Banner
চর্যাচর্যগল্পবিনিশ্চয় -- মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন (চর্যাপদ অবলম্বনে ছোট গল্প)

লিখেছেনঃ মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন, আপডেটঃ April 19, 2010, 12:00 AM, Hits: 525


 চর্যা-৩

মূল চর্যা:

এক সে শুণ্ডিনী দুই ঘরে সান্ধই।
চীঅন বাকলত বারুণী বান্ধই।।
সহজে থির করি বারুণী সান্ধ।
জে অজরামর হোই দিঢ় কান্ধ।।
দশমি দুয়ারত চিহ্ন দেখিআ।
আইল গরাহক আপনে বহিআ।।
চউশঠী ঘড়িয়ে দেউ পসারা।
পইঠেল গরাহক নাহি নিসারা।।
এক খড়ুলী সরুঅ নাল।
ভনন্তি বিরুআ থির করি চাল।।

আধুনিক বাংলা:

এক সে শুঁড়িনী দু’ঘরে ঢোকে। চিকঅ (গাছের) বাকল দিয়ে সে বারুণী মদ চোলাই করে। সহজকে স্খির রেখে বারুণী চোলাই কর, যাতে তোর দেহ অজর অমর ও দৃঢ় হয়। দশম দ্বারে চিহ্ন দেখে খদ্দের নিজেই (পথ) বেয়ে এল। চৌষট্টি ঘড়ায় মদের পসরা সাজিয়ে দেয়া হ’ল। খদ্দের ঘরে ঢুকল, আর তার নিস্তার নেই। ছোট এক পাত্র, সরু তার নল। বিরুপা বলছেন­ চাল দে স্খির ভাবে।

এতক্ষণে বোধহয় চূড়ান্ত সর্বনাশটা শুরু হয়ে গেছে। না, বিরুপার নিজের সর্বনাশ নয়। নালন্দরাজ জালন্ধরির সর্বনাশ। ডাকিনীতট পিছনে রেখে চলছে বিরুপা। সামনে বিশাল প্রান্তর। প্রান্তরের পর লোকালয়। এরপর তিলক নদী। তিলক নদীই নালন্দের পূর্ব সীমানার শেষ প্রান্ত। এরপর জোনাঘট রাজ্য। সেখান থেকে বিরুপাকে খুঁজে বের করে আনা রাজা জালন্ধরির জন্য খুব একটা সহজ হবে না। কারণ জোনাঘটরাজ লক্ষ্মীঙ্করার সাথে জালন্ধরির সম্পর্ক বহুদিন থেকেই খুব একটা ভাল নয়। আর সে কারণেই বিরু তিলক নদী পাড়ি দিয়ে জোনাঘটে পালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই অন্ধকার রাত্রে ষাটোর্ধ্ব বার্ধক্যের শরীর নিয়ে নালন্দ থেকে সে পালাতে পারবে কি না তা সে নিশ্চিত নয়। তবে পারতে তাকে হবেই, যদি সে আরও ক’টা দিন বাঁচতে চায়। অবশ্য এখন আর মরতেও খুব একটা আপত্তি নেই তার। কারণ সব কাজ শেষ। বারুণীও মনের মত খদ্দের পেয়েছে আবার বিরুও সব বকেয়া হিসাব কড়ায় গণ্ডায় বুঝিয়ে দিয়েছে। এ হিসাব শুধু তার একার নয়, শুঁড়িনীর। বিরু মনে মনে বলল, ‘মা-রে আমি সব দায় শেষ করেছি, এবার তুই শান্তিতে ঘুমা।’

গত এক বছর থেকে খদ্দেরের জন্য একেবারে অস্খির হয়ে উঠেছিল বারুণী। অবশ্য হওয়ারই কথা। ডাকিনীতটে তার চেয়ে অনেক কম বয়সী মেয়েরাও খদ্দের নিয়ে রাত কাটায় আর সে কি-না এখনো কুমারীত্বই মোচন করেনি। দাঠাকে এ নিয়ে সে অনুযোগ করেছে বহুবার। বারুণী বিরুকে ‘দাঠা’ বলেই ডাকতো। অনুযোগ শুনে বিরু তার জটার ফাঁক দিয়ে রহস্যময় চোখ তুলে রহস্যময় ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলতো­ ‘অপেক্ষা কর বারুণী, তোর কুমারীত্ব মোচন করবে যে-সে নয়; একেবারে রাজা।’ শুনে ঘাড় কাৎ করে বারুণী ‘ঠিক আছে’ সুলভ ভঙ্গী করতো। দাঠার কথা সে বিশ্বাস করতো। দাঠাছাড়া জগতে তার যে আর কেউ নেই। তাছাড়া রাজার সাথে কুমারীত্ব ঘুচাতে পারলে রারুণী যে একেবারে ডাকিনীতটের রানী হয়ে যাবে!

ডাকিনীতটের ডাকিনীদের পরবর্তী জীবনের সম্মান তো নির্ভর করে সে কার সাথে প্রথম রাত কাটিয়েছে তার উপর। এ ব্যাপারটা তাদের কাছে অনেকটা লোক সমাজের মেয়েদের বিয়ের মত। অবশ্য গত দশ বছরে বারুণী রাজাকে কোন ডাকিনীর প্রথম খদ্দের হতে দেখেনি। এই দশ বছর তিনি যতবার ডাকিনীতটে এসেছেন ততবারই লোক সমাজ থেকে তুলে আনা মেয়েদের সাথে রাত কাটানোর জন্যই এসেছিলেন। আসলে নালন্দরাজ এখন আর ডাকিনীদের শয্যায় আনন্দ পান না। এ নিয়ে তটের ডাকিনীদের মধ্যে কিছুটা লজ্জাও আছে। অথচ আগে না-কি তিনি প্রায়ই আসতেন। আর তখন তার সাথে কুমারীত্ব মোচনের সৌভাগ্য যাদের হয়েছিল তারা সকলেই এখন বিগত যৌবনা। তবুও তাদেরকে ডাকিনীতটের অন্যরা বেশ সমীহ করে চলে। পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই বয়সে তিনি আর কারো প্রথম খদ্দের হবেন কি-না সন্দেহ। তাই এ সময় যদি রাজার সাথে কুমারীত্ব মোচনের সুযোগ পাওয়া যায় তাহলে বারুণীর নিজের যেমন সম্মান হবে তেমনি তটের লজ্জাও ঘুচবে।

তটের মেয়েরা সম্ভ্রান্তদের সাথে কুমারীত্ব মোচনের যে সম্মান পায় তা কিন্তু লোক সমাজ থেকে তুলে আনা মেয়েরা পায় না। কারণ তারা তো ধর্ষিতা; সমাজ ও জাতি চ্যুত, অন্ত্যজ।

বারুণীর স্বপ্ন-চিন্তাগুলো বিরুপা স্পষ্টই পড়তে পারতো। তবে রাজাকে প্রথম খদ্দের করে দেয়ার স্বপ্নটা বিরু বারুণীকে মিথ্যা দেখাত না। সে সত্যই অপেক্ষা করেছিল রাজাকে বারুণীর ঘরে আনার জন্য। বারুণীর রূপের খবর যেন চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং একেবারে রাজার কানে পৌঁছায় সে অপেক্ষায়ই ছিল সে। যত দিন কোন খদ্দেরকে কাছে আসতে দেবে না ততদিন নানা ভাবে বারুণীর রূপের খবর ছড়াতে থাকবে ­এটা বিরু ভাল করেই জানতো। অবশেষে রাজা আজ বারুণীর ঘরে এল। একেবারে প্রথম খদ্দের হয়ে।

বিরু অনুমান করল­ সে প্রান্তরের মাঝামাঝি চলে এসেছে। পিছন ফিরে দিগন্তরেখায় ডাকিনীতটকে আরেকবার দেখে নিল সে। এখন আর সেখানকার প্রায় কিছুই দেখা যায় না শুধু আকাশমুখী আলোর আভা ছাড়া। বিরু জানে এই আলো থাকবে শেষ রাত অবধি। আর এই এই আলোর উৎসমূলে মানুষের আদিম আনন্দের বিপনী তাদেরকে কতটা পতিত করতে পারে তারই এক ভয়াল দৃশ্য রচিত হবে আজ রাতে।

এতক্ষণে রাজা জালন্ধরি নিশ্চয় বারুণীর অপরূপ দেহের ভাঁজে ভাঁজে ভাসতে শুরু করেছে। কিন্তু সে কি জানে যে কী আগুনে সে সাতরে বেড়াচ্ছে! সত্যি অপরূপ দেহ বল্লরী বারুণীর। সেই সাথে গায়ের রং। ষোল বছরের যৌবনবতী দেহে রূপের মদিরা ছড়াচ্ছে যেন। বিরু তার দীর্ঘ ভ্রাম্যমান জীবনে এমন রূপবতী নারী দেখেনি বললেই চলে। আর হবে না-ই বা কেন; বারুণীর এই দেহ তো বিরু নিজ হাতে গড়েছে, তিল তিল করে। যে-সে চোলাই নয়, একেবারে চিঅন বাকলের চোলাই। বারুণীর জন্ম থেকেই বিরু তাকে খাইয়েছে। বক যন্ত্র দিয়ে নিংড়ে চিঅন গাছের বাকলের নির্যাস থেকে তৈরী এ চোলাই আসলে ঠিক চোলাই নয়। টনিক। যদিও খেতে অনেকটা চোলাই মদের মতই। এর বিশেষত্ব হচ্ছে­ এটা নিয়মিত পান করলে নারী হয় অপরূপ দেহ বল্লরীর অধিকারী আর পুরুষ হয় অসামান্য দেহ সৌষ্ঠবে পূর্ণ।

বিরু বারুণীকে চিঅন বাকলের চোলাই খাইয়ে যতটা রূপবতী করতে চেয়েছে তার চেয়ে বেশী চেয়েছে বারুণীর রূপের গল্প চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ুক। একেবারে রাজার কানে গিয়ে পৌঁছাক। প্রকৃতপক্ষে হয়েছেও তাই। অবশ্য এজন্য বিরুকে কম ঝঞ্ঝাট সহ্য করতে হয়নি। প্রায়ই ডাকিনীতটের বড় বড় খদ্দেররা বারুণীকেপেতে চাইতো। কিন্তু দাঠার অনুমতি ছাড়া বারুণী কিছুই করতো না। করতে তার ইচ্ছেও করতো না। দাঠার জটাপড়া চুল আর অদ্ভুত আলখেল্লার আড়ালে ঢাকা রহস্যময় ব্যক্তিত্ব এবং অদ্ভূত আচরণে তার মনেও অন্যদের মত কিছুটা ভয় আর ভক্তি জাগতো। নিজের এই মুনি ঋষির মত জটাধারী বেশভূষায় অন্যদের ভয়-ভক্তি দেখে বিরু মনে মনে এক ধরনের মজাই পেত। কারণ এই বেশ-ভুষা যে আসলে তার আত্মগোপন এটা তো আর লোকে বুঝতো না। কোন খদ্দের যদি সরাসরি বিরুর কাছে এসে বারুণীর ব্যাপারে প্রস্তাব করতো তাহলে বিরু তাদের সাথে এমন অসংলগ্ন কথাবার্তা আর আচরণ শুরু করতো যে তারা রীতিমত ভয় পেয়ে যেতো। কখনো কখনো বিরু তাদের সামনে তন্ত্র-মন্ত্রের মত বিড়বিড় করতে শুরু করতো। এভাবেই সে এতগুলো বছর বারুণীকে রক্ষা করেছে। অবশ্য একটা সুবিধা ছিল­ তটের ডাকিনীদের কেউ বলাৎকার করতো না। এটাই রীতি। আসলে খদ্দেররা তো জানে ডাকিনীরা একদিন তাদের শয্যায় উঠবেই। তাই বলপ্রয়োগ করে একটা অহেতুক পরিস্থিতি তৈরী করার কী দরকার।

তবে লোক সমাজ থেকে তুলে আনা মেয়েদেরকে ডাকিনীতটে আটকে রেখে বলাৎকার করতে কোন বাধা ছিল না। সাধারণত রাজন্যবর্গ আর ধনবানরাই এ কাজটা করত। যে মেয়েটাকে তুলে আনা হত সে আর কখনোই নিজগৃহে ফিরে যেতে পারতো না। সমাজ তাকে গ্রহণ করত না। আবার ডাকিনীতটেও সে হয়ে যেত নীচু শ্রেণীর। কারণ সে বহিরাগত এবং ধর্ষিত।

এসব যে শুধু নালন্দার ডাকিনীতটের রীতি তা-ই নয়। বিরু যখন জোনাঘটের ডাকিনীতটে ছিল সেখানেও একই নিয়ম দেখেছে। জোনাঘটের ডাকিনীতটে সে ছিল প্রায় ছয় বছর। বারুণীর জন্ম হয়েছিল সেখানেই। শুধু যে ঘটনার পারম্পর্যই বিরুপাকে ডাকিনীতট থেকে ডাকিনীতটে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে তা নয়। জীবন-জীবিকাও একটা বড় কারণ ছিল। বিরু তো চোলাই তৈরী ছাড়া আর কিছুই জানে না। আর চোলাই বিক্রির সহজ ও নির্বিঘí জায়গা ডাকিনীতট ব্যাতীত আর কী হতে পারে? তবে ডাকিনীতটগুলোতে বিরু খুব সাধারণ চোলাই বিক্রি করতো। কিন্তু ঐ বিশেষ চোলাই­ যা বক যন্ত্র দিয়ে তৈরী করতে হয়­ যা বিরু ছাড়া আর কেউ তৈরী করতে জানে না­ তা তৈরী কিন্তু সে কখনো বন্ধ করেনি। গোপনে সে ঐ চোলাই তৈরী করতো শুধুমাত্র বারুণীর জন্য।

বিরু এবার প্রান্তর ছেড়ে লোকালয়ে প্রবেশ করল। রাজা জালন্ধরি কি এখন বারুণীর শয্যাগমন শেষ করেছে? গমন শেষে রাজা চা’ক আর নাই চা’ক বারুণী কি বস্ত্রাবৃত কাষ্ঠদানীটি রাজার সামনে উন্মুক্ত করেছে? বিরু ঠিক যেমনটা বলে দিয়েছে তাকে। কাষ্ঠদানীর বস্ত্র মুক্ত করার পর রাজা কি তাকে কোনো প্রশ্ন করেছে? করারই তো কথা। আর রাজা যে প্রশ্নই করুক বারুণী কি রাজাকে সেই কথাটি বলেছে যা বিরু বারুণীকে শিখিয়ে দিয়েছে। বিরু বারুণীকে বলেছে, এ সবই রীতি। রাজা যদি কোন ডাকিনীর ঘরে প্রথম খদ্দের হয় তাহলে এসব করতে হয়, না করলে অমঙ্গল হয়। বারুণী রীতি, আচার আর দাঠার খুবই ভক্ত। তাই বিরু জানে বারুণী সবই করবে।

অবশ্য বিরু নিজে ডাকিনীতটের কোনো রীতি-আচার কখনো উপেক্ষা করেনি, এমনকি শেষ মুহূর্তেও না। বিরুর যখন মনে হল বারুণীর রূপের খ্যাতি যথেষ্ট হয়েছে, বিশেষ করে রাজ দরবারের বীনা বাদক ইন্দ্রভূতি যখন বারুণীর খদ্দের হওয়ার প্রস্তাব করল তখন সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবার বারুণীর জন্য রীতি অনুযায়ী খদ্দের আহবান করবে। অন্যদের মত ইন্দ্রভূতিকে ফিরিয়ে দিয়ে বিরু বুঝেছিল­ প্রত্যাখ্যাত হওয়ার অপমানের কারণেই হোক আর অতি রূপসী এক ডাকিনীর সংবাদ দিয়ে ইনাম বকশিশ পাওয়ার অভিপ্রায়েই হোক ইন্দ্র কথাটা রাজার কানে তুলবে। অতীত তা-ই বলে। তাই সে এরপর দিনই ডাকিনী তটের দশ নম্বর ঘর অর্থাৎ যে ঘরে সে বারুণীকে নিয়ে থাকে সেই ঘরের চালের উপর সাদা হাড়ি আর সাদা পতাকা স্থাপন করে দিয়েছিল। এই চিহ্নের অর্থ ‘এই ঘরে বসবাসকারী কুমারী ডাকিনীর প্রথম রাতের জন্য যোগ্য খদ্দের খোঁজা হচ্ছে।’ অনেক ধনী আর সম্ভ্রান্তের পক্ষ থেকে প্রস্তাব এসেছিল। কিন্তু একে একে সবাইকেই ফিরিয়ে দিয়েছে বিরুপা। এক পর্যায়ে যখন রাজার পক্ষ থেকে প্রস্তাব আসল তখন সে সাদা পতাকা আর সাদা হাড়ি ঘরের চাল থেকে নামিয়ে দরজায় ঝুলিয়ে দিল, যার অর্থ­ ‘খদ্দের ঠিক হয়ে গেছে’। অবশেষে নির্ধারিত রাতে দরজার হাড়িটি ভেঙ্গে রাজা প্রবেশ করলেন বারুণীর ঘরে। দূরে দাঁড়িয়ে রাজার হাড়ি ভাঙ্গা এবং দশ নম্বর গৃহে প্রবেশের দৃশ্য দেখল বিরুপা। তারপরই সে পালানোর জন্য পা বাড়াল।

লোকালয়ের ভিতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পথের দু’ধারে কিছু দূর পরপর গৃহস্খ বাড়ী দেখতে পেল বিরু। তার মনে পড়ে গেল বহুদিন আগে এমন একটা গৃহস্খ বাড়ী তারও ছিল। স্ত্রীও ছিল। চোলাই বিক্রি করে উপার্জনও হত বেশ। বিশেষ করে সেই বকযন্ত্র দিয়ে যখন সে চিঅন গাছের বাকল থেকে ঐ বিশেষ চোলাই তৈরীর পদ্ধতি আবিষ্কার করল। এরই মধ্যে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে বিরুর স্ত্রী মারা গেল। নবজাতক কন্যা সন্তানটিকে নিয়ে বিরু যখন চারিদিকে অন্ধকার দেখছিল তখনই রাজবাড়ী থেকে ডাক এল তার। রাজা তার চিঅন বাকলের চোলাইর গ্রাহক হলেন। রাজবাড়ী থেকে নিয়মিত পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ হল তার জন্য। তবে শর্ত­ একমাত্র রাজাই হবেন এ চোলাইর গ্রাহক, আর কারো কাছে বিক্রয় করা যাবে না। মাতৃহারা কন্যাটিকে বুকে নিয়ে উঠে দাঁড়াল বিরু। রাজার জন্য চোলাই সরবরাহের সম্মান তাকে স্ত্রী বিয়োগের হতাশা থেকে মুক্তি দিল। কন্যার নাম দিল শুড়িনী। রাজার জন্য চিঅন বাকলের চোলাই তৈরী আর শুড়িনীর দেখাশোনা নিয়ে ভালই মগ্ন হয়ে পড়েছিল সে। এমনকি পুনরায় স্ত্রী গ্রহণের প্রয়োজনও বোধ করল না। রাজ বাড়ীর সহযোগিতায় সে তার চিঅন বাকলের চোলাই নিয়ে নানা নিরীক্ষা চালাতে থাকে। এতে ক’রে সে চৌষট্টি বর্ণের চৌষট্টি স্বাদের চোলাই তৈরীতে সক্ষম হয়। একটা কাষ্ঠ দানিতে চৌষট্টিটি পানপাত্রে সজ্জিত করে বিরু প্রতিদিন নালন্দরাজ জালন্ধরির সামনে পরিবেশন করতো সেই চোলাই। তবে আরও একজনকে খাওয়াতো সেই চোলাই। শুড়িনী। মাতৃহারা কন্যাটি রূপবতী হলে ভাল বর পাওয়া যাবে ­এমন আশায়। এভাবে এক দুই তিন করে অনেকগুলো বছর বেশ ভালই কেটে গেল। শুড়িনী বয়:প্রাপ্ত হল। বিরু যখন কন্যার জন্য যোগ্য পাত্রের সন্ধান করছিল তখন কিভাবে যে সর্বনাশ এসে ছায়া হয়ে পিছনে দাঁড়িয়েছে বিরু টেরই পেল না। টের পেল তখন যখন রাজ পেয়াদা এসে তাকে বেঁধে নিয়ে দরবারে হাজির করল এবং রাজার প্রিয় পাত্র বীনা বাদক ইন্দ্রভূতি বিরুর বিরুদ্ধে রাজার জন্য রক্ষিত চোলাই কন্যাকে খাওয়ানোর অপরাধের অভিযোগ উথাপন করল। জবাবে বিরু বলেছিল­ ‘মহরাজ, চিঅন বাকলের চোলাই আমি অন্য কারো কাছে বিক্রয় করতে পারবো না­ এমন শর্ত ছিল সত্য। কিন্তু নিজের তৈরী চোলাই নিজের সন্তানকে খাওয়াতে পারবো না এমন তো কথা ছিল না।’ সব শুনে রাজা ঘোষণা করলেন­ ‘ছোট এক পাত্র­ সরু তার নালী’। কি এর মানে? বিরু তখন বুঝতে পারেনি। কিন্তু দিনান্তে রাজ পেয়াদারা এসে যখন শুড়িনীকে তুলে নিয়ে গেল তখন সবই বুঝতে পারল। বিরুর বুকের মানিক মাতৃহারা মেয়েটিকে নিয়ে তোলা হল ডাকিনীতটে। দশ নম্বর ঘরে। কয়েক মাস ধরে জালন্ধরি ছোট সেই পাত্রের সরু সেই নালি ক্ষত-বিক্ষত করল। রাজ পেয়াদারা যখন শুড়িনীকে ফিরিয়ে দিয়ে গেল তখন সে সন্তান সম্ভবা। উপায়ান্তর না দেখে বিরু কন্যাকে নিয়ে জোনাঘটে নিরুদ্দেশ হল। জোনাঘটের ডাকিনীতটে এক হত দরিদর কুটিরে বারুণীকে জন্ম দিয়েছিল শুড়িনী। বারুণীর জন্মের কিছুক্ষণ পরই শুড়িনীর মৃত্যু হয়। শেষ সময়ে বারুণীকে বিরুর হাতে তুলে দিয়ে শুড়িনী বলেছিল, ‘বাবা স্খির ভাবে চাল দিও।’ শুড়িনীর সেই ‘চাল’ দিতেই বিরু ষোল বছর অপেক্ষা করেছে। আজ সেই চাল পূর্ণ হল।

অতীত দিনের এসব কষ্ট কথা ভাবতে ভাবতে বিরু লোকালয় পেরিয়ে তিলক নদীর পাড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। ততক্ষণে মধ্যরাত গত হয়েছে। নদীতে কোনো খেয়া বা নৌকা নেই। থাকার কথাও না। কারণ বিরু তো আর ঘাটে যায়নি। সেখানে নালন্দরাজ জলন্ধরির সৈন্যদের থানা আছে। নদীতে নেমে পড়ল সে। সাঁতরেই পার হবে।

আর ঐ দিকে! ডাকিনীতটের ১০ নম্বর ঘরে বেশ তৃপ্ত বারুণী। কিছুক্ষণ আগেই তার কুমারীত্ব মোচন ঘটেছে। যে-সে খদ্দের নয়। একেবারে নালন্দরাজ জালন্ধরির কাছে। জালন্ধরিও বেশ সুখী। এমন অপরূপ রূপসী ছোট এক পাত্রের সরু এক নালীতে সে বহুদিন গমন করেনি। বারুণী গিয়ে বস্ত্রাবৃত সেই কাষ্ঠদানী এনে রাজার সামনে রাখলো। বস্ত্র উন্মোচন করল। মুহূর্তে রাজার চোখ বিস্ফারিত হল। এ যে চৌষট্টি পান পাত্রে সাজানো সেই চিঅন বাকলের চোলাই। জালন্ধরির কণ্ঠে আতঙ্ক­ ‘এ­কি!’ বারুনী দাঠার শেখানো সেই জবাব দিল­ ‘ছোট এক পাত্র­ সরু তার নালী।’ বিদ্যুৎ গতিতে রাজা তার পোষাকের গোপন প্রদেশ থেকে ছুরি বের করে হাতে তুলে নিল। কিন্তু এই ছুরি সে কার বুকে বসাবে­, নিজের না বারুণীর?

অনলাইন : ১৯ এপ্রিল,২০১০


 

সাম্প্রতিক পোষ্টসমূহ