Banner
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় স্থানীয় শাসন নয়, চাই স্বশাসিত স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা ̶ হাবিবুর রহমান

লিখেছেনঃ হাবিবুর রহমান, আপডেটঃ November 4, 2015, 12:00 AM, Hits: 329

 

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচন দলীয়ভাবে করার সিদ্ধান্ত নেয়ার পর থেকে এর পক্ষে-বিপক্ষে প্রচুর বিতর্ক চলছে – টকশোতে, নিবন্ধ  এবং বক্তৃতা-বিবৃতির মাধ্যমে। এসব বিতর্কের বিষয়বস্তু সীমাবদ্ধ মুলত কোনটি ভালো – দলীয়ভাবে নির্বাচন, না আগেকার পদ্ধতির নির্দলীয় নির্বাচন - এর মধ্যে। দলীয়ভাবে নির্বাচনের পক্ষের যুক্তি হল -


১. স্থানীয় নির্বাচন নির্দলীয় ভাবে হবার নিয়ম থাকলেও বাস্তবে প্রধানত দলীয় পরিচয়ে নির্বাচন হয়ে থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলো প্রার্থীকে সমর্থন দেয়, প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালায়। তাহলে আইন করে দলীয় প্রতীক ব্যবহার, দলীয় ভাবে নির্বাচন করলে ক্ষতি কি ?


২. এতে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক পদ্ধতির ভাবনা তৃণমূলে সম্প্রসারিত হতে সহায়তা করবে। গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে।


৩. দলীয় প্রতীক ব্যবহার করে নির্বাচন করলে নির্বাচনটি হবে ‘রাজনৈতিক’, ফলে নির্দলীয় নির্বাচনের মাধ্যমে ‘বিরাজনীতিকরণের’ পথ রুদ্ধ হবে।


৪. দলীয় ভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পক্ষে আরেকটি জোরালো যুক্তি হল, এর ফলে রাজনীতিতে দলের শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হবে, ক্ষমতাসীন দল তার নির্বাচনী কর্মসূচি যথাযথ বাস্তবায়ন করতে পারবে। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সরকারি নীতিমালা অনুসরণ এবং নির্দেশনাবলী বাস্তবায়নে অধিক মাত্রায় আগ্রহী হবেন।

 

অন্যদিকে বিপক্ষদের যুক্তি হল -


১. দলীয় কারণে জাতীয় নির্বাচনে যে ধরনের হানাহানি ঘটে, এখন স্থানীয় নির্বাচনেও তার সম্প্রাসরণ হবে।


২. কোন দল করেন না অথচ জনপ্রিয় এমন ব্যক্তিবর্গ দলভিত্তিক নির্বাচন হলে নির্বাচনে লড়বেন না বা তাদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ কমে যাবে।


৩. ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান  স্থানীয় বিচার করে থাকে। দলীয় চেয়ারম্যানের পক্ষে নিরপেক্ষ বিচার করা সম্ভব নয়।


৪. এমনিতেই স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কেন্দ্রীয় সরকার তথা কেন্দ্রীয় প্রশাসনের অযাচিত হস্তক্ষেপের কারণে তারা স্বাধীন ভাবে কাজ করতে পারে না, এখন দলের অযাচিত হস্তক্ষেপের ভারও বইতে হবে। জনগণের প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে ওঠার ন্যুনতম সম্ভাবনা থাকবে না।


৫. স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় হওয়ায় প্রশাসন নির্বাচনে একধরণের নিরপেক্ষ অবস্থান নেয়ার চেষ্টা করে থাকে। দলীয় ভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হলে প্রশাসনের এরূপ নিরপেক্ষতাও থাকবে না।


৬. দলীয় প্রতীক ব্যবহার করে নির্বাচন করলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও মনোনয়ন বাণিজ্য চালু হবে ও বৃদ্ধি পাবে।


৭. দলভিত্তিক স্থানীয় নির্বাচনের জন্য গণতান্ত্রিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক দল অপরিহার্য। দুর্ভাগ্যবশত শাসক দলগুলো এই কাতারে পড়ে না। এসব দলগুলোর অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের চর্চা হয় না। এই অবস্থায় দলভিত্তিক স্থানীয় নির্বাচন দলের নামে দলাদলি ও মারামারি তৃনমূল পর্যায় পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে।


৮. স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচনের যে পদ্ধতি বা কনভেনশন চলে আসছে তা অনেক দিনের পুরনো এবং এর গ্রহণযোগ্যতা সর্বজনবিদিত।

 

মূল আলোচনায় যাওয়ার পূর্বে আর একটিবিষয়ের আলোচনা সেরে নেয়ার প্রয়োজন মনে করছি। তা হল, নতুন পদ্ধতিতে মেয়াদ উত্তীর্ণ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর ফলে সরকার নির্বাচন যথাসময়ে না দিয়ে পছন্দমাফিক দলীয় লোকদের প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে পারবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন প্রশ্নে আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রধান যুক্তি ছিল, একটি গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় এক মুহূর্তের জন্য অনির্বাচিত ব্যক্তি দ্বারা সরকার পরিচালিত হওয়ার সুযোগ থাকতে পারে না। তা হলে একই যুক্তিতে নিশ্চয়ই স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোও এক মুহূর্তের জন্য অনির্বাচিত ব্যক্তি দ্বারা পরিচালিত হওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়। ফলে সরকারের অভিসন্ধি নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। তাই বিপক্ষ যখন যুক্তি দেখান এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে  ক্ষমতাসীন দল স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান গ্রাস করে ফেলবে, এটা হল কর্তৃত্ববাদী শাসনের নতুন কৌশল – তা অস্বীকার করা যায় না। (সমালোচনার মুখে মন্ত্রীসভায় গৃহীত প্রস্তাব থেকে মেয়াদ উত্তীর্ণ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগের ব্যবস্থা সরকার প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এখন দেখা যাক চূড়ান্তভাবে তা বাতিল হয় কি না ?)

 

সুপ্রাচীন কাল থেকেই গ্রাম বাংলার গণমানুষের নিজস্ব ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অঞ্চল  ভিত্তিতে বিচ্ছিন্ন বিচ্ছিন্ন অর্থনৈতিক-সামাজিক এককসমূহের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হত । এসব স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থনৈতিক-সামাজিক এককগুলো পরিচালিত হত স্থানীয় স্বশাসিতসরকার ব্যবস্থার গণসংস্থাসমুহকে অবলম্বন করে। এটাই প্রাচীন বাংলার  স্বয়ংসম্পূর্ণ অনড় গ্রাম সমাজের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। রাজ্যের-সাম্রাজ্যের ভাঙ্গা-গড়া, উত্থানপতন বা রাজার পরিবর্তন এসব সংস্থায় মৌলিক কোন প্রভাব ফেলে নি। কৌটিল্যের অর্থশাস্র গ্রন্থ থেকে জানা যায়, মৌর্য ও মৌর্যপূর্ব যুগে (খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৪ – ১৮৩ অব্দে) গ্রামের বিশিষ্ট পরিবারের প্রবীণদের দ্বারা একটি পরিষদ গঠিত হত যারা স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামের প্রশাসনের কাজ চালাত। অনড় স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম সমাজ তথা স্থানীয় স্বশাসিতসরকার ব্যবস্থার ওপর বড় আঘাত আসে ব্রিটিশ ঔপেনিবেশিক শাসকদের দ্বারা। ঔপেনিবেশিক  কর্তৃত্বকে সর্বব্যাপী প্রসারিত করার রাজনৈতিক প্রয়োজনে তারা গ্রামের স্বশাসন ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। ঔপেনিবেশিক ধারাবাহিকতায় স্বাধীন বাংলাদেশে ও আমলাতান্ত্রিক কায়দায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালিত হচ্ছে। ঐতিহ্যগত ও ঐতিহাসিকভাবে ব্রিটিশ ঔপেনিবেশিক শাসনামলের ইউনিয়ন পরিষদ যেভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে, তার সাথে কোনভাবেই গণতান্ত্রিক ও স্থানীয় চেতনার  কোন সম্পর্ক নেই।  এ সংস্থাগুলো কোন সময়েই জনগণের গণতান্ত্রিক চেতনা বিকাশে ও গণতান্ত্রিক চর্চায় কোন ভূমিকা পালন করে নি, এবং বর্তমানেও করছে না। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় জাতীয় পর্যায়ে যেমন একজনের হাতে সকল ক্ষমতা ন্যস্ত করা হয়েছে, তেমনি স্থানীয় পর্যায়েও একজনের হাতেই ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে। অর্থাৎ জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায় – সর্বত্রই স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা সর্বব্যাপী প্রসারিত করার রাজনৈতিক প্রয়োজনেই ক্ষুদে ক্ষুদে স্বৈরশাসকে দেশ ছেয়ে দেবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাই স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার বর্তমান ক্ষমতা কাঠামো অক্ষুণ্ণ রেখে, কেন্দ্রীয় প্রশাসনের সম্প্রসারণের অংশ করা স্থানীয় শাসনের ভাবদর্শন বজায় রেখে নির্বাচন পদ্ধতির পরিবর্তন তৃণমূল পর্যায় থেকে উচ্চতর কোন স্তরেই গণতান্ত্রিক চেতনার বিকাশ ও চর্চায় সহায়ক হতে পারে না, হবে না।

 

এসব তর্ক-বিতর্কে স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোর ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গ খুব কমই আলোচিত হয়েছে। পক্ষ-বিপক্ষের আলোচনা থেকে মনে হবে এসব প্রতিষ্ঠান যথেষ্ট ক্ষমতাবান, শুধু প্রয়োজন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। বাস্তবে স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলো নখদন্তহীন বাঘ ছাড়া আর কিছুই নয়। অথচ স্থানীয় শাসনকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে সংসদকে আইন প্রণয়নের দায়িত্ব দেয়া আছে, কিন্তু ‘সংসদ’ স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাতো দূরের কথা, নির্বাচিত স্থানীয় শাসন ব্যবস্থা যাতে গড়ে না ওঠে তার জন্য বিভিন্ন প্রকার আইনকানুন প্রণয়ন করেছে এবং তা বহাল রেখেছে। সংবিধানের ৫৯(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আইন অনুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহের উপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক এককাংশের স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান করা হইবে।  কিন্তু এখনো (সংবিধান প্রণয়নের ৪৩ বছর পরেও)  জেলা পর্যায়ে  নির্বাচিত  শাসনব্যবস্থা গড়ে ওঠে নি।  সংবিধানে গ্যারান্টি ক্লজ নেই, ফলে সরকার নির্বাচন দিতে বাধ্য নয়। ক্ষমতাহীন স্থানীয় সরকার দলীয়ভাবে নির্বাচিত হোক আর নির্দলীয়ভাবে নির্বাচিত হোক তাতে জনগণের কি আসে যায়? অবশ্য বর্তমান অগণতান্ত্রিক ক্ষমতা কাঠামো বজায় রেখে স্হানীয় সরকার সংস্থাগুলো ক্ষমতাবান করা হলেও এগুলো জনগণের প্রতিষ্ঠান হবে না, বরং স্বৈরতন্ত্রের হাতকে শক্তিশালী করবে ।

 

তবে যে বিষয়ে কোন ধরনের তর্ক-বিতর্ক হচ্ছে না তা হল এগুলো কি প্রকৃত অর্থে স্থানীয় সরকার সংস্থা, না কি সরকারের নির্বাহী বিভাগের শাখা বা কেন্দ্রীয় প্রশাসনের শাখা বা সম্প্রসারণ। স্থানীয় সরকার সংস্থা হলে এগুলো গণতান্ত্রিক কি না, এগুলোর ওপর জনগণের কর্তৃত্ব বজায় থাকছে কি না তার আলোচনা পর্যালোচনা হওয়াটা অতীব জরুরী। বস্তুত এগুলোকে জনগণের প্রতিষ্ঠান তথা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার আকুতি এবং নির্দেশনা এসব তর্ক-বিতর্কে খুঁজে পাওয়া যাবে না। অথচ রূপের দিক দিয়ে, চর্চার দিক দিয়ে গণতন্ত্র হল রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্তর থেকে নিম্নতম স্তর পর্যন্ত গণতান্ত্রিক ক্ষমতা কাঠামো প্রতিষ্ঠার বিষয়। তা সম্ভব হলেই মাত্র শাসন ব্যবস্থায় জনগণের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, তথা নিজেরাই নিজেকে শাসন করতে পারে যা গণতন্ত্রের মর্ম কথা।

 
আলোচনাগুলোতে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ এবং পৌরসভাগুলোকে স্থানীয় সরকার সংস্থা বা ব্যবস্থা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।  অথচ বাংলাদেশের  সংবিধানের ৫৯ এবং ৬০ নং অনুচ্ছেদে স্থানীয় শাসনের ধারণা দেয়া আছে। আমাদের মূল সংবিধান ইংরেজিতে লেখা, পরে বাংলায় অনুবাদ করা হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাংলা অনুবাদ প্রশ্নবিদ্ধ হলেও বাংলায় অনুবাদকৃত সংবিধানকেই আইনসিদ্ধ করা হয়েছে। সংবিধানের ৫৯ এবং ৬০ নং অনুচ্ছেদে ইংরেজিতে লেখা local government এর বাংলা অনুবাদ করা হয়েছে স্থানীয় শাসন, স্থানীয় সরকার নয়। এ জন্য স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোকে সংবিধান মোতাবেক কেন্দ্রীয় প্রশাসনের শাখা বা সম্প্রসারণ হিসেবে দেখা হয়ে থাকে। বস্তুত বাংলাদেশে বর্তমানে একটি মাত্র সরকার ব্যবস্থা রয়েছে, তা হল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। তাই কেন্দ্রীয় সরকার ও স্থানীয় সরকার প্রত্যয় দুটি ব্যবহৃত হওয়া উচিত নয়। কেননা, বাস্তবে একটি সরকার ব্যবস্থাই কাজ করছে। স্থানীয় সরকার সংস্থা হিসেবে যেগুলোকে দেখানো হচ্ছে সেগুলো প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশ সরকারের নির্বাহী বিভাগের শাখা হিসেবে কাজ করছে। এভাবে প্রকৃত সত্যকে আড়াল করা হচ্ছে। এই ধারণার বিপরীতে স্থানীয় সরকারের ধারণা গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য সংবিধানের ৫৯ এবং ৬০ নং অনুচ্ছেদের বাংলা অনুবাদ সংশোধন করতে হবে। সরকারকে জাতীয় ও স্থানীয় দুই স্তরে বিভক্ত করে জাতীয় সরকার ও স্থানীয় সরকারের দায়িত্ব, কর্তব্য, সীমারেখা ইত্যাদির স্পষ্ট রূপরেখা গড়ে তুলতে হবে।

 

প্রশাসনের ওপর জনগণের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। গণতন্ত্রে জনগণ নিজেই নিজেকে শাসন করে, অর্থাৎ প্রতিনিধি নির্বাচিত করে তাদের মাধ্যমে শাসন করে।  তাই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে  স্থানীয় শাসনের বদলে নির্বাচিত স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। স্থানীয় প্রশাসনকে স্থানীয় সরকারের কাছে জবাবদিহিতে বাধ্য করার প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করতে হবে। এবং স্থানীয় সরকারকে জনগণের কাছে সরাসরি জবাবদিহিতে বাধ্য করার জন্য নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ‘রি-কল’সহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কেন্দ্রীয় সরকারের মতো স্থানীয় প্রশাসন, স্থানীয় সংসদ ও স্থানীয় আদালত সম্বলিত ‘সরকার কাঠামো ‘ স্থাপন করতে হবে। স্থানীয় সরকারের কাছে স্থানীয় জন শৃঙ্খলা রক্ষা, উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে স্থানীয় করারোপ ও বাজেট প্রণয়নের ক্ষমতা প্রদান করতে হবে। স্থানীয় বিরোধ মীমাংসার আইনী ও বিচারিক দায়িত্বও স্থানীয় সরকারের ওপর ন্যস্ত করতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদিত পণ্যের ন্যুনতম মূল্য নির্ধারণসহ স্থানীয় পর্যায়ের প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের মাধ্যমে জনগণের জীবনমান উন্নয়নও প্রাকৃতিক সম্পদের ভারসাম্য রক্ষার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কার্যকর ভুমিকা পালনের আইনী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। জাতীয় সরকারের বাজেট প্রণয়নে ও বাস্তবায়নে স্থানীয় সরকারের তদারকি ও অংশগ্রহণের ব্যবস্থা রাখতে হবে।

 

সুষ্ঠু নির্বাচন জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটায়।  কিন্তু আইনগত ভাবে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো কেন্দ্রীয় প্রশাসনের শাখা বা সম্প্রসারণ হিসেবে বিবেচিত হলে শতভাগ সুষ্ঠু নির্বাচনেও এগুলো জনগণের প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠবে না। নির্বাচন – দলভিত্তিক হোক বা নির্দলীয় হোক – এটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে দুই পদ্ধতিতেই নির্বাচন হতে দেখা যায়। তাই যারা যুক্তি দেখান যে নির্দলীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বিরাজনীতিকরণ হয় তাদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নেই। আবার ঐতিহ্যের নামে  অগণতান্ত্রিক ক্ষমতা কাঠামো বহাল রাখা গ্রহণযোগ্য নয়। এটা পরিষ্কার, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার, সঠিকভাবে বললে স্থানীয় শাসন ব্যবস্থার বর্তমান ক্ষমতা কাঠামো অক্ষুণ্ণ রেখে, প্রচলিত পদ্ধতি বা নতুন পদ্ধতি – কোনটি দ্বারাই এগুলো গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠবে না।

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
Archive