Banner
বাংলা ভাষায় মুসলিম শাসকদের বিশিষ্ট অবদান -- আলমগীর হুসেন (পুনঃপ্রকাশিত)

লিখেছেনঃ আলমগীর হুসেন, আপডেটঃ March 20, 2011, 12:00 AM, Hits: 247

 

 

“তবে আমাদের যে হিন্দু-বৌদ্ধ পূর্বপুরুষদের কৃপায় আমরা বাংলা ভাষাটি উপহার পেয়েছি, তারা যে আমাদের মাঝ থেকে ক্রমেই উধাও হয়ে যাচ্ছে - সে বিষয়টি আমাকে ভীষণ পীড়া দেয়।”


ভাষাদিবসে ফেইসবুকে প্রকাশিত আমার “শুধাংশু! এবার তুই পালা” নোটটিতে উদ্ধৃত এ বাক্যটি সম্পর্কে জনাব মনির হোসেন আমাকে লিখেনঃ

hindu-bouddho sohojiader dhormashrito grohnto likhonitei bangla bhashar prosarota! aapnar kobitar uporer lekha kintu tai-e (বলে). tobe kee muslim shashokder prishtopushokota mittha? prachin yuger charjapod, moddhoyuger sreekrishnakeertan hoye chithi, dolil-dostabej, chuktinama dhore fort william college dhore je bhashatattik ogrojatra tate kee muslimra nei, bolchhen? sahittyar etihas kinthu taa bolena.


মনির সাহেব আমার উক্তিটিকে কিছুটা ভুল বুঝেছেন। আমি শুধু বলতে চেয়েছিলাম ভাষাটির উৎপত্তির কথা, পরিপুষ্টির কথা নয়। আমি বলতে চেয়েছিঃ বাংলা ভাষার উৎপত্তি আমাদের আদি পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে এসেছে। ইসলাম সেটা আনে নি।


তবে মনির সাহেব একটি ভাল বিষয় উল্লেখ করেছেন, যার উপর কিছুটা বিষদ বিশ্লেষণ হতে পারে। সম্প্রতি ফেইসবুকে একটা প্রবন্ধ আমার নজরে এসেছে, যাতে বাংলা ভাষার সমৃদ্ধি সাধনে ইসলামী শাসনের ভূমিকা আলোচিত হয়েছে। রচনাটি আমি সম্পূর্ণ পড়ি নি; তবে বোধ হয় বলতে চাওয়া হয়েছেঃ বাংলায় ইসলামের আগমনের সময় ভাষাটি ছিল অমার্জিত; না ছিল কোনো বিশেষ সাহিত্যকর্ম, না কিছু। মুসলিম শাসকরা সক্রিয় পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে ভাষাটিকে আজকের মার্জিত-সাবলীল রূপ দিতে অনন্য ভূমিকা রেখেছে।


বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসের উপর আমার পড়াশুনা নেই; কাজেই সে বিষয়ে আমি মন্তব্য করতে পারব না। তবে সম্প্রতি বছরগুলোতে ইসলামী ধর্মীয় মতবাদ (কোরান-হাদীস-সিরা) ও ইতিহাসের উপর যথেষ্ট পড়াশুনার ভিত্তিতে বাংলা ভাষার মতো ভাষাগুলোর প্রতি ইসলাম-মুসলিমদের মনোভাব বা দৃষ্টিভঙ্গীর আলোকে বিষয়টির পর্যালোচনা করতে পারি।


প্রথমে বিবেচনা করা যাকঃ ইসলামের তলোয়ার উচিয়ে মুসলিম জিহাদী বাহিনী বাংলায় এসে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা না করলে কি হতো বাংলা ভাষার? ইসলাম যখন আসে তখন ভাষাটি সদ্য আধুনিক বাংলায় রূপায়নের পথে পা দিয়েছে, ১-২শ বছর বয়স মাত্র। তারপর মুসলিম শাসন ও আধিপত্য শুরু হয়ে যায় এবং সে-সাথে বাংলা ভাষার পরিপুষ্টি ও উৎকর্ষ সাধনে ইসলামী শাসকদের একাগ্র পৃষ্ঠপোষকতা (এটা এ পর্যায়ে একটা দাবী মাত্র, সে প্রসঙ্গে পরে আসব)। ভাষাটির পরিপুষ্টি সে সময়কালে ঘটত, ইসলাম বাংলায় না এলেও। তবে মাত্রাটি কি রকম হতো সেটা বলা মুশকিলঃ বেশীও হতে পারত, কিংবা কম।


তবে এটা আমাদেরকে মনে রাখতে হবে যে, আরব-তুর্কী-পারস্য শাসকরা কখনোই ‘জাহিলিয়া’ ভাষার পরিপুষ্টি কামনা করে নি। কেননা ইসলামের একটা মৌলিক উদ্দেশ্য হলো জাহিলিয়া সবকিছু - জ্ঞান, সংস্কৃতি, কৃষ্টি, ভাষা ধ্বংস করা। আমরা মুসলিমরা সবাই জানি এটা - স্বীকার করি বা নাই করি। এবং মুসলিম জিহাদী বাহিনী তলোয়ার উঁচিয়ে যেখানেই গিয়েছে, সেখানেই বিজিত জনগণের ভাষা-সংস্কৃতি-কৃষ্টি ধ্বংসের চেষ্টা চালিয়েছে একাগ্র মনে - সেগুলোকে পরিপুষ্টির চেষ্টা নয়। তাকিয়ে দেখুন মিশর-সিরিয়া-ফিলিস্তিনের দিকে - ইসলামের আবির্ভাবকালে ‘হেলিনিস্ট’ সংস্কৃতি ও সভ্যতার অগ্রপথিক। তদুপরি মিশর বিশ্বের সবচেয়ে পুরানো অগ্রগামী সভ্যতাগুলোর গৌরাবান্বিত উত্তরাধিকারী। ইসলাম এসে বিশ্বের এ সর্বাধিক অগ্রসরমান অঞ্চলটির ভাষা-সংস্কৃতি-কৃষ্টিকে পুরোপুরি আরবায়ন করে ফেলেছে, অথচ আরব ভাষা-সভ্যতা সংস্কৃতি তৎকালে ছিল অত্যন্ত অসংস্কৃত-আদিম পর্যায়ের। আজ মিশরে কেউ মিশরীয় নেই, তারা সবাই গৌরবান্বিত আরব হয়ে গেছে। ঠিক একই ঘটনা উত্তর আফ্রিকার লিবিয়া-আলজেরিয়া-তিউনিসিয়ার ক্ষেত্রেঃ তাদের বার্বার ভাষা-সভ্যতা-সংস্কৃতির আরবায়ন হয়ে গেছে। আলজেরিয়াতে ফ্রেন্স উপনিবেশিক আমলে তাদের মাঝে বার্বার সংস্কৃতি, সভ্যতা ও জাতীয়তার কিছুটা হাওয়া লাগে। গত দুই দশকে এরূপ ২০০,০০০ আলজেরীয় জাতীয়তাবাদীদেরকে হত্যা করেছে ইসলামপন্থী সহিংস মৌলবাদীরা, যারা দেশটির সম্পূর্ণ আরবায়ন দেখতে চাই। ইসলাম যেখানেই গেছে, সেখানেই স্থানীয় ভাষা-সংস্কৃতির উপর একই রকম প্রভাব ফেলেছে বা ফেলতে চেয়েছে ইসলামী ধর্মতত্ত্বগত দৃষ্টিভঙ্গী বা নির্দেশের কারণেই।


তবে উপরোক্ত গবেষণামূলক প্রবন্ধটির ভিত্তিতে মনে হচ্ছে ইসলাম তার উল্টোটি করেছে বাংলার ক্ষেত্রে। হতে পারে সেটা সত্য, তবে এরূপ গবেষণাকে গুরুত্ব দেওয়ার আগে আমি পাঠক-পণ্ডিতদেরকে একটু হুঁশিয়ারী দিতে চাই। বেশীরভাগ মানুষই এসব ঐতিহাসিক তথ্য সম্পর্কে অজ্ঞ। এ প্রেক্ষাপটে কোনো গবেষক এখান-সেখান থেকে তার পছন্দ-সই কিছু উদ্ধৃতি দিয়ে ব্যক্তিগত মতামত বা প্রত্যাশা অনুযায়ী যেটা চান সেই সিদ্ধান্তেই পৌঁছাতে পারেন; আর সাধারণ পাঠক সেটা খেতে বাধ্য।


যেমন ধরা যাক, আমাদের মহানবী মুহাম্মদের কথা। ইসলাম-প্রিয় গবেষকরা উনাকে সর্বকালের সেরা মহামানব, জ্ঞানী-গুণী ও বিজ্ঞানী হিসেবে প্রতিপন্ন করতে অত্যন্ত সফল হয়েছেন; আর উনার প্রতিপক্ষ মক্কার কুরাইশরা হয়েছেন সর্বকালের সবচেয়ে নির্মম-নিষ্ঠুর-বর্বর মানুষ। অথচ নবীর জীবনী (সিরা), হাদীস ও কোরান একসাথে পড়লে যে কেউ বুঝতে পাবেন যে, প্রকৃত সত্য ঠিক তার উলটোঃ নবীর কর্মকাণ্ড ছিল অত্যন্ত নির্মম-নিষ্ঠুর-বর্বর প্রকৃতির; কুরাইশরা ছিলেন অত্যন্ত সহনশীল-সভ্য প্রকৃতির (দেখুন “জিহাদ”; এম, এ, খান) ।


অন্যান্য ভাষার তুলনায় শুধুমাত্র বাংলা ভাষার উপর ইসলামের এ বিপরীত ও ইতিবাচক প্রভাবের বিষয়ে আসুন আমরা দৃষ্টিপাত করি আরেকটি বিষয়েঃ ইসলামে ধর্মান্তরকরণে। এটা মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে যে, বিশ্বের সর্বত্র ইসলামে ধর্মান্তরকরণ ঘটেছে জোর-জবরদস্তির মাধ্যমে। তবে বাংলায় ঘটেছে এর ব্যতিক্রম; বাংলায় ইসলামে ধর্মান্তর ঘটে শান্তিপূর্ণ উপায়ে ইসলামের সুফি-পীরদের মাধ্যমে, যেটা প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন পণ্ডিতরা। তবে বিজ্ঞ পণ্ডিত মহলে এটাও স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে যে, ইসলামের বড়-বড় পীর-সুফিরা (নিজামুদ্দিন আউলিয়া, খাজা মুইনুদ্দিন চিস্তি ও অন্যান্য) ছিলেন সহিংস জিহাদী কিংবা মুসলিম শাসকদেরকে রক্তঝরা সহিংস জিহাদে প্ররোচনা প্রদান বা উদ্বুদ্ধকারী। কিন্তু বাংলায় ঘটেছে এর ব্যতিক্রম। এ বিষয়ে লেখক এম, এ, খান লিখেছেনঃ


বিপুল সংখ্যক অমুসলিমদেরকে সুফিগণ কর্তৃক শান্তিপূর্ণভাবে ইসলামে ধর্মান্তরিত করার দাবি ঐতিহাসিক দলিল বা প্রমাণ দ্বারা সমর্থিত নয়। তদুপরি অধিকাংশ সুফি ছিলেন অসহিষ্ণু ও সহিংস জিহাদি মনোবৃত্তির; এমনকি তারা নিজেরাই ছিলেন সহিংস জিহাদে অংশগ্রহণকারী। বন্ধুত্বপূর্ণ এক আলাপচারিতায় বাংলাদেশী দুই ধর্মনিরপেক্ষ বিজ্ঞ-পণ্ডিত আমাকে জানান যে, অন্তত বাংলাদেশে সুফিরা শান্তিপূর্ণ উপায়ে ইসলামের বিস্তার ঘটিয়েছিলেন •••


কিন্তু বাংলার সুবিখ্যাত সুফিদের বিষয়ে সূক্ষ্ম গবেষণা করে এম, এ, খান দেখতে পান যে, তারা সবাই ছিলেন সহিংস জিহাদী বা তাতে প্ররোচনা প্রদানকারী। সুফি-পীর শাহজালাল হলেন বাংলার মুসলিমদের জাতীয় নায়ক। আর তিনি বাংলায় প্রবেশ করেন ইসলামের তলোয়ার হাতে - যেটা আমরা সবাই জানি, কিন্তু এর মাঝে নিহিত সহিংসতাকে আমরা উপেক্ষা করি, সেটাকে বিবেচনায় আনি না। ‘বাংলাপিডিয়া’র উদ্ধৃতি দিয়ে খান জানানঃ নিজামুদ্দিন আউলিয়ার শিষ্য শাহজালাল ৭০০ আনুসারী নিয়ে ভারতে এসেছিলেন ইসলামী জিহাদ বা ধর্মযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে পৌত্তলিক হিন্দুদেরকে নিধন করতে। এবং গৌরগোবিন্দের বিরুদ্ধে তার যুদ্ধের প্রসঙ্গে খান লিখেনঃ


গৌড়ের সুলতাব শামসুদ্দিন ফিরোজ শাহ দুইবার গৌরগোবিন্দকে আক্রমণ করেন••• দু’বারেই মুসলিম আক্রমণকারীরা পরাজিত হয়। সুলতানের প্রধান সেনাপতি নাসিরউদ্দিনের পরিচালনায় তৃতীয় আক্রমণ চালানো হয়। এ জিহাদ অভিযানে অংশ নিতে নিজামুদ্দিন আউলিয়া তার বিশিষ্ট শিষ্য শাহজালালকে ৩৬০ জন অনুসারীসহ প্রেরণ করেন। শাহজালাল ভক্তদের নিয়ে বাংলায় পৌঁছে হানাদার মুসলিম বাহিনীতে যোগ দেন। প্রচণ্ড যুদ্ধের পর রাজা গৌরগোবিন্দ পরাজিত হন। প্রচলিত কাহিনী অনুযায়ী এ যুদ্ধে মুসলিমদের বিজয়ের সবটুকু কৃতিত্বই বর্তায় শাহজালাল ও তার ভক্তদের উপর।


সাধারণ নিয়মে মুসলিমদের প্রতিটি বিজয়ে বিধর্মীরা হাজারে হাজারে ক্রীতদাসের শিকলে বন্দী হয়ে অনিচ্ছাকৃতভাবে মুসলিম হয়ে যেত। নিঃসন্দেহে সিলেটে শাহজালালের পদার্পণের প্রথম দিনই তলোয়ারের ডগায় দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ করা বিপুল সংখ্যক কাফিরকে তিনি ইসলামে ধর্মান্তরিত করতে সাহায্য করেন। বাস্তবিকই তা অত্যন্ত ‘শান্তিপূর্ণ উপায়ে’ ছিল বৈকি!


এম, এ, খান আরেক দৃষ্টান্তে বাংলার প্রখ্যাত সুফিসাধক নূর কুতবি আলমের বিধর্মীদেরকে ব্যাপকহারে ইসলামে ধর্মান্তরের ভূমিকা উল্লেখ করেছেন। এক যুদ্ধে যখন হিন্দু রাজা পরাজিত হয়, পীর নূর কুতবি আলমের মধ্যস্থতায় সে রাজার ১২ বছরের পুত্রকে মুসলিম বানিয়ে সুলতান জালালুদ্দিন মোহাম্মদ নামে সিংহাসনে বসানো হয়। পীর কুতবি আলম সে বাচ্চা সুলতানকে এমনভাব ইসলামের দীক্ষা দেন যে, তিনি রাজ্যের হিন্দু-বৌদ্ধদেরকে “হয় কোরান নয় মৃত্যুর বিধান দেন। যারা পিতৃ-পুরুষের ধর্ম ধরে রাখতে চেয়েছিল প্রাণ বাঁচাতে তারা আসামের জঙ্গলে আশ্রয় নেয়। বাংলায় তার ১৭ বছরের রাজত্বকালে (১৪১-৩১) তলোয়ারের ডগায় যত লোক মুসলিম হয়, পরবর্তী ৩০০ বছরে তত সংখ্যক লোক ইসলাম গ্রহণ করে নি।1

এ দৃষ্টান্তগুলো ধারণা দিবে যে, ইতিহাস-গবেষকদের উর্বর কল্পনাভর লেখনীতে কি ইতিহাস কি রকম হয়ে উঠতে পারে। তার মানে এটা নয় যে, বাংলা ভাষার পরিপুষ্টি সাধনে মুসলিম শাসকরা একাগ্র পৃষ্ঠপোষকতা দেয় নি। সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো মন্তব্য করার জ্ঞান যেহেতু আমার নেই, সেহেতু ইসলামের আগমনের একেবারেই শুরুতে বাংলা ভাষার উপর ইসলাম যে প্রভাবটি ফেলে, তা উল্লেখ করে লেখাটি শেষ করি। বখতিয়ার খিলজির বাংলায় আগমনের সময় বাংলার (বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা একত্রে) নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়টি ছিল বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও দার্শনিক চিন্তা চর্চার প্রধানতম কেন্দ্রগুলোর অন্যতম। এর নয় তলার পাঠাগারটি ছিল ভারতবর্ষের জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য ও দার্শনিক বিষয়ক পুস্তক ও পাণ্ডুলিপির শ্রেষ্ঠতম আধার। বখতিয়ার খিলজি বিশ্ববিদ্যালয়টি আক্রমণ করে মুণ্ডিত-মস্তক শিক্ষকদেরকে গণহারে নিধন করেন। বৌদ্ধ শিক্ষকদেরকে নিধনের মাত্রা এমন ছিল যে, বখতিয়ার পাঠাগারটির সামনে এসে এর বই-পুস্তকের বিষয়বস্তু সম্পর্কে অনুসন্ধান করলে - তা পড়ে শুনানোর মত শিক্ষিত কেউ ছিল না। যখন তিনি নিশ্চিত হন যে পাঠাগারটিতে কোরানের কোনো কপি নেই, তিনি আগুন জ্বালিয়ে তা ভস্মীভূত করে ফেলেন। বাংলার যুগ-যুগের সঞ্চিত জ্ঞান-সাহিত্য-দর্শনের বিপুল ভাণ্ডারটি ইসলামের প্রাথমিক আঘাতেই মুহৃর্তের মধ্যে ছার-খার হয়ে যায়।2 বাংলা ভাষা-সাহিত্যকে পরিপুষ্ট করণে এটা ইসলামের এক অনন্য অবদান নয় কি?


ইসলাম এসেছিল তলোয়ার হাতে ইসলামপূর্ব বা বহির্ভূত জ্ঞান, ধ্যান-ধারণা, ধর্ম-সংস্কৃতি, ভাষা-সাহিত্য নির্মূল করতে। নবী মুহাম্মদের অনুসরণে ইসলামের ধর্মযোদ্ধারা তলোয়ার উঁচিয়ে যেখানেই গিয়েছে, সেখানকার আদি জ্ঞান-সাহিত্যের ভাণ্ডার ধুলিসাৎ করেছেঃ আলোন্দ্রিয়া, টেসিফোন (পারসিয়া), দামেস্ক, নালন্দা, কায়রো তার উজ্বল দৃষ্টান্ত। আর পূর্বকার সবকিছু ধ্বংস করার পর স্থানীয় চিন্তাবিদরা যখন নিজস্ব ভাষা-সংস্কৃতির প্রতি ভালবাসায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তাকে শূন্য থেকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রচেষ্টায় উদ্যোগী হয়, তার কৃতিত্ব গিয়ে বর্তায় মুসলিম শাসকদের উপর।


এখানে উল্লেখ্য যে, আমাদের ভাষা-সাহিত্যের বিপুল সমৃদ্ধিসাধন ঘটেছে ইংরেজ শাসনামলে। বঙ্কিম (১৮৩৮-১৮৯৪), লালন (১৭৭৪-১৮৯০), বিদ্যাসাগর (১৮২০-১৮৯১), শরৎচন্দ্র (১৮৭৬-১৯৩৮), মধুসূদন (১৮২৪-১৮৭৩), রবি ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) ও নজরুল (১৮৯৯-১৯৭৬) প্রমুখ মনীষীদের সাহিত্যকর্ম বিনা বাংলা ভাষা হয়ে পড়বে নিতান্তই দারিদ্র্য-পীড়িত। তারা শুধু ইংরেজ শাসনামলেই বাংলা সাহিত্যকে অভাবনীয়রূপে পরিপুষ্ট করেন নি, ইংরেজ-আনীত শিক্ষা-সংস্কৃতি ও চিন্তা-চেতনাও তাদের মননশীল কর্মকাণ্ডকে যথেষ্ট উদ্দীপিত করেছিল। তদুপরি বহু পশ্চিমা পণ্ডিত বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের হারানো ভাষা-সংস্কৃতি-ঐতিহ্যের পুনরুদ্ধারে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে, বিশেষ করে যেসব অঞ্চলে ইসলাম সেগুলোকে বিনষ্ট করে ফেলেছিলঃ যেমন ইরান, ইরাক, মিশর ইত্যাদি। এমনকি ভারতবর্ষের আদি গ্রন্থ-পুস্তক, যেমন বেদ, আজ আমাদের কাছে পাঠযোগ্য, পশ্চিমা পণ্ডিতদের দ্বারা সেগুলোর ভাষান্তরের কারণেই। অথচ আরব, পারস্য ও মধ্য এশিয়া থেকে আগত কোনো মুসলিম কখনোই বাংলা ভাষা শিখার প্রয়াস করেনি; বাংলার মুসলিম শাসকরা কখনোই বাংলায় কথা বলেন নি - যার একটা কারণ ছিলঃ এটা একটা জাহিলিয়া ভাষা।


অথচ কেউ যদি ইংরেজ আমলে বাংলা ভাষার ব্যাপক সমৃদ্ধিকরণের কৃতিত্ব ইংরেজদেরকে দিতে চান, তাহলে বাংগালী আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা, পণ্ডিত-অপণ্ডিত সবাই উঠে দাঁড়াবেন অস্ত্র হাতে সে সাম্রাজ্যবাদের চেলা-চাটুকারের উদ্দেশ্য- হাসিলকারী চক্রান্তকে অঙ্কুরে বিনষ্ট করতে।



- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -
1 এম, এ, খান (২০১০) জিহাদঃ জবরদস্তিমূলক ধর্মান্তরকরণ, সাম্রাজ্যবাদ ও দাসত্বের উত্তরাধিকার, ব-দ্বীপ প্রকাশন, ঢাকা, পৃ• ১৫৩-৫৬।
2 এম, এ, খান, পৃ• ২২৭

অতিরিক্ত সূত্রঃ
1. V. S. Naipual, Beyond Beliel
2. V. S. Naipaul, Among the Believers
3. Anwar Sheikh, Islamic Imperialism
4. Ibn Warraq, Why I Am Not A Muslim


 

সাম্প্রতিক পোষ্টসমূহ