Banner
নীল শ্রমিকদের বংশধরেরা আজও অবহেলিত - সোহাগ কুমার বিশ্বাস (সচিত্র প্রতিবেদন)

লিখেছেনঃ সোহাগ কুমার বিশ্বাস , আপডেটঃ February 11, 2010, 12:00 AM, Hits: 985


  ঝিনাইদহের বিভিন্ন এলাকায় কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে অভিশপ্ত নীলকুঠি

 
ঝিনাইদহ থেকে : শত শত বছরের শোষক গোষ্ঠী ইংরেজদের পতন ঘটেছে অনেক আগেই। তবে তাদের শোষণের নানা স্মৃতিচিহ্নের অস্তিত্ব আজও বহন করে চলেছে এদেশের বিভিন্ন এলাকা। এসব এলাকার মধ্যে ঝিনাইদহ অঞ্চল অন্যতম। ইংরেজ শাসনামলে ঝিনাইদহ এলাকার মাটি নীল চাষের উপযোগী হওয়ায় কৃষকদের উপর জোর জুলুম করে করানো হত নীল চাষ। এক পর্যায়ে কৃষকেরা নীল চাষের প্রতি অনাগ্রহ প্রকাশ ও দফায় দফায় বিদ্রোহ করলে ভারতের বিভিন্ন এলাকা থেকে নীল শ্রমিক হিসাবে নিয়ে আসা হয় বুনো, বাগদি সম্প্রদায়ের লোকদের। নীল চাষের সুবিধার্থে জেলার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে তোলা হয় নীল কুঠি। ইংরেজ নীলকর সাহেবদের পতন ঘটলেও আজো কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে নীলকুঠিগুলো। তবে অবহেলা অযত্নে কুঠিগুলো আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। অনেক কুঠি ইতোমধ্যে তাদের অস্তিত্ব হারিয়েছে। আর এদেশে বসবাসরত নীল চাষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নীল শ্রমিকেরা অবহেলিতই রয়ে গেছে।
 

ইতিহাস ও অনুসন্ধানে যতটুকু জানা যায় : ঝিনাইদহ অঞ্চল দেশের উঁচু এলাকাগুলোর মধ্যে অন্যতম। এছাড়া তৎকালীন সময়ে ঝিনাইদহের মাটি নীল চাষের জন্য সব থেকে বেশী উপযেগী ছিল। যার ফলে নীলকর সাহেবরা ঝিনাইদহ অঞ্চলে ঘাঁটি গেড়ে বসে এবং এ এলাকার কৃষকদের নীল চাষে বাধ্য করতে থাকে। চাষের সুবিধার্থে বরা, এনায়েতপুর, নগরবাথান, মধুপুর, ঝিনাইদহ, হাজরাতলা, কলোমনখালী, কালীগঞ্জ, শিকারপুর, শৈলকূপার বিজুলিয়া, গাংগুটিয়া, বেণীপুর, বকশীপুর, ভাটই হরিণাকুন্ডুর জোরাদহ, ধুলিয়া, ধইনা, সোনাতনপুর, মহেশপুর, নদী তীরবর্তী এলাকা ও কোটচাঁদপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে তোলা হয় নীলকুঠি। কৌশলগত কারণে নীলকর সাহেবরা এ অঞ্চলে নীল চাষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকগুলো যৌথ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছিল। তৎকালীন সময়ে এসব প্রতিষ্ঠানকে বলা হত কনসার্ন। একেকটি কনসার্নের অধীনে ৮ থেকে ২০টি নীলকুঠির কার্যক্রম পরিচালনা করা হত। প্রতিটি কুঠি ১ হাজার থেকে ৩ হাজার বিঘা পর্যন্ত জমি শাসন করত। ঝিনাইদহের হাজরাপুর বা পোড়াহাটি কনসার্নের অধীনস্থ ১৪টি নীল কুঠির অধিকারভুক্ত জমির পরিমাণ ছিল ১৬ হাজার বিঘা। আর হরিণাকুন্ডুর জোড়াদহ কনসার্নের অধীনস্খ ৮টি কুঠির অধিকারভুক্ত জমির পরিমাণ ছিল ৯ হাজার ৪শ বিঘা। জোড়াদহ কুঠির ম্যানেজার ছিল ম্যাকলোয়ার নামের এক ইংরেজ। নীল চাষে ইংরেজ নীলকর সাহেবদের মধ্যে যাদের নাম জানা যায় তাদের মধ্যে মধুপুরের নীল কুঠির কুঠিয়াল টিসিটুইডি, কোটচাঁদপুরের নীল কুঠিয়াল সিনোলাব ম্যাকলিউড, শৈলকূপার ডাম্বল, ব্রীজবেন, নিউ হাউজ সাহেবদের নাম উল্লেখযোগ্য। তবে তৎকালীন সময়ে ইংরেজরা এ অঞ্চলের রাস্তা-ঘাটের ব্যাপক উন্নয়ন ঘটায়। চুয়াডাঙ্গা থেকে ঝিনাইদহ প্রধান সড়কসহ নীল কুঠি এলাকাগুলোর রাস্তাঘাট পাকাকরণ করা হয়। কথিত আছে নীলকর বড় সাহেবরা ভারত থেকে চুয়াডাঙ্গায় ট্রেনে এবং চুয়াডাঙ্গা থেকে সড়ক পথে ঝিনাইদহে আসত। সেখান থেকে বিভিন্ন কুঠি এলাকা পরিদর্শনে যেত। মাঠ পরিদর্শনের সময় ইংরেজ সাহেবরা গরুর গাড়ি ব্যাবহার করত। নীল চাষের তদারকির সুবিধার্থেই সড়কপথগুলো পাকাকরণ করা হয়েছিল।
 

 

কৃষক বিদ্রোহ শুরু : কষ্টদায়ক ও নির্যাতনমূলক নীল চাষ করতে কৃষকেরা একপর্যায়ে অনাগ্রহ প্রকাশ শুরু করে। ১৮৬০ সালের দিকে এ অঞ্চলে নীল চাষের বিরুদ্ধে নির্যাতিত কৃষকেরা ১ম বিদ্রোহ শুরু করে। নৌকা ভ্রমণের সময় ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার কালী ও কুমার নদের মোহনায় হাজার হাজার কৃষক জনতা ঘেরাও করে ইংরেজ ছোট লাট গ্রান্ট সাহেবকে। উত্তেজিত কৃষকদের রোষানল থেকে বাঁচতে লাট গ্রান্ট নীল চাষ বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য হয়। কৃষকদের সংগঠিত ও অব্যাহত আন্দোলনের ফলে সরকার ওই সময় নীল কমিশন গঠন করতে বাধ্য হয়। কিন্তু কয়েক বছর যেতে না যেতেই নীলকর সাহেবরা নির্যাতন মূলক চাষ আবারো শুরু করে। এপর ১৮৮৯ সালে ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলায় আবারো নীল চাষের বিরুদ্ধে কৃষক বিদ্রোহ শুরু হয়। বিজুলিয়া নীল কুঠির অধীনস্খ ৪২টি গ্রামের কয়েক হাজার কৃষক একত্রিত হয়ে নীল চাষ বন্ধ করে দেয় এবং বিজুলিয়া নীল কুঠিতে হামলা চালিয়ে কুঠি ভাংচুর করে। এসময় বিজুলিয়া কুঠির অধ্যক্ষ্য ডাম্বল সাহেব কৃষকদের রোষানলে পড়ে মারাত্মক আহত হয়।
 
আদিবাসী শ্রমিক আমদানী : ন্যয্য মূল্য না দেওয়া ও বাধ্যতামূলক নীল চাষ করানোর প্রতিবাদে এ অঞ্চলের কৃষকেরা বিভিন্ন সময় নীল চাষের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও অনাগ্রহ প্রদর্শন করতে থাকে। উপায়ন্তর না পেয়ে নীলকরেরা ভারতের বিহার প্রদেশের বুনো ও বাগদি সম্প্রদায়ের আদিবাসীসহ ছোট নাগপুর ও বিভিন্ন স্খানের সাঁওতাল সম্প্রদায় ভুক্ত আদিবাসীদের আমদানী করে শ্রমিক হিসাবে এদেশে নিয়ে আসে। বিভিন্ন নীল কুঠি সংলগ্ন এলাকায় এদের বসবাস করতে অনুমতি দেয় ইংরেজরা। ঝিনাইদহ এলাকায় যেখানে যেখানে নীল কুঠি ছিল সেখানে সেখানে বুনো বাগদিদের বসতি এখনো লক্ষ্য করা যায়। ঝিনাইদহের নগর বাথান, বিজুলিয়া, চাকলা, ছালাভারা, গাংগুটিয়া, মহেশপুরসহ অন্যান্য কুঠি এলাকাতে এই সম্প্রদায়ের লোকেরা তখন থেকেই বসবাস করে আসছে।
 

 
অবহেলিত নীল শ্রমিকদের বংশধররা : সে সময় ইংরেজদের সঙ্গে নীল চাষ করতে আসা শ্রমিকেরা বংশ পরম্পরায় এদেশেই রয়ে যায়। স্খানীয়ভাবে এরা বুনো নামে পরিচিতি পায়। বুনোরা দীর্ঘদিন ধরে এদেশে বসবাস করলেও তাদের  আচার-আচরণ, হালচাল, সামাজিক কর্মপদ্ধতি, উচ্চরণভঙ্গী ও জীবনযাত্রার বৈশিষ্ট্য প্রমাণ করে এরা স্খানীয় নয়। নীলকরদের পতনের পর দেশ থেকে নীল চাষ উঠে যায়। কিন্তু নীল শ্রমিকেরা থেকে যায় এদেশেই। তারা এখন কেউ মাছ ধরে, কেউ গাছ কাটা-মাটি কাটাসহ বিভিন্ন কৃষি শ্রমিকের কাজ করে কেউবা সাপ নিয়ে ঝাপান খেলা করে জীবিকা নির্বাহ করছে। সাধারণত কঠিন ও পরিশ্রমী কাজ করতে এরা বেশ পারদর্শী। নারী-পুরুষ উভয়েই সমান পরিশ্রমী। বাঙ্গালী হিন্দুদের মত আচার-আচরণ করলেও সামাজিক ও কর্মপদ্ধতির দিক থেকে হিন্দুদের সঙ্গে এদের বেশ পার্থক্য রয়েছে। বুনোরা সহজে রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হয় না এবং হলেও সহজে ডাক্তারের কাছে যায় না। ঝাড়-ফুঁক, গাছের ডাল, বাকল, শিকড় দ্বারা দেশীয় পদ্ধতিতে তৈরী ঔষধ এদের বেশী প্রিয়। সৎ, বিনয়ী ও মিষ্টভাষিতা এদের বিশেষ গুণ। বর্তমান আধুনিক যুগেও এদের জীবনে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি। এখনো জেলার বুনো পল্লীগুলো বেশ অবহেলিতই রয়েছে। মাটির তৈরী যেন তেন প্রকারের খড়, ছন বা নারিকেল পাতার ছাউনির ঘরে এরা বসবাস করে। এই জনগোষ্টীর জীবন যাত্রার নিজস্ব কৃষ্টি-কালচার, সামাজিক রীতি-নীতি নানা অবহেলা আর বঞ্চনার শিকার হয়ে আজ বিলুপ্তির পথে। এরা শুধুমাত্র ইংরেজদের অভিশপ্ত সেই নীল চাষ, আর নীল কুঠির কথা মনে করিয়ে দিতে কালের সাক্ষী হয়ে আজো টিকে আছে।
 
অনলাইন : ১১ ফেব্রুয়ারী, ২০১০