Banner
মোরগ – শামসুন নাহার (ছোটগল্প)

লিখেছেনঃ শামসুন নাহার, আপডেটঃ April 7, 2009, 7:43 AM, Hits: 510

রমজান মাসের ঈদের প্রায় একমাস আগে একটি বড়সড় মোরগ আনা হোল। এরকম বড় মোরগ সাধারণত দেখা যায় না। উঠানে এক পাশে ছাগল বাঁধা খঁুটিতে শক্ত দড়ি দিয়ে বাঁধা হোল তাকে। তার লম্প-ঝম্প দেখে কে! বাঁধন মেনে নিতে চায় না।
 
প্রথম দিন কিছুই খেল না। তার ধড়ফড়ানি আর ঝট্‌পটানী দেখে বাড়ীর কোন মোরগ- মুরগীই তার গা ঘেঁষল না।
 
সাধারণত  বাড়ীতে কোন নতুন মোরগ-মুরগী এলেই মুরগী মহলে একটা বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়। নিজের নিজের আধিপত্য দেখানোর জন্য বাঁধা প্রাণীটির উপর হামলা করে। ঘায়েল করারও চেষ্টা চলে।
 
ঘাড়ের পশম ফুলিয়ে তাকে আক্রমণ করার চেষ্টা যে কেউ করে নাই তাও না। কিন্তু তার বিশাল বপু, আর গম্ভীর গলার কোঁকর--- কোঁও শব্দ শুনে কেউ আর তেমন উৎসাহ দেখাল না। রণে ভঙ্গ দিয়ে যে যার পথে পা বাড়াল।
 
মাত্র ৩/৪ দিন। এরপর তাকে ছেড়ে দেয়া হোল। ছাড়া পেয়েই সে বিপুল বিক্রমে একটি কোঁকর কোঁও . . . .  ডাক ছাড়ল। তারপর একদিকের পাখা প্রায় মাটির সমতলে নামিয়ে  প্রায়  নাচতে নাচতে এক রাউন্ড ছুট দিয়ে দেখাল যে সে কে! তার চক্রাকার বেষ্টনীতে যেন আর কেউ দাঁড়ায় না। ব্যাস, সে এখন বাড়ীর এবং আশে পাশের মুরগী মহলের কর্তা সেজে বসল।
 
এরপর থেকে  সে কোন পোকা-মাকড় বা শস্য দানা পেলেও তার অনুগতদের ডাকে। আর তাদের খাওয়া দেখেই তৃপ্তি পায়।
 
এক দিন কর্ত্রীমা মোরগের চেহারা দেখে বললেন মনে হচ্ছে মোরগটা শুকিয়ে গেছে, খেতে দেওয়া হয় না নাকি?
 
দায়িত্ব পাওয়া মেয়েটা একগাল হেসে জবাব দিল খুব খেতে দেওয়া হয় মা। কিন্তু না খেলে কে কি করবে?
 
কি রকম?
 
রকম আবার কি! খাবারের দিকে তাকিয়ে বাড়ীর মুরগীদের ডাকা শুরু করে দেয়। সবাই যখন যায় তখন সে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। নিজে খায় না।
 
সব মুরগী-মোরগ ছুটে এলে সে কোঁক, কোঁক করে খেতে বলে। মনের মত মুরগীদের খাওয়ায়, বাকীগুলোকে  খেদিয়ে দেয়।
 
মুরগী জাতের আবার মনের মত কোনটা?
 
না মা,  মনের মত মানে যে সব মোরগ তার সাথে লড়তে পারবে ওদেরকে রাখে না। খেËিদয়ে দেয়।
 
 
কর্ত্রীমা হাসলেন। বললেন তবুও সুযোগ-সুবিধা বুঝে বারবার খেতে দিও। নয়ত শুকিয়ে যাবে।
 
এহেন মোরগ সম্রাট সকল মুরগীর উপর আধিপত্য বিস্তার করে তার দিন কাটাতে লাগল।
 
দেখতে দেখতে ঈদ এসে যাচ্ছে । মোরগটার সাম্রাজ্য আর আয়ু দুইই ফুয়িয়ে আসছে।
 
এসবের খবর সে রাখে না।
 
সব মুরগী আর ছানা-পোনাদের পেট পুরে খাইয়ে অল্প কিছু খাদ্য গলধঃকরণ করে। এতেই তার গর্ব। সে যে সবার কর্তা! সবার দিকে লক্ষ্য রাখা তার দায়িত্ব আর কর্তব্য।
 
ছোট ছেলেপুলে তার দু’চক্ষের বিষ।  বিশেষ করে লাল ফ্রক পরা বাড়ীর ছোট্ট মেয়ে পলি। তার ইচ্ছা ছিল মোরগটার সঙ্গে ভাব করার। কিন্তু  এক দিন  মোরগটার ঠোকর খেয়ে তার সে ইচ্ছা উবে গেছে। মোরগটাকে দেখলেই সে কান্না জুড়ে দেয়।
 
ইতিমধ্যে ঈদ এসে গেল। খুব ভোরে শোনা গেল দরাজ সুরেলা গলার ডাক কোঁক্‌রোক---- কোঁ ---।
 
সকালে উঠে বাড়ীর ছোট-বড় সবার গোসল করার ধুম। বালতি কই? গরম পানি কই? ইত্যাদি।
 
কার জন্য কোন  পোষাক নির্দিষ্ট। ছোটদের পোষাক বাছাই করার চেঁচামেচি। এ সবে সময় কিছু কাটল। আজ অন্য রকম ব্যবস্থা, অন্য রকম   আয়োজন। আজ ঈদ তারপর ছেলেরা ঈদগাহের দিকে চলে গেল।
 
যখন দুপর, সবার ডাক পড়ল খাবার ঘরে। ঘর এবং খাবার টেবিল সাজানো হয়েছে।
 
চমৎকার টেবিল ক্লথ দিয়ে ঢাকা টেবিলে অনেক রকম খাবার। টেবিল জুড়ে এটা  সেটা। মাঝখানে বিরাট কারি ডিসে শোভা পাচ্ছে মোরগ সম্রাট। ঘি এবং দধি সহকারে তাকে উপযুক্ত ভাবে উপযুক্ত পাত্রেই রাখার হয়েছে।
 
অনলাইনঃ ৭ এপ্রিল, ২০০৯