Banner
শুধু সৎ বা ভালো প্রার্থী নয়, আধুনিক ঢাকা গড়তে চাই স্বশাসিত ঢাকা নগর সরকার -- হাবিবুর রহমান

লিখেছেনঃ হাবিবুর রহমান, আপডেটঃ April 9, 2015, 12:00 AM, Hits: 397

 

দীর্ঘ তের বছর পর অবশেষে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারণায় এবং চারিদিকে নির্বাচনী আমেজ লক্ষ করা যাচ্ছে।
যথারীতি প্রার্থীগণ বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা শুরু করেছেন। এসব প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে- বাসযোগ্য ঢাকা, আদর্শ ঢাকা, সবুজ ঢাকা, তিলোত্তমা ঢাকা, নিরাপদ ঢাকা গড়া ইত্যাদি। সাধারণভাবে বললে, বিশেষত মেয়র প্রার্থীগণ উন্নত ও আধুনিক ঢাকা গড়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করছেন।


আগের মেয়র ও প্রশাসকগণও এরকম অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু এসব প্রতিশ্রুতি শেষ পর্যন্ত প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। এরা নগর ব্যবস্থাপনায় তেমন কোন মৌলিক পরিবর্তন আনয়ন করতে পারেননি, তেমনি নাগরিক সেবার মানও উন্নত হয়নি। বস্তুতঃ পৃথিবীর আবাস অযোগ্য নগরগুলোর একটি হল ঢাকা মহানগরী। গত চার বছর ধরে বিশ্বের বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকায় ঢাকার স্থান ১ ও ২ নম্বরে উঠানামা করছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) নিয়মিতভাবে বিশ্বের বিভিন্ন শহরের বাসযোগ্যতার এক জরিপ করে আসছে। এদের জরিপে ২০১২ সালে ঢাকা হয়েছিল বাসযোগ্যতার দিক দিয়ে নিকৃষ্ট শহর। ২০১৪ সালে একধাপ উপরে উঠে ১৪০ টি শহরের মধ্যে বাংলাদেশের জায়গা হয়েছে ১৩৯ নম্বরে। ঢাকার চেয়ে খারাপ শহরটি হচ্ছে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক, যেখানে কয়েক বছর ধরে যুদ্ধ চলছে। বাসযোগ্যতার এই তালিকা তৈরিতে ইআইইউ পাঁচটি ক্ষেত্রের ৩০টি দিক বিবেচনায় নেয়। এগুলো হচ্ছে ১.স্থিতিশীলতা, ২.স্বাস্থ্যসেবা, ৩.সংস্কৃতি ও পরিবেশ, ৪.শিক্ষা ও ৫.অবকাঠামো।


বাসযোগ্য ঢাকা, আদর্শ ঢাকা বা আধুনিক ঢাকা বিষয়টা আসলে কী? সাধারণভাবে বলা যায় একটি আধুনিক শহরের যেসব সুযোগ-সুবিধা বা ব্যবস্থা থাকে, তা ঢাকায়ও কার্যকর থাকবে। ঢাকার নাগরিকদের প্রধান চাহিদাগুলো হোল--


 ১. নিরাপদ গণপরিবহন ব্যবস্থা ও কার্যকর ট্রাফিক সিস্টেম।
অসহনীয় যানযটে ঘন্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হবে না। ফুটপাতগুলো হাটার উপযোগী থাকবে। বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করে নাগরিক জীবন দুর্বিষহ করবে না।


২. দুষণমুক্তপরিছন্ন ঢাকা শহর।
যত্রতত্র আবর্জনার স্তূপ জমে থাকবে না। জীবানুযুক্ত হাসপাতাল বর্জ্য, পচনশীল কাঁচা বাজার ও কিচেন বর্জ্য যেমন দুষণ সৃষ্টি করবে না, তেমনি গৃহস্থালি শক্ত বর্জ্য, নির্মাণ কাজের বর্জ্য রাস্তাঘাট অপরিছন্ন রাখবে না। যানবাহন ও কল-কারখানার কালো ধোঁয়া, বর্জ্য পচে বিষাক্ত গ্যাস উদ্গীরণ এবং হাসাপাতাল বর্জ্য থেকে রোগ জীবানুর বিস্তার ইত্যাদি বায়ু দূষণের কারণ হবে না।শহরের পার্ক ও খালগুলো পরিষ্কার পরিছন্ন থাকবে। কল-কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য ও পয়-নিষ্কাশন দ্বারা ঢাকার চারপাশের নদীগুলো দূষিত হবে না। শব্দ দুষণ বলতে কিছু থাকবে না। স্থানে স্থানে গণশৌচাগার থাকবে, তাই পথচারী ও ভাসমান মানুষ খোলাস্থানে পায়খানা-পেশাব করবে না।


৩. নিরাপদ ঢাকা।
 নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল নাগরিক দিবা-রাত্রনির্বিঘ্নে রাস্তা-ঘাটে চলাফেরা করতে পারবে। প্রত্যেক নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকবে। থাকবে না মাস্তানি, চাঁদাবাজি।


৪. নিরাপদ খাদ্য ও পানীয় প্রাপ্তির নিশ্চয়তা।
বিষাক্ত রাসায়নিকযুক্ত,মানহীনভেজাল খাদ্যসামগ্রী পাওয়া যাবে  না কাঁচাবাজারে, স্টোরে এবং হোটেলগুলোতে। ওয়াসার পানি হবে পানযোগ্য।


৫. নিয়মিত বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি সরবরাহ।
বস্তিবাসীসহ সকল নাগরিকের জন্য সহনীয় দরে নিয়মিত বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি সরবরাহের ব্যবস্থা থাকবে।


প্রশ্ন হল মেয়রগণ বা নির্বাচিত সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ কি এসব ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারবেন? এসব ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা আনার জন্য যে কার্যকর নগর কর্তৃপক্ষের দরকার সে কাঠামো কি সিটি কর্পোরেশনের রয়েছে? উত্তর হল না, সিটি কর্পোরেশনের এমন কাঠামোও নেই, ক্ষমতাও নেই। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সারা বছর জুড়ে (বেশী বর্ষাকালে) রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি ও সংস্কার করা হয়। রাস্তা খুঁড়ে কখনো ঢাকা ওয়াসা, কখনো বিদ্যুৎ বিভাগ, কখনো পয়ঃনিষ্কাশন বিভাগ, কখনো স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। এসব সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের ভেতর সমন্বয় নেই। যে রাস্তা একবার খুড়লে চলে, তা কয়েকবার খুড়তে হয়। এতে অর্থের অপচয় হয়, তেমনি জনগণের দুর্ভোগ বহুগুণ বেড়ে যায়। বস্তুতঃ ঢাকার নানা দিক দেখার জন্য সরকারের কর্তৃপক্ষের অভাব নেই। ঢাকা শহরের পানি, পরিবেশ, বিদ্যুৎ, গ্যাস, সড়ক, আইনশৃঙ্খলাসহ অন্যান্য রেগুলেটরি কার্যক্রম, ট্রাফিক, আবাসন, পরিকল্পনাসহ নানা ধরনের সেবা ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনার জন্য রয়েছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রিত প্রায় ৫০টি প্রতিষ্ঠান। এসব সংস্থা বা কর্তৃপক্ষের কাজকর্ম সমন্বয়ের জন্য একটি কার্যকর একককর্তৃপক্ষ দরকার। এই একক কর্তৃপক্ষের পক্ষে সম্ভব বাসযোগ্য ঢাকা গড়ে তোলা। কিন্তু একটি একককর্তৃপক্ষতো দূরের কথা, ঢাকাকে দুই ভাগে বিভক্ত করে পরিস্থিতি আরও জটিল করা হয়েছে। সরকারগুলো ঢাকার ওপর ছড়ি ঘোরাতে চায়, তাই ঢাকার ব্যবস্থাপনার জন্য কার্যকর কর্তৃপক্ষ দেখতে চায় না।


 শুধু ঢাকা নয়, প্রশাসনে জনগণের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা তথা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সারা দেশে স্বশাসনের বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন নির্বাচিত স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ নম্বর অনুচ্ছেদে স্থানীয় শাসনের একটি ধারণা দেয়া হয়েছে। এই ধারণার বিপরীতে স্থানীয় সরকারের ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সরকারকে জাতীয় ও স্থানীয়- এই দুই স্তরে বিভক্ত করে জাতীয় সরকার ও স্থানীয় সরকারের দায়িত্ব, কর্তব্য ও ক্ষমতা প্রয়োগের সীমারেখা সুনির্দিষ্ট করতে হবে। স্থানীয় প্রশাসনকে স্থানীয় সরকারের নিকট এবং স্থানীয় সরকারকে জনগণের নিকট সরাসরি জবাবদিহি করার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।


উপরোক্ত ধারণার আলোকে স্বশাসিত ঢাকা মহানগর সরকার ব্যবস্থা গড়ে উঠবে, যে সরকারের দায়িত্ব ও ক্ষমতা হবে নিম্নরূপ-


১.নগরীর শাসনব্যবস্থা পরিচালনা, সাংগঠনিক কাঠামো অনুমোদন, জনবল নিয়োগের অধিকার ঢাকা মহানগর সরকার সংরক্ষণ করবে।


২.নগরীর উন্নয়ন কার্যক্রম, নাগরিক পরিষেবা এই সরকারের অধীনে পরিচালিত হবে।


৩.নগরীর আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য নগর সরকারের অধীনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থাকবে।


৪. জনশৃঙ্খলা রক্ষা, উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, সেবা কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য করারোপ ও বাজেট প্রণয়ন করবে নগর সরকার। একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অধীনে জাতীয় সরকার স্থানীয় সরকারগুলোর জন্য বাজেট বরাদ্দ রাখবে।


৫. আদালত কর্তৃক দোষী সাব্যস্ত না হলে মেয়র বা কাউন্সিলরদের অপসারণ করা যাবে না। অন্যদিকে  অযোগ্য বা প্রতিশ্রুতিভঙ্গকারীদের জনগণ বিশেষ ব্যবস্থায় প্রত্যাহার বা অপসারিত করতে পারবে।


বর্তমান ব্যবস্থায় ঢাকার মেয়র বা ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নখ দন্তহীন বাঘ। মেয়র স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা মাত্র। সবচেয়ে যোগ্য ও সৎ হলেও তাঁর পক্ষে নগর ব্যবস্থাপনায় গুণগত পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। বিদ্যমান ব্যবস্থায় ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের পক্ষে আধুনিক ঢাকা গড়া সম্ভব নয়। তাই প্রার্থীদের বাসযোগ্য ঢাকা, আদর্শ ঢাকা, সবুজ ঢাকা, তিলোত্তমা ঢাকা, নিরাপদ ঢাকা গড়ার প্রতিশ্রুতি ঢাকাবাসীদের সাথে মশকরা করার শামিল। আধুনিক ঢাকা গড়তে স্বশাসিত ঢাকা মহানগর সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ছাড়া বিকল্প নেই। আন্তরিক হলে মেয়রগণ স্বশাসিত ঢাকা মহানগর সরকার গড়ার দাবীটি সামনে নিয়ে আসবেন।