Banner
একটি গল্প ─ ইকবাল মাহমুদ (ছোট গল্প)

লিখেছেনঃ ইকবাল মাহমুদ, আপডেটঃ January 16, 2016, 12:00 AM, Hits: 396

 

ম্রিয়মান শরৎ। ভেজা বাতাসে শীতের পূর্বাভাস। শিশুর ঠোঁটের মতো বিকেলের রঙ ক্ষয়ে সরীসৃপের মতো মিশে যায় রাত্রির গভীরে। ব্যস্ত ত্রস্ত মানুষ মাঠ থেকে ফিরতে শুরু করেছে ঘরে। একঝাঁক গাঙ শালিক ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে চলে গেল সুদূর-দিগন্তে ... দূরে... কোন উৎসবের ছন্দপতন শব্দ শিশিরের সন্ধ্যার মতোন বার বার ফিরে আসছে। কোথায় যেন কারা মেতে উঠেছে উল্লাস আর অভিমানের হোলিখেলায়। বেদে পাড়ার সর্দার হিমাংশু এক পাল শুয়োর তাড়াতে তাড়াতে আবছায়া অন্ধকারে মিশে গেল মুহূর্তে। ফিরে গেল ছোট ঘুপসি ঘরে। শান্ত, নিবিড়, স্নিগ্ধ পুকুরের জলে মাছরাঙা ব্যর্থ শেষ চেষ্টায় মেতে উঠছে বারবার। বাশঁঝাড়ের শুকনো কঞ্চি ছুঁয়ে ফিঙে এক সন্ধ্যার আঁধারে খুঁজে ফিরছে ঘাসফড়িঙ। সাদা বক চক চক দিনের ব্যস্ততা শেষে ঠাঁই বসে আছে বিমূঢ় হিজলের উঁচু ডালে। দাস ক্যাপিটালের পাতায় চোখ রেখে - ক্ষুব্ধ জানালায় বসে উদ্বাস্তু ভাবনায় ভাসতে ভাসতে হঠাৎ কোথায় যেন হারিয়ে যায় চয়ন...নিজেকে হারিয়ে খুঁজে ফিরে কোন কালগল্পের উপাখ্যান...ঘাসফড়িঙের ডানায় বিকেলের রঙ...আট বছর আগের একদিন...উৎসব...হঠাৎ কোন মুহূর্ত।... চোখের সামনে সেলুলয়েডের দৃশ্যপটের মতো ভেসে উঠে পটভূমি... জীবনের জলছবি...

 

- আজ কি আপনার একটু সময় হবে?  বিকেলে?  পৌষ মেলায় যেতাম। কখনো যাইনি-দেখিনি। আমি অবশ্য একা যেতে পারতাম...মাহবুব ভাই বললো...যদি আপনার...ও, সরি! আমি অরুন্ধতী। অরুন্ধতী রাই। সবাই আমাকে রাই বলেই ডাকে। আপনিও ...আপনার সাথে অবশ্য পরিচয় হয়নি...কী একটা কাজে বাইরে ছিলেন... শুনেছিলাম... তাই...

 

কোন দাড়ি, কমা, সেমিকোলন না মেনে এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে গেল রাই। চয়নকে কিছুই বলার সুযোগ দিলো না। হতভম্ব চয়ন কিছুক্ষণের জন্যে কোথায় যেন হারিয়ে গেল।...

 

আজ দু’দিন হলো রাই এসেছে অথচ সে যেন নিত্য দেখা জগতের কেউ। এ অজ পাঁড়াগায়ে তার যেন কত দিনের বাস-কত চেনা সবাই। সবকিছু ঠিক নিজের চেনা জগতের মতোন। কোন কিছুতে আড়ষ্টতা নেই। ভয়, দ্বিধা, সংকোচ, কিছুই না। রাই এর মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে কোন কথা বলল না চয়ন। চুপ করে রইল। উত্তর বা প্রত্যুত্তর কোনটাই না। ভাবলেশহীন নিরুত্তর চয়নের মুখের দিকে তাকাতেই লজ্জা পেল রাই। কিছু বলল না। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর যখন দেখল কোন প্রত্যুত্তর নেই ঠিক তখন বলে উঠল-

 

- এই যে! কী ব্যাপার! বিপদে ফেলে দিলাম নাকি?

 

- না...

 

- তবে?

 

- ভাবছিলাম...

 

- ...ভাবছিলেন...কী...আমি কে? কী আমার পরিচয় কিংবা প্রথম আলাপেই বেহায়ার মতো এমন একটি প্রস্তাব-এই তো?...

 

- আশ্চর্য! আপনার সাইক্লোজিকাল ইগো তো বেশ তীক্ষ্ণ । কী করে...

 

- হ্যাঁ বলে দিলাম। এখন বলুন আপনি যাবেন কি না?

 

- ঠিক আছে... যাবো...

 

আচমকা এরকম একটা ঘটনার মুখোমুখি হতে হবে চয়ন কখনো ভাবেনি। ভাববে কী করে - কখন কী ঘটবে সেটাতো কেউ আগে থেকে ভেবে রাখে না। সে ও ভাবেনি। আর অরুন্ধতী... যে আচম্কা এমন এক কাণ্ড করে বসবে তা কে জানতো। তবে সে নিজেকে আড়াল করে রাখার মেয়ে নয় এমনকি অভ্যস্তও নয় সেটা পরিষ্কার। গৎ বাঁধা জীবনের মধ্যে আষ্টেপৃষ্ঠে মরার চেয়ে স্বাধীন-স্বচ্ছন্দে ডানা মেলে বাঁচার মধ্যে অবাধ স্বাধীনতা আছে এবং সেটা আদায় করে নিতে হয় তা তার ভালো করে জানা। তাই নিজেকে সে আড়াল করে রাখতে চায় না বা রাখে না। কিন্তু চয়ন সম্পূর্ণ বিপরীত। মুখচোরা-আতœমুখী চয়ন... যে কি না নিজেকে আড়াল করতে - আড়ালে থাকতে ভালোবাসে। একটা মেয়েকে নিয়ে সে মেলায় যাবে... নিজেকে কিছুতে বিশ্বাস করতে পারছে না। কিছুক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া ঘটনা এখন তার কাছে হঠাৎ ঝড়ের মতোন মনে হচ্ছে। ঝড় যেমন এই এলো - সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে আবার চলে গেল - ঠিক তেমনি। চয়নের ভাবনার মাঝখানে সম্মতিটুকুন নিয়ে কখন যে রাই চলে গেছে সে টের পায়নি। যখন ধ্যানমগ্ন চয়ন নিজেকে ফিরে পেয়েছিল তখন ঘুরে তাকাতে দেখে সে নেই। এমনকি অফিসের সবাই। শুধু সে আর বে-খেয়ালী কল্পনা ছাড়া।

 

ছেলেবেলায় চয়ন অনেকবার মেলায় গেছে। গ্রামের মেলায়। বাবার হাত ধরে। গ্রামের মেলা সব সময় ভিন্ন হয়। শহরের জাঁকালো আলোর হোলিখেলা থাকে না সেখানে। সেখানে সন্ধ্যা হলে হ্যাজাক আলো জ্বলে নয়তো কুপি। সেখানে সার্কাস হয়। লাঠি খেলা। জুয়া। জাদু। বায়োস্কোপ আরও কত কী হয়! শহরে এগুলো খুব একটা দেখা যায় না। এজন্য গ্রামের মেলা এবং উৎসব একটু ভিন্ন থেকে ভিন্নতর হয়। বাড়ির পাশে মাঠ পেরিয়ে নিশ্চিন্তপুর গ্রাম। ছোট্ট নদী। সাপের মতো এঁকে বেঁকে গেছে বহুদূর... শ্মশান ঘাট। হিজল, জারুল, জামরুল, বট - সে সব গাছ ঘিরে বেড়ে উঠেছে আরো কত রকমের গাছ। সেখানে মেলা বসত। আশে পাশের হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ সবাই হাজির হতো সে মেলায়। কালী পূজা, দুর্গা পূজা, লক্ষ্মীপূজা কিংবা পৌষ ফাগুনের মেলা। সারা বছর নানা রকমের মেলা বসত। মেলাকে উপলক্ষ্য করে দোকানীরা পসার সাজাতো। বাণিজ্য করত। নানা ধর্মের মানুষ মিলে মিশে-আনন্দ আর  উল্লাসে কাটিয়ে দিত সময় নির্বিঘ্নে... কত আন্তরিকতা ছিল পরস্পরের মধ্যে। এখন আর সেসব দেখা যায় না। সময়ের সাথে সাথে সবকিছুই কেমন যেন পাল্টে গেছে। পাল্টে গেছি আমরা। কিংবা পাল্টে যেতে হয়।

 

চয়ন ঠিক ভাবতে পারে না। নিজের অজান্তে নিজের অন্যমনস্কতা বুঝতে পারে। যখন বুঝতে পারে তখন বিকেল গড়িয়ে গেছে। অফিসের সবাই ফিরে গেছে যার যার ঠিকানায়। তড়িঘড়ি সে ঘরে ফিরে ঠাণ্ডা জলে নিজেকে মেলে ধরে। ক্লান্তি, অবসাদ সমস্ত দিনের ব্যর্থতা ধুয়ে সে খুঁজে ফিরে অন্য এক অনুভূতি, উদ্দীপনা। কে যেন দরজায় কড়া নাড়ছে। মৃদু আওয়াজ কানে যেতে ভিতর থেকে বলে উঠে, ‘দরজা খোলা আছে।’

 

তিনতলার উপর ছোট্ট চিলেকোঠা। ছিমছাম। এক পাশে বারান্দা। বারান্দার কোল ঘেঁষে বেড়ে উঠেছে ঝাউগাছ। একটু বাতাসে সমুদ্রের গর্জনের মতো ফুঁসে উঠে। বারান্দায় দাঁড়ালে দেখা যায় - দূরে শহরের ছোট ছোট ঘুপসি ঘর, ডাকবাংলো, বেদে পাড়ার আকীর্ণ জীবন-যাপন, ঢাউস পালের মতো আকাশ...রুপোর থালার মতো আস্ত চাঁদ-পূর্ণিমা। ভরা পূর্ণিমায় জানালা গলে ঠিকরে পড়ে জোসনা। সে আলো ধেউ ধেউ করে নেচে বেড়ায় ঘরময়। তখন অদ্ভূত লাগে। বাড়িওলা খুব যতœ করে তৈরী করেছিল এ চিলেকোঠা। নিজে থাকবে বলে। সংসারের প্রতি উদাসীন-বাউন্ডুলে বাড়িওয়ালার আর থাকা হয়নি। প্রয়োজনের তাগিদে হয়তো অন্য কোথাও ঠাঁই নিতে হয়েছে। কিংবা বেছে নিতে হয়েছে কোন সন্তর জীবন। শেষ সমস্ত দায় কাঁধে এসে পড়েছে চয়নের উপর। চয়নও ঠিক সবকিছু গুছিয়ে নিয়েছে নিজের মতো করে। যদিও মাঝে মাঝে বাড়িওয়ালা আসে। পাওনা বুঝে নিতে নয় - চয়নের সাথে আন্তরিকতার খাতিরে - কিংবা হৃদয়ের টানে – কখনোবা আসে না। তখন চয়নকে কিছু একটা করার ব্যবস্থা করতে হয়।

 

নিজের চেনা জগতের সাথে কল্পনার জগৎকে খুঁজতে গিয়ে যখন আশ্রয় জুটল এ চিলেকোঠায় তখন নিজের মতো কল্পনার জগৎকে সে সাজিয়ে নিল। দেয়ালে দেয়ালে ফ্রেমে বন্দী মার্কস, লেলিন, পিকাসো, ফিদা, হুসেন, রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ পেরিয়ে সার্ত্র, গোগল আরো কত কে! পাশাপাশি নিজের আঁকা এবং তোলা বিভিন্ন সময়ের স্কেচ ও ছবি। একপাশে ছোট লাইব্রেরী। থরে থরে সাজানো বই। ইজেলের কোন ছুঁয়ে কালো পাথুরে ম্যুরাল-দুরন্ত বালক রিং ঠেলতে ঠেলতে দৌড়চ্ছে। অন্য পাশে বিবস্ত্র- নির্বাক দৃষ্টি মেলে কথা বলতে চাইছে অর্ধ উলঙ্গ রমণী। সারা ঘর ছবির মতো সাজানো-গোছানো তবু যেন কী নেই। কোন্ এক গভীর শূন্যতা ঘর জুড়ে খেলা করছে। প্রতিটি বস্তু, প্রতিটি ছবি, প্রতিটি বইয়ের কোণায় কোণায় কোন সে শূন্যতা। এক গভীর ক্ষত। এক গভীর বেদনা গুটি গুটি পায়ের পদচিহ্ন এঁকে চলেছে। সেই না থাকা এবং শূন্যতার মাঝে অরুন্ধতীকে দেখে থম্কে গেল চয়ন। অপ্রস্তুত নিজেকে সামলে নিয়ে বলে উঠল-

 

-ওখানে কিছুই পাবেন না। না কোন প্রেতাত্মা না কোন রূপকথার পরী। কিছু ধুলো আর পোকামাকড়ের ঘরবসতি ছাড়া। আমি একা মানুষ। সারাদিনের ক্লান্তি শেষে আমার অবসাদগুলো ওদের সাথে ভাগাভাগি করি। ওরাই আমার সব - ওরাই আমার নিত্য বোঝাপড়ার যোগ্য সমঝদার বলতে পারেন। তাছাড়া ওদেরও তো কিছু একটা জায়গার দরকার...যাক সে সব... তা একেবারে বিনা নোটিশে...কে পথ দেখিয়ে দিলো? নাকি একা...

 

-কেন আমি কি অন্ধ যে আমাকে পথ দেখিয়ে দিতে হবে...আমি বুঝি একা আসতে পারি না...তাছাড়া একজন আর্টিষ্ট, একজন চয়ন চৌধুরীর বাসা চিনতে কারো সাহায্য লাগে এটা কে বলল আপনাকে। যে রঙ এবং তুলি নিয়ে খেলা করে তাকে খুঁজে পেতে খুব কি কষ্ট হবার কথা... বলুন?...

 

-বাব্বা এত অল্প সময়ে এতকিছু জেনে গেছেন। একটুও না। তবু ...এত অল্প সময়ে একজন মানুষকে কতটুকু জানা যায় চেনা যায়...যায় কি? বলুন... একজন চয়ন চৌধুরী নিতান্ত ছা পোষা সাধারণ মানুষ। ঢোল পিটিয়ে খ্যাতির বাহাদুরী প্রকাশ করার দুঃসাহস সে কোথায় পাবে। একটু আধটু সৃষ্টিশীলতা যা আছে তাও আবার মাঝে মাঝে আপনাদের ঐ দাড়িওয়ালা ভদ্রলোক সহ্য করতে পারেন না। কেন তিনি সহ্য করবেন বলুন। দেয়া নেয়ার সর্ম্পকের মাঝে-বোঝাপড়ায় সমমনা না হলে মনের সর্ম্পকে যে ফাটল ধরে...তাই হয়তো...সবাই তো আর একরকম হয় না। তাছাড়া যোগ্য সমঝদার সেটাও তো ভাগ্যের বিষয়...না?

 

-একজন নাস্তিকের মুখে বিষয়টা কেমন রাম রাম উচ্চারণের মতো শোনালো না?

 

-কেন একজন নাস্তিক কী যোগ্য সমঝদার খুঁজতে পারে না? আপনার কী ধারণা আমি এ কাজের যোগ্য নই?

 

-বারে! আমি তো সে কথা বলিনি...তবে আমার মনে হয়েছে স্বাভাবিকতা তার লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে...কিংবা যেতে চাইছে। তাই...

 

-আর কী কী মনে হয়েছে?

 

আর কিছু নয়...সবটুকু যদি বলে দিলাম বাকী কটা দিন কী নিয়ে সময় পার করব বলুন মশাই। সে না হয় তোলা থাক অন্য কোন সময়ের জন্যে...কোনদিন... এখন তৈরী হয়ে নিন। বেরোতে হবে।

 

-আচ্ছা আমার ঘরে একজন সুন্দরী মহিলার অনভিপ্রেত প্রবেশ এটা যদি কেউ জানতে পারে বিশেষ করে এ মহল্লায় তাহলে কী হবে ভেবেছেন একবার? সবাই আমাকে কটাক্ষ করবে না?

 

-ও আপনার বুঝি জাত যাবে? আগে শুনেছি অনভিপ্রেত কোন কিছু ঘটলে মেয়েদের জাত যায়। এখন দেখছি ছেলেদের শরীরেও কলঙ্কের কালি লাগে। তা বেশ! তা না হয় আমার উপর চাপিয়ে দিবেন। বোঝাপড়াটা তখন আমি করে নিব। এখন চলুন...

 

এরপর চয়ন বেরিয়ে গিয়েছিল ঘর থেকে। পিছন পিছন রাই। গলির রাস্তা পেরিয়ে কালভার্টের সামনে এসে থম্কে কী ভেবে দাঁড়িয়েছিল কিছুক্ষণ। কী ভেবে কে জানে। চয়ন হয়তো নিজেই জানে না। কিংবা জানে কী? কিছু কিছু মানুষ আছে যারা এমন অদ্ভুত স্বভাবের। কখন যে কী করে বসে ভেবে করে না। সে খেয়ালও হয়তো তাদের থাকে না। পৃথিবীতে এমনি সব মানুষ আছে যাদের মধ্যে কেউ এমন স্বভাব ধারণ করে। কেউ একজন ভিড়ের মধ্যে ধাক্কা দিয়ে চলে গেল। সে আবার হাঁটতে শুরু করল। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার ঘন অন্ধকার হাওয়ায় হাওয়ায় সবে জমাট বাঁধতে শুরু করেছে। খালের ধার ঘিরে গড়ে উঠা ঘুপচি ঘরে টিম টিমে আলো আঁধারের সাথে যুদ্ধ করে ফিরছে। ঢোল আর মাদুলীর শব্দের সাথে শঙ্খধ্বনি জানান দিচ্ছে সন্ধ্যার আগমনী। মোয়াজ্জ্বিন আজান শেষ করে প্রতিনিধিত্ব করছে নামাজের। শিশুরা সুর করে পড়তে শুরু করেছে পাঠশালার নিয়মিত বাড়ীর পাঠ। বেদে পাড়া থেকে বুনো শুয়োরের উৎকট গন্ধ ঝটকা বাতাসে মিশে নাক ছুঁয়ে গেল। হঠাৎই পাশের বাড়ীর চামেলী স্বামীর ঘর আর করবে না বলে কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে এলো রাস্তায়। রোজই এমন হয়। সন্ধ্যার অন্ধকার-রাত্রির গভীরে মিশে যাবার সাথে সাথে তার রাগও উবে যেতে থাকে। পরদিন আবার সব ঠিক। আবার সেই নিত্য বোঝাপড়ার পাঠ। আবার সেই একই পাঁচালী। একই খুনসুটি। অন্যমনস্ক চয়ন ততক্ষনে রাইয়ের কাছ থেকে অনেকটা এগিয়ে গেছে। অন্ধকারে ঠিক দেখা যাচ্ছে না। কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে ঘুরে দাঁড়াল চয়ন। দূরত্ব মাপার চেষ্টা করল। পারল না। ফিরে এল। রাই এর কাছে এসে দাঁড়াতেই-

 

-আপনি যদি রেসের মাঠে থাকতেন নিশ্চিত পুরস্কার কেউ আটকাতে পারত না। বাব্বা! এত জোরে হাঁটতে পারেন।  পিছনে যে একজন অতিথি আছে তার খবর তো একটু রাখতে হয়। কেউ যদি নিয়ে যায় তার দায়ভার তো আপনার উপরই এসে বর্তাবে না কী?

 

-অভ্যেস নেই।তবে মনে থাকবে...আর কখনো...

 

-অভ্যেস নেই মানে...

 

-না কখনো ...থাক এসব...আসলে আমি একটু ... আমার পিছনে যে কেউ আছে তা বেমালুম ভুলে গেছি...

 

-বেশ...আর অভিযোগ মাথায় নিতে হবে না। চলুন...

 

কালভার্টের বাঁক পেরিয়ে মাঠের সীমানায় আসতেই লাল-নীল আলোয় ওদের দুজনের মুখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। নানা রঙের আলোয় সাজানো মেলার চৌহদ্দি। চারপাশ টিন দিয়ে সীমানা প্রাচীর করা। সীমানার ঠিক স্বাভাবিক দূরত্বে দুটো গেট। টিকিট ঘর। রাস্তার দু-পাশ জুড়ে দোকানিরা পসার সাজিয়ে বসে আছে। মিষ্টি-মিঠাই, মহিলাদের প্রসাধনী, নানা রঙের খেলনা, খাবার, মাটির পুতুল শোভা পাচ্ছে দোকানে দোকানে। মেলার মাঝখানে বড় তোরণ। তাকে ঘিরে গোলাকার চরকা। একপাশে সাজঘর। যাত্রা পালার জন্যে। নকল জীবনের রঙ মেখে নায়ক-নায়িকা উপাখ্যান পর্ব – বিনোদন - সাধারণের জন্যে উপভোগ্য করে তোলা। পুতুল নাচ। পঙ্গপালের মতো নারী-পুরুষ দলে দলে ভিড় ঠেলছে মেলায়। সারা বছর হাড় ভাঙা খাটুনি আর সংসারের টানাপোড়নে উল্লাস ওদের চোখ রাঙিয়ে চলে যায় কোন অবসরের দেশে। তাই ওদের কোন অবসরে ফুসরত থাকে না। প্রতিবছর ধান কাটা শেষে তাই ওরা স্বপ্ন দেখে একটু হোলিখেলার। অবসরের। আনন্দের। উৎসবের।  আজ ওরা এসেছে সমস্ত দিনের ক্লান্তি মুছে আনন্দগুলো ভাগাভাগি করে নিতে।

 

ভিড়ের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে কখন যে দুজনের হাত এক হয়ে গেছে কেউ টের পায়নি। পুতুল নাচ- পুতুলের বিয়ে আখ্যান পর্ব দেখতে দেখতে ভিড় ঠেলে একসময় ওরা মেলা থেকে বের হয়ে এসেছিল সড়কে। জোসনার হলুদ আলোয় ভিজতে ভিজতে সড়ক থেকে হারিয়ে গিয়েছিল মাঠের ধুসর পথ- জমিদারের পৌঢ় পোড়াবাড়ীর শেষ ভগ্নাবশেষে। এখন আর এখানে কেউ থাকে না। ধ্বংসাবশেষ ছাড়া। এলাকায় প্রচলিত কথিত জমিদার আর তার বংশধর নাকি কোন এক ভরা পূর্নিমা রাতে দিঘীর জলে ডুবে মরেছিল। উত্তরাধিকার বলতে কেউ নেই। ভয়ে এখানে কেউ আসেও না। রাত্রে তো নয় দিনেও খুব একটা কাউকে দেখা যায় না। কী এক অচেনা আবেগ-অভিপ্রায়ে ওরা এসে দাঁড়িয়েছিল পুকুর ঘাটে। ভরা পূর্ণিমায় পুকুরের জল ধেই ধেই নেচে নেচে খেলা করছিল। গাছের পাতা ছুঁয়ে শিশিরের জল টুপ টাপ করে শব্দ করে ফিরছিল জলে। হঠাৎ পায়ের শব্দে দু’জন-দুজনের থেকে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ছিটকে সরে দাঁড়ালো। ঘাড় ফিরে তাকাতেই দেখে কে যেন ঘাটের একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। কথা বলছে না। সামনে এগুবে কি এগুবে না ভেবে চয়ন বলে উঠল-কে? কথা বলল না। কিছুক্ষণ চুপ থেকে আরো একটু সামনে এগিয়ে এল। মৃদস্বরে বলে উঠল  আমি হিমাংশু। 

 

হিমাংশু দা তুমি এখানে এত রাতে...কী করছ এখানে?

 

কাছে এসে চয়নকে চিনতে পেওে “চয়ন দা” বলে হাত জড়িয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। হিমাংশু এই এক স্বভাব। যেদিন বউএর সাথে ঝগড়া করবে সেদিন ঘর থেকে বের হয়ে যাবে। সে রাতে সে আর ফিরবে না। সারারাত মদ খেয়ে কোথায় হয়ত বুঁদ হয়ে পড়ে থাকবে। সকালে যখন ঘুম ভাঙবে তখন ধীরে ধীরে বাড়ি ফিরে যাবে। বউ এর হাতে পায়ে ধরবে। কান্নাকাটি করবে। ক্ষমা চাইবে। যতক্ষণ না ক্ষমা মিলবে ততক্ষণ পিছু পিছু ঘুর ঘুর করবে। আজও নিশ্চয় তাই হয়েছে। নইলে...

 

 

আচ্ছা হিমাংশু দা আজ নিশ্চয় বউদির সাথে আবার ঝগড়া করেছো? কেন এমন করো বল তো?...

 

হিমাংশু মাথা নিচু করে  কাঁদতে থাকে। কোন কথা বলে না। চয়ন আবার বলে উঠে-ঠিক আছে...আর কাঁদতে হবে না। আমি কাল গিয়ে বউদি কে আচ্ছা মতো বকে দেব। এখন বাড়ি যাও। কোথায় ও পালাবে না। ঠিক আছে...।  হিমাংশু মাথা নিচু করে হ্যা উত্তর দেয়। তার পর হাঁটতে থাকে। কিছুদূও গিয়ে আবার ফিরে আসে। যখন আসে তখন তার হাতে একটা বোতল। নিশ্চয় মদ খেয়েছে। চয়নের হাতে তুলে দিয়ে বলে‘

 

-বিকেলে বাসায় গিয়েছিলাম। দেখি আপনি নেই। দিদি মনি বসে কী যেন করছে। ফিরে এসেছি। দিতে পারিনি। খুব ভাল জিনিস...

 

কথা না শেষ করে বোতল রেখে যেমনি এসেছিল তেমনি হুট হাট করে চলে গেলো। ওর চলে যাওয়ার দিকে চেয়ে দুজনে মাঝে দুজনের দিকে মুখ চাওয়া চাওয়ি করল। তারপর আচমকা হি হি করে হাসি। সে হাসি মুহূর্তে জোসনার আলোয় ভাসতে ভাসতে ছড়িয়ে পড়ল হাওয়ায়-কুয়াশায়-পুকুরের জলে। বোতল হাতে চয়ন মাঝখানে একটু অন্য মনস্ক হয়ে বলেছিল

 

আচ্ছা জোসনার আলোয় মানুষের মন খুব বিষণ্ণ হয়-না?

 

            হয় তো...।

 

ততক্ষণে চয়নের হাত থেকে হাতবদল হয়ে মহুয়ার গন্ধে ভরপুর বোতল রাই এর হাতে এসে ঠাঁই নিয়েছে। সিড়ির ধারে বসে পুকুরের জলে পা ডুবিয়ে দুরে মাঠের ধুসর কুয়াশায় চোখ রেখে বিড়বিড় করে কী সব বলতে শুরু করেছে-

 

একদিন আমি ও এমনি জোসনায় ভিজতে চেয়েছিলাম। ভিজেছিলাম। কারো হাত ধরে চলে যেতে চেয়েছিলাম অনেকদূর...সবুজ পেরিয়ে-ধুসর মাঠের পথ ধরে কোন আদিগন্ত সীমানার খোজে...একদিন...একদিন আমি পরীদেও মতো ডানা মেলে উড়ে যেতে চেয়েছিলাম আকাশে...একদিন আমি পরী হব বলে মা কী যে বকুনি দিয়েছিল আমাকে...পরী হতে চাইলে মায়েদের কী বকুনি দিতে হয়...পরে জেনেছি পরী হওয়া মানে মরে যাওয়া। আচ্ছা চয়ন, আপনি তো খুব মরে যেতে ইচ্ছে করে না? আপনি তো অনেক বার মরে যেতে চেয়েছিলেন? সবকিছু ছেড়ে ছুড়ে বেছে নিতে চেয়েছিলেন আতœহননের পথ...কী যেন চেয়েছিলেন রূপকথা’র কাছে। আপনার সেই চাওয়া কোনদিন পাওয়া হয়ে উঠেনি। রূপকথা চলে গিয়েছিল অনেক দূর ...শাসনের বৃত্ত ভাঙতে পারবে না বলে সে চলে গিয়েছিল সীমানার ওপারে। কী চেয়েছিলেন তার কাছে?... আপনার ডাইরীতে আপনি এইসব লিখে গেছেন অবলীলায়। জানেন আপনার ডাইরীটা যখন পড়ি তখন কী এক দুঃখ যেন আমাকে বার বার কুরেকুরে খাচ্ছিল। আমি নিজেকে সামলে নিতে পারিনি। কেন এমন হয় চয়ন?

 

মাঝে মাঝে এমনি সব অদ্ভুত স্বপ্ন দেখতাম আমি। কখনো দেখতাম খোলা মাঠে ভরা পূর্নিমায় ঘোড়া চেপে আমি ছুটে চলেছি। কোথায়-কোন গন্তব্যে তার কোন সীমানা ছিল না। ছুটছি তো ছুটছি। আবার কখনো খোলা মাঠে একটা ঘোড়া আমাকে তাড়িয়ে ফিরছে...আমি দোড়চ্ছি...কিন্তু কিছুতে তার সাথে পেরে উঠছি না। আচ্ছা মানুষ মরে গেলে কোথায় যায়? মরার পর সে কী আবার ফিওে আসে...

 

রূপকথার কাছে তুই কী চেয়েছিলি চয়ন? কী এমন যা তোকে দেয়নি?...সেই থেকে বড্ড বে খেয়ালি তুই...কী চেয়েছিলি বল? রূপকথা যা তোকে দেয়নি আমি তাই দেব। তবু বল...তবু তুই আর আতœহনন এর কথা ভাববি না, কথা দে...

 

 

অন্যমনস্ক, বেখেয়ালি রাই আচমকা ছুটে এসেছিল চয়নএর সামনে । দু-হাত খামছে ধরে টেনে নিয়েছিল বুকের কাছে। চয়নের ঘন চুলে বিলি কাটতে কাটতে বলেছিল-

 

এমনি গন্ধ খুজতে চাইছিলি তুই রূপকথার কাছে। একটু আশ্রয়, একটু শান্তি, একটু অভিমান, একুট দুঃখ আড়াল করতে চেয়েছিলি?...কীএমন দুঃখ ছিল তোর? সব কিছু থাকার পরও তুই কেন মরে যেতে চেয়েছিলি - মরে যেতে চাস বল...আমি তোকে সব দেব...কী চাই বল?  আমি দেব...

 

রাইয়ের এর কথা মুখে থাকতেই ঝটকা টানে সরে গিয়েছিল চয়ন। হাঁপাতে হাঁপাতে বলেছিল-

 

ছি! রাই দি। ছি! আপনাকে আমি অন্যরকম ভেবছিলাম। ভেবেছিলাম আপনি অন্তত আমাকে বুঝবেন। আপনিও...মানুষের শরীরটাই কী সব। এর বাইরে কিছুই নয়...সর্ম্পক কী শুধু শরীর দিয়ে হয় – হয় না। আপনি তো আমার থেকে বড়। কীভাবে ভাবলেন এমনটি। আমার ভাবনা, আমার চেনা জগৎ সেখানে তো আমি কাউকে আসতে দিতে চাইনে। তাহলে আপনি কেন আগ বাড়িয়ে...আমাকে আমার মতো করে ভাবতে দিন...সে জায়গাটুকু না হয় নাই নিলেন আপনারা...এতে তো খুব বেশি ক্ষতি হবে না আপনাদের...অনেক রাত হয়েছে...এবার চলুন...আমায় ভুল বুঝবেন না...

 

অপমানে লজ্জায় রাইয়ের মুখ লাল হয়ে গিয়েছিল। জোসনার ঝাপসা আলোয় সে মুখ যেন আরো বেশি লাল হয়ে উঠেছিল। শূন্যে...পুকুরের দিকে নির্বাক চেয়ে সে কোন কথা বলল না।...চয়ন এর ফিরে আসা পথ অনুসরণ করে ফিরে এসেছিল।...

 

বিকেলের জানালায় বসে এসবই ভাবছিল চয়ন। হঠাৎ ডাকপিয়নের ডাকে ফিরে তাকাল।

 

তোমার চিঠি দাদা বাবু।

 

কি ব্যাপার মধু দা তুমি তো সন্ধ্যাবেলায় কখনো চিঠি বিলি করো না। আজ...

 

দিনের ডাকে ফাকি দিয়েছি। তাই বিকেলে। এই নাও...তোমার কোন চিঠি আজকাল আসে না।...

 

চয়ন মৃদু হেসেছিল। কোন উত্তর দেয়নি। মধু দা চলে গিয়েছিল অবলীলায়। চিঠি খুলে রাইয়ের নাম দেখে একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেল। এতবছর পর...এখনো মনে আছে চয়ন  চৌধুরী কে। সমস্ত চিঠি জুড়ে রাই তার নিজের কথা কিছুই লেখেনি। চয়নকে ঘুরে ফিরে সব লেখা। শুধু শেষে একটি কথাই লেখা “আমি এখনো তোমাকে ভালবাসি - শুধু শরীরের জন্য নয়, মন থেকে - মনের জন্যে - ভাল থেকো” তোমার রাই

 

শূন্য জানালায় আদিগন্ত...শীতের সন্ধ্যায় বড় বেশি আনমনা করে দিয়ে গেল চয়ন কে।