Banner
কালো টাকা সৃষ্টি ও পুঁজি পাচার রোধ এবং বাংলাদেশের বিদ্যমান অর্থব্যবস্থাকে উৎপাদনশীল অর্থনীতিতে রূপান্তরের সমস্যা ─ হাবিবুর রহমান

লিখেছেনঃ হাবিবুর রহমান, আপডেটঃ July 27, 2015, 12:00 AM, Hits: 340


ইউএনডিপি’র হিসাব মতে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর গড়ে ৩১০ কোটি মার্কিন ডলার এবং গ্লোবাল ফিনানসিয়াল ইনটিগ্রিটি’র হিসাব মতে প্রতিবছর গড়ে ১৫০ কোটি মার্কিন ডলার পাচার হয়ে গেছে। ইউএনডিপি’র হিসাবে গত চার দশকে বাংলাদেশ থেকে ৩ লক্ষ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। টিআইবি’র সর্বশেষ জরীপে দেখা যায় ২০১১-১২ অর্থ বছরে সেবা খাতে ২১ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকা ঘুষ লেনদেন হয়েছে যা ২০১১-১২ অর্থ বছরের জাতীয় বাজেটের ১৩.৬ শতাংশ এবং জিডিপি’র ২.৪ শতাংশ। টিআইবি’র সমীক্ষা অনুসারে বাংলাদেশে যে দুর্নীতির কারণে প্রতিবছর জিডিপি’র প্রায় ২-২.৫% ক্ষতি হচ্ছে তার প্রধান ক্ষেত্র হচ্ছে সরকারী ব্যয়। অথচ আমাদের সংবিধানে রাষ্ট্রের আয়ব্যয়কে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে, আদালতের এখতিয়ারের বাইরে রাখা হয়েছে। নানা ভাবে ব্যাংক থেকে টাকা লোপাট করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সেপ্টেম্বর ২০১২ প্রতিবেদন অনুযায়ী পুরো ব্যাংকিং খাতে খেলাপী ঋণের পরিমাণ ৩৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। কেবলমাত্র ২০ ঋণ খেলাপীর কাছেই ব্যাংকগুলোর পাওনা সাড়ে ঊনত্রিশ হাজার কোটি টাকা। ২০১৪-এর শেষ ভাগে এসে খেলাপী ঋণের পরিমাণ ৫৭ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে যা মোট বিতরণকৃত ঋণের সাড়ে এগার শতাংশের বেশী।হলমার্ক কেলেংকারির মতো নতুন নতুন ব্যাংক ঋণ কেলেংকারি বের হয়ে আসছে যা দুর্নীতির ভয়াবহতা জানান দিচ্ছে। নানা ফন্দি ফিকিরে রাজনৈতিক নেতা ও ব্যাংক কর্মকর্তার যোগসাজশে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করা হচ্ছে। বারবার পুঁজি বাজার থেকে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের টাকা লুট করে নিয়ে যাচ্ছে একদল দুষ্টচক্র। লক্ষণীয় বিষয় এ লুটপাটে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি – এ দু’দলের নেতাদের নাম বেরিয়ে এসেছে। রাজনীতির মাঠে এরা একে অপরের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও লুটপাটের মাঠে তারা একে অপরের সতীর্থ।

 

বাংলাদেশে ‘মিলেমিশে’ লুটপাট করার প্রচুর উদাহরণ পাওয়া যাবে। আবার সরকারের ছত্রছায়ায় বা চোখের সামনে দিয়ে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং কোম্পানিসহ বিভিন্ন হায় হায় কোম্পানি দ্বারা (এনজিওসহ) সাধারণ মানুষের পকেট থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা প্রতারণা করে নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, যে পরিমাণ পণ্য বিদেশে রফতানি হয় তার সমমূল্যঅর্থ দেশে ফিরে আসে না। রফতানি আয়ের একটি অংশ ওসব থেকে যায় যা অর্থ পাচারের পর্যায়ে পড়ে। এভাবে আমদানি-রফতানি প্রক্রিয়াকে কাজে লাগিয়ে প্রতি বছর কয়েক হাজার কোটি টাকা করে পাচার করা হচ্ছে। গবেষণাগুলো থেকে জানা যায়  মোট টাকা পাচারের ৩০-৪০ শতাংশ এভাবেই পাচার হয়ে থাকে। এ ছাড়া হুন্ডি, ট্রান্সফার প্রাইসিং ও অন্যান্য উপায়ে টাকা পাচার হয়। গত ৪০ বছরে ২ লক্ষ কোটি টাকার ওপরে বৈদেশিক ঋণ-অনুদান সহায়তা  এসেছে। বৈদেশিক ঋণ-অনুদান সহায়তার মাত্র ২৫-৩০ ভাগ সাধারণ মানুষের কাজে লাগে। বাকী ৭০-৭৫ ভাগ ক্ষুদ্র একদল সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর পকেট ভারী করে থাকে। এজন্য সরকারগুলো বৈদেশিক ঋণ-অনুদান পেতে লালায়িত থাকে।

 

ঘুষ-দুর্নীতি, অবৈধ ব্যবসা, চোরাকারবার, কালোবাজারি, লুটপাট ইত্যাদি উপায়ে কালো অর্থনীতির বলয় সৃষ্টি করা হয়েছে। এভাবে বছরে ৮০ হাজার কোটি টাকার বেশী কালো টাকা সৃষ্টি করছে যা জাতীয় আয়ের এক তৃতীয়াংশের বেশী। এই কালো টাকার একটি অংশ পাচার হয়ে যায়। এ কারণেই এদেশের সম্পদশালীদের সেকেন্ড হোম এখন আর গ্রাম বাংলা নয়। সেকেন্ড হোম হল মালয়েশিয়া, দুবাই, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশ। সুইস ব্যাংকে  বাংলাদেশীদের টাকা জমার পরিমাণ দিন দিন বেড়ে চলেছে। ২০১৩ সালে বৃদ্ধির হার ছিল আগের বছরের তুলনায় ৬২% বেশী। কালো টাকার আর একটি অংশ অবৈধ বা কালো ব্যবসায় বিনিয়োগ হয়। রিয়াল এস্টেট বা আবাসন খাতে বিনিয়োগ হতে দেখা যায়। তবে শিল্প ও কৃষি খাত তথা প্রকৃত উৎপাদনশীল খাতে এ টাকার বিনিয়োগ লক্ষণীয় নয়।


বর্তমানে বাংলাদেশে জিডিপি’র প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক ভাবে ভাল। তবে আমাদের রফতানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক শিল্পের মূল্য সংযোজন ও সামাজিক উপযোগ অত্যন্ত কম। এটি মৌলিক শিল্প নয়। জমি ও সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়, নির্মাণ ও অবকাঠামো উন্নয়ন, আবাসন খাতসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা তথা সেবা খাত জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধিতে প্রধান অবদান রাখছে। অর্থাৎ কৃষি ও শিল্প তথা মূল উৎপাদনশীল খাতের তুলনায় অনেক এগিয়ে আছে অনুৎপাদনশীল সেবা খাত। এভাবে বিকশিত হয়েছে একধরনের নিকৃষ্ট পুঁজি যা উৎপাদনশীল খাতের বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে অবদান রাখছে না। অর্থাৎ ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্প বিকশিত করছে না। আর বহাল রাখছে ক্ষুদে মালিকানা, বাধাগ্রস্ত করছে সামাজিক পুঁজির বিকাশ। এই নিকৃষ্ট পুঁজির সাথে নিবিড় সম্পর্ক থাকে কালো টাকার দাপট, কর্পোরেট পুঁজি ও বিদেশী সাহায্য নির্ভরতা এবং এসবের সহায়ক রাজনৈতিক কাঠামোর।

 

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান ধারা হল নিকৃষ্ট পুঁজি, লুটপাট ও দুর্নীতির কালো অর্থনীতি। আর এই নিকৃষ্ট পুঁজি ও কালো অর্থনীতি বজায় রাখা ও পুষ্ট করার জন্য একটি দুর্বৃত্তায়িত অগণতান্ত্রিক রাজনীতি বিকাশ লাভ করেছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর থেকে এ ধারাই ধীরে ধীরে পুষ্ট হয়ে আজ সর্বগ্রাসী রূপ নিয়েছে। এই নিকৃষ্ট পুঁজি, লুটপাট ও কালো অর্থনীতির প্রতিনিধিরাই সংসদ নিয়ন্ত্রণ করছে। দিনে দিনে সংসদে তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি লাভ করছে। গত ৪২ বছর ধরে যারা দেশ শাসন করেছে এবং গত ২৩ বছর ধরে যে দ্বিদলীয় সরকার ব্যবস্থা কায়েম আছে তারা মূলতঃ নিকৃষ্ট পুঁজি, লুটপাট ও কালো অর্থনীতির ধারক ও বাহক। তাই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সামন্ত উৎপাদন সম্পর্কের ক্ষয় হলেও চিরায়ত পুঁজি প্রধান হয়ে উঠতে পারেনি, পুঁজিতান্ত্রিক উৎপাদন সম্পর্ক দৃঢ় ভিত্তি পায়নি।

 

অনেকে বলে থাকেন, দুর্নীতির মাধ্যমে পুঁজির সঞ্চয়ন হয় বা পরিগঠন হয়। এ পুঁজি উৎপাদনমূলক কর্মকাণ্ডে বিনিয়োজিত হয়ে উৎপাদনশীল অর্থনীতির বিকাশ ঘটায়। তবে অন্তত বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ নিয়ম প্রযোজ্য হতে দেখা যায়নি। বাংলাদেশে কালো টাকা শিল্পে বিনিয়োগ হয় না বললেই চলে। যদিও কালো টাকা সাদা করার সুযোগ সব সরকারই দিয়ে আসছে। তবে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া হলেও তা সাধারণত উৎপাদনশীল খাত তথা শিল্প খাতে বিনিয়োগের অনুমতি দেয়া হয় না।

 

কালো টাকা প্রধানত জমি ও সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়, নির্মাণ ও অবকাঠামো উন্নয়ন, আবাসন খাতে বিনিয়োগ হয়ে থাকে। তবে এসব খাতেও কালো টাকা সাদা করার পরিমাণ প্রতি বছর কালো টাকা সৃষ্টির তুলনায় অনেকগুণ কম। দেশের রাজনীতি স্থিতিশীল না থাকায় এবং প্রতিহিংসার রাজনীতি বিদ্যমান থাকায় টাকার মালিকেরা কালো টাকা বিনিয়োগে সাহসী হয় না। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে ২০০৭-০৮-এর তত্ত্বাবধায়ক সরকার বেশ কয়েকজন কালো টাকার মালিকদের অর্থদণ্ড দিয়েছিল। এধরনের পরিস্থিতি আবারও হতে পারে এমন আশংকা এদের রয়েছে। অবশ্য এদেশে শিল্পে বিনিয়োগ এমনিতেও কম হয়ে থাকে। কেননা, পুঁজি বিনিয়োগের পরিবেশ নেই বা সংকুচিত। বিশেষ করে শক্তি সংকট, চাঁদাবাজি, আমলাতান্ত্রিক হয়রানি, প্রকট ঘুষ-দুর্নীতি এবং সেই সাথে উচ্চ সুদের ব্যাংক ঋণ উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করে থাকে। আর এসবের জন্য দায়ী দেশের জন্মলগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ক্ষমতাসীন থেকেছে তাদের অনুসৃত অর্থনীতিক নীতি।

 

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতি এমনভাবে পরিচালিত যা জাতীয় অর্থনীতিতে স্থানীয় উৎপাদনশীল পুঁজির ভুমিকাকে গৌণ করে রাখছে। এই নীতির পরিবর্তন ঘটাতে হবে। এক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ বাজারের উপর স্হানীয় উৎপাদনশীল পুঁজির কর্তৃত্ব এবং স্থানীয় উৎপাদনশীল পুঁজির ধারকদের হাতে উদ্বৃত্ত মূল্যের সঞ্চয়ন যেমন নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি উৎপাদনশীল বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উৎপাদনের উপায় নির্মাণকারী স্থানীয় শিল্পের সঙ্গে ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী স্থানীয় শিল্পের ভারসাম্যপূর্ণ বিকাশ নিশ্চিতকরণে গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি বৈদেশিক বাজার নির্ভর শিল্পে বিকাশের সুযোগও গ্রহণ করতে হবে।

 

আমাদের অর্থনীতির উৎপাদনশীল রূপান্তরের প্রধান বাধা উৎপাদনশীল পুঁজির ভুমিকা গৌণকারী ও ক্ষুদে মালিকানা রক্ষাকারী বাংলাদেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক নীতি, এই বিস্তৃত নিকৃষ্ট পুঁজি, লুটেরা ও কালো অর্থনীতি, বিদ্যমান আমলাতন্ত্র এবং এগুলোর ধারক-বাহক অগণতান্ত্রিক শাসক শ্রেণী যারা ৪২ বছর ধরে এদেশ শাসন করে আসছে। এইক্ষুদে মালিকানা রক্ষাকারী ও লুটেরা-কালো অর্থনীতি এবং সন্ত্রাস-স্বৈরতন্ত্র পরস্পর পরিপুরক। আমাদের অর্থনীতির উৎপাদনশীল রূপান্তরের বাধা অপসারণ করা হল অগ্রসর রাজনীতির প্রধান কর্তব্য। এ বাধা অপসারণ করতে গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিকাশ ঘটাতে হবে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ছাড়া উৎপাদনশীল অর্থনীতিকে যেমন প্রধান ধারায় রূপান্তর করা সম্ভব নয়, তেমনি উৎপাদনশীল পুঁজির প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা ছাড়া গণতন্ত্র টেকসই হয় না।  

 

সাম্প্রতিক পোষ্টসমূহ