Banner
অসময়ের গল্প – ইকবাল মাহমুদ (ছোটগল্প)

লিখেছেনঃ ইকবাল মাহমুদ, আপডেটঃ November 4, 2015, 12:00 AM, Hits: 438

 

সন্ধ্যেবেলা। বিকেলে আলো ম্রিয়মান হয়ে রাত্রির আঁধারে ডুবে যেতে না যেতেই হিম কুয়াশা চারপাশ ঢেকে দিয়েছে সাদা চাদরে। ব্যস্ত-ত্রস্ত লোকজন তাদের দিনের দেনা পাওনা মিটিয়ে আশ্রয় নিয়েছে ঘরে। কিছু মানুষ-যাদের আশ্রয় বলতে গভর্নমেন্টর কালো পিচ-তারা শুকনো পাতা জমিয়ে শহরের প্রধান সড়কে জ্বেলে নিয়েছে আগুন। একটু উষ্ণতায় শরীর ঢাকবে বলে। কেউ বা চাদরে শরীর ঢেকে আশ্রয় নিয়েছে ওয়াপদা অফিসের শ্যাতশ্যাতে বারান্দায়। মুচি পাড়ায় গড়ে উঠা চাতাল থেকে মাঝে মাঝে ধোঁয়া কুন্ডুলি পাকিয়ে ভরে তুলছে সন্ধ্যার আকাশ। এসময় বারান্দায় বসে চা খেতে খেতে নিকোলাই গোগলে পাঠ নিচ্ছিলেন সিরাজ মাস্টার। তুর্কী এসে পিছনে দাঁড়াতেই তিনি বলে উঠলেন, ‘কী রে, এলি।’

‘বাবা তুমি টের পাও কী করে? এই যে আমি এসেছি...তুমি না দেখেই বলে দিলে। কী করে বাবা?

‘ শোন, বাবা-মায়েরা তার সন্তান কাছে আসলে শরীরের গন্ধ পাই। দেখতে হয় না। নইলে কী আর মানুষে বলে রক্তের টান। তুই যখন বাবা হবি তখন বুঝবি। বুঝলি...”

‘ বুঝেছি...কী পড়ছো...গোগল?’

‘গোগল...তারাস বুলবা। তা, তোর খবর কী?আজকাল যে খুব একটা দেখা দিস না?
‘ বাবা...’

‘ হ্যাঁ বাবা। এই বয়স্ক মানুষটার খোঁজ খবর একটু রাখিস। তুই সামনে না থাকলে যে খুব অসহায় বোধ করি আজকাল। কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগে। জানিস...’

সিরাজ মাস্টারের কথাগুলো একটু অসহায়ের মতো শোনালো। তুর্কী কিছু বলল না। চুপ করে রইল। একটু পরে কী ভেবে বলল, ‘বাবা, আজ দু’জন ডেড।’

‘কোথায়?’ সিরাজ মাস্টার বই বন্ধ করে একটু থেমে-কী যেন ভাবল। তারপর প্রশ্নটা করল।

‘ পুলিশ হেফাজতে।’
 

‘তুই জানলি কী করে?’

‘ ও পাড়ায় আলোচনা হচ্ছিল। আমি আসছিলাম ঐ রাস্তা দিয়ে...মনে হয় কাগজে আসবে না।’

‘ এসব খবর কী কাগজে আসে বোকা। কখনো আসে না। আসবেও না। তবে ওরা যেভাবে সংঘবদ্ধ হচ্ছে তাতে কিন্তু আমার অন্যরকম মনে হচ্ছে।’

‘কী?’

‘ আমি নতুন কোন ভোরের আলো দেখতে পাচ্ছি। গতানুগতিক আমরা ঘুম থেকে যে ভোর দেখি, সেরকম নয়। একদম নতুন। চারপাশ আলো করে জেগে উঠা নতুন কোন ভোর। ওরা মরতে মরতে একদিন সে ভোর ছিনিয়ে আনবে দেখিস। সেদিন মনে হয় আর বেশি দূরে নয়। খুবই কাছে...’ ।

‘ ...কী কথা হচ্ছে বাপ ছেলের...আবার বুঝি কোন রাজনীতি? কোন পাড়ায় ক’টা ছেলে মরল। কোন দেশে গৃহযুদ্ধে কত জন মারা গেল। কার ছেলে স্কুলে গেল না। কার ঘরে আজ বাতি জ্বলবে কী জ্বলবে না...এমনিতে তো ছেলের মাথা খেয়েছো। নতুন করে আবার কোন মতলব ফাঁদছো দু’জনে? বন্যা এসে কখন যে পিছনে দাঁড়িয়েছে সিরাজ মাস্টার তা বুঝতে পারেনি। বুঝতে না দিয়েই সে ঝুকে গেছে তাদের গল্পের মাঝখানে।

‘ না তেমন কিছু নয়। এই একটু সাহিত্য আর কী...’

‘ যেমন বাপ, তেমন ছেলে...কোন কিছুই পরিষ্কার করে বলবে না।’ বলে বন্যা রান্না ঘরে ফিরে গেল। কিছুক্ষণ পর এক হাতে চা অন্য হাতে মুড়ি নিয়ে ফিরে এল। এসে দেখে বাপ ছেলের সেই একই খুঁনসুটি। একই গালগল্প। তুর্কীরও হাতে চা দিয়ে বলল, ‘আজ কমলিকা এসেছিল। বসতে বললাম। বসল না। বলল কী একটা দরকার আছে তোর কাছে। চলে গেল। একটা চিঠি দিয়ে গেছে। টেবিলে আছে। দেখে নিস।’ কথাগুলো বলে কিছুক্ষণ থামল বন্যা। আরও কিছু বলবে বলে যেই ঠিক সময় পাশ থেকে সিরাজ মাস্টার বলে উঠল, ‘কমলিকা? মানে আমাদের তথাগত রায় এর মেয়ে। খোকা ওকে চেনে?’

‘ তুমি তো দেখছি বোকার মতো কথা বলছো। এক পাড়াতে থাকে আর ওকে চিনবে না, তা কী করে হয়। তাছাড়া শহরটা তো আর খুব বেশি বড় না। যে চিনতে খুব কষ্ট হবে। তবে যাই বল, মেয়েটা কিন্তু বেশ গো। জানো হাসলে কী সুন্দর মুখে টোল পড়ে। মাথাভর্তি এক গাছা চুল পা ছোঁবে বলে বেড়ে চলেছে। হালকা গড়নের শ্যামবর্ণা মেয়ে দেখতে ভারি বেশ। আমার খুব ইচ্ছে আমাদের খোকাকে বিয়ে দিয়ে ঠিক এমন একটা মেয়ে ঘরে আনবো।’

ততক্ষণে গল্পের মাঝ থেকে তুর্কী আশ্রয় নিয়েছে নিজের ঘরে। আর ফিরে আসেনি। শুধু রাতে খাবার টেবিলে সবার সাথে দেখা একবার। চুপচাপ। কোন কথা না বলে একমনে খেয়ে উঠে পড়ল। প্রতিদিন যতটুকু খায় আজ ঠিক ততটুকুন নয়। একটু অল্প। খাবার সময় আনমনে কী যেন ভাবছিল। যখন ভাবছিল তখন মুখের রেখায় কেমন জানি এক ছাপ ভেসে উঠছিল। চেনা ছবি তবু যেন কেমন অচেনা হয়ে যাচ্ছিল বন্যার। শুধু বন্যার নয় সিরাজ মাস্টারেরও। তবু তারা কিছু বলল না। কোন প্রশ্ন কিংবা কিছুই। বিকেলে কমলিকার চিঠি পাবার পর থেকেই কেমন যেন সে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল। সবার থেকে। সিরাজ মাস্টার মনে শুধু একটি কথাই ভাবছিল ‘ছেলেটা ঠিক তার মতোই হয়েছে। সবকিছু মুখ বুঝে সহ্য করবে তবু কাউকে কিছু জানতে দেবে না।’ আবার এও ভাবছিলেন চারপাশের অসময় পরিবেশ তুর্কী কে কি গিলে ফেলছে? না কোন এক ভয়ংকর পথে সে পা বাড়িয়েছে যার জন্যে মাঝে মাঝে এমন দূরত্ব তৈরী হয়।  ভয় এবং উৎকন্ঠায় কোন কিছুই তিনি স্ত্রী বুঝতে দিলেন না। খাওয়া দাওয়া শেষ করে স্ত্রী এবং ছেলে ঘুমোতে গেলে সিরাজ মাস্টার বারান্দায় কিছুক্ষণ পায়চারী করে আবার পড়তে বসেছিলেন। তখন মধ্য রাত্রি। মফস্বল শহওে মধ্যরাত্রি মানে সুনশান নিরবতা। চারপাশ অন্ধকার। দোকান পাঠ বন্ধ। শুধু সোডিয়াম লাইট টিম টিমে আলো জ্বেলে প্রহরীর মতো থাকে। দু’একটা কুকুর ঘেউ ঘেউ শব্দে মাঝে মাঝে রাত্রির সমস্ত গভীরতা ভেঙে খান খান করে দেয়। কিংবা মালভর্তি ট্রাক দানবের মতো শব্দে শহরের রাস্তায় ধুলো উড়িয়ে চলে যায় কোন কারবারির গুদামে।
হঠাৎ পর পর তিনটে বিকট শব্দ যেন রাত্রির সমস্ত অন্ধকার ছিঁড়ে ফুঁড়ে বিদীর্ণ করে চলে গেল এপাশ থেকে ওপাশে। শীতের গভীর স্তব্ধতা ভেঙে মুহূর্তে জেগে উঠল পাখিকুল। সেইসাথে এক পাল কুকুর মন্ডল বাড়ির রাস্তা ঘিরে ঘেউ ঘেউ শব্দে মাতিয়ে তুলল স্তব্ধতার প্রহর। পাখির ডাক, কুকুরের ঘেউ ঘেউ শব্দ আর মানুষের মৃদু ফিসফিসানি নিরুত্তর প্রতিধ্বনিতে রূপ নিলো। একটা কুহুক পাখি কুহু কুহু শব্দে ডেকে চলল কিছুক্ষণ।

সিরাজ উদ্দিন। সামান্য প্রাইমারী স্কুল মাস্টার। মফস্বল শহরের মাস্টারদের সম্পর্কে যেসব গতানুগতিক বর্ণনা থাকে তার ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম কিছু নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে আর দশ জনের মতো কোন বড় অফিসে চাকরির জন্যে ধর্ণা না দিয়ে তিনি যোগ দিয়েছেন স্কুল মাস্টার পেশায়। একটু চেষ্টা করলে হয়তো তিনি বড় কোন অফিসার হতে পারতেন কিন্তু সেটা স্বভাব বিরুদ্ধ হওয়ায় বেশি দূর এগোয় নি। সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে অন্য পেশার থেকে তিনি স্কুল পেশাকে বেশি যুক্তিযুক্ত মনে করেছিলেন। তবে মুদ্রা দোষ বলতে যা তা হলো রাত্রিতে ঘুমোবার আগে রাজনীতি, অর্থনীত, সামজনীতি কিংবা কোন বিদেশী গল্পের ভাঁড়ারে মুখ না গুজে তিনি থাকতে পারেন না। বই পড়া এবং সংগ্রহের নেশা তার ছোটবেলা থেকে। ছোটবেলায় বাবা বই পড়া খুব ভালো চোখে দেখতেন না। পড়া শেষ করে একটা ভালো চাকরি করবে এটাই ছিলো তার একমাত্র ইচ্ছা। কিন্তু ছেলের একগুঁয়েমি, কথায় কথায় যুক্তি আর তর্কের কাছে তিনি হার মানলেন। স্বেচ্ছায় বেছে নেয়া ইচ্ছের প্রতিবন্ধকতা না হয়ে বরং দিনে দিনে সাগ্রহী, সমজদার একজন পাঠক হয়ে উঠলেন। এমনি করে সেদিনের অল্প অল্প করে জমানো সেই সব বই আজ বিশাল এক লাইব্রেরীতে রূপ নিয়েছে। এখন তার ভালোই লাগে। এ মফস্বলে যারা আগে সিনেমা, নাটক যাত্রাপালা দেখে কাটাতো আজ তারা বই ছাড়া কিছু বোঝে না। একসময় যারা কিঞ্চিৎ পাগল বলে আখ্যায়িত করত এখন উল্টো তারাই বুদ্ধি পরামর্শ দেয়। কী করলে ভালো হয়-হবে। কার কতটুকু দায়িত্ব-দায়বদ্ধতা কিংবা কী করতে হবে - এখন আর তাদের বলে দিতে হয় না। এখন রাজনীতি, অর্থনীতি, বিজ্ঞান, ধর্ম সর্ম্পকে বিভিন্ন আলোচনায় এরা মেতে ওঠে। মাঝে মাঝে পাঠচক্র সভা করে। এখন আর সে একা নয়। সঙ্গে অনেক-অনেকে।

রাত্রিতে যখন তিনি গোগল পাঠ নিচ্ছিলেন ঠিক তখন ঘটনাটা ঘটল। হঠাৎ করে। বিনা নোটিশে। কোন আগাম বার্তা না দিয়ে। ইদানিং বড় শহরের মতো মফস্বল শহরের এরকম গুলির শব্দ, বোমাবাজি, খুন, গুমের ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। একদল মানুষ আরেক দল মানুষের উপর কুকুরের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ছে। আজ এপাড়ার ছেলেরা মারছে তো কাল ওপাড়ার। যে মানুষের মধ্যে এক সময় ধৈর্য, সহনশীলতা ও সম্মান দেখানোর বোধ ছিলো তা সময়ের সাথে সাথে যেন কেমন মলিন...বিবর্ণ...ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাচ্ছে...অবক্ষয়ের অতলে হারিয়ে যাচ্ছে সুন্দর মূল্যবোধগুলো। নষ্টরা নখের থাবায় খুবলে খুবলে খাচ্ছে সবকিছু। গ্রামের পর গ্রাম, সবুজ প্রকৃতি নগরায়নের করাল গ্রীবায় বিলীন হতে হতে মানুষের সুন্দর বোধ মরে যেতে শুরু করেছে। এখন আর কেউ কাউকে রাস্তায় দেখলে সালাম দেয় না। ছোটরা গুরুজনদের দেখলে শিষ দিতে দিতে চলে যায় অবলীলায়। একদল বখাটে স্কুল, কলেজ, চৌরাস্তা দাঁড়িয়ে অশ্লীল ভাষায় মেয়েকে টিজ করে। প্রযুক্তির অপব্যবহার, অপনীতি, অপনৈতিকতা, অপসংস্কৃতি সবকিছু এদের পাল্টে ফেলেছে। শুধু এরা নয় এর সাথে যুক্ত হয়েছে বড়রাও। তারা সংখ্যায় বেশি নয়। সংখ্যালঘু এইসব নষ্ট মানুষ সবসময় অল্পতেই ধ্বংস ডেকে আনে। এটাই স্বাভাবিক। কেননা, যারা সঠিক পথ দেখাবে, পালন করবে কান্ডারীর ভ'মিকা, নেতৃত্ব দিবে নতুন কোন দিনের-নতুন কোন প্রত্যাশার তারাও আজ ভঙ্গুর-ক্ষয়িষ্ণু। এইতো সেদিন, ওপাড়ার এক মেয়েকে ধর্ষণ করল তিনজন ছেলে। পালাক্রমে। থানা, আদালত কত কী! কিন্তু কী হলো? শেষ লজ্জা, ঘৃণা, অপমান সহ্য করতে না পেরে সমাজের নপুংসক মানুষদের মুখে থু থু দিয়ে আত্মহত্যা করল মেয়েটি। কেননা সে জানে-জেনে গিয়েছিল, যে সমাজে সে বাস করে -সে সমাজ তাকে কোনদিন যোগ্য সম্মান দেবে না; দিতে পারবে না। পারবে না দিতে ভালোভাবে বাঁচার ন্যুনত্যম অধিকার।আর তাই সে আত্মহত্যা করেছিল। মারা গিয়েছিল। নীরবে প্রতিবাদ জানিয়েছিল। ও পেরেছে - আমরা পারিনি। পেরেছি কি?...

পর পর তিনটে গুলির শব্দ। চম্‌কে উঠেছিলেন সিরাজ মাস্টার। বই বন্ধ করে চোখে চোখ চেপে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন। চুপচাপ। ভাবছিলেন আজ বুঝি আবার কোন মায়ের কোল খালি হল। বুলেটের ঝাঁঝরায় ছিন্নভিন্ন হলো কোন ভবিষ্যত সন্তানের। কোন ঘরে দুঃসংবাদ বয়ে আসবে বাতাসের ডানায়। আসার সাথে সাথে হয়ত কান্নার রোল পড়বে। সকালের আলো ক্ষিপ্রতার রূপ না নিতেই পুলিশ এসে হানা দেবে দরজায়। কড়া নাড়বে। থানায় যেতে হবে। জেরার মুখে পাণ্ডুর মুখ করে বসে থাকতে হবে কোন পিতা কিংবা ভাই-এর। পাশাপশি তিনি এও ভাবছিলেন, কিছু পেতে হলে কিছু রক্ত তো ঝরাতেই হয়। সবকিছু কী সহজে পাওয়া যায়? যায় না... মনের মধ্যে এইসব আজগুবি কথা বার বার ঘুরপাক খাচ্ছিল। এই সব সাতপাঁচ ভেবে তিনি আর পড়তে পারেন নি। স্ত্রী কে ঘুম থেকে ডেকে তুলেছিলেন। বলেছিলেন,‘তুর্কী ঘুমিয়েছে?’

‘ পড়তে দেখেছিলাম। হয়তো ঘুমিয়ে গেছে। কেন?’ -  ঘুম ভারাক্রান্ত চোখে লম্বা হাই তুলে কথাগুলো বলল বন্যা।

‘ না...বাইরে কিছু একটা ঘটছে বোধ হয়। আজকাল সময়টা তো খুব একটা ভালো যাচ্ছে না।’

‘ আমাদের খোকা তো এমন নয়।’

‘আজকালকের ছেলেদের বোঝা খুব মুশকিল। কালাম শেখের ছেলে কী কম শান্তশিষ্ট ছিল। তারপর কী হলো। খুন হবার পর শোনা গেল সে এন্টি সোশ্যাল ছিল।’

‘ আমাদের খোকা কখনো এমন করবে না। করতে পারে না।’

‘তবু, আমার কেন জানি ভয় হয়। কেমন যেন লাগে। কোন এক অজানা আশঙ্কা প্রায়ই আমাকে পেয়ে বসে। বুঝি না ঠিক...তবু...’

‘ ছি! তুমি কী গো! রাত দুপুরে এমন ভাবনাও মানুষ ভাবে। কী সব অলুক্ষণে কথা। তোমার কী...।’ স্ত্রীর মুখের না বলা কথা কেড়ে নিয়ে তিনি বললেন-

‘আজ যখন পার্টি অফিস থেকে বের হয়ে চা খাব বলে পাশের দোকানে বসব ঠিক তখন নিখিলেশ এর সাথে দেখা। আমি এক নই। আরো কয়েকজন ছিলাম আমরা। কত গল্প হলো-কত কথা। কথায় আছে না কথায় কথায় কথাপুর। গল্পের কী আর শেষ আছে। পুরনো বন্ধু। কতদিন পর দেশের বাইরে থেকে এসেছে। স্কলারশিপটা পাওয়ার পর ওর আর আমার তো দেখা হয়নি। আমার যাবার কথা ছিল। আমি গেলাম না ও গেল। ডিপার্টমেন্ট আমার জায়গায় ওকে পাঠাল। আমারও খুব একটা ইচ্ছে ছিল না। বাইরে যাব। সবাইকে ছেড়ে থাকবো। এটা কী করে সম্ভব? তাছাড়া দেশ, মা, মাটি, মাতৃভূমি ছেড়ে আমি কোনদিন যেতে চাইনি। তাছাড়া ঐসময় পার্টি অফিস থেকে বাইর যাওয়া নিষেধ ছিলো। তাই যাইনি। বিদেশে ও ভালোই আছে মনে হল। দামী গাড়ী, বাড়ি, টাকা পয়সা নিয়ে বেশ আরামে আছে। একটা মানুষের বেঁচে থাকার জন্য কি এতকিছুর দরকার হয়? কী হয় এসব দিয়ে? আমার অবশ্য কিছু নেই। মাস্টারি করে সামান্য যে কটা টাকা পাই তা দিয়ে আমাদের তিনজনের সংসার দিব্যি চলে যাচ্ছে। আমি না থাকলে তোমার অবশ্য একটু কষ্ট হবে। সেটাও বেশি দিনের জন্যে নয়। সাময়িক। মানুষের জীবন সবসময় তো আর একরকম যায় না। নদীর স্রোতের মতো সে দিক পাল্টায়। তাতে কী। আমার যা আছে তাই নিয়ে আমি খুশি। যদিও মাঝে মাঝে খুব খারাপ লাগে - ছেলেকে ভালো কিছু দিতে পারি না। ভালো জামা কাপড়। ভালো খাবার। দূরে কোথাও বেড়াতে যাওয়া। অবশ্য তোমার ছেলে সে কষ্ট আমাকে ভুলিয়ে দেয়। কথার মারপ্যাঁচ কিংবা যুক্তি-তর্কে আমি ওর সাথে কখনো পেরে উঠি না। অল্পতেই ও খুশি।’ কেমন যেন অভিমানের সুরে কথাগুলো বলল মাস্টার মশাই। স্ত্রীর দিকে না তাকিয়ে অবলীলায় বলে যাওয়া কথার প্রত্যুত্তরে বন্যা শুধু বললঃ  

‘শুধু কি আমার ছেলে? তোমার নয়?’

‘আমাদের...আমরা আসলে ওর জন্য কিছুই করে যেতে পারছিনা।’

‘ কিচ্ছু করতে হবে না। যা আছে ওটুকুতেই ওর চলবে। তোমাকে যত মানুষ চেনে-জানে-সম্মান করে এটা কি ওর কাছে কম গর্বের-গৌরবের। এসব কি ওর বড় সম্পদ-বড় অহংকার নয়। খোকার কাছ থেকে আমরা কিছুই চাই না। শুধু মানুষের মতো মানুষ হলেই চলবে। আজকের যে সমাজে দাঁড়িয়ে আমরা কথা বলছি, সে সমাজে যে এমন মানুষের খুব বেশি প্রয়োজন। নইলে যে এ সমাজ পচে গলে নষ্ট হয়ে যাবে। একে তো রক্ষা করতে হবে। এর দায়িত্ব কে নেবে? কাউকে না কাউকে তো নিতে হবে। আর তুমিই তো বলো, ‘মানুষের এই ছোট্ট জীবন, যদি কোন মানুষের উপকারে না আসে, বিপদে আপদে সে পাশে গিয়ে না দাঁড়াই - তাহলে এ জীবনের সার্থকতা কোথায়? এ জীবন দিয়ে কী করবো? তাই মানুষের এ জীবন এমনভাবে কাজে লাগাতে হবে, যাতে মানুষ সারাজীবন মনে রাখতে পারে। নইলে কী সেটা জীবন হলো। বেঁচে থাকা হলো? বলো...’  

‘আমি ও তো তাই ভাবি বন্যা। বয়স হচ্ছে। ভাবনাগুলো ইদানিং খুব বেয়াড়াপনা আচরণ শুরু করেছে। না ভেবে যে এখন আর পারি না। বয়স্ক মানুষের একমাত্র সঙ্গী তো তাঁর একান্ত ভাবনা। কী পেলাম - কী পেলাম না...এইসব না পাওয়ার বেদনা মানুষের বয়স হলে খুব বেশি ভাবায়। সে বেশি নস্টালজিয়া হয়ে পড়ে। বড় বেশি আশ্রয় খোঁজে। ছেলেমানুষি তখন মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। নিখিলেশকে দেখে এসব পুরনো কথা নুতন করে মনে পড়ে গেলো। যাও তুমি গিয়ে ছেলেকে একবার দেখে এসো, ঘুমিয়েছে কি না।’

মাস্টার মশাইয়ের কথাগুলো স্ত্রীর কাছে আজ কেমন জানি ছেলেমানুষির মতো মনে হলো। শিশুর আচরণের মতো হলো। এই তার এক সমস্যা। খুব বেশি যখন ভাবে কিংবা কোন পুরনো জিনিসের দেখা পাই কিংবা ছেলেবেলার কিংবা হারিয়ে যাওয়া কিছু; তখন এমনি শিশু সুলভ আচরণ করে সে। নিখিলেশের সাথে দেখা হবার পর সে এমনি আবোল তাবোল বকতে শুরু করেছে। এখন না থামালে আরো বেশি করবে। তাই সে একটু ধমকের সুরে বললো-

‘ থাক। অনেক হয়েছে। আর ভাবতে হবে না। এখন চল। ঘুমোবে। অনেক রাত হয়েছে’...

‘ যাবো বৈ কী। আচ্ছা বন্যা... একটা কথা... শোনার পর থেকে মাথার ভিতরে ঘুরপাক খাচ্ছে। চেষ্টা করছি কিন্তু কিছুতেই মুছে ফেলতে পারছিনা...’

‘ আবার কী হলো?... ভুরু কুঁচকে প্রশ্ন করলো বন্যা।

‘হরিশংকর হঠাৎ আজ খোকার বিষয়ে কিছু বলতে চাইল। বেশ লোকজন ছিলো। তাই বেশি কিছু বলেনি। শুধু আড়ালে ডেকে নিয়ে ফিসফিস করে বললো, ‘‘বাবু, ছেলেটার দিকে একটু খেয়াল নিবেন। সময়কাল ভালো না। চারপাশে যা সব ঘটছে...” হঠাৎ নিখিলেশ আসায় আর কিছু বলতে পারেনি। হয়তো আরো কিছু বলতে চেয়েছিলো... কী বলতে চেয়েছিলো হরিশংকর... হরিশংকর কী কোন কিছুর ইঙ্গিত দিলো বন্যা... যা আমরা জানি না... ও জানে।’

হরিশংকর জলদাস। ভয়াল নদীর ভাঙনে ভিটে-মাটি হারিয়ে সে এখন মফস্বল শহরের চা’এর দোকানী। একসময় তার সব ছিলো। গোয়ালভর্তি গরু, গোলাভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ। জমিদার বাড়ীর একমাত্র উত্তরাধিকার শোষক আর গড়াই এর থাবায় সব কিছু হারিয়ে নিপীড়িত মানুষের কাতারের একজন। বিপদে আপদে সবসময় সে মাস্টার বাবুর পাশে থাকে। আত্মীয়-স্বজন বলতে যা আছে তার যোগ্য দাবিদার তিনিই। রক্ত সর্ম্পকের বাইরে থেকেও সে যেন বেশি রক্তের-সম্পর্কের। আপনের। মাস্টার মশাইয়ের তাই শেষ আশ্রয়স্থল এই হরিশংকর জলদাস।  

মস্টার মশাইয়ের গলার স্বর বার বার এক অজানা আশঙ্কার ইঙ্গিত দিচ্ছিল। মুখের রেখায় গভীর উদ্বিগ্নের ছাপ। তার মুখের দিকে তাকিয়ে বন্যা একটু ভয় পেল। মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিল। কাউকে কিছু বুঝতে দিলো না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। হঠাৎ নীরবতা ভেঙে খোকার ঘরের দিকে ছুটে গেল। দরজার সামনে দাঁড়াতেই দেখে ভিতর থেকে লাগানো। শুধু দরজার নিচের ফাঁক গলে হারিকেনের মৃদু টিম টিমে আলো আভা ছড়াচ্ছে। হয়তো ঘুমিয়ে গেছে। কিংবা পড়ছে। ডাকবে কী ডাকবে না এই ভেবে সে আবার নিজের ঘরে ফিরে এলো। লম্বা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘দরজা লাগানো। মনে হয় ঘুমিয়েছে। অনেক রাত হয়েছে। এবার চল ঘুমোতে যাবে। সিরাজ মাস্টার স্ত্রীর পিছু পিছু ঘুমোতে গিয়েছিল। কিন্তু সারারাত তার ঘুম হলো না। উল্টো পাল্টা চিন্তা মাথায় নিয়ে বিছানায় এপাশ ওপাশ করতে করতে সে ভোরের দিকে ঘুমিয়েছিল। গভীর ঘুমের মধ্যে হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে তার ঘুম ভেঙেছিল। যখন ঘুম ভেঙেছিল তখনো চারপাশের পরিবেশ পাখিদের কলরবে মুখরিত হয়ে ওঠেনি। শীতের হালকা কুয়াশা চাদরের মতো ছিল গাছেদের শরীর জুড়ে। আবছায়া অন্ধকার কুয়াশার সাথে মেতে উঠেছিল হোলিখেলায়। নারকেলের চিকন পাতায় শিশিরের জল-টিনের চালে ছন্দপতনের গান গেয়ে ফিরছিল। দুধ শিশির ঘাসের সবুজ ডগায় গভীর আহ্লাদ আর চুম্বনে মগ্ন ছিল সারারাত। দূরে কোথাও ভোরের কাক কা-কা শব্দে মুহূর্তে ছিন্নভিন্ন করে গেল সমস্ত নিস্তব্ধতা। কে যেন দরজায় দাঁড়িয়ে দরাজ গলায় দু’তিনবার ডাক দিল ‘মাস্টার মশাই... ও মাস্টার মশাই... বাড়িতে কী আছেন?’ আধো ঘুমে মাস্টার মশাই জিজ্ঞেস করলো ‘কে?’

‘ থানা থেকে এসেছি।’

‘থানা’ শব্দ কানে যেতেই সিরাজ মাস্টার ধড়পড় করে বিছানায় উঠে বসেছিল। চোখ কচলাতে কচলাতে দরজা খুলে থানার রাশভারি দারোগা ফণিভূষণ মুখুজ্যেুকে দেখে আঁতকে উঠেছিল মুহূর্তের জন্যে। নিজের অজান্তে ফিস ফিস করে বলেছিলঃ

‘দারোগা বাবু, আপনি...এত সকালে...কোন...’

‘ দুঃখিত মাস্টারশাই!সকাল বেলায় আপনাকে কষ্ট দেবার জন্যে। আমাদের সাথে একটু থানায় যেতে হবে।’

‘ থানায়...কেন?...কোন...’

‘ থানায় গেলেই সব জানতে পারবেন। আমরা অপেক্ষা করছি, আপনি তৈরী হয়ে আসুন।’

ততক্ষণে স্ত্রী এসে পিছনে দাঁড়িয়েছে। মাস্টার মশাই বউ-এর দিকে মুখ তুলে তাকালেন কিছুক্ষণের জন্যে। কোন কথা বললেন না। আলনা থেকে পাঞ্জাবি নিয়ে শরীরে চাপিয়ে চুপচাপ ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন। শুধু যাবার সময় দরজার চৌকাঠে পা রেখে স্ত্রীর দিকে ম্লান মুখে একবার চাইলেন। সামনে যে সময় আসছে সে সময় হয়তো ভালো কোন কিছু বয়ে আনবে না। হয়তো কোন কঠিন দুঃস্বপ্ন ঘাড়ের উপর দীর্ঘশ্বাস ফেলবে। ভয়ংকর কোনকিছুর আভাস দিয়ে গেলো। থানার পিকআপ ভ্যানে উঠে সমস্ত রাস্তা তিনি কোন প্রশ্ন করলেন না। মাথা নিচু করে চুপ হয়ে বসে রইলেন। থানার সামনে এসে গাড়ি থামতেই দারোগা বাবু তাকে নিয়ে সোজা নিজের ঘরে চলে গেলেন। একটা চেয়ার টেনে বসতে দিয়ে নিজের জায়গায় গিয়ে বসলেন। দু’জনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। নীরবতা ভেঙে দারোগা বাবু প্রথমে বলে উঠলেনঃ

‘চা খাবেন?’

‘ না। প্রয়োজন নেই। কী জন্য আমাকে থানায় নিয়ে এলেন...যদি বলতেন...’

‘ কী জন্য আপনাকে এই সাত সকাল বেলা ডেকে এনেছি...আপনি তো ভালো করেই জানেন থানা পুলিশ অযথা কাউকে ডেকে আনে না। বিশেষ কোন কারণ ছাড়া। তাও আবার এত সকালে। আমি অফ ডিউটিতে ছিলাম। তারপরও এসেছি...’  
‘না...যদি বলতেন।’ সিরাজ মাস্টার এতক্ষণ মাথা নিচু করে ছিলেন। এবার মাথা তুলে দারোগার চোখে চোখ রেখে সোজা প্রশ্ন করলেন।

‘আপনার ছেলের নাম তুর্কী?

‘জ্বি’

‘শুধু তুর্কী...না...’

‘তরুন তুর্কী’

‘ আপনার ছেলে এখন কোথায় আছে জানেন?

‘ বাসায়।’

‘ আপনি কী সিউর?

‘ বাসায় দেখেছি...রাতে ঘুমোবার আগে...’

‘ না আপনি সিউর নন। আপনার ছেলে বাসায় নেই। বাসায় যদি থাকতো তাহলে এত সকালে কী আমি আপনাকে বাসা থেকে ডেকে আনি!’

‘ মানে...’

‘ মানেটা খুব সহজ। এগুলো নিশ্চয়ই আপনার ছেলের (একটা ব্যাগ, ডায়েরী, কলম, কিছু লিফলেট এবং বই)।  আপনার ছেলে নেই...সে মারা গেছে। তাকে মেরে ফেলা হয়েছে। রাত্রে যখন ঘটনা ঘটে তখন আমরা জানতে পারি তিনজন মারা গেছে। দু’জনের লাশ তখনই পেয়েছি। একেবারে স্পট ডেড। সাথে একটা মেয়েও ছিলো। আর একজনের লাশ আমরা পাইনি। ভোর চারটায় কলেজ রোডের শেষ মাথায় কালভার্টের পাশে পেয়েছি। সঙ্গে এই ব্যাগটা। পেয়েই আমরা আপনার বাসায় গিয়েছি। আমি ওকে অনেক আগে থেকেই চিনি। আমার ছেলের বন্ধু। আমাদের বাসায় বেশ কয়েকবার গেছে। আমার কাছে সব ধরনের তথ্যই ছিলো। তারপরও আমরা পারিনি। আমরা ঠিকমত পৌঁছাতে পারিনি। খুনিরা আগে জেনে গিয়েছিল এবং জায়গা বদল করে ফেলেছিল। জানেন তো থানার কিছু নিয়ম-কানুন আছে, তাই আপনাকে...’


সিরাজ মাস্টার যেন তার নিজের কানকে ও বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। মুহূর্তে চোখের সামনে থাকা সব জিনিস আবছা দেখছিলেন। তার পা কাঁপছিল। হাত কাঁপছিল। না, ভয়ে নয়। এইমাত্র পাওয়া খবরটায়। হতবিহ্বল মাস্টার মশাই অপলক তাকিয়ে ছিলেন দারোগা বাবুর মোটা ফ্রেমের চশমার ভিতরে থাকা চকচকে দুটি চোখের দিকে। যে চোখ অবলীলায় সব কিছু বলে গেল। যে চোখ এক ভয়ংকর মুহূর্তের কথা বলল অবলীলায়। কোন ভয়, দ্বিধা, সংকোচ, ঘৃণা ছাড়া। ফণিভূষণ মুখুজ্যে বাবুর চোখের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন ‘একটু জল হবে?’ কিছুক্ষণ পর পিয়ন গ্লাস ভর্তি জল দিয়ে গেল। মাস্টার মশাই ঢকঢক করে সমস্ত জল খেয়ে মাথা নিচু করে বসে রইলেন। ভাবলেন স্ত্রী’কে তিনি কী বলবেন। বলার পর কী অবস্থা হবে তার...সেই দৃশ্যের কথা। সারাজীবন ছেলেকে সবকিছুতে খুব বেশি আশ্রয় দেবার জন্যে স্ত্রীর কাছ থেকে তার কম অভিযোগ শুনতে হয়নি। একটু শাসন, একটু খোঁজ খবর নেয়া সব বিষয়েই তার তাগাদা ছিলো খুব বেশি। ছেলের এই চলে যাবার দায়ভার সে কী আমার উপর চাপাবে না? আগে থেকে যদি একটু খোঁজ-খবর নেয়া যেতো, কোথায় যায়, কী করে, বন্ধুরাই বা কারা, তারা কেমন? কী তাদের ঠিকানা? তাহলে আজ এ ঘটনা কী ঘটত? ঘটত না হয়তো। এর জন্যে সে নিজেই দায়ী। ইদানিং খোকা যেন কেমন আড়ালে চলে গিয়েছিল। চুপচাপ থাকত। খুব একটা বেশি কথা বলত না। যতক্ষণ ঘরে থাকত ততক্ষণ বই নিয়ে বসে থাকত। কলেজের পাঠ চুকিয়ে বাড়ী ফিরলে খুব একটা দেখা হতো না। মাঝে মাঝে কাছে এসে এটা ওটা কিংবা কোন ভাল গল্পের কথা বলত। একটা ঘরে তিনটে মানুষ অথচ কত দূরত্ব তৈরী হয়ে গিয়েছিল সবার সাথে। দূরত্ব তৈরী হয়েছিল না কি সে নিজেই দূরত্ব তৈরী করে নিয়েছিল? কৈ আমি তো কখনো খোকার থেকে আলাদা হয়ে যাইনি। গিয়েছিলাম কি? নাকি খোকা এমন কোন কাজ করত, যা খুব কাছে থাকলে আমরা টের পেয়ে যেতাম। হয়তো তাই কিংবা...

‘ মাস্টার মশাই..কী ভাবছেন? দারোগা নীরবতা ভেঙে প্রশ্ন করলেন। একইসাথে একজন মানুষ সব হারানোর পর যেমন বিমূঢ় হয়ে যায়। হারিয়ে ফেলে তার কথা বলার সমস্ত শক্তি ঠিক তেমনি মূক-বিমূঢ় অন্যমনস্ক হয়ে দারোগার কাছে জানতে চাইলেন

‘ খোকা এখন কোথায় আছে।’

‘মর্গে। তদন্তের পর আমরা আপনার হাতে তুলে দিব। আপনাকে আরেকবার একটু বিকেলে আসতে হবে...আচ্ছা আপনি কী জানতেন তুর্কী আজকাল কোথায় যেতো-কী করতো?’  

‘না...তবে বন্ধুদের সাথে প্রায়ই বাইরে বেড়াতে যেতো। আমার সাথে ইদানিং খুব একটা দেখা হতো না। স্কুলে থাকতাম। সারাদিন পর বাড়ি ফিরে খুব কম সময়ই ওকে কাছে পেয়েছি।’

‘ আপনি একজন মাস্টার হয়েও ছেলের থেকে এত দূরত্বে ছিলেন। জানেন ও নিষিদ্ধ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হয়ে গিয়েছিল। ও একজন এন্টি সোশ্যাল। ওরা গোপন সংগঠন গড়ে তুলেছিল - তুলেছে। ও একা নয়। ওর সাথে আছে আরো অনেকে। সংখ্যায় ওরা অনেক। আপনার মনে আছে কিছুদিন আগে জেলার খাদ্য গুদামের কিছু উদ্ধর্তন কর্মকর্তা খুন হয়েছিল। শুধু তাই নয় ধর্ম নিয়ে যারা বেসাতি করে। ব্যবসা ফাঁদে। রাজনীতি করে এমন আরো বেশ কয়েকজন মারা গেছে এ শহরে। সে সব ছিলো ওদের গ্রুপের কাজ। ওরা ঘুণধরা সমাজটাকে ভেঙে নতুন করে গড়ার শপথ নিয়েছিল। জানেন ওদের ভয়ে এখন শহরের বড় বড় অফিসার কোনঠাসা। ওরা থানাও লুট করতে চেয়েছিল। আমি সব জানি। তারপরও আমি ওদের বিরুদ্ধে কোন স্টেপ নিইনি। অথচ ওরা কী না মারা গেল আততায়ীর গুলিতে। আপনার ছেলের ব্যাগে যেসব নামের তালিকা পেয়েছি তা আমি সরিয়ে ফেলেছি। কারো হাতে তুলে দিইনি। কোনদিন দিব না। ও যা বলছিলাম, চলুন মর্গে থেকে আসি তার পর না কথা বলা যাবে।...’

দারোগার পিছু পিছু সিরাজ মাস্টার হিম ঘরে গিয়েছিল। সাজানো বেশ কিছু বেওয়ারিশ লাশের মধ্যে থেকে তার খোকার লাশ দেখেছিল দু’চোখ ভরে। বাক নিস্তব্ধ মাস্টার মশাই খোকার লাশের দিকে-মুখের দিকে ম্লান দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে ছিল। তার মুখে কোন কথা ছিল না। ছিল না বুকের ভিতর থেকে উঠে আসা কোন ভাষা। যে ভাষায় সে স্কুলের ছাত্রদের পড়ায়। যে ভাষায় সে খোকাকে প্রথম পাঠ নিতে শিখিয়েছিল। যে ভাষায় খোকা গুটি গুটি পা ফেলে বাবার হাত ধরে একদিন হেঁটে গিয়েছিল নিশ্চিন্তপুর মেলায়। বাবার কাঁধে চেপে মেলার ভিড়ে হৈ হুল্লোড় আর উৎসবের মাঝে প্রতিমা দেখে বলেছিল, ‘বাপজান আমারে এমন একটা বউ কিনে  দিবা।’ সেই খোকা। আজ হিম ঘরে। বুকের সমস্ত গভীরতা দিয়ে যাকে এতদিন আগলে রেখেছি, উত্তাপ দিয়ে ভুলে দিয়েছি সমস্ত ঠান্ডার কষ্ট, এতটুকু আাঁচড় লাগতে দেইনি শরীরের কোথাও। একটু কেটে গেলে বা ব্যাথা পেয়ে শব্দ করে উঠলে নিজের ভিতর ব্যাথা পেয়েছি আগে। শীতে কুঁকড়ে যাবে বলে শরীর থেকে নিজের শাল খুলে জড়িয়ে দিয়েছি ওর শরীরে। সেই খোকা। আমার খোকা। আজ হিম ঘরে। হিম ঘরের ঠান্ডায় নিথর হয়ে পড়ে আছে। কোন নড়াচাড়া নেই। ঠান্ডায় কাশির কোন শব্দ নেই। খোকা তোর কী ঠান্ডা লাগছে না। খোকা একবার বল ‘বাবা, আমার খুব ঠান্ডা লাগছে। আমি আর পারছিনা। আমাকে নিয়ে যাও এখান থেকে। একবার বল খোকা। একবার বল...’  

মাস্টার মশাই এর কথা শুনে পিছন ঘুরে ফণিভূষণ মুখুজ্যে চোখ মুছছিলেন। তিনি কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিলেন না যে, মাস্টারমশাইএর ছেলের সাথে একই হিমঘরে তার ছেলেও ঘুমিয়ে আছে। একই ভাবে তার ছেলেও মারা গেছে। কত আদরের, কত মায়া দিয়ে এতটা বড় করে তুলেছেন তিনি। তিনি কী করে বলবেন এ কথা। একজনের শোক আরেক জন বুঝবে কী করে। আজ যদি আমি শোকাতুর না হতাম তাহলে হয়তো মাস্টার মশাইএর শোক বুঝতে পারতাম না। আমার তো তিনটে ছেলে আর মাস্টার মশাই। সে কী করে ভুলবে এ শোক। আমি না হয় আরো দুজন কে নিয়ে থাকতে পারবো। সে? ছেলে মারা যাবার পর ও বুকে পাথর বেধে ছিলাম। শুধু মাস্টার মশাইকে বুঝতে দিব না বলে। শুধু আমি ওদের দলে নাম লিখিয়েছি বলে বুকে পাথর বেঁধে আছি। দাঁতে দাঁত চেপে কথা বলে গেছি। মুখের রেখায় নকল অভিনয় করে নিজের দুঃখটা কে আড়াল করে গেছি। এখন সে অভিনয় আমাকে করে যেতে হবে।  

হিম ঘরে সিরাজ মাস্টার কিছুক্ষণের জন্যে মূর্ছা গিয়েছিল। কোন কথা না বলে আচম্‌‌কা পড়ে গিয়েছিল মেঝেতে। দারোগা বাবু আশে পাশে যাকে পেয়েছিলেন তাদের সাহায্য নিয়ে ফিরে গিয়েছিলেন নিজের অফিস ঘরে। ডাক্তার ডেকে মাস্টার মশাইকে সুস্থ করে তুলেছিলেন।বলেছিলেন-

‘মাস্টার মশাই আপনাকে আমি বাড়ি পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করছি। আপনি বাড়ি চলে যান। বিকেলে আমি লাশ নিয়ে আসব। আমার নিজের কিছু কাজ বাকী আছে। শেষ করে তবেই আসব...ততক্ষণ পর্যন্ত একটু অপেক্ষা করতে হবে।...’

‘না স্যার...আমি থাকব। যার জন্যে এতটা বছর কষ্ট করে এসেছি তার জন্যে এই কটা ঘন্টা বসে থাকবো এটা কী খুব বেশি কষ্টের। সন্তান হারানো বেদনার চেয়ে অপেক্ষার কষ্ট কী খুব বেশি? বলুন...’

‘তা ঠিক আছে...কিন্তু অনেক সময় লাগবে। তারচেয়ে আপানি বাড়িতে চলে যান। আমার উপর একটু বিশ্বাস রাখুন। না হয় এই খাকি পোষাকি মানুষটার উপর আপনার ছেলের কিছু দায়িত্ব দিয়ে গেলেন। প্লিজ! আর না করবেন না।’

এরপর সিরাজ মাস্টার চোখ মুছতে মুছতে পা বাড়িয়েছিলেন দরজার দিকে। হতবিহ্বল সিরাজ মাস্টারের দিকে তাকিয়ে দারোগা বাবু কিছুতেই নিজেকে সামলে নিতে পারেন নি। মাস্টার মশাইয়ের মতো তারও যে বড় ক্ষতি হয়ে গেছে। এ কথা সে কী করে বলবে। কিভাবে বলবে। মাস্টার মশাই যখন পিকআপ ভ্যানের পাটাতনে পা রাখবে ঠিক তখন ফণিভূষণ মুখুজ্যে পিছন ‘মাস্টার মশাই’ বলে ডেকে উঠলেন। মাস্টার মশাই ঘাড় ঘুরে তাকাতেই তিনি হাতের মধ্যে হাত নিয়ে বললেনঃ

‘মাস্টার মশাই, আমার ছেলেটাও নেই। কাল আপনার ছেলের সাথে আমার ছেলেও ছিলো। আমি আপনাকে বলতে পারিনি। কষ্টটা বুকের মধ্যে চেপে রেখেছিলাম। জানেন আমার বাসায় যখন ওরা গল্প করতো তখন আমি কান পেতে ওদের কথা শুনতাম। প্রথম প্রথম কিছু বুঝতে পারতাম না। পরে ঠিক ব্যাপারটা ধরে ফেললাম। আর তারপর থেকেই কেন জানি ওদের খুব ভালো লেগে গেলো। ওদের আদর্শ... নীতি... ওরা যা করতে চায়...সব। সেই থেকে আমিও ওদের দলের একজন হয়ে গেলাম। কত রিপোর্ট ছিল ওদের গ্রুপের নামে। তারপরও আমি ওদের ধরিনি। কাউকে ধরতে দেয়নি। কেননা ওরা যে নতুন সমাজের কথা ভাবছিল তার নীরব সমর্থক ছিলাম আমিও। সেই সমাজ ব্যবস্থা যে আজ বড্ড দরকার মাস্টার মশাই। ওরা মরেনি। ওরা মরতে পারে না। একজন তুর্কী মারা গেছে, একজন কমলিকা মারা গেছে, একজন স্বাধীন মারা গেছে, তাতে কী। আরো অনেক তুর্কী, কমলিকা, স্বাধীন এর জন্ম ওরা দিয়ে গেছো। প্রতি বিপ্লবে বিপ্লবে ওরা বেঁচে থাকবে। সালাম কমরেড! লাল সালাম।’

মাস্টার মশাই ফণিভূষণ মুখুজ্যের দিকে তাকিয়ে কী বলবেন ঠিক বুঝে উঠতে পারলেন না। একবার চাইলেন। সে চাহনিতে কিছুক্ষণ আগে যে হতাশা ছিল তা আর নেই। নেই কোন বিহ্বলতা। সংকোচ, ভয়, উৎকন্ঠা কিংবা হারানোর কিছু। দাঁতে দাঁত চেপে একজন বিপ্লবী যেমন তার শেষ মুহূর্তে লড়ে যাবার প্রত্যয় ব্যক্ত করে ঠিক তেমনি - তিনিও, হাতটা সরিয়ে দারোগার কাঁধের উপর রাখলেন। কাঁধ চাপড়ে বললেনঃ

‘আসি, দারোগা বাবু...আবার দেখা হবে...’

১১ ডিসেম্বর ২০১২