Banner
৭ নভেম্বর ও কর্ণেল তাহের - মোঃ শোহীদুল্লাহ

লিখেছেনঃ মোঃ শোহীদুল্লাহ, আপডেটঃ February 10, 2010, 1:30 PM, Hits: 6349

আমাদের জাতীয় মুক্তি ও স্বাধীনতাযুদ্ধে কর্ণেল আবু তাহের ১১ নং সেক্টরের সেক্টর কমাণ্ডার ছিলেন। ১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের সেনানিবাস থেকে মৃত্যুর ঝুঁকি মাথায় নিয়ে পালিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেন। ’৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে নিজের সেক্টরের অধীন তৎকালীন জামালপুর জেলার ধানুয়া কামালপুরের যুদ্ধে তিনি একটি পা হারান। তিনি ছিলেন অসীম সাহসী মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে জান বাজি রেখে লড়াই করার জন্য তিনি বীরোত্তম খেতাবে ভূষিত হন। জনযুদ্ধের নীতিতে বিশ্বাস করতেন তাহের। ভাবতেন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশের কথা। তাঁর এই ভাবনাকে তিনি মোটেই ভাবনা বিলাস হিসেবে নেন নি। নিয়েছিলেন জীবনের লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য হিসেবে। একাত্ম হয়েছিলেন গণমানুষ, মাটি আর তৎকালীন জাসদের বাম বিপ্লবী রাজনীতির সাথে। ছাত্র সেজেছিলেন লেনিন কিংবা মাও সেতুঙের। মারাত্মক ঝুঁকি মাথায় নিয়ে সার্বিক সহযোগিতা করেছেন গণবাহিনী গড়ে তুলতে। বিপ্লবী গণঅভ্যুত্থানে সহায়ক আরও অধিক গুরুত্বপূর্ণ যে কাজটির তিনি রূপকার ছিলেন সেটি হলো বিপ্লবী সৈনিকসংস্থা গঠন। লেনিনের ভাষায় ‘উর্দি পরা শ্রমিক’ সাধারণ সেনা সদস্যদের শোষিত জনতার কাতারে নিয়ে আসার যে অসাধারণ রাজনৈতিক কাজ তিনি করেছিলেন তা বাংলাদেশের বাম বিপ্লবী লড়াই-সংগ্রামে এক বিরল দৃষ্টানত। সামরিক রণকৌশলেন দিক থেকে শিক্ষণীয় তো বটেই। ১৯৭৫-এর ৭ নভেম্বরের বিপ্লবী গণঅভ্যুত্থান প্রচেষ্টার বাইরেও আমাদের দেশে গণবিচ্ছিন্ন সশস্ত্র তৎপরতা হয়েছে প্রচুর। এখানে আত্রাই বিদ্রোহ কিংবা সর্বহারা পার্টির গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরাওয়ের সশস্ত্র সংগ্রাম উল্লেখযোগ্য। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো কর্ণেল তাহের আঘাত করেছিলেন শোষকদের রাষ্ট্রের মাথায়। অন্যরাও রাষ্ট্রকে আঘাত করতে গেছেন কিন্তু আঘাত করেছেন রাষ্ট্রের হাত-পায়ের মরা নখে। ফলে রাষ্ট্র ততটুকু শঙ্কিত হয় নি যতটুকু শঙ্কিত হয়েছিল ৭ নভেম্বরের আঘাতে।

 

ব্রিটিশ শাসিত ভারতের আসাম প্রদেশের বদরপুর রেলওয়ে স্টেশনে নানার বাসায় ১৯৩৮ সালের ১৪ নভেম্বর আবু তাহের জন্ম গ্রহণ করেন। পৈত্রিক বাড়ি নেত্রকোনা জেলার পূর্বধলা থানার কাজলা গ্রামে। চট্টগ্রাম ফতেহাবাদ স্কুলের ছাত্র তাহের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। মূলত সেখান থেকেই তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদ, পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশের নিপীড়িত মানুষদের ন্যায্য অধিকার, স্বাধীকার ও স্বাধীনতার রাজনৈতিক চেতনায় বলিয়ান হতে থাকেন। স্বাধীনতা সংগ্রামে জয়ী হতে হলে সামরিক প্রশিক্ষণ অভিজ্ঞতা প্রয়োজন - এই বোধ থেকেই শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে তিনি পাকিস্তান সামরিকবাহিনীতে যোগদান করেন। অর্জন করেন বিশ্বমানের কমিশনপ্রাপ্ত সামরিক কমাণ্ডো ক্যাডেটের স্থান এবং মর্যাদা।

 

১৯৭৪ সালের ১৭ মার্চ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেয়ার জন্য অপেক্ষমান জাসদের নেতা-কর্মীদের ওপর রক্ষীবাহিনীর নারকীয় হামলা, নির্বিচারে গুলিবর্ষণের পর কর্ণেল তাহের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর জাসদ, জাসদের শাখা গণসংগঠনসমূহ, বিপ্লবী গণবাহিনী ও বিপ্লবী সৈনিকসংস্থার নেতৃত্বে সিপাহী জনতার গণঅভ্যুত্থান ক্ষণিকের জন্যে সাফল্যের মুখ দেখলেও মোস্তাক-জিয়া চক্রের আসল চেহারা থলের বিড়ালের মতো বেরিয়ে আসতে বিন্দুমাত্র বিলম্ব হয় নি। অভুত্থানের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ মার্কিন-পাকিস্তান-রিয়াদপন্থী চরম প্রতিক্রিয়াশীলদের হাতে চলে যায়। রাষ্ট্রবিপ্লব সংগঠিত করার জন্যে সশস্ত্র গণঅভ্যুত্থান করতে যাওয়াকে লেনিন আগুন নিয়ে খেলার সাথে তুলনা করেছেন। নির্ভুল নেতৃত্বে এবং সঠিক জনশক্তি সমাবেশের উপর না দাঁড়িয়ে একাজ করতে গেলে যে ভয়াবহ বিপর্যয় হয়, তাই হলো ৭ নভেম্বরের ঘটনার পরপরই। বন্দি হলেন জাসদ নেতৃবৃন্দ। তাহেরের পরিণতিও হলো অনুরূপ। তিনি ১৯৭৬ সালের ২৪ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এস. এম. হলের হাউস টিউটর............. বাসা থেকে তিনি গ্রেফতার হন। বন্দি হওয়ার আগে কর্ণেল তাহের কোনো এক গোপন সেল্টারে সাংবাদিক নির্মল সেনের সঙ্গে ৭ নভেম্বরের ঘটনা সম্পর্কে বলেন, “you will remember me. I have introduced class struggle in the Army.”

 

গ্রেফতারের পরপরই রাষ্ট্র বনাম মেজর (অবঃ) জলিল গং তথাকথিত রাষ্ট্রদ্রোহী মামলার বিচার শুরু হয়। কর্ণেল তাহের এবং জাসদ নেতৃবৃন্দের বিচারের জন্য ১৯৭৬ সালের ১৪ জুন সামরিক আইন ট্রাইব্যুনাল-৭৬/১ জারি করা হয়। এই জংলি আইনের আওতায় ট্রাইব্যুনালটি গঠিত হয় ১৫ জুন। সামরিক ট্রাইব্যুনাল বসার স্থান নির্ধারণ করা হয় ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরে ডিআইজি প্রিজন-এর অফিস কক্ষে। ট্রাইব্যুনাল গঠনের দিনই ট্রাইব্যুনালের সদস্যরা কেন্দ্রীয় কারাগার পরিদর্শন করেন। কর্ণেল তাহের এবং তাঁর সহযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে ‘Conspiracy case of state v’s Major (Rtd.) M.A. Jalil and Others’ শিরোনামের মামলাটির বিচার শুরু হয় ১৯৭৬ সালের ১৮ জুন। রায় যাতে সরকারের পক্ষে যায় সেজন্যে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে চাকরিরত, পরে একাত্তরের যুদ্ধবন্দি বিনিময় চুক্তির অধীনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে পুনর্বহালকৃত সেনা কর্মকর্তা কর্ণেল ইউসুফ হায়দারকে সামরিক ট্রাইব্যুনালের প্রধান নিযুক্ত করা হয়। ট্রাইব্যুনালের সদস্য ছিলেন - উইং কমাণ্ডার মোহামমদ আব্দুর রশীদ, প্রশাসনিক শাখা, যশোর বিমান ঘাঁটি, বিএএফ; মোহামমদ আব্দুল আলী, প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট, ঢাকা সদর (দক্ষিণ) এবং হাসান মোরশেদ, প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট ঢাকা (উত্তর)। বিচারে আসামীদের মৌলিক মানবাধিকার সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। অভিযুক্তদের তাদের আইনজীবীদের সাথে কোনো প্রকার পরামর্শ করতে দেয়া হয় নি। যা আমাদের শাসনতান্ত্রিক আইনে স্বীকৃত নাগরিকের আত্মপক্ষ সমর্থনের মৌলিক মানবিক অধিকারের ঘোরতর পরিপন্থী। সরকার পক্ষের সাক্ষীদের দেয়া বানোয়াট বক্তব্যের প্রকৃত সত্যতা যাচাই তথা ‘Cross examination-এর কোনো প্রকার সুযোগ দেয়া হয় নি বিরোধী পক্ষের উকিলদের। রাজসাক্ষী ফখরুল আলমকে জেরা করার জন্যে সামরিক ট্রাইব্যুনালের কাছে অনুমতি প্রার্থনা করা হলে তা প্রত্যাখ্যান করা হয়। সরকারি সাক্ষীকে জেরার ব্যাপারে ট্রাইব্যুনালের এই সিদ্ধানতটি European Conventional Human Rights Convention on Civil and Political Rights, -এর ধারা ৩ এর (ঘ) অনুচ্ছেদ এবং International Convention on Civil and Political Rights, ১৯৬৬-এর ধারা ১৪ (৮) এর অনুচ্ছেদ (ঙ) এর সুসপষ্ট লঙ্ঘন। এই মামলার আসামী পক্ষের উকিলের বাড়িতেও পুলিশি পাহারা বসানো হয়। যাতে জাসদের তরফ থেকে আইনজীবীদের সঙ্গে কোনো যুক্তিবুদ্ধি করা না যায়। এমনই এক ফ্যাসিবাদী সামরিক বিচারে ১৯৭৬ সালের ২১ জুলাই ভোর ৩টা ৪৯ মিনিটে মহান দেশপ্রেমিক ও সমাজতন্ত্রী কর্ণেল তাহেরকে তথাকথিত রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলায় অভিযুক্ত করে সামরিক আদালতের সাজানো রায়ে হত্যা করা হয়।

 

ফাঁসিতে তাঁর মৃত্যুদণ্ডের কথা শুনে তাহের মোটেই ভয় পান নি। বরং তিনি প্রাণদণ্ডকে রাজনৈতিক সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবেই নেন। জাসদের সভাপতি মেজর (অবঃ) জলিল মৃত্যুদপ্রাপ্ত কর্ণেল (অবঃ) তাহেরকে দিয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমাপ্রার্থনার আবেদন করানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তাহের তাতে স্বীকৃতি দেননি। উল্টো সহযোদ্ধা জলিলকে বলেছেন “Try to behave like a patriot. Try to give your blood to your nation” মিসে লুৎফা হাহের স্বামীর প্রাণ বাঁচাতে রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাদাত মোহামমদ সায়েমের কাছে আবেদন করেন। এ.এস.এম সায়েম তা নাকোচ করে দেন। জেল কোডের চিরাচরিত প্রথা অনুযায়ী ফাঁসির পূর্বক্ষণে জনৈক মৌলভি কর্ণেল তাহেরকে ‘তওবা’ পড়াতে যান। তাহের তওবা পড়ার প্রয়োজনবোধ করেন নি। বরং সকালে দাড়ি কেটে, পছন্দের নীল শার্ট পরে, আম কেটে খেয়ে, নিজের রচিত বিপ্লবের কবিতা আবৃত্তি করতে করতে মহান বিপ্লবী নেতা তাহের ফাঁসির মঞ্চে ওঠেন। নিজেই ফাঁসির রশি গলায় পরেন। পায়ের তলা থেকে ফাঁসিমঞ্চের পাটাতন হঠাৎ সরে যায়। তাহের ঝুলে পড়েন ফাঁসির কূয়ায়। খানিক সময় নড়াচড়া করে ফাঁসির দড়ি স্থির ঝুলতে থাকে। সামান্য সময়ের ব্যবধানে মুক্তিযোদ্ধা তাহের লাশ হয়ে যান। মিশে যান একাত্তরের রণাঙ্গনে শহীদ তাঁর লখো সহযোদ্ধার কাতারে। তাহেরের ঘাতক হিসেবে দেশের মানুষ সামরিক স্বৈরশাসক জিয়ার কথা যমন জানে তেমনি জানে তৎকালীন আওয়ামী লীগের নৈতিক নীরবতার কথা। পিকিং ও মস্কোপন্থী বলে পরিচিত সেসময়ের স্বঘোষিত কম্যুনিস্টদের কেউই কিন্তু কর্ণেল তাহেরের প্রাণরক্ষার প্রশ্নে সোচ্চার হননি। চীনপন্থী নেতা মোহমমদ তোয়াহা তখন টি.এস.সি’র এক সভায় তাহেরকে গ্রেফতার করিয়ে দেয়ার কৃতিত্ব দাবি করেছেন বলেও জানা যায়।

 

শুভ লক্ষণ যে, নতুন প্রজন্মের প্রকৃত কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের মাঝে মস্কোপন্থী অথবা পিকিংপন্থী তাত্ত্বিক গালগল্পের নেশা কাটতে শুরু করেছে। দেশীয় বাস্তবতাকে বিবেচনায় এনে বামপন্থীরা শোষণমুক্তির লড়াই ঐক্যবদ্ধভাবে করুক এই কাতর মিনতি আজ সর্বত্র। এমনি সময়ে দেশের বামপন্থী মহলে শহীদ কমরেড আবু তাহের বীরউত্তম সম্পর্কে রয়েছে আগ্রহ, অবহেলা, নিঃশর্ত সমর্থন কিংবা অহেতুক বিরোধিতার বাতিক। এসব থেকে মুক্ত হয়ে তাহেরকে বস্তুনিষ্ঠভাবে মূল্যায়নের জন্যে তাঁর রচিত রাজনৈতিক সাহিত্য পাঠ করা খুব জরুরি। শহীদ কমরেড আবু তাহের বাংলাদেশের বাম বিপ্লবী লড়াইয়ে একজন প্রমিথিউস কিংবা ক্ষুদিরাম।

 

তথ্যসূত্রঃ ১. ইতিহাস আমাকে মুক্তি দেবে, সম্পাদনা, জিয়াউল হক মুক্ত
২. কর্ণেল তাহের ও জাসদ রাজনীতি; আলতাফ পারভেজ
৩. কর্ণেল তাহের ও সিপাহী অভ্যুত্থান মামলা, আলতাফ পারভেজ

 

লেখক ঃ সাংবাদিক, দৈনিক সমকাল


অনলাইন ঃ ৭ নভেম্বর, ২০০৮