Banner
ইতিহাস অনুসন্ধান কেন করব? ─ শামসুজ্জোহা মানিক

লিখেছেনঃ শামসুজ্জোহা মানিক, আপডেটঃ July 24, 2015, 12:00 AM, Hits: 389


ভারতবর্ষ তথা দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীন ইতিহাসের খুব বেশীটাই এখনও রহস্যাবৃত হয়ে রয়েছে। তথ্যের অভাবে, প্রত্নতাত্ত্বিক খনন ও আবিষ্কারের অভাবে এবং ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী-সাম্রাজ্যবাদীদের উদ্দেশ্য প্রণোদিত ইতিহাস শিক্ষাদানের প্রভাবে উপমহাদেশের অতীত ইতিহাস নিয়ে বিভ্রান্তির সীমা নাই। ঋগ্বেদের উদ্ভট ও হাস্যকর ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে ইতিহাসের নামে তারা যা করেছিল তাকে তামাশার চূড়ান্ত বলা চলে। সিন্ধু সভ্যতার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আবিষ্কারের প্রায় একশত বৎসর হতে চলল, কিন্তু এখনও উপমহাশের সকল রাষ্ট্রের পাঠ্য পুস্তকে ভারতবর্ষে বহিরাগত(!), যাযাবর(!), বর্বর ও পশুপালক(!) আর্য আক্রমণ তত্ত্ব লিখা হয়। পণ্ডিত, রাজনীতিক কারও সাহস কিংবা ক্ষমতা হল না এই মিথ্যাকে প্রাতিষ্ঠানিক জায়গা থেকে বিদায় দিয়ে সত্যকে ইতিহাসের নূতন আঙ্গিকে তুলে ধরার।
 
কারণ ব্রিটিশ শাসকরা রাষ্ট্র শাসন থেকে বিদায় নিলেও তারা তাদের যে গোলামদের হাতে রাষ্ট্র দেখার ভার দিয়ে গিয়েছিল সেই গোলামরাই এখন পর্যন্ত উপমহাদেশের রাষ্ট্রগুলির দেখাশুনা করে যাচ্ছে। গোলাম তো গোলামই! তার গায়ের রং, ভাষা, চেহারা, ধর্ম যেমনই হোক। আগে মালিক ছিল ব্রিটেন, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর থেকে সেই মালিকের জায়গাটা নিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তবে সেটা রাজনৈতিক যতটা, ততটা জ্ঞানতাত্ত্বিক নয়। জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রভুত্ব বা মালিকানার জায়গাটা এখনও প্রধানতই ব্রিটেনের হাতে রয়েছে। বলা চলে ইঙ্গ-মার্কিন প্রভুদের দাসরাই এখন উপমহাদেশের সব জায়গার সংস্থাপন বা স্ট্যাবলিশমেন্ট দখল করে আছে। কারণ এখানে কোথায়ও প্রকৃত অর্থে জাতীয় বিপ্লব হয় নাই।
 
যাইহোক, এখনকার আলোচনার প্রেক্ষিত সেটা নয়। এখন আমার বলবার উদ্দেশ্য উপমহাদেশের মানুষ হিসাবে আমাদের অতীত ইতিহাস পুনরুদ্ধার করার এবং সেখান থেকে শিক্ষা ও প্রেরণা নিবার গুরুত্ব তুলে ধরা। অবশ্য এমন কথাও আমি বলতে শুনেছি, ‘অতীত জেনে কী হবে?’ তা ঠিক। যে স্রোতে ভাসা শ্যাওলার মত শুধু বর্তমানের স্রোতে ভেসে বেড়াতে পছন্দ করে অথবা যার অতীত শুধুই কলঙ্কমাখা তার অতীত জানার বা জানাবার প্রয়োজনটা কীসের? যার ভবিষ্যৎ নির্মাণের স্বপ্ন বা প্রয়োজন নাই তারও অতীত নিয়ে মাথা না ঘামালে চলে। কারণ উন্নততর ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য তার অতীত থেকে শিক্ষা নিবার প্রয়োজন নাই।
 
আমি আমাদের জাতির একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রয়োজন অনুভব করি। সুতরাং এই জাতির আগামী যাত্রাপথ নির্মাণের জন্য তার অতীত সন্ধান করি। কিন্তু এই জাতির অতীত বা ইতিহাসকে জানতে গিয়ে আমাকে সারা পৃথিবীর দিকে যেমন দৃষ্টি দিতে হয় তেমন আরও বেশী করে দৃষ্টি দিতে হয় এই উপমহাদেশের ইতিহাসের দিকে, যার সঙ্গে সুখ-দুঃখসহ আমার জাতির ইতিহাস অনেক বেশী ঘনিষ্ঠভাবে আবদ্ধ। আর এই ইতিহাসের সন্ধানে আমি মাঝে মাঝে উপস্থিত হই সিন্ধু সভ্যতায় কিংবা যেতে চাই তার থেকেও আরও দূর বিস্মৃত অতীতে। বিশেষত সিন্ধু সভ্যতার ঐতিহ্যের সঙ্গে ভাষা এবং আরও নানানভাবে আমাদের জাতির বন্ধন অনেক জোরালো বলে আমি সিন্ধু সভ্যতার উপর অনুসন্ধানকে এত গুরুত্ব দিই।

 
মধ্যযুগের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে ইউরোপ নবজাগরণের পথ ধরে আধুনিক যুগে যে যাত্রা করতে পেরেছিল সেটা কিন্তু সম্ভব হয়েছিল ভুলে যাওয়া অতীতকে খুঁজে পাবার ফলে এবং অতীতের বিস্মৃত গ্রীক জ্ঞানভাণ্ডারের পুনরুদ্ধারের ফলে। আমরা ইউরোপের অনুগামী হয়ে নূতন কালের উদ্বোধন বা যাত্রা কিছুই করতে পারব না। বরং ইউরোপের অনুগামী হয়ে থেকে আমরা তাদের যে দাসত্ব করে চলেছি তা-ই করে চলব। সুতরাং আমাদেরকে তাদের শিখানো পথ ত্যাগ করে নূতন পথ সন্ধান করতে হবে। আর সে ক্ষেত্রে আমাদের দেশের অতীত এবং আমাদের উপমহাদেশের অতীত আমাদের জন্য হয়ে উঠতে পারে বিপুল শক্তি ও প্রেরণার উৎস। অতীতের অন্ধ পূজারী না হয়েই সে কাজটা করা যায়।
 
আমি মনে করি যারা বাংলা ও বাঙ্গালী জাতির উন্নত ভবিষ্যৎ নির্মাণের স্বপ্ন দেখেন তাদের এই দিকটাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এবং এই গুরুত্ব শুধু আমরা যারা বাঙ্গালী শুধু তারা দিলে চলবে না উপরন্তু সমগ্র উপমহাদেশের সকল জাতি ও রাষ্ট্রকেও এই দিকটাতে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ বাংলাদেশসহ সমগ্র উপমহাদেশকে পাশ্চাত্যের দাসত্ব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে এবং তার একটি গৌরবোজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে হবে।

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
Archive