Banner
বাঙ্গালীর জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ষাটের দশকের বিপ্লবী প্রজন্মের ভূমিকা

লিখেছেনঃ শামসুজ্জোহা মানিক, আপডেটঃ March 13, 2009, 12:00 AM, Hits: 1852

(নিবন্ধটি ১৯৯৮সালের ফেব্রুয়ারীতে প্রাচ্যবিদ্যা প্রকাশনী কর্তৃক প্রকাশিত এবং শামসুজ্জোহা মানিক কর্তৃক সম্পাদিত ‘বাঙালী জাতীয়তাবাদের স্বরূপ সন্ধানে’ নামক সংকলন গ্রন্থ থেকে সংকলিত। নিবন্ধটি লিখিত হয় ১৯৯৭-তে। তাৎপর্য বিবেচনা করে এটি এখানে প্রকাশ করা হল। কয়েকটি জায়গায় বানান পরিবর্তন ও সামান্য কয়েকটি সংশোধন ছাড়া আর কোনও ধরনের পরিবর্তন করা হয় নাই। - লেখক, ২৬ ফেব্রুয়ারী, ২০০৯)

 
একটি প্রজন্মের ভূমিকার পুনর্মূল্যায়ন



আজকের বাংলাদেশ-রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে বাঙ্গালীর জাতি চেতনার বিকাশে ১৯৪৮-’৫২-এর ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব অপরিমেয়। ভাষা আন্দোলনকে আমরা এ দেশে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের সূচনা বিন্দু হিসাবে দেখতে পারি। কিন্তু ’৫০-এর দশকে বাঙ্গালীর স্বতন্ত্র জাতি চেতনার উন্মেষ ঘটলেও এটি বাঙ্গালীর স্বতন্ত্র জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেতনায় রূপ নেয় প্রকৃতপক্ষে ’৬০-এর দশকে। এই চেতনার ফলে ঘটে ’৭১-এ বাঙ্গালী জাতির ইতিহাসে প্রথম জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ যার লক্ষ্য ছিল ধর্ম-সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের পরিবর্তে বাঙ্গালী জাতির একটি স্বাধীন লোকবাদী (Secular)  রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।

এ কথা সকলেরই জানা যে, ভাষা আন্দোলনের প্রধান চালিকা শক্তি ছিল ছাত্র সম্প্রদায়। মূলত ছাত্রদের কারণে ভাষা আন্দোলন সমগ্র জনগণ ও জাতির আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু একটি বিরাট ও অতীব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আজো প্রায় অস্বীকৃত এবং অনুদ্‌ঘাটিত রয়েছে, সেটি হল বাঙ্গালীর সেকিউলার বা লোকবাদী এবং গণতান্ত্রিক জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন গড়ে তোলায় ষাটের দশকের ছাত্র সম্প্রদায় বিশেষত বিপ্লবী বা বামপন্থী ছাত্র-যুব শক্তির ভূমিকা। ভাষা আন্দোলনের মতই বাঙ্গালীর স্বাধীন জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেতনা ও আন্দোলন যে, এক সময় ছাত্রদের ভিতর থেকে ক্রম প্রসারিত হয়ে সমগ্র জনগণ ও জাতির আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল সেই সত্যটি আজো প্রায় সম্পূর্ণরূপে অস্বীকৃত হয়ে রয়েছে।

এরও নিশ্চয় কারণ আছে। সেই কারণ আমাদের বুঝতে হবে। আর সেটা বুঝলে আমরা বুঝব বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বাঙ্গালীর জাতি-রাষ্ট্র হিসাবে সঙ্কট ও সীমাবদ্ধতা এবং এ দেশে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের নামে সাধারণভাবে প্রচারিত ধারণারও সঙ্কট ও বিভ্রান্তি কোনখানে সেই বিষয়টি।

আমার আলোচনায় এই বিষয়ের উপর আমি নূতন দিক থেকে আলোকপাত করব এবং তার মধ্য দিয়ে আমি এ দেশে প্রকৃত বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের বিকাশে এবং বাঙ্গালীর জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের বিকাশে ষাটের দশকের বিপ্লবী বা বামপন্থী ছাত্র-তরুণদের কেন্দ্রীয় ভূমিকাটিকে উদ্‌ঘাটিত করব যে ভূমিকাটি পঁচিশ বৎসরের অধিককাল যাবৎ অস্বীকৃত হয়ে আছে।× আসলে সেই দশকে বিপ্লবী তরুণ প্রজন্ম এমন এক চেতনাকে ধারণ করেছিল যাকে সঠিকভাবে এগিয়ে নিবার মত তত্ত্ব, অভিজ্ঞতা ও চরিত্রের অধিকারী নেতৃত্ব সে কালে ছিল না। তাছাড়া এই চেতনার শক্তির সাফল্যের জন্য অনুকূল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও সেকালে ছিল না। এই সকল কারণে ঐ প্রজন্ম এক অর্থে ব্যর্থ হয়েছিল। আর এই ব্যর্থতার কারণে তারা যেমন অস্বীকৃত হয়েছে তেমন অস্বীকৃত হয়েছে তাদের অনন্যসাধারণ ঐতিহাসিক ভূমিকা। তাদের অবদান ও ভূমিকা অন্যরা আত্মসাৎ করতে চেয়েছে। তবুও তারা সম্পূর্ণ ব্যর্থ নয়। ব্যর্থ নয় বলে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ এবং বাঙ্গালীর লোকবাদী জাতি-রাষ্ট্র চেতনার অভিঘাতেই জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে এবং পাকিস্তান ভেঙ্গেছে এবং তৎকালীন পূর্ব বাংলার বুকে বাংলাদেশ নামে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাঙ্গালীর জাতি-রাষ্ট্রের পরিচয় নিয়ে।

× বারো বৎসর পর লেখাটি পুনঃপ্রকাশ করতে গিয়ে দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে যে এই অবস্থার পরিবর্তন আজ অবধি হয় নাই। - লেখক, ২৪ ফেব্রুয়ারী, ২০০৯

আমার এই বক্তব্যের তাৎপর্য এই আলোচনায় সপষ্ট করতে চেষ্টা করব। এবং এই আলোচনায় প্রসঙ্গক্রমে ঐ দশকে আমার ভূমিকাও কিছুটা উঠে আসবে। তবে মূল আলোচনায় যাবার পূর্বে ষাটের দশকে জাতীয়তাবাদের বিকাশের পটভূমি সম্পর্কে  একটা ধারণা পাবার জন্য খুব সংক্ষেপে পঞ্চাশের দশকের রাজনৈতিক গতিধারার একটা চিত্র দিতে চেষ্টা করব।



 
পঞ্চাশের দশক



১৯৪৭-এ ধর্মের ভিত্তিতে বাংলা ও ভারত বিভক্ত হয়ে দু’টো ভিন্ন রাষ্ট্র পাকিস্তান ও ভারত প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলার পূর্বাঞ্চল তথা পূর্ব বাংলা পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং পশ্চিমাঞ্চল তথা পশ্চিম বাংলা ভারত রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়। এইভাবে ১৯৪৭ থেকে বাঙ্গালী জাতি ধর্ম সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে বিভক্ত হয়ে দু’টি স্বতন্ত্র ধারায় অগ্রসর হয়। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পাকিস্তানের অবাঙ্গালী শাসক গোষ্ঠী পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠী বাঙ্গালীর ভাষা বাংলাকে অস্বীকার করে উর্দূকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসাবে বাঙ্গালীর উপর জোর করে চাপিয়ে দিতে চাইলে বাঙ্গালীর মনে নিদারুণ প্রতিক্রিয়া ঘটে। পূর্ব বাংলায় বাংলা ভাষার মর্যাদা এবং অধিকার নিয়ে এমন এক চেতনার জাগরণ ঘটতে শুরু করে যা পাকিস্তানের ইসলামী সাম্প্রদায়িক চেতনার বিপরীতে বাঙ্গালী চেতনার উদ্ভব ও বিকাশ ঘটায়। ১৯৪৮-এ শুরু হয়ে ভাষা আন্দোলন ১৯৫২ পর্যন্ত এগিয়ে যায়। ১৯৫২-এর ২১শে ফেব্রুয়ারীতে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় বাঙ্গালী চেতনার এমন এক বিস্ফোরণ ঘটে যা পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক ভাবাদর্শের ভিত্তিকে নড়িয়ে দেয়। ধর্ম-সাম্প্রদায়িক পরিচয় বোধের কাঠামো ভেঙ্গে এক অচেতন জাতিসত্তার জাতি পরিচয় বোধ মাথা তুলে দাঁড়াতে শুরু করে। এই অবস্থায় ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের পূর্বে ১৯৫৩-তে পূর্ব বাংলায় যুক্তফ্রন্ট গঠিত হলে ২১ দফা কর্মসূচী রচিত  হয়। ২১ দফা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসাবে শুধু বাংলাভাষা এবং এবং সেই সঙ্গে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবীকে উপস্থিত করে নাই, উপরন্তু কৃষক-শ্রমিকসহ পূর্ব বাংলার জনগণের একটি অভিন্ন কর্মসূচীও উপস্থিত করে। বস্তুত ২১ দফা ছিল পূর্ব বাংলার সমগ্র বাঙ্গালী জাতি ও জনগণের এমন এক গণতান্ত্রিক কর্মসূচী যার তাৎপর্য ছিল অপরিমেয়। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে উত্থিত চেতনা ২১ দফায় একটা পূর্ণতা নেয়।

’৫৪-এর নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট বিপুল ভোটাধিক্যে জয়লাভ করে এবং যে মুসলিম লীগের নেতৃত্বে ’৪৭-এর পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তার কবর রচিত হয়। এইভাবে ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন এবং ’৫৪-এর নির্বাচনে পূর্বে বাংলায় বাঙ্গালী জাতি চেতনার আত্মপ্রকাশ ঘটে।

কিন্তু এ বিজয় ছিল সাময়িক এবং ভঙ্গুর। কারণ নির্বাচনের পর যুক্তফ্রন্টে অন্তর্দ্বন্দ্ব দেখা দেয় এবং ১৯৫৫-তে যুক্তফ্রন্ট ভেঙ্গে যায়। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার এর সুযোগ নিয়ে ১৯৫৫ সালে পূর্ব বাংলায় ৯২-ক ধারা জারি করে সরাসরি কেন্দ্রের শাসন প্রতিষ্ঠিত করে। ১৯৫৬-তে আওয়ামী লীগের অন্যতম নেতা সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধান মন্ত্রী হবার পর নবতর সঙ্কট দেখা দেয়। যুক্তফ্রন্টের প্রধান রাজনৈতিক দল ছিল আওয়ামী লীগ এবং ২১ দফা কর্মসূচীর প্রতি আওয়ামী লীগ ছিল অঙ্গীকারাবদ্ধ যার ১৯ নং ধারায় স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে বলা হয়েছিল ঃ “লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ব বঙ্গকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রদান ও সার্বভৌমিক করা হইবে একং দেশরক্ষা, পররাষ্ট্র ও মুদ্র ব্যতীত আর সমস্ত বিষয় (অবশিষ্টাত্মক ক্ষমতাসমূহ) পূর্ব বঙ্গ সরকারের হাতে আনয়ন করা হইবে এবং দেশরক্ষা বিভাগের স্থল বাহিনীর হেড কোয়ার্টার পশ্চিম পাকিস্তানে ও নৌবাহিনীর হেড কোয়ার্টার পূর্ব পাকিস্তানে স্থাপন করা হইবে এবং পূর্ব পাকিস্তানে অস্ত্র নির্মাণের কারখানা নির্মাণ করতঃ পূর্ব পাকিস্তানকে আত্মরক্ষায় স্বয়ংসম্পূর্ণ করা হইবে। আনসার বাহিনীকে সশস্ত্র বাহিনীতে পরিণত করা হইবে।” কিন্তু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধান মন্ত্রী হবার পর পূর্ব বাংলাকে স্বায়ত্তশাসন দিতে অস্বীকার করেন। তিনি ঘোষণা করেন যে, তিনি প্রধান মন্ত্রী হবার ফলে পূর্ব বাংলাকে শতকরা ৯৮ ভাগ স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়ে গেছে।

এখানে উল্লেখ্য যে, ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের জাতীয় আইন সভায় পাকিস্তানের সংবিধান গৃহীত হয় এবং এই সংবিধানে পূর্ব বাংলার নাম পরিবর্তন করে পূর্ব পাকিস্তান করা হয় এবং পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবীকে অস্বীকার করা হয়। অন্যদিকে এতে পশ্চিম পাকিস্তানে পাঞ্জাব, সিন্ধু, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ এবং বেলুচিস্তান এই চারটি প্রদেশকে একীভূত করে পশ্চিম পাকিস্তানকে একটি মাত্র প্রদেশে পরিণত করা হয়। এইভাবে পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন জাতিসত্তাকে পাঞ্জাবীদের পদতলে নিক্ষেপ করা হয়। এই সংবিধান প্রণয়নে সোহরাওয়ার্দীর ভূমিকা ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ  পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় প্রবেশের সুযোগ পাওয়া মাত্রই সোহরাওয়ার্দী ২১ দফার অঙ্গীকার ভঙ্গ করেন।

অপর দিকে আওয়ামী লীগ ছিল স্বাধীন ও জোট নিরপেক্ষ বৈদেশিক নীতি অনুসরণের পক্ষে। কিন্তু পাকিস্তানের প্রধান মন্ত্রী হয়ে সোহরাওয়ার্দী আওয়ামী লীগের কর্মনীতি বিসর্জন দিয়ে পাকিস্তাকে আমেরিকার সামিরক জোটভুক্ত রাখার ক্ষেত্রে ভূমিকা নেন। এই সকল কর্মকাণ্ডে শেখ মুজিবুর রহমান সোহরাওয়ার্দীকে সমর্থন দেন।

কিন্তু আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা-সভাপতি মওলানা ভাসানী সোহরাওয়ার্দীর এসব কর্মকাণ্ডের তীব্র বিরোধিতা করেন এবং আওয়ামী লীগের কর্মনীতি ও আদর্শের পতাকাকে দৃঢ়ভাবে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেন। ফলে তাঁর সঙ্গে সোহরাওয়ার্দী-মুজিবের দ্বন্দ্ব তীব্র হয়ে ওঠে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের এক বৃহৎ অংশ এই সময় ক্ষমতার লোভে পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন এবং স্বাধীন ও জোট নিরপেক্ষ বৈদেশিক নীতির দাবী জলাঞ্জলি দিয়ে সোহরাওয়ার্দী-মুজিবকে সমর্থন দেয়। ফলে ১৯৫৭ সালে মওলানা ভাসানী তাঁর সমর্থকদের নিয়ে আওয়ামী লীগ পরিত্যাগ করে পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠন করেন। পূর্ব বাংলায় প্রধানত বামপন্থী এবং কমিউনিস্টরা ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বা ন্যাপের মূল ভিত্তি তৈরী করল। এইভাবে পূর্ব বাংলার জনগণের রাজনীতির মূলধারা আওয়ামী লীগ ভেঙ্গে গিয়ে আওয়ামী লীগ এবং ন্যাপ এই দুইটি ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ল। দক্ষিণপন্থীরা রয়ে গেল আওয়ামী লীগে। এবং ন্যাপ পরিণত হল বামপন্থী বা আমূল পরিবর্তনবাদীদের রাজনৈতিক সংগঠনে।

সোহরাওয়ার্দী-মুজিব নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নেতাদের ডিগবাজী এবং আওয়ামী লীগের ভাঙ্গন জনমনে তীব্র হতাশা সৃষ্টি করে। ১৯৫৭-তে সোহরাওয়ার্দী নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার পতন ঘটে। এবং পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারে দ্রুত ভাঙ্গন এবং পরিবর্তন ঘটতে থাকে। জনমনে হতাশা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নেয় সেনাবাহিনী। জেনারেল আইয়ূব খানের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী ১৯৫৮-এর অক্টোবরে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে নেয়। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬২ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে সামরিক শাসন চলে। কিন্তু সামরিক শাসন প্রত্যাহারের অল্প কিছু দিন পূর্বে ১৯৬২-র  ৩১ জানুয়ারী থেকে পূর্ব বাংলায় আইয়ুব বিরোধী ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়। ৩০ জানুয়ারী সোহরাওয়ার্দী গ্রেফতার হলে তার প্রতিবাদে যে আন্দোলন শুরু হয় তা এক সময় আইয়ূব সরকার বিরোধী এক বিশাল ছাত্র গণ-আন্দোলনে পরিণত হয়। ’৬২ এর এই ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ক্রমে এমন এক বিপ্লবী প্রজন্মের উত্থান ঘটে যা পরবর্তীকালে আইয়ূব বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে বাঙ্গালী জাতির স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অভিমুখ দান করে। এই বিষয় বোঝার জন্য এখন আমি ষাটের দশকে ছাত্র আন্দোলনে বিপ্লবী ধারার বিকাশ প্রক্রিয়ার একটা সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিব।

 
বিপ্লবী প্রজন্মের উত্থান


’৬২-এর ছাত্র আন্দোলনের সূচনায় যিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি হলেন মোহামমদ ফরহাদ। তিনি ছিলেন গোপন ও নিষিদ্ধ সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী। কিন্তু ’৬২-এর মধ্যবর্তী পর্যায় থেকে যিনি ছাত্র আন্দোলনকে নবতর গতিবেগ দেন এবং তার সামনে চলে আসেন তিনি হলেন কাজী জাফর আহমদ। কাজী জাফরের নেতৃত্বে সাময়িকভাবে স্তিমিত হয়ে পড়া আইয়ূব বিরোধী ছাত্র আন্দোলন সারা দেশব্যাপী এক ব্যাপক ছাত্র গণ-আন্দোলনে পরিণত হয় এবং ’৬২-এর শেষ দিকে এক কনভেনশনের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন পুনর্সংগঠিত হলে তিনি তার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

এখানে উল্লেখ্য যে, সেই সময় পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র লীগ এই দুই ছাত্র সংগঠন ছিল ছাত্র আন্দোলনের প্রধান শক্তি। তবে আন্দোলনে প্রধানতম শক্তি ছিল ন্যাপের সঙ্গে সম্পর্কিত পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন। ছাত্র আন্দোলনের দ্বিতীয় প্রধান শক্তি ছাত্র লীগ ছিল আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্কিত।

’৬২-এর ছাত্র আন্দোলন শুরু হয় সোহরাওয়ার্দীর মুক্তি এবং সামরিক আইন প্রত্যাহারের দাবীতে। কিছুদিন পর সামরিক আইন প্রত্যাহার করা হয় এবং সোহরাওয়ার্দীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা বন্দীদশা থেকে মুক্ত হতে শুরু করেন। এই সময় ছাত্রদের শিক্ষাগত এবং বিভিন্ন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দাবীতে ছাত্র আন্দোলন বিকাশ ও বিস্তার লাভ করতে থাকে। এই আন্দোলনের ধাক্কায় জনগণের বিভিন্ন  পেশাগত এবং রাজনৈতিক দাবী আদায়ের আন্দোলন শুরু হতে থাকে। এভাবে ছাত্র আন্দোলন থেকে গণ-আন্দোলন জেগে উঠে।

এ কথা বলেছি যে, ছাত্র আন্দোলনের প্রধান শক্তি ছিল পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন। কিন্তু ১৯৬৩ থেকে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র  ইউনিয়নের ভিতর বিভিন্ন প্রশ্নে মোহামমদ ফরহাদ এবং কাজী জাফর আহমদের মধ্যে দ্বন্দ্ব তীব্র হতে থাকে। ফরহাদ ছিলেন মূলত কমিউনিস্ট নেতা। এবং তিনি ১৯৬২-এর শেষ দিক থেকে প্রকাশ্য ছাত্র আন্দোলন থেকে সরে গিয়ে আত্মগোপন করে ছাত্র ইউনিয়নকে পরিচালনা করতে থাকেন। অন্যদিকে কাজী জাফর ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের প্রকাশ্য এবং আনুষ্ঠানিক নেতা এবং ছাত্র আন্দোলনেরও সব চেয়ে জনপ্রিয় নেতা। কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক থাকলেও সেখানে তাঁর গুরুত্ব এবং ভূমিকা ছিল গৌণ। এই অবস্থায় ছাত্র আন্দোলন ও সংগঠনের উপর নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন পদ্ধতিগত প্রশ্নে মোহামমদ ফরহাদ এবং কাজী জাফর আহমদের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। ফরহাদ ছাত্র ইউনিয়নের ভিতর গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সংগঠন গড়ে তুলে ছাত্র ইউনিয়নকে পরিচালনা করছিলেন এবং সেই সঙ্গে কাজী জাফরকেও নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছিলেন। কিন্তু প্রকাশ্য সংগঠন ও আন্দোলনের সমস্যা তাঁর পক্ষে সব সময় বোঝা সম্ভব ছিল না। অন্য দিকে প্রকাশ্য গণ-আন্দোলনের নেতার আকাঙ্ক্ষা, প্রয়োজন ও দৃষ্টিভঙ্গীর সঙ্গেও তাঁর এবং যে গোপন কমিউনিস্ট পার্টিকে তিনি প্রতিনিধিত্ব করছিলেন তার সব সময় সঙ্গতি থাকার কারণ ছিল না। এমন অবস্থায় কাজী জাফর এবং ছাত্র আন্দোলনকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে ফরহাদ এবং কমিউনিস্ট পার্টি কাজী জাফর এবং আন্দোলনকারী ছাত্র নেতা-কর্মীদের সঙ্গে এমন এক দ্বন্দ্বে অবতীর্ণ হয় যার ফালফল হল যুগান্তকারী। আপাত দৃষ্টিতে এই দ্বন্দ্ব ছিল দুই ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব। কিন্তু এর গভীরে ছিল দু’টো প্রক্রিয়া বা ধারারও দ্বন্দ্ব। গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে গণ-আন্দোলন ও সংগঠনের দ্বন্দ্ব। গোপন এবং সেই সঙ্গে অতি হিসাবী ও রক্ষণশীল এক ধারার সঙ্গে প্রকাশ্য এবং সেই সঙ্গে প্রবল তেজ ও গতি নিয়ে উদীয়মান এক ধারার দ্বন্দ্ব।

এখানে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা দরকার যে, তখনকার গোপন কমিউনিস্ট নেতৃত্ব জাতীয় আন্দোলনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব এবং তার সঙ্গে ঐক্যের উপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিত। ফলে তারা ছাত্র আন্দোলনের গতিকেও সেইভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইত যা পরিণত হত আওয়ামী লীগ ও ছাত্র লীগের লেজুড়বৃত্তিতে। স্বাভাবিকভাবে ছাত্র আন্দোলনের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও শক্তিশালী নেতা কাজী জাফরের পক্ষে এই লেজুড়বৃত্তি মেনে নেওয়া কঠিন হত। ফলে এটাও হয়ে উঠেছিল দ্বন্দ্বের একটা কারণ।

১৯৬৩ সালে এই দ্বন্দ্ব আমাদের নিকট প্রকাশ পেলে আমি সঠিকভাবে এই দ্বন্দ্বকে মূলত রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব হিসাবে চিহ্নিত করি এবং তাঁকে দ্বন্দ্বটিকে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব হিসাবে না দেখে এটিকে একটি বিপ্লবী রাজনৈতিক লক্ষ্যাভিমুখে পরিচালিত করতে অনুপ্রাণিত করি। আমার নিজের কথাটা বলতে পারি যে, আমি তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টির বিপ্লব বিমুখ চেতনার বিপরীতে একটি জাতীয়তাবাদী এবং বিপ্লবী রাজনীতি গড়ার লক্ষ্যে এই দ্বন্দ্বকে ব্যবহার ও পরিচালনা করতে চেষ্টা করতে থাকি। ১৯৬২ সালে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। এবং তার অনেক পূর্ব থেকেই আমার লক্ষ্য ছিল বাঙ্গালী জাতির একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। কাজী জাফরের সঙ্গে আমার ঐক্যের প্রেরণা এসেছিল এই লক্ষ্যে একটি বিপ্লবী শক্তি গড়ে তোলার প্রয়োজন বোধ থেকে। চীন-সোভিয়েত মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব কিন্তু প্রথমে আমাদের নিকট আসে নাই। ১৯৬৪ এবং ’৬৫-তে এই মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব সপষ্ট ও প্রকাশ্য রূপ নিয়ে আমাদের সমমুখে এলে মস্কোপন্থী পার্টিকে মোকাবিলা করতে গিয়ে কাজী জাফরসহ আমরা চীনের লাইনের পক্ষে দাঁড়াই। এইভাবে পার্টি এবং ফরহাদের সঙ্গে কাজী জাফর এবং ছাত্র গণ-নেতৃত্বের দ্বন্দ্বকে আমরা একটি সপষ্ট রাজনৈতিক-মতাদর্শিক দ্বন্দ্বে পরিণত করতে সক্ষম হই। তবে মতাদর্শিক প্রশ্নগুলি ১৯৬৫-এর এপ্রিলে ছাত্র ইউনিয়ন বিভক্ত হবার পূর্ব পর্যন্ত সচেতন ও অগ্রগামী কর্মীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ এবং অপ্রকাশ্য ছিল।

এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, ১৯৬৩-তে ছাত্র ইউনিয়নের যে সমেমলন হয় তাতে বদরুল হক সভাপতি এবং হায়দার আকবর খানা রনো সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। বদরুল হক ও রনো উভয়ে পার্টির সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলেন। বদরুল হক পাটির অন্ধ অনুগত হলেও ছাত্র আন্দোলনের অধিকতর অগ্রগামী ছাত্র নেতা রনো তা ছিলেন না। বরং গণ-ধারার নেতা হিসাবে তিনি কাজী জাফরকেই অনুসরণ করেন এবং সেই সঙ্গে প্রতিনিধিত্ব করেন ছাত্র আন্দোলনের অগ্রণী ও সাহসী কর্মীদের প্রাগ্রসর চেতনার। এই অভিজ্ঞতার পর কমিউনিস্ট পার্টি ১৯৬৫-তে সম্পূর্ণরূপে অন্ধ সমর্থক ও কর্মীদের নিয়ে ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের এবং কাজী জাফর ও স্বাধীন গণ-ধারার সমর্থকদের নেতৃত্ব থেকে বাদ দিবার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু ১৯৬৫-এর এপ্রিলে অনুষ্ঠিত সমেমলনে স্বাধীন গণ-ধারার সমর্থকরা প্রাধান্য অর্জন করে। তবু আপোসের পন্থা হিসাবে তারা নিজেদের প্রতিনিধি হিসাবে রাশেদ খান মেননকে সভাপতি এবং পার্টির প্রতিনিধি হিসাবে সাইফুদ্দিন আহমদ মানিককে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করে। গোপন কমিউনিস্ট পার্টি তার লক্ষ্য হাসিলে ব্যর্থ হলে তার কর্মীদের সমেমলন কক্ষ পরিত্যাগ করার সিদ্ধান্ত দেয় এবং রাতের বেলা তৎকালীন ইকবাল হল (বর্তমানে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল)-এর ছাদে মতিয়া চৌধুরীকে সভানেত্রী এবং সাইফুদ্দীন আহমদ মানিককে সাধারণ সম্পাদক করে পাল্টা কমিটি গঠন করে এবং এইভাবে ছাত্র ইউনিয়নকে দ্বিধাবিভক্ত করে।

ছাত্র ইউনিয়ন দ্বিধা বিভক্ত হবার পর তৎকালীন অবিভক্ত মস্কোপন্থী কমিউনিস্ট পার্টিকে মোকাবিলা করতে গিয়ে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন ক্রমে চীনের প্রতি ঝুঁকে পড়ে এবং পরবর্তী কালে চীনপন্থী ছাত্র সংগঠন রূপে আত্মপ্রকাশ করে। অন্যদিকে ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া) মস্কোপন্থী রাজনীতির প্রবক্তা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে।

ছাত্র ইউনিয়নের বিভক্তির পর একটা পর্যায়ে কমিউনিস্ট পার্টির মধ্য থেকে সুখেন্দু দস্তিদার, আব্দুল হক, মোহামমদ তোয়াহা প্রমুখ কমিউনিস্ট নেতা গোপনে মেনন নেতৃত্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নকে সমর্থন দিতে শুরু করেন এবং চীনের লাইনের সমর্থনে নিজেদের অবস্থানও ক্রমে জোরদার করতে থাকেন। এই অংশের সঙ্গে মওলানা ভাসানীর ঐক্য হয়। এইভাবে ক্রমে পূর্ব বাংলার জাতীয় রাজনীতিতে চীনপন্থী ধারা শক্তিশালী হয়ে উঠে।

এখানে বলা দরকার যে, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন মস্কোপন্থী পার্টির সঙ্গে ১৯৬৫-তে বিচ্ছেদের পর মতিয়াপন্থী ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে নিজ রাজনৈতিক পার্থক্যকে সপষ্ট করার জন্য সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতাকে সমমুখে নিয়ে আসে। মনে রাখতে হবে ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও কর্মীদের মনে সমাজতন্ত্র ও বিপ্লবের যে ভাবনাই থাকুক ছাত্র গণ-সংগঠন হিসাবে ছাত্র ইউনিয়নে আনুষ্ঠানিকভাবে তখনও সেসব আনা সম্ভব ছিল না। সুতরাং সাম্রজ্যবাদ বিরোধিতাকে রাজনৈতিক পার্থক্যের প্রধান দিক হিসাবে দেখানোটা ছিল একটা কৌশল। কারণ আইয়ূব-বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রশ্নে ছাত্র ইউনিয়নের দুই অংশের মধ্যে মৌলিক কোন মতপার্থক্য তখন পর্যন্ত ছিল না।

কিন্তু ১৯৬৫-এর সেপ্টেম্বরে পাক-ভারত যুদ্ধের কিছু পূর্বে আইয়ূব সরকার চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপন করতে থাকলে, বিশেষ করে যুদ্ধের পর ছাত্র ইউনিয়ন এবং ন্যাপ আইয়ূব সরকার বিরোধী আন্দোলনকে স্তিমিত করে। পিকিংপন্থী ধারা হিসাবে বাম আন্দোলনের নেতৃত্ব এই সময় আইয়ূব সরকারের মধ্যে সাম্রজ্যবাদ বিরোধী প্রগতিশীলতার উপাদানকে প্রবল হিসাবে দেখতে শুরু করে। পাক-ভারত যুদ্ধে চীন কর্তৃক পাকিস্তানের প্রতি সমর্থন দানের ফলে বামপন্থী নেতৃত্ব ভারত বিরোধী অবস্থান নিতে গিয়ে পাকিস্তানের প্রতিও সমর্থন সূচক ভূমিকা নেয়।

১৯৬৬-তে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি দ্বিধাবিভক্ত হয় এবং সুখেন্দ দস্তিদার, আবদুল হক ও মোহামমদ তোয়াহার নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) গঠিত হয়। এই পার্টি ছিল পিকিংপন্থী এবং সেই সঙ্গে প্রকৃতপক্ষে পাকিস্তানপন্থী। বিভক্তির পূর্ব থেকেই সুখেন্দু-হক-তোয়াহা আইয়ূব ও পাকিস্তানের প্রতি দুর্বল কর্মনীতি অনুসরণ করতে থাকেন যার মূল কথা ছিল “ডোন্ট্‌ ডিসটার্ব্‌ আইয়ূব”। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের মেনন নেতৃত্ব এই কর্মনীতি অনুসরণে আইয়ূব বিরোধী আন্দোলন বর্জন করে শুধু সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ফাঁকা স্লোগান দিলেও ছাত্র ইউনিয়নের ব্যাপক কর্মীরা ছিল এর বিরোধী। কারণ পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের বিপ্লবী ধারার বিকাশ হয়েছিল মূলত আইয়ূব বিরোধী জঙ্গী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে।

পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে গণতন্ত্র এবং পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের চেতনা ছিল প্রবল। সেই সঙ্গে সমাজতন্ত্রের চেতনাও ছিল ক্রমবর্ধমান। আমার নিজের ধারণা ছিল স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন এবং সমাজতান্ত্রিক চেতনার বিস্তারের ফলে এক সময় পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা বিস্তার লাভ করবে এবং সেই সঙ্গে সশস্ত্র সংগ্রামের চেতনাও। এই ধরনের চেতনা সেই সময় কর্মীদের একটি শক্তিশালী এবং নির্ধারক অংশের মধ্যে ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করছিল।

কিন্তু  পিকিংপন্থী কমিউনিস্ট নেতৃত্ব এবং ন্যাপে তাদের অনুসারীরা পূর্ব বাংলার জাতীয় প্রশ্ন এবং স্বায়ত্তশাসনের দাবীর গুরুত্বকে এই সময় গৌণ করে দেখে এবং সারা পাকিস্তান ভিত্তিক রাজনীতিকে অগ্রাধিকার দান করে। বিশেষ করে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের চিন্তা থেকে এল মার্কসীয় শ্রেণী সংগ্রামের তত্ত্ব যে তত্ত্ব বাঙ্গালী জাতির স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের গুরুত্বকে খর্ব করল। এইভাবে পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের প্রতি পঞ্চাশের দশকে যে অঙ্গীকার নিয়ে ন্যাপের জন্ম তা থেকেই প্রকারন্তরে তা সরে গেল ষাটের দশকে। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে মেনন, মান্নান ভূঁইয়া প্রমুখও ১৯৬৫, ’৬৬, ’৬৭ পর্বে এই রাজনীতির অনুসারী ছিলেন। এর ফলে ছাত্র  ইউনিয়নের ভিতর নেতৃত্বের বিরুদ্ধে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ জেগে ওঠে।

বামপন্থীরা যখন এই রকম বিভ্রান্তি ও অন্তর্দ্বন্দ্বে লিপ্ত তখন ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবী হিসাবে ৬ দফা কর্মসূচী ঘোষণা করেন। ৬ দফা কর্মসূচী ছিল ঐ পরিস্থিতিতে এক যুগান্তকারী কর্মসূচী। এটা ঠিক যে, ৬ দফা ২১ দফার তুলনায় অনেক পশ্চাৎপদ ও সীমাবদ্ধ কর্মসূচী ছিল। এটা ছিল মূলত পূর্ব বাংলার মধ্যবিত্তের কর্মসূচী। এতে কৃষক, শ্রমিকসহ বৃহত্তর জনগণের আর কোন দাবী আসে নাই। তবু স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে এটি ছিল সুসপষ্ট।

১৯৬৬-তে ন্যাপ থেকেও ১৪ দফা দাবী সম্বলিত একটি কর্মসূচী দেওয়া হয়। ১৪ দফা কর্মসূচীতে পূর্ব পাকিস্তানের দাবী উত্থাপন করা হলেও তা ছিল সমগ্র পাকিস্তান ভিত্তিক একটি কর্মসূচী। সমগ্র পাকিস্তানের বিভিন্ন জাতি ও জনগণের বিভিন্ন দাবীগুলিকে এমন ভাবে সন্নিবেশিত করা হল যাতে করে সেখানে পূর্ব বাংলার বাঙ্গালী জাতির স্বতন্ত্র জাতীয়তার গুরুত্বকে প্রকৃতপক্ষে অস্বীকার করা হয় এবং পূর্ব বাংলার বিকাশমান স্বাতন্ত্র্য বোধকে পাকিস্তান ভিত্তিক রাজনীতির মধ্যে গুলিয়ে ফেলা হয়। ২১দফা এমন কি ৬ দফার তুলনায় ১৪ দফা ছিল একটি পশ্চাৎপদ এবং অনুপযোগী কর্মসূচী। এটার প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব বাংলার স্বাধিকার এবং বাঙ্গালী জাতির জাতীয় চেতনার উজ্জীবন ও বিকাশকে বিপথগামী করা। সুতরাং বাঙ্গালীর জাতীয় চেতনার বিকাশের ঐ কালটাতে ব্যাপক জনগণের মধ্যে তো বটেই এমন কি ছাত্র ইউনিয়নের মধ্যে ১৪ দফা কোন আবেদন সৃষ্টি করতে পারে নাই। এই সময় ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীদের বৃহত্তর অংশ ন্যাপ নেতৃত্বের নিকট থেকে ৬ দফার সমান্তরালে পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবীকে কেন্দ্রে রেখে পূর্ব বাংলার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় কর্মসূচী দাবী করতে থাকে।×

× ১৪ দফা কর্মসূচীর ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে আমার সমালোচনা থাকলেও এই নিবন্ধ লেখার সময়ও এটিকে যেভাবে সমালোচনা করেছি এখন আর সেভাবে সমালোচনা করি না। ১৪ দফার একটি প্রধান সমস্যা ছিল সেই সময়কার তরুণ প্রজন্মের অগ্রগামী চেতনার সঙ্গে তাল মিলাতে না পারা। সেই প্রজন্মের মূল ধারার ভিতর কাজ করছিল পাকিস্তানকে ভেঙ্গে ফেলে বাঙ্গালীর লোকবাদী ও সমাজতান্ত্রিক-গণতান্ত্রিক স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রচণ্ড আর্তি। ফলে তাদের দাবী ছিল ১৯৫৩-এর ২১ দফার মত মূলত পূর্ব পাকিস্তান ভিত্তিক স্বায়ত্তশাসনের কর্মসূচী প্রদান করার যাকে সামনে রেখে তারা গোপনে বা অপ্রকাশ্যে স্বাধীনতার রাজনীতি গড়ার জন্য কাজ করতে পারবে। কিন্তু বামপন্থী নেতৃত্ব এ ধরনের কোনও কর্মসূচী দিতে অক্ষম ছিল। পাকিস্তানের কাঠামোর ভিতর পূর্ব ও পশ্চিম উভয় অঞ্চলের স্বায়ত্তশাসনের দাবীর উপর সম-গুরুত্ব দিবার ফলে ১৪ দফা কর্মসূচী কোন ক্রমেই তরুণ প্রজন্মের সমর্থন লাভে সমর্থ ছিল না। এক অর্থে ১৪ দফা ৬ দফার মতই সমগ্র পাকিস্তান ভিত্তিক একটি কর্মসূচী ছিল। কিন্তু তা ৬ দফার মত সংক্ষিপ্ত, সুসপষ্ট এবং জোরালো ছিল না। সবচেয়ে বড় কথা ১৪ দফাকে এগিয়ে নিবার মত কোন শক্তি ছিল না। ভাসানী বাদে ন্যাপ নেতৃত্ব ছিল আন্দোলন বিমুখ। আর বামপন্থী ছাত্ররা এই কর্মসূচীকে প্রত্যাখান করেছিল। কেন করেছিল সে কথা একটু আগেই বলেছি। ছাত্ররা ছিল সে কালে আন্দোলনের প্রধান শক্তি। সুতরাং বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাওয়াই ছিল ১৪ দফার নিয়তি। কিন্তু ৬ দফার ভাগ্য ছিল ভিন্ন। নেতৃত্ব যেমন আন্দোলনে গেল তেমন ছাত্র লীগ ৬ দফাকে নিয়ে গেল জনগণের মাঝে। - লেখক ঃ ২৪ ফেব্রুয়ারী, ২০০৯

১৯৬৭-তে ন্যাপের মস্কোপন্থী অংশ ন্যাপ বিভক্ত করে ওয়ালী খানের নেতৃত্বে ন্যাপ নাম নিয়েই স্বতন্ত্র একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা  করে। এক সময় এই অংশ  পূর্ব বাংলায় আওয়ামী লীগের ৬ দফাকে সমর্থন দেয়। পূর্ব বাংলায়  এটি তাদের মুখ্য রাজনীতি হয়ে ওঠে। অর্থাৎ রাজনীতিতে তাদের মূল ভূমিকা ছিল লেজুড়বৃত্তিকারীর।

কিন্তু ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাপের মূল এবং প্রধান অংশের ভূমিকা রইল পূর্ববৎ দুঃখজনক। কারণ এই পর্যায়ে ন্যাপের মূল নিয়ন্ত্রণ ছিল হক-তোয়াহা নেতৃত্বাধীন পিকিংপন্থীদের হাতে যারা ছিল চীনের প্রতি অন্ধ আনুগত্যের কারণে পাকিস্তানপন্থী ও আইয়ূবের প্রতি দুর্বল। বিশেষত আওয়ামী লীগ ৬ দফা কর্মসূচী দিবার পর তারা এর মধ্যে পাকিস্তান ও চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার ষড়যন্ত্র দেখতে পায়। কিন্তু তারা পূর্ব বাংলার জন্য বিকল্প জাতীয় কর্মসূচী না দিয়ে ৬ দফাকে বিরোধিতা করার উপর সর্বশক্তি নিয়োগ করে।

এই অবস্থায় শেখ মুজিব এবং আওয়ামী লীগের বিরাট লাভ হয়। ইতিপূর্বে ’৫৬-’৫৭-তে পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন এবং ২১ দফার প্রতি অঙ্গীকার ভঙ্গ করায় আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তায় যে বিপর্যয় ঘটে তার প্রভাব কাটিয়ে উঠা গেল ৬ দফার সাহায্যে। ৬ দফার সাহায্যে শেখ মুজিব ক্রমে বিপুলভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেন। অন্যদিকে বামপন্থীরা এবং ভাসানী এবার তাঁদের এতকালের ভাবমূর্তি হারাতে শুরু করেন।

ভাসানী এক সময় বিপদ বুঝতে পারেন। ১৯৬৭-এর একটি সভা থেকে আমি তাঁর সমস্যা বুঝতে পারি। তখন আমি গ্রামাঞ্চলে কৃষক সংগঠন করছিলাম। ১৯৬৭-এর মে অথবা জুন মাসে পূর্ব পাকিস্তান কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির যে সভা হয় একজন সাধারণ কৃষক কর্মী হলেও আমাকে সেখানে উপস্থিত হবার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেই সভায় উপস্থিত থেকে আমি বুঝতে পারি ভাসানীর নিঃসঙ্গতা ও অসহায়তা। তিনি ঐ সভায় আইয়ূব বিরোধী আন্দোলনের প্রয়োজন উপস্থিত করেন। আন্দোলনের কর্মসূচী না থাকার জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কিন্তু উপস্থিত ২৫/৩০ জন নেতার মধ্যে একজনও তাঁর সমর্থনে একটি কথাও বলেন নাই। মওলানা ভাসানী বক্তব্য রাখার কিছু পূর্বে আমি কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য না হয়েও ন্যাপের পক্ষ থেকে পূর্ব বাংলার একটি জাতীয় কর্মসূচী দেবার গুরুত্বের কথা বলি।* কিন্তু তৎকালীন পিকিংপন্থী গোপন কমিউনিস্ট পার্টির নেতা এবং প্রকাশ্যে পূর্ব পাকিস্তান কৃষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুল হক আমাকে থামিয়ে দেন। এবং আমার জাতীয় কর্মসূচীর দাবীটি এখানে উপস্থিত ন্যাপসহ কোন বাম নেতার কাছ থেকেই কোনও সমর্থন পায় নাই। এটা বিস্ময়কর মনে হতে পারে যে, বামপন্থী নেতৃত্বের কেউই তখন পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন কেন্দ্রিক কোনও আন্দোলনের প্রয়োজন অনুভব করত না। কারণ এর মধ্যে তারা জাতীয়তাবাদ দেখতে পেত। আর জাতীয়তাবাদকে তারা দেখতে পেত তাদের মার্কসীয় শ্রেণীতত্ত্ব এবং পিকিং কেন্দ্রিক আন্তর্জাতিকতাবাদের শত্রু হিসাবে।
---------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
* সভায় ভাসানী উপস্থিত হবার অল্প কিছু পূর্বে আমি বক্তব্য দিই।
---------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

তবে এর বাইরে ছিল প্রধানত ছাত্র-তরুণদের ব্যাপকতম অংশ। অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের ব্যাপক কর্মী-সমর্থকরা তখন চাইছিল ৬ দফার সমান্তরালে বাঙ্গালীর একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় কর্মসূচী। কিন্তু তাদের প্রতিনিধিত্বকারী জাতীয় নেতৃত্ব ছিল না। ছাত্র ইউনিয়নেরও নেতৃত্ব ১৯৬৭ পর্যন্ত ছিল মেনন-মান্নান ভুঁইয়া-মোস্তফা জামাল হায়দারের হাতে যাঁরা ছিলেন তখন পিকিংপন্থী নেতৃত্বের রাজনৈতিক লাইনের অনুসারী।

কিন্তু ১৯৬৭-তে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সমেমলন হলে তাতে মোস্তাফা জামাল হায়দার সভাপতি এবং মাহবুবউল্লাহ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। মাহবুবউল্লাহ ছাত্র ইউনিয়নের বামপন্থী জাতীয়তাবাদী ধারার প্রতিনিধি হিসাবে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ক্রমে ছাত্র ইউনিয়ন বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী এবং স্বাধিকারপন্থীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। কাজী জাফরের অনুসারী মোস্তাফা জামাল হায়দারও ক্রমে এই ধারার সঙ্গে একাত্ম হন। অর্থাৎ কাজী জাফর, রনো, মেনন, মান্নান ভূঁইয়া প্রমুখ যুব নেতাও এক সময় অন্ধ পিকিংপন্থা পরিহার করতে শুরু করেন।

১৯৬৮ থেকে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন হয়ে ওঠে এ দেশে বাঙ্গালীর জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার রাজনীতিতে উদ্বুদ্ধ এক বিশাল তরুণ প্রজন্মের প্রধান প্রকাশ্য সংগঠন। তবে এই রাজনীতিকে নূতন গতিবেগ ও মাত্রা দান করার ক্ষেত্রে সিরাজ শিকদারের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সিরাজ শিকদার প্রথম স্বাধীন পূর্ব বাংলা প্রতিষ্ঠার চেতনাকে একটি সংগঠিত রূপ দেন। তবে তিনি ছিলেন প্রকাশ্য গণ-আন্দোলন বিরোধী এবং শুধুমাত্র গোপন ও সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন জন-গণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা প্রতিষ্ঠার প্রবক্তা। এই পথ ছিল বিপ্লবী প্রজন্মের জন্য অতীব বিপজ্জনক এবং হঠকারী যা তাদেরকে নিতে পারত গণ-বিচ্ছিন্নতা ও ধ্বংসের মুখে। তবু তিনি সেই নেতৃত্বহীনতা ও বিভ্রান্তির কালে তরুণ প্রজন্মের চেতনায় এমন একটি ধাক্কা দিয়েছিলেন যা তাদেরকে স্বাধীন জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার রাজনীতির পথে এগিয়ে যাবার জন্য নূতন প্রেরণা ও শক্তি দিয়েছিল। কিন্তু একই সঙ্গে তাদেরকে ঠেলে দেয় এমন এক সঙ্কটে যার ফলে সেই কালে তরুণ প্রজন্মের সামনে সুস্থিরভাবে এগিয়ে যাওয়া আরও দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। সিরাজ শিকদার, শেখ মুজিব এবং পিকিংপন্থী নেতৃত্ব এই তিন শক্তির চাপে গণ-আন্দোলন ও জাতীয়তাবাদের ধারায় আগুয়ান বিপ্লবী ছাত্র-যুব শক্তির জন্য  কালটা ছিল নিদারুণ সঙ্কটের। কিন্তু এই সঙ্কট সত্ত্বেও বাঙ্গালীর জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে সেই কালটাতে এগিয়ে নেবার ক্ষেত্রে তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা ছিল বিস্ময়কর। এবার আমি তরুণ প্রজন্মের সেই ভূমিকার দিকটির উপর আলোকপাত করব।
 
জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তরুণ প্রজন্ম


ষাটের দশকে বাঙ্গালীর জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার রাজনীতির উদ্ভব ও বিকাশের উপর আলোচনা করতে গেলে সিরাজ শিকদারের প্রসঙ্গ অনিবার্যভাবে এসে পড়ে। সিরাজ শিকদার ছিলেন ১৯৬৭-তে নির্বাচিত পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি। ছাত্র ইউনিয়নের সহ-সভাপতি হলেও তিনি গণ-সংগঠন ও আন্দোলন বিরোধী হয়ে উঠেন এবং পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার লক্ষ্যে সশস্ত্র সংগ্রাম গড়ে তোলার জন্য গোপন  সংগঠন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে কাজ করতে থাকেন। ১৯৬৮-এর প্রথম দিকে (জানুয়ারী মাসে) তিনি গোপন সংগঠন হিসাবে পূর্ব বাংলার শ্রমিক আন্দোলন গঠন করেন। পরবর্তী কালে তা পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি নাম গ্রহণ করে।

সেই সময় আমি তৎকালীন দিনাজপুর জেলায় কৃষক আন্দোলন ও সংগঠন গড়ে তোলার জন্য কাজ করছিলাম। ১৯৬৮-এর শুরুতে কোন এক সময় আমি ঢাকায় এলে সিরাজ শিকদারের স্বাধীন পূর্ব বাংলার লক্ষ্যে গণ-সংগঠন বিরোধী কর্মনীতি সম্পর্কে জানতে পারি। আগেই বলেছি যে, পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার লক্ষ্য দীর্ঘকাল ধরে আমার ভিতর ছিল। তবে ১৯৬৭ সালে গণ-আন্দোলনের প্রশ্নে সিরাজ শিকদারের সঙ্গে আমার মতপার্থক্য হয়। আমার বক্তব্য ছিল পূর্ব বাংলাকে মুক্ত করতে হলে গোপন ও প্রকাশ্য কাজের সমন্বয় ঘটাতে হবে। গণ-লাইন বর্জন করে শুধু গোপন ধারায় অগ্রসর হলে তার পরিণতি হবে গণ-বিচ্ছিন্নতা এবং ধ্বংস।

যাইহোক, ১৯৬৮-এর শুরুতে সিরাজ শিকদারের পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে পারলে আমি তার বিরোধিতা করি। আমার অবশ্য এতকাল পর্যন্ত ধারণা ছিল যে, পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন ক্রমে বিকশিত হয়ে এক সময় জাতি-রাষ্ট্র চেতনা ও সশস্ত্র সংগ্রামের রাজনীতির বিকাশ ঘটাবে। তখন একটা পর্যায়ে আমাদের পক্ষে স্বাধীনতার কর্মসূচী দিয়ে সংগ্রাম শুরু করা সম্ভব হবে। কিন্তু এই ধরনের জাতীয় কর্মসূচী আমাদের ধারায় অবস্থিত জাতীয় নেতৃত্ব তথা ন্যাপ থেকে দেওয়া হয় নাই। এই রকম এক সময়ে বামপন্থী ছাত্র-তরুণদের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দেয়। অথচ তাদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী আকাঙ্ক্ষা প্রবল স্রোতে পরিণত হচ্ছিল। এই রকম অবস্থায় প্রতিষ্ঠিত বাম নেতৃত্বের প্রতি ক্ষুব্ধ বিপ্লবী ছাত্র-তরুণদের মনে সিরাজ শিকদারের পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার লক্ষ্যে গোপন সংগঠনের রাজনীতি প্রচণ্ড আবেগ সৃষ্টি করে। এটা তরুণ প্রজন্মের সামনে একটি বিকল্প রাজনীতি উপস্থিত করল।

কিন্তু আমি সিরাজ শিকদারকে তথা তার পদ্ধতিতে আমাদের প্রজন্মের বিপ্লবী শক্তির জন্য ভয়ঙ্কর বিপদ হিসাবে বিবেচনা করি এবং তাকে প্রতিহত করাকে আমার করণীয় হিসাবে নির্ধারণ করি। গণ-লাইনের ভিত্তিতে স্বাধীন পূর্ব বাংলার আন্দোলন গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে ১৯৬৮-এর এপ্রিলে আমার উদ্যোগে পূর্ব বাংলার বিপ্লবী কমিউনিস্ট আন্দোলন নামে একটি গোপন সংগঠন গঠিত হয় যা ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের বৃহত্তর অংশের প্রতিনিধিত্বকারী। সেই সঙ্গে তরুণ প্রজন্মেরও এক ব্যাপক অংশের প্রতিনিধিত্বকারী ছিল এই সংগঠন। এর কেন্দ্রীয় সংগঠনী কমিটিতে ছিলেন মাহবুব উল্লাহ, আবুল কাসেম ফজলুল হক, আমজাদ হোসেন এবং শামসুজ্জোহা মানিক।×

× নূরুল হাসানও সংগঠনী কমিটিতে প্রথম দিকে ছিলেন। কিন্তু কয়েক দিন পর সিরাজ শিকদারের সঙ্গে আমাদের এক যৌথ আলোচনা সভায় তিনি তাঁর এজেন্ট হিসাবে আত্মপ্রকাশ করলে তাকে সংগঠন থেকে বাদ দেওয়া হয়। - লেখক, ২৪ ফেব্রুয়ারী, ২০০৯

সংগঠন গঠনের ফলে সিরাজ সিকদারের ব্যাপক ও বিদ্যুৎগতি উত্থান রোধ হল। কারণ আমরা তরুণ প্রজন্মের জাতীয়তাবাদী আকাঙ্ক্ষার প্রতিলন ঘটিয়ে প্রকাশ্য রাজনীতি ও আন্দোলনের মাধ্যমে স্বাধীন জন-গণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম গড়ে তোলার পথ নিলাম। এইভাবে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন হয়ে উঠল স্বাধীনতাকামী জাতীয়তাবাদী শক্তির ঝটিকা বাহিনী। ক্রমে কাজী জাফরের অনুসারী মোস্তাফা জামাল হায়দার এবং তাঁর অনুসারী ছাত্র নেতা-কর্মীরাও এই রাজনীতি গ্রহণ করেন। ১৯৬৯-এ কাজী জাফরের নেতৃত্বে গঠিত হয় গোপন সংগঠন কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটি। তারও লক্ষ্য ছিল পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা এবং বাঙ্গালীর জন-গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। এবং এই সংগঠনও বিশ্বাস করত প্রকাশ্য ও গোপন আন্দোলনের সমন্বয়ে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে কাজী জাফর নেতৃত্বাধীন ছাত্র-যুব গোষ্ঠী হক-তোয়াহা নেতৃত্বাধীন পিকিংপন্থী কমিউনিস্ট রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করে।

এইভাবে এ দেশে বাঙ্গালীর জাতীয় আন্দোলনে দু’টো ধারা উপস্থিত হল। একটি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন, যার লক্ষ্য ছিল ৬ দফার ভিত্তিতে পূর্ব বাংলার পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা। অপরটি গোপনে প্রথমে পূর্ব বাংলার বিপ্লবী কমিউনিস্ট আন্দোলন এবং পরে কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের সমন্বয় কমিটিরও নেতৃত্বে এবং প্রকাশ্যে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্বে, যার লক্ষ্য ছিল পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা অর্জন। সিরাজ শিকদার গণ-সংগঠন ও আন্দোলন থেকে প্রত্যাহার করায় এবং ছাত্র-যুব শক্তির বড় অংশ না পাওয়ায় জাতীয় রাজনীতির মূল ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেন। সুতরাং জাতীয় রাজনীতিতে তখন জাতীয়তাবাদের সপক্ষে প্রকাশ্য দু’টো শক্তি দাঁড়াল - একটি আওয়ামী লীগ এবং অপরটি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন।

কিন্তু সমস্যা ছিল এই দুই শক্তির পরসপর বিরোধী অবস্থানের কারণে। এই বিরোধের মূল কারণ ছিল সমাজতন্ত্র এবং পুঁজিবাদের বিরোধ। আওয়ামী লীগ ছিল পুঁজিবাদের সমর্থক। অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন ছিল সমাজতন্ত্রের সমর্থক। বিরোধের আরও দিক ছিল। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও কর্মী বাহিনী বিশ্বাস করত সশস্ত্র সংগ্রামে। কিন্তু আওয়ামী লীগ ছিল নিয়মতন্ত্র ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতার হাত বদলে বিশ্বাসী। তাছাড়া আওয়ামী লীগ যে ৬ দফা দিয়েছিল তা প্রকৃতপক্ষে বাঙ্গালীর জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন গড়ে তোলার কর্মসূচী ছিল না। কারণ তার মধ্যে বাঙ্গালী চেতনার মর্মবস্তু থাকলেও সেই সঙ্গেই ছিল পাকিস্তান ভিত্তিক ধর্ম-সাম্প্রদায়িক চেতনা ও মর্মবস্তু। প্রকৃতপক্ষে ৬ দফা ভিত্তিক জাতীয়তাবাদী চেতনায় ছিল প্রচলিত ধর্মের বিজড়ন।

কিন্তু এটাও ঠিক যে, প্রকাশ্যে জাতীয় আন্দোলন গড়ার জন্য এমন একটি দ্বৈত বৈশিষ্ট্য ধারণকারী জাতীয় কর্মসূচীর প্রয়োজন ছিল যার আড়ালে থেকে বাঙ্গালীর লোকবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেতনা ও আন্দোলন গড়ে তোলা যেত। যে কালে ন্যাপ বা বাম নেতৃত্ব তেমন কোন কর্মসূচী না দেওয়ায় আপাত দৃ’ষ্টি পরসপর বিরোধী অবস্থানে থেকেও ৬ দফা এবং স্বাধীন জন-গণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলার রাজনীতি পরসপরের পরিপূরক হল। ৬ দফার সীমাবদ্ধতা দূর করল অধিকতর অগ্রগামী এবং প্রচলিত ধর্মের বিজড়নমুক্ত স্বাধীন জন-গণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলার রাজনীতি।

এখন আমরা যদি সে কালে পূর্ব বাংলার জাতীয় আন্দোলন পর্যালোচনা করি তবে তার বিকাশ ধারাকে এভাবে দেখতে পাব। ১৯৬৬-তে আওয়ামী লীগের ৬ দফা পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন ও বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের ক্রমবর্ধমান আকাঙ্ক্ষা ও আবেগকে একটি কর্মসূচীর মাধ্যমে সংহত রূপ দিল। এইভাবে ৬ দফা তার সকল সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ছিল জাতির স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধিকার বোধের বিকাশের ক্ষেত্রে একটি অনুকূল অভিঘাত বা প্রেরণা। এই অভিঘাতকে গ্রহণ করে ১৯৬৮-তে সিরাজ শিকদার তরুণ প্রজন্মের চেতনায় আর একটি অভিঘাত হানেন গণ-পথ বর্জিত সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন পূর্ব বাংলা প্রতিষ্ঠার রাজনীতি উপস্থিত করে। সিরাজ শিকদারের পদ্ধতি ভুল হলেও তিনিই প্রথম জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার রাজনীতিকে সামনে নিয়ে এসে তরুণ প্রজন্মের চেতনায় অভিঘাত হানেন। বামপন্থী জাতীয় নেতৃত্ব ৬ দফার অভিঘাত থেকে কোনও শিক্ষা না নিয়ে তাকে প্রতিহত করার পথ নেয়। কিন্তু ঐকালের তরুণ প্রজন্মের পক্ষে যা করা সম্ভব ছিল তা তারা করল। সিরাজ শিকদারের অভিঘাত থেকে শিক্ষা এবং প্রেরণা নিয়ে তারা ১৯৬৮-তেই বাঙ্গালীর জাতি-রাষ্ট্র হিসাবে স্বাধীন পূর্ব বাংলা প্রতিষ্ঠাকে সমস্ত জাতি ও জনগণের রাজনীতি হিসাবে গড়ে তোলার জন্য গণ-আন্দোলনের পথ নিল। ক্রমে তাদের রাজনীতিটাই এক সময় ৬ দফা ও অন্যান্য আন্দোলনের অভিমুখ বদলে দিয়ে ১৯৭১-এর জাতীয় মুক্তিযুদ্ধকে অনিবার্য  করে।

তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক গতিধারার প্রভাব গিয়ে পড়ে ঐতিহ্যিক ধারায় গড়ে ওঠা পিকিংপন্থী কমিউনিস্ট রাজনীতিতেও। ১৯৬৮-এর শেষ দিকে পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) বিভক্ত হয় এবং দেবেন শিকদার, আবদুল মতিন, আলাউদ্দিন  আহমদের নেতৃত্বে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয়। এই পার্টি গঠন হলে আমি পূর্ব বাংলার বিপ্লবী কমিউনিস্ট আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সংগঠনী কমিটিতে তাদের সঙ্গে ঐক্যের আলোচনা শুরুর প্রস্তাব দিই। কারণ তখনও সিরাজ শিকদারের বিপদ ভয়ানকভাবেই ছিল। তাছাড়া তখন জাতীয় রাজনীতিতে দ্রুত কার্যকর ভূমিকা পালনের প্রয়োজন আমি তীব্রভাবে অনুভব করছিলাম। ঐ পার্টির আবদুল মতিন, আলাউদ্দিন আহমদ এবং আবুল বাশার ছিলেন ন্যাপ এবং বাম রাজনীতিতে প্রভাবশালী ব্যক্তি। সুতরাং তাঁদেরকে আমাদের রাজনীতিতে পাওয়া আমার নিকট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমার প্রস্তাব বিপ্লবী কমিনিস্ট আন্দোলনে গৃহীত হলে আমি পূর্ব  বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে ঐক্যের আলোচনা শুরু করি। এই আলোচনায় তাঁরা পূর্ব বাংলা স্বাধীনতার প্রশ্নে আমাদের সঙ্গে একমত হলে আমরা পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদানের সিদ্ধান্ত নিই।× এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয় ১৯৬৯-এর প্রথমার্ধে।

× আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত অবশ্য যোগদানের ছিল না, ছিল ঐক্যের। কিন্তু আমরা যেভাবে ঐক্যবদ্ধ পার্টি গঠন করি তাতে সেটা যোগদান হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই কারণে আমি অনেক সময় ভুল করে সিদ্ধান্তটিকে সেভাবে বলি। এখানেও সেভাবে উল্লেখ করেছি। - লেখক, ২৪ ফেব্রুয়ারী, ২০০৯

ইতিমধ্যে ১৯৬৮-এর ৬ ডিসেম্বর মওলানা ভাসানী আইয়ূব বিরোধী আন্দোলন শুরু করলে তা জানুয়ারীর ২০ তারিখে আসাদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সারাদেশ ব্যাপী প্রচণ্ড ও বিশাল গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত হয়। আমাদের সৌভাগ্য যে, আমরা সিরাজ শিকদারের প্রভাবকে যথা সময়ে প্রতিহত করতে পেরেছিলাম। তা না হলে এই গণ-আন্দোলনের প্রধান চালিকা শক্তি ছাত্রদেরকে হয়তো ভাসানীর পক্ষে পাওয়া সম্ভব হত না। প্রকৃতপক্ষে সিরাজ শিকদারের উত্থানের জন্য সময়টা ছিল খুবই অনুকূল। ৬ দফা দিবার পর শেখ মুজিবসহ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের মূল অংশ কারারুদ্ধ। নেতৃত্বহীনতা ও বিপর্যয়ের কারণে রাজনীতির মাঠে আওয়ামী লীগের উপস্থিতি খুব সামান্য ছিল। ন্যাপ এবং বামপন্থীরা তখন মাঠে। কিন্তু ব্যাপক প্রভাব সত্ত্বেও তাদের দিক থেকে জাতীয় কর্মসূচী না থাকায় জনমনে তাদের প্রতি অনাস্থা বাড়ছিল। এমন অবস্থায় তরুণ প্রজন্ম বিকল্প পথ সন্ধান করছিল। জনগণ চাইছিল স্বায়ত্তশাসন। কিন্তু নেতৃত্বের প্রতি আস্থাহীন তরুণ প্রজন্ম ক্রমবর্ধমানভাবে চাইছিল স্বাধীনতা এবং স্বাধীনতার জন্য পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধের প্রস্তুতি। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের ভিতর এই চেতনার ব্যাপক ও দ্রুত বিস্তার ঘটছিল। এই অবস্থায় সিরাজ শিকদার যদি এই শক্তিকে নিজ পক্ষে টেনে নিতে পারতেন তবে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র লীগের ব্যাপক অংশও তার নেতৃত্বহীনতার ঐ অবস্থায় তাঁর সঙ্গে চলে যেত এমন সম্ভাবনা যথেষ্ট ছিল। এমন ধরনের ঘটনা ঘটলে সেটা সমগ্র তরুণ প্রজন্মকে একটা অকাল ও গণ-বিচ্ছিন্ন সশস্ত্র সংগ্রামে নিয়ে যেতে পারত। এবং সম্ভবত পাকিস্তানী সেনাবাহিনী সহজেই তাকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পেয়ে ধ্বংস করতে সক্ষম হত। ফলে জাতির জীবনে একটা অকাল গর্ভপাত ঘটে যেতে পারত এবং সেক্ষেত্রে ১৯৭১-এর জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার শক্তিটা আগেই ধ্বংস হওয়ায় ঐ যুদ্ধটাও আর ঘটত না।

হাঁ, এটা আমাদের সৌভাগ্য যে, আমরা যথাসময়ে সিরাজ শিকদারকে রোধ করি স্বাধীনতার বিকল্প কর্মসূচী ও কর্মপদ্ধতি দিয়ে যদিও আমাদেরও সীমাবদ্ধতা ছিল প্রকাশ্য জাতীয় কর্মসূচীর নিজস্ব আড়াল আমাদের জন্য না থাকায়। এই অবস্থায় ’৬৮-’৬৯-এর গণ-অভুত্থান ঘটলে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়ে আমরা স্বাধীন এবং জন-গণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলার চেতনাকে সারা দেশে বিস্তৃত করার কাজ শুরু করি।

পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদানের পর ঐ পার্টির নেতৃত্ব আমাদের মধ্য থেকে মাহবুব উল্লাহ এবং আমজাদ হোসেনকে তাঁদের পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিতে গ্রহণ করেন। কিন্তু আমাকে রাখেন সাধারণ সদস্য হিসাবে। অথচ তাঁরা জানতেন আমার ভূমিকা সম্পর্কে এবং জানতেন যে, তাঁদের সঙ্গে ঐক্যের আলোচনা প্রায় সম্পূর্ণরূপে আমি চালাই। পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার প্রশ্নে আমার দৃঢ়তা এবং তরুণ প্রজন্মের উপর আমার প্রভাব সম্পর্কেও তাঁরা জানতেন। এবং তাঁরা জানতেন যে, আমি মতান্ধ ব্যক্তি ছিলাম না।

পুর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টিতে দিবার পর আমার অবস্থা হল সঙ্কটজনক। সেখানে যোগ দেবার পর থেকেই তার নেতৃত্ব আমাকে কোণঠাসা করে রাখার উপর শক্তি নিয়োগ করেন এবং পেটি বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী হিসাবে আমাকে চিহ্নিত করতে থাকেন।

তবু আমি মনে করি আমি ব্যর্থ হই নাই। যে মুহূর্তে তাঁরা ছাত্র-তরুণদের দাবী পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার কর্মসূচী এবং সেই সঙ্গে ছাত্র-তরুণদের গ্রহণ করলেন সেই মুহূর্তে  তাঁরা আমাদের রাজনীতির অচেতন হাতিয়ারে পরিণত হলেন। ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ন্যাপের উপর থেকে হক-তোয়াহার নিয়ন্ত্রণ উৎখাত হয় এবং তাতে মতিন-আলাউদ্দিন-বাশারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। আর এর ফলে আমাদের প্রজন্ম সমগ্র ন্যাপ এবং তার সঙ্গেকার গণ-সংগঠনগুলোকে স্বাধীন পূর্ব বাংলা প্রতিষ্ঠার রাজনীতি প্রচারের মঞ্চে পরিণত করল। এইভাবে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে পরিচালিত স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনের ভিতর প্রবেশ করতে থাকে স্বাধীনতা ও সশস্ত্র সংগ্রামের চেতনা ও উপাদান। নেতৃত্ব যতই চেষ্টা করুক ছাত্র-তরুণদেরকে বাধা দিতে পারে নাই।

যাইহোক, ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের ভিতর ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ থেকে ১১ দফা কর্মসূচী ঘোষণা করা হলে গণ-আন্দোলন একটি নূতন গতিবেগ লাভ করে। ৬ দফার তুলনায় এটি ছিল অনেক বেশী প্রাগ্রসর ও গণমুখী। কিন্তু প্রবল আন্দোলনের চাপে শেখ মুজিব মুক্তি পেলে ছাত্রদের ১১ দফার আবেদন ম্লান হতে থাকে। শেখ মুজিব প্রথম দিকে ৬ দফার সঙ্গে ১১ দফার কথা বললেও পরবর্তী সময়ে শুধু ৬ দফার কথাই বলতে থাকেন। ন্যাপের পক্ষ থেকে তখনও কোন জাতীয় কর্মসূচী দেওয়া হল না। তবে মওলানা ভাসানী ১১ দফার প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখেন অনেক দিন পর্যন্ত। ১৯৬৯-এর ২৫ মার্চ আইয়ূব সরকারের পতন ঘটে। আইয়ূব খান সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ইয়াহিয়ার হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।

আইয়ূবের পতনের পর শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তা ক্রমবর্ধমান গতিবেগ অর্জন করতে থাকে। তাঁর ছিল ৬ দফা কর্মসূচী যা ছিল জনগণের নিকট সহজবোধ্য এবং জনগণের সকল অংশের নিকট গ্রহণযোগ্য। কিন্তু ছাত্র ও যুব কর্মীরা স্বাধীনতার স্লোগান দিতে থাকলেও জনগণের নিকট বোধগম্য ও গ্রহণযোগ্য তেমন একটি কর্মসূচী ন্যাপ থেকে আর এল না। হয়ত তখন তেমন একটি কর্মসূচী  দিয়েও ন্যাপ আর আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তার সেঙ্গ পাল্লা দিতে পারত না। তবু ন্যাপ ও বাম আন্দোলনের ক্ষতির পরিমাণটা হয়ত কমানো যেত। বরং ছাত্র-যুবকদের স্বাধীনতার দাবী তখনও জনগণের দাবী হয়ে না উঠায় এই ধরনের অগ্রগামী দাবীর প্রভাব বাড়তে থাকলেও তা বামপন্থী আন্দোলনের গণ-বিচ্ছিন্নতাও বাড়াচ্ছিল। বিশেষত মনে রাখতে হবে যে, স্বাধীনতার স্লোগান ছাত্র-তরুণ বামপন্থীরা দিলেও তাদের প্রকাশ্য আন্দোলনের জাতীয় কর্মসূচী না থাকায় শূন্য স্থানটা পূরণ করল বরং ৬ দফা।

বাম রাজনীতির এই বিভ্রান্তির কালে ছাত্র-যুবকদের মধ্যে কর্মসূচীর তাগিদ তীব্র হয়ে উঠলে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের মাধ্যমে স্বাধীন জন-গণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলার কর্মসূচী ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেয়। কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটিও এই কর্মসূচীর প্রশ্নে একমত হয়। ১৯৭০-এর ২২ ফেব্রুয়ারী পল্টনের জনসভায় পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষ থেকে স্বাধীন জন-গণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলার ১১ দফা কর্মসূচী ঘোষণা করা হল। তখন ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মোস্তফা জামাল হায়দার এবং সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল্লাহ্‌। এই জনসভায় ১১ দফা কর্মসূচীর সমর্থনে প্রাক্তন ছাত্র নেতা ও তৎকালীন শ্রমিক নেতা কাজী জাফর আহমদ বক্তৃতা করেন। এ ছাড়া প্রাক্তন ছাত্র নেতা  রাশেদ খান মেনন, তৎকালীন ছাত্র নেতা মোস্তফা জামাল হায়দার ও মাহবুব উল্লাহ্‌ প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। এই সভায় বক্তব্য রাখার কারণে সামরিক আদালত কাজী জাফর আহমদ রাশেদ খান মেননকে ৭ বৎসর করে এবং মোস্তফা জামাল হায়দার ও মাহবুব উল্লাহ্‌কে ১ বৎসর করে সশ্রম কারাদণ্ডাদেশ দেয়। তাঁরা সকলে আত্মগোপন করেন, কিন্তু মাহবুব উল্লাহ্‌ মার্চ মাসে গ্রেফতার হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত কারারুদ্ধ থাকেন।

প্রকাশ্য জনসভায় স্বাধীন পূর্ব বাংলার কর্মসূচী ঘোষণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আর কিছু না থাকায় তখন ঐটারই প্রয়োজন ছিল। পুরাতন নেতৃত্বের নিষিক্রয়তা ও জাতীয় কর্মসূচীহীনতার তুলনায় এটার গুরুত্ব ছিল অপরিমেয়। ছাত্র-যুবকদের পক্ষে যা করা সম্ভব ছিল তা তারা করল। কিন্তু তবু বলব স্বায়ত্তশাসনের কর্মসূচী না দিয়ে কিংবা তাকে পাশ কাটিয়ে হঠাৎ করে স্বাধীনতার কর্মসূচী প্রদান ছিল একটি বেশী অগ্রগামী পদক্ষেপ। আর তা ছাড়া এটা দিয়ে এত দিনে জাতীয় রাজনীতিতে সৃষ্ট গণ-বিচ্ছিন্নতাও আর সহসা দূর করা সম্ভব ছিল না। বরং এই কর্মসূচী প্রকাশ্যে ঘোষণার ফলে ছাত্র-যুব নেতৃত্ব কারারুদ্ধ হওয়ায় কিংবা আত্মগোপন করতে বাধ্য হওয়ায় বিপ্লবী ছাত্র আন্দোলন প্রকৃতপক্ষে নেতৃত্বহীন হল। তা ছাড়া ঐ কর্মসূচী কমিউনিস্ট রাজনীতির শ্রেণী তত্ত্ব দ্বারা বেশী প্রভাবিত থাকায় সেটা ছিল যথেষ্ট সংকীর্ণ বা সীমাবদ্ধ।

আমার ধারণা এর পিছনেও কার্যকর ছিল পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির প্রবীণ নেতৃত্বের কূটকৌশল ও ষড়যন্ত্র। তাঁরা এই পদ্ধতিতে তরুণ প্রজন্মের তীব্র আবেগকে তুষ্ট অথচ ছত্রভঙ্গ করতে চেয়েছিলেন। সুতরাং কাজী জাফর, মেনন বক্তৃতা দিলেন। কিন্তু পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান নেতা আবদুল মতিন, আলাউদ্দিন আহমদ উপস্থিত থাকেন নাই কিংবা তাঁদের কেউ বক্তৃতা দেন নি। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম সম্পাদক দেবেন শিকদার তখন কারাবন্দী এবং আবদুল মতিন তখন পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক।

এই সমগ্র সময়টাতে আমি বিচ্ছিন্নভাবে গ্রামে পড়ে থেকে কৃষক আন্দোলন করছিলাম। ১৯৬৯ থেকে আমি তৎকালীন রংপুর জেলায় কাজ করছিলাম। পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব চাইতেন না যে, আমি ঢাকায় ছাত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখি।

১৯৭০-এর জুলাই মাসে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। ঐ কংগ্রেসে আমিও উপস্থিত হই। তখন পার্টি এবং বাম রাজনীতির সমগ্র চিত্র আমার কাছে সপষ্টভাবে ধরা পড়ে। আমার কাছে এটা সপষ্ট হল যে, সমগ্র জাতীয় আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণ আওয়ামী লীগের হাতে চলে গেছে এবং প্রকাশ্য আন্দোলনের মাধ্যমে আমাদের পক্ষে আর তার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। আমাদের নেতৃত্বের ব্যর্থতা ও অযোগ্যতাও তখন আমার কাছে সুসপষ্ট এবং তাদের উদ্দেশ্যটাও তখন আমার কাছে সপষ্ট। তারা স্বাধীনতা ইত্যাদির কথা বলে কাল ক্ষেপণ করতে চাইছে এবং একটা রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলে তারা পুনরায় শ্রেণী রাজনীতি ও বিপ্লবের নামে তাদের সংকীর্ণ পেশাভিত্তিক ও সংস্কারবাদী রাজনীতি চালু করবে।

এই রকম পরিস্থিতিতে আমি কংগ্রেসে বসে চারু মজুমদারের গণ-সংগঠন বর্জন ও শ্রেণীশত্রু খতমের রাজনীতিকে পার্টির ভ্রান্ত রাজনীতি প্রতিহত করার পথ হিসাবে দেখতে পাই। আমার বিবেচনায় কিন্তু ইতিপূর্বে চারু মজুমদারের লাইন ছিল বিপজ্জনক ও ভ্রান্ত। ঐ কংগ্রেসে উপস্থিত হবার পূর্ব পর্যন্ত আমি যেমন সিরাজ শিকদারের লাইন বিরোধী ছিলাম তেমন চারু মজুমদারের লাইন বিরোধীও ছিলাম। কিন্তু যে পার্টি শ্রেণী রাজনীতি ছাড়া আর কিছু বুঝতে চাইত না তাকে জাতীয় যুদ্ধে নেবার জন্য আমি সৃজনশীলভাবে চারু মজুমদারের লাইন গ্রহণের তাৎপর্য তুলে ধরলাম। আমি যুক্তি দিলাম জাতীয় রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ আওয়ামী লীগের হাতে চলে গেছে, ফলে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আর পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার জন্য আমাদের পার্টির নেতৃত্বে জাতীয় যুদ্ধ গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এই অবস্থায় আমাদের পার্টির নেতৃত্বে জাতীয় যুদ্ধ শুরু করার পদ্ধতি হতে পারে গণ-সংগঠন ও আন্দোলন বর্জন করে গোপনে কৃষক ও শ্রমিকদের নিয়ে শ্রেণী শত্রু খতমের মাধ্যমে গণ-বাহিনী গঠন করা এবং গ্রামাঞ্চলে ঘাঁটি এলাকা গড়ে তোলা। এর ফলে যখন পাকিস্তানী রাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত ঘটবে তখন শ্রেণী দ্বন্দ্বের জাতীয় দ্বন্দ্বে উত্তরণ ঘটবে এবং আমরা পূর্ণাঙ্গরূপে জাতীয় যুদ্ধ শুরু করব। আমি অবশ্য তখন বিষয়টিকে ভাববার জন্য উপস্থিত করলাম।

আমার বক্তব্য পার্টি নেতৃত্ব বিবেচনা করতে রাজী হলেন। এই কংগ্রেসে পার্টির উপস্থিত কর্মীদের অধিকাংশই আমার চিন্তাকে গুরুত্বের সঙ্গে নিলেন। এবং এই কংগ্রেসে আমাকে প্রথম পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত করা হয়।

১৯৭০-এর জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়টা ছিল পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। ঐ সময়ে বাম আন্দোলন নিস্তেজ হয়ে পড়ে। শ্রমিক-কৃষকদের দাবী-ভিত্তিক আন্দোলনও তখন ৬ দফার নীচে তলিয়ে গিয়ে প্রায় থেমে গেছে। ৭ ডিসেম্ব্বর পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচন হলে পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ বিপুলভাবে জয়লাভ করে। এই নির্বাচন ন্যাপ বর্জন করে। এই বর্জনের পিছনে মওলানা ভাসানী এবং পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকাই ছিল মুখ্য। সুখেন্দু-হক-তোয়াহা নেতৃত্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) ১৯৭০-এর প্রথম দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ন্যাপ এবং গণ-সংগঠন বর্জন করে গ্রামঞ্চলে সশস্ত্র শ্রেণী সংগ্রাম গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ শুরু করে। তাদের সঙ্গে পূর্ব বাংলার জাতীয় আন্দোলনের আর কোনও সম্পর্ক ছিল না। বস্তুত ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থনের ফলে তারা ন্যাপ এবং তার সঙ্গে সম্পর্কিত গণ-সংগঠনগুলোর উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। ফলে তাদের চলে যাওয়া ছাড়া উপায়ও ছিল না।

কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হবার পর আমি চারু মজুমদারের লাইন গ্রহণের জন্য পার্টিকে তাগিদ দিতে থাকি। ১৯৭০-এর ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় হলে আমি পার্টিকে আর সময় না দিবার সিদ্ধান্ত নিই। এবং পার্টিকে জানাই যে, জাতীয় যুদ্ধ গড়ে তোলার লক্ষ্যে হয় পার্টি চারু মজুমদারের লাইন গ্রহণ করবে নয় আমরা পার্টিকে বিভক্ত কওে আলাদা পার্টি গঠন করব। এই প্রশ্নে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আমজাদ হোসেন আমাকে সমর্থন দেন এবং সেই সঙ্গে তরুণ কর্মীদের ব্যাপক অংশের সমর্থন পাই। তবে আমজাদের সঙ্গে আমার চিন্তার মৌলিক পার্থক্যও ছিল। তিনি তখন চারু মজুমদারের লাইনের অন্ধ সমর্থক হয়েছিলেন যেটা আমি ছিলাম না। আমি ছিলাম জাতীয় মুক্তিযুদ্ধে পার্টিকে নিয়ে যাবার জন্য চারু মজুমদারের লাইনের সাময়িক ও সৃজনশীল প্রয়োগের পক্ষপাতী। বস্তুত তখন চীন চারু মজুমদারকে সমর্থন করায় চীনপন্থী পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বের পক্ষে এই লাইনের বিরোধিতা করা ছিল দুঃসাধ্য।

যাইহোক, আমার চাপের মুখে পার্টি নেতৃত্ব এই প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নিবার জন্য দ্রুত বিশেষ কংগ্রেসে ডাকেন। বিশেষ কংগ্রেসে অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭০-এর ৩০, ৩১ ডিসেম্বর এবং ১৯৭১-এর ১ জানুয়ারী তারিখে। তীব্র বিতর্কের মধ্য দিয়ে চারু মজুমদারের লাইনকে পার্টির অন্যতম লাইন হিসাবে নেওয়া হলেও পাশাপাশি গণ-সংগঠন ও গণ-আন্দোলন অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। এইভাবে নেতৃত্ব একটা আপোসের ব্যবস্থা করল। তবে পার্টি নেতৃত্ব চারু মজুমদারের লাইনকে পার্টির অন্যতম লাইন হিসাবে গ্রহণ করলেও আমাকে কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে অপসারণ করে এবং আমজাদকে কেন্দ্রীয় কমিটিতে রেখে তাঁকে এই লাইন প্রয়োগের দায়িত্ব প্রদান করে। উদ্দেশটা সপষ্ট। যাতে পার্টিকে জাতীয় যুদ্ধে নেওয়া না যায়। আর এইভাবে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব তাদেও বাঙ্গালীর জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম বিরোধী চক্রান্তমূলক রাজনীতিকে সুসপষ্ট করল।

এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, চারু মজুমদারের লাইন গ্রহণের মাত্র কয়েক দিন আগে আলাউদ্দিন-মতিনের নির্দেশে অথবা সমমতিতে এবং পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির অগোচরে (তখন আমি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য) ডিসেম্বরে নির্বাচিত প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য এবং পাবনার আওয়ামী লীগ নেতা আহমদ রফিককে শ্রেণী শত্রু হিসাবে হত্যা করা হয়। অথচ তখনও পার্টিতে এই লাইন নেওয়া হয় নাই এবং তাঁরা ছিলেন এই লাইন বিরোধী। এর উদ্দেশ্যও সপষ্ট। যাতে করে আওয়ামী লীগ এবং বামপন্থী শিবিরের মধ্যকার বৈরী সম্পর্কটা এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছায় যাতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে উভয় শিবিরের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের কোনও ভিত্তি অবশিষ্ট না থাকে।

যাইহোক, আমার বিবেচনায় স্বাধীন পূর্ব বাংলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গঠিত পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টিতে চারু মজুমদারের লাইন গ্রহণের ফলাফল ছিল যুগান্তকারী। এই পার্টির ঘোষিত লক্ষ্য ছিল পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা। কিন্তু তার জন্য যথাযথ কর্মসূচী ও কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করার যোগ্যতা কিংবা সদিচ্ছা তার নেতৃত্বের ছিল না। বরং বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে প্রমাণিত হয়েছে যে, এই নেতৃত্ব ছিল মূলত মতান্ধ, অযোগ্য, সঙ্কীর্ণ এবং চক্রান্তকারী। বিভিন্ন ঘটনা থেকে আমার কাছে এটা সপষ্ট যে, বামপন্থী ছাত্র-তরুণদের ভিতরে ক্রমবর্ধমান জাতীয়তাবাদী আবেগকে স্বীয় সঙ্কীর্ণ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার স্বার্থে ব্যবহার করতে চেয়ে একটা পর্যায়ে এই নেতৃত্ব পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার বক্তব্য গ্রহণ করে। অবশ্য যে কথা আগেই বলেছি যে, এর ফলে তরুণ প্রজন্মের স্বাধীনতার চেতনা দ্রুত ও ব্যাপকভাবে জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশের সুযোগ পায় এবং এইভাবে ৬ দফা ভিত্তিক স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের অভিমুখ পরিবর্তন করে তাকে স্বাধীনতা যুদ্ধের দিকে যেতে বাধ্য করে।

যাইহোক, চারু মজুমদারের লাইন গ্রহণের ফলে পার্টির ব্যাপক কর্মীরা একটা নূতন গতিশীলতা পায়। পার্টিতে এই ধারণা ছিল যে, শ্রেণী সংগ্রামের ভিত্তিতে জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম গড়ে উঠবে। এই লাইন সেই ধারণাকে প্রয়োগ করার একটা সুযোগ এনে দিল। কিন্তু নেতৃত্ব প্রকৃতপক্ষে জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম এবং বাঙ্গালীর জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য বিরোধী ছিল বলে তারা আমাকে কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে সরিয়ে দেয় এবং এই লাইনের অন্ধ অনুসারী আমজাদ হোসেনকে কেন্দ্রীয় কমিটিতে রেখে দেয়। কিন্তু তবু এই লাইনকে পার্টির অন্যতম লাইন হিসাবে গ্রহণ করার অনিবার্য পরিণতি হল জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের সূচনা। মনে রাখতে হবে কমিউনিস্ট পার্টির তখন এক ব্যাপক গণ-ভিত্তি ছিল। চারু মজুমদারের লাইন গ্রহণের ফলে সারা দেশে এটা প্রচার হল যে, পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপ এবং বাম সংগঠনগুলোর কর্মীরা শ্রেণী শত্রু খতমের মাধ্যমে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু করতে যাচ্ছে। সারা দেশ তখন স্বাধীনতার আন্দোলনের উত্তাল জোয়ারে ভাসছে। তখন “শ্রমিক-কৃষক অস্ত্র ধরো, পূর্ব বাংলা স্বাধীন করো”, “শ্রেণী শত্রু খতম করো, পূর্ব বাংলা স্বাধীন করো”, “গণবাহিনী গঠন করো, পূর্ব বাংলা স্বাধীন করো” এই স্লোগানগুলো বিশেষ তাৎপর্য ও গুরুত্ব নিয়ে জাতির সামনে উপস্থিত হয়। পার্টি নেতৃত্বের মনে যে উদ্দেশ্য বা পরিকল্পনাই থাক বাইরে এই সব স্লোগান ও প্রচারের প্রভাব ছিল প্রচণ্ড। বস্তুত পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টিতে চারু মজুমদারের লাইনের অন্তর্ভুক্তি আওয়ামী লীগসহ সবাইকে এমন এক নেতৃত্বের প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেয় যে, ইয়াহিয়া-মুজিবের আপোসের সব পথ বন্ধ হয়ে যায়।

১৯৫৬’-৫৭-তে সমাজে এই রকম বিপ্লবী উপাদানের অনুপস্থিতির কারণে সোহরাওয়ার্দী-মুজিবের পক্ষে ২১ দফার প্রতি অঙ্গীকার ভঙ্গ করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু ’৭১-এ ৬ দফার বাস্তবায়নও আর সম্ভব ছিল না। স্বাধীনতা একমাত্র অনিবার্যতা হয়ে দেখা দিল। প্রশ্ন হল কে এই স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব দিবে? আওয়ামী লীগ, নাকি পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি? আওয়ামী লীগকেই তা দিতে হত, কারণ তা ততদিনে ব্যাপক জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে দাঁড়িয়ে গেছে। কিন্তু যদি আওয়ামী লীগ এই নেতৃত্ব দিতে অস্বীকার করত তবে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির হাতে তা চলে যেত। বস্তুত স্বাধীনতা যুদ্ধে আওয়ামী লীগ না এলে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির জাতি বিরোধী নেতৃত্ব উৎখাত হত তার কর্মীদের দ্বারা। কিন্তু আওয়ামী লীগ এই নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে এলে কমিউনিস্ট নেতৃত্ব জাতীয় যুদ্ধ বিরোধী চক্রান্তে পার্টিকে ধরে রাখার সুযোগ পায় আওয়ামী লীগের প্রতি কর্মীদের সন্দেহ, অবিশ্বাস ও তিক্ততাকে ব্যবহার করে। যাইহোক, সঙ্গত কারণেই পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষে নেতৃত্ব প্রদান সম্ভব হয় নাই। কারণ আওয়ামী লীগ অত বোকা নয় যে, মাঠটা কমিউনিস্ট পার্টির হাতে ছেড়ে দিবে। সুতরাং তারাও এমন একটা পর্যায়ে জাতীয় আন্দোলনকে এগিয়ে নিল যখন পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ আক্রমণ অভিযান শুরু করল। এর বিরুদ্ধে জাতির প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হলে আওয়ামী লীগ তাতে নেতৃত্ব দিল ভারত রাষ্ট্রে অবস্থান করে। তবে এটা তাৎপর্যপূর্ণ যে, শেখ মুজিব এই যুদ্ধে নেতৃত্ব দিলেন না, বরং বাড়ীতে বসে থেকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর হাতে ধরা দিলেন।

শেখ মুজিব তাঁর ৭ মার্চের ভাষণে বলেছিলেন, “আমি যদি হুকুম দিবার না পারি.....” ইত্যাদি। তবে কি এটা আগেই নির্ধারিত হয়ে ছিল এবং তিনি জানতেন যে, কী ঘটতে যাচ্ছে? হয়ত পাকিস্তানের আক্রমণ, মুজিবের আত্মসমর্পণ, আওয়ামী লীগ কর্তৃক ভারত রাষ্ট্রে আশ্রয় গ্রহণ, ভারত রাষ্ট্রের সাহায্য, একটা পর্যায়ে পাক-ভারত যুদ্ধের মাধ্যমে বাঙ্গালীর জাতীয় মুক্তিযুদ্ধকে পাক-ভারতের মধ্যে রাষ্ট্রীয় যুদ্ধে পরিণত করে জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের দ্রুত সমাপ্তি - এ সবের নীল নকশা প্রণীত হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে। উদ্দেশ্য কি পূর্ব বাংলায় বিপ্লবী শক্তির ক্ষমতা দখলের সম্ভাবনাকে বিনষ্ট করা? যাইহোক, এটা এই আলোচনার জন্য এখন অপ্রাসঙ্গিক। তবে এ বিষয়ে গভীর অনুসন্ধান ও মূল্যায়নের প্রয়োজন আছে।

যাইহোক, ’৭১-এর জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বামপন্থী কমিউনিস্ট নেতৃত্বের স্বরূপ উদ্‌ঘাটিত হল। হক-তোয়াহারা পূর্ব থেকেই বাঙ্গালীর জাতি চেতনা ও স্বার্থ বিরোধী ছিলেন। তাঁদেরকে চিনতে অসুবিধা হয় না। কিন্তু জাতীয় যুদ্ধ শুরু হলে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি নেতৃত্ব তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিল। তারা অবশ্য সপষ্টভাবে স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা করে নাই। কিন্তু পাকিস্তান এবং আওয়ামী লীগ-ভারত উভয় পক্ষের বিরুদ্ধে দুই ফ্রন্টে লড়াইয়ের নামে তারা জাতীয় যুদ্ধকে বিভক্ত ও দুর্বল করার কাজ করে।

কিন্তু এই সময়ে ষাটের দশকের বিপ্লবী প্রজন্মের এক ব্যাপক অংশ জাতীয়তাবাদী আবেগ নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির দেবেন শিকদার-আবুল বাশারের নেতৃত্বাধীন অংশ পার্টি পুনর্গঠিত করে পশ্চিম বাংলা ও ত্রিপুরা থেকে জাতীয় যুদ্ধ পরিচালনা করে। এই সময় কাজী জাফরের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলার সমন্বয় কমিটি পশ্চিম বাংলা থেকে পূর্ব বাংলার মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ ছাড়াও বিভিন্ন বামপন্থী গোষ্ঠীর ভূমিকা ছিল জাতীয় মুক্তিযুদ্ধে।

তবে জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ গড়ায় বামপন্থীদের সামনে ছিল অজস্র বাধা। পূর্ব বাংলার ভিতরে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ও তার দালালদের আক্রমণ ও দমন অভিযান ছাড়াও ছিল সনাতন কমিউনিস্ট ধারায় গড়ে উঠা পিকিংপন্থী কমিউনিস্ট নেতৃত্বের প্রবল বাধা। আর ভারত-রাষ্ট্রের ভিতর ছিল দিল্লী সরকার ও আওয়ামী লীগ সরকারের দিক থেকে প্রবল বাধা এবং ষড়যন্ত্র। বস্তুত বামপন্থীদের যুদ্ধ ছিল অস্ত্র, অর্থ ও রাষ্ট্রীয় সমর্থনহীন যুদ্ধ। অথচ এর বিপরীতে আওয়ামী লীগের ছিল সবই।

তখনকার বামপন্থীদের সমস্যা সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতার কথা বলি। ছাত্র ইউনিয়নের রংপুর জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শফিক যুদ্ধ শুরু হলে ভারতে চলে যায় জাতীয় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে। সে ছিল গরীব বিধাব মায়ের ৭ সন্তানের মধ্যে একমাত্র পুত্র সন্তান। নম্র ও ভদ্র প্রকৃতির আদর্শবাদী এই তরুণকে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিকেই আওয়ামী লীগাররা তাদের সঙ্গে একত্রে পাটগ্রাম সেক্টরে পাকিস্তানী সেনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সময় পিছন থেকে গুলী করে হত্যা করে।

আমি তখন জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করার জন্য উভয় বাংলায় ব্যাপকভাবে ঘোরাঘুরি করি। এ পাশে ছিল পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর গ্রেফতারী পরোয়ানা। ও পাশে ছিল ভারত ও আওয়ামী লীগ সরকারের গ্রেফতারী পরোয়ানা। আমার অবস্থা বোঝাতে গিয়ে একটা ঘটনার কথা উল্লেখ করব। ঠাকুরগাঁর এক ছেলে ছাত্র ইউনিয়ন করত। সাধারণ সমর্থক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিল। তার ডাক নাম ছিল মানিক। যুদ্ধ শুরু হবার পর পশ্চিম বাংলায় আরও অনেকের মত আশ্রয় নেয়। কিন্তু মানিক নাম থাকার জন্য তাকে ভারত সরকার গ্রেফতার করে। সঙ্গে সঙ্গে ভারতে আশ্রয়গ্রহণকারী ঠাকুগাঁর স্থানীয় নেতৃবৃন্দ তার মুক্তির জন্য চেষ্টা করলে সে প্রাণে বেঁচে যায়। কিন্তু মানিক নাম থাকার জন্য তাকে প্রায় ৭ মাস কারাবন্দী থাকতে হয়। কাজেই যে মানিককে তারা খুঁজছিল তাকে পেলে তারা তার কী অবস্থা করত তা অনুমেয়।

এইভাবে একদিকে পুরাতন পিকিংপন্থী নেতৃত্ব এবং অপরদিকে ভারত সরকার এবং তার আশ্রয়ে থাকা আওয়ামী লীগের প্রবাসী সরকার উভয়ের বিরোধিতার মুখে বামপন্থী কিংবা বিপ্লবী জাতীয়তাবাদী শক্তির পক্ষে জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ গড়ে তোলা ছিল এক প্রায় অসাধ্য সাধন। তবু তারা এই অসাধ্য সাধন করছিল। এবং এর মূল কৃতিত্ব ষাটের দশকের তরুণ প্রজন্মের যারা দীর্ঘকাল ধরে সমস্ত প্রতিকূলতা ও মতাদর্শিক বিভ্রান্তির মধ্যেও লোকবাদী ও গণতান্ত্রিক বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে স্বাধীন পূর্ব বাংলার রাজনীতি গড়ে তুলেছিল। যুদ্ধ কিছু বেশী কাল স্থায়ী হলে যে, বামপন্থীদের নেতৃত্বে জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের স্বাধীন ও ঐক্যবদ্ধ ধারা গড়ে উঠত তেমন সম্ভাবনা ছিল খুব বেশী। কিন্তু ১৯৭১-এর ডিসেম্বরে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তানের পরাজয়ের মাধ্যমে ১৬ ডিসেম্বর যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটল। ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হল। ফলে পূর্ব বাংলা স্বাধীন হল। সেই সঙ্গে এই ভূখণ্ডে শেষ হল কমিউনিস্ট রাজনীতির ঐতিহাসিক ভূমিকা।

কমিউনিস্ট রাজনীতি এ দেশে আপাত দৃষ্টিতে ব্যর্থ হলেও তা একটা যুগান্তকারী ভূমিকা সম্পন্ন করেছিল বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের বিকাশে এবং সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে বাঙ্গালীর লোকবাদী বা সেকিউলার জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেতনার উন্মেষ সাধনে। এ ক্ষেত্রে ষাটের দশকে মার্কসবাদী ধারায় বিকশিত ছাত্র-যুব শক্তির ভূমিকা ছিল অপরিমেয়ভাবে মূল্যবান। আবার মার্কসবাদী তত্ত্বের কারণেই তার মধ্যে এমন এক আত্মদ্বন্দ্ব ও সঙ্কট জন্ম দেয় যা তাকে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে নিয়ে যাবার পথে বাধা হয়। এই বিষয়ের উপর এখন আমি সংক্ষিপ্ত আলোচনা করব।
 
কমিউনিস্ট রাজনীতি ও জাতীয়তাবাদের বিকাশ


বাংলাদেশে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের উদ্ভব ও বিকাশের প্রাথমিক ভিত্তি রচনা করেছিল ভাষা আন্দোলন। এটা ছিল পাকিস্তানের অবাঙ্গালী শাসক শ্রেণী কর্তৃক বাঙ্গালী জাতিসত্তার মর্যাদা ও স্বাতন্ত্র্য বোধের উপর আঘাতের প্রতিক্রিয়া। কিন্তু এর ফলে বাঙ্গালীর জাতি চেতনার জাগরণ ঘটলেও বাঙ্গালীর স্বতন্ত্র জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত করার ক্ষেত্র মার্কসবাদ ও কমিউনিস্ট রাজনীতির ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এটা ঠিক যে, পঞ্চাশের দশকে ২১ দফা এবং ষাটের দশকে ৬ দফা পূর্ব বাংলার বাঙ্গালী জনগণের মনে পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্বাতন্ত্র্য ও অধিকার সম্পর্কে চেতনাকে প্রবল করে এবং পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলকে একটি সংহত রূপ দান করে। কিন্তু মনে রাখা দরকার যে, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন এবং জাতীয়তাবাদ একে অপরের পরিপূরক হলেও দু’টি ভিন্ন প্রপঞ্চ। বিশেষত পূর্ব বাংলার ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিমেয়।

কারণ ১৯৪৭-এ ধর্ম-সাম্প্রদায়িক চেতনার ভিত্তিতে অখণ্ড বাংলা ও বাঙ্গালী জাতি বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান ও ভারত এই দুই পৃথক রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়। ফলে পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন চেতনার সঙ্গে ধর্ম-সাম্প্রদায়িক চেতনার বিরোধ নাও দেখা দিতে পারে। এমন কি অবাঙ্গালী মুসলিম শাসক শ্রেণীর সঙ্গে স্বার্থগত সংঘাতের কারণে পূর্ব বাংলার জনগণ ধর্ম-সাম্প্রদায়িকতাকে অক্ষুণ রেখেই নিজেদের জন্য একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র চাইতে পারত। সেক্ষেত্রে পূর্ব বাংলার বাঙ্গালী মুসলমানের আর একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন আসতে পারত।

তবে ২১ দফা ও ৬ দফা উভয় কর্মসূচীতেই লাহোর প্রস্তাবকে স্বায়ত্তশাসন দাবীর মূল ভিত্তি হিসাবে উল্লেখ করা হয়। লাহোর প্রস্তাবের মূল ভিত্তি যে, ধর্মীয় দ্বি-জাতিতত্ত্ব ছিল তা আমরা জানি। রাজনৈতিক কৌশল হিসাবে এটা সঠিক হলেও এই যুক্তি বাঙ্গালী জাতির লোকবাদী রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি রচনা করে না। তবে এটা নিশ্চয় স্বায়ত্তশাসন চেতনার এমন এক রক্ষাপ্রাচীর গড়তে পারে যার আড়ালে লোকবাদী বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটতে পারে। আর এই পরবর্তী কাজের জন্য একটি লোকবাদী দর্শনের প্রয়োজন।

ভাষা আন্দোলন ও চেতনা লোকবাদী দর্শনের ভিত্তি রচনায় বিশাল ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু শুধু ভাষা চেতনা দর্শনের প্রয়োজন পূরণ করতে পারে না। এ দেশে জন চেতনাকে ধর্ম-সাম্প্রদায়িক চেতনার নিগড়মুক্ত করে বাঙ্গালী জাতীয়তাবোধের উন্মেষের জন্য একটি শক্তিশালী লোকবাদী দর্শনের প্রয়োজন ছিল। সেটা ছিল মার্কসবাদ এবং কমিউনিস্ট রাজনীতি। এই রাজনীতির ফলে জনগণ বিশেষত শিক্ষিত জনগোষ্ঠী লোকবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হত। এর ফলে সাম্প্রদায়িক চেতনা ভেঙ্গে পড়ত এবং বাঙ্গালীর উপর পশ্চিমাদের জাতিগত নিপীড়নের ঐ কালটাতে বাঙ্গালীর নিকট বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের আবেদন প্রবল হয়ে উঠত। বিশেষ করে ষাটের দশকে যখন আইয়ূব সরকার বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নবতর উত্থান ঘটল তখন মার্কসবাদ এবং জাতীয়তাবাদের মধ্যে বিজড়নের মধ্য দিয়ে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ এবং জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেতনা দ্রুতবেগে মাথা তুলে দাঁড়াল।

অন্য দিকে শুধু নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে এবং নির্বাচনের রাজনীতির মাধ্যমে এমন একটি জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা ছিল অসম্ভব ব্যাপার। এর জন্য প্রয়োজন ছিল সশস্ত্র সংগ্রাম। এই সংগ্রাম গড়ে তোলার উপযোগী একটা পদ্ধতিও ছিল মার্কসবাদ ও কমিউনিস্ট রাজনীতিতে। সুতরাং জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনেও এই রাজনীতির প্রভাব হল বিপুল।

কিন্তু তত্ত্বগতভাবে মার্কসবাদের ভিত্তি হল সর্বহারার একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য শ্রেণী সংগ্রামের ধারণা। মার্কসবাদের লক্ষ্য জাতি-রাষ্ট্র  প্রতিষ্ঠা নয় বরং শ্রেণীহীন সমাজ তথা কমিউনিজম প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শ্রমিক শ্রেণীর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। মার্কসবাদের সশস্ত্র সংগ্রাম এই তত্ত্ব নির্ভর।

আর এখানেই সে কালে মার্কসবাদ এক নিদারুণ সঙ্কট সৃষ্টি করে। মার্কসবাদ তার লোকবাদী চেতনা মাধ্যমে প্রথম পর্যায়ে জাতীয়তাবাদের চেতনা গড়লেও পরবর্তী পর্যায়ে তার বিরুদ্ধে দাঁড়াত। তৎকালীন বামপন্থী জাতীয়তাবাদীদেরকে আমরা আধা মার্কসবাদী বলতে পারি যাদের নিকট একটি ন্যায় বিচার ও সুষম সমাজ প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি হিসাবে সমাজতন্ত্রের আবেদন থাকরেও শ্রমিক শ্রেণীর একনায়কত্ব বা নেতৃত্ব এবং মার্কসীয় শ্রেণী সংগ্রামের বিশেষ কোনও আবেদন ছিল না। বিশেষত মার্কসবাদের বিভিন্ন তাত্ত্বিক সূত্রের বিশুদ্ধতা রক্ষার তাগিদ তাদের ছিল না অথবা থাকলেও তা খুব সামান্য ছিল। কিন্তু যারা মার্কসবাদী হয়ে উঠত তারা ক্রমে জাতীয়তাবাদ এবং জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা বাদ দিয়ে শ্রেণী সংগ্রামের মাধ্যমে শ্রমিক শ্রেণীর একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার নামে মার্কসবাদের অনুশীলনে চলে যেত।

ছাত্র তরুণরা ছিল তত্ত্বে কাঁচা অথবা মার্কসবাদে দীক্ষা সম্পূর্ণ হতে তাদের অনেক সময় নিত। কিংবা বয়সের কারণেও তাদের মন ছিল অনেক সজীব, বাস্তব থেকে শেখার ও বোঝার তাড়না তাদের মধ্যে ছিল প্রবল। ফলে তারা জাতীয়তাবাদী হত। কিন্তু নেতৃত্ব আসত এক দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তৈরী হয়ে। ফলে তাদের মনে জাতীয়তাবাদের কোনও আবেদন তো থাকতই না বরং তারা আন্তর্জাতিকতাবাদী দর্শন মার্কসবাদের অনুসারী হয়ে জাতীয়তাবাদকে দেখতে পেত তাদের মার্কসবাদী মতাদর্শের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বা শত্রু হিসাবে। অথচ এই নেতৃত্বের প্রভাব বলয়ে প্রকৃত লোকবাদী জাতীয়তাবাদের প্রবল স্রোতটা জেগে উঠছিল প্রবল ও বেগবান সামাজিক শক্তি হিসাবে ছাত্র-যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে। এদের বাদ দিবারও উপায় ছিল না। আবার তাদের আকাঙ্ক্ষা ও প্রয়োজনের প্রতিনিধিত্ব করাও সম্ভব ছিল না এই প্রক্রিয়াজাত নেতৃত্বের পক্ষে। ফলে তারা ষাটের দশকে তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে অমন সব প্রতারণামূলক আচরণ এবং তাদের বিরুদ্ধে চক্রান্তের পথ বেছে নেয়।

এইভাবে মার্কসবাদ এমন এক অন্তর্দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে যা বামপন্থী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় নেয়। ঐ কালে জাতীয়তাবাদের জাগরণে যারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তারা মার্কসবাদী পরিচয় ব্যবহার করলেও তাদেরকে প্রকৃত মার্কসবাদী বলা যায় না। যেমন সিরাজ শিকদার। সে যুগে বিশ্বজুড়ে প্রসারমান প্রবল মতাদর্শ হিসাবে মার্কসবাদকে ব্যবহার করে তিনি বাঙ্গালীর একটি জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। তাঁর পথ ও পদ্ধতি ভুল ছিল, কিন্তু লক্ষ্য মূলত সঠিক ছিল। এমন একটি লক্ষ্য নিয়ে আমিও দীর্ঘকাল ধরে কাজ করেছিলাম। সে কালে আমার সামনে মার্কসবাদের বিকল্প কোনো মতাদর্শ বা তত্ত্ব না থাকায় আমিও তাকে ব্যবহার করে এগিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু মার্কসবাদের প্রতি অন্ধত্ব ছিল না বলে এ দেশে লোকবাদী জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে এগিয়ে নেবার ক্ষেত্রে আমি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ দিতে পেরেছিলাম। কিন্তু যে মতবাদ নিয়ে আমি এগোতে চেয়েছিলাম এ দেশের প্রেক্ষিতে তার অনুপযোগিতার কারণে আমিও শেষ পর্যন্ত আর এগোতে পারি নাই, বরং কমিউনিস্ট রাজনীতির ভ্রান্ত্রি এবং নেতৃত্বের চক্রান্তের শিকার হই।

আসলে বাঙ্গালীর একটি উন্নত, আধুনিক, লোকবাদী এবং গণতান্ত্রিক জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য দরকার ছিল একটি বিপ্লবী জাতীয় গণতান্ত্রিক বুর্জোয়া দর্শনের। সেটা সে কালে না থাকায় আমরা কমিউনিস্ট দর্শন দিয়ে সে কাজটা করতে চেয়েছিলাম। অথচ সেটা সম্ভব ছিল না। এ দেশের সমস্যাটা ছিল একটা উৎপাদনশীল বুর্জোয়া অর্থনীতি গঠনের এবং একটি জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার। মার্কসীয় সমাজতন্ত্রের নামে রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ এবং আন্তর্জাতিকতাবাদের দর্শন মার্কসবাদ দিয়ে সেটা সম্ভব ছিল না। অন্যদিকে নিয়মতন্ত্র ও নির্বাচনের ধারায় গড়ে উঠা আওয়ামী লীগের তেমন একটি বিপ্লবী ও উৎপাদনশীল বুর্জোয়া দর্শন এবং চরিত্র ছিল না বলে একটি লোকবাদী ও গণতান্ত্রিক জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তারও ব্যর্থতা ঘটেছে। ফলে দিল্লীর সাহায্য নিয়ে তা বাংলাদেশ নামে যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করল তা প্রকৃতপক্ষে জাতি-রাষ্ট্র হবার পরিবর্তে ধর্ম-সাম্প্রদায়িক মর্মবস্তুকেই রক্ষা করল এবং ক্রমে আর একটি পাকিস্তান রূপেই তা আবির্ভূত হল। তবু যে ঘটনাটি বিপুলভাবে তাৎপর্যপূর্ণ তা হল ১৯৭১-এর জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ যার মূল প্রেরণা  ছিল বাঙ্গালীর জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। বাংলাদেশ-রাষ্ট্র যার নেতৃত্বেই প্রতিষ্ঠিত হোক, তার ব্যর্থতা যেমনই হোক ঐ প্রেরণাটাই এই জাতির সবচেয়ে বড় অর্জন। কারণ বাংলাদেশ-রাষ্ট্র জন্মগতভাবে ঐ প্রেরণার কাছে অঙ্গীকারাবদ্ধ। আর এখানেই ষাটের দশকের প্রজন্মের ঐতিহাসিক সাফল্য।

বস্তুত ষাটের দশকে এমন এক প্রজন্মের উত্থান ঘটে যার ভূমিকার তাৎপর্য না বুঝলে আমরা বাংলাদেশ-রাষ্ট্রের উদ্ভবের মূল শক্তিটাকেই বুঝতে পারব না। আইয়ূব-বিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এই প্রজন্মের উত্থান। এবং এর প্রধান শক্তি ছিল সে কালের বাম ছাত্র আন্দোলন। আরও নির্দিষ্ট করে বললে বিপ্লবী জাতীয়তাবাদী আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বিকশিত পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন এবং তার মধ্য থেকে উত্থিত যুব শক্তি।

এই আকাঙ্ক্ষার সামনে থেকেছেন বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন ছাত্র নেতা, যাঁদের সবার ভূমিকা যে সব সময় এই আকাঙ্ক্ষার যথাযথ প্রতিফলন ঘটিয়েছে তা নয়। তবু ছাত্র-যুব আন্দোলনের সামনে থেকে এই আন্দোলনের অন্তর্গত আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিনিধিত্ব করে তাঁদের অন্তত একটা পর্যায় পর্যন্ত অগ্রসর হতে হয়েছে। তাঁদের কারো কারো ভূমিকা কখনও প্রশ্ন সাপেক্ষ হয়েছে বা কখনও প্রচলিত কমিউনিস্ট ও বাম রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকার অধীনস্থ বা অংশ হয়েছে। তবু তাঁরা যে ছাত্র-যুব আন্দোলনকে নেতৃত্ব দিয়েছেন সেই আন্দোলন অপ্রতিরোধ্যভাবে এগিয়ে গেছে একটি বেগবান ও বর্ধমান স্রোতধারার মত। এই ধারার সামনে প্রথমে থেকেছেন কাজী জাফর আহমদ এবং তারপর হায়দার আকবর খান রনো, রাশেদ খান মেনন, আবদুল মান্নান ভূঁইয়া, মোস্তফা জামাল হায়দার এবং মাহবুব উল্লাহ প্রমুখ। এঁদের কারো ভূমিকা কখনও বিতর্কিত হয়েছিল যে কথা একটু আগেই বলেছি। কিন্তু এদের দিয়েই ঐ ধারাটিকে বিচার কারাটাও একটা ভুল যে ভুলটা অনেকেই করেন। প্রকৃতপক্ষে ঐ ধারা এগিয়ে গিয়েছিল বাঙ্গালীর জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অনেক সময়ই অস্ফুট চেতনা নিয়ে। কিন্তু চেতনার জগতে যত অসপষ্টতা ও বিভ্রান্তিই থাক জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যটি ছিল ধ্রুব নক্ষত্রের মত স্থির, অচঞ্চল।

এই ধারাটি ছিল প্রকৃতপক্ষে নেতৃত্বহীন। অর্থাৎ ষাটের দশকে এমন এক বিপ্লবী তরুণ প্রজন্মের প্রবল উত্থান ঘটেছিল যাকে নেতৃত্ব দিবার মত সামাজিক-রাজনৈতিক শক্তি ছিল না। কিন্তু নেতৃত্ব দিবার জন্য যে জ্ঞান-অভিজ্ঞতা-অর্থ-প্রতিষ্ঠা ইত্যাদির প্রয়োজন সে সব এই প্রজন্মের ছিল না। যে বাম ধারায় তার উদ্ভব ও অবস্থান সেখানকার নেতৃত্ব ছিল তার প্রতি বৈরী কিংবা এই প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষার  সঙ্গে তার কোনও সঙ্গতি ছিল না। ফলে প্রবল শক্তি থাকলেও এই প্রজন্ম চতুর্দিকের রাষ্ট্রীয়-সামাজিক-রাজনৈতিক বাধা, চক্রান্ত ও আক্রমণের মুখে ছিল অনেকটাই অসহায়। তবু এই প্রজন্মই গড়ে তুলেছিল বাঙ্গালী জনগণের জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের রাজনীতি এবং অনিবার্য করেছিল বাঙ্গালীর ইতিহাসের প্রথম জাতীয় যুদ্ধ।

কিছু পুনরুক্তি হলেও বলব যে, জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ অনিবার্য করায় আওয়ামী লীগ এবং ৬ দফারও নিশ্চয় একটা ভূমিকা ছিল। কিন্তু সেই ভূমিকাটা মৌল ছিল না, বরং ছিল সহায়ক। ৬ দফা ছিল মূলত পূর্ব বাংলার উদীয়মান মধ্যবিত্ত এবং বিকাশকামী বুর্জোয়ার কর্মসূচী। এটা ঠিক যে, ৬ দফায় বাঙ্গালী জাতির স্বাধিকার চেতনা প্রতিফলিত হয়েছিল। কিন্তু জাতি কি শুধু মধ্যবিত্তকে নিয়ে? কৃষক, শ্রমিক, নারী এবং বিভিন্ন পেশা ও গোষ্ঠীর জনগণকে নিয়ে যে জাতি গঠিত তাদের স্বার্থ ও আকাঙ্ক্ষার কতটুকু প্রতিফলন সেখানে ছিল যে, তারা এই কর্মসূচীকে বাস্তবায়নের জন্য যুদ্ধের মত এক প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী ঘটনা ঘটাতে এগিয়ে যাবে? বস্তুত ৬ দফা এমন এক কর্মসূচী যেখানে ব্যাপক জনগণের নিজস্ব কোনও ভূমিকা রাখার অবকাশ ছিল না। এটা মধ্যবিত্তের এমন এক কর্মসূচী যাতে জনগণের সমর্থন থাকলেও গোটা নেতৃত্ব এবং উদ্যোগে জনগণের ব্যাপকতর অংশের অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল না। ফলে এটা ছিল মূলত সমাজের উপর তলার আন্দোলনের কর্মসূচী, একটি নিয়মতন্ত্র ও নির্বাচনের কর্মসূচী যাকে জনগণ সমর্থন দিবে এবং নির্বাচন এলে তার সপক্ষে ভোট দিয়ে তার নেতাদের ক্ষমতায় পাঠাবে।

আর এই নিয়মতন্ত্রের পথ বেয়ে কি লোকবাদী চেতনা ভিত্তিক বাঙ্গালীর জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব ছিল? ৬ দফা বড় জোর একটি শক্ত এককেন্দ্রিক পাকিস্তানের বদলে একটি ফেডারেল পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হত। হয়ত সময়ের পথ ধরে এক সময় মূলত আপোসের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তান আলাদা হয়ে যেত এবং এখানে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হত। কিন্তু সেটা কী হত? মূল লাহোর প্রস্তাবের বাস্তবায়ন অর্থাৎ আর একটি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা। হাঁ, বাঙ্গালী পরিচিতি বোধও একটা থাকত বৈকি। তবু তার প্রধান দিকটা হত মুসলিম পরিচিতি বোধ। অর্থাৎ সেটা বাঙ্গালীর রাষ্ট্র হত না। হত মুসলমানদের রাষ্ট্র। বড় জোর বলা যেত বাঙ্গালী মুসলমানের রাষ্ট্র। অর্থাৎ ১৯৪৭-এ ভারতবর্ষ দুই ভাগ হয়েছিল। এবার হত তিন ভাগ। তবে একই মুসলমান সাম্প্রদায়ের দু’টো আলাদা রাষ্ট্র হত।

কিন্তু ’৭১-এর জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ সেই অবস্থাকেই রাখে নাই। নয় মাসের যুদ্ধে বাঙ্গালীর জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেতনার আঘাতে লাহোর প্রস্তাব এবং পাকিস্তানের গোটা ধর্মীয় ভাবাদর্শিক চেতনা এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামো তছনছ হল। এটা ঠিক যে, ভারত-রাষ্ট্রের সহায়তায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বে বাংলাদেশ-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে পাকিস্তানের ভেঙ্গে পড়া রাষ্ট্রীয়-সামাজিক ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে পুনর্বিন্যস্ত করা হল এবং সেটা করা হল গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এবং সেকিউলার বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের কথা বলেই।

এ কথাটা বুঝলেই চলবে যে, ৬ দফা কোনো অর্থেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং ভাবাদর্শিক কাঠামো ভাঙ্গার কর্মসূচী ছিল না, তবে এই কাঠামোকে দুর্বল করার কর্মসূচী ছিল। এর সুযোগ নিয়েছিল ষাটের দশকের গণতান্ত্রিক বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী আকাঙ্ক্ষার প্রতিভূ তরুণ প্রজন্ম, সে কালের বামপন্থী ছাত্র-যুব শক্তি।

এই ছাত্র-যুব শক্তি সঙ্গত কারণেই ৬ দফাকে সমর্থন করে  নাই। কারণ ২১ দফার মত এতে জনগণের উৎপাদনশীল অংশগুলির কর্মসূচী ও দাবীর সমাবেশ না ঘটানোয় ৬ দফা ছিল এমন এক মধ্যবিত্ত ও বুর্জোয়া বিকাশের কর্মসূচী যা হবে উৎপাদন বিমুখ, লুটেরা এবং সাম্রাজ্যবাদের দালাল অর্থাৎ যা হবে চরিত্রে লুম্পেন এবং মুৎসুদ্দি। এমন এক লুম্পেন ও মুৎসুদ্দি শ্রেণীর প্রয়োজন পূরণের জন্য সোহরাওয়ার্দী ১৯৫৬ কিংবা এমন কি তারও পূর্ব থেকেই আওয়ামী লীগের যে যাত্রাপথ নির্মাণ করছিলেন সেই পথ ধরে এগিয়ে এসে ১৯৬৬-তে সোহরাওয়ার্দীর শিষ্য মুজিব ৬ দফা প্রদান করেন। তবু এর একটা প্রগতিশীল দিক ছিল পাকিস্তানকে দুর্বল করার ক্ষেত্রে, যে কথাটি ইতিপূর্বে বলেছি।

কিন্তু ন্যাপের মূল নিয়ন্ত্রণ যাদের হাতে ছিল সেই কমিউনিস্টরাও ছিল জাতীয় গণতান্ত্রিক বুর্জোয়া শ্রেণী গঠনের কর্মসূচীর বিরোধী। বস্তুত উৎপাদনশীল ও শ্রমজীবী জনগণকে সাথে নিয়ে যে বুর্জোয়ার উদ্ভব তা-ই তো জাতীয় গণতান্ত্রিক বুর্জোয়া হতে পারে। কিন্তু মার্কসীয় মতবাদের কারণে কমিউনিস্ট নেতৃত্ব ছিল এই বুর্জোয়ার নেতৃত্ব বিরোধী। অথচ এ দেশের বাস্তবতায় এমন এক বুর্জোয়া শ্রেণীর নেতৃত্ব ছাড়া বাঙ্গালীর লোকবাদী ও গণতান্ত্রিক জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় তথা স্বাধীন বুর্জোয়া অর্থনীতি গড়া সম্ভব ছিল না। মওলানা ভাসানী ছিলেন এ দেশের বাস্তবতায় তেমন এক জাতীয় বুর্জোয়া নেতা। কিন্তু কমিউনিস্টরা জাতীয় বুর্জোয়া নেতৃত্বকে তার ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করতে দিতে না চাওয়ায় তাঁকেও তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করতে দেয় নাই।

কিন্তু বিপ্লবী ছাত্র-যুব শক্তিকে রোধ করা যায় নাই। কারণ তাদের মূল প্রেরণা ছিল বাঙ্গালীর লোকবাদী জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং সেই সঙ্গে একটি জাতীয় গণতান্ত্রিক বুর্জোয়া বিপ্লবের মাধ্যমে উৎপাদনশীল স্বাধীন বুর্জোয়া অর্থনীতি সংগঠন করা। এই প্রেরণা থেকে এসেছিল তাদের জাতীয় জন-গণতান্ত্রিক বিপ্লবের ধারণা। এই প্রেরণা থেকে তাদের ছিল ৬ দফার বিকল্প হিসাবে একটি জাতীয় কর্মসূচীর দাবী, যা তারা সে কালে তাদের নেতৃত্বের নিকট থেকে পায় নাই। এই অবস্থায় এক সময় তারা বাঙ্গালী জাতির স্বাধীন জন-গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কর্মসূচীকেই একমাত্র অবলম্বন করে এগিয়ে যেতে বাধ্য হয়। কিন্তু নিজ নেতৃত্বের নিকট থেকে একটি প্রকাশ্য কর্মসূচীর আড়াল না থাকায় তারা ছিল এক্ষেত্রে অসহায়। একদিকে শেখ মুজিব ও ৬ দফা এবং অপর দিকে সিরাজ শিকদারের অগ্রগমনকে মোকাবিলা করতে গিয়ে এই প্রজন্মের প্রধান অংশটি এক সময় পুরাতন কমিউনিস্ট নেতৃত্বের একাংশের আশ্রয় নেয় এবং এইভাবে ভ্রান্তি এবং নিদারুণ চক্রান্তের শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত ধ্বংস প্রাপ্ত হয়, কিন্তু তার পুর্বে বাঙ্গালীর জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ ঘটিয়ে দেয়। এইভাবে এক ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জন করে। সমগ্র ভারতবর্ষে এই প্রথম জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য এমন বিশাল আয়তনে জনগণের জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হল। এইভাবে ষাটের দশকে বাঙ্গালীর জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এবং ১৯৭১-এ বাঙ্গালী জাতির মুক্তিযুদ্ধ শুধু পাকিস্তানের ধর্মীয় দ্বি-জাতিতত্ত্বের নৈতিক ভিত্তিকে ধ্বংস করে নাই, একইভাবে ভারতের তথাকথিত অসাম্প্রদায়িক ও সেকিউলার একজাতিতত্ত্বের নৈতিক ভিত্তিটাকেও ধ্বংস করল। বস্তুত এই বিষয়টি বুঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে, বাঙ্গালী জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেতনা উপস্থিত ক’রে ষাটের দশকে তরুণ প্রজন্ম শুধু তৎকালীন পূর্ব বাংলার রাজনীতিকে নূতন অভিমুখ দেয় নাই, উপরন্তু সমগ্র উপমহাদেশের রাজনীতিকেও নূতন অভিমুখ দিয়েছে। তরুণ প্রজন্মের ভূমিকার এই তাৎপর্য সপষ্ট করার জন্য এখন আমি উপমহাদেশের দ্বি-জাতিতত্ত্ব এবং এক-জাতিতত্ত্বের ভ্রান্তির দিকে দৃষ্টি দিব।
 
 
বাঙ্গালীর জাতি-রাষ্ট্র বনাম উপমহাদেশের একজাতিতত্ত্ব ও দ্বিজাতিতত্ত্ব


মুসলিম সাম্প্রদায়িক চেতনা সম্ভূত মুসলিম লীগের দ্বিজাতিতত্ত্বের সমালোচনা করার সময় এই সত্যের দিকে অনেক সময়েই দৃষ্টি পড়ে না যে, ভারতের একজাতিতত্ত্ব প্রকৃতপক্ষে হিন্দু সাম্প্রদায়িক চেতনা সম্ভূত। বস্তুত প্রচলিত ধর্মকে বাদ দিলে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ বলে কোনও কিছু থাকে না। কারণ ভারতর্বষ এক জাতির দেশ নয়, বরং বহু জাতির এক উপমহাদেশ।

বহুকাল ধরে ভারতকে এক রাষ্ট্রভুক্ত করেছিল বৈদেশিক আক্রমণকারীদের তরবারী। তাদের সর্বশেষ প্রতিনিধি ছিল ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীরা। বহিরাগত ব্রিটিশ শাসনের অবসান হলে উপমহাদেশের বিভিন্ন জাতিগুলিকে ঐক্যবদ্ধ করার অভ্যন্তরীণ শক্তি হিসাবে প্রচলিত ধর্ম স্থান নিতে পারে। এমন অবস্থায় ঐক্যবদ্ধ ভারতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনে ভারতের দুই প্রধান ধর্ম হিন্দু এবং ইসলাম সামনে চলে আসে। ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতে হিন্দুরা ছিল সংখ্যাগুরু ধর্ম-সম্প্রদায়।এই কারণেও তাদের জন্য ধর্মীয় রাজনীতির পতাকা উড়ানোর প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু স্বাধীন অখণ্ড ভারত-রাষ্ট্র চেতনার মূলে ছিল এই ধর্ম-সাম্প্রদায়িক বোধ।এর প্রতিক্রিয়ায় মুসলমান সম্প্রদায় হিন্দু ভারত-রাষ্ট্রের বিপরীতে মুসলমান ভারত-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাইল। পাকিস্তান হল সেই দাবীর রূপায়ন।এইভাবে এক ভারত ছিল যেমন হিন্দু রাষ্ট্র চেতনার প্রকাশ তেমর দুই ভারত অর্থাৎ ভারত এবং পাকিস্তান ছিল মুসলিম রাষ্ট্র চেতনার প্রকাশ। আর এই উভয় অলোকবাদী এবং মধ্যযুগীয় ধর্ম চেতনার তলে চাপা পড়ে গেল ভারতের জাতিসত্তাগুলির প্রকৃত লোকবাদী ও আধুনিক রাষ্ট্র ও সমাজ চেতনা। এর ফলে ১৯৪৭-এ ভারত ভাগ হল ধর্মের ভিত্তিতে। পাকিস্তান হল মুসলমান সম্প্রদায়ের রাষ্ট্র। কিন্তু ভারত-রাষ্ট্র নিজেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অসাম্প্রদায়িক ও লোকবাদী বা সেকিউলার রাষ্ট্র হিসাবে ঘোষণা করলেও চেতনা ও অন্তর্বস্তুতে এটি হল হিন্দু রাষ্ট্র। এইভাবে উভয় রাষ্ট্রের প্রধান নিয়ামক হয়ে রইল প্রাচীন ধর্মবোধ।

ষাটের দশকে পূর্ব বাংলায় বাঙ্গালীর স্বাধীন জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেতনা নিয়ে জেগে ওঠা তরুণ প্রজন্ম মুসলিম ও হিন্দু রাষ্ট্র চেতনার বিপরীতে এবং বাইরে এক ভিন্ন এবং পুরোপুরি লোকবাদী রাষ্ট্র চেতনা উপস্থিত করল। ’৭০-এর মধ্যে এই চেতনার বিস্তার এমনভাবে হল যে, পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়ে ’৭১-এ আওয়ামী লীগ এই চেতনাকে ব্যবহার করতে বাধ্য হল। ভারত-রাষ্ট্র তথা দিল্লী সরকারও এটাকে ব্যবহার করতে বাধ্য হল।

কিন্তু এটা ভারত-রাষ্ট্রের জন্য এক অতি বিপজ্জনক ঘটনা। এবং পাকিস্তানের জন্যও। কারণ বাঙ্গালী জাতির  রাষ্ট্র হিসাবে পূর্ব বাংলায় বাংলাদেশ-রাষ্ট্রের উদ্ভব ভারত ও পাকিস্তান উভয় রাষ্ট্রের আদর্শিক ভিত্তিতে আঘাত হানে। এই কারণে উভয় রাষ্ট্রের জন্যই প্রয়োজন ছিল বাঙ্গালী জাতির লোকবাদী জাতি চেতনার যথাযথ বিকাশের আগেই বাঙ্গালী জাতির জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের অবসান ঘটানো। বিশেষ করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ভারত-রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত বাঙ্গালী জাতিসত্তার সামনেও একটি বিকল্প উপস্থিত করছিল। প্রকৃতপক্ষে ’৭১-এর জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ উভয় বাঙ্গালীর ঐক্যবদ্ধ জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের অন্তর্বস্তুকে ধারণ করছিল। বিশেষ করে দিল্লীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে বামপন্থীদের নেতৃত্বে স্বাধীনভাবে বিকশিত জাতীয় মুক্তিযুদ্ধে উভয় বাংলার বাঙ্গালীর ঐক্যের রূপটি মূর্ত হবার দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। এই স্বাধীন ধারায় জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ বিকশিত হয়ে উঠলে বাঙ্গালীর জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রথম পর্যায়টি হত পাকিস্তানের কবল থেকে পূর্ব বাংলার মুক্তি এবং দ্বিতীয় পর্যায়টি অনিবার্যভাবে হয়ে উঠত ভারত-রাষ্ট্রের কবল থেকে পশ্চিম বাংলা ও ত্রিপুরার মুক্তি। আর এইভাবে এক সময় মূর্ত হয়ে উঠত তিন খণ্ডে বিভক্ত বাঙ্গালী জাতির ঐক্যবদ্ধ গণতান্ত্রিক ও লোকবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বাস্তবতা। এই রকম একটি বাস্তবতা পাকিস্তান ও ভারত উভয় রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক ছিল। তাছাড়া এই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী শক্তির বিকাশও ঘটছিল দ্রুতগতিতে, যা উভয় রাষ্ট্রের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থাকে বিপন্ন করতে পারত। সুতরাং জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের দ্রুত সমাপ্তির প্রয়োজনে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হল। যুদ্ধে পাকিস্তানের হার হলে ভারত-রাষ্ট্র তার আশ্রয়ে ও নিয়ন্ত্রণে সংরক্ষিত আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন করে দিয়ে গেল। এইভাবে বাঙ্গালী জাতিরও একটা জয় হল ঠিক কিন্তু তার চেয়েও  অনেক বেশী জয় হল দিল্লীর।

এইভাবে একটা প্রজন্ম যারা স্বাধীন পূর্ব বাংলা তথা স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের রাজনীতিটা গড়ে তুলল তাদের একটা বিজয় হল ঠিকই কিন্তু পরাজয়ও হল। এই রাষ্ট্রের নেতৃত্ব তাদের হাতে এল না। ফলে যে রাজনীতিটা তারা গড়ল তাকে তার পরিণতিতে নিতে পারল না। দিল্লী সফল হল। একটা লোকবাদী বা সেকিউলার জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার রাজনীতি এবং সেই রাজনীতির জন্য অপরিহার্য জাতীয় জন-যুদ্ধের রাজনীতি আওয়ামী লীগ গড়ে তোলে নাই। ফলে তা আনুষ্ঠানিকভাবে এবং সংবিধানে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ, লোকবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ইত্যাদি বললেও করল ভিন্নটা। পাকিস্তানের রাজনৈতিক, ভাবাদর্শিক, রাষ্ট্রীয়, অর্থনৈতিক কাঠামো পুনর্বিন্যস্ত অথবা পুনরুজ্জীবিত করার কাজটাকেই মুজিব এগিয়ে নিলেন পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে এসে। কিন্তু জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে তাঁর এবং তাঁর দলের নাম জড়িয়ে যাওয়ায় তাঁর সঙ্কটও ছিল। এটা তাঁকে এমন এক আত্মদ্বন্দ্ব দিয়েছিল যা থেকে মুক্ত হওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। এই আত্মদ্বন্দ্ব নিয়ে তিনি বেশীদূর এগোতে পারেন নাই। ফলে তাঁকে প্রাণ দিয়ে এই দ্বন্দ্ব মীমাংসার পথ করে দিতে হয়েছে। ক্রমে বাংলাদেশ অনেকাংশে হয়ে উঠেছে একটি খণ্ডিত পাকিস্তান।

কিন্তু রয়ে গেছে নয় মাসের জাতীয় যুদ্ধের চেতনা যে চেতনাকে গড়ে তুলেছিল ষাটের দশকের বিপ্লবী প্রজন্ম নিজেদের ঘাম ও রক্ত দিয়ে। এই চেতনা বাংলাদেশ-রাষ্ট্রকে পুনরায় তার লক্ষ্যাভিমুখে নিতে বাধ্য যে লক্ষ্য থেকে একদিন পথভ্রষ্ট হয়েছিল এ দেশের সংগ্রাম। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতা, কমিউনিস্ট রাজনীতির ভ্রান্তি ও নেতৃত্বের চক্রান্ত এবং দিল্লীর কূটকৌশল ইত্যাদি কারণে সেই সংগ্রাম সে দিন পথভ্রষ্ট হয়েছিল। কিন্তু ছাব্বিশ বৎসরে বাঙ্গালী জাতি অনেক পরিপক্ব হয়েছে। এক অসচেতন জাতিসত্তা  থেকে সচেতন জাতির বিকাশের পথে তার অনেকটা অগ্রগমন ঘটেছে। এটা শুধু এই বঙ্গেই নয়, অপর বঙ্গেও তার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।

কিন্তু বাঙ্গালী জাতির অগ্রগমনের মূল শক্তিটা, নেতৃত্বকারী শক্তিটা আজো রয়ে গেছে এ দেশের ষাটের দশকের সেই বিপ্লবী প্রজন্মের ভিতর। যে কাজটি সেদিন তারা নিজেদের অনভিজ্ঞতা ও বিভ্রান্তির কারণে সম্পন্ন করতে পারে নাই সে কাজটি সম্পন্ন করার মধ্য দিয়েই তারা তাদের ঐতিহাসিক ভূমিকা পালনের কাজটি সম্পূর্ণ করতে পারে। তাদের অসমাপ্ত ভূমিকার সমাপ্তির কাজটি একটি ঐতিহাসিক অনিবার্যতা হয়েই রয়েছে। তবে এর জন্য প্রয়োজন আজ তাদের আত্মানুসন্ধান। আর তখনই এই আত্মানুসন্ধান জাতিরও আত্মানুসন্ধানে পরিণত হবে।


 
লেখক ঃ সম্পাদক, বঙ্গরাষ্ট্র

রচনা ঃ ৭ এপ্রিল - ১৮ এপ্রিল, ১৯৯৭

অনলাইন ঃ  ১৩ মার্চ, ২০০৯