Banner
সমাজ ও রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরে ১৯৭২-এর মূল সংবিধান – একটি পর্যালোচনা প্রয়াস -- হাবিবুর রহমান

লিখেছেনঃ হাবিবুর রহমান, আপডেটঃ November 8, 2014, 12:00 AM, Hits: 1907

এক.


গণতন্ত্রের প্রশ্নে শাসক শ্রেণীর দল ও জোটগুলোর মধ্যে অদ্ভুত এক ঐক্য  (unholy alliance) রয়েছে। যখনই যে দল বা জোট সরকার গঠন করে বিরোধীরা সেই সরকারকে স্বৈরাচারী সরকার বলে অভিহিত করে। আবার এই বিরোধী দল ও জোট ক্ষমতাসীন হলে ক্ষমতাহারা দল ও জোট তাদেরকে স্বৈরাচারী হিসেবে প্রচার করে থাকে। তেমনি যখন যে দল বা জোট সরকারে থাকে তখন তারা নিজেদেরকে গণতন্ত্রের রক্ষক হিসেবে দেশবাসীর সামনে উপস্থাপন করতে যারপরনাই সচেষ্ট থাকে। আর বিরোধী দল গণতন্ত্র নেই বা শেষ হয়ে যাচ্ছে ঘোষণা দিয়ে তা রক্ষা ও প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। যেন তাদের দল বা জোট ক্ষমতায় গেলেই গণতন্ত্র রক্ষা পেতে পারে। নব্বই-এর দশক থেকে পালাক্রমে আওয়ামী জোট এবং বিএনপি জোট দেশ শাসন করে আসছে। আওয়ামী জোট ক্ষমতায় থাকলে বিএনপি জোট সবখানে একদলীয় বাকশালের ভূত দেখতে পায়। আবার বিএনপি জোট ক্ষমতায় থাকলে আওয়ামী জোট চোখে বাইনোকুলার লাগিয়েও গণতন্ত্র খুঁজে পায় না। গণতন্ত্র প্রশ্নে এ দেশের রাজনীতিতে এ ধারাটাই প্রাধান্য বিস্তার করে আছে।

স্বাধীনতা লাভের পর এ দেশের মানুষ দীর্ঘকাল এক দলীয় শাসন, সামরিক শাসন, সেনা নিয়ন্ত্রিত বেসামরিক শাসনের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত হয়েছে। তারা প্রত্যক্ষ করেছে ভোটারবিহীন নির্বাচন। দেখছে ভোট জালিয়াতির মাধ্যমে ফলাফল পালটে দেবার নানা অপপ্রয়াস। এই প্রেক্ষাপটে শাসক শ্রেণীর দলগুলের রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবিগণ জনমনে, সমাজে এ বিশ্বাস প্রোথিত করতে সক্ষম হয় যে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠিত হলে রাষ্ট্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায় ও সমাজে গণতান্ত্রিক মুল্যবোধ বিকাশ লাভ করে। এভাবে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন এবং গণতন্ত্র সমার্থক হয়ে উঠে। অথচ নির্বাচন হচ্ছে গণতন্ত্র চর্চার একটি নিয়ম বা পদ্ধতি মাত্র। গণতন্ত্র চর্চার আরও নিয়ম বা পদ্ধতি রয়েছে। যেমন গণ অভ্যুত্থান-এর  মাধ্যমেও গণতান্ত্রিক সরকার গঠিত হয়ে থাকে।

নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠিত হয়, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায় না- এ সত্যবোধটা অর্জনে দেশবাসীকে অনেকগুলো নির্বাচনের অভিজ্ঞতা পার হতে হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে এসব নির্বাচন মোটামুটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হিসেবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছে। আর এই নির্বাচিত সরকারকে একদল বা জোট অপর দল বা জোটকে অর্থাৎ পরস্পরকে স্বৈরাচার হিসেবে অভিহিত করেছে। এর মধ্য দিয়ে শাসক শ্রেণীই স্বীকার করে নিয়েছে  নির্বাচনের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারী সরকারও প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

গণতন্ত্র প্রশ্নে এসব ভুল ধারণা ছড়িয়ে দেয়া বা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছে বলেই শাসক শ্রেণীর দলগুলো ধোঁকা দিয়ে গণতন্ত্রের নামে এ দেশে স্বৈরতন্ত্র বজায় রাখতে পারছে। তাই গণতন্ত্রের সঠিক ধারণা সমাজে প্রতিষ্ঠা করা গণতন্ত্রকামী দল, রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের অন্যতম প্রধান কর্তব্য হয়ে আছে। দেশ স্বাধীন করলেই, এক সরকার বিদায় করে নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠন করা সম্ভব হলেই সমাজ ও রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর হয় না। দু’ দু’বার স্বাধীনতা অর্জন এবং বহুবার সরকার বদলাবার অভিজ্ঞতা থেকে আজকে জনগণ এ উপলব্ধি করতে সক্ষম হচ্ছে। তাই গণতন্ত্রের সঠিক ধারণা গ্রহণ করতে সমাজ এবং জনমানসও অনেকটা প্রস্তুত। এখন প্রয়োজন জনগণের নিকট গণতন্ত্রের সঠিক ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা।

গণতন্ত্রের দুটো দিক প্রণিধানযোগ্য। মর্মের দিক দিয়ে গণতন্ত্রে ব্যাক্তি বা জনগণ সার্বভৌম। দেশের প্রতিটি নাগরিকের সার্বভৌম ইচ্ছার ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে উঠে এবং দাঁড়িয়ে থাকে। আর রূপের দিক দিয়ে দেখলে জনগণ নির্বাচিত প্রতিনিধি দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনা করে থাকে। আর তাই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা জনগণ তথা সার্বভৌম ইচ্ছার প্রতিনিধি মাত্র, খোদ ইচ্ছেটা নয়। সুতরাং গণতন্ত্রে রাষ্ট্র, সরকার, সংসদ, বিচার বিভাগ কেউই সার্বভৌম নয়, সার্বভৌম হতে পারে না। এসবই ব্যাক্তি বা জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছের বহিঃপ্রকাশ মাত্র, সে কারণে তাদের ক্ষমতা নির্দিষ্ট ও সীমাবদ্ধ। ব্যাক্তির সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ হয় এমন কোন আইন,  বিধি তারা প্রণয়ন বা প্রয়োগ করতে পারেনা, বলবত করতে পারে না। তাই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল, এ রাষ্ট্র নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার বা মৌলিক মানবিক অধিকার হরণ করার আইন প্রণয়নের অধিকার রাখে না। নির্বাহী বিভাগ অর্থাৎ সরকার, আমলা বা পুলিশ নাগরিকদের মৌলিক মানবিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করলে তার অপরাধে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নিজেকেও আদালতের কাঠগড়ায় হাজির করতে দ্বিধা করে না। আবার রাষ্ট্রের ক্ষমতা রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের (শাসন, আইন ও বিচার বিভাগ) কোন একটিতে কেন্দ্রীভুত হতে না দেয়াটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এ রাষ্ট্রে তার তিনটি অঙ্গ স্বাধীনভাবে নিজ নিজ কর্তব্য সম্পাদন করতে পারে। রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য হল জনগণের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হতে না দেয়া। এ কারণেই  গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র অগ্রসর ও অগ্রগামী রাষ্ট্র।

জনগণ সকল ক্ষমতার উৎস – শাসক শ্রেণী এই শ্লোগানটিকে গণতন্ত্রের সমার্থক করে জনগণের নিকট হাজির করে থাকে। শুনতে ভালো লাগলেও প্রকৃত অর্থে এই শ্লোগানটি স্বৈরতন্ত্রের সমার্থক। একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে, এ শ্লোগান অনুসারে জনগণ ক্ষমতার উৎস, সার্বভৌম নয়।

রাষ্ট্র বিজ্ঞানের ছাত্র বা যারা রাজনীতি চর্চা করেন, তারা নিশ্চয়ই জানেন সরকার ও রাষ্ট্র এক নয়। তারা এ-ও জানেন, রাজনীতির দিক দিয়ে রাষ্ট্র হল একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা। যেমন- দাস রাষ্ট্র, সামন্ত রাষ্ট্র, একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্র, স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র বা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। আবার এটাও কম বেশি তাদের জানা থাকার কথা, একটি রাষ্ট্রের প্রকৃতি কি হবে তা সে রাষ্ট্রের সংবিধানের ভেতর নিহিত থাকে। অর্থাৎ সংবিধান হলো জনগণের দ্বারা গৃহীত সেই দলিল যার ভিত্তিতে রাষ্ট্র গড়ে ওঠে এবং পরিচালিত হয়। একটা বীজের ভিতর যেমন একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্যের উদ্ভিদ লুকিয়ে থাকে, তেমনি একটা সংবিধানের ভিতর একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্যের রাষ্ট্র লুকিয়ে থাকে। তাই আমরা যখন সাধারণ ভাবে বলি এ রাষ্ট্রে স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিদ্যমান তথা রাষ্ট্রটা স্বৈরতান্ত্রিক, তখন এর মানে এ-ও দাঁড়ায় যে ঐ রাষ্ট্রের সংবিধানটা স্বৈরতান্ত্রিক। কেননা একটা স্বৈরতান্ত্রিক সংবিধানই স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্ম দিয়ে থাকে। অগণতান্ত্রিক সংবিধান দ্বারা পরিচালিত রাষ্ট্রে সরকার ফ্যাসিস্ট বা স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে থাকে বা হতে বাধ্য তা সে সরকার যতই অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দ্বারা গঠিত হোক না কেন।

তাই একটিগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণে, সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বস্তরে গণতন্ত্র চর্চা করতে গণতন্ত্রের মর্ম ও রূপের দিকটা আত্মস্থ করা, উপলব্দি অতীব গুরুত্বপূর্ণ। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, এই অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি খুব একটা আলোচনা- পর্যালোচনা হতে দেখা যায়না, যা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য জরুরী। কেননা শুধু কাঠামোগত বিনির্মাণ নয়, মুল্যবোধের বিনির্মাণও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও বিকাশে একান্ত আবশ্যক। একটি সরকারের ফ্যাসীবাদী বা স্বৈরাচারী চরিত্র ধারণের সাথে রাষ্ট্র ও সংবিধান যে সরাসরি সম্পর্কিত সে সম্পর্কে আমরা মোটেও সচেতন নই, চিন্তিত নই। অন্ততঃ এদেশের প্রধান রাজনৈতিক ধারার এতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট। তাই এদেশে সরকারের ফ্যাসিবাদী বা স্বৈরতান্ত্রিক চরিত্র নিয়ে প্রচুর সমালোচনা হয়, সরকার পরিবর্তনের জন্য শ্রম ও রক্ত দেয়া হয়- কিন্তু রাষ্ট্র ও সংবিধানের প্রকৃতি নিয়ে তেমন পর্যালোচনা হয়না। অন্যভাবে বলা যায়, শাসক শ্রেণীর ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতা বহির্ভূত রাজনৈতিক দলগুলো স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র বহাল রাখতে চায় বলেই তারা সরকার পরিবর্তনের আন্দোলন এমন ভাবে সংগঠিত করে যেন রাষ্ট্রের গায়ে কোন আঁচড় না লাগে। তাই সরকার বদল হয়, কিন্তু রাষ্ট্র বদলায় না। এই স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র বহাল রাখতে চায় বলেই শাসকশ্রেণী বিদ্যমান অগণতান্ত্রিক সংবিধানের ধারাবাহিকতা রক্ষায় সবসময় তৎপর থাকে। সরকার পরিবর্তন হয়। তবে নতুন সরকারের স্বৈরতান্ত্রিক চেহারা পরিস্ফুট হতে খুব বেশী সময় নিতে হয় না। জনগণের মোহভঙ্গ ঘটে। দেশের জনগণ পুনরায় সরকার পরিবর্তনের আন্দোলনের বৃত্তে প্রবেশ করে। গত ৪২ বছর ধরে আমরা এমনটাই হতে দেখে আসছি। এদেশের রাজনৈতিক আন্দোলন সংগ্রামের এটাই প্রধান ধারা।

সমাজ ও রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য জাতীয় রাজনীতিকে এ ধারা থেকে বের করে আনতে হবে। বর্তমান রাষ্ট্রের প্রকৃতি কি তার পর্যালোচনা, তর্কবিতর্ক রাজনীতির প্রধান বিষয়বস্তুতে পরিণত করতে হবে। আর তা করতে রাষ্ট্রের ভিত্তি  সংবিধানের পর্যালোচনা প্রাধান্যে নিয়ে আসা জরুরী। প্রয়োজন সংবিধানকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত করা। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচিত পরপর কয়েকটি সরকার দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালিত হবার পরেও  গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ না পাওয়ায় এবং সরকারগুলোর ফ্যাসিস্ট চেহারা বারবার উন্মোচিত হওয়ায় সংবিধান ও রাষ্ট্রের অন্তর্নিহিত প্রকৃতি নিয়ে স্বল্প পরিসরে হলেও তর্ক-বিতর্ক, আলোচনা-পর্যালোচনা শুরু হয়েছে। যারা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন, টেকসই গণতন্ত্র আশা করেন, তাদের অন্যতম প্রধান কর্তব্য হলো এই তর্ক-বিতর্ক তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত ছড়িয়ে দেয়া, আলোচনা-পর্যালোচনার দুর্বল রাজনৈতিক ধারাকে শক্তিশালী ধারায় পরিণত করা।


 দুই.


 বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংবিধান প্রণয়নের লক্ষ্যে ১৯৭২ সালের ২২ মার্চ ‘’বাংলাদেশ গণপরিষদ আদেশ’ আইন জারী করা  হয়। এই আইন বলে পাকিস্তান রাষ্ট্র কাঠামোর অধীনে ১৯৭০ সালে নির্বাচিত তৎকালীন ‘পূর্ব পাকিস্তান’ অংশের জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে গণপরিষদ গঠন করা হয়। আরো স্পষ্ট করে বললে পাকিস্তান রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে ‘পূর্ব পাকিস্তানের’ স্বায়ত্তশাসনের দাবীর সংগে সংগতিপূর্ণ একটি সংবিধান প্রণয়নের জন্য যারা ইয়াহিয়া খানের এল এফ ও বা আইনগত কাঠামোর আওতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন, তাদের স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য সবিধান প্রণয়নের দায়িত্ব দেয়া হয়। ঐ নির্বাচনদ্বয়ে মোট সদস্য সংখা৪৬৯ (জাতীয় পরিষদের আসন ১৬৯টি এবং প্রাদেশিক পরিষদের আসন ৩০০টি) জন। তবে ৪৩০ জন সদস্য নিয়ে গণপরিষদ  যাত্রা শুরু করে এবং শেষ অব্দি টিকে থাকেন ৪০৩ জন। মৃত্যু, পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনের জন্য বহিস্কার, দল থেকে বহিষ্কার ইত্যাদি নানা কারণে মোট ৪৬৯ জন সদস্যের মধ্য থেকে সর্বমোট ৬৬ জন সদস্যের সংবিধান প্রণয়নে অংশ ছিল না। এ হিসেবে ১ কোটিরও বেশী দেশবাসীর সংবিধানে প্রতিনিধিত্ব ছিলনা।

বাংলাদেশ গণপরিষদের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ১০ এপ্রিল, ১৯৭২। উদ্বোধনের পরের দিন  ১১ এপ্রিল ডঃ কামাল হোসেনকে প্রধান করে ৩৪ সদস্য বিশিষ্ট একটি সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠন করা হয়। ন্যাপ থেকে প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত  সুরঞ্জিত সে্নগুপ্ত এ কমিটিতে একমাত্র বিরোধীদলীয় সদস্য ছিলেন। ১১ অক্টোবর খসড়া চূড়ান্ত করা হয় এবং গণপরিষদের দ্বিতীয় বৈঠকে ১২ অক্টোবর খসড়া সংবিধান প্রস্তাব আকারে উথাপন করা হয়। ১৮ অক্টোবর  থেকে সংসদে সংবিধান বিলের ওপর আলোচনা শুরু হয় এবং ৩০ অক্টোবর সমাপ্ত হয়। ৩১ অক্টোবর  থেকে ৩রা নভেম্বর পর্যন্ত সংবিধানের অনুচ্ছেদওয়ারি আলোচনা চলে ।একই বছরের ৪ নভেম্বর গণপরিষদ কর্তৃক সংবিধান গৃহীত হয়। সাংবিধান সভা বা গণপরিষদে খসড়া উত্থাপনের মাত্র ২৪ কার্য দিবসে সংবিধান চূড়ান্ত হয়ে গৃহীত হয় যা ইতিহাসে বিরল। এটা আমাদের দেশের সংবিধান প্রণয়ন প্রক্রিয়ার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য।

বাংলাদেশের গণপরিষদের অন্যতম একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল এর সদস্যদের স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার ছিল না। ২২ মার্চ, ১৯৭২ রাষ্ট্রপতি কর্তৃক জারি করা গণপরিষদ সদস্য (সদস্য বাতিল) আদেশ আইন বলে গণপরিষদ সদস্যদের স্বাধীন মত প্রকাশের পথ রুদ্ধ করা হয় ।

বাংলাদেশের গণপরিষদের আর একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, এই গণপরিষদের কোন আইন প্রণয়নের ক্ষমতা ছিলনা। মন্ত্রীসভার ওপর কোন নিয়ন্ত্রণ ছিল না, ছিল না সরকারের ওপর তদারকির ক্ষমতা। অর্থাৎ একটি নুলো, নিয়ন্ত্রিত সাংবিধান সভা বা গণপরিষদ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংবিধান প্রণয়ন করেছে। এ সময় অধ্যাদেশ জারী করে শাসন কার্য পরিচালনা করা হয়। প্রধানমন্ত্রী ছিলেন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী এবং তাঁর ইচ্ছাই ছিল আইনের উৎস। ১৯৭২ সালের সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর এই ক্ষমতা অত্যন্ত সুকৌশলে বলবত রাখা হয়েছে। বস্তুত এক ব্যক্তির ক্ষমতা নিরুঙ্কুশ করার লক্ষ্য নিয়ে এই সংবিধান প্রণয়ন করা হয়েছে।

 

তিন.

 

সংবিধান গৃহীত হবার মাত্র ৭ মাসের মাথায় প্রথম সংশোধনী করা হয়। তারপর এ পর্যন্ত ১৬বার সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। এর মধ্যে যেসব সংশোধনী রাষ্ট্রের চরিত্রে প্রভাব ফেলেছে বা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও মূল্যবোধে আঘাত করেছে সেগুলো সংক্ষেপে আলোচনা করা হলঃ

২য় সংশোধনী

এ সংশোধনীর ফলে সরকার মৌলিক অধিকার পরিপন্থী আইন তৈরি ও জারী করার অধিকার লাভ করে। নিবর্তনমূলক আটকাদেশের বিধান, জরুরী অবস্থা ঘোষণা ও  জরুরী অবস্থাকালীন সময়ে মৌলিক অধিকার স্থগিত করার বিধান এ সংশোধনীর মাধ্যমে সংযোজন করা হয়। বস্তুতঃ মূল সংবিধানে নাগরিকদের যতটুকু মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল, এ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্র তা থেকে সুস্পষ্টভাবে ফিরে আসে।

৪র্থ সংশোধনী

এ সংশোধনীর মাধ্যমে মন্ত্রী পরিষদ শাসিত সরকারের বদলে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। মৌলিক অধিকার বলবতকরণের জন্য হাইকোর্টের পরিবর্তে সাংবিধানিক আদালত বা কমিশন রাখার বিধান করা হয়। হাইকোর্ট – সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি নিয়োগ ও বরখাস্তের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত করা হয়। প্রশাসনের সকল স্তরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি দ্বারা দেশ শাসনের যে বিধান ছিল তা বাতিল করা হয়।অনুচ্ছেদ ৭০ কে আরও পোক্ত করা হয়। সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে একটিমাত্র রাজনৈতিক দল চালু করার বিধান যুক্ত করা হয়। এ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রের নির্বাহী কর্তা হনরাষ্ট্রপতি এবং তিনি তাঁর নির্বাহী কর্তৃত্বে অধীনস্থ কর্মচারীদের (আমলাদের) দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনার অধিকারী হন। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদ্বারা দেশ শাসনের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সম্পূর্ণ রূপে ভূলুণ্ঠিত করা হয়। এভাবে এ সংশোধনী রাষ্ট্রটাকে পুরোপুরি স্বৈরতান্ত্রিক ও আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করে।

৫ম সংশোধনী

এ সংশোধনীর বলে সকল সামরিক ফরমানের বৈধতা দেয়া হয়। এসব ফরমানের মাধ্যমে সামরিক আইন জারী বা প্রত্যাহার করা হয়েছে, মূলনীতি (জাতিয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র বাতিল করা হয়) পরিবর্তন করা হয়েছে, দালালদের বিচারের আওতা থেকে মুক্তি দেয়া হয়েছে, ধর্মীয় রাজনিতি (একটিমাত্র জাতীয় দল সংক্রান্ত বিধান বাতিল করা হয়) ও সংগঠন করার অধিকার দেয়া হয়েছে, নাগরিকত্ব থেকে জাতীয়তা সংক্রান্ত বিধান পরিবর্তন করা হয়েছে, শেখ মজিবুর রহমানের হত্যাকারীদের দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে। তা ছাড়া সংবিধানে প্রস্তাবনার উপরে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম এবং প্রস্তাবনায় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রাম এর স্থলে জাতীয় স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদ্ধের শব্দগুলো প্রতিস্থাপন করা হয় তারওবৈধতা দেয়া হয়। সংবিধান সংশোধনীর ক্ষেত্রে গণভোটের ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা হয়।  বস্তুত এ সংশোধনী হল সামরিক শাসন বৈধতা ওদায়মুক্তির সংশোধনী। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রটাকে প্রধানত সমরতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করা হয়।

৮ম সংশোধনী

এ সংশোধনীর মাধ্যমে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করা হয়। এবং সুপ্রিমকোর্টের ৬ টি নতুন বিভাগ স্থাপন করা হয়।

দ্বাদশ সংশোধনী

এ সংশোধনীর দ্বারা মন্ত্রী পরিষদশাসিত সরকার ব্যবস্থা ফেরত আনা হয়। আবারো প্রধানমন্ত্রীকে সকল ক্ষমতার মালিক বানানো হয়। এ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের দিকে ফেরত যাত্রা শুরু হয়।

ত্রয়োদশসংশোধনী

এ সংশোধনীর বদৌলতে গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থী নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করা হয়। এসংশোধনী দ্বারা প্রমাণিত হয় শাসক শ্রেণীর দলগুলোর সরকার একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের আয়োজনে সক্ষম নয়।

পঞ্চদশ সংশোধনী

এ সংশোধনীর বলে১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের প্রস্তাবনা ফেরত আনা হয়েছে, নাগরিকের বাঙ্গালিত্ব ফেরত এসেছে। সংবিধানের মূলনীতি অংশের অনুচ্ছেদ ৮-এর জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও শোষণ মুক্তি এবং ধর্মনিরপেক্ষতা ’৭২-এর চেহারায় ফেরত এসেছে। অনুচ্ছেদ ৭০ ফেরত এসেছে ১৯৭২ সালের মূল সংবিধান অনুসারে। মূল সংবিধানে ক্ষমতায় থেকে নির্বাচনের যে বিধান ছিল তা-ই নতুনভাবে পুনঃ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। মৌলিক অধ্যায়ের অনুচ্ছেদ ৩৮, যেখানে রাজনৈতিক উদ্দেশে ধর্মীয় সংগঠন করার ওপর বিধিনিষেধ ছিল, ফেরত এসেছে নতুন আঙ্গিকে। নতুন যুক্ত হয়েছে ১৮ক এবং ২৩ক। ১৮ক তে পরিবেশ ও জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে এবং ২৩ক তে উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের সংরক্ষণ ও উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে। সবচেয়ে প্রণিধানযোগ্য বিষয় হল অবৈধ ক্ষমতা দখল রোধ করতে গিয়ে সংবিধানে এমন বিধান যুক্ত করা হয়েছে যাতে সংবিধানের সমালোচনাকে রাষ্ট্রদোহীতার  শামিল করা হয়েছে। আরও ভয়ংকর ব্যপার হল সংবিধানের প্রস্তাবনা, মূলনীতিসহ  বেশ কিছু অনুচ্ছেদকে অমরত্ব প্রদান করা হয়েছে। অর্থাৎ এগুলো কখনই পরিবর্তন করা যাবে না যা গণতন্ত্রসম্মত নয়।

এসব সংশোধনীর বলে রাষ্ট্র অধিকতর ব্যক্তির সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণকারী মৌলিক অধিকার পরিপন্থী আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের অধিকার পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রি তথা এক ব্যক্তির ক্ষমতা নিরুঙ্কুশ করা হয়েছে। ৫ম ও ৭ম সংশোধনী দ্বারা সামরিক শাসনকে বৈধতা দেয়া হয়েছে।

সর্বশেষ ষোড়শ সংশোধনী দ্বারা বিচারপতিদের অভিশংসন ক্ষমতা১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের অনুরূপ জাতীয় সংসদের হাতে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে।

 

চার.

 

বাংলাদেশের ৪৩ বছরের ইতিহাসে সংবিধান বিষয়ক আলোচনা-পর্যালোচনাকে মোটা দাগে ৩ টি পর্বে ভাগ করা যায়। প্রথম পর্ব সংবিধান রচনা কাল। স্বাধীনতা লাভের অব্যহতি পরেই সংবিধানের বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে। ২১ ডিসেম্বর, ১৯৭১ ন্যাপ নেতা মোজাফফর আহমেদ সর্বদলীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধান গ্রহণের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আর একটি সাধারণ নির্বাচন না করে দেশের জন্য স্থায়ী সংবিধান গ্রহণ করা যেতে পারে না। তবে এসব পরামর্শ কোন রকম বিবেচনায় না নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র কাঠামোয় নির্বাচিত পূর্ব পাকিস্তান অংশের জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে সংবিধান সভা বা গণপরিষদ গঠনের ঘোষণা দেয়া হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ইয়াহিয়া খানের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের ম্যানডেট নিয়ে বিজয়ী হওয়া ব্যক্তিদের বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের এক্তিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলেন। তিনি দাবী করেন এই সদস্যদের বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের কোন অধিকার নেই। তখনকার সাবেক ছাত্র নেতাআ.স.ম. রব ও শাহজাহান সিরাজ দাবী করেন, পরিষদ– সদস্যদের শতকরা নব্বই জনই স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে যুক্ত ছিলনা। সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত একটি স্বাধীন দেশের শাসনতন্ত্র প্রণয়নের অধিকার তাদের থাকতে পারে না। বিরোধীদের প্রধান যুক্তি ছিল, মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের সংগ্রামের মধ্য দিয়েগোটা জাতির রাজনৈতিক চেতনার যে বিকাশ ঘটেছে তার প্রতিনিধিত্ব করার জন্যই নতুন নির্বাচনের প্রয়োজন যা সত্তুর সালের পরিষদ সদস্যরা ধারণ করতে পারে না।

গণপরিষদে খসড়া উত্থাপনের পর বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক দল ও বুদ্ধিজীবী তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। এদের মধ্যে সিপিবি সংবিধানকে সাধারণভাবে গণতান্ত্রিক অভিহিত করে স্বাগত জানায়। যদিও তারা স্বীকার করে এতে কিছু ত্রুটি আছে যা সংশোধনের অপেক্ষা রাখে। ন্যাপ মোজাফফর সংবিধানের বেশ কিছু ধারাকে সমালোচনা করে বলে, শাসনতন্ত্রের মূল অনুচ্ছেদে কেবলমাত্র কতগুলো সদিচ্ছার ঘোষণা দেয়া হয়েছে যা পূরণে রাষ্ট্র আইনানুগ ভাবে বাধ্য নহে। লেনিনবাদি পার্টি মনে করে এই সংবিধান সমাজতান্ত্রিক তো নয়ই, এমনকি অন্যান্য বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকদের যে ধরনের সাংবিধানিক অধিকার থাকে তা ও নেই। বিরোধী গণপরিষদ সদস্য সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত বলেন, যেসব ধারার নিন্দা আওয়ামী লীগ ’৫৬ সালে করেছিল, হুবুহু সেগুলোই তারা স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে প্রবিষ্ট করিয়েছে। আরেক বিরোধী গণপরিষদ সদস্য মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা বলেন, শাসনতন্ত্র বিলের প্রতিটি প্রমাণ দেয় যে, এক হাতে জনগণকে অধিকার দেয়া হয়েছে, অন্য হাতে সে অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। বদরুদ্দিন উমর এটিকে চিরস্থায়ী জরুরী অবস্থার একটি সংবিধান অভিহিত করে বলেন, শাসকগোষ্ঠীর একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রে অসীম ক্ষমতা চর্চার অধিকার দেয়া হয়েছে।

সামরিক স্বৈরতন্ত্র তথা সমরতন্ত্রের প্রতিভু এরশাদ সরকার বিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে উঠলে সরকার ব্যবস্থা ও সংবিধান নিয়ে নতুন করে আলোচনা-সমালোচনা এবং তর্কবিতর্কের সূচনা হয়। মূলত আশির দশকের শেষ দিক থেকে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী পর্যন্ত সময়কালকে সংবিধান নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার দ্বিতীয়পর্ব বলা যেতে পারে। এ সময়ের তর্কবিতর্কের প্রধান বিষয় ছিল সরকার পদ্ধতি কি হবে তা নিয়ে। এরশাদ সরকার বিরোধী আন্দোলনরত তিন জোটের রূপরেখা অনুসরণ করে এ ধারা সংবিধানের সকল অগণতান্ত্রিক বিধি-বিধান আড়াল করে শুধুমাত্র চতুর্থ সংশোধনী দ্বারা বাতিলকৃত মন্ত্রীপরিষদ শাসিত সরকার ব্যবস্থা পুনঃ বহালকে গণতন্ত্রের সমার্থক করে আলোচনার কেন্দ্রবিদুতে পরিণত করে। যেন মন্ত্রীপরিষদ শাসিত সরকার ব্যবস্থা মাত্রই গণতান্ত্রিক ও রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা মাত্রই অগণতান্ত্রিক। যেন মন্ত্রীপরিষদ শাসিত সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা গেলে আপনা আপনিই দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। একইসাথে এ ধারা ‘সার্বভৌম সংসদ’ নামক গণতন্ত্র বিরোধী তত্ত্ব প্রতিষ্ঠার প্রয়াস পায়। ব্যারিস্টার ইশতিয়াক আহমেদ এ ধারার বিশেষজ্ঞ প্রতিভু হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।

এ সময়কালে সংবিধান বিষয়ক আলোচনার আর একটি ধারা বিকাশ লাভ করেছিল। এ ধারা ’৭২-এর মূল সংবিধান প্রতিষ্ঠার আন্দোলন চালাচ্ছিল। প্রধানত বাম ঘরানার বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদগণ এ ধারার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। মধ্যবিত্তের ওপর বা রাজনীতি সচেতন জনগণের ওপর এ ধারা প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল। এ ধারা মতে ’৭২-এর মূল সংবিধান মূলত গণতান্ত্রিক এবং মূল সংবিধানই বিদ্যমান সাংবিধানিক–রাজনৈতিক সংকট থেকে দেশকে মুক্ত করতে পারে। দল হিসেবে সিপিবিএ ধারার নেতৃত্ব প্রদান করে।

’৭২-এর মূল সংবিধানকে অগণতান্ত্রিক অভিহিত করে নতুন গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়নকে প্রধান রাজনৈতিক কর্তব্য মনে করার একটি ক্ষুদ্র ধারাও বিরাজ করছিল এসময়। দল হিসেবে ঐক্য প্রক্রিয়া এ ধারাকে এগিয়ে নিতে সচেষ্ট ছিল। ঐক্য প্রক্রিয়ার কর্মসূচিতে গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়নকে গুরুত্ব দেয়া হয়। ফরহাদ মজহার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও  গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রতিষ্ঠার স্বপক্ষে  বিভিন্ন নিবন্ধ লিখে প্রচুর বিতর্কের সুত্রপাত ঘটান।এ সময়কালে সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান, এ. বি. এম. মুসা, আইনজ্ঞ শাহদিন মালিকসহ অনেকেই সংবিধানের বিভিন্ন বিধি নিয়ে পর্যালোচনামূলক বক্তব্য হাজির করেন।

ইসলামী শাসনতন্ত্রের দাবী নিয়ে আর একটি ধারাও এসময় ক্রিয়াশীল ছিল। প্রধানত ইসলামি চিন্তাবিদ ও ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলো এ ধারার প্রবর্তক। কোরআন ও সুন্নাহ ইসলামী শাসনতন্ত্রের ভিত্তি হলেও দলগুলোর ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। এবং এদের বড় অংশই বিএনপি-এর সাথে জোটবদ্ধ হয়ে রাজনীতি করছে।

নতুন করে মন্ত্রীপরিষদ শাসিত সরকারের নামে এক ব্যক্তি তথা প্রধানমন্ত্রী শাসিত সরকার ব্যবস্থা পুনঃ প্রবর্তনের পর বিভিন্ন ইস্যুতে আরও কয়েকবার সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। প্রতিটি সংশোধন কালেই মুলত সংসদের বাহিরে বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ আলোচনাগুলোর অনেকটাতে সংবিধানের মর্ম বা গভীরে যেতে দেখা যায়। অর্থাৎ এ সময়কালটাতে সংবিধানের প্রকৃত পর্যালোচনার ব্যাপ্তি বেড়েছে বলা যায়। তাই দ্বাদশ সংশোধনীর পর থেকে আজ পর্যন্ত সময়কালটাকে সংবিধান বিষয়ক আলোচনার ৩য় পর্ব বলা অত্যুক্তি হবেনা। এ সময়কালে মিজানুর রহমান খান নিজেকে একজন সংবিধান পর্যালোচক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন। সাংবাদিক নুরুল কবির, আইনজ্ঞ শাহদিন মালিকসহ আরও অনেকেই সংবিধানের বিভিন্ন অগণতান্ত্রিক বিধি নিয়ে সরব রয়েছেন।

বরাবরের মত এ সময়কালটাতেও বিভিন্ন অগণতান্ত্রিক বিধি সম্বলিত বিদ্যমান সংবিধানের স্বপক্ষ রাজনৈতিক ধারা এদেশের প্রধান ধারা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকদের প্রভাবিত করে আছে। ক্ষমতাসীন দল ও জোট এবং প্রধান বিরোধী দল ও জোট এ ধারারই দুই প্রতিদ্বন্দ্বী অংশ। এদের মধ্যে কয়েকটি ইস্যু যেমন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, জাতীয়তাবাদ, ধর্ম নিরপক্ষতা ইত্যাদি প্রশ্নে বিরোধ থাকলেও সংবিধানের অগণতান্ত্রিক বিধি বিধান প্রশ্নে কোন বিরোধ দেখা যায়নি। এ পর্বে শাসক শ্রেণীর রাজনীতিবিদদের একাংশের সংবিধানের কোন কোন অগণতান্ত্রিক বিধি বিধানের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে দেখা যায়। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর অপিরিসীম ক্ষমতা কমানোর পক্ষপাতি এরা। ’৭২-এর মূল সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেন কর্তৃক সংবিধানের৭০ ধারা বাতিলের দাবি খুবই প্রণিধানযোগ্য। এটা এ ইঙ্গিতও দিচ্ছে সংবিধানের গণতন্ত্রয়ানের দাবীটি শাসক শ্রেণীর ভাবনাতেও চলে এসেছে।

’৭২-এর মূল সংবিধান মূলত গণতান্ত্রিক এবং  মূল সংবিধানই বিদ্যমান সাংবিধানিক–রাজনৈতিক সংকট থেকে দেশকে মুক্ত করতে পারে – এখনো এই বিশ্বাস প্রগতিশীল চিন্তায় প্রভাব বিস্তার করে আছে। সিপিবি এখনো এ ধারারই নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে। কামাল লোহানীর নেতৃতে এ সময়কালে ’৭২-এর মূল সংবিধান পুনরুদ্ধার কমিটি গঠিত হয়।

তবে গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়নের ধারাটি আরও শক্তিশালি হয়েছে। দল হিসেবে গণসংহতি আন্দোলন এ ধারাকে এগিয়ে নিতে সচেষ্ট।গণতান্ত্রিক আইন ও সংবিধান আন্দোলন এ প্রশ্নে তাত্ত্বিক সংগ্রাম পরিচালনা করছে। আরও ছোট ছোট দল ও সংগঠন গণতান্ত্রিক সংবিধানের দাবি নিয়ে মাঠে নেমেছে।

 

পাঁচ.

 

১৬ বার সংশোধিত বিদ্যমান সংবিধান অগণতান্ত্রিক বিধি-বিধান দ্বারা যুক্ত তা আজ রাজনৈতিক অঙ্গনে অনেকটা স্বীকৃত। শাসক শ্রেণীর একাংশও কিছুঅগণতান্ত্রিক বিধি-বিধানের বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেছে। ফলত সংবিধানের গণতন্ত্রয়ানের দাবীটি নতুন মাত্রা পাচ্ছে। এখন যে প্রশ্নটি সামনে উঠে আসছে তা হল সংবিধানের গণতন্ত্রয়ানে সংবিধানের কিছু বিধি-বিধান সংশোধন ও সংযোজন করলেই চলবে, নাকি নতুন গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়নের প্রয়োজন রয়েছে। সাথে সাথে কোন প্রক্রিয়ায় সংবিধান সংশোধন বা প্রণয়ন করা হবে সে প্রশ্নেরও মীমাংসা করতে হবে। আর তাই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংবিধানের বৈশিষ্ট্য কি হওয়া উচিত সে বিষয়ে সামাজিক আলোচনা-পর্যালোচনা ও তর্কবিতর্ককে তীব্র করতে হবে, তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে হবে। প্রশ্ন দুটি ব্যাপক মানুষের চেতনাতে ধারণ করতে হবে। না হলে নতুন বা ভিন্ন রূপে অগণতান্ত্রিক সংবিধান দেশবাসীর ঘাড়ে চেপে বসতে পারে। কেননা যেহেতু জনগণের অভিপ্রায়ে সংবিধান রচিত হয়, তাই জনগণের চেতনাতে গণতান্ত্রিক সংবিধানের আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত থাকতে হবে।

এ নিবন্ধে উপরে উল্লেখ করা হয়েছে গণতান্ত্রিক সংবিধানের প্রশ্নে আমাদের দেশে দু’টি ধারা ক্রিয়াশীল রয়েছে। প্রধান ধারা সংশোধনপূর্ব ’৭২-এর মূল সংবিধানকে  মূলত গণতান্ত্রিক মনে করে এবং বিশ্বাস করে মূল সংবিধানই বিদ্যমান সাংবিধানিক–রাজনৈতিক সংকট থেকে দেশকে মুক্ত করতে পারে। দ্বিতীয় ধারা ’৭২-এর মূল সংবিধানকে অগণতান্ত্রিক মনে করে এবং নতুন গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়নকে প্রধান রাজনৈতিক কর্তব্য মনে করছে। গণতান্ত্রিক সংবিধানের প্রশ্নে জনসচেতনা গড়ে তুলতে প্রথমে এ বিষয়টা মীমাংসা হতে হবে। আজকের বাংলাদেশের এ চেহারা বা স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার বীজ সংশোধনপূর্ব ’৭২-এর মূল সংবিধানে প্রোথিত ছিল কি না তার পর্যালোচনা আগে সারতে হবে। এটা হবে গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এক ধাপ অগ্রগতি।

 

ছয়.

 

’৭২-এর মূল সংবিধান গণতান্ত্রিককি না,  কিম্বা এর কোন কোন ধারা বা বিধি-বিধান অগণতান্ত্রিক সে আলোচনায় যাবার আগে যে বিষয়টা স্মরণ করাতে চাই তা হল মূল সংবিধানের দেয়া ক্ষমতা বলেই এসব সংশোধন সম্পন্ন করা হয়েছে। এ সংবিধান এমনকি সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখলেও বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় নি।সংবিধান প্রণয়নের দেড় বছরের মাথায় বাংলাদেশ আমলা নির্ভর স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হল কেন – এ পর্যালোচনা আজ তাই খুবই জরুরী।

’৭২-এর মূল সংবিধান সম্পর্কিত দ্বিতীয় যে বিষয়টি স্মরণ রাখতে হবে তা হল- ঔপনিবেশিক আমলের সকল আইন কানুন এ সংবিধানে বহাল রাখা হয়েছে। অনুচ্ছেদ ১৪৯, ১৫২ ধারা বলে স্বাধীনতা ঘোষণার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত যে সমস্ত আইন এদেশে জারি ছিল, কার্যক্ষেত্রে তা সক্রিয় থাকুক আর না থাকুক, সে সবই স্বাধীন দেশের আইন হিসেবে বহাল রয়েছে। যেসব আইন ব্রিটিশরা তৈরি করেছিল তাদের ঔপনিবেশিক শাসন নিরুঙ্কুশ করা, অর্থনৈতিক লুণ্ঠন আর আন্দোলনকারীদের দমন-পীড়নের জন্য; যা অব্যাহত রেখেছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী একই উদ্দেশে; বাংলাদেশেও সেগুলো হুবুহু কার্যকর করা হল। যা ছিল ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের মূলমন্ত্র, যে আকাঙ্ক্ষায় দেশের মানুষ পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, যে সমাজ গড়বে বলে কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র-জনতা মুক্তিযুদ্ধে জীবন দিয়েছে, সে আকাঙ্ক্ষাগুলো সংবিধানের প্রস্তাবনায়, মূলনীতিতে লেখা হয়েছে ঠিকই, তবে কার্যক্ষেত্রে এসে ঔপনিবেশিক আমলের সকল অগণতান্ত্রিক আইন কানুন বহাল রেখে এবং সেই সাথে নতুন কিছু অগণতান্ত্রিক আইন যুক্ত করে পাকিস্তান রাষ্ট্রটাই স্বাধীন দেশে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে।

’৭২-এর মূল সংবিধানের ৪৬, ৭০, ১৪২ও ১৪৯ ধারাগুলো প্রধানত বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অগণতান্ত্রিকতার উৎস হিসেবে বেশি করে চিহ্নিত। তবে আরও কিছু ধারায়ও অগণতান্ত্রিকতার বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান।১৪২ ধারা বলে সংসদ সদস্যরা সংবিধানের যে কোনধারা-উপধারা, বিধিবিধান বাতিল বা সংশোধন করতে পারে। তবে এ জন্য দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন প্রয়োজন পরবে। কিন্তু কোন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংসদেরসংবিধান বদলের এমন অধিকার নেই। সংবিধান প্রণয়ন হয়সংবিধান সভায়। রাষ্ট্র কি ভাবে আইন প্রণয়ন করবে তার নিয়ম, রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিভাগের চরিত্র ও আন্তঃসম্পর্ক কি হবে তা নির্ধারণ, নাগরিকের মৌলিক অধিকার কি ভাবে রক্ষিত হবে প্রভৃতি অতি মৌলিক ও ভিত্তিমূলের বিষয়গুলো হল সংবিধানের বিষয় যা সংবিধান সভা নির্ধারণ করে। প্রণীত সংবিধানের আলোকে সংসদ আইন প্রণয়ন করে থাকে। অর্থাৎ আইন প্রণয়ন করার আইন হচ্ছে সংবিধান। তবে সংবিধানের আলোকে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা ও দায়িত্ব সংসদের থাকলেও এমন কোন আইন প্রণয়ন করতে পারে না যা ব্যাক্তির সার্বভৌমত্ব ও মৌলিক অধিকার খর্ব করতে পারে। একবার সংবিধান সভার মাধ্যমে সংবিধানপ্রণীতহবার পর সংবিধানের ছোট–খাট পরিবর্তনে রেফারেনডাম এবং মৌলিকপরিবর্তনে নতুন করে সংবিধান সভা ডাকতে হয়। কারণ  জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন নিশ্চিত না করে সংবিধান বদলের কোন অধিকার কারও থাকতে পারেনা। তাছাড়া যে সংবিধানের ভিত্তিতে সংসদ ডাকা হয় সেই ভিত্তিটা বদলে দেবার ক্ষমতা সংসদের থাকে না। এটাই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য।কিন্তু’৭২-এর মূল সংবিধানের ১৪২ ধারা বলে সংসদকে জনগণের মৌলিক অধিকার হরণ করার অধিকার দেয়া হয়েছে, যেমন খুশি তেমন আইন করার অধিকার দেয়া হয়েছে। সংবিধানের বিশাল একটা অংশ জুড়ে মৌলিক অধিকার সম্পর্কে বড় বড় কথা বলা হল, মৌলিক অধিকার বিরোধী আইন প্রণয়ন করা যাবে না কায়দা করে লেখা হল। অথচ এরপর বলা হল সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য  চাইলে সব কিছুই করা যাবে। এ এক অদ্ভুত প্রতারণা। এত বড় অগণতান্ত্রিক বিধান থাকার পরও ’৭২-এর মূল সংবিধানকে গণতান্ত্রিক বলা যায় কি?

মূল সংবিধানের ৭০ ধারাদলীয় সংসদ সদস্যদের অধিকার ও ক্ষমতা সুনির্দিষ্ট করেছে। এ ধারার কারণে কোন নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থী মনোনীত হয়ে কোন ব্যক্তিসংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে তিনি যদি উক্ত দল হতে পদত্যাগ করেন, বা সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোট দান করেন তাহলে সংসদে তার আসন শূন্য হবে।এ ধারা বলে সংসদ সদস্যরা দলের বিরুদ্ধে ভোটতো দিতে পারবেনই না, এমনকি ভোটাভুটির সময় সংসদে অনুপস্থিত থাকলেও বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন বলে ধরে নেয়া হবে। অর্থাৎ সংসদে সংসদ সদস্যরা কলাগাছ হিসেবে থাকবেন এবং দল যা বলবে সে অনুযায়ী তিনি হ্যা বা না বলবেন। এ ধারাটি গণপরিষদ গঠনকালে ২২ মার্চ, ১৯৭২ রাষ্ট্রপতি কর্তৃক জারি করা বাংলাদেশ গণপরিষদ সদস্য (সদস্যপদ বাতিল ) আদেশ এর অনুরূপ। আদেশটি হল, যদি কোন গণপরিষদ সদস্য তিনি যে দলের মনোনয়নে নির্বাচিত হয়েছেন সে দল থেকে পদত্যাগ করেন বা দল তাকে বহিষ্কার করে তবে তার সদস্যপদ বিলুপ্ত হবে এবং এ বিষয়ে আদালত-এ কোন প্রস্ন উত্থাপন করা যাবে না। এ আদেশের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ তার নিজের আয়ত্তে থাকা গণপরিষদের কাছ থেকে তার স্বাভাবিক ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে গণপরিষদকে প্রধানমন্ত্রীর আজ্ঞাবহ গণপরিষদে পরিণত করে। এটি দলীয় গণপরিষদ সদস্যদের মুখে কুলুপ এঁটে দিয়েছিল। তাই এ আদেশ বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম গণতান্ত্রিক চেতনা বিরোধী আইন । এ আইনটিই সংবিধানসম্মত হয়ে মূল সংবিধানের ৭০ ধারায় গৃহীত হয়ে সংসদ সদস্যদের মুখ বন্ধে কাজ করছে। যেভাবে গণপরিষদ সদস্যদের স্বাধীন মত প্রকাশের এখতিয়ারকে বিনষ্ট করা হয়েছিল, তারই ধারাবাহিকতা সংসদেও অব্যাহত থাকল। অবশ্য ৭০ ধারার স্বপক্ষে যুক্তি রয়েছে। তা হল, সংসদ সদস্যদের কেনাবেচা বা সুবিধাবাদিতায় সরকারের অকারণ পতন হয় যা কাম্য হতে পারে না। পাকিস্তান আমলে এ ধরনের কয়েকটি উদাহরণ রয়েছে। দলের টিকিটে নির্বাচিত হয়ে এসে সংসদে গিয়ে দল বদল করার মতো সুবিধাবাদ ঠেকানো দরকার, তবে তা সাংসদদের পুতুল বানিয়ে নয়। সংসদ হল বিতর্কের যায়গা। সেই বিতর্কে সাংসদ তার দলকে নয়, বরং যাদের ভোটে তিনি নির্বাচিত হয়েছেন তাদের প্রতিনিধিত্ব করার কথা। সে ক্ষেত্রে কোন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে তাঁর সঙ্গে দলের অন্যান্য সাংসদদের মতবিরোধ থাকতে পারে। এইমতবিরোধ সংসদে প্রকাশ করার অধিকার হরণ করা মানে তিনি যাদের প্রতিনিধি তাদের মৌলিক অধিকার হরণ করা। তাই এ ক্ষেত্রে, সরকারের  টিকে থাকার প্রশ্নে শুধুমাত্র আস্থা ভোটের বেলায় এ ধারা প্রযোজ্য হতে পারে।

আজকাল হরহামেশাই ক্রসফায়ার, এনকাউনটারে নিহত হবার গল্প শোনা যায়। বিনা বিচারে বা বিচার বহির্ভূত এসব হত্যার জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে কোন রকম জবাবদিহি করতে হয় না বা বিচারের মুখোমুখি হতে হয় না। কেননা, বিনা বিচারেএসব হত্যার আইনগত ভিত্তি আমাদের সংবিধান, ’৭২-এর মূল সংবিধানেই বিদ্যমান রয়েছে। মৌলিক অধিকার ভাগের ৪৬ অনুচ্ছেদ হল সেই বিধান যেখানে বলা হয়েছে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত ব্যক্তিগণ যদি কোন অঞ্চলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বা পুনর্বহালের প্রয়োজনে কোন কার্য করে তবে আইনের মাধ্যমে দায়মুক্ত করা যাবে। অর্থাৎ শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য কাউকে হত্যাও করা হয় তবুও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে অব্যহতি দিতে আইন প্রণয়ন করা যাবে। এর ফলে মৌলিক অধিকার ভাগে বর্ণিত ‘আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান’ বা ‘সকলেই আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী’ অথবা কাউকে আইন অনুযায়ী ব্যতীত ‘জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতা’ থেকে বঞ্চিত করা যাবেনা বলে যেসব অধিকার নিরঙ্কুশ ভাবা হয়েছিল তা আর নিরঙ্কুশ থাকল না। তেমনি, ‘মৌলিক অধিকারের সঙ্গে অসমঞ্জস্য আইন বাতিল হয়ে যাবে’ অথবা ‘অসামঞ্জস্যপূর্ণ আইন প্রণয়ন করা যাবে না’ বক্তব্যসমূহ মিথ্যা, চাতুরিপূর্ণ ও ঠগবাজিতে পরিণত হয়। মজার ব্যপার হল,৪৬ অনুচ্ছেদের বক্তব্যটি ঔপেনিবেশিক ভারত শাসন আইন থেকে ভারত ও পাকিস্তানের গণপরিষদ হুবুহ নকল করেছিল। বাংলাদেশের সংবিধানেও সেই ভাষাই আছে, শুধু ‘মার্শাল ল’ কথাটি নাই। ৪৬ অনুচ্ছেদটি মৌলিক অধিকার ( ৩য় ভাগ ) অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত, যদিও এটি মৌলিক অধিকার রক্ষা নয়, মৌলিক অধিকার হরণ করার বিধান।

 

সাত.

 

’৭২-এর সংবিধানের ভিত্তিতে বাংলাদেশে মন্ত্রী পরিষদ শাসিত বা সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। পৃথিবীর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে মন্ত্রী পরিষদ ও রাষ্ট্রপতি শাসিত – এ দু’ ধরনের সরকার ব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে। মন্ত্রী পরিষদ শাসিত সরকার ব্যবস্থার সূতিকাগার হল ইংল্যান্ড, দু’শ বছর আমরা যার উপনিবেশ ছিলাম। তাই বোধ হয় আমরা মন্ত্রী পরিষদ শাসিত সরকার ব্যবস্থার সাথে বেশি পরিচিত এবং এ ব্যবস্থায় স্বস্তি অনুভব করি। তবে ইংল্যান্ডের সরকার ব্যবস্থাগ্রহণ করলেও এধরনের সরকার ব্যবস্থার মর্ম বা নির্যাস যেমন ’৭২-এর সংবিধানে প্রতিফলিত হয়নি, তেমনি সরকারগুলোকেও তা চর্চায় নিতে চেষ্টা করতে দেখা যায়নি। অর্থাৎ শাসনকার্য পরিচালনায় গণতন্ত্রের মর্মের কোন প্রতিফলন পাওয়া যাবে না। ইংল্যান্ডে রাজা বা রাণী (বর্তমানে রানী) সাংবিধানিক প্রধান। তাঁকে সমালোচনা করা যায় না, তিনি আদালতেরও ঊর্ধ্বে। রাণীর নামেই শাসনকার্য পরিচালনা, আইন প্রণয়ন ও বিচারকার্য পরিচালিত হয়। অর্থাৎ রাণী একই সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গের অংশ ও প্রধান। এভাবে তাঁর ব্যাক্তিরুপের মধ্য দিয়েই রাষ্ট্রের একক ও অবিচ্ছিন্ন সার্বভৌম ক্ষমতার চর্চাও প্রযুক্ত হয়। কিন্তু রাজা বা রাণী যা করেন মন্ত্রিসভার পরামর্শ মতই করেন। আর মন্ত্রিসভা সংসদের প্রণীত আইন দ্বারাই শাসনকার্য নির্বাহ করে থাকে।

আমাদের দেশে রাণী নেই, আছেন রাষ্ট্রপতি। সংসদীয় সরকার ব্যবস্থার মৌল ধারণা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতিই সকল সিদ্ধান্ত নেবার ও তা কার্যকর করার অধিকারী। তিনিই হবেন রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতার প্রতীক বা অভিপ্রকাশ। তাঁর মধ্য দিয়েই সমগ্র সংবিধান নিজের ঐক্য বা একক ও অবিচ্ছিন্ন সত্তা অক্ষুন্ন রাখবে। সেই কারণেই এই ক্ষমতার অধীনস্ত থাকা সকল নাগরিকের জন্য বাধ্যতামুলক, প্রধানমন্ত্রীর জন্যেও। সংসদীয় সরকার ব্যবস্থার এই মূল সূর / মর্মকথা ৭২-এর সংবিধানে খুঁজে পাওয়া যাবেনা। এ সংবিধান কার্যতঃ প্রধানমন্ত্রীকে সীমাহীন ক্ষমতা প্রদান করেছে এবং তিনি রাষ্ট্রপতির ঊর্ধ্বে বিরাজ করছেন।

‘৭২-এর সংবিধানে রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের ক্ষেত্র ছাড়া আর কোন ক্ষমতাই দেয়া হয় নি। ৪৮(৩) ধারায় বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের ক্ষেত্র ছাড়া রাষ্ট্রপতি তাহাঁর অন্য সকল দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কার্য করিবেন। এ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের যে ক্ষমতা প্রদান করেছেতা-ও আসলে কথার মারপ্যাঁচ। কেননা, ৫৬(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যে সংসদ-সদস্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন বলে রাষ্ট্রপতির নিকট প্রতীয়মান হবেন, রাষ্ট্রপতি তাঁকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দিবেন। যেহেতু সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভকারী দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি কে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দিতে হয়, তাই প্রকৃত অর্থে এ ক্ষেত্রেও রাস্ট্রপতির ক্ষমতা প্রয়োগেরকোন সুযোগ নাই।

ভারতের মূল সংবিধানে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থার মূল সুর প্রতিফলিত হয়েছে। যদিও এ ক্ষেত্রে ভারতীয় সংবিধানে পরিবর্তন আনা হয়েছে, তারপরেও ভারতের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মন্ত্রীপরিষদের পরামর্শ অনুযায়ী কর্ম সম্পাদন করে থাকেন। কিন্তু ’৭২ এর সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কর্ম সম্পাদন করে থাকেন।

সরকার তথা নির্বাহী প্রধানকে অভিশংসন করার বিধান সকল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সংবিধানে পাওয়া যাবে। পাওয়া যাবেনা বাংলাদেশের সংবিধানে। ’৭২-এর সংবিধানে রাষ্ট্রপতি কে অভিশংসন করার বিধান থাকলেও প্রধানমন্ত্রীর অভিশংসনের কোন বিধান নেই। শুধু তাই নয়, প্রধানমন্ত্রীর কাজের জবাবদিহিতা চাইবার ও আদায় করবার কোন ব্যবস্থাও নাই।

৫৫(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, মন্ত্রীপরিষদ যৌথভাবে সংসদের কাছে দায়ী থাকবেন। কিন্তু অনুচ্ছেদ ৭০-এর মাধ্যমে গোটা সংসদকে দল তথা দলীয় প্রধানের নিকট দায়বদ্ধ, অনুগত হতে বাধ্য করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী সংসদকে যখন যে ধরনের আইন প্রণয়নের নির্দেশ দিবেন, জাতীয় সংসদ সে ধরনের আইন প্রণয়ন করতে বাধ্য। এমনকি সংসদ অধিবেশনে না থাকাকালীন সময়েও রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে অধ্যাদেশ জারী করিয়ে নিতে পারেন। অনুচ্ছেদ ৭০-এর সাথে অনুচ্ছেদ ১৪২ মিলিয়ে পড়লে দেখা যাবে যিনি প্রধানমন্ত্রী তিনি যদি দলীয় প্রধান হন, আর তাঁর দলের যদি জাতীয় সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকে তাহলে তিনি সংবিধান সংশোধনের এমন অপরিমেয় ক্ষমতা ভোগ করতে পারবেন যা পৃথিবীর কোন গণতান্ত্রিক দেশের প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট কল্পনাও করতে পারেন না। আর আমাদের দেশেতো সরকার প্রধান এবংদলীয় প্রধান একই ব্যক্তি হয়ে থাকেন। অন্যদিকে শাসক শ্রেণীর দলগুলোর ভিতর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চা নেই বললেই চলে। কার্যতঃ দলের প্রধানের ইচ্ছা অনুযায়ী দলের বিভিন্ন কমিটি গঠিত হয়ে থাকে। জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে দলের নমিনেশন কে পাবেন তা-ওদলীয় প্রধান নির্ধারণ করে থাকেন।

সহগবিধান অনুযায়ী কোন আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কোন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত কোন দণ্ড মওকুফ, স্থগিত, বা হ্রাসের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতি সংরক্ষণ করেন। তবে যেহেতু রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করে থাকেন, তাই কার্যত প্রধানমন্ত্রী-ই এ অধিকার সংরক্ষণ করেন।

বস্তুতঃ ৭২ এর সংবিধান একজন প্রধানমন্ত্রীর কাছে যে সীমাহীন ক্ষমতা অর্পণ করেছে তা পৃথিবীর কোন গণতান্ত্রিক সংবিধান তো দূরের কথা, অগণতান্ত্রিক সেনা শাসকদের কাছেও এই পরিমাণ ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হবার নজির নেই।

 

আট.

 

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েমের প্রধান ও আবশ্যক শর্ত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সংবিধান প্রণয়ন যা ’৭২-এর সংবিধান রচনা প্রক্রিয়ায় অনুসরণ করা হয়নি। মূলনীতি ও মৌলিক অধ্যায় অংশে অনেক ভাল ভাল কথা সন্নিবেশিত থাকলেও তা আদালত দ্বারা বলবতযোগ্য নয়। অর্থাৎ সরকার এগুলো বাস্তবায়নে বাধ্য নয়। উপরন্তু এ সংবিধানে জনগণের মৌলিক অধিকার হরণকারী আইন প্রণয়নের অধিকার দেয়া হয়েছে। এমনকি নাগরিকের জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণ করার যে কোন অপরাধ থেকে নির্বাহী কর্তৃত্বকে দায়মুক্ত রাখা হয়েছে। সর্বোপরি এ সংবিধানের মাধ্যমে এক ব্যক্তি তথা প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। তাই বিদ্যমান সংবিধানের আমূল পরিবর্তন ছাড়া বাংলাদেশে গণতন্ত্র তথা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।

সংবিধান হল নাগরিক তথা জনগণের ইচ্ছা ও অভিপ্রায়ের স্বীকৃতি। তাই সংবিধানে জনগণের ইচ্ছা ও অভিপ্রায়ের প্রতিফলন ঘটে থাকে। গণতান্ত্রিক সংবিধান রচনা মানে স্বাধীন ও মুক্ত সত্ত্বা হিসেবে মানুষ বা নাগরিকের নিজের সুরক্ষার সনদ তৈরির প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ায় নাগরিককে নিজেকে স্বাধীন ও মুক্তসত্ত্বা হিসেবে ভাবতে পারতে হয়। নিজেদের ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা ও সংকল্পে সাংবিধানিক রূপ দাড় করানোর যোগ্যতা অর্জন করতে পারতে হয়। ব্যক্তির ইচ্ছা ও অভিপ্রায়ের স্বাধীনতা অক্ষুন্ন রেখে সমষ্টির ইচ্ছা ও অভিপ্রায়ে সংবিধান প্রণীত হতে হয়। তাই গোটা জাতির চেতনাতে গণতান্ত্রিক সংবিধানের আকাঙ্ক্ষা জাগরুক থাকা অত্যাবশ্যক। আর তাই গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়নে রাজনৈতিক, আইনি পরিবর্তনের সংগ্রামের সাথে মানুষ তথা নাগরিকের সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের সংগ্রাম যুক্ত।

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংবিধানের বৈশিষ্ট্য কি হওয়া উচিত সে বিষয়ে সামাজিক আলোচনা-পর্যালোচনা ও  তর্কবিতর্ককে তীব্র করতে হবে, তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে হবে। এটি ব্যপক মানুষের চেতনাতে, উপলদ্ধিতে আনতে পারতে হবে। না হলে নতুন বা ভিন্ন রূপে অগণতান্ত্রিক সংবিধান দেশবাসীর ঘাড়ে চেপে বসতে পারে।