Banner
স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের রাষ্ট্রদর্শন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে মিথ্যার বেসাতি ─ হাবিবুর রহমান

লিখেছেনঃ হাবিবুর রহমান, আপডেটঃ April 1, 2017, 12:00 AM, Hits: 253

 


১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র জারি করা হয়। সেই ঘোষণাপত্রের মহান আদর্শ বাস্তবায়নে বীর জনগণ মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করে। লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণ উৎসর্গ করে বিজয় ছিনিয়ে আনে। এটা ছিল মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের সাথে নতুন একটি রাষ্ট্র গঠনের চুক্তি। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের গুরুত্বপূর্ণ দিক হল মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত রাষ্ট্রের আদর্শিক ভিত্তি কি হবে তার সুস্পষ্ট ঘোষণা। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, ‘সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী বাংলাদেশের জনগণ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রতি যে ম্যানডেট দিয়েছেন সে ম্যানডেট মোতাবেক আমরা, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা, আমাদের সমবায়ে গণপরিষদ গঠন করে পারস্পরিক আলাপ আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশকে সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র ঘোষণা করছি’। সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার অর্থাৎ এই ত্রয়ী আদর্শ বাস্তবায়ন করার জন্য বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করা হয়েছে। এটাই ছিল মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদর্শন। এর আলোকেই মুক্তিযোদ্ধারা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে গেছেন। তাই মুক্তিযুদ্ধকে এই ত্রয়ী আদর্শ থেকে আলাদা করা যাবে না। ফলে এই ত্রয়ী আদর্শের পরিবর্তন হতে পারে না। কিম্বা প্রতিস্থাপন বা উপেক্ষাযোগ্য নয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে স্বাধীন বাংলাদেশে কখনোই এই আদর্শগুলো অনুসরণ করা হয় নি।


সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে করা হয়েছে স্বাভাবিকভাবে তা বাস্তবায়ন করার কথা স্বাধীনতা উত্তর রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ তথা রাষ্ট্র শাসকদের। এর আলোকে তারা তাদের লক্ষ্য, কর্তব্য নির্ধারণ করবেন। স্বাধীনতা অর্জনের ৪৬ বছর পরেও প্রশ্ন উঠেছে বাংলাদেশ রাষ্ট্র এগুলো আদর্শ হিসেবে নিয়েছে কি না, এগুলো আদৌ   বাস্তবায়ন হয়েছে কি না। বলা হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার এক বছরের মধ্যেই সে আদর্শ ভয়ঙ্কর ভাবে পরাজিত হয়, এই আদর্শিক ভিত্তি বিসর্জন দেয়া হয়। স্বাধীনতা অর্জনের ৪৬ বছর পরেও রাষ্ট্রে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় এক কদমও এগুতে পারিনি, বরঞ্চ অনেক দূর পিছিয়ে গিয়েছি।  এসব ভাষ্য মতে –


প্রথমত, বাংলাদেশের সংবিধানের কোথাও সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার শব্দ তিনটি স্থান পায় নি, সংবিধানে এই তিনটি আদর্শকে সম্পূর্ণভাবে বাদ দেয়া হয়েছে। বরঞ্চ স্বৈরশাসন-নিপীড়ন-বৈষম্যের রাষ্ট্র কাঠামো বিলুপ্ত করে উচ্চতম মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণের পরিবর্তে আবারো ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থা পুনর্বহাল করা হয়েছে/ বহাল রাখা হয়েছে।


তিনটি শব্দের সমাহারে আদর্শ প্রকাশের রীতি বেশ পুরনো। ইংরেজ দার্শনিক জন লক উদ্ভাবিত life, liberty, and property শব্দ তিনটি পরবর্তীতে টমাস জেফারসন আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে স্থান দেন ‘life, liberty, and Pursuit of Happiness’ এই তিন আদর্শ হিসেবে। রুশ বিপ্লব তথা অক্টোবর বিপ্লবের ঘোষণায় ছিল ‘Peace, Land & Bread’. আর ফরাসী বিপ্লবের মূলমন্ত্র ছিল Liberty, Equality and Fraternity বা মুক্তি, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব। এই ঘোষণাপত্রের আদর্শকে ফ্রান্সের সংবিধানের Preamble-এ বলা হয়েছে Common ideals of liberty, equality and fraternity. আর সেই আদর্শকে ফ্রান্সের সংবিধানের আর্টিকেল – ২ এ বলা হয়েছে ‘The maxim of the Republic shall be “liberty, equality and fraternity.” ফ্রান্স তার ঘোষণাপত্রের আদর্শকে সংবিধানের Preamble-এ  রাষ্ট্রদর্শন হিসেবে নির্দেশনা দিয়েছে এবং সংবিধানে সেই তিন আদর্শের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি ঘোষণা করেছে।


কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের  ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার’ এই তিন আদর্শকে বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনা বা অন্য কোথাও রাষ্ট্রের আদর্শিক ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয় নি। অথচ এই তিন আদর্শের ভিত্তিতে রাষ্ট্র নির্মিত হবে এটাই ছিল শহীদদের রক্তের সাথে আমাদের সম্পাদিত চুক্তি।


দ্বিতীয়ত, স্বাধীনতা অর্জনের ৪৭ বছরেও এই তিন আদর্শ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার বিন্দুমাত্র পালন করা হয় নি। প্রথমে সাম্যের কথায় আসা যাক। সাম্য বলতে অনেক কিছু বোঝানো হয়ে থাকে। যেমন আইনগত সাম্য, রাজনৈতিক সাম্য, সামাজিক সাম্য এবং অর্থনৈতিক সাম্য। অর্থাৎ রাষ্ট্রের সকল মানুষের আইন প্রণয়ন, নেতৃত্ব নির্বাচন এবং জীবন যাপনের জন্যে সবকিছু পাবার অধিকার থাকবে। এসব ক্ষেত্রে স্বাধীন বাংলাদেশে ব্রিটিশ ও পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক আমল থেকে বিশেষ ফারাক খুঁজে পাওয়া যাবে না। যেমন পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার মানুষের তীব্র ক্ষোভের একটি বড় কারণ ছিল বৈষম্য। এই বৈষম্য ছিল আয়ে, পণ্য মূল্যে, কর্মসংস্থানে, রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যে এবং সর্বত্র। সোনার বাংলা স্মশান কেন – এই পোস্টারটি তৎকালীন পূর্ব বাংলার সর্বস্তরের মানুষকে ভীষণ ভাবে নাড়া দিয়েছিল। বাইশ পরিবারের হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল পাকিস্তানের তাবৎ সম্পদ। স্বাধীন বাংলাদেশে এই অবস্থার একটুকুও অদলবদল হয় নি। কিছুসংখ্যক পরিবারের হাতে রাষ্ট্রের সম্পদের কেন্দ্রীভবন ঘটে চলেছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০১৪ অনুযায়ী দেশের এক তৃতীয়াংশ (৩৬ শতাংশ) সম্পদের মালিকানা মাত্র ১০% মানুষের হাতে কুক্ষিগত রয়েছে। বিপরীতে সবচেয়ে গরীব ১০% ভাগের হাতে সম্পদ রয়েছে মাত্র ২%। দেশের প্রায় ৭৮ শতাংশ মানুষের দৈনিক আয় ৩.১ ডলার বা ২৫০ টাকার নিচে। আর দৈনিক ১.০৯ ডলার ১৫০ টাকার নিচে আয় করেন প্রায় ৪৪ শতাংশ মানুষ ( ২০১৬ এর জুনে প্রকাশিত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় সমীক্ষা)। অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের ৪০ থেকে ৫০ হাজার মানুষের কাছে ৪০ শতাংশের বেশী সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয়েছে। দেশের আয় বা প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। আর আয়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বৈষম্য – ধনী-গরীবে, শহরে-গ্রামে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য থেকে দেখা যায় ১৯৯০ সালের পর থেকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়তে থাকে। একই সাথে বাড়তে থাকে আয় বৈষম্য। ১৯৮০-৯০ সময়কালে দেশের গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ৩.৭ শতাংশ। ওই সময় জিনি বা গিনি সহগের মান ছিল ০.৩০। ১৯৯১-২০০০ সময়কালে গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ৪.৮ শতাংশ, আর গিনি সহগের মান ছিল ০.৪১। আর ২০০১-১০ সময়কালে গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ৫.৮ শতাংশ এবং গিনি সহগের মান দাঁড়ায় ০.৪৫। অথচ  বাংলাদেশের জন্মকালে তা ছিল মাত্র ০.২৮। জিনি বা গিনি সহগ ( Gini coefficient )  অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সূচক যা কোন দেশের আয় বা সম্পদ বণ্টনের অসমতা বোঝানোর জন্য ব্যবহার করা হয়। গিনি সহগের মান শূন্য হলে বুঝতে হবে দেশে কোন বৈষম্য নেই, আর গিনি সহগের মান এক হলে বুঝতে হবে বৈষম্য চরমে পৌঁছেছে। গিনি সহগ যদি বাড়তে বাড়তে ০.৫০ এর কাছাকাছি পৌছায় বা অতিক্রম করে তা অর্থনীতির জন্য মারাত্মক।    


ব্যক্তি বা ব্যক্তি সমষ্টির আত্মমর্যাদাবোধ, শারীরিক ও মানসিক অনন্যতা ও যোগ্যতা অনুযায়ী ক্ষমতায়নের দাবীগুলোর সমন্বয়ে মানবিক মর্যাদা গঠিত হয়। যে সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রত্যেক নাগরিক ধর্ম, বর্ণ, জাতি ও শ্রেণী নির্বিশেষে মানুষ হিসেবে সমান সম্মান ও মর্যাদা পেয়ে থাকে সে সমাজ ও রাষ্ট্রে মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত আছে বলা যায়। সবধরনের ( অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ) দাসত্ব থেকে মুক্ত মানুষেরা মানবিক ও আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন মানুষ হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে। মানবিক মর্যাদা নিয়ে ১৯৪৮ সালে মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা ছিল সব মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন এবং মর্যাদা ও অধিকারের ক্ষেত্রে সমান। জার্মান সংবিধানে মৌলিক অধিকারের শীর্ষে রয়েছে মানবিক মর্যাদা। এতে বলা হয়েছে মানবিক মর্যাদা অলঙ্ঘনীয়। একে রক্ষা করা রাষ্ট্রের কর্তব্য।


ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রভু আমাদেরকে ঘৃণাভরে নেটিভ বলে ডাকতো। পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গিও ব্রিটিশদের থেকে খুব একটা হেরফের ছিল না। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে জাতপাতের বিভেদ প্রকট নয়। কিন্তু সমাজে আশরাফ-আতরাফ, উচু-নিচু বিভেদ বিরাজিত ছিল, ভিন্ন আঙ্গিকে এর সবই সমাজে বহাল রয়েছে। সর্বোপরি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রভু-ভৃত্য সংস্কৃতি সমাজে প্রবল ভাবে বিরাজ করছে।  


বৃহৎ অর্থে স্বাধীনতা শুধু ভৌগলিক সীমানার সার্বভৌমত্ব কিম্বা রাষ্ট্রখণ্ড বা মানচিত্র নয়, ওই মানচিত্রের, ওই ভূখণ্ডের প্রতিটি নাগরিককে সার্বভৌম, স্বশাসিত, মর্যাদাবান ও অধিকারভোগী করে গড়ে তোলাই হল স্বাধীনতার মর্মবাণী। অর্থাৎ এমন রাষ্ট্রে প্রত্যেক ব্যক্তি সার্বভৌম। রাষ্ট্র ব্যক্তির সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ হয় এমন কোন আইন বা বিধি  প্রণয়ন বা প্রয়োগ বা বলবত করতে পারে না। তাই মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত আছে এমন কোন রাষ্ট্রে বাংলাদেশের মত বিনা বিচারে বা বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয় না। এসব রাষ্ট্রে এনকাউন্টার, ক্রসফায়ার ইত্যাদি বিভিন্ন নামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী এমন নির্বিচারে তার নাগরিকদেরকে হত্যা করতে পারে না।  


ব্যক্তি ও সমাজের মাঝে ন্যায়সম্মত ও যথাযথ সম্পর্ক হল সামাজিক ন্যায় বিচার। এর পরিমাপ নির্ধারিত হয় সম্পদের যথাযথ বণ্টন, সামাজিক সুযোগ সুবিধা ও ব্যক্তির সুবিধার নিরিখে। রাষ্ট্রের সকল নাগরিক যদি সম্পদের বণ্টন, সুযোগ-সুবিধাগুলো সমান ভাবে ভোগ করতে পারে তাহলে ওই রাষ্ট্রে সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত আছে বলা যায়। তাই সামাজিক ন্যায় বিচার হচ্ছে এমন এক ব্যবস্থা যা ব্যক্তিজীবনে পূর্ণতা আনে, সমাজ থেকে তার প্রাপ্য নিশ্চিত করে এবং সমাজে সক্রিয় অবদান রাখতে সহায়তা করে। সুতরাং সামাজিক ন্যায়বিচার আর মানব উন্নয়নের লক্ষ্য এক ও অভিন্ন।  আইএলওর মুখবন্ধে বলা হয়েছে— বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য অত্যাবশ্যকীয় ভিত্তি হচ্ছে সামাজিক ন্যায়বিচার। সামাজিক ন্যায়বিচার ধারণার প্রচলন ১৮৪০ সালে, Luigi Taparel নামক ধর্মযাজক এ ধারণার জনক।


শুধুমাত্র সম্পদ ভোগে আকাশচুম্বী বৈষম্য, রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা ভোগের পার্থক্য দিয়েও বলা যায় বাংলাদেশে সামাজিক ন্যায় বিচার ভূলুণ্ঠিত।


তৃতীয়ত সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার এই তিনটি শব্দের নির্দিষ্ট সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। যে প্রেক্ষাপট এই তিনটি শব্দকে অর্থবহ করে তোলে। প্রকৃত অর্থে এই শব্দগুলো নির্দিষ্ট সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে মানুষে মানুষে সামাজিক সম্পর্কের ঐতিহাসিক রূপকেই চিহ্নিত করে। মানুষে মানুষে বিশেষ রাজনৈতিক সম্পর্কও নির্দিষ্ট সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটেই জন্মলাভ করে। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে উল্লিখিত তিনটি শব্দকে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটেই বুঝতে হবে। এবং আমাদের রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমকে সেই নির্দিষ্ট রাজনৈতিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের দিকে লক্ষ্য রেখেই নির্ধারণ করে তাকে কার্যকর রূপ দিতে হবে। এই কাজে প্রথম প্রথম পদক্ষেপ হবে স্বাধীনতার ঘোষণাকে কার্যকর রূপ দেওয়ার জন্য সেই লক্ষ্যাভিমুখী কার্যকর রাষ্ট্রীয় সংবিধান প্রণয়ন যার অনুশীলনের ধারায় স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের আদর্শ বাস্তবায়নের উপযোগী রাজনৈতিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈশিষ্ট্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের আদর্শকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে যেসব বিষয় রাষ্ট্রীয়ভাবে কার্যকর করা প্রয়োজন তা হচ্ছে -       


একঃ দেশীয় সম্পদের উপর জাতীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা।  জাতীয় অর্থনীতিতে দেশীয় উৎপাদনশীল পূঁজির কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এবং এই নিয়ন্ত্রণের ধারায় অভ্যন্তরীণ বাজারের বিকাশ নিশ্চিত করা । উৎপাদনশীল বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উৎপাদনের উপায় নির্মানকারী শিল্পের সঙ্গে ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী শিল্পের সামন্জস্যপূর্ণ বিকাশ নিশ্চিত করা । অর্থাৎ বাংলাদেশের বিদ্যমান অর্থব্যবস্থাকে উৎপাদনশীল অর্থনীতিতে রূপান্তর ঘটাতে হবে। যে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দেশীয় উৎপানশীল খাতকে লাভজনক খাতে পরিণত করতে অক্ষম তার অবসান এবং দেশীয় উৎপানশীল খাতকে লাভজনক করে তুলতে সক্ষম রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কাঠামো প্রতিষ্ঠা করতে হবে।


দুইঃ দেশীয় অর্থ-সম্পদের বিদেশ পাচার ও দুর্নীতি রোধ করা । গ্লোবাল ফিনান্সিয়াল ইনটিগ্রিটি, ইউএনডিপিসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের গবেষণালব্ধ তথ্যমতে ২০০৪ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ১ দশকে বাংলাদেশ থেকে ৫৬.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পাচার হয়েছে। শুধু মাত্র ২০১৩ সালে পাচার হয়েছে ৯.৬ বিলিয়ন ডলার। ২০১৩ সালের পাচার হয়ে যাওয়া অর্থ বাংলাদেশের ২০১৫-১৬ অর্থ বছরের শিক্ষা, স্বাস্থ, পরিবহণ, পল্লী উন্নয়ন, শিল্প ও ভৌত মোট উন্নয়ন বাজেটের সমান। ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক আমলে অর্থ পাচার হয়েছে, অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে এদেশের জনগণ আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে অর্থ পাচার বন্ধতো হয়ই নি, বরং ইদানিং বেড়ে গেছে বলা চলে। ঘুষ-দুর্নীতি, অবৈধ ব্যবসা, চোরাকারবার, কালোবাজারি, লুটপাট ইত্যাদি উপায়ে কালো অর্থনীতির বলয় সৃষ্টি করা হয়েছে। এভাবে বছরে ৮০ হাজার কোটি টাকার বেশি কালো টাকা সৃষ্টি করছে যা জাতীয় আয়ের এক তৃতীয়াংশের বেশী। এই কালো টাকার একটি অংশ পাচার হয়ে যায়। টিআইবি’র সমীক্ষা অনুসারে বাংলাদেশে যে দুর্নীতির কারণে প্রতিবছর জিডিপি’র প্রায় ২-২.৫% ক্ষতি হচ্ছে তার প্রধান ক্ষেত্র হচ্ছে সরকারী ব্যয়। অথচ আমাদের সংবিধানে রাষ্ট্রের আয়ব্যয়কে প্রশ্নের ঊর্ধ্ব-এ, আদালতের এখতিয়ারের বাইরে রাখা হয়েছে। তাই বিদ্যমান দুর্নীতি, পুঁজি পাচার এবং জনসম্পদ ও জাতীয় সম্পদ লুটপাটকারীদের সহায়ক দায়মুক্তির বিধানসহ অনুরূপ সবধরনের বিধান পরিবর্তন এবং পুঁজি পাচার, দুর্নীতি লুটপাট বন্ধে সহায়ক বিধিবিধান প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ।     


তিনঃ সর্বোপরি রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক করতে হবে। এজন্যে-


-    সংবিধানে সরকারের প্রধান নির্বাহীকে সকল আইন কানুনের ঊর্ধ্ব-এ রাখা হয়েছে এবং দেশের সকল ক্ষমতা তার কাছে ন্যস্ত করা হয়েছে তার পরিবর্তন করতে হবে। রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার ওপর জনগণের প্রকৃত মালিকানা বা কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে।


-    ব্রিটিশ ও পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক আইন ও এর ধারাবাহিকতায় সৃষ্ট বিদ্যমান আইন , বিচার ও শাসন ব্যবস্থা সবার জন্য সমান নয়। এগুলো পরিবর্তন করে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের  তিন আদর্শের সাথে সঙ্গতি রেখে আইন, আদালত, প্রশাসন ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।


-    ব্রিটিশ প্রবর্তিত স্থানীয় শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তে স্বশাসিত, জনগণের প্রতিনিধিত্বশীল স্থানীয় সরকার কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।


-    জাতি-ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায়-নারীপুরুষ নির্বিশেষে রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের সমান নাগরিক ও মৌলিক অধিকার ভোগ করার সাংবিধানিক অধিকার থাকতে হবে। রাষ্ট্র এমন কোন আইন, আদেশ, ফরমান প্রণয়ন, অনুমোদন বা জারী করতে পারবে না যা ব্যক্তির মৌলিক মানবিক অধিকারকে গৌণ করে, হস্তক্ষেপ করে বা লঙ্ঘন করে।


মোটাদাগে বললে, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বর্ণিত সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার উপযোগী রাজনৈতিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণ করা হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্খার প্রকৃত বাস্তবায়ন। এই তিন আদর্শের বাস্তবায়ন হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রকৃত বাস্তবায়ন। এই তিন আদর্শ বাস্তবায়নে অঙ্গীকারাবদ্ধ এবং তাকে বাস্তবে রূপদানের জন্য অনুশীলনরত রাজনৈতিক নেতৃত্বকেই আমরা বলতে পারি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণকারী রাজনৈতিক নেতৃত্ব।


আর তাই মুক্তিযুদ্ধের তিন আদর্শ সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা মানবিক, জনকল্যাণকামী রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে।   

 

 

সাম্প্রতিক পোষ্টসমূহ