানা দুঃশ্চিনতায় মন ভারাক্রানত। এরমাঝে ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণে যেন দেশের রাজনৈতিক অবস্থা সকলের সামনে উন্মোচিত হল এবং সবাই একটা দিক নির্দেশনা পেল। শহরে, গ্রামে, গঞ্জে সংগঠিত হতে থাকল সংগ্রাম কমিটি। ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় পাকসেনারা নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালাল। এরই মাঝে খবর ছড়িয়ে পড়ল বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতারের। আত্মীয়-স্বজন যারা ঢাকায় ছিল পালিয়ে গ্রামে আসতে শুরু করেছে। জনসাধারণের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যুদ্ধ প্রতিরোধ অবস্থা তৈরি ও আসন্ন যুদ্ধ মোকাবেলায় প্রস্তুতি শুরু হতে থাকে। উদ্বেগের মাঝে দিন কাটাচ্ছি। মনে হচ্ছিল কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে থাকার সময় কত অনিয়মের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছি, মিটিং করেছি, মিছিল করেছি। এখন শারীরিক অবস্থা অনুকুলে না থাকায় কিছু করতে পারছি না। এরই মােঝে এপ্রিলের প্রথম দিনেই ঢাকা ও ময়মনসিংহ হতে ৭ পরিবারের ৩০ জন সদস্য পাক আর্মির অত্যাচারের ভয়ে পালিয়ে এসে আমার বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিল। বাসা লোকে লোকারণ্য। আমাদের বাসাটা ছিল স্টেশনের কাছে, পাকসেনারা ময়মনসিংহ ও ওদিক দিয়ে কিশোরগঞ্জ পর্যনত এসেছে। আমরা সকলেই উদ্বিগ্ন থাকি কখন এদিক দিয়ে আর্মি মুভ করতে শুরু করে। প্রতিনিয়তই শুনতে থাকি নানা গুজব। এক অনিশ্চয়তা ও ভয়াবহ দুর্যোগময় পরিস্থিতিতে ৭ এপ্রিল আমার মেয়ের জন্ম হল। এক রাতে আব্বা রেডিওর নব ঘোরাতে ঘোরাতে শুনতে পেলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে জিয়ার কণ্ঠ। তিনি মুজিবের পক্ষ থেকে বারবার ঘোষণা দিচ্ছেন স্বাধীনতার। আর ঈশ্বরগঞ্জে থাকা আমাদের কারো জন্য নিরাপদ মনে হল না। আমি ৭ দিনের মেয়েকে নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে চলে গেলাম। সেটা ছিল অনেক ভেতরে, কাজলা নামের গ্রাম। ওখানে গিয়ে দেখি অনেক লোকের সমাগম আত্মীয়-স্বজন ছাড়াও পরিচিত, অপরিচিত অনেক লোক শহর থেকে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। কাজলায় বসে বসে বিভিন্ন লোক এবং আত্মীয়-স্বজনদের সাথে মতবিনিময়, আলোচনা ও রাতে উঠানে পাটি বিছিয়ে আকাশবাণী ও বিবিসির খবর শোনা এবং আস্তে আস্তে স্বাধীন বাংলা বেতারের খবর শোনা। হঠাৎ এক দুপুরে তাহেরের একটা চিঠি আসল, তার মায়ের কাছে লেখা। এপ্রিলের শেষের দিকে এই প্রথম তার চিঠি পেলাম। এ চিঠিটা অনেক ইঙ্গিতপূর্ণ মনে হল। তিনি লিখলেন যখনই সম্ভব হবে সময়মত পৌঁছব। এদিকে দলে দলে ছেলেরা সীমানত পেরিয়ে ভারতে চলে যাচ্ছে। প্রশিক্ষণ নিচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিচ্ছে। তাহেরের ভাইয়েরা সকলেই চলে গেছে। আমার ভাইও তূরায় চলে গেছে। এদিকে যেমন মুক্তিফৌজ গঠন হচ্ছে অন্যদিকে পাকিস্তানি মনোভাবের লোকের সংখ্যাও বাড়ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে তারা শানিতকমিটি গঠন করেছে। সুতরাং কথাবার্তা খুব সাবধানে বলতে হয়। প্রতিটি জাতীয় দুর্যোগে বেশিরভাগ জনগণ থাকে দোদুল্যমান। কেউ সামনে এগিয়ে আসে, কেউ নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করে। বাকিরা দুর্যোগের ফলাফল প্রত্যক্ষ করে অংশ নেয়, এটাই সাধারণদের চরিত্র। দেশের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসতে আমাদের লম্বা সময় অপেক্ষা করতে হবে। অনেক ত্যাগ তিতিক্ষা ও রক্ত ঝরাতে হবে, এ আমরা বুঝতে পারছিলাম। তাই আমরাও চিনতা করতে শুরু করে দিয়েছি গ্রামে বসে কী করা যায়, কীভাবে মুক্তিযুদ্ধে শরিক হওয়া যায়। কীভাবে মহিলাদেরকে সংগঠিত করা যায়, আসন্ন যুদ্ধ মোকাবেলা ও প্রতিরোধ করা যায়, কারণ শহর থেকে অনেক ছেলেমেয়ে এখন গ্রামে অবস্থান করছে। জুলাই ৭১-এর এক জোছনা রাতে উঠানে সকলে মিলে আকাশবাণীর খবর শুনছি, এর মাঝে খবরে বলল “পাকিস্তান থেকে ৪ জন উর্ধ্বতন সামরিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব পালিয়ে এসে দিল্লি পৌঁছেছে এবং তারা প্রবাসী সরকারের সেনা প্রধান কর্ণেল এম.এ.জি. ওসমানির সঙ্গে আছে। গোপনীয়তার স্বার্থে তাদের নাম প্রকাশ করা হল না। আমাদের বোঝায় আর বাকি রইল না যে তাহের তাদের একজন। এর আগেই তাহেরের ভাইয়েরা এবং আমার ভাইসহ অনেক চেনাজানা ছেলে সীমানেতর ওপারে চলে গেছে। ভারতও সীমানত খুলে দিয়েছে। দলেদলে শরণার্থীরা যাচ্ছে। ওরা পাহাড়, জঙ্গল, পরিষকার করে নিজেরা সংগঠিত হচ্ছে। মূলত মার্চ, এপ্রিল ও মে মাস পর্যনত অল্পসংখ্যক ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআর ও পুলিশবাহিনীর সশস্ত্র প্রতিরোধ চলতে চলতে জুন মাসে এদেশে গেরিলাযুদ্ধের সূচনা হয়। মুক্তিফৌজ গড়ে উঠতে থাকে বিভিন্ন অঞ্চলে, জুলাইতে মুক্তিযুদ্ধ একটি রূপ নেয়। মুক্তিযোদ্ধারা ছড়িয়ে পড়তে থাকে গ্রামে-গঞ্জে। জুলাইয়ের শেষের দিকে হঠাৎ এক রাতে দুই আগন্তুক আপাদমস্তুক চাদরে ঢেকে এসে হাজির। তাহেরের ভাই সাঈদ ও আমার ভাই সাব্বির, তারা ১১ নং সেক্টরের বকশীগঞ্জ রণাঙ্গন থেকে এসেছে। তাদেরকে পাঠানো হয়েছে আমাকে নেয়ার জন্য। তাহের পাকিস্তান থেকে চলে এসেছে এবং তূরায় ১১ নং সেক্টরে অবস্থান করছে। তার যুদ্ধে অংশ গ্রহণের ইচ্ছা বাস্তবায়নের কথা শুনে মনটা আনন্দে ভরে গেল। আমাকে কালই পালাতে হবে, কারণ পাক আর্মি জেনে গেছে তাহেরের অবস্থান। আমার শাশুড়ি তাদের এক বন্ধুস্থানীয় লোক খাজা নেওয়াজ খানকে ডেকে সব বললেন এবং পরদিন ভোর বেলায় যৎসামান্য কাপড় নিয়ে তাহেরের ছোট দু’বোনকে সঙ্গে নিয়ে রওনা দিলাম। উনি প্রথমে আমাদের নিয়ে উঠালেন নেত্রকোনার শেষ প্রানেত বুরবুরাসুনাই নামে এক গ্রামে। গ্রামটি শনির হাওরের কাছে। চারদিকে পানি, নৌকাই একমাত্র চলাচলের বাহন। এখান থেকে শনির হাওর পাড়ি দিয়ে সীমানত এলাকা মেঘালয়ের বাঘমারা যেতে হবে। খবর পাওয়া গেল পাক আর্মি কলমাকান্দা বাজার পুড়িয়ে দিয়েছে, হাওর টহল দিচ্ছে সপীডবোড দিয়ে। তাই আমাদেরকে কোনদিক দিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে তা নিয়ে সমস্যা দেখা দিয়েছে। তাহের পাকিস্তান আর্মি ত্যাগ করে পালিয়ে এসেছে, পাকসেনারা তাকে ধরার জন্য হন্যে হয়ে আমাকে খুঁজছে। আমাকে ধরার জন্য পাক আর্মি একই সঙ্গে একই দিন এবং সময়ে আমার বাবার বাড়ি ও শ্বশুর বাড়িতে হানা দেয়। আমাকে না পেয়ে, আমার মা-বাবা, ছোটবোন, অপরদিকে শ্বশুর-শাশুড়ি, তাহেরের বড়ভাই যিনি পাকিস্তান থেকে অনেক কষ্টে ছুটি নিয়ে দেশে এসেছিলেন, তিনি তার স্ত্রী ও পুত্রসহ সকলকেই ধরে পাক আর্মি ময়মনসিংহ আর্মি হেডকোয়ার্টারে নিয়ে যায়। ময়মনসিংহ আর্মি হেডকোয়ার্টারের কমাণ্ডিং অফিসার ছিলেন তখন ব্রিগেডিয়ার কাদির। তিনি একজন সামরিক বিশেষজ্ঞ এবং তাহেরের প্রশিক্ষক ছিলেন। তাহেরের সমরবিদ্যায় পারদর্শিতার জন্য তাহেরকে অত্যনত স্নেহ ও উঁচুমাপের মনে করতেন। তিনি তাহেরর পিতামাতাকে বললেন তাহেরকে আত্মসমর্পণ করতে খবর পাঠাতে, তিনি তাহেরের জীবন রক্ষা করবেন। তিনি আরও বললেন মেঘালয়ের তূরা সীমানেতর কামালপুরে দুর্ধর্ষ পাকিস্তানি কমাণ্ডো ব্যাটালিয়ান নিয়োগ দেয়া হয়েছে, তাহেরকে পেলে তারা মেরে ফেলবে। আর আমার মা-বাবা ও বোনকে ময়মনসিংহ জেলে পাঠানো হল, বলা হল মেয়েকে বের করে দেন, না হলে গুলি করা হবে। একদিন জেলে থাকার পর আবার তাদেরকে একই কথা বলা হলে, আমার বাবা মুখ ফসকে বলে ফেলেন, মেয়ে ঢাকায়। তখন তাদের ছেড়ে দেয়, কিন্তু নজরবন্দি করে রাখে এবং মাঝে মাঝে হাজিরা দিতে বলে। এদিকে ঢাকা থেকে আমার দুলাভাই জুলাবুল ইসলামকে, আমাকে বের করে দেয়ার জন্য ক্যান্টনমেন্টে ধরে নিয়ে গেল। অনেকদিন তাঁর পরিবার কোন খোঁজ খবর পায় নাই। দুলাভাইয়ের বড় ভাই শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সাহেবের হস্তক্ষেপে অনেকদিন পর মুক্তি পান। তাঁকে যে অত্যাচার করা হয়েছিল তা অবর্ণনীয়। এদিকে পাক আর্মি থেমে নেই, হন্যে হয়ে আমাকে খুঁজছে। আমাদের গ্রামটা ঘেরাও করে ঘরে ঘরে আমার ছবি নিয়ে তল্লাশি করেছে, অনেক যুবতীকে করেছে লাঞ্ছনা। যে বাড়িতে আমি আশ্রয় নিয়েছিলাম, বাড়ি ছাড়ার এক সপ্তাদের মাথায় খবর পেলাম পাকবাহিনী ওই বাড়িটি পুড়িয়ে দিয়েছে আমাকে জায়গা দেয়ার অপরাধে। আমার জন্য কত লোকের কত কষ্ট, কত যাতনা সহ্য করতে হয়েছে তা মনে হলে চোখ ভিজে আসে। যাক তারপর একরাত্রিতে বুরবুরাসুনাই গ্রাম থেকে একটা নৌকায় করে দুই ননদ, ডলি ও ঝুলিসহ আমরা রওয়া দিলাম সীমানেতর দিকে। শনির হাওর পাড়ি দেয়া, মনে হয় উত্তাল সাগর। কোন কূল নেই, শুধু পানি আর পানি। হঠাৎ নৌকায় পানি ঢুকতে শুরু করেছে মাঝিরা বিপদ সংকেত দিল, সাব্বির ও সাঈদ থালা দিয়ে পানি সেচে ফেলল। এভাবে নৌকায় চলতে চলতে সন্ধ্যায় উঠলাম কলমকান্দার এক গ্রামে। এখানে রাত্রে থাকতে হবে। মাঝির বাড়ি এ গ্রামে, গভীর রাত্রে তার বাড়িতে উঠলাম। ভয়ে বুক দুরুদুরু করছে, পেটে দানা নেই প্রায় দেড়দিন। মাঝির বৌ ভাত ও লালচিনি দিল। মনে হল অমৃত খাচ্ছি। ভোরেই আবার রওনা দিলাম। নৌকার দু’দিকে কাপড়ের বেড়া দিয়ে ভেতরে লুকিয়ে চলেছি। দুই ননদকে ছেঁড়া জামা পরিয়ে নিয়েছি। সাব্বির ও সাঈদ পাটাতনের নিচে, মাঝে মাঝে পর্দার ভেতর লুকিয়ে থাকে। কারণ একটু পরপরই রাজাকার, আলবদরেরা ঘাট, পুল পাহারা দিচ্ছে, তারা জিজ্ঞেস করে নৌকায় কে যায়। মাঝি বলে, অমুক গ্রামের অমুকের পরিবার। এভাবে দুরুদুরু বক্ষে আল্লাহর নাম করে করে এগুচ্ছি। আমার মেয়ের বয়স তিন মাস। হাওরের ঠাণ্ডা পানিতে দুধ গুলে তাকে খাওয়াই। কোন বিকল্প ব্যবস্থা নেই। তার ডায়রিয়া হয়ে গেল, বাঁচামরা আল্লাহ এবং ভাগ্যের হাতে সঁপে দিলাম। এভাবে তিনদিন হাওরের জলে যুদ্ধ করতে করতে মেঘালয়ের বাঘমারা সীমানত পৌঁছলাম। সীমানত লাগোয়া কালাচান মিয়ার বাড়িতে আশ্রয় নিলাম। তিনি যুদ্ধের শুরু থেকে অনেক শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছেন এবং নিরাপদ গনতব্যে পৌঁছে দিয়েছেন। সীমানত এলাকায় নদীর তীরে পাহাড়ের কূল ঘেষে সারিসারি শরণার্থী শিবির, আমাদের মতই হাওর পাড়ি দিয়ে তারা এখানে আশ্রয় নিয়েছেন। হঠাৎ মনে হলে দেশের ভিটেমাটি ছেড়ে, আত্মীয়-স্বজনকে ছেড়ে অন্য দেশে আশ্রয় নিলাম, মুহূর্তে মনটা বিষণ্ন হয়ে গেল। আবার এত মানুষ দেখে, ক্যাম্পে তরুণ ছেলেদের শক্ত মনোবল দেখে আশার আলো দেখলাম। তরুণ ছেলেরা কেউ বা জঙ্গল কেটে পরিষকার করে তাঁবু টানাচ্ছে, কেউ কেউ অস্ত্র চালনা করছে, কেউ অন্যের কাজে সাহায্য করছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে, দেখে বড়ই ভাল লাগল। কালাচান মিয়ার বাড়িতে থাকাকালীন খবর পেলাম তাহের তূরায় পৌঁছেছে। আমাদের সেখানে যেতে হবে। কালাচানদের মত পরোপকারী লোকজনের জন্য শরণার্থী ও মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে অবস্থান ও যুদ্ধ করে যাওয়া সহজ হয়েছিল। জাতি এদের চিরদিন শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। এরা ইতিহাসের একটা অংশ। তূরায় যেতে হলে অনেকখানি পাহাড়, দুর্গম পথ অতিক্রম করে যেতে হবে। এরই মধ্যে পাহাড়ি ঢলে পথ বন্ধ হয়ে গেল। সীমানত থেকে ৩০ কিঃ মিঃ দূরে লংবা বিএসএফ ক্যাম্প আছে। ওখানকার ভারতীয় আর্মি অফিসার মুরারী খবর পাঠাল যে রাস্তা তাড়াতাড়ি পরিষকার করে আমাদের নেওয়ার জন্য জিপ পাঠানো হবে। যে ক’টাকা সাথে ছিল তা প্রায় শেষ পর্যায়ে। এরই মাঝে জিপে করে লংবাতে রওনা দিলাম। সেখানে গিয়ে এই প্রথম গোসল সেরে একটু বিশ্রাম করলাম। ওখান থেকে রওনা দিয়ে পরদিন আমরা তেলাঢালা নামক একটা জায়গায় ইয়্যুথ ক্যাম্পে রইলাম।

 

সেখানে দেখলাম হাজার হাজার ছেলে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। যাদের বয়স কম, তাদেরকে যুদ্ধে নেয়া হচ্ছে না বলে তাদের সে কী কান্না! কেউ রান্না করছে, কেউ প্রশিক্ষণ নিচ্ছে, কেউ বা যুদ্ধে যাচ্ছে। এই প্রথম বাংলার স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়ন প্রত্যক্ষ করতে লাগলাম। প্রচণ্ড খুশিতে মন ভরে গেল, মনে হল আমিও ওদের সঙ্গে শরিক হই। আবার পরদিন তূরার পথে যাত্রা করলাম। সঙ্গী হল ১৪ বৎসরের এক মুক্তিযোদ্ধা। হাতে অস্ত্র, কী গাম্ভীর্য, কী প্রত্যয় তার দৃষ্টিতে! সে আমাদের গাইড। এইসব ছেলেদের জন্য গর্বে বুক ভরে যায়। তূরায় পৌঁছতে বিকেল হয়ে গেল। আমাদের কিছুদিন আগেই গিয়েছেন ক্যাপ্টেন আকবর ও তার পরিবার (বর্তমানে মন্ত্রী), ক্যাপ্টেন শাফায়াত জামিল ও তার পরিবার, স্কোয়াড্রন লিডার লিয়াকত, ক্যাপ্টেন ওয়ালী (সাবেক মন্ত্রী), মেজর মান্নান, আরও অনেকে এবং আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ।

 

আমাদেরকে নেয়া হল ক্যাপ্টেন আকবরের বাসায়। উনি আবার ছিলেন ওখানকার একটি পরিবারের সঙ্গে। ওখানে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর তাহের আসল আমাদের এবং ভারতীয় কয়েকজন আর্মি অফিসারের সঙ্গে। অনেকদিন পর দেখা। হাসতে হাসতে কাছে এল। হাতে একটা এসলফ ঝয়মধর, এই প্রথম তার সনতানকে দেখল। বলল, ভাবনায় ছিলে, দেখলে তো আমি ঠিক সময়েই চলে এসেছি। তারপর তূরার বিএসএফ ক্যাম্পে এক কর্ণেলেন গোয়ালঘর পরিষকার করে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হল।

 

তাহের পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসার পর মুক্তিযুদ্ধের অধিনায়ক কর্ণেল এমএজি ওসমানী তাহেরকে বললেন আপনি সবক’টি সেক্টর পরিদর্শন করে যুদ্ধের এবং রণকৌশলের দুর্বল দিকগুলি খুঁজে বের করে নীতি নির্ধারণ করুণ। ওসমানী জানতেন যে, তাহের গেরিলাযুদ্ধে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তাহেরের আজীবন স্বপ্ন, নিপীড়িত বাঙালি জাতির স্বাধীন সত্ত্বা অর্জনে নিজেকে নিয়োজিত করেন। তিনি প্রত্যেক সেক্টরের অবস্থান বিশ্লেষণ করে ১১ নং সেক্টর পরিদর্শন করে এখানেই থেকে যাওয়া এবং যুদ্ধ পরিচালনা করার সিদ্ধানত নেন।

 

এই সেক্টরটি ছিল কামালপুর, জামালপুর, টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহের বিরাট এলাকা নিয়ে এবং খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যা না কি ভারতীয় অফিসারের নেতৃত্বে ছিল।

 

জিয়াউর রহমান ছিলেন জেড ফোর্স গঠন নিয়ে ব্যস্ত। এখানে তাহের ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক এদেরকে সংগঠিত করে প্রশিক্ষণ দিয়ে ১১ নং সেক্টরে যুদ্ধ পরিচালনা করতে লাগলেন। আমরা যেখানে থাকি সেখান থেকে যুদ্ধক্ষেত্রের দূরত্ব ২৫ কিঃ মিঃ হবে। সীমানত লাগোয়া যুদ্ধ ক্যাম্পটি ছিল মহেন্দ্রগঞ্জে। আমার সঙ্গে তাহেরের বোনেরা ডাঃ হাই-এর পরিবার এবং অন্যান্যরা ছিল বলে যুদ্ধক্ষেত্রে আমাদের থাকা সম্ভব ছিল না। তবে প্রতিদিনের ঘটনাবলির খবরাখবর আমাদেরকে অন্যান্য লোকেরা অবহিত করত। তাহের অনেক মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে সপ্তাহে একদিন আসত, যেদিন অন্যান্য অফিসারদের সঙ্গে তূরা হেডকোয়ার্টারে তার মিটিং থাকত। তাহের চাইত কামালপুর শত্রুমুক্ত করে ১১ নং সেক্টর বাংলাদেশের ভেতর স্থাপন করবে এবং আমরাও চলে যাব বাংলার মাটিতে। বিএসএফ ক্যাম্পে থাকাকালীন বিএসএফ-এর কমাণ্ডার কর্ণেল রংরাজ ও তার স্ত্রী সবসময় চাইতেন আমি যেন তাদের সঙ্গে বিভিন্ন পার্টিতে, দাওয়াতে যাই। যেন আমাদের আনন্দে রাখার চেষ্টা। কিন্তু আমি এসব বরাবরই এড়িয়ে চলেছি সবসময় মনে হত আমার দেশে না জানি কী হচ্ছে। আত্মীয়-স্বজনদের কী অবস্থা, কত ছেলেরা যুদ্ধে আহত হচ্ছে, কতজন মারা যাচ্ছে?

 

একদিন আমাদেরকে দেখতে এলেন মতিয়া আপা, মণি সিংহসহ অনেক আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ। জানতে পারছি নানান সেক্টরের খবর। যুদ্ধের ভয়াবহতায় মাঝে মাঝে উৎকণ্ঠায় পড়ি, মাঝে মাঝে আশার আলোতে উদ্ভাসিত হই, এভাবে অস্থায়ী সংসার চলছে। এরই মাঝে সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে তাহেরের আরেক ভাই আবু ইউসুফ যুদ্ধক্ষেত্রে এসে উপস্থিত। তাকে দেখে আমরা অনেকটা ভরসা পেলাম। তিনি ছিলেন সৌদি এয়ার ফোর্সে কর্মরত। ছুটি নিয়ে লণ্ডনে এসে সোজা গৌহাটির মেঘালয়ে যুদ্ধে যাবেন বলে প্রস্তুতি নিয়ে এসেছেন। দেশ স্বাধীন করার মনোবাসনা তাকে কোন প্রলোভনে বাঁধতে পারে নাই। দু’দিন তূরায় আমাদের সাথে কাটিয়ে যুদ্ধের ময়দানে চলে গেলেন। মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে আগের চেয়ে আত্মপ্রত্যয় বেড়ে গেছে। এরই মধ্যে তারা ছোট ছোট জয় করতে করতে বড় বড় অপারেশনে অংশ নিতে শুরু করেছে সম্পূর্ণ এক নতুন কায়দায়। গেরিলাযুদ্ধ জনযুদ্ধে রূপ নিচ্ছে, নেতৃত্বে তাহের। তাহের পরিকল্পনা করল কামালপুর ঘাঁটি শত্রুমুক্ত করলে কামালপুর, জামালপুর ও টাঙ্গাইল হয়ে ঢাকা দখল করা সম্ভব। কামালপুর ছিল গুরুত্বপূর্ণ এক দুর্ধর্ষ ঘাঁটি, পাক আর্মির একটা চৌকশ ব্যাটালিয়ন এতে নিয়োজিত ছিল। কারণ এটা ঢাকার প্রবেশদ্বার, পাকিস্তানিরা এটা জানত।

 

তাহের এক দিন কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে আসল এবং বলল, নভেম্বর ১৪-এর মধ্যে আমরা বাংলাদেশের ভেতর চলে যাব। ১৪ নভেম্বর তাহেরের জন্মদিন। ঐ দিনই কামালপুর শত্রুমুক্ত করার পরিকল্পনা করেছে, এটা বুঝতে পারলাম। আমি ভেতরে ভেতরে প্রস্তুতি নিতে শুরু করে দিয়েছি। মুক্তিযোদ্ধাদের দেবার জন্য উপহার সামগ্রী কিনে জমাচ্ছি আর আশা করছি উপহার সামগ্রী নিয়ে ওদের সঙ্গে উৎসবে যোগ দেব। সারাদিন উৎকণ্ঠায় কাটছে। ১৪ নভেম্বর। উত্তেজনা, ভয় ইত্যাদি। দুপুর গড়িয়ে বিকেল, খেতে মন চাচ্ছিল না তবু খেতে বসেছি। এমন সময় অধিনায়ক কর্ণেল রংরাজ তার স্ত্রীকে নিয়ে এসে মেঝেতে পাতা মাদুরে বসলেন। আমি একটু অবাক, এই সময়ে তাদের দেখে। তিনি এসে যুদ্ধের ভয়াবহতা বলতে শুরু করেছেন, ভূমিকা করছেন। আমার তর সইছিল না। বললাম, সব খুলে বলুন, আমি সবকিছু শোনার জন্য প্রস্তুত। তারপর তিনি বললেন, তাহেরের একটি পায়ে গুলি লেগেছে যুুদ্ধ পরিচালনা করার সময়। আমি ব্যাপারটাকে তেমন আমলে আনিনি। কারণ দেখেছি ক্যাপ্টেন মান্নানের পায়ে গুলি লেগেছিল এক মাসের মাঝে সে আবার যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে এসেছে। আমি স্বাভাবিকভাবে নিলাম এবং তাকে দেখতে চাইলাম। তিনি বললেন যে একটু পরেই তাকে বিএসএফ-এর মাঠে হেলিকপ্টার-এ করে নিয়ে আসা হবে। দেখলাম হেলিকপ্টার-এ শোয়া, চাদর দিয়ে শরীর ঢাকা, সঙ্গে ইউসুফ ভাই এবং অন্যান্যরা আছেন। সকলেই বললেন, এতক্ষণ কথা বলছিল, এইমাত্র ঘুমিয়েছে। আমি বুঝতেও পারিনি যে একটা পা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে ইতোমধ্যে।

 

এরপর কামালপুরের কর্তৃত্ব আসে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে। সকলেই বলল, জ্ঞান হারানোর পূর্বেও আহত অবস্থায় যুদ্ধ পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। তারপর তাকে নেয়া হল কম্বাইণ্ড মিলিটারি হসপিটাল, গৌহাটি সদরে। আমি আমার পাঁচ মাসের মেয়েকে দুই ননদের কাছে (একজন অষ্টম শ্রেণীতে এবং অন্যজন নবম শ্রেণীতে পড়ে) রেখে আনোয়ারকে সঙ্গে করে গৌহাটি হাসপাতালে চলে যাই। তখন হাসপাতালে আহত তাহেরের বিপদসীমা কাটেনি। এখানে এসে দেখলাম তার একটা পা উরু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে মর্টারের শেলের আঘাতে। আমার জন্য ব্যাপারটা অকল্পনীয় হলেও মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিলাম। এই সামরিক হাসপাতালে এসে যুদ্ধের আর এক ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করলাম। কত যে সামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারি আহত, বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম! আমাদের মুক্তিযুদ্ধে যেমনি মুক্তিযোদ্ধারা আহত হয়েছে, প্রাণ দিয়েছে, তেমনি ভারতীয়রাও আহত হয়েছে, প্রাণ দিয়েছে। যখন অন্যান্য আহতরা ব্যাথায় চিৎকার করত, তাহেরকে হুইল চেয়ারে করে প্রতি রুমে রুমে যেতাম, তাদের সাহস দিতাম, কথা বলতাম, খাবারটা খাইয়ে দিতাম।

 

স্বাধীন বাংলার সরকার প্রধান তাজউদ্দিন সাহেব লোক পাঠালেন তাহেরের শারীরিক অবস্থা জানতে। ভারতীয় সেনাপ্রধান নিজে এসে চিকিৎসার খোঁজখবর নিলেন, মেঘালয়ের গভর্ণর সস্ত্রীক এসে ফুলের তোড়া দিয়ে দেখে গেলেন। পরে আরও উন্নত চিকিৎসার জন্য লক্ষ্ণৌ ও পুনা অড়য়মফমধমথল খমশদ ঈপষয়ড়প-এ পাঠানো হয়। ওখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাকে দেখতে আসেন। এরমধ্যে গৌহাটি হাসপাতালে এক মাস থাকার পর তাহেরের বাবা-মা, বোন ও অন্য যারা আমার সঙ্গে ছিলেন তাদের নিয়ে ২৫ ডিসেম্বর ৭১-এ আমরা দেশে ফেরার উদ্দেশ্যে রওনা হই তাহের চলে যায় পুনা।

 

সীমানত পার হচ্ছি আর যুদ্ধের ধ্বংসাবশেষ দেখছি। সুষং দুর্গাপুর দিয়ে প্রবেশ করলাম, বাংলার মাটিতে পা রেখে জিপ থেকে নেমে মাটি বুকে চেপে আমাদের সে কী কান্না! দেশের মাটির মূল্য আমি বুঝেছি, দেশপ্রেম আমি শিখেছি, তাই যুদ্ধটা আমার জীবনে সোনালী স্বপ্নের দিন। গৌহাটি হাসপাতালে থাকার সময় তাহেরকে দেখতে অনেক নেতৃবৃন্দ আসতেন। সকলেই বলাবলি করতেন, যুদ্ধ তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাবে, আমরা ডিসেম্বরেই বাংলাদেশে যাব। তাহের চিনিতত হতেন এবং বলতেন, শ্রমিক, কৃষক সাধারণ মানুষের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক যুদ্ধ যে জনযুদ্ধের রূপ নিতে শুরু করেছে এবং বাঙালি জাতির সামনে নিজেরাই স্বাধীনতার সোনালী আভাস অর্জনের ইঙ্গিত পাচ্ছে তাকে ব্যাহত করে পাওয়া স্বাধীনতা কখনো সুফল বয়ে আনবে না। তার মতে, এ ছিল দেউলিয়া রাজনীতি। তাই তিনি বলেছেন, “মুক্তিযোদ্ধারা আবার জয়ী হবে।”

 

লুৎফা তাহের, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। মুক্তিযুদ্ধের ১১ নং সেক্টরের অধিনায়ক কর্ণেল তাহেরের স্ত্রী।

 

৩১ অক্টোবর ২০০৮ লুৎফা তাহেরের সৌজন্যে।

 

অনলাইন : ৭ নভেম্বর ২০০৮