Banner
প্রাচীন ভারতবর্ষের গণরাষ্ট্র বা সাধারণতন্ত্র ─ হাবিবুর রহমান

লিখেছেনঃ হাবিবুর রহমান, আপডেটঃ November 30, -0001, 12:00 AM, Hits: 110


                                          
ভুমিকাঃ

 

ভারতীয় উপমহাদেশে কখন, কিভাবে রাষ্ট্রের উদ্ভব হোল তার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া দুষ্কর। বিভিন্ন সূত্র থেকে ধারণা করা যায় আগে থেকেই রাজনৈতিক কার্যকলাপে যুক্ত মানুষগুলোই  প্রথম দিকের রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে। তবে উপমহাদেশের মানুষেরা কখন থেকে রাজনৈতিক কার্যকলাপ শুরু করে বা রাজনৈতিক সংগঠনভুক্ত হয় এবং তার ধরন কিরূপ ছিল তা জানা যায় না। লৌকিক উপাখ্যান, অতিকথা বা পৌরাণিক কাহিনী থেকে তার সামান্যই অনুমান করা যায়। তবে এটা জানা যায় যে, কৌম সমাজে দলপতি নির্বাচনের চর্চা ছিল এবং কৌম সমাজ একত্র হয়ে কোম পরিচালনার বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিত। অর্থাৎ কৌম সমাজে একধরনের রাজনতিক চর্চা ছিল। সমাজ বিকাশের স্বীকৃত পথ ধরে পৃথিবীর অন্যান্য স্থানের মতই  দক্ষিণ এশিয়ায়ও প্রাগৈতিহাসিক কালে পারিবারিক প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে  যৌথ পরিবার ও পারিবারিক সম্পত্তির ধারণা রাষ্ট্রের উম্মেষকালে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আর কৌম বা উপজাতিভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠনের পর্যায় পাড়ি দিয়ে বা এগুলো বিবর্তিত হয়ে রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে। ঋকবেদ থেকে দেখা যায় প্রথম দিকের আর্য সমাজ পরিবার, জনমন, বিস এবং জনতে বিভক্ত ছিল। জনমন সম্ভবত গ্রাম এবং কতগুলো গ্রাম নিয়ে বিস গঠিত হতো। অনেকগুলো বিস মিলে জন বা কৌম বা উপজাতি গঠিত হতো।  বিস প্রধান বিসপতি এবং জনের প্রধান জনপতি বা রাজা। কৌম বা উপজাতির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল বিভিন্ন প্রয়োজনে এরা এক এলাকা থেকে বসবাস গুটিয়ে অন্য এলাকায় বসবাস করতে গিয়ে থাকে। অর্থাৎ এসব মানব গোষ্ঠী স্থায়ী ভূখণ্ডে বাঁধা থাকতো না। তাই এগুলোকে রাষ্ট্র বলা যায় না। উপজাতিভিত্তিক শাসন ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রের মধ্যে পার্থক্য হল – একটি বিশেষ কৌম বা গোত্রের বসবাসের এলাকা নিয়ে তাদের  প্রশাসনিক এলাকা গঠিত। উপজাতি বা গোত্রের মানুষেরা একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় গোত্র বা উপজাতি প্রধান নির্বাচন করতেন। একই এলাকায় বা পাশাপাশি একাধিক উপজাতি বা গোত্র বসবাস করলেও এক গোত্র বা উপজাতির নেতা নির্বাচনে  অন্য গোত্র বা উপজাতি অংশ নিত না বা প্রশাসনিক অংশ হত না। অন্যদিকে একটি রাষ্ট্র সীমানায় বা রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে একাধিক গোত্র বা উপজাতি বা জাতি বসবাস করতে পারে। রাষ্ট্রের শাসক রাষ্ট্র সীমানায় বসবাসকারী সকল মানব গোষ্ঠীকে নিয়ে তার শাসন কার্য পরিচালনা করে থাকেন। বস্তুত প্রাপ্ত তথ্য প্রমাণাদি থেকে প্রধান ধারার ইতিহাসবিদগণ মনে করেন বৈদিক যুগের প্রথম দিকে কৌম বা উপজাতিভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠনের অস্তিত্ব ছিল । তারা বৈদিক যুগের শেষের দিকে ধীরে ধীরে রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে বলে ধারণা করছেন। আর এটা অনুমান করা অসঙ্গত হবে না যে কৌম ব্যবস্থা প্রসারিত হয়ে রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে। ঋকবেদে ২৫০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে কৌম বা উপজাতিভিত্তিক রাষ্ট্রের উদাহরণ পাওয়া যায়। আর ১০০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে  স্থায়ী ভূখণ্ডভিত্তিক রাষ্ট্র পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হতে দেখা যায়। উইকিপিডিয়ায় খ্রিস্টপূর্ব ৪২২৯ অব্দ থেকে পরিবর্তী ২০০০ বছর সময়কালকে বৈদিক যুগের সময়কাল বলা হয়েছে। তবে অধিকাংশ পণ্ডিত ও ইতিহাসবিদ এর মতে বৈদিক যুগের সময়সীমা খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ অব্দ পর্যন্ত মোট ১০০০ বছর। এর মধ্যে আদি বৈদিক যুগ (ঋকবেদের যুগ ) খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ১০০o অব্দ পর্যন্ত ৫০০ বছর।  এই সিদ্ধান্তে গুরুতর প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে সিন্ধু সভ্যতা। তর্কাতীত ভাবে স্বীকৃত এই সভ্যতার বয়স প্রায় ৫ হাজার বছর। তবে সর্বশেষ আবিস্কার থেকে পণ্ডিতেরা বলছেন এই সভ্যতার শুরু ৭ থেকে ৯ হাজার বছর পূর্বে। তাহলে সিন্ধু সভ্যতায় কি রাষ্ট্র ছিল না? পণ্ডিতজনের মধ্যে এ নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে।  জোরালো মত হল সিন্ধু সভ্যতায় রাষ্ট্র ছিল। তাহলে উপমহাদেশে রাষ্ট্রের উদ্ভবের সময়কাল আরও পিছিয়ে নিতে হয় এবং বলতে হয় সিন্ধু সভ্যতার রাষ্ট্র উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন রাষ্ট্র।

 

প্রাচীন ভারতবর্ষে, রাষ্ট্রের ইতিহাসের শুরুর দিকে, অনেকগুলো ছোট রাজ্যের দেখা পাওয়া যায়। বস্তুত শুরুর দিকে বড় রাষ্ট্র বা সাম্রাজ্যের দেখা মেলে না, হওয়াও সম্ভব ছিল না। এক্ষেত্রেও সিন্ধু সভ্যতা প্রশ্ন হয়ে দেখা দিচ্ছে। কেননা সিন্ধু সভ্যতার ব্যপ্তি বিশাল, প্রায় সাড়ে ১২ লক্ষ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে অবস্থিত। যেহেতু সিন্ধু সভ্যতার নগরগুলো একটা থেকে আরেকটি বিশাল দূরত্ব নিয়ে অবস্থিত তাই এগুলো কি স্বাধীন নগর রাষ্ট্র ছিল, নাকি একটি কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত ছিল এ প্রশ্নেরও মীমাংসা হওয়া প্রয়োজন। যাহোক, প্রাচীন ইতিহাসে বিশেষভাবে নিজেদের চিহ্ন রেখে গিয়েছিল যেই সব ছোট রাজ্য, তাদের মধ্যে কিছু ছিল গণরাষ্ট্র। সেখানে রাজা বা নেতা নির্বাচিত হতেন।  রাজ্য শাসনের  উত্তরাধিকারী কে হবেন তা রাজকূলের বংশপরম্পরায় ঠিক করা হত না। রাজ্যের জনগণের মধ্য থেকে  বিশেষ কিছু লোক নেতা নির্বাচন করতেন।

 

ছোট রাজ্যগুলির ইতিহাস সবচেয়ে ভালোভাবে পাওয়া যায় বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মগ্রন্থগুলিতে। পুরাণে এদের কয়েক জায়গায় সামান্য উল্লেখ আছে।  পুরাণগুলি ব্রাহ্মণ্য-ধর্মের নীতি অনুযায়ী মূলত  রাজচক্রবর্তী রাজাদেরই মর্যাদা দিত, ছোটোখাটো রাজাদের সেখানে বিশেষ পাত্তা দেওয়া হয় নি। তা ছাড়া ব্রাহ্মণ্য ধর্ম রাজতন্ত্রকে গুরুত্ব প্রদান করেছে। তাই পুরাণগুলোতে গণরাষ্ট্রের উল্লেখ তেমন মেলে না।

 

এখানে আর একটি বিষয় উল্লেখ করতে হয়। সাধারণভাবে রাজ্যের অধিপতি হিসেবে রাজাকে চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু ভারতবর্ষের প্রাচীন ইতিহাসে রাজা বলতে শুধু রাজ্যের অধিপতিকে বোঝায় নি। যেমন একপন্ন জাতকের কথা ধরতে গেলে লিচ্ছবিগণের ৭৭০৭ রাজা, সেই সংখ্যক উপরাজা ও সেনাপতি ছিল। বৌদ্ধ শাস্ত্র মহাবাস্তু-তে আবার এই সংখ্যাটা অনেক বাড়িয়ে বলা হয়েছে। ঐতিহাসিকরা মনে করেন এই সংখ্যাটা হচ্ছে বিভিন্ন ক্ষমতাশালী ক্ষত্রিয় পরিবারের সংখ্যা, যেখানে ‘রাজা’ হচ্ছে পরিবারের প্রধান ও উপরাজা হচ্ছে তাদের বড় ছেলেরা।

 

গণরাষ্ট্রের এলাকা এবং উদ্ভব ও ব্যাপ্তির সময়কাল

 

প্রবল ধারণা হল কৌম ব্যবস্থা প্রসারিত হয়ে রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে। আর কৌম সমাজে দলপতি নির্বাচনের চর্চা ছিল এবং সমাজের সকলে একত্রে বসে কৌম পরিচালনায় বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিত। তাই এটা ধরে নেয়া অসঙ্গত হবে না যে প্রথম দিকের রাষ্ট্রশাসকগণ প্রধানত জনসম্মতিতে বা একধরনের নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হতেন। অর্থাৎ উদ্ভবকালে রাষ্ট্রগুলো ছিল চরিত্রের দিক দিয়ে মুলত গণরাষ্ট্র, অন্তত বেশিরভাগ রাষ্ট্র। যদিও ‘রাজা’র প্রথম উল্লেখ বহু আগে, ঋগ্বেদে দশ রাজার যুদ্ধের কাহিনীতে পাওয়া যায়,  কিন্তু ইতিহাসে গণরাজ্যের বিবরণ আমরা প্রথম পাই ৬০০ খ্রীষ্ট পূর্বাব্দ নাগাদ। ভারতবর্ষে তখন ষোলটি মহাজনপদ (ষোড়শ মহাজনপদ) গড়ে উঠেছে। তবে ষোলটি মহাজনপদের তালিকা  পুরাণ, বৌদ্ধ শাস্ত্র ও জৈনশাস্ত্রগুলিতে এক এক জায়গায় এক এক রকম। এই মহাজনপদগুলি হয়ে উঠেছিল সেই যুগের রাজনীতি, সৃষ্টি ও কৃষ্টির কেন্দ্র।  তাদের শক্তি যত বেড়েছে, পেশী ফুলিয়ে তারা একে অপরের সাথে যুদ্ধে নিরত হয়েছে, আবার পরস্পরের মধ্যে বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপন করে সন্ধি করেছে। প্রয়োজনে কনফেডারেশন গঠন করেছে। আজ লড়াই ঝগড়া, কাল ভাব, এই ভাবেই গড়ে উঠেছে সেই সময়ের ইতিহাস। গণরাষ্ট্রগুলির কথা মেগাস্থিনিসের ইণ্ডিকা ও অন্যান্য গ্রীক লেখকদের লেখাতেও পাওয়া যায়। মহাভারতেও এই ধরণের রাষ্ট্রের উল্লেখ আছে। যৌধেয়, মালব, উদ্দেহিক ও অর্জুনায়ণ গণগুলির (ব্যক্তির নয়) নাম-অঙ্কিত মুদ্রা খ্রীষ্টাব্দ প্রথম শতাব্দীগুলিতে পাওয়া যায়।  বিভিন্ন সূত্র ও তথ্য থেকে মোটামুটি ৬০০ খ্রীষ্ট পূর্বাব্দ থেকে ৪০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত  ১০০০ বছর গণরাষ্ট্রের বিস্তার হতে দেখা যায়।

 

যদি ‘রাজ্য’ বললে রাজা শাসিত ভূখণ্ড বোঝায়, তাহলে গণরাষ্ট্রগুলিকে রাজ্য বললে একটু ভুল হবে। কারণ এদের ‘গণ’, বা ‘সংঘ’ বললেই বোধহয় ঠিক বলা হয়। প্রাচীন গ্রন্থগুলিতে এদের এভাবেই বর্ণনা করা আছে। পাণিনি তাঁর অষ্টাধ্যায়ী ব্যাকরণে দুই ধরনের দেশের কথা বলেছেন, জনপদ এবং সংঘ বা গণ। এই সময়কালের গণরাষ্ট্রগুলির মধ্যে কয়েকটা  আদিতে ছিল রাজা শাসিত রাজ্য, পরে গণ শাসিত রাষ্ট্রে পরিণত হয়, আবার কিছু গণরাষ্ট্র পরে পাশা উলটে রাজা শাসিত রাজ্যে পরিণত হয়। যেমন বিদেহ ছিল শুরুতে রাজতন্ত্র, পরে খ্রীষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে গণরাষ্ট্রে পরিণত হয়। আবার সেই সময়ে কুরু ছিল রাজতন্ত্র, পরে সেটি গণরাষ্ট্রে পরিণত হয়। গণ এবং সংঘের ফারাকটা ঠিক স্পষ্ট নয়, বৃজ্জি ও মল্লকে প্রাচীন লেখাতে সংঘ বলে উল্লেখ করা আছে। বোধহয় বড়োসড়ো রাষ্ট্রদের সংঘ আর ছোটোখাটোদের গণ বলা হত।

 

আয়তনে তেমন বড় ছিল না গণরাষ্ট্রগুলো। কিছু কিছু গণরাষ্ট্র বর্তমান কালের ১ বা ২টি  তহশিলের সমান আয়তনের ছিল। বৌদ্ধ জাতকে দেখা যায়, বড় বলা হয় এমন ৪টি রাজ্য - শাক্য, মল্ল, লিচ্ছিবি ও বিদেহ -  মিলে আয়তনে লম্বায় ২০০ মাইল এবং প্রস্থে ১০০ মাইল এর বেশী হবে না।

 

পাঞ্জাব ও সিন্ধু উপতক্যায় খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ অব্দ থেকে ৪০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত অনেক ক’টি গণরাষ্ট্রের দেখা মেলে। এদের মধ্যে যেগুলো সম্পর্কে জানা যায় সেগুলো হোল ব্রিক, দমনি, পারসভ, এবং কম্বোজ (Vrikas, Damanis, Parsvas, and Kambojas)।  Trigarta-Shashthas ছিল ৬টি রাষ্ট্রের কনফেডারেশন। এগুলো হল – Kaundoportha, Dandaki, Kraushtak, Jalmani, Brahmagupto and Janaki. মহাভারতে অর্জুন কর্তৃক পঞ্চগণ (Panchagana) ও সপ্তগণ (Saptagana) জয়ের কথা বলা আছে। সম্ভবত এগুলো ৫ ও ৭ গণরাষ্ট্রের কনফেডারেশন। অর্জুনায়ণ (Arjunayanas) ২০০ অব্দ থেকে ৪০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত আগ্রা ও জয়পুর অঞ্চলে বিস্তার লাভ করেছিল। যৌধেয় (Yaudheya) গণরাষ্ট্রটি বেশ বড় ছিল। এটি পূবে সরনপুর থেকে পশ্চিমে বহভলপুর এবং উত্তর-পশ্চিমে লুধিয়ানা থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে দিল্লী পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এটি ছিল তিন রাষ্ট্রের কনফেডারেশন। চেনাব ও রাভির  মাঝে গণরাষ্ট্র মালব ও ক্ষুদ্রক-এর অবস্থান ছিল । এই দু’টি রাষ্ট্র মিলে কনফেডারেশন গড়ে অ্যালেক্সান্ডারের বাহিনীর বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল।

 

গণরাষ্ট্রগুলির মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ও বর্ণময় ছিল হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত বৃজ্জি, যা ছিল আট বা নয়টি গোষ্ঠীর এক মিলিত সংঘ, যার রাজধানী ছিল বৈশালী। এই গোষ্ঠীগুলির মধ্যে চারটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গোষ্ঠী ছিল বৃজ্জি, লিচ্ছবি, বিদেহ ও ন্যায় বা জ্ঞাতৃকা। অন্যান্য গোষ্ঠীগুলির, যেমন উগ্র, ভোগ, কৌরব বা ঐক্ষবক – এদের কথা খুব কমই জানা যায়। এই চার গোষ্ঠীর সকলের আবার আলাদা আলাদা রাজধানী ছিল। রামায়ণে বর্ণিত বিদেহ নামের রাজ্যটি বোধ হয় সেই যুগে হিমালয়ের কোলে অবস্থিত এই গণরাষ্ট্রর অন্তর্গত ছিল, যার রাজধানী ছিল মিথিলা। জ্ঞাতৃকাদের রাজধানী ছিল কুন্দপুর এবং বৃজ্জি ও লিচ্ছবিদের রাজধানী ছিল বৈশালী, যা ছিল সমস্ত মিলিত সংঘের প্রধান রাজধানী বা হেডকোয়ার্টারও। বৈশালী ছিল সুদৃশ্য নগর প্রাকার, সুউচ্চ সৌধ ও পদ্ম-পুষ্করিণী দিয়ে সাজানো সেই যুগের এক বিখ্যাত নগরী। লিচ্ছবিদের সাথে কোশলরাজ্য ও মল্লগণের সম্পর্ক ভালো ছিল, কিন্তু মগধের সাথে ছিল ঝগড়া। একবার লিচ্ছবিরা মগধরাজ বিম্বিসারের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করে। তবে বৃজ্জিদের নেতা চেতকের (সম্পর্কে জৈন তীর্থংকর মহাবীরের মামা) কন্যা চেল্লনার সাথে বিম্বিসারের বিয়ে হবার পর লিচ্ছবি আর মগধের মধ্যে শান্তি স্থাপন হয় এবং যতদিন বিম্বিসার বেঁচে ছিলেন ততদিন এই শান্তি বজায় ছিল।  কিন্তু বিম্বিসারের ছেলে অজাতশত্রুর সময় মগধের সাথে বৃজ্জি-লিচ্ছবি সংঘের  শত্রুতা বেড়ে এক যুদ্ধে পরিণত হয়। মল্ল গণরাজ্যটি ছিল বৃজ্জিদের পশ্চিমে এবং সেটাও ছিল নয় গোষ্ঠীর মিলিত সংঘ। এদের দুটি রাজধানী ছিল, কুশীনর ও পাব। মল্লদের উল্লেখ মহাভারতের ভীষ্মপর্বেও আছে। মনু মল্লদের ব্রাত্য-ক্ষত্রিয় বলেছেন। মল্লরা শুরুতে রাজা শাসিত রাজ্য ছিল, কুশ-জাতকে ইক্ষাকু নামে মল্লদের এক রাজার নাম পাওয়া যায়। পরে মল্লরা সংঘে পরিণত হয়। এদের সাথে বৃজ্জিদের বেশ ভাব ছিল। এরা প্রধানত বৌদ্ধ ও জৈনধর্মের অনুসরণ করত। বুদ্ধের মৃত্যুর কিছু পরেই মল্লদের দেশ মগধের অন্তর্ভুক্ত হয়। চতুর্থ শতকে পাঞ্জাবের কেন্দ্রে দেখতে পাওয়া যায় গণরাষ্ট্র মদ্র।

 

যখন অন্যান্য রাজাদের রাজ্যগুলি ছিল গঙ্গা-যমুনার মতো নদীগুলির উর্বর সমতলভূমিতে, তখন বেশির ভাগ গণরাষ্ট্রের অবস্থান ছিল হিমালয়ের পাদদেশে। অবশ্য মৎস্য গণরাজ্য হিমালয়ের পাদদেশে ছিল না, এটা ছিল বর্তমান রাজস্থানে, জয়পুর, আলওয়ার ও ভরতপুরের অঞ্চলগুলি নিয়ে। এই রাজ্যের স্থাপক বিরাটের নাম অনুযায়ী এর রাজধানীর নাম ছিল বিরাটনগর, বর্তমানের বৈরাট। তবে মৎস্য গণরাষ্ট্র ছিল কিনা সেই নিয়ে সন্দেহ আছে।

 

মৎস্য গণের সাথে আর একটি বিখ্যাত গণরাজ্য, শূরসেন রাজ্যের সম্পর্ক বেশ ভালো ছিল। শূরসেনদের রাজধানী ছিল যমুনা তীরবর্তী মথুরায়। বৌদ্ধ শাস্ত্রে এর রাজার নাম অবন্তীপুত্র, যিনি বুদ্ধের শিষ্য ছিলেন। আর মহাভারত ও পুরাণ অনুযায়ী এই রাষ্ট্রটির শাসন করতেন যদু বা যাদবগণ, বৃষ্ণিগণ যার শাখা ছিলেন। মেগাস্থিনিসের ইন্ডিকাতেও শূরসেনের উল্লেখ আছে।

 

বৌদ্ধশাস্ত্রে কপিলাবস্তুর শাক্যদের গণরাষ্ট্র বলা হয়েছে। আরও বলা আছে যে শাক্যরা সভার মাধ্যমে যুদ্ধ, শান্তি, সন্ধি, জোটবাঁধা ইত্যাদি নীতি স্থির করত। বুদ্ধ শাক্যবংশে জন্মেছিলেন বলে বৌদ্ধশাস্ত্রে এদের সম্বন্ধে বিশদভাবে বলা আছে। কোশলরাজ প্রসেনজিতের স্ত্রী শাক্যবংশীয় ছিলেন। পরে প্রসেনজিতের পুত্র বিধুদ্ধব শাক্যবংশ ধ্বংস করে।

 

কোলিয় গণরাষ্ট্রটি ছিল শাক্য রাষ্ট্রের পূর্ব পাশে, রোহিণী নদী এই দুই-রাষ্ট্রের সীমানা নির্ধারণ করত। সম্ভবত শাক্যদের সাথে এদের আত্মীয়তা ছিল। কোলিয়দের নাকি এক ধরনের নগররক্ষক বা পুলিশ ফোর্স ছিল, যারা বিচিত্র পাগড়ি পরে থাকত ও নাগরিকদের পীড়ন করত। ভগ্গ নামে আর একটি গণরাষ্ট্রের সন্ধান পাওয়া যায়, যমুনা ও শোন নদীর মাঝে কোথাও এক জায়গায়। এদের রাজধানী ছিল সুংসুমারা পাহাড়ে। সম্ভবত এরা বৎসরাজ্যের অধীনস্থ ছিল বা আত্মীয়তা সূত্রে বদ্ধ ছিল।

 

পিপ্পলিবনের অধিবাসী মোরিয় গণের সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানা যায় না, তবে পণ্ডিতেরা মনে করেন ষষ্ঠ খ্রীষ্টপূর্বাব্দের এই মোরিয়দেরই এক বংশধর চন্দ্রগুপ্ত পরে উত্তর ভারতের বিরাট মৌর্য সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন।

 

পাণিনির অষ্টাধ্যায়ীতে ক্ষুদ্রক, মালব, অম্বষ্ঠ, হস্তিনায়ণ, মদ্র, মধুমন্ত, শিবি, ইত্যাদি বহু গণের কথা বলা আছে। অপেক্ষাকৃত পরে বৃষ্ণি, অন্ধকদের মথুরা অঞ্চলের সংঘ হিসেবে উল্লেখ আছে এবং বাসুদেব কৃষ্ণকে  ‘সংঘ-মুখ্য’ বলা হয়েছে। এছাড়াও, অলকাপ্পার বুলি, কেশপুত্রের কালাম – এদেরও গণরাষ্ট্র বলে উল্লেখ করা আছে।

 

অন্যদিকে সিন্ধু সভ্যতায় রাষ্ট্র ছিল ধরে নিলে তাও গণরাষ্ট্রের ধাঁচের ছিল বলে অনুমান করা যায়। কেননা সিন্ধু সভ্যতার নগরগুলোতে বড় কোন অট্টালিকা বা রাজপ্রাসাদ জাতীয় কাঠামোর (যা রাজতন্ত্রের সাধারণ বৈশিষ্ট্য)  অস্তিত্ব পাওয়া যায় নি। এমন কি বড় কোন দুর্গ প্রাকারের অস্তিত্ব মেলে নি। জনসম্মতি নিয়েই রাষ্ট্র পরিচালিত হত বলে অধিক যুক্তিসঙ্গত মনে হয়। তাছাড়া  সিন্ধু সভ্যতায় রাজতন্ত্রের অনুষঙ্গ ধর্মের প্রভাবও পরিলক্ষিত হয় না।

 

গণরাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য

 

গণরাষ্ট্রে রাজা বা নেতা নির্বাচিত হতেন।  এই নির্বাচন অবশ্য বর্তমানের নিরিখে সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক বলা যাবে না, কিন্তু তাহলেও রাজ্যের উত্তরাধিকারী কে হবেন তা রাজকূলের বংশপরম্পরায় ঠিক করা হত না। এই রাষ্ট্রগুলোতে নাগরিকদের মধ্য থেকে  বিশেষ কিছু লোক নেতা নির্বাচন করতেন যাদের নিয়ে একটা কেন্দ্রীয় পরিষদ গঠিত হতো। শুধু নেতা নির্বাচন নয়, যুদ্ধ ঘোষণা বা শান্তি চুক্তি নির্ধারণে এরা সিদ্ধান্ত দিতেন। অর্থাৎ রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন বিষয়ে এদের মতামত ও সিদ্ধান্ত নেয়া হতো। এদের সংখ্যা তথা পরিষদের সদস্য সংখ্যা রাষ্ট্রের আকার আয়তন ও অভিজাত তথা ক্ষত্রিয় পরিবারের সংখ্যা অনুযায়ী ভিন্ন হতো। এ সংখ্যা কয়েক শত থেকে কয়েক হাজার পর্যন্ত হতে দেখা যায়। নেতা নির্বাচন থেকে শুরু করে বিভিন্ন  বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ সকলের সম্মতির মাধ্যমে হতে দেখা যায়, আবার ভোটাভুটিতেও হতে দেখা যায়। তবে আদর্শ গণরাষ্ট্রে একাধিক দল বা পক্ষ ছিল না। কোন ভোটাভুটি নয়, সম্মতির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেয়া হতো। তবে যে সব  রাষ্ট্রে ভোটাভুটি হত তা ছিল বেশ চিত্তাকর্ষক। নির্বাচন হত কাঠের শলাকার মাধ্যমে। বিভিন্ন রঙের শলাকা ব্যবহার করা হতো। নির্বাচন পরিচালনার জন্য একজন নির্বাচন পরিচালক বা নির্বাচন কমিশনারও থাকত, যাকে বলা হত ‘শলাকা-গ্রাহক’ এবং তিনি ছিলেন তাঁর সততা ও নিরপেক্ষতার জন্য সকলের সম্মানিত কোনো ব্যক্তি। গণরাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতা কেন্দ্রীয় পরিষদের হাতে ন্যস্ত ছিল। অর্থাৎ নির্বাহীরা পুরোটাই কেন্দ্রীয় পরিষদের নিয়ন্ত্রণে থাকতেন। তাই অন্ধক-বৃজ্জি গণরাষ্ট্রের গণপতি শ্রীকৃষ্ণ নারদের নিকট অভিযোগ দিয়েছিলেন যে তিনি প্রভু নন, কেন্দ্রীয় সভার দাস মাত্র।

 

অনেক ঐতিহাসিক গণরাষ্ট্রগুলিকে গ্রীসের রিপাবলিকের সাথে তুলনা করে প্রজাতন্ত্র বলে আখ্যা দিয়েছেন। তবে বর্তমানের ঐতিহাসিকরা এগুলিকে Oligarchy বা অভিজাততন্ত্র বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। কারণ এদের শাসনব্যবস্থায় ক্ষমতা মুষ্টিমেয় কিছু অভিজাতকূলের হাতে ন্যস্ত ছিল। এই অভিজাত সম্প্রদায় ছিল প্রধানত বিভিন্ন ক্ষত্রিয়কুলের প্রধানেরা। অবশ্য গ্রীসের রিপাবলিকও আধুনিক গণতন্ত্রের নিরিখে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয় । কেননা সে সময় গ্রীসেও সকল নাগরিকের মতামত প্রদানের অধিকার ছিল না। দাসদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করা হয় নি। যাহোক, গণরাষ্ট্রের নেতাকে গণপতি, গণ-জ্যেষ্ঠ, গণরাজা অথবা সংঘ-মুখ্য নামে অভিহিত করা হত। অভিজাতকুল যেখানে সভা করতেন সেই জায়গার নাম ছিল সন্থাগার। দৈনন্দিন কাজকর্ম অল্প কিছু লোকের দ্বারা চালিত হত।

 

ভদ্দশাল জাতকে বলা আছে এই ক্ষত্রিয় পুরুষ প্রধানের দল বছরে একবার বসন্ত উৎসবের সময় মিলিত হতেন, কাছের এক ‘পোক্খরণী’ (পুষ্করিণী) তে স্নান করে সভাগৃহে হাজির হতেন রাজকীয় কাজকর্ম করতে। সভা শুরু হত ঢাক-ঢোল কাড়া-নাকাড়া পিটিয়ে সকলকে জানান দিয়ে। প্রত্যেকের জন্য আসন নির্দিষ্ট করা থাকত। সভার সংখ্যাপূর্তি বা কোরামের দায়িত্বে থাকতেন ‘গণ-পূরক’।

 

গণরাষ্ট্রগুলির গঠন ও কাজের সঙ্গে, বিশেষ করে সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রক্রিয়ায়  বৌদ্ধ সংঘের সাথে মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তাই অনেকে মনে করেন গণরাষ্ট্রগুলির নেতা নির্বাচন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া বৌদ্ধ সংঘের ধারণা থেকে গৃহীত হয়েছে।

 

বৌদ্ধ ও জৈন শাস্ত্রগুলিতে গণরাষ্ট্রগুলির উল্লেখ থাকলেও, ব্রাহ্মণ্য শাস্ত্রে এদের উল্লেখ প্রায় নেই বললেই চলে। এর কারণ হিসেবে বলা হয় সে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের কেন্দ্রে ছিল ব্রাহ্মণ পুরোহিত ও রাজা, তাই রাজাবিহীন দেশকে যথেচ্ছাচারী বলে মানা হত।  অন্য দিকে গণরাষ্ট্রগুলিতে ব্রাহ্মণদের কোনো বিশেষ সম্মান দেওয়া হত না। গণের ইতিহাস দেখলে তাতে ব্রাহ্মণদের কোনো বিশেষ দান বা ভূমিদানের উল্লেখ নেই বললেই চলে, অথচ এই দানগুলির সেযুগের রাজতন্ত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। অনেকের মতে যেহেতু গণগুলি ক্ষত্রিয়কুল শাসিত ছিল, সেজন্যে গণরাষ্ট্র গুলিতে  ক্ষত্রিয় ছাড়া অন্যান্য জাতি বর্ণের রাজনৈতিক স্থিতি, সম্ভবত সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিও, ক্ষত্রিয়কুলের তুলনায় নীচে ছিল। কিম্বা আজকের বর্ণপ্রথা বা জাতপাতের ব্যবস্থা গণরাষ্ট্রে কার্যকর বা প্রচলিত ছিল না। সম্ভবত সে সময় সমাজে বর্ণ বিভাজন শক্তভাবে গেড়ে বসে নি। গণপতি বা রাজাদের ক্ষত্রিয় হিসেবে চিহ্নিত করা হতো না, ক্ষত্রিয় হিসেবে সম্বোধন পরের সময়কালের। পালি  ‘অমবত্থ সুত্তে’ (Pali Canon –দিঘনিকয়) লেখা আছে যে যখন ব্রাহ্মণ অমবত্থ কপিলাবস্তুতে এসেছিলেন, তখন জনতা তাকে দেখে হেসেছিল ও কোনো সম্মান দেয় নি। অবশ্য Pali Canon-এর মতো বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থে এই বিষয়ে নিরপেক্ষতা আশা করা মুস্কিল হতে পারে। তবে এটা বলা যায়, গণরাষ্ট্রগুলোতে ধর্ম, সুনির্দিষ্ট করে বললে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রভাব ছিল না। বেশিরভাগ গণের শাসনে ইশ্বর ও ধর্ম ব্যবহারের প্রয়োজন হয় নি। বস্তুত রাজতন্ত্র ও ব্রাহ্মন্যবাদের উত্থান একসাথে হয়েছে ধরে নেয়া যায়। বলা যায় এরা একে অপরের পরিপূরক, একে অপরের হাত ধরে বিকশিত হয়েছে। হয়তো রাজতন্ত্র তথা একজনের বা এক পরিবারের শাসন ততকালীন জনগণ তথা ক্ষমতাশালী পরিবারদের নিকট গ্রহণযোগ্য ছিল না। তখন রাজতন্ত্রের পক্ষে সমাজ নিয়ন্ত্রণের ভূমিকায় এগিয়ে আসে ব্রাহ্মন্যবাদী ধর্ম। বস্তুত রাজতন্ত্রের উত্থান ও বিকাশ কালেই বর্ণাশ্রমভিত্তিক ব্রাহ্মন্যবাদের বিকাশ হতে দেখা যায়।

 

গণরাষ্ট্রগুলির মিলিত শক্তিই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ ও একই সঙ্গে তাদের সবচেয়ে বড়ো দুর্বলতা। অর্থশাস্ত্রে বলা আছে যে রাজাদের বিরুদ্ধের যুদ্ধ কৌশল গণরাষ্ট্রগুলির বিপক্ষে খাটে না। সাধারণ যুদ্ধ কৌশলে গণরাষ্ট্র অজেয়, তাই সেখানে বিভেদের মাধ্যমে দুর্বলতা সৃষ্টি করার পরামর্শ দেওয়া আছে। অজাতশত্রু দীর্ঘদিন যুদ্ধ করেও বৃজ্জি-লিচ্ছবিদের জয় করতে পারেন নি। বৌদ্ধ ‘মহাপরিনিব্বান সুত্তে’র গল্পে আছে যে ভগবান বুদ্ধ যখন রাজগৃহে অবস্থান করছিলেন, তখন অজাতশত্রু তার মন্ত্রী ভাস্করকে পাঠান তাঁর কাছে। অজাতশত্রু ভাস্করকে বলেন যে আপনি গিয়ে বুদ্ধকে বলবেন যে আমি বৃজ্জি আক্রমণ করব। তারপর বুদ্ধ কি বলেন তা শুনে আসবেন, কারণ তিনি ভবিষ্যতদ্রষ্টা। বুদ্ধ বলেন যে তিনি বৈশালীতে থাকার সময় তাদের শিক্ষা দিয়ে এসেছিলেন কি করে একত্রে থাকতে হয়, বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করতে হয়, নারীদের সম্মান রক্ষা করতে হয়, ইত্যাদি। যতদিন বৃজ্জিরা এই উপদেশ মেনে চলবে, ততদিন তাদের উন্নতি হতে থাকবে ও তাদের যুদ্ধে পরাজিত করা অসম্ভব। ভাস্কর সেই কথা যখন এসে অজাতশত্রুকে বললেন, তখন রাজা বুঝতে পারলেন যে একমাত্র বিভেদ সৃষ্টির দ্বারাই বৃজ্জিদের পরাজিত করা সম্ভব। তিনি ভাস্করকে সেই কাজে গুপ্তচর করে পাঠালেন। ভাস্কর অনেক সময় নিয়ে কৌশলের সাহায্যে বৈশালীতে বিভেদ আনলেন এবং  অজাতশত্রুর হাতে বৃজ্জির পরাজয় ঘটল।

 

গণরাষ্ট্রের বিলুপ্তিঃ

 

আলেকজান্ডারের ভারত অভিযানের সময় উত্তর পশ্চিমের ছোট ছোট গণরাষ্ট্র, যেমন মালব, ক্ষুদ্রক, মদ্র, মধুমন্ত, অশ্বায়ন ইত্যাদিরা তাকে সবলে  বাধা দিয়েছিল, কিন্তু তার সমরকৌশলের কাছে দাঁড়াতে পারেনি। তবে মগধকেন্দ্রিক সাম্রাজ্য, বিশেষ করে মৌর্য ও গুপ্ত সাম্রাজ্যের আগ্রাসন মোকাবেলা করে শেষ পর্যন্ত গণরাষ্ট্রগুলি তাদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারে নি। মগধ কেন্দ্রিক সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক ক্ষমতার উৎস ছিল গাঙ্গেয় অববাহিকার উর্বর ভূমি। অপর দিকে এখানে ছিল লৌহ খনি। ফলে যুদ্ধাস্ত্র তৈরির ক্ষেত্রে সে ছিল সুবিধাজনক অবস্থানে। সম্ভবত এই দুই উপকরণ মগধের সাম্রাজ্য বিস্তারে সহায়ক হয়েছিল।  ইতিহাস বলে ভারতবর্ষে মৌর্যরা প্রথম বৃহৎ সাম্রাজ্য গড়ে তুলে। গণরাষ্ট্রগুলির পতনও শুরু হয় তখন থেকে। তবে গুপ্ত সম্রাট সমুদ্রগুপ্তের ভারত বিজয়ের সাথে সাথে প্রায় এক হাজার বছরের গণরাষ্ট্রগুলির ইতিহাসে চূড়ান্ত যবনিকা নেমে আসে।

 

তবে শুধু বহিঃ আক্রমণে বা সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র দ্বারা গণরাষ্ট্রের বিনাশ হয়েছে এমনটি ভাবা সঠিক হবে না। সম্ভবত যুদ্ধ করতে গিয়ে গণরাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ পরিচালনা ব্যবস্থায় পরিবর্তন সাধিত হয়। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ বিজয়ী সেনাপ্রধানকে মহিমান্বিত করে তুলে বা সেনাপতিদের ক্ষমতাবান করে তুলে যা রাজতন্ত্র বিকাশের পথ সুগম করে। অন্যদিকে গণরাষ্ট্রগুলোর বিলোপের নির্ভরযোগ্য অর্থনৈতিক কারণ খুঁজে পাওয়া খুবই দুস্কর। তবে এমনটা অনুমান করা যায় গণরাষ্ট্র ও রাজতন্ত্রের মধ্যে উৎপাদিত পণ্যের বণ্টন প্রক্রিয়ায় পার্থক্য বা ভিন্নতা ছিল।  সম্ভবত রাষ্ট্রপূর্ব কৌম সমাজে পণ্য বিক্রয় প্রচলিত ছিল না।  উৎপাদিত পণ্য সবার মধ্যে বণ্টন করে দেয়ার একটি ব্যবস্থা বা বিনিময় প্রথা প্রচলিত ছিল। ব্যক্তি মালিকানা ছিল না বা প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল। সম্ভবত গণরাষ্ট্রগুলোতে এ ধরণের ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল, হাট-বাজারে নিয়ে পণ্য বিক্রি সমর্থন করা হয় নি। ধারণা করা যায় স্থায়ীভাবে বসবাস ও কৃষির বিকাশের সাথে অতিরিক্ত বা উদ্বৃত্ত পণ্য উৎপাদন হতে শুরু করে যা বিক্রির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। পণ্য বিক্রয়ের যে চাপ সমাজে তৈরি হচ্ছিল, গণরাষ্ট্রের চিন্তাকাঠামো তা মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত ছিল না। এ অবস্থা রাজতন্ত্র উদ্ভবের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে। রাজতন্ত্রে ব্যক্তিমালিকানা তথা পরিবারিক সম্পত্তির স্বীকৃতি দেয়া হয় এবং  উৎপাদিত পন্য বিক্রি সমর্থন করা হয়।  সম্ভবত উপমহাদেশে রাজতন্ত্রের শুরুতে হাট-বাজারও প্রতিষ্ঠা হওয়া শুরু হয়।

 

সহায়ক গ্রন্থ ও নিবন্ধঃ

1.    State and Government in Ancient India – A.S. Altekar, Motilal Banarsidass Publishers Pvt. Ltd. Delhi, India.

2.    মহাভারত

3.    কৌটিলীয় অর্থশাস্ত্র  - অনুবাদ ড. রাধাগোবিন্দ বসাক,  সংঘ প্রকাশন, ঢাকা, বাংলাদেশ।

4.    বাঙ্গালীর ইতিহাস, আদি পর্ব   -  নীহাররঞ্জন রায়, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ভারত।

5.    আর্যজন ও সিন্ধু সভ্যতা  - শামসুজ্জোহা মানিক ও শামসুল আলম চঞ্চল, বদ্বীপ প্রকাশনী, ঢাকা, বাংলাদেশ।

6.    প্রাচীন ভারতের গণরাষ্ট্রগুলি ( নিবন্ধ )  - দিলীপ দাস, তথ্য সূত্র ইন্টারনেট।

7.    State and Society in Ancient India, source - Internet.

8.    ঝর্ণাধারা থেকে সৃষ্টি ধারা ( নিবন্ধ )  -  কলিম খান, মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা – নদী সংখ্যাঃ ১৯৯৯-২০০০।

 

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
Archive