Banner
বাংলা সাহিত্যে জাতীয়তার আদর্শ

লিখেছেনঃ কাজী আবদুল ওদুদ , আপডেটঃ August 9, 2010, 4:01 PM, Hits: 37304


কিছুদিন পূর্বে কোনো মাসিকপত্রে একটি লেখা পড়েছিলাম ­- কবিকঙ্কণ চণ্ডীতে সেকালের বাংলার জাতীয় জীবন কেমন প্রতিফলিত হয়েছে এই সম্পর্কে। লেখক কড়া লোক, অমন সুপ্রাচীন কবিকঙ্কণকেও তিনি খাতির করেন নি মোটেও, বরং তাঁর ভাঁড়ুদত্ত, কালকেতু প্রভৃতি যে মোটের-উপর হীন শ্রেণীর জীব, কোন জাতির শ্লাঘার বস্তু নয়, এসব কথা এতটুকু আবরু রেখে বলবার প্রয়োজনও তিনি অনুভব করেন নি। আমার আজকের এই লেখাটিও সেকালের বাংলার জাতীয় জীবনের কাহিনী দিয়ে আরম্ভ করা যেতে পারতো, কিন্তু ‘জাতীয়তা’ বলতে যে সজ্ঞান প্রচেষ্টা বোঝায় সেটি যখন বিশেষভাবে একালের তখন প্রচীন মহাজনদের শান্তিতে বিঘ্ন না ঘটানোই হয়ত শোভন।

একালের বাংলার জাতীয় জীবনের সূচনা রামমোহন থেকে -­ এ সম্বন্ধে কিছু আলোচনা আমরা অন্যত্র করেছি -­ কিন্তু একালের বাংলা সাহিত্যে জাতীয় জীবনের সমস্যার আলোচনার সূচনা বোধ হয় ভূদেব মুখোপাধ্যায় থেকেই। তাঁর সতীর্থ রাজনারায়ণ বসু সুবিখ্যাত ‘‘হিন্দু ধর্মের শ্রেষ্ঠতা বিষয়ক প্রস্তাব’’ লিখেছিলেন, টেকচাঁদ ঠাকুরের হিন্দুত্বের, বিশেষত হিন্দুনারী-জীবনের, আদর্শ বঙ্কিমচন্দ্রের উপর প্রভাব বিস্তার করেছিল, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের নেতৃত্বাধীন ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গে পাদ্‌রীদের মসীযুদ্ধও প্রণিধানযোগ্য, ­- কিন্তু তবু ‘‘সামাজিক প্রবন্ধ’’ ও “পারিবারিক প্রবন্ধ”-এর রচয়িতা ভূদেবের স্থান বাংলার জাতীয়তাসমস্যার আলোচনার ইতিহাসে খুব উচ্চে এই জন্য যে এইসব বইতেই হিন্দুত্বকে বিস্তারিতভাবে যুক্তি-তর্কের দিক দিয়ে দেখতে চেষ্টা করা হয়েছে, প্রতিপক্ষের মত খণ্ডন করার চেষ্টাও হয়েছে যুক্তি-তর্কের সাহায্যেই -­ বিশেষত সুপরিচিত হিন্দু-মুসলমান সমস্যার সমাধানের অভিনব চেষ্টাও এই সব গ্রন্থে আছে।

একালে ভূদেবের আগে পর্যন্ত হিন্দু-সমাজের উপর দিয়ে বেশ এক ঝড় বয়ে যায়; পাদ্‌রিদের নিন্দা, ব্রাহ্মদের সংস্কার-চেষ্টা, হিন্দু-কলেজের আঘাত, এই ত্রিবিধ আক্রমণে হিন্দু সমাজ নিজেকে বিপন্ন বোধ করে। এ-সবের মধ্যে হিন্দু-কলেজের নব্য হিন্দুর আক্রমণই হয়ত হিন্দু-সমাজকে ব্যতিব্যস্ত করেছিল কিছু বেশী, কেননা They were enemies within the citadel (ঘর-শত্রু); আর এই আঘাতের নিষ্করুণতার জন্যই প্রতিঘাত হিন্দু-সমাজের পক্ষে অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে পড়ে। প্রতিঘাতের পদ্ধতি কিছুদিন থেকে সুনির্দিষ্ট হয়ে আসছিল; -­ ব্রাহ্মদের উপনিষদের আশ্রয় নেওয়া, বাইবেল থেকে তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে যত্নবান হওয়া, রাজনারায়ণ বসুর ‘‘হিন্দুধর্মের শ্রেষ্ঠতা বিষয়ক প্রস্তাব,’’ প্রভৃতিতে এই প্রতিঘাতের অস্ত্রের যোগান চলছিল; এর সঙ্গে শশধর তর্কচূড়ামণির প্রচলিত হিন্দুধর্মের চমকপ্রদ বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ও সুপণ্ডিত চরিত্রবান ভূদেবের স্বজন-বাৎসল্যের যোগ হলো। মানুষ স্বভাবত রক্ষণশীল, ভূদেব পযর্ন্ত হিন্দু-মনীষার এই যে অভিনব আবিষ্কার দাঁড়ালো যে হিন্দু ধর্ম জগতের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম, হিন্দু সমাজ চুড়ান্ত বৈজ্ঞানিকতার উপরে প্রতিষ্ঠিত, একে পূর্ণ সত্যের মর্যাদা দিতে হিন্দু সমাজের দেরী হলো না আরো বিশেষ করে এই জন্য যে সত্বরই বঙ্কিম, রামকৃষ্ণ ও বিবেকানন্দের প্রতিভার প্রসন্ন আলোক এই চিন্তাধারার উপরে পতিত হলো।

ভূদেবকে আজো অনেকে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন ক’রে থাকেন। দুই-একজনকে ঠাট্টা করতেও শুনেছি এই বলে যে তাঁর ভিতরে নিজের বংশের শ্রেষ্ঠ-ব্রাহ্মণত্বের গৌরব-বোধ প্রবল ছিল। কিন্তু এ সত্য যে ভূদেব বাস্তবিকই একালের বাংলার চিন্তাক্ষেত্রে এক প্রবল ব্যক্তি ­- তাঁকে সেই চিন্তার ক্ষেত্রে অতিক্রম করে যেতে পারেন এমন হিন্দু (অথবা মুসলমান ­- মুসলমানেরা স্বভাবত ভূদেব প্রমুখ চিন্তানায়কদের কাছ থেকে তাঁদের স্বধর্ম গৌরবের শিক্ষা গ্রহণ করেছেন ও করছেন) দেখি নি বল্লে অতুøক্তি হয় না। ভূদেবের এই হিন্দু ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব বিষয়ক চিন্তাই বাংলার একালের মনীষীদের সাধারণ লক্ষণ, বলা যেতে পারে; তাঁদের কেউ কেউ বা জোর দিয়েছেন উপনিষদের উপরে, কেউ কেউ পৌরাণিক হিন্দুধর্মের উপরে, কেউ বা হিন্দু-ইতিহাসের সবকিছুরই উপরে। অবশ্য আল্‌বেরুনী থেকে আরাম্ভ ক’রে একালের রোমাঁ রোলাঁ পর্যন্ত অনেক প্রথিত-যশাঃ অহিন্দুও হিন্দু সাধনার উচ্চ প্রশংসা করেছেন, আর হিন্দুর মতো একটা সুপ্রচীন সভ্যজাতির ইতিহাসে গৌরব-জনক অনেক কিছু যে থাকবে এ যেমন স্বাভাবিক তেমনি সঙ্গত, তবু একালের বাংলা সাহিত্যে হিন্দু-চিন্তানায়কদের আত্মপ্রশংসা যে-রূপ নিয়ে ফুটে উঠেছে ও যে-ফল ফলিয়েছে তা বুঝতে চেষ্টা করা এ-কালের বাংলার জিজ্ঞাসুদের জন্য নানা কারণেই অবশ্যকর্তব্য; পরিবর্তনশীলতা মানুষের ইতিহাসের এক নিত্য লক্ষণ, সেই পরিবর্তন হয়ত কিছু পরিমাণে সুনিয়ন্ত্রিত হতে পারবে এই-সব অনুসন্ধানের সাহায্যে।

আত্মপ্রশংসা-মাত্রই দোষার্হ নয়; অনেক সময়ে আত্মপ্রশংসা আত্ম-বিকাশেরই এক রূপ। গ্রীক, মুসলমান, ইংরেজ, জার্মান, ফরাসী, এঁদের সাহিত্যের সঙ্গে আমাদের যে অল্প পরিচয়টুকু ঘটে তারও ভিতর দিয়ে বুঝতে পারা যায়, আত্মগৌরববোধ এ’দের কারো ভিতর কম নয়। কিন্তু এঁদের আত্মপ্রশংসার সঙ্গে একালের বাঙালীর আত্ন-প্রশংসা মিলিয়ে দেখলে পার্থক্য যেটি সেটি সহজেই চোখে পড়ে। জগতের বুকে দৃঢ়পদে দাঁড়াবার ও বিচরণ করবার ক্ষমতা থেকে উৎসারিত হয় যে একটি সহজ আত্মগৌরববোধ, সেই স্বাভাবিকতার প্রভামণ্ডিত আত্মপ্রশংসা একালের বাংলা সাহিত্যে দুর্লভ; একালের বাংলা সাহিত্যিকদের আত্মপ্রশংসার মূলে রয়েছে বরং তার্কিকতা ­ প্রবল প্রতিপক্ষের সামনে নিজেদের বজায় রাখবার একটা চেষ্টা।

তার উপর এই সব হিন্দু সমাজ-তাত্ত্বিকদের সমস্ত চিন্তার মূলে রয়েছে এক শোচনীয় দায়িত্বহীনতা। ভূদেব তো তাঁর কালের ব্রিটিশ ভারতকেই প্রায় চিরন্তন ভারত ধরে নিয়েছিলেন। দেশ-রক্ষা ও দেশ-শাসনের বৃহৎ দায়িত্ব রয়েছে সবল শাসকদের স্কন্ধে, সে দায়িত্ব যে কত বিচিত্র বাস্তবতায় সুকঠোর সে-সম্বন্ধে দেশের চিত্ত সচেতন করবার প্রয়োজনও তেমন অনুভূত হয় নি, এই শান্তির ও স্বস্তির আওতায় কেমন করে একটি সম্মানিত ভব্য ধর্ম-জীবন যাপন সম্ভবপর ভূদেবের অনেকখানি সমস্যাই এই সমস্যা। তাই বাংলার বা ভারতের ভবিষ্যৎ ওজস্বল জাতীয় জীবন ভূদেবের মতো একজন সুপণ্ডিত সচ্চরিত্র সুপ্রসিদ্ধ কিন্তু হ্রস্বদৃষ্টি চিন্তা-নায়কের ঋণ অতি সামান্যই স্বীকার করবে মনে হয়।

ভূদেবের পরে বঙ্কিমচন্দ্র কালানুসারে; কিন্তু বাংলার সর্ব সাধারণের উপরে প্রভাব বিস্তারে অগ্রবর্তী বঙ্কিমচন্দ্রই -­ বঙ্কিমচন্দ্রের প্রতিভার প্রসন্ন আলোক ভূদেবের চিন্তাধারার উপরে পড়েছিল বলেই তার ঐতিহাসিক মর্যাদা এত বেশী। নব-বাঙ্গালীত্বের স্রষ্টা বঙ্কিমচন্দ্র এ সম্বন্ধে দ্বিমত নেই ­- স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও তাঁর কালের একজন কর্মী বলে নিজেকে পরিচিত করতে অগৌরব বোধ করেন নি। বঙ্কিম প্রতিভাবান, তাই স্বভাবতই তিনি অনেকখানি সত্যাশ্রয়ী। তিনি তাঁর স্বদেশবাসী মুসলমানদের সম্বন্ধে এক জায়গায় বলেছেন ­- এদেশের যে সব মুসলমান গরু খায় তারা নরাধম; তবু এই অসহিষ্ণু বঙ্কিমচন্দ্রই “বঙ্গদেশের কৃষকে”র দুর্দশার কাহিনী লিখেছেন, পুরুষের সঙ্গে নারীর সমান অধিকারের কথা বলেছেন, আর প্রবল ইচ্ছা-শক্তির সাহায্যে যুগযুগাগত জড়তা কাটিয়ে উঠতে নানা ভাবে নির্দেশ করেছেন। বাংলাদেশের সর্ব সাধারণের উপরে বঙ্কিমচন্দ্রের প্রভাব যাই-ই হোক তাকে বাস্তবিকই যাঁরা বুঝতে চেষ্টা করেন তাঁদের বুঝতে দেরী হয় না যে মানব প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর পরিচয় কত গভীর। কিন্তু তবু কেন সঙ্কীর্ণ হিন্দুত্বের অভিমান তার ভিতরে এত প্রবল তা বহু রকমে ভেবেও আমি নিজে তেমন সুমীমাংসায় পৌছুতে পারিনি। হতে পারে স্বভাবদত্ত প্রতিভার তীক্ষা চঞ্চল আলোকে ব্যক্তিগত ও জাতীয় জীবনের অনেক কিছুই তাঁর চোখে প্রতিভাত হয়েছিল, কিন্তু সমগ্রভাবে দেশের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে একটি মহান বিশ্বাসে অনুপ্রাণিত হবার সামর্থø তাঁর ছিল না। বঙ্কিমচন্দ্রের প্রতিভা সৃষ্টিধর্মী ঠিক নয় যদিও প্রদীপ্ত ­- এ কথাটি আপাতত অনেকের কানে রূঢ় শোনাতে পারে, কিন্তু সেদিন হয়ত দূরে নয় যেদিন তাঁর শ্রেষ্ঠ ভক্তরাও বলবেন -­ জাতীয় জীবনে বঙ্কিমচন্দ্রের নেতৃত্ব অস্বীকার না করলে কাল ও পরিবেষ্টনের সঙ্গে দ্বন্দ্বই হবে বাঙালীর ভাগ্য। বাঙালী বলতে আমরা জাতিধর্মনির্বিশেষে বাংলা দেশের সব লোকই বুঝছি। মুসলমানদের অনেকে বলতে চান বটে তাঁরা বঙ্কিমচন্দ্রের বিরোধী, কিন্তু যে-ভাবে তাঁরা তাঁর বিরোধিতা করতে প্রয়াস পান তা প্রকৃতই তার অনুকরণ। সঙ্কীর্ণ ও উগ্র জাতীয়ত্বই বঙ্কিমচন্দ্রের মন্ত্র, সে মন্ত্রের মোহ কাটিয়ে উঠবার মতো মানসিকতা আজো দেশের কোন সম্প্রদায়েরই হয় নি।

বঙ্কিমচন্দ্রের সহপাঠী, কিন্তু অপরিচিত, কেশবচন্দ্র বাংলার জাতীয় জীবনের আর এক দিকের উৎকর্ষ বিধানে ব্রতী হয়েছিলেন ­- ধর্মের ক্ষেত্রে। কেশবচন্দ্রের প্রতিভা ছিল আশ্চার্য ধরণের। সাধারণত তাঁর রচনায় সাহিত্যক সৌষ্ঠব খুব বেশী নয়, কিন্তু তাঁর ‘‘জীবন বেদ’’ বাংলা সাহিত্যে এক পরমোৎকৃষ্ট কাব্য এই হিসাবে যে ধর্মজীবনের আকুলি-বাকুলির এক চমৎকার রূপ ফুটেছে এতে। এ ভিন্ন তাঁরই নির্দেশক্রমে তাঁর প্রচারকবর্গ বিভিন্ন ধর্ম-সাহিত্য মন্থন ক’রে বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারে নব নব সাহিত্য-রত্ন দান করেছেন। এই সব প্রচেষ্টার ফলে বাংলার জাতীয় জীবন বৃহত্তর ও গভীরতর হবে এ আশা করা স্বাভাবিক। কিন্তু বিজ্ঞান-প্রভাবান্বিত ঊনবিংশ শতাব্দীতেও কেশবচন্দ্র ছিলেন অত্যন্ত বেশী mystic (মরমিয়া); তাই তাঁর প্রভাবে বাংলার জাতীয় জীবন ধর্মময় তত হতে পারে নি যত হয়েছে ধর্মোন্মত্ত; অন্য কথায়, কর্মহীন ও গতিহীন। কেশবচন্দ্রের প্রতিভা কেন এমন একটা অবাঞ্ছিত পরিণতি লাভ করল এ সম্বন্ধে অনেক কথাই ভাবা যেতে পারে। এর জন্য দোষ কেশবচন্দ্রকে না দিয়ে তাঁর দেশবাসীদেরও দেওয়া যেতে পারে -­ তাঁরা শুধু তাঁর ভাবোন্মত্ততা না নিয়ে তাঁর জ্ঞান ও কর্মময় জীবন থেকে প্রেরণা বেশী করে গ্রহণ করতে পারতেন। কিন্তু এর জন্য শেষ পর্যন্ত কেশবচন্দ্রকেই দায়ী করা ভিন্ন হয়ত গত্যন্তর নেই। এক বৃহৎ মানব-পরিবারের ধর্মজীবন বলতে যে একটি বিপুল বীর্যবন্ত অভিনব জীবনযাপন বোঝায় সে-সম্বন্ধে সচেতনতা কেশবচন্দ্রের ভিতর ছিল না এ সত্য নয়, কিন্তু তবু কেমন করে যেন তিনি সেই অভিনব বিরাট জীবন সর্বান্তঃকরণে চাইতে পারেন নি। সত্য ও কল্যাণের আকর্ষণে কেশবচন্দ্র আকৃষ্ট হয়েছিলেন, কিন্তু সমসাময়িক-কালের সুপরিচিত জীবন-ধারার জন্য তাঁর মমতা হয়ত তারও চাইতে বলবত্তর ছিল।

কেশবচন্দ্রের সঙ্গে সঙ্গে রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের কথা এসে পড়ে, যেমন বঙ্কিমচন্দ্রের সঙ্গে সঙ্গে হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র, রমেশচন্দ্র, দ্বিজেন্দ্রলাল প্রভৃতির কথা এসে পড়ে -­ শুধু পার্থক্য এই যে, হেম-নবীন প্রমুখ বঙ্কিমচন্দ্রের অনুবর্তীরা অনেকখানি শক্তিহীন অনুবর্তী, কিন্তু রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ কেশবচন্দ্রের চাইতে অনেক বেশী আধিপত্য বাংলার জাতীয় জীবনের উপরে বিস্তার করতে সমর্থ হয়েছেন।

কিন্তু আমাদের আলোচনাস্থল বিবেকানন্দই, রামকৃষ্ণ তেমন নন, কেননা তিনি এ কালের বাংলার নতুন নর-দেবতা -­ তাঁর মর্যাদা তাঁর দেবত্বেরই জন্য, নরত্বের জন্য তেমন নয়। তাঁকে এক বড় সমন্বয়াচার্যরূপে দাঁড় করাবার চেষ্টা কেউ কেউ করেছেন, কিন্তু যাঁর মনোজীবন গভীর ও চমৎকার হলেও অল্প পরিসর তাঁকে নিয়ে এ ক্ষেত্রে বাদানুবাদ না করাই শোভন।

বিবেকানন্দ সম্বন্ধে মহানুভব রোলাঁ এক জায়গায় বলেছেন -­ তাঁর প্রতিভার বিরাটত্ব এইখানে যে জীবনের পর্বত-প্রমাণ দুঃখের সামনে তিনি ভীত হন নি -­ যে ভয় হয়ত বুদ্ধদেবেও লক্ষ্যযোগ্য। ­ বিবেকানন্দ নির্ভীক ছিলেন সন্দেহ নেই, মানুষের সঙ্গে একটি সহজ প্রীতির যোগও তাঁর ছিল, তবু মানুষের দুঃখ বুঝবার ধৈর্য তাঁর ভিতরে ছিল তা মনে হয় না। আমাদের মনে হয় বিবেকানন্দ জীবনে একটি সুসামঞ্জস্য লাভ করবার পূর্বেই ইহলোক ত্যাগ করেন। তাঁর ভিতরকার সাহস শেষ পর্যন্ত রয়ে গেছে একটি ব্যক্তিগত সাহস। যাকে বলা হয় বহু জনের জন্য সত্যের আবিষ্কার ও প্রয়োগের সাহস সে-গৌরব তাঁকে দিতে পারলে আজ আমরা জাতীয় জীবনে অনেক বিড়ম্বনার হাত থেকে অ্ব্যাহতি পেতে পারতাম।

বিবেকানন্দ সুপণ্ডিত ও সুলেখক; কিন্তু তাঁর প্রধান কীর্তি দেশের বুকে সেবাশ্রমের বিস্তার। এর পেছনে যে আত্নসম্মানবোধ ও স্বদেশবাৎসল্য রয়েছে সেটি আমাদের পরম আনন্দ ও শ্রদ্ধার সামগ্রী। তবু এ-কথা আমাদের ভাবতেই হবে যে সন্ন্যাস ও ভিক্ষার সাহায্যে দেশের দুঃখ দূর করতে চেষ্টা করা ছেঁড়া কাপড় তালি দেওয়ার চাইতে বড় কাজ নয়। সন্ন্যাস জীবনের বহু অলঙ্কারের এক অলঙ্কার, ভিক্ষার সাহায্যে অর্থনৈতিক অসাম্যের রূঢ়তা ঈষৎ শ্রীমণ্ডিত হতেও পারে; কিন্তু মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় সমৃদ্ধিই, ভিক্ষা বা দীনতা নয়। বিবেকানন্দও জাতির জন্য দীনতা চান নি -­ তাঁর নিজের বেশও দীনবেশ ছিল না। জাতির পরিবেশ ও চিত্ত উভয়েরই সমৃদ্ধির জন্য তিনি যে তেমন বিশেষ আয়োজন করতে পারেন নি তার কারণ মনে হয় তাঁর অস্থিরতা ­- স্বসম্প্রদায়ের আশু উন্নতির জন্য অস্থিরতা। এ অস্থিরতা শ্রদ্ধেয় নিশ্চয়ই, কিন্তু এ কথাও ভুললে চলবে না যে অস্থিরতা সব সময়ে উদ্দেশ্য সিদ্ধির অনুকূল হয় না, অনেক সময়ই হয় প্রতিকূল।

হিন্দু-মুসলমান সমস্যা সম্পর্কে বিবেকানন্দের একটি কথা সুবিখ্যাত, তিনি বলেছেন -­ ভারতীয় জাতীয়ত্বের রূপ হবে ইসলাম-দেহ ও বেদান্ত-মস্তিষ্ক। কিন্তু কথাটি কিছু সুচিন্তার উদ্রেক করলেও এর ভিতরকার দুর্বলতা অল্পেই চোখে পড়ে। ইসলাম ও বেদান্ত দুয়েরই বর্তমান অনুবর্তীরা জগৎ-সভায় সম্মানের আসনে আসীন নন -­ আর সত্যের মর্যাদা সত্যের সেবক থেকেই। তা’ছাড়া ইসলাম ও বেদান্তের যে-সমন্বয় ভারতীয় জীবনকে জগতে গণনার বস্তু করে তুলবে সে-সমন্বয়ের চেষ্টা তিনি বা তাঁর শিষ্যেরা কেউই তেমন করেন নি, -­ করলেও এমন জিনিষ হয়ত দাঁড়াতো যা দেখে বেদান্ত-বাদী ইসলাম-বাদী কেউই খুশী হতে পারতেন না। -­ হয়ত বেদান্তের ভিতরে ইসলাম আছে ও ইসলামের ভিতরে বেদান্ত আছে, তাই জাতির সর্বসাধারণের জন্য প্রয়োজন নানা-বিরুদ্ধতা-খণ্ডিত পুরাতন মতবাদের জোড়াতালি তেমন নয় যেমন সমসাময়িক জাগতিক জীবনের কল্যাণ-অকল্যাণ, উন্নতি-অবনতি সম্বন্ধে সুস্পষ্ট ধারণা ও অক্লান্ত সাধনা। -­ কর্মী বিবেকানন্দও বাস্তবিক কর্মী তেমন নন, অনেকখানি খেয়ালী।

ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলার প্রায় সমস্ত কর্ম ও চিন্তা-নেতাই জাতীয় জীবনে পরিবর্তনের প্রয়োজন অনুভব করেছেন, বলা যেতে পারে। কিন্তু সে পরিবর্তন জাতীয় জীবনে প্রকৃতই কার্যকর হবার জন্য যে খুব বড় রকমের হওয়া চাই ­- হয়ত আমূল -­ সে-বোধ জেগেছে দুই জনের ভিতর ­ রামমোহন ও রবীন্দ্রনাথ। এই সম্পর্কে মধুসূদনের নাম করা যায় না শুধু এই জন্য যে তার ভিতরে জাতীয় জীবন নিয়ন্ত্রণের সজ্ঞান প্রচেষ্টা অতি কম। কেউ কেউ বলতে পারেন ­- রামমোহন ও বরীন্দ্রনাথের ভিতরেও Scholasticism যথেষ্ট -­ তাঁরা প্রচীন শাস্ত্রের নূতন ব্যাখ্যা দিতে চেয়েছেন, তাও ব্যবহারিক জীবনে তেমন নয়, চিন্তাক্ষেত্রেই -­ ফলে প্রাচীন-পন্থিত্ব আমাদের ঘোচে নি। এই ধরণের চিন্তার প্রতি আমার ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা যথেষ্ট, শুধু বলতে চাই -­ রামমোহনকে এই অভিযোগে অভিযুক্ত করা দুঃসাধ্য, কেননা তাঁর কর্মের আয়োজন সুবিপুল, আর তাঁর দৃষ্টি যে পিছনে নিবদ্ধ নয় সামনে বহুদূর পর্যন্ত প্রসারিত, তা বুঝতে এতটুকুও বেগ পেতে হয় না, আর রবীন্দ্রনাথকে কিছু পরিমাণে অভিযুক্ত করা সম্ভবপর হলেও তাঁর প্রবণতা কোন্‌ দিকে তা বুঝতে না পারা তাঁর দেশবাসীর পক্ষে অশোভন। তাঁর ‘অচলায়তনে’র আচার্য, ‘গোরা’র ‘পরেশ’, ‘চতুরঙ্গে’র ‘শচীশ’, এরা কেউই কূলের শান্তি চান নি, স্রোত ও আবর্তের উপরে নিজেদের স’পে দিয়েছেন।

কিন্তু তবু এ সত্য যে জাতীয় জীবনের উৎকর্ষ সাধনে রবীন্দ্র­প্রতিভা আশানুরূপ কার্যকরী হয় নি। ভূদেবের স্বস্তি, বঙ্কিমচন্দ্রের উগ্রতা, কেশবচন্দ্রের ভাবোন্মত্ততা, বিবেকানন্দের খেয়ালিত্ব, জাতীয় জীবনের জন্য এ-সমস্তেরই অপকারিতা সম্বন্ধে তিনি যথেষ্ট সচেতন; কিন্তু তিনি যে কবি, মানুষের ও প্রকৃতির সভায় চির-আন্দময় গায়ক, এই বোধ কর্মীর যোদ্ধৃবেশ গ্রহণে বারবার তার ভিতরে কুণ্ঠা এনে দিয়েছে। এতে তার সাহিত্যের গৌরব ক্ষুণ্ন হয় নি, বরং এক হিসাবে বৃদ্ধি পেয়েছে ­- আত্মপ্রকাশে-ব্যস্ত মানুষের সমাজে এ-কুণ্ঠা কত দুর্লভ -­ কিন্তু কবির সমসাময়িক বাঙ্গালী জীবন কিছু পরিমাণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বৈকি। রবীন্দ্র-সাহিত্যের সার্থকতা তুলিত হতে পারে সুফী-সাহিত্যের সার্থকতার সঙ্গে। সুফী-সাহিত্য বহু দেশের বহু ব্যক্তির মনোজীবনে আশ্চর্য সুফল ফলিয়েছে, তবু বৃহত্তর সমাজজীবনে সে-সাহিত্যের প্রভাব আশানুরূপ সুন্দর নয়।

সমাজ-জীবনে রবীন্দ্রনাথের নির্দেশ কিছু সুস্পষ্ট করতে প্রয়াস পেয়েছেন তাঁর প্রতিভাবান শিষ্য শরৎচন্দ্র; আর এ-কার্যে কিছু সাফল্যও তিনি অর্জন করেছেন। তাঁর সম্প্রতি প্রকাশিত গ্রন্থ ‘‘শেষ প্রশ্ন’’ উপন্যাস না হতে পারে, একদেশদর্শিতাও তাতে যথেষ্ট, তবু একালের সর্বকল্যাণরোধী হিন্দুত্ব-অভিমান ও তারই পিছনে পিছনে আসা মুসলিমত্ব-অভিমান তাঁর হাতে যে আঘাত খেয়েছে তাতে দেশের মোহমুক্তির কিছু সহায়তা হবে আশা করা যেতে পারে।

শরৎচন্দ্রের ধরণের পরিচ্ছন্ন চিন্তা তাঁর সমকালবর্তী দুইজন মুসলমান সাহিত্যিকের ভিতরেও ফুটেছে -­ একজন কাজী ইমদাদুল হক অপরজন লুৎফর রহমান। শুধু এঁদের ত্রুটি এই ­- দেশের আম-দরবারে আসন গ্রহণ করে কথা বলতে এঁরা পারেন নি, অথবা সাহস করেন নি।

যাকে বলা যেতে পারে সুব্যবস্থিত বীর্যবন্ত জাতীয় জীবন তার আয়োজন একালের বাংলার সাহিত্যে ও জীবনে কম হয়েছে আমরা দেখেছি। কিন্তু কি ভাবেই বা এ-ত্রুটির ক্ষালন সম্ভবপর?

এ-সম্বন্ধে কাগজে-পত্রে সভা-সমিতিতে শুধু কল্পনা-জল্পনা চলতে পারে, সত্যকার কর্মারম্ভ অপেক্ষা করছে নবভাবোদ্দীপ্ত কর্মীর। সেই ধরণের একটি জল্পনা-কল্পনার অবতারণা করা যেতে পারে।

সত্যকার জাতীয় জীবনের উদ্দেশ্যে দু’টি কর্ম ও চিন্তাধারার কথা সহজেই মনে পড়ে -­ প্রথমটি, হিন্দু-মুসলমান সমস্যার সমাধান-চেষ্টা, দ্বিতীয়টি, জাতীয় জীবন সুনিশ্চিত অর্থনৈতিক ভিত্তির উপরে প্রতিষ্ঠিত করা। শিক্ষা ও স্বরাজ-সাধনা অর্থনৈতিক সমস্যার অন্তর্গত ক’রে ভাবাই সঙ্গত, আর সেভাবে না ভাবলে শিক্ষা ও স্বরাজসাধনা হয়ত শেষ পর্যন্ত আমাদের কাছে ভাববিলাসের ব্যাপারই রয়ে যাবে। আমি নিজে এই শেষোক্ত অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধানচেষ্টাই আপাতত বেশী প্রয়োজনীয় মনে করি। জাতিভেদ ও হিন্দু-মুসলমান সমস্যার মীমাংসার ভার আমাদের ভিতরকার ক্রমবর্ধমান বৈজ্ঞানিকতার উপরে ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে -­ অর্থনৈতিক সুমীমাংসাও এ-সবের সাহায্য করবে।

কিন্তু অর্থনৈতিক সমস্যার সুমীমাংসা তো সহজসাধ্য নয়! সহজসাধ্য নিশ্চয়ই নয়, তবে এর একটি যোগ্য ভিত্তির পত্তন হতে পারে শাসক ও শাসিত সকলেরই ভিতরে এই চিন্তা যদি প্রবল হয় যে, দেশে অভুক্ত ও কর্মহীন কেউ থাকবে না। ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলার সমাজ-কল্যাণ-চিন্তায় এক একটি মারাত্মক দৈন্য ছিল যে সমাজ ও রাষ্ট্রকে দুই বিভিন্ন, এমন কি পরস্পর-বিরোধী, শক্তিরূপে কল্পনা করা হয়েছিল; তারই ফলে সেবাশ্রমের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল সে-যুগের শ্রেষ্ঠ কর্ম। দেশের রাজনৈতিক অবস্থিতি সম্বন্ধে সূক্ষ্মদৃষ্টি রবীন্দ্রনাথও দেশের রাজশক্তিকে কতকটা বিরুদ্ধশক্তিই ভেবেছেন। কিন্তু রাজশক্তিকে যেমন করে হোক দেশের সম্পদবৃদ্ধির কাজে লাগাতে না পারলে দেশের ও সঙ্গে সঙ্গে দেশের লোকের উন্নতি বাস্তবিকই অসম্ভব। আর দেশের এই সম্পদ-বৃদ্ধির কাজে রাজশক্তিরও ব্রতী হওয়া স্বাভাবিক, কেননা সম্পদের প্রয়োজন তার অত্যন্ত বেশী। দক্ষ মাঝি প্রতিকূল হাওয়াকেও বহু পরিমাণে তার কাজে লাগাতে পারে। দক্ষ জাতীয় কর্মীও তেমনিভাবে রাজশক্তির অপ্রসন্নতা সত্ত্বেও তার সাহায্যে জাতীয় জীবনের উৎকর্ষ বিধানে অগ্রসর হতে পারে। এ কল্পনা নয়, ভগ্যবান দেশের ইতিহাসে জনসাধারণের সঙ্গে রাষ্ট্রের এই দৃঢ় যোগ খুবই লক্ষ্যযোগ্য।

অবশ্য এই অর্থনৈতিক শ্রীবৃদ্ধিই যে জাতীয় জীবনের উৎকর্ষের জন্য যথেষ্ট তা নয়, আর্থিক স্বাচ্ছল্য জীবনের খুব বড় একটি কাম্য কিন্তু একমাত্র কাম্য নয়। মনে হয় বাংলা দেশে অন্যান্য সৃষ্টির সূচনা কিছু কিছু হয়েছে, এখন, সবারই গ্রাসাচ্ছাদনের ব্যবস্থার জন্য সমস্ত দেশ দায়ী, এই চিন্তার ভিতরে আপামরসাধারণের প্রতি যে একটা শ্রদ্ধা ও কর্তব্য-বোধ আছে তাই হয়ত বিশেষভাবে সাহায্য করবে আমাদের সমস্ত চেষ্টার সত্যাশ্রয়ী হতে। আর প্রাচীনত্বের অভিমান নয় সত্যাশ্রয়ের প্রয়োজনই আমাদের জন্য অত্যন্ত বেশী -­ আমাদের সাহিত্য, বীর্যবন্ত জাতীয়  জীবন, সব ক্ষেত্রে।


জ্যৈষ্ঠ, ১৩৩৮


(প্রবন্ধটি ব্র্যাক কর্তৃক ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত কাজী আবদুল ওদুদ-এর প্রবন্ধ সংকলন গ্রন্থ “শাশ্বত বঙ্গ” থেকে সংকলিত। -- বঙ্গরাষ্ট্র, ৯ আগস্ট,২০১০)

 

{sharethis}

 

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
Archive
 
সাম্প্রতিক পোষ্টসমূহ