Banner
কবির ঈশ্বর ─ মৃন্ময় চক্রবর্তী (কবিতা)

লিখেছেনঃ মৃন্ময় চক্রবর্তী, আপডেটঃ October 20, 2015, 12:00 AM, Hits: 333

 

জুবেদ আলি মন্ডল
পেশায় রঙমিস্ত্রী
দক্ষিণের ক্যানিং লাইনে বাড়ি
তালদি থেকে ভেনে চড়ে আরো বেশ কিছু দূরে
তার গ্রাম, গ্রামের নামটা আমার মনে নেই।
তাকে চিনতাম
সে আমাকে তার বাড়ি নিয়ে যাবে বলেছিল।
জুবেদদা ছিল স্বভাব কবি,
অনেকদিন আগে আমাদের পাড়ায় একটা বাড়ি
রঙ করতে এসেছিল, তখনই তার সাথে আলাপ।
যতদিন রঙের কাজ চলছিল
ততদিন তার গান আর ছড়া কাটা শুনতাম।
সে গাজীর গান, শীতলার গান
বনবিবির জহুরানামা গাইত।
অনেক বায়নাও পেত সে এখানে সেখানে।
আমাকে একবার সে বিবিমার পাঁচালি  শুনিয়েছিল,
বলেছিল এগুলো নাকি তারই লেখা।
পরে অনেকবার দেখা হয়েছে
আমিই দেখা করতাম তার সাথে,
স্টেশনের কাছে মিস্ত্রীদের ঠেকে রোজই সে আসত কাজের সন্ধানে।
একবার বেশ কিছুদিন তার খোঁজ নিতে যাইনি বলে
সে নিজেই চলে এসেছিল আমার বাড়িতে।
তার সঙ্গে দেখা হলেই কাঁচাপাকা দাড়ি নেড়ে
পানের রসে কালো হয়ে যাওয়া ভাঙা দাঁত মেলে
হাসতে হাসতে জড়িয়ে ধরে বলত,
আমার মরমিয়া কেমন আছ?
সে বলেছিল কোনো একটা পূর্ণিমায় তার বাড়ি যেতে।
সে আমাকে ঈশ্বর দর্শন করাবে
আমার পুণ্য হবে
আমার বালাই বিপদ থাকবে না।
তার পুকুরে ভরাপূর্ণিমায় নাকি বনবিবি নামেন।
পুকুরে পিছনের বাঁশঝাড়, ভাঁট ভেরেন্ডার বন
 আলোয় আলো হয়ে যায়, ওখানে দেবী তার আটন গড়েন,
এক রাতের আটন।
মনে মনে তখন যা চাওয়া যায় তাই নাকি মেলে।
সে কপালে জোড়হাত ঠেকিয়ে বলেছিল
বনবিবিমা তোমাদের সাক্ষাৎ দুর্গা, আসবে তো একদিন?
বলেছিলাম যাব কিন্তু যাওয়া হয়নি, হয়ে ওঠেনি কিছুতেই।
এইভাবে দিন চলে গেছে অনেক।
বহুদিন তাকে আর দেখিনা,
সেও আমার খোঁজে আসেনি।
ভাবলাম বয়স হয়েছে, হয়তো পেশা ছেড়ে দিয়েছে।
হঠাৎ একদিন পার্কসার্কাসে দেখা হয়ে গেল।
দেখলাম তার বয়স বেড়েছে অনেক
আমি তাকে চিনতে পারিনি, সেই আমাকে চিনেছে।
মাথার চুল দাড়ি সব সাদা হয়ে গেছে
গাল তুবড়ে গেছে, মুখে চোখে অগাধ বিষণ্ণতা।
জিজ্ঞাসা করলাম,কি ব্যাপার জুবেদদা দেখা নেই যে একদম,
পেশা ছেড়েছ নাকি?
সে ঘাড় নেড়ে বলল, হ্যাঁ ভাই, বয়স হয়েছে আর ভাড়ায় উঠে
রঙ করতে পারিনে, শরীল বড় কমজোরি,
এখন এখেনে একজায়গায় চামড়ার কাজ করি।
বললাম, গান গাওনা আর?
সে খানিক চুপ করে থেকে মাথা নেড়ে বলল,
নাঃ, ওরা নিষেধ দেচে।
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম,
কারা তোমার গান নিষেধ দিয়েছে জুবেদদা?
তার চোখে জল টলমল করে উঠল, সে বলল,
তার গ্রামের মোড়ল মাতব্বররা তাকে গাইতে নিষেধ করেছে,
ওরা বলে মায়ের জহুরানামা গাওয়া নাকি পাপ,
এসব নাকি হিঁদুদের গান।
বুঝলাম কবির বুকের উপর দিয়ে কারা যেন
হেঁটে চলে গেছে, আর তার অন্তরের ঈশ্বর কাঁদছেন।
আমি বললাম, তোমার পুকুরে এখনো বিবিমা নামেন?
তার চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, সে ফিসফিস করে বলল,
আসে গো মা আমার আসে, আমাকে গাইতে বলে, কিন্তু আমি গাইতি পারিনা..
তার দীর্ঘশ্বাস ছাপিয়ে বুনোমোষের মত ট্রেন ঢুকে পড়ল প্ল্যাটফর্মে...
ভাবলাম যে সাধক কবির পুকুরে বনবিবি আটন গড়েন
কোন পুণ্যবানেরা তার গান নিষিদ্ধ করে
কারা তার বুকের উপর বুনোমোষ ছেড়ে দেয়...
আমি ট্রেনে উঠে পড়লাম, ট্রেন ছেড়ে যেতে যেতে দেখলাম
বৃদ্ধ কবি তখনো দাঁড়িয়ে ,
আমার গন্তব্যের দিকে উঁচু হয়ে আছে তার পুণ্যহাত।

 

সাম্প্রতিক পোষ্টসমূহ