Banner
কয়েকটি কবিতা ─ শামসুজ্জোহা মানিক (কবিতা)

লিখেছেনঃ শামসুজ্জোহা মানিক, আপডেটঃ May 22, 2011, 11:53 AM, Hits: 27173



জীবন সংগ্রাম

যদিও ভেবেছিলাম এক মৃত্যু পার হয়ে
নিব খুঁজে আর এক জীবন
পাশব অরণ্যের রাত ভুলে যাব
সবুজ আলোর হাসিমাখা এক শান্ত
গ্রামের মাঠে এসে।
তবু জীবন ঝড়ের আকাশে দিশাহারা বলাকার মতো
যেন ডানা ভেঙে পড়ে যায় বারবার মাটিতে।
হৃদয় মৃত্যুর সীমানা যতোবার পার হয়
দেখে নতুন নতুন মৃত্যুর অধিকার।

তবু তো জীবন বার বার মাথা তোলে,
খোসা ভেঙে পাখীর ছানার মতো
ভূমিষ্ঠ হ’তে চায় পৃথিবীতে।
হৃদয় বার বার সোনালী ভোরের আলো মেখে দুই চোখে
বুনো হাঁসের পাখায় উড়ে যেতে চায় সুদূরে।
কেননা সুদূর চিরদিন অজানা সুখের কথা বলে।

ব্যর্থতা এসেছে এতোবার
তবু দুর্জয় সাহসের অংকুর মাথা তোলে
এতো যন্ত্রণা রয়েছে হৃদয়ে
তবু নীল, সোনালী আকাশ নেমে আসে হৃদয়ে
নিয়ে আসে ছায়াপথ, নিহারীকা, নক্ষত্রের ডাক।
কোথা থেকে আহা বার বার বাঁচবার সাধ এতো জাগে!

অক্টোবর, ১৯৭৩





পাখী শুয়ে আছে

দু’টো পা আকাশের দিকে তুলে
পাখী শুয়ে আছে মাটির বিছানাতে,
কেউ নাই তার আশপাশে,
পাখী একা শুয়ে আছে।
সাথীরা ভুলে কি গেছে তাকে,
নাকি ফেলে চলে গেছে?
পাখী একা শুয়ে আছে
দু’পা উপরে তুলে ঘুমের বিছানাতে,
শেষ ঘুম ঘুমায় পাখীটি এখন
যেই ঘুম আর ভাঙ্গবে না;
আকাশে আর তাই উড়বে না পাখী,
সুর করে আর তাই ডাকবে না,
চোখ মেলে আর তাই দেখবে না,
ওসব প্রয়োজন ফুরিয়ে গিয়েছে তার,
শুধু আছে অন্ধকার অনন্ত
কালের।
দুই পা উপরে তুলে তাই
চড়াই পাখীটি কেমন শুয়েছে এখন
শেষ ঘুম ঘুমাবে বলে মরণের বিছানায়।

১৭ ফেব্রুয়ারী ২০০৫, ৫ ফাল্গুন ১৪১১
বৃহস্পতিবার, ঢাকা

(ভোর রাতে স্বপ্নে চড়াই পাখীর লাশ মাটিতে ঐভাবে শোয়া দেখে কবিতাটা লেখা ঐ দিন দুপুরে। তবে প্রথম দুই লাইন ঘুম ভেঙ্গে উঠেই লেখা।)





তপতীর জন্য অনুভব

তপতী! আমরা অনেক দূরের মানুষ দু’জনে
সুতরাং ভালবাসা কীভাবে জন্মাবে বলো?
কাদাচিৎ শুধু দূর থেকে দেখা
কথা বহু কাল পরে, তাও সামান্য সময়,
তবু যে মনের ভিতরে
কিছু কিছু অনুভব এমনই কাজ করে
যাদের পারি না বোঝাতে স্বাভাবিক নিয়ম।
হয়ত যে বেদনা তোমাদের তরে আছে
তা হতে জাগে যে অনুভব মনের ভিতর
হয়ত বা তাও এক প্রেম, যদিও অন্য রকম।
তুমি তো নারী, যৌবনে ছিলে রূপসী
তারও তো আকর্ষণ মনের ভিতরে
গোপনে কাজ করে।
সুতরাং কখনো মন যদি চেয়ে থাকে তোমাকে
সে কি তবে অস্বাভাবিক অথবা
অন্যায় আবদার হৃদয়ের?
জানি হৃদয়ের এই সব ভাবনা
অলস কল্পনা মাত্র নির্জন প্রাণের।
তবু তপতী তুমি আমারও অগোচরে
হঠাৎ কখনো স্মৃতিপটে এলে
মন হয় এলোমেলো,  ব্যথায় করুণ।
তপতী! বলো তো কেন জীবনের গতিধারা
এই রূপ না হয়ে হল না ভিন্ন রকম?

২৯  জুলাই ২০০৪
১৪ শ্রাবণ ১৪১১
বৃহস্পতিবার, ঢাকা





কোনো এক রাতের সঙ্গে সংলাপ

ওই যুবতী
নগ্ন শরীর ঢেকে রাখো অন্ধকার
অনেক অপমান সয়েছে যে তাকে দিও না আর দৃষ্টির অপমান।
হে রাত। তোমার আকাশে নক্ষত্রেরা জ্বলে
ওদের নির্লজ্জ লাল চোখ ঢেকে ফেলো কুয়াশায়
যেন এই মাঠের শিশিরে শায়িত যুবতী পড়ে না ওদের চোখে।
হে রাত। যে বাতাস বয়ে যায় তাকে বলে দাও
যেন ধীরে ধীরে
ছুঁয়ে যায় পৃথিবীর মতো ঐ শায়িতাকে
সা
ন্ত্বনার নরম হাত বুলায় ওর এলোচুলে, দেহে।
অথবা মাটিকে বলে দাও যেন তাকে
ধরে রাখে নরম আলতো করে
যেন আঘাতের বেদনা আর কাঁদায় না তাকে।
(আহা কাঁদাবে কি? অনুভব এখনও তার আছে?)
অথবা ওর যন্ত্রণার ধ্বনি এ হৃদয়ে আসে না যেন
তাই ঝিঁঝিঁদের বলে দাও আরো জোরে গাইতে সংগীত।
আহ্‌ ওই জোনাকিরা কেন ভীড় করে ওই দেহের কাছে?
আলোর মশাল জ্বেলে কি খোঁজে ওখানে? হৃদয়? অশ্র? বেদনা?
ওই যুবকেরা খোঁজে নি হৃদয়
ওরা শুধু চেয়েছিল অহৃদয় দেহ শুধুই দেহ
আর চেয়েছিল আকণ্ঠ তৃষ্ণা মেটাতে শুধু অশ্রু জল।
আর কিছু নয়; নয় হৃদয়: নয় যা কিছু হৃদয়ের।
আর জোনাকঁরা খুজবে হৃদয়! অথবা এসেছে শুধু লজ্জা বাড়াতে?
ওদের বলে দাও চলে যেতে। ওই দেহের কাছ হতে ওরা চলে যাক দূরে।
ওই যুবতীর বিবশ শরীর শিশিরে ভেজা মাঠে পড় থাক সারা রাত
সারা রাত বিষণ্ন বাতাস তার এলোচুল চুম্বন করে যাক
শান্ত
মাঠ সারা রাত তাকে আপন হৃদয়ে রেখে শোনাক ঝিল্লির গান।

হে রাত। তুমি ওকে ঢেকে রাখো, ওকে আড়াল করো
যেন আর কোনো লালসার হিংস্র থাবা ও দেহে পড়ে না কখনো
কাঁদায় না আর হৃদয়কে।

১৯৭৩





কালা
ন্ত


আমার শেষ হয়েছে বনবাস
স্বগৃহ জনপদে আমি ফিরেছি আবার
কেড়ে নিতে যাবতীয় অধিকার
বুঝে নিতে সিংহাসন, রাজ্যপাট যা যা আছে আমার
এবং যা যা হবে আমার সেই সব সব সব কিছু।
আমার হাতে এখন খাপ খোলা তলোয়ার
অথচ আমার দু’চোখে এখন করুণার আলো
হৃদয়ে বেদনার কী ব্যথিত সঙ্গীত!
যেন বিজয়ী হয়ে ক্ষমা ক’রে দিতে ইচ্ছা করে
সব পরাজিত, নতজানু, শঙ্কাতুর শত্রুকে।


অবশেষে ফিরে এসেছি বাণিজ্য শেষ ক'রে
সাত সমুদ্র, সহস্র দ্বীপ ঘুরে ঘুরে
বিপুল বৈভব - স্বর্ণ, মণিতে জাহাজ ভরে এসেছি ঘরে।
অথচ আমার বক্ষে এখন সহস্র স্মৃতির ধূপ জ্বলে;
উদাসী সময় আমার কপালে এঁকেছে কী নির্মম আবেগে
তিক্ত রেখাগুলো; কী বিপুল রিক্ততা দীর্ঘ প্রবাসের!
স্বপ্নের বন্দর কোনোদিন পাব না জেনে
খেদ আর নেই মনে; তবু ব্যথা কেন থাকে!


এখন আমার সামনে সাজানো থরে থরে প্রাচীন জিজ্ঞাসার উত্তর
যেন বহু যুদ্ধ শেষ ক’রে সে সব এনেছি জয় ক’রে।
এখন আমি বিজয়ী, গর্বিত, উদ্ধত,
বিজিত নগরে প্রবেশ করছি ধীরে ধীরে
অথচ আমার তলোয়ার এখন রেখেছি খাপে ভরে,
সম
স্ত বিজয় উল্লাস হ’তে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে
আমি এখন কাঁদছি ধীরে ধীরে গোপনে।
কেননা আমার দু’ হাত জড়িয়ে ধরে
তার মুখের উপর রেখেছিল কিছুক্ষণ গভীর আবেগে
এক নারী, এক অপরূপ নারী, সোনালী ভোরের মতো এক নারী।


অবশেষে জীবনের দীর্ঘ পথ ঘুরে ঘুরে
আর এক কালে এসে আমি নিজেকে পেলাম খুঁজে।

১৫ ডিসেম্বর, ১৯৭৯।





সংশয়

তুমি কোন্‌ পথরেখা ধরে
এসেছিলে কাছে,
যেন কক্ষচ্যুত নক্ষত্র এক
একা জ্বলে কতকাল ধরে
হয়েছ দারুণ
আগুন
তার দহনের তীব্র শিখায়
আলোকিত আমার ভুবন।
কিংবা দারুণ বর্ষা হয়ে
অঝোর অঝোর ধারায়
নিভালে আমারই বুকের আগুন।
আবার চলে কি যাবে তবে
দূর ছায়াপথ ধরে
আর কোন সীমানায়
নতুন কক্ষপথ গড়ে নিতে চেয়ে?
অথবা অন্যটাও তো হতে পারে -
আমাকেই টেনে নিবে
অতিকায় কৃষ্ণ গহ্বর এক
তার বুকের ভিতরে।
তোমার ক’ফোটা চোখের জল
তখন ঝরে ঝরে পড়বে
আমি কোনদিন জানব না।
বর্ষার ভেজা রাতে
কেঁদে আকুল হলেও
আমি তোমাকে দেখব না।