Banner
অযোগ্য শাসকদের যাঁতাকলে বাংলাদেশ : বিজয়ের ৪৪ বছরের সাতকাহন ─ জাহিদ হাসান

লিখেছেনঃ জাহিদ হাসান, আপডেটঃ December 31, 2015, 12:00 AM, Hits: 330

এই বছরের ১৬ ডিসেম্বরে আমরা ৪৫তম বিজয় দিবস উদ্‌যাপন করেছি। আর ৫ বছর পর আমরা ৫০তম অর্থাৎ স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করব। ৪৪ বছরের অনেক লম্বা সময় পার করে আজ আমরা যেখানে এসে দাঁড়িয়েছি সেখান থেকে স্বাধীনতাপূর্ব বাংলাদেশ তথা পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার সাথে আজকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার যদি একটা আবেগহীন ও বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনা ও তুলনা করতে পারি তবেই তা হবে স্বাধীনতার ৪৪ বছরের সত্যিকার মূল্যায়ন। আত্মোপলব্ধি, আত্মসমালেচনা এবং অতীত ও বর্তমানের যুক্তিসংগত বিচার-বিশ্লেষণের মধ্য দিয়েই একটা জাতি তথা দেশ ভুল-ত্রুটি সংশোধন করে ভবিষ্যৎ অগ্রগতির জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারে। অহমিকা, আবেগ-তাড়িত মনোভাব ও সান্ত্বনামূলক আত্ম-তৃপ্তি বা সন্তুষ্টি নিয়ে আর যাই হউক বাস্তবতাকে উপলব্ধি করা, প্রকৃত সত্যকে উম্মোচন করা ও কাংখিত লক্ষ্যে কখনও পৌছানো যায় না।

 

স্বাধীনতার আগে নেতারা আমাদেরকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল এই বাংলা (পূর্ব বাংলা)-কে “সোনার বাংলায়” পরিণত করবে অর্থাৎ আমরা অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জন করব, আমরা গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি করে মানুষের মত প্রকাশের তথা বাক স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করব, মানুষে মানুষে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে একটা শোষণ ও বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলব, সকল ধর্ম ও জাতিগোষ্টির সম-অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করব, সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করে মানবিক মূল্যবোধকে জাগ্রত করব, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করব, বাংলা ভাষা ও বাংগালী সংস্কৃতিকে মনে প্রাণে ধারণ করে শ্রেষ্ঠ বাংগালী জাতি হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াব, বাংলার শাশ্বত প্রকৃতি ও রূপকে সংরক্ষণ করে এই বাংলাকে সত্যিই প্রকৃত সোনার বাংলায় সাজিয়ে তুলব। বাংগালী জাতির উল্লেখিত স্বপ্ন, আদর্শ ও লক্ষ্য পূরণে একমাত্র বাধাই ছিল তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান অর্থাৎ পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী। তাই তাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম শেষে সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছি - যার বয়স এখন ৪৪ বছর। অতএব, আজকের বাংলাদেশকে দেখতে হবে ৪৪ বছরে আমাদের শাসকরা স্বাধীনতাপূর্ব স্বপ্ন, আদর্শ ও লক্ষ্য পূরণে অর্থাৎ বাংলাদেশকে সোনার বাংলায় পরিণত করার ক্ষেত্রে কতটুকু সফল হয়েছেন। আর যদি প্রকৃত অর্থে (রাজনৈতিক বুলি হিসেবে নয়) সোনার বাংলায় পরিণত করায় সফল হয়ে না থাকেন তবে দেখতে হবে, খুঁজতে হবে, বুঝতে ও মেনে নিতে হবে তাদের ব্যর্থতা কোথায় এবং কেন ?

 

স্বাধীনতার পূর্বে আমাদেরকে বুঝানো হয়েছিল তৎকালীন পাকিস্তানের মূল অর্থনৈতিক শক্তিই ছিল আমাদের বাংলার প্রধান সম্পদ পাট, চা ও চামড়া। আমাদেরকে বঞ্চিত করে পাকিস্তানী শাসকরা মূলত এই তিন খাতের আয় দিয়েই পশ্চিম পাকিস্তানকে গড়ে তুলছিল। কিন্তু পাকিস্তানী শাসকদের কাছ থেকে পূর্ব বাংলাকে মুক্ত করে দীর্ঘ ৪৪ বছরে আমরা আমাদের পাট সম্পদকে (যাকে বলা হত সোনলী আঁশ) ধ্বংস করেছি, বাংলার পাট চাষীরা এখন মৃতপ্রায়, পাটকে এখন তাদের গলার ফাঁশ বলা হয়, কোন কোন বছর পাট চাষীরা পাটের ন্যয্য মূল্য না পেয়ে মনের দু:খে কষ্টে-উৎপাদিত পাটকে আগুনে পুড়িয়ে ফেলে। অথচ স্বাধীনতার পূর্বে ১৯৬৯ - ৭০ অর্থবছরেও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (আজকের বাংলাদেশের) পাটখাতে আয় ছিল ৩০০ কোটি টাকা (যা আজকের মূল্যমানে ৩০ হাজার কোটি টাকারও বেশী)। সারা পৃথিবীতে এখন প্লাস্টিক ও পলিথিনের পণ্য ব্যবহারের পরিবর্তে প্রাকৃতিক কাঁচা মালের তৈরী পণ্যের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে - যেখানে আজ আমাদের নিজস্ব কৃষিজ সম্পদ পাটের চাহিদার সম্ভাবনা ছিল সবচেয়ে উজ্জ্বল। বর্তমানে আমাদের দেশে পাট উৎপাদিত হয় বছরে ৭০-৭৫ লাখ বেল, বাংলাদেশ জুট এসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী ২০১২-১৩ অর্থবছরে পাট রপ্তানী হয়েছে ২০ লাখ ৫৫ হাজার ৪৩২ বেল, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ২৪ হাজার ২১৫ বেল, অর্থাৎ গত ৪/৫ বছরে পাটের রপ্তানী কমেছে ৫৭%, ফলে অনেক জুট প্রেস বন্ধ হয়ে গেছে, বেকার হয়েছে হাজার হাজার শ্রমিক/কর্মচারী, কি কারণে এখন আবার সরকার পাট রপ্তানী অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত পাট খাতে দুর্নীতি, জাতীয়করণের মত ভুল সিদ্ধান্ত ও অযোগ্য ব্যবস্থাপনার কারণে বিশ্বের সর্ববৃহৎ পাটকল আদমজীসহ দেশের বলতে গেলে সব কয়টা পাটকলকেই লোকসান দিতে দিতে শেষ পর্যন্ত বন্ধ করে দিতে হয়েছে। এ মাসের ২১ তারিখের দৈনিক ইত্তেফাকের খবরে প্রকাশ নানা সংকটে পড়ে খুলনা-যশোর শিল্প এলাকার ৩টা জুটমিল বন্ধ হয়ে গেছে, আরো কয়েকটা বন্ধের দারপ্রান্তে, ফলে কয়েক হাজার শ্রমিক-কর্মচারী বেকার হয়ে পড়েছে। আমরা এখন পাটের জন্ম ইতিহাস আবিষ্কার করে বিশ্বে রেকর্ড সৃষ্টি করার প্রচার ও প্রচারণা নিয়ে পুলকিত হচ্ছি, কিন্তু প্রকৃত অর্থে পাট সম্পদের উন্নয়ন ও পাটচাষীর কল্যাণের জন্য কার্যকর ও ফলপ্রসূ উদ্যোগ ও পরিকল্পনার কোন লক্ষণ নাই।

 

এইতো গেল পাটের অবস্থা। স্বাধীনতার আগে যেখানে আমাদের এখান থেকে বিদেশে চা রপ্তানী হত, এখন দেশের চাহিদা মেটানোর জন্য চা আমদানী করা হচ্ছে, চামড়া শিল্পও কোন রকমে টিকে আছে। বাংলাদেশ রপ্তানী উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য মতে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পন্য রপ্তানীর লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে মাত্র ১২৮ কোটি ২৮ লাখ মার্কিন ডলার, কিন্তু প্রথম ৫ মাসে তা বিগত অর্থবছরের চেয়ে ১.৮১% কম। বর্তমান ট্যানারী শিল্পকে ৪৪ বছরেও কোন সরকার ঢাকার হাজারীবাগ থেকে নির্দ্ধারিত স্থান কালিয়াকৈরে স্থানান্তর করে পরিকল্পিত ও আধুনিকভাবে পুন:স্থাপনের কাজটা সমাধা করতে পারেনি। যে পাট, চা ও চামড়ার আয় দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানকে গড়ে তোলা হচ্ছিল, স্বাধীনতার পর এই তিন খাত আমাদের হাতে আসার পর এই তিন খাতের আয় দিয়েত বাংলাদেশকে সোনার বাংলায় পরিণত করা যেত। আসলে বিগত ৪৪ বছরের শাসনকাল পর্যালোচনা করলে আমাদের শাসকদের তথা যারা দেশ পরিচালনা করছে তাদের এই ক্ষমতা বা যোগ্যতা এমনকি ইচ্ছা ছিল বলেও আমরা বিশ্বাস করতে পারছি না। স্বাধীনতাপূর্ব ঢাকার আদমজী শিল্পনগরী, ডেমরা শিল্পনগরী, কাঞ্চন শিল্পনগরী, নারায়নগঞ্জের ফতুল্লা/গোদনাইল শিল্প এলাকা এবং খুলনার খালিশপুর শিল্প এলাকা অর্থনৈতিক কর্মচাঞ্চল্যে ছিল মুখর, এখন এসব এলাকা মৃত ও পরিত্যক্ত। আগে আমাদের চিনি আমদানী করতে হত না, এখন চিনিকল প্রায় সবই বন্ধ, খুলনা নিউজপ্রিন্টের কাগজই সংবাদপত্রের জন্য পর্যাপ্ত ছিল, এখন তাও প্রায় অচল। এই কি বাংলাদেশের সামনে এগিয়ে চলা ?

 

স্বাধীনতার প্রধানতম স্বপ্ন ছিল অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে একটা শোষণহীন সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলব। ৪৪ বছরের পরেও কি তা সম্ভব হয়েছে ? স্বাধীনতার পূর্বে বলা হত পুরো পাকিস্তানের ২২ পরিবার দেশ ও জনগণকে শোষণ করছে, স্বাধীনতার পর এখন আমাদের দেশে ২২ লাখেরও বেশী কোটিপতি পরিবার হয়েছে, শোষণ আগের চেয়ে আরো ভয়াবহভাবে বেড়েছে। অপরদিকে বিভিন্ন খাতে হাজারো পণ্যের উপর (এমনকি শিক্ষার উপরও) বিভিন্ন মাত্রার কর, ভ্যাট আরোপের মাধ্যমে এবং জ্বালানী তেল, বিদ্যুৎ ও গ্যাস এর মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি করে সরকারও প্রকৃতপক্ষে জনগণকে আরো বেশী শোষণ করছে /  গলা টিপে ধরেছে। দেশের নিজস্ব কৃষিজ বা খনিজ সম্পদের উপর অর্থনীতিকে দাড় করাতে ব্যর্থ হওয়াতেই পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতির বাস্তবতায় বেঁচে থাকা বা টিকে থাকার জন্য দেশের জনগণ (বেসরকারী উদ্যোগতারা ) ধীরে ধীরে পোষাক শিল্প ও জনশক্তি রপ্তানী খাতকে আজ দেশের সর্ববৃহৎ রপ্তানী আয়ের উৎস হিসেবে গড়ে তুলেছে। এ ব্যাপারে বিভিন্ন সময়ের সরকার বা শাসকরা তাদের উপর অর্পিত রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হিসেবে প্রয়োজনীয় সাহায্য-সহযোগিতা করেছে সত্য কিন্তু পাট, চা আর চামড়া খাত ধ্বংস হওয়ার পর গদি নিয়ে কাড়া-কাড়ি / মারা-মারি এবং দুর্নীতি আর রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট-পাট করা ছাড়া দেশের অর্থনীতির জন্য বিকল্প খাত বা উৎস খুজে বের করা বা সৃষ্টি করার মত কোন যোগ্যতা বা দক্ষতা দেখাতে পারে নাই।

 

বৈদেশিক সাহায্য ও ঋণে পরিচালিত প্রকল্প খাতেও দুর্নীতি ও অব্যস্থাপনা এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে দেশে বিদেশী বিনিয়োগ মারাত্মকভাবে কমে গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিনিয়োগ বোর্ডের তথ্য মতে ২০১৪ সালে বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগ এসেছে মাত্র ১৬০ কোটি ডলার, সেই তুলনায় আমাদের প্রতিবেশী একটা অগনতান্ত্রিক দেশ মিয়ানমারেও ২০১৪ সালে বিদেশী বিনিয়োগ এসেছে ৮০০ কোটি ডলার, ভিয়েতনামে এই সময়ে ৭২০ কোটি ডলার। দৈনিক কালের কন্ঠের ৮ ডিসেম্বরের এক প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল “বিনিয়োগে হাহাকার”, এফবিসিসিআই এর সভাপতি বলেন বিনিয়োগের বড় বাধা হল গ্যাস-বিদ্যুতের অভাব, জমির উচ্চ মূল্য, ব্যাংক ঋণের চড়া সুদ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা। আর এক প্রতিবেদনে বলা হয় নতুন বিদেশী বিনিয়োগ বিগত ৫ বছরে কমেছে সর্বনিম্ন। এর ফলে আমাদের দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে গেছে। বিভিন্ন দেশে এখন তৈরী পোষাকের চাহিদা বেড়েছে বলে আমরা এ খাতে দেশের ৬০ লাখ মহিলা শ্রমিককে কাজে লাগাতে পেরেছি বটে, যদি তা না হত তবে এই বিশাল বেকার মেয়েদের কি অবস্থা হত ? বিভিন্ন দেশে গৃহদাসী হিসেবে রপ্তানী করা ছাড়া আর কি কোন উপায় থাকত ? অপরদিকে বিভিন্ন উন্নয়নশীল ও অর্থনৈতিকভাবে উন্নত নির্ভরশীল হয়েছে বলে আমরা লাখ লাখ শ্রমিক বিদেশে রপ্তানী করতে পেরেছি, এটাকে জনশক্তি রপ্তানী বলা হলেও প্রকৃত অর্থে এটা বিদেশের কাছে শ্রম বিক্রি করা ছাড়া আর কিছুই নয়, দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ নাই বা খুবই সীমিত বলে আমরা অসম্মানজনক এই খাতে আমাদের দেশের যুবকদের বিদেশে পাঠাচ্ছি, দেশে চাকুরী/কাজ-কর্মের সুযোগ নাই বলে আবার অবৈধভাবেও হাজার হাজার বেকার যুবক বিদেশে পাড়ি দিতে গিয়ে মাঝপথে মারা যাচ্ছে বা বিভিন্ন দেশে বন্দি হচ্ছে, এমনকি এখন বিভিন্ন দেশে গৃহকর্মীর নামে মেয়েদেরকেও গৃহদাসী হিসেবে পাঠাতে শুরু করেছি ? সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখা স্বাধীন দেশের জন্য এটা কি সম্মানজনক বা মর্যাদাশীল আয়ের উৎস? বাংলাদেশ এগিয়ে যাওয়ার এটাই কি যথার্থ প্রমাণ?

 

সস্তা ও সহজলভ্য শ্রম থাকায় এবং লাখ লাখ বেকার থাকার কারণে আমরা উল্লেখিত দুই খাতে এখনও টিকে আছি, কিন্তু এখানেও আমাদের প্রতিযোগী দেশ রয়েছে। বিকল্প ও ক্ষণস্থায়ী চাহিদার উপর নির্ভর হয়ে অর্থনীতিকে বেশীদিন সচল করে রাখা যায় না। দেশের আর এক প্রকৃতিক সম্পদ ছিল মাটির নিচের গ্যাস, এটাও এখন নি:শেষ হতে চলেছে, বাসা বাড়ি ও খাবার হোটেলে ২৪ ঘন্টা গ্যাসের অতি ও অপব্যবহার নিয়ন্ত্রনের কোন ব্যবস্থা ছিল না, বরঞ্চ গ্যাস নিয়ন্ত্রক সংস্থা তিতাস ও বাখরাবাদে চলছে শুধু কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি। আমাদের “দেশপ্রেমিক” সরকার তথা শাসকদের দেশ চালাতে অদূরদর্শিতার আর একটা নমূনা হল মাটির নিচের মূল্যবান এই সম্পদকে আরো দ্রুত শেষ করার জন্য কার্বন নি:সরণ তথা পরিবেশ দূষণ কমানোর নামে প্রাইভেট কারসহ বিভিন্ন যানবাহনকে গ্যাসে রূপান্তরিত করার আত্মঘাতি নির্দেশ / সুযোগ করে দেওয়া, গত ১০ বছর যাবৎ লাখ লাখ যানবাহন জ্বালানী গ্যাস ব্যবহার করে মাটির নিচের গ্যাসের মওজুদ শেষ করে ফেলেছে, এখন সাধারণ জনগণ বাসা-বাড়িতে রান্নার কাজের জন্য এবং শিল্প-কারখানা চালাতে আর গ্যাস পাচ্ছে না। অপরদিকে নাসার স্যাটেলাইটের গত ১০ বছরের তথ্য পর্যালোচনা করে আমেরিকান জিওফিজিক্যাল ইউনিয়নের এক বৈঠকে সম্প্রতি জানানো হয় যে এই সময়ে বাংলাদেশে দূষণের হার বেড়েছে শতকরা ৮০ ভাগ। ঢাকাসহ সারা দেশের আবহাওয়া ও পরিবেশ এবং নদ-নদীর পানিকে যেভাবে আরো অসংখ্য কারণে দিন-রাত দূষিত করা হচ্ছে সেখানে গাড়ির ইঞ্জিনে গ্যাস ব্যবহার করে দূষণ কমানোর চিন্তা-ভাবনা যেমন হাস্যকর বা তামাসা তেমনি আত্মঘাতিও বটে। অপর সম্পদ মাটির নিচের কয়লা, এই সম্পদেরও উপযুক্ত ব্যবহারের জন্য আজ পর্যন্ত কোন কার্যকর পদক্ষেপ বা পরিকল্পনা নিতে পারছে না, এমনকি দীর্ঘ ৪৪ বছরে একটা কয়লা নীতিও প্রনয়ন করা যায়নি, বরং বিদেশ থেকে কয়লা আমদানী করে দেশের অন্যতম প্রধান সম্পদ সুন্দরবনকে ধ্বংস করার জন্য সেখানে (রামপালে) ভারতের সহযোগিতায় বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মান করা হচ্ছে। এমনিতেই বিভিন্ন মানুষ-সৃষ্ট কারণে সুন্দরবনের উদ্ভিদ ও বন্য প্রাণীর সংখ্যা আশংকাজনকভাবে কমে যাচ্ছে, সুন্দরবন এখন জলদস্যু আর বনদস্যুদের আস্তানা ও অভয়াস্থলে পরিনত হয়েছে। অথচ আমাদের বর্তমান বনমন্ত্রী বলেছেন সুন্দরবনের বাঘরা নাকি ভারতে বেড়াতে যাওয়ায় সেখানে বাঘের সংখ্যা এখন কমে গেছে। এই হচ্ছে আমাদের শাসকদের “দেশপ্রেমিক ও জ্ঞানগর্ভ” বক্তব্য এবং বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মেধা ও যোগ্যতা।

 

স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশ বিমান দুর্নীতি ও অযোগ্য ব্যবস্থাপনার কারণে একটানা শুধু লোকসান দিয়েই যাচ্ছে (বিমানমন্ত্রী অবশ্য বল্লেন ৪৪ বছর পর এই প্রথমবার নাকি বাংলাদেশ বিমান লাভের মুখ দেখেছে), যেখানে যাত্রীর অভাব নাই, সীট চাইলে সীট পাওয়া যায় না সেখানে লোকসান হবে কেন ? পৃথিবীর কোন এয়ারলাইনস এর এমন লোকসানের নজির নাই। একই অবস্থা রেল ও সড়ক পরিবহনেও (বি,আর,টি,সি )।

 

বৃটিশ ও পাকিস্তান আমলের পর উত্তরাধিকার সূত্রে যে রেল লাইন ছিল ৪৪ বছরে মাত্র ১৪২ কিলোমিটার নতুন রেল লাইন বসানো হয়েছে, স্বাধীনতার আগে এ দেশের ৭.৫ কোটি মানুষের কাছে রেল যোগাযোগই ছিল সবচেয়ে বেশী আকর্ষণীয় ও সহজলভ্য, কিন্তু স্বাধীনতার পর লোকসংখ্যা এখন ১৬ কোটি হওয়ার পরেও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়ে আছে, যেখানে এখন এর আরো সম্প্রসারণ বা আধুনিকায়ন হওয়ার কথা বরং সারা দেশে এখন ১৫৫ টা ছোট-বড় রেল স্টেশন বন্ধ হয়ে আছে - যাকে ঘিরে হাজার হাজার মানুষের ছোট ছোট ব্যবসা তথা রুটি-রোজগারের ব্যবস্থা হয়েছিল। উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় ও ব্যস্ত সৈয়দপুর রেলওয়ে ওয়ার্কশপে এখন গরু-ছাগল বিশ্রাম নেয়, ছাদ দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে মূলবান যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মনে হয় দেশে সরকার নাই, রাষ্ট্রের ও জনগনের এসব ক্ষয়-ক্ষতি ও লোকসান দেখার কেউ নাই।

 

অপরদিকে স্বাধীনতার আগে চলাচলের ও পণ্য পরিবহনের জন্য বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান যোগাযোগ ব্যবস্থাই ছিল নৌপথ, কিন্তু বিগত ৪৪ বছরে তার প্রসার, উন্নয়ন বা আধুনিকায়নের পরিবর্তে ঢাকার বুডিগঙ্গা, শীতলক্ষা, তুরাগ ও বালি নদীসহ সারা দেশের নদ-নদী, খাল-বিল ভরাট করে, দখল করে বাংলার ঐতিহ্য (যে নৌকা আওয়ামী লীগের দলীয় প্রতীক) নৌপরিবহন ব্যবস্থাকে চিরতরেই শেষ করে দেওয়ার কার্যক্রম চলছে। সড়ক যোগাযোগে যানজট ও কালক্ষেপনের কারণে নৌপথ হতে পারত চট্টগ্রাম বন্দর থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় বা শিল্পাঞ্চলে মালামাল পরিবহনের অন্যতম বিকল্প পথ, এজন্য ইতমধ্যে বেসরকারী উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে নৌ টার্মিনাল/স্টেশন তৈরী হচ্ছে। এখন সরকারের উচিত বছরের পর বছর ধরে জমে যাওয়া পলির কারণে নদ-নদীগুলোর নাব্যতা বৃদ্ধির জন্য বিরামহীম ড্রেজিং এর ব্যবস্থা করা, অথচ মাঝে-মধ্যে ছিটে-ফুটো ড্রেজিং এর কাজ করে শুধু রাজনীতি করা হয় (আমরা করছি, অন্যরা কেউ করেনি)। নদ-নদী, খাল-বিল দখল ও ভরাট করার কারণে আজ দেশে মাছের আকাল সৃষ্টি হয়েছে, এখন বাংলাদেশের নিজস্ব বহু প্রজাতির মাছের বংশ নির্বংশ হয়ে গেছে, জাতীয় সম্পদ/মাছ ইলিশেরও অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার পথে, এত নিষেধ, আদেশ/বাধা সত্তেও বড় হওয়ার আগেই ইলিশের পোনা/বাচ্চা ইলিশ শিকার করা হচ্ছে। অথচ স্বাধীনতার আগে কি বাংলাদেশের নদ-নদী, খাল-বিল এবং মৎস সম্পদের এই অবস্থা ছিল ? ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী লুটেরা ও ডেভলেপর কোম্পানীর নামধারী ভূমি দস্যুরা আজ বাংলাদেশের নদ-নদী, খাল-বিল, ডোবা-পুকুর-জলাশয় সব দখল করে ভরাট করে ফেলছে, এর ফলে জলজ সম্পদসহ দেশের ও জনগণের কি মারাত্মক ও ভয়াবহ ক্ষতি ও পরিণতি হবে তা জানা ও বুঝার পরেও নিজের স্বার্থ ও সুবিধা লাভের জন্য এরা এই আত্ম-ঘাতি প্রবণতা থেকে বিরত বা ক্ষান্ত হচ্ছে না, এই অপতৎপরতা দেখা ও রোধ করার জন্য সরকারী বিভাগ/দপ্তর, আইন ও লোকবল থাকা সত্তেও কোন প্রতিকার হচ্ছে না, মাঝে-মধ্যে লোক-দেখানো অভিযান চালানো হয়, কিন্তু কিছুদিন পরেই আবার একই অবস্থা। বনদস্যুরা গাছ-পালা কেটে দেশের বন-জঙ্গল উজাড় করে দিচ্ছে, ফলে বাংলাদেশ থেকে এখন বহু প্রজাতির পশু-পাখি এবং বহু জাতের ফলমূলসহ বনজ তথা ভেষজ উদ্ভিদ ও লতা-গুল্ম বিলীন হয়ে গেছে। শীত মৌসুমে এখন অতিথি পাখির আগমন আগের মত নাই। ভূমি দস্যুরা পাহাড় কেটে জায়গা-জমি দখল করে নিচ্ছে। দুই সপ্তাহ আগে ঢাকায় অনুষ্ঠিত কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মশালায় জানানো হয় পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে আমাদের দেশের ৩৪ শতাংশ জীববৈচিত্র এখন ধ্বংশের সম্মুখীন, নিজ দেশের জলবায়ু ও প্রকৃতি/পরিবেশকে যেখানে ঠান্ডা মাথায় আমরা নিজেরাই ধ্বংস করে দিচ্ছি সেখানে বিশ্ব জলবায়ূ তথা পরিবেশ সংক্রান্ত পুরস্কার আমাদেরকে কোন্ কাজের জন্য বা কেন দেওয়া হয় এর জবাব জানা নাই ? এসব পেয়ে আমরা ধন্য হই এবং এ নিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার সুযোগ পাই মাত্র। এই ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে প্যারিসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব জলবায়ূ সম্মেলনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক ড. মার্গারেট চ্যান বাংলাদেশের দৈনিক কালের কন্ঠের এক প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন এবং এ জন্য আমাদের প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা করেন, সাথে সাথে তিনি ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অব পাবলিক হেল্থ এ্যাসোসিয়েশনের ১৫টি উন্নত ও ২০টি উন্নয়নশীল দেশের উপর পরিচালিত জরীপের যে প্রতিবেদনটি গনমাধ্যমকর্মীদের হাতে তুলে দেন তাতে বলা হয়েছে ৩৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থা সবচেয়ে নাজুক। ১৮টি সূচকের মধ্যে ১৪টিতেই বাংলাদেশের কোন কার্যক্রম নাই, ৪টি সূচকে সীমিত কিছু কর্মসূচি ও পরিকল্পনা আছে, কিন্তু কোন বাস্তবায়ন বা কার্যক্রম নাই।

 

এই মিথ্যা ও ঠকবাজির রাজনীতিই চলছে ৪৪ বছর যাবত। এভাবেই আমাদের শাসকরা এখন বাংলাদেশেকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সারা দেশে রেলের প্রায় ৪ হাজার একর জায়গা বেদখল হয়ে আছে। সবই হয়েছে ও হচ্ছে সরকারী দলের প্রভাবশালী নেতা ও মাস্তানদের দ্বারা। দেশের সর্বক্ষেত্রেই চলছে এই জবরদখল ও অরাজকতা। স্বাধীনতার আগে ঢাকার রেসকোর্সে হত ঘোড়দৌড়, তাও উপভোগ্য ছিল, স্বাধীনতার পর এটা হয়েছিল রাজধানীবাসির জন্য নির্বিঘ্নে সময় কাটানো, প্রাত:ভ্রমণ তথা বুকভরে অক্সিজেন নেওয়ার জন্য সোহরোয়ার্দী উদ্যান, যা এখন ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে নেশাখোর ও অন্যান্য অপরাধীদের এবং তথাকথিত প্রেমিক যুগলদের অবৈধ যৌনাচারের লীলাভূমি, ফুসকার দোকান আর জনসভার স্থানে। গাছ-গাছড়াসমৃদ্ধ সবুজ শ্যামল নির্মল পরিবেশ এখন আর সেখানে নাই, কোন শিক্ষক/ভদ্রলোক এখন আর এখানে ভুলেও যায় না। এমন অবস্থা ঢাকার রমনা পার্ক, ওসমানী উদ্যান, চন্দ্রিমা উদ্যান, ন্যাশানাল বোটানিক্যাল গার্ডেন, জাতীয় উদ্যান, চিড়িয়াখানাসহ দেশের সবকয়টা পার্ক/বিনোদনকেন্দ্র/লেকপারের অবস্থা।

 

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত বিশ্বের সর্ববৃহৎ, এ নিয়ে গর্ব করি এবং ৮ম আশ্চর্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করার জন্য গণভোটে অংশগ্রহণ করি। কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আরো অনেক মনকাড়া প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সম্পদ এ দেশের ছিল, যাকে ঘিরে সম্ভাবনাময় পর্যটন শিল্প গড়ে উঠতে পারত, হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হত, বৈদেশিক মূদ্রা আয়ের উৎস বাড়ত। স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরেও এখন পর্যন্ত পর্যটনের জন্য আমরা কোন অবকাঠামোই তৈরী করতে পারিনি। ১৬ কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত দেশের দেশীয় “পর্যটকদের” এইসব স্থানে গণহারে ভ্রমণের/চাপের কারণে এগুলোর আকর্ষণ, সৌন্দর্য ও অস্তিত্বই এখন ধ্বংস হওয়ার পথে। বিদেশী পর্যটক আকর্ষণ করতে না পারায় এ খাতে বৈদেশিক মূদ্রা আয়ের সুযোগ তৈরী হচ্ছে না, তবে দেশীয় সৌন্দর্য্য পিপাসুদের ঘিরে একশ্রেণীর লোকের হোটেলব্যবসাসহ বিভিন্ন ব্যবসা এখন জমজমাট, এখানে সরকারের কোন নিয়ন্ত্রণ নাই, এমনকি রাজস্ব আয়ের জন্য দেশীয় পর্যটকদের কাছ থেকেও টিকিট বা বিভিন্ন স্পটের জন্য একটা নির্দিষ্ট ফি আদার করা যেত। শাসকরা এভাবেই বাংলাদেশেকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

 

সস্তা বাহবা নেওয়ার জন্য রাজনৈতিক বুলি আওড়িয়ে শাসক দল এখন বলে বেড়ায় আমরা এখন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার  দ্বারপ্রান্তে এসে গেছি, আমাদের মাথাপিছু গড় আয় এখন এক হাজার ডলারেরও বেশী। কথাটা গাণিতিকভাবে সত্য হলেও এর মধ্যে যে অসারতা ও শুভংকরের ফাঁকি রয়েছে তা জনগণ ঠিকই বুঝে। একজন দরিদ্র লোক যদি দৈনিক আয় করে ২০০ টাকা আর একজন ধনী লোক যদি আয় করে ১০০০ টাকা তবে এই দুইজনের মাথাপিছু গড় আয় হবে ৬০০ টাকা, এই হিসেবে যদি বলা হয় দেশের মানুষের গড় আয় বেড়েছে তবে নিজেদেরকেই নিজেদের ধোকা দেওয়া হবে। সরকারের পক্ষ থেকে আরো বলা হয় এখন মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে, কত ডাহা মিথ্যা কথা ! স্বাধীনতার আগে এই দেশের একজন নিন্ম পদমর্যাদার সরকারী কর্মচারীর মাসিক বেতন ছিল ৭৫ - ১৫০ টাকা, এই আয় দিয়েই সে সারা মাস স্বচ্ছন্দে চলতে পারত, ঘুষ খেতে হত না বা ধার-দেনা করতে হত না। কারণ তখন নিত্যপ্রযোজনীয় পন্যের দাম ছিল কম এবং টাকার মান ও ক্রয় ক্ষমতা ছিল বেশী। কিন্তু এখন একই পদমর্যাদার একজন কর্মচারীর মাসিক বেতন ৫,০০০-১০,০০০ টাকা হওয়ার পরেও মাস চলতে তাকে দুর্নীতি করে বাড়তি আয় করতে বা সংসার চালাতে ধার করতে হয়। কারণ স্বাধীনতার পূর্বের সময়ের চেয়ে বর্তমানে নিত্যপ্রযোজনীয় পণ্যে অস্বাভাবিক ও আকাশচুম্বি মূল্যবৃদ্ধির বিপরীতে উপার্জিত টাকার মান ও ক্রয় ক্ষমতা কমে গেছে। এখন সাধারণ মানুষ খরচের বাজেট কমাতে বা প্রয়োজনীয় পণ্য আগে যা কিনত তার চেয়ে পরিমানে কম কিনতে বাধ্য হচ্ছে। তারপরেও শাসক দল বলে এখন দেশের মানুষ নাকি আগের চেয়ে ভাল আছে, দেশ এগিয়ে যাচ্ছে !

 

আমাদের সরকারের তরফ থেকে আরো বলা হয় বাংলাদেশে এখন দারিদ্র্য সীমার হার ২০ শতাংশে নেমে এসেছে, অথচ অতি সম্প্রতি জাতিসংঘের এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে বাংলাদেশে এখন ৫১ শতাংশ লোক দারিদ্র্য সীমার নীচে আছে। যদি তাই না হত তবে এখনও ঈদের সময় যাকাতের কাপড় নিতে শত শত লোক জড়ো হয় কেন বা ঠেলা-ঠেলিতে অগণিত সংখ্যায় পায়ের নীচে পিষ্ট হয়ে জীবন দিতে যায় কেন ? স্বাধীনতার পূর্বে পাকিস্তানের শাসন ও শোষণকালে এই দেশে এমন অবস্থা কি কখনও হয়েছে ? অর্থাৎ ঐ সময় এই বাংলার মানুষেরও জীবন ধারনের জন্য এত কঠিন ও কঠোর বাস্তবতার সম্মুখীন হতে হয়নি, তাহলে ৪৪ বছর পার করেও আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের সাধারণ তথা দরিদ্র জনগনের ভাগ্যোন্নয়ন করতে ব্যর্থ কেন ? স্বাধীনতার অন্যতম ও প্রধান আকাংখা ছিল এ দেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি, ৪৪ বছরেও কি এই মুক্তি অর্জিত হয়েছে ? তবে স্বাধীনতা পেয়ে ভাগ্যোন্নয়ন হয়েছে এক শ্রেণীর মানুষের যারা অবৈধ উপায়ে ব্যবসা করে আয় করছে, যারা মওজুতদারী / অতি মুনাফা করে বেশী আয় করছে, যারা লাখ লাখ শ্রমিকের সস্তা শ্রমকে পুঁজি করে কোটি কোটি টাকা আয় করছে, যারা ঘুষ আর দুর্নীতির মাধ্যমে টাকা কামাচেছ, যারা ভুমিদস্যু, যারা বনদস্যু তাদের আয় বেড়েছে, ভাগ্যোন্নয়ন হয়েছে, সরকারী মহলের কথায় তারাই ভাল আছে, তাদেরকে নিয়েই হয়ত দেশ এগিয়ে যাচ্ছে।

 

দুর্নীতি এখন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ব্যাধি। রাষ্ট্রযন্ত্র ও সমাজের এমন কোন স্তর নাই যেটাকে দুর্নীতি গ্রাস করে নাই, এখন শিক্ষা ও সাংবাদিকতা পেশাতেও দুর্নীতি ঢুকেছে যেখানে বিবেকবান মানুষ তৈরী হবে এবং যারা সমাজের দর্পন বা বিবেক। দুর্নীতিতে বাংলাদেশ পর পর ৩ বার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়ে এখন তা একই সূচকে আছে। কোন দেশ দুর্নীতিতে এগিয়ে গেলে বাংলাদেশের সূচক নিচে নেমে আসে? তার অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশে দুর্নীতি কমেছে, বরং দুর্নীতি এখন বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে, দুর্নীতি এখন নীতিতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো দুর্নীতিতে দেওলিয়া হওয়ার পথে, শেয়ার বাজারে মহা দুর্নীতি ও কেলেংকারীর ঘটনা ঘটছে, দেশের বিমানবন্দরগুলো এখন স্বর্ন চোরাচালানের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের পুলিশ বিভাগ (যাকে মানুষের তথা অসহায়ের বন্ধু বলা হয়) তারা এখন এ দেশে সমস্ত দুর্নীতির জন্মদাতা বা মাতাতে পরিণত হয়েছে; টাকা খেয়ে আসামীকে বাদী, বাদীকে আসামী বানাচ্ছে; অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামী বানিয়ে রমরমা গ্রেফতার বাণিজ্য চালু করেছে। আইন-আদালতে এখন টাকার বিনিময়ে বিচারের নামে প্যাকেজ ডিল করে পছন্দমত রায় নেওয়া হয়, সাধারণ মানুষের ন্যায় বিচার ও সময়মত বিচার পাওয়া এখন দুরূহ ও ভাগ্যের ব্যাপার। টাকার বিনিময়ে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা এখন “কন্ট্রাক্ট কিলিং” এর মত জঘন্য অপরাধেও জড়িয়ে পড়েছে, আর বন্দুক-যুদ্ধ ও ক্রসফায়ারের নামে বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডতো হরহামেশাই চালিয়ে যাচ্ছে। আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর নামে মানুষকে তুলে নিয়ে গিয়ে গুম ও খুনের ঘটনাও দেশে এখন অহরহ ঘটছে। এই অবস্থা পর্যালোচনা করলে ন্যায় বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা - স্বাধীনতার অন্যতম এই প্রধান আকাংখাও কি ৪৪ বছরে পূরণ হয়েছে ? স্বাধীনতার পূর্বে পাকিস্তানের শাসন ও শোষণকালে কি এ দেশের জনগণ এমন বিভিষীকাময় পরিস্থিতিতে পড়েছিল বা দেখেছিল ?  তাহলে ৪৪ বছরের শাসনামলে আমাদের শাসকরা এ দেশের জনগণের জন্য কি সুখের ব্যবস্থা করেছে ? দেশ সামনে এগিয়ে যাচ্ছে কি এই কলংক নিয়ে ?

 

স্বাধীনতা পূর্ববর্তি সময়ে এই বাংলার মানুষ রাস্তায় নির্বিঘ্নে ও নির্ভয়ে চলতে পেরেছে, রাতে দরজা খোলা রেখেও ঘুমাতে পেরেছে; আর এখন দিনের বেলায়ও দরজা বন্ধ করে ঘরে থাকা নিরাপদ নয়। রাস্তায় বের হলে জান-মাল নিয়ে ঘরে ফিরে আসতে পারবে কিনা এই আশংকা দেখা দিয়েছে। ছিনতাই, অজ্ঞান পার্টি, মলম পার্টি এখন এ দেশের রাস্তাঘাটে অতি পরিচিত ও প্রাতিষ্ঠানিক আতংকের নাম, এখন বাসা-অফিস কোথাও মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা নাই, পুলিশও এখন বাসা-অফিসে কারো নিরাপত্তা দিতে পারছেনা, তাই বলছে সব জায়গায় সিসি ক্যামেরা বসাতে - যার ব্যবসা এখন সবচেয়ে বেশী জমজমাট। বলা হয় এ দেশে এখন ১২০০ মানুষের জন্য ভাগে একজন পুলিশ, কিন্তু প্রতিদিন ১২০০ মানুষই কি ১২০০ অপরাধ করে যে পুলিশের পক্ষে সামাল দেওয়া সম্ভব নয় ? এমন জঘন্য ও অসহায় অবস্থা কি এ দেশের মানুষের স্বাধীনতার আগে ছিল ? তাহলে ৪৪ বছরে এ দেশের শাসকরা জনগনের জন্য কি সূখ-স্বাচ্ছ্যন্দের ব্যবস্থা করতে পেরেছে ? আমাদেরকে কি এমন সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখিয়েছিল ?

 

প্রতিদিন দেশে নারী নির্যাতন (যৌন হয়রানীসহ) ও খুনের ঘটনা ঘটছে - যা কখনও কখনও খুবই বিভৎস, নৃশংস ও লোমহর্ষক এবং এই আপরাধের প্রবণতা দিন দিন মারাত্মক আকারে বৃদ্ধি পাচ্ছে - যা মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে পাক হানাদার ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের মানবতাবিরোধী অপরাধকেও হার মানাচ্ছে (বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য মতে এই বছর নভেম্বর পর্যন্ত ৩৬ জনকে পুলিশী নির্যাতন ও ৮২ জনকে হত্যাসহ মোট ৪১১৬ জন নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে)। ঐ সময় পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসররা যা করেছিল তা একটা বিশেষ সময়, পরিস্থিতি ও ঘটনাকে কেন্দ্র করে ৯ মাস যাবৎ করেছে (যে কাজকে আমরা গণহত্যা তথা যুদ্ধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে সেই সময়কার এ দেশেীয় অপরাধীদের এখন  ৪৪ বছর পরেও বিচার করছি)। কিন্তু এখনতো আমাদের নিজেদের স্বাধীন দেশ, আমরা একই মায়ের জাত ভাই-বোন, এখন আমরা কিভাবে ও কেন প্রতিনিয়ত আমাদের মা-বোনদের প্রতি এমন অন্যায়-অবিচার করতে পারছি? মুক্তিপণ আদায়ের জন্য মানুষকে এমনকি অবুঝ, নিরীহ শিশুকেও অপহরণ করে নৃশংসভাবে হত্যা করা হচ্ছে, কত মা, কত নারী, কত সন্তানের বুক ও কোল চিরতরে খালি করে দেওয়া হচ্ছে। স্বাধীনতার পূর্বে এমন মানবতাবিরোধী বিভীষিকাময় অবস্থা কি এ দেশের মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে? তাহলে কেমন সুখ ও শান্তির স্বপ্ন দেখিয়ে আমরা জনগনকে স্বাধীনতার জন্য এত রক্ত এত আত্ম-ত্যাগ করতে উদ্বুদ্ধ করেছিলাম ? বাংলাদেশ কি এই কালিমা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ?

 

প্রতিদিন এখন চারিদিকের হত্যা, খুন ও পৈশাচিকতার মত অপরাধ দেখলে মনে হয় দেশের জনগণ যেন অসহিষ্ণূ ও অপরাধপ্রবণ এবং হিংস্র ও সন্ত্রাসী জাতিতে পরিণত হয়েছে, তুচ্ছ ঘটনার জের হিসেবেও একজন আর একজনকে হত্যা করে ফেলছে, চোর/পকেটমার সন্দেহে প্রকাশ্যে কাউকে পিটিয়ে দেহ থেকে জানটা বের না করা পর্যন্ত ক্ষান্ত হয় না (কয়েকদিন আগে পিটিয়ে মারল নারায়নগঞ্জে ৮ জনকে ), চারিপাশে দাড়িয়ে অন্যরা এই নৃশংসতা উপভোগ করে, কেউ বাঁচাতে যায়না, কেউ বলে না যে আর মের না, এবার পুলিশের কাছে দিয়ে দাও। স্বামী স্ত্রীকে খুন করছে, প্রেমিক প্রেমিকাকে খুন করছে, ভাই ভাইকে খুন করছে, এমনকি শিশু কিশোররাও এখন সহপাঠী, বন্ধু বা খেলার সাথীকে খুন করতে দ্বিধা করছে না। কোন মানুষ রাগ করে একটা গ্লাস ভাঙ্গলে তা আবার কিনে আনা যায়, কিন্তু একটা মানুষের জীবন শেষ করে দিলে কি আর একটা জীবন মানুষ ফিরিয়ে দিতে পারে ? পারে না বলেই যারা কারো জীবন নেয় ইসলামী শরীয়া আইণে তার একমাত্র বিচারও মৃত্যুদণ্ড। অবৈধ পথে চোরাচালান হয়ে এবং দেশের বিভিন্ন গোপনীয় স্থানে তৈরী হচ্ছে আগ্নেয়াস্ত্র, সন্ত্রাসী ও খুনিদের হাতে এখন অবৈধ অস্ত্রের ছড়াছড়ি, অথচ এসব অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে র‌্যাব-পুলিশের নাই কোন বিশেষ তৎপরতা। খুন করা বা জানে মেরে ফেলা যেন এখন বাংলাদেশে ডাল-ভাত। এর প্রধানতম কারণ মানুষ মনে করে খুন করে এখন পার পাওয়া যায় বা কোন কোন সময় খুনের জন্য মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামীও রাজনৈতিক বিবেচনায় রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে প্রাণ ভিক্ষা পেয়ে যায়, বিচার শুরু হলে খুনের আসামীকেও জামিনে ছেড়ে দেওয়া হয়, জামিনে বের হয়ে সে বাদী বা সাক্ষীকে মামলা প্রত্যাহার করার জন্য চাপ সৃষ্টি করে, না হয় তাদেরেকেও মেরে ফেলার হুমকী দেয়। সামাজিক মূল্যবোধ, পারিবারিক ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, ভালবাসা, দয়া-মায়া সবই যেন আমাদের সমাজ থেকে নি:শেষ হয়ে যাচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় আমরা দেশকে দ্রুত মধ্য যুগীয় বর্বতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। সীমান্ত দিয়ে অবাধে ফেনসিডিল ও ইয়াবাসহ নেশাজাতীয় পণ্য ও ঔষধ দেশে প্রবেশ করছে, যা যুব সমাজ তথা উঠতি বয়সের ছেলে-মেয়েদেরকে অংকুরেই ধ্বংস করে দিচ্ছে, প্রথম প্রথম লোক দেখানো অভিযান চালিয়ে ইয়াবা সম্রাট/সম্রাজ্ঞীকে ধরার খবর প্রকাশ করেছিল, এখন এই ব্যবসায় এম,পি, প্রশাসনের লোক, পুলিশ কর্মকর্তারাও জড়িয়ে পড়েছে, তাই এর বিরুদ্ধে অভিযান বন্ধ হয়ে গেছে। শাসক দল ও তাদের সমর্থকরা বলে পাশ্চাত্য/উন্নত দেশের তুলনায় বাংলাদেশে অপরাধের মাত্রা/সংখ্যা অনেক কম। অথচ পাশ্চাত্য সমাজ অবাধ মেলা-মেশায়, বহু বিবাহ, অবাধ যৌনাচার ও নেশা ( মদ্যপান ) গ্রহণে অভ্যস্ত এবং যে কেউ অবাধে আগ্নেয়াস্ত্র বহন করতে বা রাখতে পারে বলে সেখানে আপরাধের ঘটনা ও প্রবণতা স্বাভাবিকভাবেই বেশী। কিন্তু আমাদের সমাজ পারিবারিক বন্ধন, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের আবরণে আবদ্ধ, এখানে নেশাগ্রস্ত হয়ে প্রকাশ্যে কেউ রাস্তায় মাতলামি করতে পারে না, প্রকাশ্যে কেউ আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারে না, যুগ যুগ ধরে (এমনকি স্বাধীনতার আগেও) আমাদের সমাজ তথা দেশের মানুষ শান্তি ও সম্প্রীতির বন্ধনে বসবাস করে আসছে। কাজেই পাশ্চাত্য দেশের অপরাধের সাথে আমাদের দেশের অপরাধকে তুলনা করে দায়মুক্তি পাওয়ার কোন সুযোগ নাই। অথচ পাশ্চাত্য সমাজে অপরাধকে যেভাবে মোকাবেলা করা হয় এবং অপরাধীর বিচার করা হয় আমাদের দেশে কি তা হয় ? আমাদের সাধু-শাসকরা এ ক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের সাথে আমাদের তুলনা দেয় না।

 

আমাদের সমাজে ৪৪ বছর পরে পরিবর্তন এসেছে প্রেম-প্রীতি/ভালবাসার ক্ষেত্রেও, পারস্পরিক ভালোবাসা, পবিত্রতা ও মানবিকতা এখন আর নাই, এখন প্রেম মানে দৈহিক সম্ভোগ। প্রগতিশীলতার নামে অবাধ মেলা-মেশার সুযোগে নারী-পুরুষরা এখন অবৈধ যৌনাচারে লিপ্ত হচ্ছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমনকি কর্মস্থলেও নারীরা যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, চারিদিকে পরকীয়া প্রেমের অভিশাপ - যার জন্য প্রায়ই প্রাণ দিতে হচ্ছে স্বামী, স্ত্রী বা সন্তানদের। প্রেমিক-প্রেমিকারা এখন একজন আর একজনের বয়-ফ্রেন্ড ও গার্ল-ফ্রেন্ডে পরিণত হয়েছে, যে সম্পর্কের কোন স্থায়িত্ব নাই, ভোগ-সম্ভোগের পর ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়, ইদানিং ইন্টারনেটের যুগে এসব অবৈধ ও অসামাজিক কাজের দৃশ্য মোবাইলে ধারণ করে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দিয়ে মেয়েদেরকে অবাধে ব্ল্যাক-মেইলিংও করা হচ্ছে। অর্থাৎ কোথায় ও কোন্ নরকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আমাদের সমাজকে কেউ জানে না। এ ব্যাপারে দেশের শাসক ও সমাজপতিদেরও কোন মাথা-ব্যথা আছে বলে মনে হয় না। এমন পরিস্থিতি কি স্বাধীনতার আগে এ দেশে ছিল ? এমন বাংলাদেশ নির্মাণের জন্য কি আমরা দেশ স্বাধীন করেছিলাম? তাহলে এজন্য কে ও কারা দায়ী, এর কারণ কি, নিশ্চয়ই স্বাধীনতা এ জন্য দায়ী নয়। সামাজিক অবক্ষয়কে এই পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য নিশ্চয়ই আমাদের যারা শাসক, সমাজপতি, শিক্ষক, রাষ্ট্রনায়ক তারাই দায়ী। নিজেদের কর্মকাণ্ড, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং নৈতিকতা ও আদর্শহীন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অভিশাপে গোটা জাতিকে অসহিষ্ণূ, বেপরোয়া, উশৃংখল ও মানবতা বর্জিত জীবে পরিণত করে তুলছে। তারপরেও বলা হচ্ছে আমরা তথা দেশ নাকি আগের তুলনায় এখন অনেক ভাল ও সুখে আছে।

 

আমরা গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি করে মানুষের মত প্রকাশের তথা বাক স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করব বলে দেশকে স্বাধীন করেছিলাম, ৪৪ বছরেও কি তা করতে পেরেছি ? মুখে নিজেদেরকে পাশ্চাত্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অনুসারী বল্লেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কি পাশ্চাত্যের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, পরমত সহিষ্ণুতা ও সংস্কৃতির লেশমাত্র খুঁজে পাওয়া যায় ? পাকিস্তানী শাসকরা গণতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে কান লুই এর বিশ্বখ্যাত নক্সা অনুযায়ী শেরেবাংলা নগরে যে জাতীয় সংসদ তৈরী করে দিয়েছিল তার স্থাপত্য সৌন্দর্য নিয়ে আমরা এখন গর্ব করতে পারি সত্য, কিন্তু এখানে কি এখন প্রকৃত গণতন্ত্রের চর্চা হচ্ছে ? আমাদের দেশেরই একটা গবেষণা সংস্থা এটাকে এখন “পুতুল নাচের নাট্যশালা” বলে উল্লেখ করেছে। ৪৪ বছরের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় এখন আমাদের দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বিকৃত গণতন্ত্র এবং নির্বাচনকে পরিণত করা হয়েছে ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য একটা  প্রহসনমূলক রাজনৈতিক তামাসা বা নাটক। সুস্থ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার পরিবর্তে এখন চলছে হিংসা, প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতি, একদল রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র শক্তি ব্যবহার করে বিরোধী দলকে দমন করে যেভাবেই হউক ক্ষমতা ধরে রাখতে চায়, অপরদিকে বিরোধী দল সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য আন্দোলনের নামে সাধারণ ও নিরস্ত্র মানুষকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মারে। এখন দেশের সকল শ্রেণী বা পেশার লোকজনই এই অসুস্থ ও অগণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিবেশের শিকারে পরিণত হয়ে বা প্রভাবে পড়ে গোটা সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে অসহনীয় ও অস্থিতিশীল করে তুলেছে। শিক্ষকরাও (যারা দেশের ভবিষ্যতের জন্য যোগ্য নাগরিক গড়ে তুলবেন) পদ, পদোন্নতি ও সুবিধা পাওয়ার আশায়/লোভে আজ দলীয় রাজনীতিতে জড়িত হয়ে দলাদলি নিয়ে ব্যস্ত। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের অবনতি হওয়ার এটাও অন্যতম কারণ, ছাত্ররা এখন শিক্ষক পেটাতে কোন লজ্জা বা দ্বিধাবোধ করে না। কারণ শিক্ষক এখন আর ছাত্র/ছাত্রীদের কাছে শ্রদ্ধা করার মত মহৎ ব্যক্তিত্ব বা একটা নিরপেক্ষ আদর্শ বা মডেল নয়। ছাত্ররাতো ইতমধ্যে রাজনৈতিক দলাদলি ও কোন্দলে ধ্বংসের শেষ প্রান্তে পৌছে গেছে, এখন ছাত্রদের হাতে থাকে বই-খাতার পরিবর্তে চাপাতি, রাম দা ও বিভিন্ন আগ্নেয়াস্ত্র। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে তখন তাদের ছাত্র/যুব সংগঠন শিক্ষাঙ্গন ও অন্যান্য স্তরে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। লেখা-পড়ার পরিবর্তে দলাদলি, টেন্ডারবাজি, প্রতিপক্ষের সাথে মারামারি ও ভাগ-বাটোয়ারা বা প্রভাব বিস্তারকে নিয়ে নিজেদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে সারাক্ষণ লিপ্ত  থাকে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ছাত্রজীবনের সহপাঠীর মত মধুর ও অকৃত্রিম বন্ধু আর কেউ নয়, কিন্তু কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন রাজনৈতিক দলাদলির কারণে সবচেয়ে প্রিয় এই সহপাঠীরাও একে অপরকে কুপিয়ে জখম করছে, খুন করছে। স্বাধীনতার আগেও এ দেশে ছাত্র রাজনীতি ছিল। আওয়ামী লীগ, মুসলিম লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ছিল, পাকিস্তানের পক্ষে-বিপক্ষে রাজনীতি ছিল, কিন্তু তখনওতো ছাত্রদের মধ্যে এমন সশস্ত্র দলাদলি, মারামারি ছিল না, শিক্ষকরাও কখনো রাজনীতির লেজুরবৃত্তি করত না। যে কারণে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক ছিল তখন অহংকার করার মত মধুর ও শ্রদ্ধা পূর্ন। স্বাধীনতার পর চালু হয়েছে ভোগের রাজনীতি, লুট-পাটের রাজনীতি, কাকে মেরে কাকে ঠকিয়ে কে খাবে, কে পাবে এই রাজনীতি। ৪৪ বছর আগে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনা হয়েছিল কি এ জন্য ? তাই এখন প্রশ্ন জাগে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের “স্বাধীনতা” ছিনিয়ে আনা হয়েছিল নাকি লুটে-পুটে, ছিড়ে-ফেরে খাওয়ার জন্য এবং যার যা খুশি যেমনে ইচ্ছা তেমনে চলার জন্য পাকিস্তানীদের কাছ থেকে এক খন্ড ভুমি ছিনিয়ে আনা হয়েছিল  ?

 

স্বাধীনতার আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল আমাদের অহংকার, এর সুনাম ও খ্যাতি এতই উচ্চে ছিল যাকে তখন প্রাচ্যের অক্সফোর্ডের সাথে তুলনা করা হত। আর এখন স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে ৪৪ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মান ও মর্যাদাকে কোথায় নামিয়ে আনা হয়েছে তা আর বলার প্রয়োজন নাই। ব্যাঙের ছাতার মত এখন দেশে ইংলিশ ও বাংলা মিডিয়ামের নামে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ও আরো হচ্ছে, শিক্ষার মান ও পরিবেশ উন্নয়নের কোন লক্ষণ নাই,  শিক্ষার নামে এসব প্রতিষ্ঠানে চলছে এখন শুধু ব্যবসা (ভর্তি বাণিজ্য, সার্টিফিকেট প্রদান, ইত্যাদি), যে কারণে সরকারও উৎসাহিত হচ্ছে এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উপর কর বা ভ্যাট আরোপ করতে (অর্থাৎ তোমরা শিক্ষার নামে ব্যবসা-বাণিজ্য করলে আমরা তার উপর কর পাব না কেন ?)। স্বাধীনতার আগে ঢাকায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল শুধুমাত্র বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর উত্তীর্নদের এম,ফিল, পি,এইচ,ডি কোর্স ও উচ্চতর গবেষণা সংক্রান্ত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য - যাতে দেশে উচ্চ মানের বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদ তৈরী হয়। কিন্তু স্বাধীনতার পর এখানে আমলা ও শোষক তৈরী হবে এই অজুহাতে এটাকে গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করা হয়, এখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ইতিহাস ও রেকর্ড সৃষ্টি করেছে ছাত্রী ধর্ষণের কেন্দ্র হিসেবে, আর সারা বছর উপচার্যকে কেন্দ্র করে শিক্ষকদের আন্দোলনতো লেগেই আছে।

 

১৬ ডিসেম্বরের আগে পাক হানাদার বাহিনী তাদের এদেশীয় দোসরদের সহায়তায় অসংখ্য বাংগালী শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, পণ্ডিত তথা বুদ্ধিজীবিকে হত্যা করেছিল, কারণ তারা সত্যিকার অর্থেই বুদ্ধিজীবি ছিল, তারা বেঁচে থাকলে হত বাংলাদেশের মূল্যবান সম্পদ। কিন্তু তাদেরওতো জন্ম হয়েছিল পাকিস্তান সৃষ্টির আগে বা পরে, অর্থাৎ তাদের পুরো শিক্ষা জীবন, কর্মজীবন, সাধনা ও গবেষণাকাল অতিবাহিত হয়েছিল শোষক বা ঔপনিবেশিক পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের জন্মের ( ১৯৪৭ সাল ) পর থেকে ২৩ বছর (বাংলাদেশের জন্মের আগে) পর্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশে। অথচ পাকিস্তানের কাছ থেকে মুক্ত হয়ে অনুকূল পরিবেশ (স্বাধীনতা) পেয়েও দীর্ঘ ৪৪ বছরে তাদের মত বুদ্ধিজীবী আমরা বাংলাদেশে কতজন জন্ম দিতে/তৈরী করতে পেরেছি বা পেয়েছি ? প্রবীণ যারা এখনও আছেন এবং বাংলাদেশের জন্মের পর এখন আমরা যাদেরকে কথিত সুশীল সমাজের লোক হিসেবে দেখতে পাই দলীয় রাজনীতির লেজুড়বৃত্তির কারণে এবং কোন না কোন রাজনৈতিক আদর্শ বা মতামতের অনুসারী হয়ে নিরপেক্ষতা হারিয়ে তারা এখন আর বুদ্ধিজীবী নাই, এখন হয়েছে দলবাজ দুর্বুদ্ধিজীবী, তারা আর এখন বাংলাদেশের মূল্যবান সম্পদ নয়, বরং আপদ বা বিপদ। আইণজীবীরা দলীয় রাজনীতিতে বিভক্ত, এমনকি বিচারপতিরাও আজ রাজনৈতিক মতাদর্শে আক্রান্ত হয়ে  “চোখে কালোপট্টি বাঁধা” ন্যায় বিচারের প্রতীককে কলুষিত করছে, দলীয় বিবেচনায় এখন উচ্চ আদালতের বিভিন্ন স্তরে (প্রধান বিচারপতিসহ)  বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া হয়, বিচারকদের বয়স বাড়িয়ে ক্ষমতায় থাকার উপায় খোঁজ করা হয়, কোন্ বেঞ্চের বিচারকরা কোন্ দলের অনুসারী সে হিসেবে মামলা পরিচালনার জন্য দলীয়ভাবে বিভক্ত আইনজীবীরা তৎপর থাকে, বিচারকরা (বিশেষ করে নিম্ন আদালতের) এখন ক্ষমতাসীন সরকারের মনোভাব ও ইচ্ছার প্রতি সচেতন থেকে রায় দেয়। অবসরে যাওয়ার পর কোন কোন বিচারপতি যখন বিভিন্ন অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা বা টেলিভিশনের টক-শোতে গিয়ে কথা বলে তখন তারা তাদেরকে রাজনৈতিক দলের সক্রিয় নেতার চেয়েও আরো বেশী রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট হিসেবে প্রমাণ দেয়, এতেই প্রমাণিত হয় বিচারক থাকাকালীন সময়ে তারা কতটা নিরপেক্ষ ছিল। দুর্নীতি দমনের জন্য স্বাধীন কমিশন করা হয়েছে বলে শাসকরা দাবী করে, কিন্তু এই কমিশনকে যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে তাদের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠান হিসেবেই ব্যবহার করে, একই অবস্থা ও অভিযোগ দেশের আর  এক গুরুত্বপূর্ন কথিত স্বাধীন প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনের।

 

পাকিস্তান আমলে সি,এস,পি (সেন্ট্রাল সুপিরিয়ার সার্ভিস) এবং পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক প্রশাসনের জন্য ই,পি,সি,এস প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রশাসনিক পদে লোক নিয়োগ করা হত, এসব পরীক্ষার মাধ্যমে যাদেরকে বাছাই করা হত তাদের বিদ্যা-বুদ্ধি, জ্ঞান ও মেধা ছিল ঈর্ষণীয়, এমন কয়েকজন বাংগালী কৃতি সন্তান স্বাধীনতার পর বিভিন্ন মন্ত্রনালয়ের সচিব, রাষ্ট্রদূত ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ন পদে চাকুরী করে এখন অবসরে আছেন বা কেউ কেউ মারা গেছেন। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পি,এস,সি) করা হলেও এর সর্বোচ্চ ও প্রত্যাশিত মান ধরে রাখতে পারেনি। পরীক্ষা, বাছাই ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এত দুর্নীতি ঢুকেছে (প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ) এখন সব সময়েই ছেলে-মেয়েদেরকে পরীক্ষা বাতিল বা ফলাফল বাতিলের আন্দোলন করতে দেখা যায়। আর যারা এখন পি,এস,সি’র পরীক্ষায় পাশ করে বি,সি,এস ক্যাডার হয়ে বের হয়ে আসছে তাদের মেধা, বিদ্যা-বুদ্ধি আগের সি,এস,পি ও ই,পি,সি,এস কর্মকর্তাদের ধারে কাছেও নাই, স্বাধীন দেশে এসব মেধাহীন লোকেরা আজ প্রশাসন চালাচ্ছে বলে প্রশাসনেও দলাদলি/রাজনীতি ঢুকেছে, দুর্নীতির কথাতো বলারই অপেক্ষা রাখে না।

 

জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে এখন বাংলাদেশে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বেড়েছে, প্রতি বছর পাশের হার বাড়ছে (বা বাড়ানো হচ্ছে), জিপিও-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও এখন হাজার হাজার, কিন্তু শিক্ষার মান কি বেড়েছে ? বাংগালীদের মেধা ও প্রজ্ঞা পৃথিবীর অন্য কোন দেশের মানুষের চেয়ে কম নয়, যারা অন্যান্য দেশে পড়া-শুনা ও গবেষণায় আছে বা কর্মরত আছে তাদের সুনাম ও খ্যাতি মাঝে-মধ্যেই সারা পৃথিবীময় ছড়াচ্ছে। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ মননশীল ও সৃষ্টিশীল মানুষ তৈরীর জন্য মোটেও অনুকূল নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এখন আর পদোন্নতির জন্য গবেষণা বা নতুন কিছু আবিষ্কার করতে হয় না, রাজনৈতিক লেজুরবৃত্তি করতে পারলেই হয়। স্বাধীনতার আগে এ দেশের ছেলে-মেয়েদের স্কুল শেষ করে কলেজে বা কলেজ শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য কোন চিন্তা করতে হতো না, পড়া-শুনা শেষ করে পেশা/কর্মজীবন বা চাকুরীর জন্যও কোন অনিশ্চয়তা ছিল না। কিন্তু স্বাধীন তথা নিজ দেশে এখন চাহিদার তুলনায় সুযোগ সীমিত বলে প্রচণ্ড প্রতিযোগিতার কারণে সবকিছুই অনিশ্চিত হয়ে গেছে, শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা আশংকাজনকভাবে বাড়ছে, সাম্প্রতিক তথ্য মতে এখন দেশে ২৬ লাখ শিক্ষিত বেকার আছে। পদার্থ বিদ্যায় মাস্টার্স পাশ করে ব্যাংকের চাকুরীর জন্যও প্রাণপণ সংগ্রাম করতে হচ্ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায়, শিক্ষার হার বেড়ে যাওয়ায় পরিবর্তিত পরিস্থিতে কিভাবে জনগণের চাহিদা মেটানো সম্ভব এ ব্যাপারে দীর্ঘ ৪৪ বছরেও কি আমাদের দেশের সরকার বা শাসকরা কোন বাস্তবসম্মত ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে শুধু লুট-পাট ও দুর্নীতি করে বিত্তশালী হওয়ার জন্য গদি নিয়ে কাড়া-কাড়ি ও মারা-মারি ছাড়া? শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন নিয়েও চলছে রাজনীতি। শিক্ষাই একটা জাতিকে বিকশিত করতে পারে, এজন্য শিক্ষার গুরুত্ব সর্বস্তরে নিশ্চিত করা যেখানে জরুরী সেখানে আমাদের স্বাধীন দেশে আজ পর্যন্ত জাতীয় নির্বাচনসহ কোন নির্বাচনেই প্রার্থীদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতাকে আবশ্যক করা হচ্ছে না, যাদের অর্থ (টাকা)শক্তি ও মাস্তানী করার যোগ্যতা আছে তারাই সমাজপতি তথা জনপ্রতিনিধি হচ্ছে। এদের মত শাসকদের যাঁতাকলে পড়েই আজ দেশে সর্বস্তরে ধ্বস নেমেছে।

 

রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে বাংগালীরা ১৯৫২ সালে বুকের রক্ত দিয়েছে, বাংলা ভাষা ও বাংগালী সংস্কৃতিকে ধারণ ও লালন করার স্বপ্নও ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম প্রেরণা। কিন্তু স্বাধীনতার পর ৪৪ বছরে ধীরে ধীরে বাংলা ভাষাকে আমরা ভুলতে বসেছি, এই কিছুদিন আগেও প্রধান বিচারপতিকে বিচার কার্যক্রমে বাংলা ভাষা ব্যবহার করার উপর তাগিদ দিতে হল। একুশে ফেব্রুয়ারী ও বাংলা নববর্ষ প্রতি বছর ঘটা করে পালন করি, কিন্তু দৈনিন্দন জীবনে বাংলা মাস ও তারিখ ব্যবহার করি না, এমনকি কোন্ দিনে কোন্ বাংলা তারিখ তাও বলতে পারি না। আজকের  প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা ইংরেজী মাধ্যমে পড়া-শুনার ফলে এবং আধুনিকতার নামে ফ্যাশন করে এখন বাংলা শব্দকে বিকৃত করে উচ্চারণ করে, এ ব্যাপারে বাংলা একাডেমী বা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ নিশ্চুপ। অপর দিকে বাংগালীর শাশ্বত সংস্কৃতি ও  পোষাক-আষাকতো এখন হিন্দি ও বিদেশী সংস্কৃতির জোয়ারে ও প্রভাবে ভেসে গেছে, আর এ ব্যাপারে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে আমাদের দেশের বেসরকারী টিভি চ্যানেলগুলো (যাদের শ্লোগান হল হৃদয়ে বাংলাদেশ, অবিরাম বাংলার মুখ, ইত্যাদি ইত্যাদি )। আমরা বিদেশীদের ভাল দিকগুলো যেমন অনুষ্ঠানের ভাল মান, উন্নত প্রযুক্তি এসব আয়ত্ত করতে পারি না, খারাপ দিকগুলো যেমন অর্ধনগ্ন পোষাক, উলংগ নাচ এসব খুব ভালভাবে অনুসরণ বা আয়ত্ত করতে পারি। বাংলা সংস্কৃতিকে ও বাংগালী কৃষ্টি ও ঐতিহ্যকে ধারণ ও লালন করার যে স্বপ্ন স্বাধীনতার আগে আমাদেরকে দেখানো হয়েছিল তা পূর্ন হওয়ার পরিবর্তে এখন বিলীন হতে চলেছে ?

 

ঢাকা ছিল আগে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক রাজধানী, পাকিস্তানী শাসকদের আমলেও ঢাকা শহরের রাস্তা-ঘাট, আবাসিক এলাকা (ধানমন্ডি, গুলশান-বনানী) ও অন্যান্য উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সুপরিকল্পিতভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে। কিন্তু স্বাধীন হয়ে আমরা রাজধানী ঢাকা শহরকে ৪৪ বছরে আরো উন্নত, সুশৃংখল ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সমৃদ্ধ করার পরিবর্তে অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে এখন ঢাকা শহরকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশী জনবহুল ও বসবাসের অনুপযোগী একটা মেগা বস্তির শহরে পরিণত করা হয়েছে। যানজটে এখন ঢাকা শহর অচল, হাজার হাজার কর্মঘণ্টা মানুষের এখন রাস্তায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, সামান্য বৃষ্টি হলে ঢাকা শহর এখন পানিতে তলিয়ে জলজটের শহরে পরিণত হয়, এখন দিনে দিনে ঢাকার বাইরের অন্যান্য জেলা শহরের অবস্থাও দ্রুত ঢাকার মত অবস্থায় পরিণত হচ্ছে। স্বাধীনতার আগে টানা ৭ দিন বৃষ্টি হলেও বৃষ্টি থামার পর পরই কোথাও পানি জমা থাকতে দেখা যায়নি, কারণ পানি নিষ্কাশনের সব নালা-নর্দমা, খাল-বিল পরিষ্কার ও খোলা ছিল, স্বাধীনতা পাওয়ার পর আমরা মানুষরাই এসব দখল করেছি, বন্ধ করে দিয়েছি, সুতরাং এখন কর্মফল বা সাজাতো ভোগ করতেই হবে। কিন্তু স্বাধীন দেশের সরকার ও শাসকদের দায়িত্ব ছিল এসব রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কার করে আগের মত সচল রাখা। এজন্য কি সরকারী মন্ত্রণালয়, দপ্তর বা বিভাগ ও জনগণের করের টাকায় বেতনভোগী কর্মকর্তা/কর্মচারীর অভাব ছিল? জমজমাট আনন্দ-উল্লাশে পৌর নির্বাচন করা হয় এলাকার সব সমস্যার সমাধান করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে।

 

আসলে সরকার ও শাসকদের যেমন ছিল না একটা স্বাধীন দেশ পরিচালনার যোগ্যতা ও দূরদর্শিতা, তেমনি আমরা জনগণও নিজেদের ভাল-মন্দ বুঝার পরেও স্বীয় স্বার্থে ও লোভে নিজের পায়ে কুড়াল মারার মত কাজ করতেও দ্বিধা করি না। ঢাকা শহরের বর্তমান রাস্তার দৈর্ঘ্য ও আয়তন বিবেচনা করেই সে অনুপাতে রাস্তায় প্রাইভেট কার ও অন্যান্য যানবাহন চলাচলের পারমিট না দিয়ে লাগামহীনভাবে তা দেওয়ার কারণে আজ ঢাকার এই যানজট ও জনদুর্ভোগ, এখন ঢাকার অর্ধেক রাস্তাই গাড়ি পার্কি-এর দখলে চলে যায়, তদুপরি ঢাকার অনেক ব্যস্ত ও জনাকীর্ন রাস্তার পাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ছোট-বড় গাড়ি ও মোটর সাইকেল মেরামতের কারখানা। একই অবস্থা আন্ত:জেলায় চলাচলকারী যানবাহন ও মহাসড়কের ক্ষেত্রেও, কোন হিসাব-নিকাশ বা নিয়ন্ত্রণ নাই, অপ্রশস্ত রাস্তায় বেপরোয়া গতিতে মাত্রাতিরক্ত যানবাহন চলাচলের কারণে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছে। যারা এভাবে আপন জন হারাচ্ছে, পঙ্গু হচ্ছে তাদের যন্ত্রনা ও দু:খ-কষ্ট কি শাসকরা বুঝে ?  এমন অবস্থা যাতে সৃষ্টি না হয় বা হলে এ থেকে পরিত্রানের স্থায়ী ও দ্রুত কি ব্যবস্থা নেওয়া যায় এসব ভাবা ও চিন্তা করার যোগ্যতা, দক্ষতা, দূরদর্শিতা বা ইচ্ছা ও সময় কি আমাদের স্বাধীন দেশের শাসকদের আছে ? দেশেতো পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ, বিশারদ, নগরবিদ এর ছড়াছড়ি। এরাও রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে দ্বিধা বিভক্ত, সরকারের পক্ষের লোক হলে সরকারের ভুল সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনাকেও এরা সমর্থন করে যুক্তি দিতে থাকে। আগামী ৫০ বছরের কথা মাথায় রেখে কোন পরিকল্পনা করা হয়না, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যখন মেঘনা ও গোমতী সেতু তৈরী করা হয় তখন সাধারণ মানুষও সন্দেহ করেছিল এত সরু সেতু আগামী কয়েক বছর পর যখন অকেজো বা অনুপযোগী হয়ে যাবে তখন আবার শত শত কোটি টাকা অপচয় করে নতুন সেতু বানাতে হবে, এখন তাই ভাবা হচ্ছে। অথচ স্বাধীনতার আগে যখন শীতলক্ষার উপর সেতু নির্মাণ শুরু হয়েছিল (যা স্বাধীনতার পর চালু হয়) তাও অনেক প্রশস্ত করে কাঠামো তৈরী করা হয়েছিল, তাহলে আমাদের স্বাধীন দেশের শাসকদের মাথায় সুদূরপ্রসারী চিন্তা ও পরিকল্পনা আসে না কেন ? ঢাকার মগবাজারে যে ফ্লাইওভার তৈরী হচ্ছে চার বছর পর এখন ধরা পড়েছে মূল নক্সাতে ভুল, এখন তা সংশোধন করে তৈরী করতে আরো ৪০০ কোটি টাকা বেশী খরচ হবে, এমন অবস্থা সর্বস্তরে সর্বক্ষেত্রে, যা কিছু করে শুধু রাজনৈতিক ও আর্থিক ফায়দা হাসিলের জন্য, প্রয়োজন অপ্রয়োজনের কথা বিবেচনা করা হয় না, সঠিক পরিকল্পনা করা হয় না। এখন প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা খরচ করে (নিজস্ব অর্থে) পদ্মা সেতু করা হচ্ছে একই রাজনৈতিক বাহবা নেওয়ার জন্য। শুষ্ক মৌসুমে পদ্মায় এখন আর পানি থাকে না, তখন সেখানে ফসল হয়, হার্ডিঞ্জ ব্রীজের নীচে দিয়ে যানবাহন/গরুর গাড়ি চলাচল করে, “পদ্মার ঢেউরে” .... নজরুলের বিখ্যাত এই গানের ও পদ্মার ইলিশের আর কোন যথার্থতা এখন খুঁজে পাওয়া যায় না। অনেক বিশেষজ্ঞই এখন আশংকা প্রকাশ করছেন সেতুর জন্য নদী শাসন করার ফলে এবং ৪২/৪৩টা পিলারের  কারণে পলির পরিমাণ বাড়তে বাড়তে পদ্মায় আর ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণ ও প্রজনন থাকবে না। হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে সেতু তৈরীর পরিবর্তে সবার আগে প্রয়োজন ছিল দেশের সব কয়টা (বিশেষ করে প্রধান প্রধান) নদীগুলোর নাব্যতা বৃদ্ধি করার ব্যবস্থা করা, ভারতের সাথে বুঝাপড়া করে আমাদের নদীর পানি পাওয়ার ন্যায্যতা নিশ্চিত করা, নদীতে যদি সারা বছর পানিই না থাকে তবে সেতু তৈরী করে লাভ কি ? যে উদ্দেশ্যে যমুনা (বঙ্গবন্ধু) সেতু তৈরী করা হয়েছিল তা কি সফল হয়েছে, ঢাকা বা এ অঞ্চলের লোকজন কি গিয়ে ঐ অঞ্চলের শহরগুলোতে বিনিয়োগ করে স্বনির্ভর বা সেখানে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে ? বরং উল্টোটা হয়েছে, সেতু হওয়ায় ঐসব অঞ্চলের লোকজন আয়-রোজগারের জন্য সহজে ঢাকায় এসে ভীর করেছে, পদ্মা সেতু হওয়ার পরেও একই অবস্থা হবে, ঢাকার লোকসংখ্যা হবে তখন ৩ কোটিরও বেশী। রাজধানী ঢাকা শহরে বর্তমানে ঘর থেকে বের হয়ে কর্মস্থলে যেতে যেখানে ঘন্টার পর ঘন্টা রাস্তায় বসে থাকতে হয় সেখানে সেতু তৈরী করে দিয়ে বাইরের শহরের লোকজন যাতে আরো তাড়াতাড়ি ঢাকায় এসে ঢাকার জনসংখ্যার ঘনত্ব / ভীড় আরো বাড়াতে পারে তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। বরং সেতু তৈরীতে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ না করে নৌপথকে আরো কার্যকর করা এবং আগের যে ফেরী ব্যবস্থা ছিল তাকে আরো উন্নত ও নিরাপদ করাই ছিল জরুরী ও বাস্তবসম্মত। অপরদিকে অতি জরুরী ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে যেখানে ৬ বা ৮-লেনে উন্নীত করা প্রয়োজন সেখানে বিগত ১০ বছরে তাকে ৪-লেনেও পরিণত কারার কাজ শেষ হচ্ছে না। রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করা ছিল সবচেয়ে জরুরী।

 

স্বাধীনতার পর দেশের চিকিৎসা খাতে হাসপাতাল ও ডায়গনেস্টিক সেন্টার গড়ে উঠেছে হাজার হাজার, কিন্তু চিকিৎসা সেবা ও চিকিৎসার মান অধ:পতনে গেছে, নেহায়েত কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া ডাক্তারদেরকে এখন কসাই এর সাথে তুলনা করা হয় (কয়েকদিন আগে এক সেমিনারে খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রীও এ মন্তব্য করেছেন), টাকা ছাড়া এরা কিছুই বুঝে না, ৫০০ - ১০০০ টাকা ভিজিটিং ফি, সরকারী ডাক্তাররা স্বীয় কর্মস্থলে কম সময় ও মনোযোগ দিয়ে সারাক্ষণ সময় দেয় বিভিন্ন বেসরকারী হাসপাতাল ও ক্লিনিকে আরো বেশী টাকা কামানোর লোভে, আধুনিক হাসপাতালের নামে গড়ে উঠেছে কয়েকটা নামসর্বস্ব হাসপাতাল যেগুলোকে এখন রোগী ধরার ফাঁদ বলা হয়, রোগী ভর্তি হওয়ার আগেই প্যাকেজ ডিল বাবত বিরাট অংকের টাকার চুক্তি করে নেয়, প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে আই,সি,ইউতে ভর্তি বা লাইফ সাপোর্ট দিয়ে রোগীদের কাছ থেকে এসবের জন্য বাড়তি টাকা আদায় করে নেওয়া হয়, এসব কারণে মাঝে-মধ্যেই ভুক্তভুগী রোগীরা ক্ষিপ্ত হয়ে ভাংচুর চালায়। যাদের সামর্থ্য আছে তাদের বেশীরভাগই এখন ভারত, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও অন্যান্য উন্নত দেশে চিকিৎসা করতে চলে যায়। দেশের গরীব ও মধ্যম আয়ের সাধারণ রোগীদের সরকারী ও বেসরকারী হাসপাতালে কি দুরাবস্থা ও হয়রানী তার খবর হরহামেশাই গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

 

বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে বেশী উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সবকিছুতে ভেজাল আর ভেজাল, মাছে ফরমালিন, শাক-সব্জি, ফল-মূলে রাসায়নিক ও কীটনাশক মেশানো হচ্ছে, খাদ্যদ্রব্য এখন কোন কিছুই ভেজালমুক্ত নাই, এমনকি ঔষধেও ভেজাল ঢুকেছে। শুধু খাদ্যদ্রব্য আর ঔষধই নয় মানুষের জীবনের প্রয়োজনীয় প্রায় সবকিছুই এখন ভেজালযুক্ত। মাঝে-মধ্যে ছিটে-ফোটা ভেজাল বিরোধী অভিযান চালানো হয়, কিন্তু ভেজালের এমন ভয়াবহ অবস্থা সত্ত্বেও তা সারাক্ষণ সারা বছর বিরতিহীনভাবে চালানো হয় না। স্বাধীনতার আগে এ দেশের মানুষ কি এমন ভেজালের রাজত্ব দেখেছে ? বাংলাদেশ কি এসব জনদুর্ভোগকে সাথে নিয়ে এভাবেই এগিয়ে যাবে ?

 

শাসকদের তরফ থেকে গর্ব ভরে বলা হয় বাংলাদেশ এখন খাদ্যে স্বয়ম্ভরতা অর্জন করেছে। কিন্তু এখানেও ভেজাল আছে, খাদ্য শব্দটা আক্ষরিক অর্থে অনেক বড়। খাদ্য বলতে শুধু চাল বুঝায়না । একমাত্র চাল ছাড়া বলতে গেলে আর সকল খাদ্যদ্রব্যই (তেল, ডাল, দুধ, চিনি, পেয়াজ, আদা, রসুন আরো অনেক কিছু) আমাদের বিদেশ থেকে আমদানী করতে হয়। চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্নতার কথা বলা হলেও এখনও বিদেশ থেকে চাল আমদানী করা হচ্ছে, ভারতীয় চালে বাজার সয়লাব হয়ে আছে, দেশে উৎপাদিত চাল মূল্য পাচ্ছে না। স্বাধীনতার আগে এ দেশের লোকসংখ্যা ছিল ৭.৫ কোটি, কিন্তু এ দেশের আয়তন তখন যা ছিল (৫৫ হাজার বর্গমাইল) এখনও তাই আছে, বরং এখন লোকসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ১৬ কোটি। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর বাসস্থানের চাহিদা মেটাতে গিয়ে এবং অপরিকল্পিভাবে কল-কারখানা ও অন্যান্য স্থাপনা গড়ে তোলার কারণে এখন দেশে চাষাবাদের জমি আশংকাজনক হারে কমে গেছে, আর কয়েক বছর পর চাষাবাদের জন্য কোন জমি এবং মৎস চাষের জন্যও খাল-বিল, ডোবা-পুকুর থাকবে না।

 

আমরা বিগত ৪৪ বছরে আর কিছু পারি আর নাই পারি জনসংখ্যা বৃদ্ধির কাজটা খুব সফলতার সাথে করতে পেরেছি। বাংলাদেশের এখন বলতে গেলে উন্নয়নের প্রধান বাধা এবং সর্বক্ষেত্রে তীব্র প্রতিযোগিতার (কাড়া-কাড়ি, মারা-মারি) একমাত্র কারণই হলো দেশের আয়তনের এবং সম্পদ, সুযোগ ও চাহিদার তুলনায় এই অস্বাভাবিক ও বিশাল জনসংখ্যার চাপ। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শাসক গোষ্ঠী যদি সঠিক পরিকল্পনা (এমনকি আইন তৈরী করে হলেও) গ্রহণ করে জনসংখ্যাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারত তবে আজ আর এমন চতুর্দিকে নৈরাজ্য, দুর্নীতি, হাহাকার, অভাব কিছুই থাকত না। যা ছিল বা ৪৪ বছরে যা অর্জিত হয়েছে তাতেই এদেশের জনগণ সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারত, তখন আর গণতন্ত্রের জন্যও আন্দোলন করত না। আমাদের দুর্ভাগ্য দেশের ও জনগণের কল্যাণের জন্য সুদূরপ্রসারী ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও কর্মসূচী প্রনয়ণ করার মত যোগ্য নেতৃত্ব পাইনি, পেয়েছি সব ক্ষমতালোভী লুটেরার দল (এ দেশের রূপকার ও স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও দেশ চালানোর সময় আপসোস করে এ কথা বলেছিলেন)। এখন যেহেতু বাংলাদেশের আয়তন আর বড় হবে না বা বড় করা যাবে না এবং বছর বছর জনসংখ্যা আরো বাড়তে থাকবে (ধারণা করা হচ্ছে ২০৫০ সালের মধ্যে জনসংখ্যা হবে ৩০ কোটি) সেহেতু দেশকে জনসংখ্যার চাপ থেকে কমাতে হলে এখনই কমপক্ষে ৪/৫ কোটি লোককে বিভিন্ন দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে, বিগত ৪০ বছরে প্রায় ১ কোটি লোক বিদেশে গেছে, এই সংখ্যা এত দীর্ঘ সময়ে আরো অনেক বেশী হত যদি সরকারগুলোর তেমন ইচ্ছা ও পরিকল্পনা থাকত (যাও এ পর্যন্ত গেছে তার ৯৫ শতাংশই পাঠিয়েছে বেসরকারী জনশক্তি রপ্তানীকারকরা)। বর্তমানে সরকার অভিবাসন ব্যয় কমানোর নামে বেসরকারী জনশক্তি রপ্তানীকারকদেরকে বাদ দিয়ে নিজেই জনশক্তি রপ্তানীর দায়িত্ব নিতে গিয়ে (ব্যবসা করতে গিয়ে) বিগত ৬/৭ বছরে জনশক্তি রপ্তানীর খাতকে পুরোপুরি বন্ধ / ধ্বংস করে দিয়েছে (অথচ জনশক্তি রপ্তানী খাতই বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত), যে কারণে এখন মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়েও অবৈধভাবে বিদেশ যাওয়ার (মানব পাচারের) প্রবণতা আশংকাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারী মহল আত্মতুষ্টির জন্য ইদানীং বলে মানব উন্নয়নের সূচকে বাংলাদেশ এখন ভারত ও পাকিস্তানের চেয়েও এগিয়ে, জাতিসংঘের ২০১৫ সালের মানব উন্নয়ন সূচকে ১৮৮ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এখনও অনেক তলায় ১৪২তম, ভারত ১৩০ এবং পাকিস্তান ১৪৭তম। কিন্তু মানব সম্পদের কোন উন্নতি নাই, বিশাল জনগোষ্ঠীকে জনসম্পদে পরিণত করার কোন জোরালো কর্মযজ্ঞ নাই। বিদেশে অদক্ষ শ্রমিক রপ্তানী ছাড়া আমাদের এখনও কোন বিকল্প নাই, মানব সম্পদের যদি সত্যিই উন্নয়ন হত তবে দেশে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনশক্তি তৈরী হত। মধপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন উন্নত দেশ ভারত, পাকিস্তান, ফিলিপাইন ও শ্রীলংকা থেকেই সবচেয়ে বেশী দক্ষ শ্রমিক নেয়, এতে কম লোক পাঠিয়েও বেশী আয় করা যায়। অদক্ষ শ্রমিকও যদি বেশী সংখ্যক পাঠানো যেত তাহলেও দেশের বেকারের ও জনসংখ্যার চাপ কমত। যদি দেশের ৪/৫ কোটি লোককে বৈধভাবে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দেওয়া যেত তবে বৈদেশিক মুদ্রার আয় বহুগুণ বৃদ্ধি পেত সাথে সাথে দেশের জনসংখ্যার চাপও কমত, আয়তনে বাংলাদেশের চেয়ে বহুগুণ বড় আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে (বিশেষ করে যেখানে আমাদের সৈনিকরা শান্তিমিশনে কাজ করে) এমনকি পার্শ্ববর্তী মিয়ানমারেও কৃষি কাজে যৌথ উদ্যোগের ভিত্তিতে ব্যবসায়িক চুক্তি করে আমাদের দেশ থেকে প্রচুর লোক পাঠানোর সুযোগ আছে, কিন্তু আমাদের স্বাধীন দেশের “দেশপ্রেমিক” সরকারগুলোর কি এসব নিয়ে চিন্তা করার যোগ্যতা, সময় ও ইচ্ছা আছে ?

 

মিয়ানমারের সাথে আইনী লড়াই করে সমুদ্র সীমা নির্ধারণের পর “সমুদ্র বিজয়” করে ফেলেছি বলে শুধু রাজনৈতিক আনন্দ উল্লাশ করা হয়েছে, স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত সমুদ্র সম্পদ আহরণ করে বা ব্যবহার করে কি দেশ ও জনগণের কল্যাণে লাগাতে পেরেছি ? স্বাধীনতার পর উত্তরাধিকার সূত্রে চট্টগ্রাম ও মংলা সমূদ্র বন্দর পেয়েছিলাম, চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরে এখন পলি জমে উঁচু হয়ে যাওয়ায় বড় বড় জাহাজ বন্দরে ভিড়তে পারছে না, অনেক দূরে নোঙ্গর করে বসে থাকতে হয়, ছোট ছোট জাহাজ ও নৌকা গিয়ে সেগুলো থেকে মালামাল খালাস করে নিয়ে আসে, এতে সময় ও অর্থের অপচয় হচ্ছে। চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরের গভীরতা বাড়ানোর যেমন কোন উদ্যোগ নাই অপরদিকে সকল সুযোগ থাকা সত্তেও মংলা বন্দরকে দীর্ঘ ৪৪ বছরেও একটা বিকল্প বা দ্বিতীয় সমুন্দ্র বন্দর হিসেবে কার্যকর করে তুলতে পারেনি। পাকিস্তান আমলেই এ দেশে চট্টগ্রামে একটা তেল শোধনাগার (ইস্টার্ন রিফাইনারী) প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল, জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে বিভিন্ন ক্ষেত্রে জালানী তেলের চাহিদা হাজার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু ৪৪ বছরেও কি দেশে আর একটা রিফাইনারী তৈরী করা হয়েছে, বরং যেটা আছে সেটাকেও রক্ষণাবেক্ষণ করতে এখন হিমসিম খাচ্ছে, ইদানিং শোনা যাচ্ছে এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ভারতকে দেওয়া হচ্ছে। বিগত প্রায় দুই বছর যাবত আন্তর্জাতিক বাজারে জালানী তেলের দাম কমে প্রতি ব্যারেল মাত্র ৪০ ডলারে (এখন আরো কম)  বিক্রি হচ্ছে - যা আগে ছিল ১৫০ ডলারেরও বেশী। যদি দেশে আর একটা রিফাইনারী থাকত তবে এখন আগামী ১০ বছরের জন্য তেল এনে মওজুত করে রাখা যেত, আর অপরিশোধিত তেলের (ক্রুড ওয়েল) দামতো আরো কম। দীর্ঘ ৪৪ বছরেও কেন এই সক্ষমতা অর্জন করা গেল না ? এই দূরদর্শিতা কি আমাদের শাসকদের আছে? অপরদিকে কম দামে বিদেশ থেকে তেল কিনে দেশের মানুষের কাছে তা বেশী দামেই সরকার বিক্রি করছে, এই সুযোগে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বিগত কয়েক বছরের ২৯ হাজার কোটি টাকার দেনা মিটিয়েও গত অর্থ বছরে ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে (সূত্র কালের কন্ঠ, ২২/১২/১৫ ইং )।

 

পাকিস্তান আমলে চট্টগ্রামের কাপ্তাইতে যে বিশাল পানি বিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরী করা হয়েছিল তা এখন অকার্যকর হয়ে আছে, কর্নফুলী নদীতেও এখন সেই স্রোত নাই, কাপ্তাই লেকেরও বেহাল দশা, এখন আর প্রপেলার ঘুরানোর মত পানি নাই। ৭.৫ কোটি জনগণের জন্য তখন যে পরিমাণ বিদ্যুতের প্রয়োজন ছিল তা এ দেশেই উৎপাদিত হত (সিদ্ধিরগঞ্জ, ঘোড়াশাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রও তখনকার তৈরী), স্বাধীনতার আগে এ দেশের মানুষ লোড-শেডিং দেখেনি বা বুঝেনি এটা কি জিনিষ, বিদ্যুতের অভাবে তখন কোন কল-কারখানাও বন্ধ থাকত না, তারপরেও পাবনার রূপপুরে পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরীর পরিকল্পনা স্বাধীনতার আগেই নেওয়া হয়েছিল এবং কাজও শুরু হয়েছিল। তাহলে স্বাধীন হওয়ার পর যখন দেশের জনসংখ্যা ও বিদ্যুতের চাহিদা বাড়া শুরু হল তখন কেন স্বাধীন দেশের শাসকরা ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে পরবর্তী ৫০ বছরের চাহিদা মেটানোর জন্য আরো বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র তৈরী করেনি ? ৪৪ বছর পার করে যখন বিদ্যুতের অবস্থা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে এখন দিশেহারা হয়ে কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র তৈরী করে হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে (জনগণের গলা কেটে) এবং ভারত, নেপাল, ভূটান থেকে বিদ্যুৎ আমদানী করে চাহিদা মেটানোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে, ৪৪ বছর পর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক সুবিধার্থে রাশিয়ার সাথে চুক্তি করা হয়েছে (যেখানে ভারতের নাগপালে রাশিয়ার পারমাণবিক প্রকল্প নিয়ে ভয়াবহ বিপর্যয়ের উদাহরণ আছে ), অথচ স্বাধীনতার আগে এর নির্মানের দায়িত্বে ছিল ফ্রান্স। আমাদের শাসকরা যখন কোন কিছুর পরিণাম চূড়ান্ত আকার ধারণ করে তখন (যখন বহু সময় পার ও ক্ষয়-ক্ষতি হয়ে যায়) সমাধানের জন্য নড়ে-চড়ে বসে অর্থাৎ ঠেকে শিখে বা করে, পরিণামের কথা আগে ভেবে সেভাবে স্বাধীন দেশের জন্য যুগোপযোগী ভবিষ্যত পারিকল্পনা করার বা ভাবারও যোগ্যতা ও দক্ষতা এদের নাই।

 

এবারের বিজয় দিবসে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ভারতীয় সেনা সদস্যদের জীবিত ৬০ জন অতিথিও আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন, এটা খুবই প্রশংসনীয় ও তাৎপর্যপূর্ন ঘটনা। ভারত সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে এবং আমাদেরকে সার্বিকভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করেছিল বলেই ১৯৭১ সালে ৯ মাসে আমরা দেশ স্বাধীন করতে পেরেছিলাম। যে দেশটি বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটার জন্মের জন্য এত কিছু করেছিল সেই দেশটাইতো আমাদের সবচেয়ে ঘনিষ্ট বন্ধু হওয়া উচিত, আমরা তা মনে করলেও ভারত কি তা মনে করে?

 

স্বাধীনতার পর পরীক্ষামূলকভাবে ফারাক্কা বাঁধ চালু করার কথা বলে স্থায়ীভাবেই তা চালু রেখেছে, এর ফলে বাংলাদেশের নদ-নদীর অবস্থা এখন করুণ, আরো অন্যান্য নদীতেও একতরফা বাঁধ দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে, তিস্তা নদীর পানি প্রবাহ নিয়ে বাংলাদেশের সাথে চুক্তি করতে গড়িমসি করছে, অথচ বাংলাদেশের কাছ থেকে ট্রানজিট, করিডোর সবকিছুই একে একে আদায় করে নিচ্ছে, বাংলাদেশের উপর দিয়ে এখন ভারতীয় ভারি যানবাহন চলাচল শুরু করেছে, চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করছে, ভারতের এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য বাংলাদেশের ভূখন্ডের উপর দিয়ে খুঁটি বসানো হচ্ছে, ৪২ বছর আগে চুক্তি হওয়ার পর সাথে সাথেই তাদের বেরুবাড়ি নিয়ে গেল, কিন্তু আমাদের সাথে  সিটমহল বিনিময় করল এখন ৪২ বছর পর। সবচেয়ে বড় দুখ:জনক আচরণ হল সীমান্তে বাংলাদেশীদের গুলি / নির্যাতন করে হত্যা করা (ফেলানী হত্যাসহ), এ ব্যাপারে ফ্ল্যাগ-মিটিং ছাড়াও বিগত ৩০ বছরে অসংখ্য বার উচ্চ পর্যায়ের আলোচনা হয়েছে, কিন্তু বি,এস,এফ বাংলাদেশী হত্যা বন্ধ করছে না। এই বছর নভেম্বর মাস পর্যন্ত ১১ মাসেই ৫৬ জনকে হত্যা করেছে। পাকিস্তান আমলে ভারতের সাথে যে সীমান্ত ছিল বাংলাদেশের সাথে তাই আছে, পাকিস্তান আমলেও সীমান্তে চোরাচালান হত, কিন্তু তখন কখনও বি,এস,এফ একজন বাংগালীকেও এভাবে হত্যা করত না, এখন কি বন্ধু দেশ বলে ভালবেসে তা করছে? মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বাংলাদেশী দোসরদের বিচার করা হচ্ছে বলে পাকিস্তান যেভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছে তার বিরুদ্ধে আমাদের সরকারের তীব্র প্রতিবাদ ও অবস্থান প্রশংসনীয় (যদিও আমাদের দেশের উপর তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোন প্রভাব নাই), কিন্তু বাংলাদেশের কোন সরকারই ভারতের এমন শত্রুতামূলক ও অমানবিক আচরণের (যার প্রভাব আমাদের উপর প্রত্যক্ষভাবে পড়ছে) জন্য ভারত সরকারের বিরুদ্ধে কোন কড়া অবস্থান নিতে পারেনি বা নেয় না। বাংলাদেশ তাহলে আর একটা দেশের এমন আচরণ সহ্য করছে কেন? ভয়ে নাকি গদি রক্ষার জন্য ভারতের সমর্থন হারাবে বলে ?

 

বর্তমান সরকারের সাথে সুর মিলিয়ে সরকার সমর্থিত মহল সবার মুখেই এখন একই সুর বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, ২০২১ সালের মধ্যে আমরা মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হব, বাংলাদেশ হবে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে উন্নয়নের মডেল, ইত্যাদি ইত্যাদি। সত্যিই এখন বাংলাদেশ নামক ইঞ্জিনটা এগিয়ে যাচ্ছে, দীর্ঘ ৪৪ বছর পর এখন ইঞ্জিনে গতি এসেছে, কিন্তু যে স্বপ্ন পূরণের জন্য তথা মুক্তিযুদ্ধের যে চেতনা (সূচনায় উপরে উল্লেখিত) বাস্তবায়ন করার জন্য আমরা যুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিলাম সেই স্বপ্ন ও চেতনাগুলো বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে কি ইঞ্জিন এগিয়ে যাচ্ছে নাকি এগুলোকে ইঞ্জিনের চাকায় পিষ্ট করে দুমড়ে-মুচড়ে দুর্নীতি, লুট-পাট, নদ-নদী, খাল-বিল দখল, বন-জঙ্গল, পাহাড়-পর্বত উজাড়, কুশাসন, ন্যায়বিচারহীনতা, হিংস্রতা, সন্ত্রাস, খুন, গুম, অপহরণ, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, জান-মালের চরম নিরাপত্তাহীনতা, সামাজিক মূল্যবোধের চরম অবনতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, ভালবাসা, মায়া-মমতাহীন সামাজিক বন্ধন, অপরাজনীতি, দলবাজি, গনতন্ত্রহীন শাসন ব্যবস্থা তথা স্বৈরাচারী কায়দায় দেশ শাসন এসব কিছু দিয়ে ট্রেনের বগিগুলো ভরে কি ইঞ্জিন এগিয়ে যাচ্ছে ? তাহলেত সেই খাঁটি বাংলা প্রচলিত প্রবাদের মতই হবে “উপর দিয়ে ফিট-ফাট, নিচে দিয়ে সদরঘাট”, গাছের উপর দিয়ে পানি ঢেলে নিচে দিয়ে শেকড় কাটার মত। বাংলাদেশের জলবায়ু, প্রকৃতি, নদ-নদী, খাল-বিল, পাহাড়-পর্বত, বন-জঙ্গল, কৃষিভূমি, কৃষক এসবই হল বাংলাদেশের প্রাণ, বাংলাদেশের জীবনটাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য এগুলোই হল একমাত্র শক্তি। কিন্তু বিগত ৪৪ বছরে আমরা বাংলাদেশকে বাঁচিয়ে রাখার এই মূল শক্তিকেই ঠাণ্ডা মাথায় গলা টিপে মেরে ফেলার কাজটা করে যাচ্ছি। স্বাধীনতার আগেও এই বাংলার যে নৈসর্গিক রূপ ছিল যা নিয়ে বাংলার বিখ্যাত কবি সাধকরা কবিতা ও গান লিখতে উদ্বুদ্ধ ও বিখ্যাত হয়েছিলেন আজ বাংলার সেই রূপ কোথায়ও খুজে পাওয়া যায় না। ২২ ডিসেম্বর দৈনিক যুগান্তরের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় কুমিল্লার গোমতি ও মেঘনা নদীর মিলনস্থল বা মোহনা এখন শুধুই বালুচর,  পানির অভাবে সেখানে নদী পরিণত হয়েছে মরুভূমিতে, দুপাশের এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ অনবরত রুক্ষ থেকে রুক্ষ হয়ে উঠছে, এই সোনার বাংলা গড়ে তোলার স্বপ্ন কি আমরা স্বাধীনতার আগে দেখেছিলাম ?

 

৪৪ বছরের ব্যর্থতাকে ঢাকতে ও আত্মতুষ্টির জন্য ব্যর্থ শাসকরা ও তাদের দোসররা সব সময়েই যুক্তি দেয় বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে বলেইতো আমরা একটা দেশ পেয়েছি, একটা পতাকা পেয়েছি, জাতীয় সংগীত পেয়েছি, একটা স্বাধীন ভূখণ্ড পেয়েছি, নিজস্ব পাসপোর্ট পেয়েছি, আমরা জজ-ব্যরিষ্টার ও আরো কত কি হতে ও করতে পেরেছি। স্বাধীনতার আগেওতো পাকিস্তান নামক একটা দেশ আমাদের ছিল, একটা পতাকা ছিল, জাতীয় সংগীত ছিল, পাকিস্তানী পাসপোর্টও ছিল, বসবাসের জন্য আমাদের এই ভূখণ্ডটাও ছিল, পাকিস্তানের জন্মের পর ২৩ বছর এবং (দেশ যদি স্বাধীন না হত) পরবর্তী ৪৪ বছরে আমরা হয়ত আরো অনেক কিছুই পেতাম বা হতাম, তাহলে পার্থক্যটা কোথায় ?

 

একটা পতাকা, একটা জাতীয় সংগীত, একটা পাসপোর্ট ও একটা ভূখণ্ডই কি শুধু স্বাধীনতা? যদি তাই হয় তবেত আমরা তখন স্বাধীনই ছিলাম, তাহলে পাকিস্তানের কাছ থেকে যুদ্ধ করে পৃথক হলাম কেন ? কেন পৃথক হলাম সেই জবাবের মধ্যেই খুঁজতে হবে আমাদের স্বাধীনতার যথার্থতা বা যৌক্তিকতা এবং যে উদ্দেশ্য, স্বপ্ন ও লক্ষ্যকে সামনে রেখে আমরা স্বাধীন হয়েছিলাম ৪৪ বছরেও কি তা বাস্তবায়ন করতে পেরেছি বা  এখন যেভাবে ও যেসব আবর্জনা দিয়ে ট্রেনের বগি ভর্তি করে বাংলাদেশ নামক ইঞ্জিনটা এগিয়ে যাচ্ছে তা দিয়ে কি আগামী আরো ৪৪ বছরেও সেই গন্তব্যে (“সোনার বাংলায়”) পৌঁছাতে পারব ? মানুষ একটা রাষ্ট্র গঠন করে এজন্য যে রাষ্ট্র তার মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করবে, তার জান-মালের নিরাপত্তা দিবে তথা নাগরিক জীবনকে শান্তি ও স্বাচ্ছ্যন্দময় করে তুলবে, আয়-রোজগার তথা ভালভাবে বেঁচে থাকার ব্যবস্থা ও সুযোগ করে দিবে। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনাগুলোর কথা যদি বাদও দেওয়া হয় মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ, জান-মালের নিরাপত্তা, নাগরিক জীবনকে শান্তি ও স্বাচ্ছ্যন্দময় করে তোলা এবং আয়-রোজগার তথা ভালভাবে বেঁচে থাকার ব্যবস্থা ও সুযোগ কি স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা ও শাসকরা ৪৪ বছরেও  করে দিতে পেরেছে? ১৬ কোটি মানুষের দেশ এখন, মানুষতো বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করবেই, কোন না কোনভাবে আয়-রোজগারের ব্যবস্থা করতেই হবে, মানুষের বেঁচে থাকার ও আয়-রোজগারের সংগ্রামের মধ্য দিয়েই এখন বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরছে, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি হচ্ছে, তাই শাসক গোষ্ঠী ও তাদের সমর্থকরা সান্ত্বনামূলক আত্ম-তৃপ্তি বা সন্তুষ্টি নিয়ে বলছে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে।

 

কিন্তু এই এগিয়ে যাওয়ার গতি পেতে যেমন ৪৪ বছর সময় লাগা মোটেও প্রত্যাশিত নয় তেমনি এই এগিয়ে যাওয়ার মূল শক্তি যদি দেশের নিজস্ব প্রাকৃতিক তথা কৃষিজ, জলজ, বনজ, খনিজ এবং দক্ষ ও প্রশিক্ষিত মানবসম্পদের উপর ভিত্তি করে দাঁড়াতে না পারে তবে তারও কোন স্থায়িত্ব থাকবে না, বিকল্প ও ক্ষণস্থায়ী চাহিদার উপর নির্ভর হয়ে দেশকে বেশী দূর এগিয়ে নেওয়া যায় না । অপরদিকে এই এগিয়ে যাওয়ার কোন অর্থ বা মূল্য নাই যদি স্বাধীন বাংলাদেশ তথা শাসকরা মানুষের মৌলিক অধিকার, জান-মালের নিরাপত্তা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং মুক্তিযুদ্ধের মূল প্রেরণা, লক্ষ্য ও চেতনাগুলোকে নিশ্চিত ও বাস্তবায়ন করতে না পারে, তা না হলে আগামী ৪৫ বছর পরেও সোনার বাংলা কায়েম করার আকাংখ অপূর্নই রয়ে যাবে। স্বাধীনতার আগে শ্লোগান ছিল “সোনার বাংলা শ্মশান কেন”? স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর এখন সোনার বাংলা কি স্বর্গে পরিণত হয়েছে ? বরং স্বাধীনতার আগে সোনার বাংলা শব্দটার আক্ষরিক অর্থ বলতে যা বুঝায় তার কিছুটা রং, রূপ ও ছোয়া বাংগালীদের জীবন ও উপলব্ধিতে ছিল, কিন্তু এখন সুখের ঢেকুর তুলে যেই বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে বলা হয় তার সাথে কি সোনার বাংলার ছিটে-ফুটো কোন চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়? মধ্য আয়ের দেশে নয়, বরং বলা যায় মধ্যযুগীয় বর্বতার যুগে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এজন্য নিশ্চয়ই আমাদের স্বাধীনতা দায়ী নয়, দায়ী আমাদের ব্যর্থ শাসক গোষ্ঠী এবং আমরা আবেগ-প্রবণ, অপরিণামদর্শী ও আত্মঘাতী বাংগালী জাতি।

 

লেখক : জাহিদ হাসান, রিয়াদ, সউদী আরব।

 

 

 

 

সাম্প্রতিক পোষ্টসমূহ