Banner
নব্বইয়ের দ্বি-দলীয় ধারা বনাম বাম বিকল্প -- ইমাম গাজ্জালী

লিখেছেনঃ ইমাম গাজ্জালী, আপডেটঃ January 16, 2014, 12:00 AM, Hits: 1549


দ্বি-দলীয় পাল্টাপাল্টির বিপরীতে বাম বিকল্পের স্লোগান তোলা হয়েছে একটি বামপন্থী মহল থেকে। কোন পথে এবং কীভাবে সেই বাম বিকল্প গড়ে উঠবে তা খোলাসা করে বলেন নি তারা। তবে এই সংঘাতময় রাজনৈতিক পরিস্থিতি এড়াতে নির্বাচনের আগে তারা দুই নেত্রীকে দুইটি পরামর্শ দিয়েছিলেন।


এক . খালেদাকে দিয়েছিলেন যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গ ছাড়ার পরামর্শ এবং
দুই . প্রধান বিরোধী দল (বর্তমানে সাবেক) বিএনপিকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য হাসিনাকে দিয়েছিলেন দ্বিতীয় পরামর্শ।


তাদের মতে, বিএনপিকে বাদ দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠান করলে সেটা গ্রহণযোগ্য হবে না, ত হবে এক তরফা। গণতন্ত্রের পথে হাঁটার জন্য দুই নেত্রীকে এক করার দূতিয়ালী করেছেন এসকল বামেরা। বিএনপি নির্বাচনে না আসায় তারাও নির্বাচন বয়কট করেছেন। এদের ’এক তরফা নির্বাচন’ বয়কটের রাজনীতির ক্রেডিট জমা পড়ল সেই বিএনপি-জামায়াতের ঘরেই। সরকার বিরোধী বক্তব্য নিয়েই যে নির্বাচনে অংশ নেওয়া যায়, সে কৌশলটি বিবেচনায় আনতে পারলেন না, দুই নেত্রীকে গণতন্ত্রী বানানোর কাজ করতে গিয়ে।
 
গণতন্ত্র রক্ষার নামে দু’নেত্রীকে (হাসিনা ও খালেদা) এক করার বামপন্থীদের এই দূতিয়ালী নতুন কিছু নয়, এসব পুরোনো খাসলত দেখা গেছে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে। আন্দোলনের এই কৌশলের পরিণতিতে ক্রমাগত ক্ষয়িষ্ণু হয়ে গেছেন তারা। সেখান থেকে কোনো ক্রেডিট নিজেদের ঘরে তুলতে পারেন নি। এরপরেও এসব বামেরা ফের একই কাজ করে যাচ্ছেন। এরশাদ পতনের আগে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র যে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অবস্থান ছিল, এরশাদ পতনের পরে দল দু’টির অবস্থান আরো সুসংহত হয়। পক্ষান্তরে ওই আন্দোলনে কমিউনিস্ট ও বামপন্থীদের রাজনৈতিক-সাংগঠনিক অবস্থানে ঠিক তার উল্টো চিত্রটিই উঠে আসে।
 
এরশাদ পতনের আগের আওয়ামী লীগ ছিল বহু খণ্ডে বিভক্ত, শক্তিহীন, নেতৃত্বহীন, ক্ষয়িষ্ণু একটি দল। অপরদিকে সামরিক ক্যুদেতায় নিহত দলের প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমানের করুণ মৃত্যুর পর নি:শেষ হওয়ার সম্ভাব্য পরিণতির দিকে ক্রমেই ধাবিত হচ্ছিল বিএনপি। দলচ্যুত, নীতিচ্যুত, বিভ্রান্ত ও হতাশাগ্রস্ত তথাকথিত প্রগতিশীল এবং টাউট-বাটপাড়দের নিয়ে গঠিত দলটির তেমন কোনো জনভিত্তি তৈরি হয়নি তখন। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের ধারায় দুইটি দলই শক্তিশালী হয়েছে, বিপরীতে শক্তি ক্ষয় পেয়েছে বামপন্থী কমিউনিস্টদের। আন্দোলনের যে কৌশলে তাদের এই পরিণতি, সেখান থেকে কোনো শিক্ষা নেওয়া হল না, বরং সেই একই কৌশলে রাজনীতি করছেন তারা।

অপরদিকে বর্তমানের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বামমোর্চা সহ অন্যান্য বাম কমিউনিস্ট সংগঠনগুলোর ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে। তারা সকলেই বলছেন, মার্কিন ও ভারতের মদদে এটা দুই দলের গদী দখলের সংঘাত।

বক্তব্যটি আপাত দৃষ্টিতে সঠিক বলে মনে হলেও, সেখানে মুক্তিযুদ্ধকালীন কমিউনিস্টদের একাংশের ’দুই কুত্তার কামড়াকামড়ি’ তত্ত্বের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। বর্তমানে বিরাজমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যে ভিন্নতর মাত্রা রয়েছে, তা বুঝতে সক্ষম হচ্ছেন না কমিউনিস্টদের এই অংশটি। কমিউনিস্টদের এই অংশটির মধ্যে বৈপ্লবিক উপাদন থাকলেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে বুঝতে না পারায় তারা বাংলাদেশকেই বুঝতে সক্ষম হচ্ছেন না। মুক্তিযুদ্ধকালীন তাদের ভূমিকার কোনো বিচারমূলক আত্মসমালোচনার কাজটি যথাযথভাবে সুরাহা হয়নি। সেই পুরোনো তত্ত্বের প্রভাবটি এখনো কাটাতে পারেন নি তারা। প্রতিটি আন্দোলনেই সেই তত্ত্বের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। সেখান থেকে বেরিয়ে না আসলে এখানে কমিউনিস্টদের মধ্যে কার্যকর কোনো গণআন্দোলন গড়ে উঠা দু:সাধ্য হয়ে পড়বে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে মেহনতীদের স্বার্থের জায়গা থেকে আলাদা কোনো বক্তব্য হাজির করতে সমর্থ হন নি এই বামপন্থী কমিউনিস্টগণ। তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে তাদের আলাদা বক্তব্য পাওয়া যায় নি, যে বক্তব্য পাওয়া গেছে তা কখনো আওয়ামী লীগের কাছাকাছি, কখনো বিএনপি-জামায়াত জোটের কাছাকাছি।


দ্বি-দলীয় রাজনীতির বৈধতা

প্রত্যাখ্যাত অবস্থান থেকে আওয়ামী লীগ তার গ্রহণযোগ্যতা ফিরে পায় এবং নি:শেষ হওয়ার সম্ভাব্য পরিণতি থেকে বিএনপি জনভিত্তি পায় মূলত এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়েই। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৫ দল এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৭ দল, এভাবে হাসিনা, খালেদাকে কেন্দ্র করেই সামরিক স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলা হয়। স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের পরিণতিতেই শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং নতুন করে শাসন ক্ষমতার বৈধতা পায় ওই দল দু’টি। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনের পর ১৫ দল ও ৭ দল থেকে বামপন্থীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বেরিয়ে এসে ৫ দলীয় জোট গড়ে তোলে। দুই নেত্রীকে সমঝোতায় এনে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনকে তেজী করাই ছিল ৫ দলের রাজনীতি। এছাড়া কমরেড ফরহাদের ফিফটি ফিফটি তত্ত্বটিতো আমরা জানিই। অর্থাৎ ক্রিয়াশীল এসকল বামপন্থী নানাভাবে ওই দ্বি-দলীয় ধারাটিকেই পরিপুষ্ট করেছে। ওই দুই দলের ক্ষমতায়নের মধ্যেই তারা দেশের গণতন্ত্রের সম্ভাবনা দেখেছে, দেখেছে নিজেদের ভবিষ্যত। এভাবেই দ্বি-দলীয় রাজনীতি নতুন করে বিন্যস্ত হয়েছে, শক্তিশালী হয়েছে এবং ক্ষমতা দখলের বৈধতা অর্জন করেছে। এই বৈধতার উপর ভর করেই বাংলাদেশের বুর্জোয়া শাসক শ্রেণি দুই দলকে কেন্দ্র করে তাদের সীমাহীন শোষণ, লুণ্ঠন, চুরিচামারি, নির্যাতন এবং যাবতীয় অপকর্ম জারি রাখতে সক্ষম হন।

নতুন রাজনীতির সন্ধান

আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কেন্দ্রিক শাসক শ্রেণির শোষণ, লুণ্ঠন চুরিচামারি ও রাষ্ট্রীয় নির্যাতন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মানুষ আর তা মেনে নিতে রাজী হচ্ছেন না। শাসক শ্রেণিও আর দ্বি-দলীয় বৈধতা দিয়ে তাদের শাসন কাজ জারি রাখতে পারছে না। স্পষ্টতই এসকল রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে মানুষ। এ প্রবণতায় নতুন রাজনীতিকে বৈধতা দিতে চায় মানুষ।

সম্প্রতি গণজাগরণ মঞ্চের উত্থানে দ্বি-দলীয় পাল্টাপাল্টির উপর একটি বড় আঘাত এসেছে। যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা, বেরিয়ে এসেছে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকা সাম্প্রদায়িক বিপদ, যার এমন  প্রবল উপস্থিতি সম্পর্কে অনেকেই অবহিত ছিলেন না। এরাই দ্বি-জাতি তত্ত্বের কাছে বাংলাদেশের পরাজয় ঘটাতে চায়। গণজাগরণ আরো স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিয়েছে, সামরিক শাসকদের দলের সঙ্গে (বিএনপি ও জাতীয় পার্টি) সাম্প্রদায়িক শক্তির মিতালী কত গভীর। শত টানাটানি করেও এই দুইয়ের বিচ্ছেদ ঘটানো সম্ভব নয়। গণজাগরণ যেন চাইছে, কী সরকারে কী বিরোধী দলে সবখানে থাকবে মুক্তিযুদ্ধের রাজনীতি। বর্তমান সংঘাতময় রাজনৈতিক পরিস্থিতি দেশকে দ্বি-দলীয় পাল্টাপাল্টির পরিণতি থেকে সরিয়ে এনেছে। এবার আওয়ামী লীগের পরিবর্তে আর বিএনপি আসবে না, আসলেও আরেক চেহারার বিএনপি আসবে। তা হবে গণতন্ত্রের জন্য বড় দু:সংবাদ। তাই আওয়ামী লীগের বদলে জনগণের, বিশেষত মেহনতী জনগণের ক্ষমতা দখল জরুরি হয়ে পড়েছে, তা না হলে দেশটা যেন অধ:পতনে যাওয়ার ভাগ্য বরণ করবে। সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিলয়ে তার সঙ্গে গাটছড়া বাঁধা বিএনপিও যদি একই নিয়তি বেছে নেয়, তার জন্য কান্নাকাটি করা বামপন্থীদের মোটেও সাজে না। বরং এই মুহূর্তে এমন কর্মসূচী হাজির করতে হবে যেখানে আওয়ামী লীগ, বিএনপি কেন্দ্রিক বুর্জোয়া শাসক শ্রেনির বিপরীতে নতুন শক্তির উত্থানের পথ তৈরি হয়।

দুই দলের পাল্টাপাল্টি শোষণ-লুণ্ঠন থেকে মুক্তি পেতে চাইলে, বুর্জোয়া শ্রেণির শোষণ থেকেই মুক্তি লাভ জরুরি। দরকার নতুন ধারার রাজনীতি। এজন্য পয়লা জরুরি কাজ হল, এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে দুই দলকে বৈধতা দেওয়ার বামপন্থী রাজনীতিকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো, দরকার বিচারমূলক সমালোচনা। এই কাজটি যারাই করতে পারবেন, একমাত্র তারাই দ্বি-দলীয় বুর্জোয়া শ্রেণির শোষণের বিরুদ্ধে বিকল্প রাজনীতির তত্ত্বগত ভিত রচনা করতে সক্ষম হবেন। সেই আত্মসমালোচনা গ্রহণ না করে, এখনো দু’নেত্রীকে নানা পরামর্শ দেওয়ার পুরোনো কাজ করে যারা বাম বিকল্প গড়ার কথা বলছেন, তারা কখনোই বুঝমান কর্মী, সমর্থকদের ধোঁকা দিতে পারবেন না। এই স্ববিরোধী ও হাস্যকর রাজনৈতিক অবস্থান থেকে বামপন্থীরা যত তাড়াতাড়ি উতরিয়ে উঠবেন দেশের জন্য ততই মঙ্গল।


কী সেই নতুন রাজনীতির স্বরূপ

গণজাগরণ মঞ্চের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন বিকল্প রাজনীতির স্বরূপ কিছুটা জানান দিয়ে গেছে। অর্থাৎ বিকল্প রাজনীতির স্বরূপ তুলে আনতে মুক্তিযুদ্ধের কাছেই ফিরে যেতে হচ্ছে আমাদের। মুক্তিযুদ্ধের রাজনীতির বর্তমান স্বরূপ সঠিকভাবে তুলে আনাটাই এখন গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

আমাদের মতে, শোষণহীন, বৈষম্যহীন, সেক্যুলার এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতিই হল মুক্তিযুদ্ধের রাজনীতি। মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে অগ্রসর চেতনা হল, ’স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ।’ আমাদের মতে যুদ্ধাপরাধের যে বিচার প্রক্রিয়া চলছে, তাকে এগিয়ে নিতে এবং রাজনীতির স্বার্থ সিদ্ধির জায়গা থেকে তাকে মুক্ত করতে হবে। আমাদের দাবি হল, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধ, যুদ্ধপরাধীদের বিচার, তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত, ভোটাধিকার বাতিল এবং নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করতে হবে।

একই সঙ্গে দাবি তোলা দরকার, দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ, আমলা, ব্যবসায়ীদের বিচার, তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত, ভোটাধিকার বাতিল এবং নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করার।

বাজেয়াপ্ত পুঁজি দিয়ে জনবান্ধব ও পরিবেশ বান্ধব শিল্প-কারখানা গড়ে তুলতে, সকল কর্মক্ষম মানুষের কাজের ব্যবস্থা করতে, অফিসারের বেতন এবং শ্রমিকদের বেতন ক্রমান্বয়ে সমান সমান করতে হবে।
 
উল্লেখ্য, দ্বি-দলীয় রাজনীতির সীমাবদ্ধতা নিয়ে বগল বাজানো ড. কামাল, মাহমুদুর রহমান মান্না, বি. চৌধুরী, কাদের সিদ্দিকী এবং আসম আব্দুর রবের মতো কক্ষচ্যুত, দলচ্যুত, নীতিচ্যুত তারকাদের কাছে গিয়ে লাভ নেই। দলে পদ না পেয়ে বঞ্চিতরা কিংবা বিদেশের মুষ্ঠি ভিক্ষা খেয়ে নসিহত খয়রাত করা এনজিও কর্মকর্তারা এই সময়ের রাজনীতি তুলে আনতে অক্ষম। কাজটি করার দায় তুলে নেওয়ার জন্য শত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বামপন্থী কমিউনিস্টগণ ছাড়া আপাতত আর কোনো শক্তির উপস্থিতিই নেই সমাজে।