Banner
বাংলাদেশে গণতন্ত্রের সমস্যা -- শামসুজ্জোহা মানিক

লিখেছেনঃ শামসুজ্জোহা মানিক , আপডেটঃ February 10, 2015, 12:00 AM, Hits: 14576

 

(২০০৭-এর ১২ জানুয়ারীতে ফখরুদ্দীন আহমদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিযুক্ত হবার পর থেকে দেশের প্রচার মাধ্যম সমূহে যেসব রাজনৈতিক বিতর্ক চলছিল নিবন্ধটি তার প্রেক্ষিতে লিখা হয় এবং ওয়েবসাইট বঙ্গরাষ্ট্র-এ ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০০৮ তারিখে প্রকাশিত হয়। - বঙ্গরাষ্ট্র)

 


গণতন্ত্রের স্বরূপ সন্ধান


আমাদের দেশে গণতন্ত্রের মূল সমস্যাটা কোনখানে? ১৯৯১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত দলীয় শাসনের অভিজ্ঞতা এবং ২০০৭-এর ১১ জানুয়ারীর পট পরিবর্তনের পর এই প্রশ্ন নূতন করে যে কোন সচেতন মানুষের মনে আসা উচিত। এই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের কঠিন কাজটা বাদ দিয়ে যারা দ্রুত একটা নির্বাচনের জন্য ব্যগ্র, এবং ভাবছেন বা বলছেন যে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলেই দেশ পুনরায় গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করবে তারা যে অভিজ্ঞতা থেকে কোন শিক্ষা নিতে চান না সে কথা নিঃসংশয়ে বলা যায়। তাদের কাছে নির্বাচন আর গণতন্ত্র সমার্থক।

 

বস্তুত নির্বাচনমূলক শাসন ব্যবস্থাকেই যারা গণতন্ত্র হিসাবে চালাতে চান তারা গণতন্ত্রের মর্মবস্তু বা সারসত্তা সম্পর্কে কোন ধারণা রাখারই প্রয়োজন মনে করেন না। তাদের মত মানলে কি ইংল্যান্ড বা গ্রেট ব্রিটেনকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলা যাবে? কারণ ইংল্যান্ডের রাষ্ট্র প্রধান অনির্বাচিত বংশগত রাজা বা রাণী। রাষ্ট্রের পরিচয়ে ইংল্যান্ড বা গ্রেট ব্রিটেন আদৌ প্রজাতন্ত্র নয়, বরং রাজতন্ত্র। এই জন্য তাকে বলা হয় ইউনাইটেড কিংডম বা যুক্তরাজ্য। কিন্তু রাষ্ট্র শাসনের একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে বংশগত রাজতন্ত্র থাকলেও ব্রিটেনকে কেউ স্বৈরতন্ত্র বা রাজতন্ত্র শাসিত রাষ্ট্র না বলে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রই বলে। অথচ সেখানে নির্বাচিত সরকার বা জন-প্রতিনিধিরা রাজা বা রাণীর নামেই দেশ শাসন করে। সরকার পরিচালনায় সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের সমর্থন যথেষ্ট নয়, সেই সঙ্গে অপরিহার্য রাজা বা রাণীর সম্মতি বা অনুমোদন। উপরন্তু সংসদ বা পার্লামেন্টের দুইটি কক্ষের একটি হাউজ অব্‌ কমন্স নির্বাচিত জন-প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত হলেও, উচ্চতর কক্ষ হিসাবে পরিগণিত অপর কক্ষ হাউজ অব লর্ডস মূলত উত্তরাধিকার সূত্রে সামন্ত প্রভুদের বংশধরদের নিয়ে গঠিত।

 

তাহলে কী দাঁড়াল? যে ইংল্যান্ডের গণতন্ত্রকে এ দেশে আদর্শ হিসাবে অনুসরণের চেষ্টা করা হয় সেই ইংল্যান্ড থেকে যদি শিক্ষণীয় কিছু থাকে তবে বলতে হবে যে, নির্বাচনই গণতন্ত্রের সবকিছু নয়। নির্বাচন প্রকৃতপক্ষে গণতন্ত্রের একটি অঙ্গ। তাই নির্বাচন বা ভোট দিলেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয় না। এ ক্ষেত্রে উপমা হিসাবে নির্বাচনকে মানুষের দেহাবরণ বা পোশাকের সঙ্গে তুলনা করা যায়। একটা শিম্পাঞ্জিকে জামা, প্যান্ট, কোট, টাই, জুতা পরালে যেমন তা মানুষ হয়ে যায় না তেমন একটা নির্বাচনমূলক ব্যবস্থা প্রবর্তন করলেই একটা সমাজ বা রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক হয় না।

 

সমাজ মানসে বা সমাজে পশ্চাৎপদ, প্রতিক্রিয়াশীল ও স্বৈরতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির অপ্রতিহত চাষাবাদ এবং রাষ্ট্রে আমলাতান্ত্রিক শাসন বজায় রেখে পাঁচ বৎসর মেয়াদে নির্বাচন দিলে গণতন্ত্রের নামে যে বস্তুটা প্রতিষ্ঠিত হয় তার নমুনা সামরিক শাসন বহির্ভূত কালে আমরা কম দেখলাম না। ব্রিটিশ এবং পাকিস্তানী শাসন কালের কথা বাদ দেওয়া যাক। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর আওয়ামী লীগের প্রথম শাসন কালের প্রায় সাড়ে তিন বৎসর এবং ১৯৯১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত নির্বাচনমূলক দলীয় শাসনের প্রায় পনেরো বৎসর গণতন্ত্রের যে চেহারা আমরা দেখেছি তারপর ঐ শব্দের প্রতি মোহ থাকার কোন কারণ থাকত না, যদি না ইউরোপ-আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়া তথা পাশ্চাত্যের উন্নত ও গণতান্ত্রিক দেশগুলোর দৃষ্টান্ত আমাদের চোখের সামনে থাকত।

 

নির্বাচনমূলক শাসনের যে রূপ আমরা বিগত দিনগুলোতে দেখেছি তাকে গণতন্ত্র না বলে নির্বাচনমূলক স্বৈরতন্ত্র বলাটাই যুক্তিযুক্ত, কিংবা এটাকে যদি গণতন্ত্র বলতেই হয় তবে তার পূর্বে একটা পঙ্গু বা সীমাবদ্ধ শব্দ যোগ করা উচিত। অর্থাৎ এটা পঙ্গু গণতন্ত্র মাত্র। নিকৃষ্ট মানের স্বৈরতা ও ইতরতা দ্বারা অধিকৃত এই পঙ্গু গণতন্ত্র প্রকৃতপক্ষে একটা ইতরতন্ত্র রূপে আমাদের দেশে আবির্ভূত হয়েছে, যা ’৭২ থেকে ’৭৫ পর্যন্ত এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত সময়ে চরম রূপ নিয়ে দেখা দিয়েছিল। একটা নির্বাচন নির্ভর ইতর ও দুর্বৃত্ত শ্রেণীর লোকদের যে একনায়কী শাসন আমরা বার বার এ দেশে দেখেছি সেটাকে আর যা­ই হোক পাশ্চাত্যের গণতন্ত্রের সঙ্গে মিলানো যায় না।

 

অথচ আপাত দৃষ্টিতে পাশ্চাত্যের গণতন্ত্রের দৃষ্টান্ত সামনে রেখে আমাদের দেশে বহুকাল যাবৎ নির্বাচনমূলক শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা করা হয়েছে। কিন্তু স্বৈরতান্ত্রিক সামরিক শাসনের নিকৃষ্টতার তুলনায় নির্বাচিত দলীয় শাসন যে খুব বেশী উৎকৃষ্টতার পরিচয় দিতে পেরেছে তা নয়। বরং কোন কোন ক্ষেত্রে নির্বাচিত দলীয় শাসন সেনা শাসনের চেয়েও অধিকতর অধঃপতিত ও নিকৃষ্ট রূপ নিয়ে আত্মঃপ্রকাশ করেছে।

 

কাজেই এই প্রশ্ন সঙ্গতরূপে করা উচিত, দীর্ঘ কালের প্রয়োগ এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরেও কেন এ দেশে নির্বাচনমূলক দলীয় শাসন একটা উন্নত ও গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার রূপ নিয়ে আত্মপ্রকাশের পরিবর্তে স্বৈরতন্ত্র রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে, ক্রমিক অধঃপতনের মাধ্যমে ইতরতন্ত্রে পর্যবসিত হয়েছে এবং দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে সমগ্র সমাজ ও রাষ্ট্রের দুর্বৃত্তায়ন ঘটিয়েছে?

 

প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের জন্য প্রথমে আমরা এ দেশের গণতন্ত্র অনুশীলনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় কাঠামোগত যে সীমাবদ্ধতা রয়েছে সেদিকে দৃষ্টি দিব। অর্থাৎ যে কাঠামোর ভিতর নির্বাচনমূলক জন-প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা রক্ষিত সেই কাঠামোর সমস্যাটা প্রথমে বিচার করব।

 


গণতন্ত্রের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা


রূপকথার গল্পের উপমা দিয়ে বললে বলতে হয়, এ দেশে গণতন্ত্রের প্রাণ-ভোমরা বন্দী হয়ে আছে আমলাতন্ত্রের হাতের মুঠোয় ধরা কৌটার ভিতর। পাঁচ বৎসরের মেয়াদে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য জনগণ ভোট দিয়ে যাদেরকে নির্বাচিত করে তারা প্রকৃতপক্ষে একটি আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা রক্ষা ও পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়। ধরা যাক নির্বাচিত জাতীয় সংসদ এবং সরকারের কথা। আইন প্রণয়ন ও নীতি নির্ধারণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের। সরকার বা মন্ত্রীসভা জাতীয় সংসদে গৃহীত আইন এবং দিক নির্দেশ বাস্তবায়নকারী সর্বোচ্চ সংস্থা। কিন্তু বাস্তবে সকল আইন ও নির্দেশ বাস্তবায়ন বা প্রয়োগের ক্ষমতা কাদের হাতে? মাথার উপরে বা কেন্দ্রে সীমাবদ্ধ একটি ক্ষুদ্র সংসদ এবং সরকারকে ঘিরে থাকা এক বিশাল আমলাতান্ত্রিক জালের মাধ্যমে সরকারের সকল আইন, কর্মনীতি ও নির্দেশ কার্যকর হয়।

 

অর্থাৎ রাজনীতিকরা নির্বাচনে জিতে জাতীয় সংসদ এবং সরকার গঠন করলেও বাস্তবে রাষ্ট্র পরিচালনা তথা শাসন ভার থাকে বেসামরিক আমলাদের হাতে। আমলাদের শাসন স্তরক্রমে বিন্যস্ত থাকে উপরে কেন্দ্র তথা সচিবালয় থেকে নীচে বিভাগ, জেলা এবং থানা বা উপজেলা পর্যন্ত। এই বাস্তবতায় নির্বাচিত সরকার সাধারণ মানুষের ধরা-ছোঁয়ার বাইরের এক সত্তা। বরং জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা ও থানার পুলিশ প্রশাসন ইত্যাদি সমন্বিত এক আমলাতন্ত্র সাধারণ মানুষের নিকট নিত্য দিনের কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষ শাসক হিসাবে আবির্ভূত হয়। গ্রামের মানুষের হাতের কাছে নির্বাচিত জন-প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা হিসাবে ইউনিয়ন পরিষদ এবং শহর বা নগরের মানুষের হাতের কাছে একই ধরনের ব্যবস্থা হিসাবে পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন আছে ঠিকই, কিন্তু এগুলোর ক্ষমতা একেবারে সীমিত এবং এগুলো প্রকৃতপক্ষে আমলাতন্ত্রের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান হিসাবে কার্যকর থাকে। নির্বাচিত স্থানীয় সরকার হিসাবে পরিচিত এই সংস্থাগুলি জনগণের প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্রের প্রতি উপহাস মাত্র। স্থানীয় পর্যায়ে মানুষকে তার দৈনন্দিন প্রয়োজনে যাদের দ্বারস্থ হতে হয় কিংবা যারা মানুষের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডের তদারকী করে তারা আমলা। অর্থাৎ নিত্যদিনের বাস্তবতায় এ দেশে প্রকৃতপক্ষে জন-প্রতিনিধিত্বমূলক শাসন ব্যবস্থার অস্তিত্ব নাই।

 

এই আমলারা এলাকায় বহিরাগত এবং সাধারণ মানুষের জন্য অচেনা। কারণ আমলারা এক এলাকায় বেশী দিন থাকতে পারে না এবং তাদেরকে নিজ এলাকায় বদলী করা হয় না। এক জেলার আমলা শাসন করে ভিন্ন জেলার মানুষকে। এভাবে আমলাতন্ত্র শুধু কেন্দ্রীভূত এক স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে প্রতিনিধিত্ব বা পরিচালনা করে না, উপরন্তু বহিরাগত শাসনের রূপ ও চরিত্র নিয়েও সাধারণ মানুষের সম্মুখে উপস্থিত থাকে।

 

এটা একটা অদ্ভূত ও উদ্ভট শাসন ব্যবস্থা। কারণ নির্বাচনমূলক এই ব্যবস্থায় রাষ্ট্র ক্ষমতা বৈধত যাদের হাতে অর্পিত তারা হচ্ছে নির্বাচিত জন-প্রতিনিধি। কিন্তু রাষ্ট্র ক্ষমতা কার্যত যাদের হাতে অর্পিত তারা হচ্ছে আমলা। অর্থাৎ জন-প্রতিনিধিরা বা সরকার যে আইন করুক, যে সিদ্ধান্ত নিক তার বাস্তবায়ন বা প্রয়োগের উপর তার নিয়ন্ত্রণ নাই। বাস্তবায়নের ভার অনির্বাচিত আমলাদের হাতে, যাদের মোকাবিলায় সরকার নিজেও অসহায়। কারণ তারাই নির্বাচিত সরকারকে ঘিরে থাকে এবং তাদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য আছে আইনী রক্ষাকবচ বা বিধিবিধান।

 

এই ধরনের এক ব্যবস্থা যেখানে উপরে বা কেন্দ্রে নির্বাচিত সরকার থাকে এবং তার চারপাশে এবং নীচে থাকে বিশাল আমলাতন্ত্রের আবেষ্টন ও ভিত্তি সেই ব্যবস্থায় এক অস্বাভাবিক দ্বন্দ্ব ও জটিলতা দেখা দিতে বাধ্য। জন-প্রতিনিধিত্বশীল ব্যবস্থা একটি ক্ষুদ্র কেন্দ্রে আবদ্ধ হয়ে পঙ্গু হয়ে থাকে। তাকে দেশ শাসনে এমন একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থার উপর নির্ভর করতে হয় যা তার চরিত্রের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। অপর দিকে আমলাতন্ত্র তার মাথার উপর যে ধরনের সরকার লাভ করে তাও তার চরিত্রের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। মাথার উপর অনির্বাচিত রাজা বা সামরিক শাসক থাকলে আমলাতন্ত্র যে স্বচ্ছন্দ গতি লাভ করতে পারে এই ব্যবস্থায় সেটা সম্ভব নয়। ফলে প্রশাসনে ক্রমে বিস্তার লাভ করে দ্বন্দ্ব, স্থবিরতা, বিশৃঙ্খলা ও হতাশা।

 

এই ব্যবস্থায় জন-প্রতিনিধিরা আমলাতন্ত্রের বাধার কারণে জনগণের স্বার্থের প্রতিনিধিত্বে অক্ষম হয়ে থাকে। অপর দিকে আমলাতন্ত্রও বাধাপ্রাপ্ত ও খর্ব হয় সরকার এবং সরকারী দল দ্বারা। এই রকম এক দ্বন্দ্ব ও অচলাবস্থায় হতাশা থেকে ঘটে নৈতিক অবক্ষয়। দেশ হিতের পরিবর্তে ক্ষমতার অপব্যবহার দ্বারা দুর্নীতি ও লুণ্ঠন তখন উভয়ে মধ্যে সহাবস্থান ও ঐক্য রক্ষার সহজতর উপায় হয়ে দেখা দেয়।

 

দেশ শাসনের সকল স্তরে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা না থাকায় রাষ্ট্র শাসন যেমন এককেন্দ্রিক এবং আমলাতান্ত্রিক হয় তেমন ক্ষমতায় যেতে পারা রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব আমলাতন্ত্রের সঙ্গে ক্ষমতার লড়াইয়ে সুবিধাজনক অবস্থান রক্ষা করতে চেয়ে সারা দেশব্যাপী এবং বিভিন্ন পর্যায়ে দলের যে বিস্তার ঘটায় তার চরিত্রও হয় একনায়কী এবং স্বৈরতান্ত্রিক। দলের গঠনতন্ত্রে যা-ই লেখা থাক দল তার আচরণে হয় একনায়কী।

 

অন্যদিকে, ক্ষমতা কেন্দ্রিক দলের বিস্তার ঘটাতে গিয়ে সুযোগ-সুবিধা বিতরণ করতে হয়। শুধু আমলাতন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনে নয়, অধিকন্তু বিগত কালের ক্ষমতায় থাকা বর্তমান বিরোধী দলের প্রবল শক্তিকে মোকাবিলা করতে গিয়েও দলের বিস্তার প্রয়োজনীয় হয়। এভাবে বিভিন্ন সরকারী, আধা সরকারী এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং ক্ষেত্রে দলীয়করণ ঘটে। গড়ে উঠে ক্ষমতা কেন্দ্রিক দলগুলোর অঙ্গ-সংগঠন। এভাবে এক দলের মোকাবিলায় বিস্তৃত হয় অপর দল। দলের বিস্তারে কখনও আদর্শ বা কর্মসূচীর কথা বলা হলেও সেসব বাস্তবে কোন অর্থ বহন করে না। মূল বিষয় হচ্ছে অর্থ বিত্ত, সুযোগ-সুবিধা লাভ। ফলে দলের বিস্তারের সঙ্গে বিস্তার লাভ করে দুর্নীতি এবং সেই সঙ্গে সীমিত সুযোগ-সুবিধা নিয়ে দলাদলি এবং হানাহানি ­ -- সেটা শুধু দলের সঙ্গে দলের নয়, উপরন্তু একই দলের বিভিন্ন উপদলের মধ্যেও।

 

এই রকম এক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় শক্তিশালী দলের আশ্রয় ছাড়া কারও টিকে থাকা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। এই আশ্রয়স্থল ক্ষমতাসীন দল হতে পারে অথবা শক্তিশালী বিরোধী দল হতে পারে। ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা ক্ষমতার সাহায্যে দুর্নীতি, লুণ্ঠন, সন্ত্রাস করে। তাকে মোকাবিলা করার জন্য জনগণের এক বৃহৎ অংশ শক্তিশালী বা প্রধান বিরোধী দলের আশ্রয় নেয়। এভাবে ঘটতে থাকে দলীয় বিভাজন। অপর দিকে, স্থানীয় বা মাঠ পর্যায়ে জনগণ বহিরাগত, অচেনা ও তাদের প্রতি নির্লিপ্ত-নির্বিকার আমলা-পুলিশের প্রভুত্বসুলভ, দমন-পীড়ন এবং দুর্নীতি মূলক শাসনকে মোকাবিলা করতে বা সহনীয় পর্যায়ে রাখতে গিয়ে সরকারী অথবা শক্তিশালী বিরোধী দলের আশ্রয় নেয়।

 

প্রকৃতপক্ষে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার অভাব বা দুর্বলতা পূরণ করে রাজনৈতিক দল। শুধু দলের কেন্দ্রীয় বা জাতীয় নেতৃত্বের প্রয়োজনে নয়, অধিকন্তু স্থানীয় জনগণের প্রয়োজনেও রাজনৈতিক দল মাঠ পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। বলা যায় রাজনৈতিক দলগুলো মাঠ পর্যায়ে রাষ্ট্রের প্রতিনিধি আমলাদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে জনগণের পক্ষ থেকে এক ধরনের বার্গেইনিং এজেন্টের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। এই অবস্থায় ক্ষমতাসীন কিংবা বিরোধী বৃহৎ দলের নেতা-কর্মীদের কাজ হয়ে দাঁড়ায় আমলাদের কাছ থেকে নিজেদের কিংবা এলাকার মানুষের জন্য নানান ধরনের সুযোগ-সুবিধা আদায়ের উদ্দেশ্যে দেন-দরবার বা তদবির করা, চাপ প্রদান করা। এ ছাড়া থাকে ঘুষ বা উৎকোচ। আদর্শনিষ্ঠ, ত্যাগী ও সংগ্রামী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের বিপরীতে এ ধরনের অপ্রাতিষ্ঠানিক ও বৈধতাবহির্ভূত ক্ষমতা চর্চাকারী রাজনীতিকরা আবির্ভূত হয় তদবিরবাজ, ধান্দাবাজ অথবা দুর্নীতিগ্রস্ত রূপে।

 

কিন্তু দলীয় রাজনীতির অধঃপতনের সকল সুবিধা সবচেয়ে বেশী ভোগ করে আমলাতন্ত্র। ক্ষমতা কেন্দ্রিক দলগুলির দ্বন্দ্ব ও হানাহানির বিপরীতে আমলাতন্ত্র মূলত একটি ঐক্যবদ্ধ ও সংহত যন্ত্র হিসাবে কাজ করে। প্রশাসনে সামনে থাকে পুলিশ ও প্রশাসনিক আমলাতন্ত্র। এই ব্যবস্থাকে রক্ষা দিতে পিছনে থাকে সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনী নিজেও আমলাতান্ত্রিক পদ্ধতিতে গঠিত ও পরিচালিত যন্ত্র। এভাবে সমন্বিত এক আমলাতন্ত্রের বিপরীতে রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হতে না পারার সুযোগ পুরোপুরি ভোগ করে সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র। তবে দলীয় শাসনের সময় প্রশাসনে সরাসরি থাকায় বেসামরিক আমলাতন্ত্র হয় সবচেয়ে বেশী সুবিধাভোগী।

 

আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাধীনে বহু দলীয় গণতন্ত্রের নামে বহু দলীয় নির্বাচনের ব্যবস্থা রাজনৈতিক দলগুলোকে যে উন্মত্ত ও মরীয়া প্রতিযোগিতায় নামায় তাতে করে রাজনীতিতে নিয়ম-নীতি-আদর্শের কোন জায়গা থাকে না। দলের জন্য যে কোনভাবে জাতীয় নির্বাচনে জিতাটাই বড় হয়ে দাঁড়ায়। কারণ জিততে পারলেই সরকার গঠনের মাধ্যমে একটি মাত্র কেন্দ্রে সীমাবদ্ধ সকল ক্ষমতা করায়ত্ত করা সম্ভব হয়।

 

রাজনৈতিক দল পরিচালনা এবং নির্বাচনের জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। ক্ষমতাকে মূলত অবৈধভাবে ব্যবহার করে যারা দ্রুত প্রচুর অর্থ সংগ্রহ করতে পারে দলের নিয়ন্ত্রণ স্বাভাবিকভাবে তাদের হাতে চলে যায়। কাজেই নেতৃত্ব রক্ষার জন্য দলের নেতারাও একইভাবে অর্থ সংগ্রহের প্রতিযোগিতায় নামে। অর্থ সংগ্রহের এই প্রক্রিয়ায় অপরিহার্যভাবে এসে পড়ে পেশীশক্তির ব্যবহার। এভাবে এই প্রক্রিয়ায় নেতাদেরও কারও পক্ষে চাইলেও খুব একটা সৎ ও নীতি-নিয়মনিষ্ঠ থাকার উপায় থাকে না।

 

কিন্তু শুধু অর্থ বা পেশীশক্তি থাকলেই নির্বাচনে জিতা যায় না। কিছু ক্ষেত্রে কারচুপি বা ভোট কেন্দ্র দখল হতে পারে। কিন্তু সব ক্ষেত্রে এটা সম্ভব নয়। কাজেই ভোটের প্রয়োজনে জনগণের দ্বারস্থ না হয়ে উপায় থাকে না। তাছাড়া জনগণের বৃহৎ অংশের সমর্থন না পেলে বৃহৎ দলকেও টিকিয়ে রাখা যায় না। সুতরাং জনতুষ্টির জন্য কিছু কাজ ছাড়াও অনেক বেশী পরিমাণে যেটা করতে হয় সেটা হচ্ছে জনগণ যেসব কথা শুনতে পছন্দ করে সেগুলো বলা। দিতে হয় এমন সব প্রতিশ্রুতি ক্ষমতায় যাবার হাতিয়ার হলেও ক্ষমতায় গিয়ে যেগুলি রক্ষার কোন প্রয়োজন হয় না। এমনকি লিখিত কর্মসূচী বা নির্বাচনী ইশতেহারেরও বাস্তব কোন মুল্য যে নাই তা এ দেশের রাজনীতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল প্রতিটি মানুষ জানেন।

 

তবে জনতুষ্টির জন্য যে রাজনীতি গড়ে উঠে সেটা বরং রাজনীতির ক্রমিক অধঃপতন ঘটায়। যেহেতু যে কোন মূল্যে ভোটারদের মন জয় করে নির্বাচনে জিতাটাই মূল্য লক্ষ্য হয় সেহেতু ভোটার বা জনগণকে সুশিক্ষিত বা উন্নত চেতনার অধিকারী করা দলের কাজ হয় না। সে কাজ করতে গেলে বরং ভোট সংখ্যা কমে। ভোটারদের বিপুল সংখ্যাগুরু যেহেতু পশ্চাৎপদ, অজ্ঞ এবং ধর্মভীরু সেহেতু তাদের পশ্চাৎপদতা, অজ্ঞতা এবং ধর্মীয় আবেগকে রক্ষা ও ব্যবহারের প্রতিযোগিতায় নামতে রাজনীতিকরা বাধ্য হয়।

 

এভাবে রাজনীতি হয়ে পড়ে একদিকে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ ও পেশীশক্তি এবং অপর দিকে পশ্চাৎপদতা, অজ্ঞতা ও ধর্মাচ্ছন্নতার অংশ, অধীনস্থ এবং প্রতিনিধিত্বকারী। ক্ষমতা চর্চাকারী বিদ্যমান রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নকে দেখতে হবে এই প্রেক্ষাপটে। এই রাজনীতিতে সৎ, আদর্শনিষ্ঠ, ভদ্র ও ত্যাগী নেতা-কর্মীদের যেমন জায়গা থাকে না তেমন জায়গা থাকে না উন্নত, যুক্তিবাদী, লোকবাদী এবং গণতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনারও। রাজনীতি অধিকাংশ ক্ষেত্রে হয়ে পড়ে কতকগুলো আত্মমর্যাদা বোধহীন অথচ দাম্ভিক, প্রতারক, অর্থ লোলুপ, অভদ্র, ইতর ও দুর্বৃত্তের আখড়া। বিএনপি-আওয়ামী লীগের মত বৃহৎ দলগুলোর দিকে দৃষ্টিপাত করলেই বুঝা যাবে এই বক্তব্যের যৌক্তিকতা কতটা।

 

আধুনিক ও সভ্য পৃথিবীর সঙ্গে লেনদেন করতে হয় বলে রাজনৈতিক দলের উপর তলার নেতাদের আচরণে তবু কিছুটা ভদ্রতার প্রলেপ বা মার্জনা থাকে, কিন্তু যত নীচে যাওয়া যায় তত ইতর, অমার্জিত ও দুর্বৃত্ত চেহারা নগ্ন হয়ে আত্মপ্রকাশ করে। এই ধরনের দলগুলো ক্ষমতার ভিতরে ও বাইরে থেকে সমগ্র রাষ্ট্র ও সমাজেরও ক্রমিক অধঃপতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

 

এখন সঙ্গত রূপেই এই প্রশ্ন আসা উচিত যে, দীর্ঘ কাল ধরে এ দেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং নানান ধরনের কাঠামোগত পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরেও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের সমস্যার সমাধান করা গেল না কেন? মূল সমস্যাগুলিকে কি কখনই ধরতে বা বুঝতে পারা যায় নাই? নাকি সমস্যার মূলে এমন আর কিছু আছে যে, বুঝলেও তার জন্য কার্যকর কিছু করা সম্ভব হয় নাই?

 

এ দেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং প্রাতিষ্ঠানিক বা কাঠামোগত ইতিহাসটা কম দীর্ঘ নয়। ভারতীয় উপমহাদেশ এবং সেই সঙ্গে বাংলাদেশ রাষ্ট্র আজ যে অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত সেই অঞ্চলেও আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং বুর্জোয়া শিল্প বিপ্নবের বীজ বপন করে দিয়ে গেছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা। তার পূর্বে এ দেশ এবং উপমহাদেশে শত শত কিংবা কয়েক হাজার বৎসর ধরে বজায় ছিল সামরিক আমলাতান্ত্রিক-স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এই ধরনের রাষ্ট্রের শীর্ষে থাকত রাজা বা সম্রাট। তারা তাদের সেনাবাহিনী এবং প্রশাসন যন্ত্রের সাহায্যে রাষ্ট্র শাসন করত। এই ব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল ধর্ম ভিত্তিক সমাজ এবং একই সঙ্গে দেহশক্তি নির্ভর পশ্চাৎপদ কৃষি অর্থনীতি।

 

ব্রিটিশ শাসকরা নিজেরাও একটা আমলাতান্ত্রিক-স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু এটা সামরিক প্রাধান্যযুক্ত আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্র ছিল না। বরং ছিল বেসামরিক আমলাতন্ত্রের প্রাধান্যযুক্ত রাষ্ট্র। রাষ্ট্র শাসনে ইংরেজ শাসকরা সেনাবাহিনীকে প্রাধান্যে আসতে দেয় নাই। বরং তার কাজ ছিল উপমহাদেশে বেসামরিক ইংরেজ প্রশাসকদের অধীনে থেকে দেশ জয় এবং সাম্রাজ্য রক্ষা করা। অর্থাৎ উপনিবেশিক রাষ্ট্রে সেনাবাহিনীর ভূমিকা ছিল মূলত পাহারাদারের।

 

১৮৫৭ সালে ভারত ব্যাপী স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ইংরেজ শাসকরা তাদের শাসন রক্ষার জন্য জন-প্রতিনিধিত্বের একটা সীমাবদ্ধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন বোধ করে। এই ব্যবস্থা বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে ১৯৩৫-এ ভারত শাসন আইনে পরিণত রূপ লাভ করে। এরই ধারাবাহিকতায় ইংরেজরা ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতা কোন রাজা বা সেনাপতির কাছে হস্তান্তর না করে নির্বাচিত জন-প্রতিনিধিদের কাছে হস্তান্তর করে যায়।

 

এই সঙ্গে ইংরেজরা একটা আধুনিক পুঁজিবাদী অর্থনীতি রেখে দিয়ে যায়, যার চারপাশে যত পশ্চাৎপদ এবং দেহশক্তি নির্ভর কৃষি প্রধান অর্থনীতি ক্রিয়াশীল থাকুক বিকাশমান ছিল শিল্প নির্ভর পুঁজিবাদী অর্থনীতি। তবে স্বাভাবিকভাবে ইংরেজ প্রবর্তিত পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অধীনে গড়ে উঠা পুঁজিপতি বা সম্পত্তিবান শ্রেণী ছিল ইংরেজ শাসক ও পুঁজির অধীনস্থ এবং সহযোগী। অর্থাৎ ব্রিটেনসহ পশ্চিম ইউরোপের স্বাধীন বুর্জোয়া বা পুঁজিপতি শ্রেণীর পরিবর্তে এখানে যে শ্রেণী বিকাশ লাভ করে তা হল মুৎসুদ্দি তথা সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার অধীনস্থ কিংবা দালাল।

 

এখন প্রশ্ন, প্রায় ৬০ বৎসর পূর্বে ইংরেজ চলে যাবার পরেও এবং বিশেষ করে ’৭১-এ একটা স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরেও উন্নত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং শক্তিশালী শিল্প অর্থনীতি গড়তে এ দেশ ব্যর্থ হল কেন? কেন এ দেশের শাসক শ্রেণী পাশ্চাত্যের উন্নত দেশগুলোর সমান উন্নত হবার জন্য চীন-ভিয়েৎনামের মত উচ্চাকাঙ্ক্ষী না হয়ে বরং তথাকথিত দাতা দেশগুলোর দাসত্বের মধ্যে সার্থকতা খোঁজে? কেন আজ অবধি গণতান্ত্রিক বিপ্নব ও শিল্প বিপ্নব একান্ত সীমাবদ্ধ, খণ্ডিত এবং পঙ্গু হয়ে রইল? আধুনিক শিক্ষা আছে, প্রযুক্তি আছে, উন্নত পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ আছে। তাহলে সমস্যাটা কোথায়?

 

এটা ঠিক যে, আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা বিরাট কাঠামোগত বাধা হয়ে আছে। আধুনিক কালে দাস ব্যবস্থা না থাকলেও এ দেশের আমলারা মর্মগতভাবে দাস। ভদ্র ভাষায় তাদেরকে রাষ্ট্রের ভৃত্য বলা যায়। কিন্তু একটা দাসত্বমূলক ব্যবস্থা রক্ষার হাতিয়ার হয়ে তারা নিজেবাও দাস হয়ে উঠে। বিশেষত আমাদের দেশে যে আমলাতন্ত্র বিদ্যমান তা ব্রিটিশ উপনিবেশিক আমলাতন্ত্রের ধারাবাহিকতা মাত্র। এত কালেও এতসব পরিবর্তনের পরেও এই দাসতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিশেষ কোন পরিবর্তন হয় নাই। এ দেশ কিংবা উপমহাদেশ নিয়ন্ত্রণ ও শাসনের জন্য আমলারা ছিল ইংরেজ শাসকদের হাতিয়ার। আধুনিক কালে তাদেরকে এ কালের উপযোগী করে জন্ম দিয়ে গেছে তাদের ইংরেজ প্রভুরা। এক কালে তারা ইংরেজ প্রভুদের দাস হিসাবে অধীনস্থ জনগণের উপর শাসন দণ্ড ঘুরাত। এখন ইংরেজ প্রভুরা না থাকলেও মার্কিন নেতৃত্বাধীন পাশ্চাত্যের আধিপত্যমূলক বিশ্ব ব্যবস্থা আছে। এখন আমলাতন্ত্রের একটা কাজ হয়ে রয়েছে নির্বাচিত বা অনির্বাচিত যে ধরনের শাসক হোক তারা যাতে স্বাধীন চেতা না হয়ে বরং দাসত্বপরায়ণ হয়ে বিদেশী স্বার্থ রক্ষা করে সেই দিকটা নিশ্চিত রাখা।

 

ঠিক আছে, মেনে নিলাম আমলারা দাস। আর নিজেরা দাস বলে নীচ তলায় জনগণকে দাসানুদাস করে রাখায় যেমন তারা ভূমিকা পালন করে তেমন বিদেশী প্রভুদের স্বার্থে দেশেও একদল দাসত্বপরায়ণ শাসক তৈরী অথবা রক্ষা এবং লালন করার কাজটা করে চলে। কিন্তু এর পরেও প্রশ্ন আসে, এই রকম এক পশ্চাৎপদ ও বিকৃত ব্যবস্থাকে ভাঙ্গবার জন্য সমাজের ভিতর থেকে কোন শক্তির উদ্ভব হবার পথে বাধা কোথায়? রাষ্ট্র এবং জাতি হিসাবে একটা স্বাধীন সত্তা নিয়ে পৃথিবীতে মর্যাদা নিয়ে দাঁড়াবার স্বপ্ন আমরা সাধারণভাবে আমলাদের কাছ থেকে আশা না করতে পারি, কিন্তু রাজনীতিক তথা রাজনৈতিক দল এবং ব্যবসায়ী বা শিল্পোদ্যোক্তাদের কাছ থেকেও কি তা আশা করতে পারি না? আমলাদেরও ভিতর কেউ স্বপ্ন দেখে না এটা হতে পারে না। তবে ব্যবস্থা বা কাঠামোগত কারণে তাদের পক্ষে স্বাধীনভাবে ভূমিকা নেওয়া সম্ভব হয় না। কিন্তু সমাজের অন্যদের ক্ষেত্রে সমস্যাটা কোথায়? সুতরাং এ বিষয়ে আরও গভীর তলদেশে অনুসন্ধান করা প্রয়োজনীয়।

 

বস্তুত আধুনিক সভ্যতার পথ ধরে এতটা পথ এগিয়ে আসার পরও যে আমরা আজ অবধি পাশ্চাত্যের উন্নত ও শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর নিয়ন্ত্রণাধীন এবং অনুগত হয়ে আছি এর কারণ শুধু সমাজের উপরিতলে অবস্থিত রাষ্ট্র কাঠামোর ভিতর অনুসন্ধান না করে সমাজের অবতলে অবস্থিত জনগণের চেতনা তথা ভাবাদর্শের ভিতরেও অনুসন্ধান করলে আমরা আমাদের প্রশ্নের উত্তর পাব। আর তখন আমরা দেখতে পাব সমাজের উপর থেকে চাপানো আছে একটা বর্বর, দমন-পীড়নবাদী ও সন্ত্রাসী রাষ্ট্র, আর ভিতর থেকে সমাজকে লৌহকঠিন বন্ধনে আবদ্ধ করে রেখেছে ভাবাদর্শের মূল রূপ হিসাবে ধর্ম।

 

ধর্মের প্রভাব আমাদের মত ইসলামী সমাজ মানসে প্রচণ্ড। ধর্মের যে নির্দিষ্ট গণ্ডী দেওয়া আছে স্বাভাবিক অবস্থায় ভিতর থেকে সেই গণ্ডী ভেঙ্গে সমাজের পক্ষে নূতন শক্তির উদ্ভব ও বিকাশ ঘটানো অসম্ভব হয়ে থাকে। ধর্মের প্রভাবে সমাজ-তল বা আম-জনতা নূতন শক্তি সৃষ্টিতে অক্ষম হয়ে থাকে বলে তারা যেমন সমাজের ভিতর থেকে গণতন্ত্রায়ন এবং শিল্পায়নের শক্তির বিকাশে রসদ যোগাতে পারে না তেমন এই শক্তিগুলিকেও অস্তিত্বের প্রয়োজনে বিদেশ মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে বাধ্য করে। ধর্মের প্রভাবে বরং সমাজ তল হয়ে থাকে ভয়ঙ্কর রকম প্রতিক্রিয়াশীল, পশ্চাৎপদ এবং একনায়কী বা স্বৈরতান্ত্রিক। এই রকম বাস্তবতায় পাশ্চাত্য দ্বারা সৃষ্ট আধুনিক ব্যবস্থার ফসল রাজনৈতিক দল, পুঁজিপতি-ব্যবসায়ী শ্রেণী এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণীর এক বৃহৎ অংশকেও জনগণের উপর নির্ভরতার পরিবর্তে বিদেশের শিল্পোন্নত ও আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর আশ্রয়ের মধ্যেই নিজেদেরকে নিরাপদ ও স্বচ্ছন্দ বোধ করতে দেখা যায়।

 

তবে এই শ্রেণীগুলিও সাধারণভাবে ধর্মকে ব্যবহার করে। মুসলমান জনগণের সঙ্গে নিজেদের ধর্মীয় পরিচয়ের অভিন্নতার সুযোগ নিয়ে তারা ধর্মকে ব্যবহার করে জনগণের সমর্থন অথবা আনুগত্য সহজে লাভ করার জন্য। তবে তাদের এই ব্যবহার প্রকৃতপক্ষে হয়ে দাঁড়ায় ভণ্ডামি কিংবা প্রতারণা অথবা কৌশল। মূল ধর্মের সঙ্গে তথা ধর্মের মূল শিক্ষার সঙ্গে কোন সম্পর্ক না থাকলেও তারা ধর্ম সংক্রান্ত এমন সব ব্যাখ্যা দাঁড় করায় যাতে করে জনগণের ধর্মানুভূতিকে তুষ্ট রেখে ধর্মের মূলনীতি বিরোধী জীবনাচরণের অনেক কিছু অনুশীলন করা যায়। যেমন প্রাণীর চিত্র নির্মাণ সংক্রান্ত যে কোন কর্মকাণ্ড ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ হলেও সেগুলোকে যেমন তারা মোটেই বর্জন করে না তেমন বর্জন করে না আরও অনেক কিছুকে। কাজেই চলচ্চিত্র, টেলিভিশন, নৃত্য, সঙ্গীত, ইত্যাদি উপভোগে তারা পিছপা হয় না। মদ্যপান ধর্মীয় বিধানে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ হলেও বিশেষত সমাজের উপর তলায় তা অনেকেরই জীবনের অংশ হয়ে থাকে। এ ছাড়া আছে ধর্মীয় বিধানে নিষিদ্ধ পর নারী-পুরুষ সহজ ও ঘনিষ্ঠ মেলামেশা। বিশেষত আজকের সভ্যতায় নারীকে আদৌ গৃহবন্দী করে রাখা সম্ভব নয়। ফলে ধর্মীয় বিধানে নিষিদ্ধ হলেও নারীকে যেমন প্রকাশ্যে এবং পুরুষের সাহচর্যে আসতে দিতে হয় তেমন এমন কি নারী নেতৃত্বকেও পুরুষ মেনে নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু ধর্মের আবরণ রাখতে হয় আমজনতা বা সমাজ তলের সহজ সমর্থন লাভ কিংবা সেখান থেকে বিরোধিতা বা আক্রমণ এড়াবার প্রয়োজনে।

 

উপরন্তু নিজদেরও ধর্ম বিশ্বাসের অনুভূতিকে তুষ্ট করা হয় এভাবে। কিন্তু মনের গভীরে এসবেরই প্রতি রয়ে যায় শ্রদ্ধার অভাব। ফলে জীবন-জীবিকার তাগিদে কিংবা ভোগ ও সুবিধার প্রয়োজনে পাশ্চাত্য থেকে আসা আধুনিক জীবনাচরণ অনুসরণের ভিতর সাধারণভাবে থাকে পাপ বা অপরাধ বোধ। অর্থাৎ এ দেশে আধুনিক জীবনাচরণের পিছনে নৈতিকতার অনুমোদন সাধারণভাবে থাকে না। তাই মনের গভীরে এর অবলম্বন থাকে না। অন্যদিকে অনুসৃত জীবনাচরণের মধ্যে ধর্মীয় কারণে নৈতিকতা ও গৌরব বোধের যে অভাব থাকে তা অবক্ষয় ঘটায় ব্যক্তির আত্মমর্যাদা বোধ ও নৈতিকতার। এভাবে আধুনিক সভ্যতা এ দেশে দুর্নীতিকে প্রবলতর মাত্রা নিতে সাহায্য করছে।

 

সুতরাং এ দেশে আধুনিকতার সব আয়োজন বাহির এবং উপর থেকে চাপানো, আরোপ, এবং সমাজ তলে সমর্থনের অভাবে ভাসমান। সমাজ এগুলোকে আত্মস্থ করে নিজের মত করে উন্নত রূপ দিতে পারে না। সেটা রাষ্ট্র হোক, পুঁজি হোক, রাজনৈতিক দল হোক কিংবা জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা হোক। কারণ ধর্মের প্রভাবে তার নিজস্ব বা স্বাধীন ও উন্নত বুদ্ধিবৃত্তি বা চেতনা নাই। জ্ঞান-বিজ্ঞান, গণতন্ত্র এবং পুঁজির বিকাশের জন্য যে পুষ্টি সমাজ তলে থাকা দরকার সেটা নাই বলে এগুলি দুর্বল ও অনুন্নত হয়ে থাকে। বরং সমাজেরও চাপে এগুলো হয়ে থাকে বিকৃত ও পঙ্গু। এর সুযোগ নেয় বিদেশী শক্তিগুলো। এ কাজে তাদের মূল হাতিয়ার হিসাবে কাজ করে আমলাতান্ত্রিক ও স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা এবং সেই সঙ্গে ধর্মও। এই দুইটি এ দেশে পরস্পরের পরিপূরক। বস্তুত রাষ্ট্র ব্যবস্থার পাশাপাশি ধর্মের সমস্যাও না বুঝলে আমরা কোনদিন জনগণ তথা সমাজ ও রাষ্ট্রের মুক্তির পথ খুঁজে পাব না এবং খুঁজে পাব না প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথও। সুতরাং এখন আমরা সেই দিকে দৃষ্টি দিব।

 

 

ধর্মের সমস্যা

 

আধুনিক সভ্যতার উৎপত্তি পশ্চিম ইউরোপে। তার শুরুটা কিন্তু বিদ্যমান ধর্মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ থেকে। ধর্মের অন্ধ বিশ্বাসের পরিবর্তে যুক্তি ও জ্ঞান-বিজ্ঞান সাধনা এবং মৃত্যু পরবর্তী কাল্পনিক জীবনের উন্নয়নের পরিবর্তে লৌকিক জীবনে উন্নয়ন সাধনা দিয়ে আধুনিক সভ্যতার পথে মানুষের যাত্রা শুরু হয় পশ্চিম ইউরোপে।

 

১০৯৬ খ্রীঃ থেকে ১২৯১খ্রীঃ পর্যন্ত স্থায়ী প্রায় দুইশত বৎসরের প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী এবং ব্যর্থ ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধের পর ইউরোপে রেনেসাঁ বা নবজাগরণ শুরু হয়। ক্রুসেডের ব্যর্থতা রোমান ক্যাথলিক চার্চের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণের উপর যে নিদারুণ আঘাত হানে তার ফলে সেখানে যুক্তি ও জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা সম্ভব হয়। বিশেষত জীবনবাদী ও যুক্তিবাদী প্রাচীন গ্রীক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্পকলার চর্চা দ্বারা এর শুরুটা ঘটে। জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা যে স্বাধীন ও জিজ্ঞাসু মনের জাগরণ ঘটায় তার ফলে সেখানে রোমান ক্যাথলিক চার্চ প্রধান পোপের আধিপত্যের বিরুদ্ধে জাগরণ ঘটে। ধর্মগুরু পোপ কেন্দ্রিক কেন্দ্রীভূত ও কঠোরভাবে দৃঢ়বদ্ধ রোমান ক্যাথলিক চার্চের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় খ্রীষ্টান ধর্মের উদারনৈতিক ও বিকেন্দ্রীভূত ধারা হিসাবে প্রোটেস্ট্যান্ট সম্প্রদায়। অপর দিকে যুক্তিবাদী দার্শনিক ধারার বিকাশের ফলে সমাজে প্রবল হয়ে উঠে ধর্ম বা অলৌকিকতায় বিশ্বাস থেকে মুক্ত লোকবাদী বা বস্তুবাদী চিন্তাধারা। এইভাবে ধর্ম সংস্কারমূলক এবং ধর্ম মুক্ত এই উভয় ধারায় পশ্চিম ইউরোপে মানুষের চিন্তার জগৎ এগিয়ে যায়।

 

কিন্তু যে ধারায় পশ্চিম ইউরোপের চিন্তা-চেতনার জগৎ অগ্রসর হোক ইতিপূর্বে সমাজ ও রাষ্ট্রের উপর ধর্মের যে আধিপত্য ছিল সেটা ভেঙ্গে পড়ল কিংবা শিথিল হল। এর ফলে রাষ্ট্র থেকে ধর্ম পৃথক এবং দূরবর্তী হল। কাজটি সহজে হয় নাই। এর জন্য সেখানে অসংখ্য আন্দোলন বা সংগ্রাম করতে হয়েছে, বহু সংখ্যক মানুষকে আত্মদান করতে হয়েছে। ধর্মের বিরুদ্ধে সংগ্রামের বিজয়ের ফলে মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হল। বলা যায় রাষ্ট্র থেকে পৃথক ধর্মের বিচার্য বিষয় হল ব্যক্তির বিশ্বাসের জায়গা, যেখানে রাষ্ট্র এমনকি সমাজেরও কিছু করার রইল না। এভাবে ইউরোপে চিন্তার স্বাধীনতা থেকে স্বাধীন ব্যক্তিসত্তার জাগরণ ঘটল।

 

আর স্বাধীন ব্যক্তিসত্তার জাগরণের সঙ্গে শুরু হল যন্ত্রশিল্পের নূতন নূতন উদ্ভাবন ও বিকাশ এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থারও প্রতিষ্ঠা ও বিকাশ। উন্নততর সমাজ শক্তি এবং যন্ত্রশক্তি দ্বারা বলীয়ান হয়ে ইউরোপ ক্রমে সারা পৃথিবী জয় করে তাকে নিজেদের উপনিবেশ ও বাজারে পরিণত করল।

 

পশ্চিম ইউরোপে ব্যক্তির স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা, শিল্প পুঁজির বিকাশ এবং রাষ্ট্রের গণতন্ত্রায়ন একটা অপরটার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। কিন্তু এই সামগ্রিক বিকাশের মূল চালিকা শক্তি হচ্ছে ব্যক্তি। এখন প্রশ্ন আসা উচিত ব্যক্তির এই উদ্ভব বা বিকাশ হল কীভাবে? এটা না বুঝলে অমরা আমাদের সমাজেরও গণতন্ত্রায়ন ও শিল্পায়নের সমস্যার মূলটাকে ধরতে পারব না। ফলে এই সমস্যারও সমাধান কোনদিন বের করতে পারব না।

 

বস্তুত এই বিষয়কে আমাদের বুঝতে হবে যে, পশ্চিম ইউরোপে ব্যক্তি যে পশ্চাৎপদ সামন্তবাদী রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থা এবং ধর্মের নিয়ন্ত্রণ ভেঙ্গে বের হয়ে আসতে পেরেছে সেটা সম্ভব হয়েছে সেখানে মূলত বরাবরই ধর্ম এবং রাষ্ট্রের মধ্যে বিভাজন বা পার্থক্য থাকার ফলে। মধ্যযুগে রাষ্ট্রের উপর ধর্ম বা তার প্রতিষ্ঠান হিসাবে চার্চের নিয়ন্ত্রণ বা আধিপত্য থাকলেও রাষ্ট্র এবং চার্চ কখনই এক ছিল না। চার্চ প্রধান পোপ রাষ্ট্র প্রধান ছিলেন না।

 

খ্রীষ্টধর্মের উদ্ভব ও বিকাশ প্রক্রিয়া এর জন্য দায়ী। খ্রীষ্টধর্ম তার জন্মের পর থেকে প্রায় তিন শত বৎসর রাষ্ট্রের ভয়ঙ্কর দমন ও নির্যাতনের শিকার ছিল। রোমান শাসকরা খ্রীষ্টীয় বিশ্বাসের কারণে শত শত বৎসর অগণিত খ্রীষ্টানকে হত্যাসহ বিভিন্নভাবে নির্যাতন করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সমাজের নীচ তলা থেকে উদ্ভূত খ্রীষ্টধর্ম সমগ্র সমাজ এবং অবশেষে রাষ্ট্রকেও গ্রাস করে। ৩১৩ খ্রীষ্টাব্দে রোমের সম্রাট কন্‌স্টানটিন খ্রীষ্টধর্মসহ সকল ধর্মের প্রতি সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করলে খ্রীষ্টধর্মের সঙ্গে রাষ্ট্রের বিরোধ শেষ হয়। তিনি নিজে খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ করেন। ইটালির উত্তর ও উত্তর-পূর্ব দিক থেকে আগত যে বর্বর উপজাতিদের হাতে রোমান সভ্যতা ধ্বংস হল তারাও খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ করল।

 

কিন্তু রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্ম তথা খ্রীষ্টীয় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে উঠা গীর্জা বা চার্চের পার্থক্য রয়েই গেল। যীশু নিজে রাষ্ট্র ও ধর্মের মধ্যে পার্থক্যের সীমারেখা টেনে দিয়ে গিয়েছিলেন সিজারের প্রাপ্য সিজারকে এবং ঈশ্বরের প্রাপ্য ঈশ্বরকে দিতে বলে। উপরন্তু শত শত বৎসর ধরে খ্রীষ্টধর্ম এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিকাশ ঘটে রাষ্ট্রের বাইরে থেকে। এই ধারায় গড়ে উঠা রোমান ক্যাথলিক চার্চের প্রধান হিসাবে পোপ ক্যাথলিক চার্চের অন্তর্ভুক্ত সমগ্র খ্রীষ্টান সমাজের প্রধান ধর্মগুরু হলেও এবং এই চার্চের অন্তর্ভুক্ত সকল রাষ্ট্র তথা সম্রাট ও রাজারা তাকে ধর্মগুরু হিসাবে আনুগত্য প্রদান করলেও তিনি রাষ্ট্র প্রধান না হয়ে ধর্মগুরু হয়েই রইলেন। এর ফলে পশ্চিম ইউরোপে রাষ্ট্র এবং ধর্ম প্রকৃত অর্থে কখনই একীভূত হয় নাই। চার্চের প্রভুত্ব বা প্রাধান্য থাকলেও রাষ্ট্রের স্বাতন্ত্র্য রয়ে গিয়েছিল।

 

প্রতিষ্ঠানগতভাবে ধর্ম এবং রাষ্ট্রের মধ্যে এই পার্থক্যের ফলে ধর্ম এবং রাষ্ট্রের মধ্যে সর্বদা এমন একটা দ্বন্দ্ব রয়ে গেল যার সুযোগ নিয়ে সকল পশ্চাৎপদতার মধ্যেও ব্যক্তি তার অস্তিত্বের ভিত্তি রক্ষা করতে পারল। চার্চ যতই শক্তিশালী হোক রাষ্ট্রের মত স্বৈরতার শক্তি প্রয়োগের ক্ষমতা তার হাতে ছিল না। অপর দিক চার্চ নিজ স্বার্থে রাষ্ট্র তথা রাজা বা সম্রাটকেও নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী হতে দিল না। এ কাজে তার সহায়ক শুধু প্রজা সাধারণের ধর্ম বিশ্বাসের কারণে সৃষ্ট তার প্রভাবের ভিতর ছিল না, অধিকন্তু ছিল সামন্ত শ্রেণীর শক্তির ভিতরেও। সামন্ত শ্রেণীর ব্যাপক অধিকার কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র ক্ষমতার অবাধ হয়ে উঠার পথে বিরাট হয়ে থেকে ছিল। রাজা বা সম্রাট যত ক্ষমতাধর হোক তাকে পার্লামেন্ট বা পরিষদের নিকট যথেষ্ট পরিমাণে দায়বদ্ধ হয়ে চলতে হত, যেখানে সামন্ত প্রভু এবং পাদ্রীদের অবস্থান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

এই অবস্থায় প্রাচ্যের স্বৈরতন্ত্রের মত নিরঙ্কুশ স্বৈরতন্ত্রের বিকাশের কোন বাস্তবতা পশ্চিম ইউরোপে ছিল না। চার্চ, রাষ্ট্র এবং সামন্ত প্রভু এই তিন শক্তির মধ্যে ঐক্য ও দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে এমন এক ভারসাম্য রক্ষিত হল যার ফলে ব্যক্তিসত্তা এবং গণতন্ত্র উভয়েরই বীজ রক্ষা পেল। তবে এই বীজের বিকাশ তথা অঙ্কুরোদ্‌গমের জন্য প্রয়োজনীয় ছিল ধর্মীয় শক্তির ক্ষয় অথবা পরাজয়, যাতে যুক্তিবাদী ও বিজ্ঞান মনস্ক ব্যক্তি মুক্তি পায়। ক্রুসেডের ব্যর্থতা এবং রেনেসাঁ সেই কাজ সম্পন্ন ক’রে আধুনিক ইউরোপের জন্ম ঘটাল। এভাবে সেখানে বিরাট আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটল।

 

তবে এই পরিবর্তনের জন্য পশ্চিম ইউরোপের দেশে দেশে বিরাট বিরাট গণ-বিপ্নব এবং যুদ্ধেরও প্রয়োজন হয়েছিল। এই পরিবর্তনের মূল চালিকা শক্তি বা অগ্রণী শক্তি হিসাবে ভূমিকা পালন করেছিল চিন্তাবিদ ও বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় এবং কারখানা মালিক ও বণিক বা বুর্জোয়া শ্রেণী। এদের উপর নির্ভর করে সেখানে ক্রমে রাজনৈতিক দলের বিকাশ ঘটে এবং আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ক্রমবিকাশের ধারায় রাজনৈতিক দলের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে এটা লক্ষণীয় যে, ক্যাথলিক চার্চের নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটিয়ে খ্রীষ্টধর্মের অধিকতর উদারনৈতিক ধারা হিসাবে প্রবর্তিত প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রীষ্টধর্ম পশ্চিম ইউরোপের উত্তরের যে দেশগুলিতে প্রতিষ্ঠিত হয় সেই দেশগুলিই শিল্প বিপ্নব ও গণতান্ত্রিক বিপ্নবের পথ ধরে ক্যাথলিক চার্চ প্রভাবিত দক্ষিণের দেশগুলির তুলনায় অনেক বেশী এবং অনেক দ্র্নত অগ্রসর হয়েছে।

 

একটা সমাজের সামগ্রিক কাঠামো নির্মাণ এবং তার অগ্রগতি অথবা পশ্চাৎগতি সাধনের ক্ষেত্রে ধর্মের ভূমিকা কতখানি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে তার প্রমাণ একই খ্রীষ্টধর্ম শাসিত পশ্চিম ইউরোপের সঙ্গে রাশিয়াসহ পূর্ব ইউরোপের দেশগুলির তুলনামূলক পর্যালোচনা করলে পাওয়া যায়। পশ্চিম ইউরোপ যেখানে ছিল রোমান ক্যাথলিক চার্চ শাসিত সেখানে পূর্ব ইউরোপ ছিল প্রধানত অর্থডক্স্‌ চার্চ শাসিত।

 

মধ্যযুগে পশ্চিম ইউরোপে রাষ্ট্রের উপর চার্চের আধিপত্য থাকলেও ক্যাথলিক চার্চ ছিল রাষ্ট্র থেকে পৃথক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু খ্রীষ্টধর্মের অর্থডক্স মত যেখানে প্রধান ছিল সেই পূর্ব ইউরোপের অবস্থা ছিল ভিন্ন। বর্তমান তুরস্কের ইস্তানবুল এক সময় ছিল গ্রীসের অংশ এবং এই নগরের নাম ছিল কন্‌স্টান্টিনোপল। এই কন্‌স্টান্টিনোপলকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা বাইজেন্টাইন রোমান সাম্রাজ্যভুক্ত অঞ্চলে খ্রীষ্টধর্মের যে অর্থডক্স মত প্রচলিত ছিল তার চার্চগুলির প্রধান হিসাবে আবির্ভূত হন সম্রাট নিজে। অর্থাৎ সম্রাট এবং চার্চের প্রধান কার্যত একই ব্যক্তি হলেন। এর ফলে রাষ্ট্র এবং গীর্জা তথা রাষ্ট্র এবং পুরোহিততন্ত্র ভিন্ন হলেও রাষ্ট্র চার্চকে অধীনস্থ করল। এভাবে একটা বিন্দুতে রাষ্ট্র এবং চার্চ কার্যত একীভূত হল। ফলে রাষ্ট্র এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সুদৃঢ় ঐক্যবন্ধন স্থাপিত হল।

 

তুরস্কের মুসলমান খলীফাদের হাতে কন্‌স্টান্টিনোপল এবং বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের পতন হলে অর্থডক্স চার্চের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে যে শূন্যতা সৃষ্টি হল তা পূরণ করতে রাশিয়ার সম্রাট তথা জার এগিয়ে আসেন এবং রাশিয়ায় অর্থডক্স চার্চের প্রধানের ভূমিকা গ্রহণ করেন।

 

এটা লক্ষণীয় যে, অর্থডক্স চার্চ শাসিত খ্রীষ্টান দেশগুলিতে পশ্চিম ইউরোপের মত প্রায় স্বাধীন সামন্ত শ্রেণীর অস্তিত্ব ছিল না। রাশিয়ার ইতিহাস থেকে জানা যায় সেখানকার সামন্তরা কীভাবে সম্রাটের মর্জির উপর নির্ভর করত। বস্তুত ধর্মীয় পার্থক্য সত্ত্বেও প্রাচ্যের স্বৈরতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে অনেক বিষয়ে পূর্ব ইউরোপের সমাজ ও রাষ্ট্রগুলি বিশেষত রাশিয়া খুব বেশী ভিন্ন ছিল না। রাশিয়ার স্বৈরতন্ত্র ছিল অনেকাংশে এশীয় স্বৈরতন্ত্রের অনুরূপ।

 

অথচ খ্রীষ্টধর্মের তত্ত্বগত এবং বিকাশগত বৈশিষ্ট্য অনেক ভিন্নতা দাবী করে। খ্রীষ্টধর্মে যীশু খ্রীষ্ট এবং ঈশ্বরের মধ্যকার সম্পর্ক দাস এবং দাস মালিকের নয়, বরং পুত্র এবং পিতার। উভয়ের মধ্যে ক্ষমতার বিভাজনও সুস্পষ্ট এবং বিরাট। বাইবেল অনুযায়ী প্রলয় ও বিচার দিবস পর্যন্ত স্বর্গ এবং পৃথিবীর যাবতীয় কর্তৃত্ব বিশ্বস্রষ্টা ঈশ্বর কর্তৃক যীশু খ্রীষ্টের হাতে অর্পিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, বাইবেলে বলা হচ্ছে যে, শেষ বিচার দিবসে মানুষের পাপ-পুণ্যের বিচার যীশু খ্রীষ্ট নিজে করবেন। বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, খ্রীষ্টধর্মের ঈশ্বরের অবস্থা ইংল্যান্ডের রাজা বা রাণীর চেয়ে বিশেষ সুবিধার নয়।

 

এই রকম এক ধর্ম যেখানে ঈশ্বর এবং যীশুর মধ্যে ক্ষমতা বা দায়িত্বের পৃথকীকরণের ধারণার মাধ্যমে ক্ষমতার দ্বৈততা বা বিভাজনের স্বীকৃতি আছে তেমন এক ধর্মের সমাজেও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র একটি কেন্দ্রে একীভূত হবার ফলে স্বৈরতন্ত্র কীভাবে বিকাশ লাভ করে এবং তার ফলে ব্যক্তির বিকাশ কীভাবে বাধাগ্রস্ত হয় তার প্রমাণ পূর্ব ইউরোপ এবং বিশেষত রাশিয়া। ব্যক্তির এই সীমাবদ্ধতার ফলে রাশিয়ার নেতৃত্বে পূর্ব ইউরোপের দ্রুত আধুনিকায়ন ও অগ্রযাত্রার জন্য ব্যক্তির পরিবর্তে রাজনৈতিক দলকে উদ্যোগী ভূমিকা নিতে হয়েছে।

 

ব্যক্তির অক্ষমতায় পশ্চিম ইউরোপের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাবার তাগিদে পূর্ব ইউরোপ যে পথ নিল তা হল কমিউনিস্ট আদর্শের অনুসারী একক রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে পরিচালিত রাষ্ট্র ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত শিল্পায়নের পথ। একটা পর্যায়ে সেখানে একক রাজনৈতিক দল হিসাবে কমিউনিস্ট পার্টির শাসনের যেমন অবসান ঘ’টে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু হয়েছে তেমন ব্যক্তি মালিকানাধীন পুঁজিবাদী অর্থনীতির বিকাশের পথেও যাত্রা শুরু হয়েছে।

 

এটা খুবই লক্ষণীয় যে, পশ্চিম ইউরোপের তুলনায় কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলিতে শাসক রাজনৈতিক দল এবং রাষ্ট্র ধর্মের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অনেক বেশী অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। এমন কি চীন-ভিয়েৎনামের মত দেশগুলিতেও আমরা একই ঘটনা ঘটতে দেখি। অথচ এইসব দেশে যে ধর্ম সবচেয়ে বেশী প্রভাবশালী সেটা হচ্ছে বৌদ্ধ ধর্ম, যা পৃথিবীর সকল প্রধান ধর্মের মধ্যে সবচেয়ে উদার এবং পরমত সহিষ্ণু। এমনকি এটা এমন এক ধর্ম যেখানে বিশ্বস্রষ্টা ও পালন কর্তা হিসাবে ঈশ্বর ধারণারও স্থান নাই। তবে দেহাতীত আত্মার ধারণাকে কেন্দ্র করে এই ধর্ম গড়ে উঠায় সেখানে বিভিন্ন অলৌকিক শক্তি বা দেব-দেবীর ধারণার জায়গা আছে। জীবনের দুঃখময়তা, আত্মার জন্মান্তর বা নূতন জীবদেহ গ্রহণ এবং পুন্যকর্মের মধ্য দিয়ে অবশেষে জন্মান্তর চক্রের অবসান ঘ’টে আত্মারও বিলুপ্তি বা নির্বাণ ইত্যাদি ধারণার মাধ্যমে এটা একটা অলোকবাদী এবং অন্ধ বিশ্বাস নির্ভর ধর্ম হিসাবে বিকাশ লাভ করেছে। এই ধর্মের প্রভাব থাকলে সমাজ অভ্যন্তরে যুক্তিবাদী ও বিজ্ঞান মনস্ক মানুষের বিকাশের পথে যে বাধা বা সমস্যা সৃষ্টি হয় তাকে মোকাবিলা করতে গিয়ে চীন-ভিয়েৎনামের মত দেশগুলিতেও রাষ্ট্র সর্বদা ধর্মকে ছাড় দিতে পারে নাই, বরং ধর্মের প্রভাব থেকে সমাজকে মুক্ত করার জন্য ধর্মের বিরুদ্ধে সংগ্রামে তাকে কম-বেশী ভূমিকা রাখতে হয়েছে।

 

এই যেখানে অবস্থা সেখানে আমাদের মত ইসলাম শাসিত সমাজে ধর্মের কারণে সমাজের উন্নয়ন ও গণতন্ত্রায়নের সমস্যা অকল্পনীয় রকম কঠিন। পশ্চিম ইউরোপ তথা পাশ্চাত্যকে মোকাবিলা করে স্বাধীনভাবে এবং মর্যাদার সঙ্গে এগিয়ে যেতে চেয়ে রাশিয়া-চীনের মত দেশগুলো পাশ্চাত্যের সামাজিক পরিবর্তন এবং শিল্পায়নের ধারণাকে নিজেদের মত করে এবং স্বাধীনভাবে গ্রহণ এবং প্রয়োগ করেছে। ফলে তারা তাদের নিজস্ব উন্নয়ন এবং গণতন্ত্রায়নের পথ উদ্ভাবন এবং অনুসরণ করেছে।

 

রাশিয়ায় সমাজতন্ত্রের নামে রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ এবং একদলীয় গণতন্ত্রের মাধ্যমে সমাজকে একটা পর্যায় পর্যন্ত এগিয়ে নিবার পর বহুদলীয় গণতন্ত্র এবং ব্যক্তি মালিকানাধীন বুর্জোয়া অর্থনীতি প্রর্বতন করা হয়েছে। এই পট পরিবর্তন ঘটাতে গিয়ে পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে গেছে। তবে সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। এবং এর দ্বারা ১৯১৭-তে রুশ বিপ্নবের মাধ্যমে রাশিয়াসহ সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলোতে যে বিপুল উন্নয়ন সাধিত হয়েছে সেটা মিথ্যা হয়ে যায় না। একটা ব্যবস্থা একটা ইতিবাচক ভূমিকা শেষ করে চলে গেছে এভাবেই বরং ঘটনাটাকে ব্যাখ্যা করা উচিত। তবে ব্যবস্থাটার কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। কোথায় কীভাবে ছিল সেটা ভিন্ন আলোচনার বিষয়।

 

একইভাবে চীনও সনাতন সমাজতান্ত্রিক ধারণাতে অনেক পরিবর্তন এনেছে। সেখানে এখন পর্যন্ত গণতন্ত্র মূলত এক দল তথা শাসক কমিউনিস্ট পার্টির ভিতরই সীমাবদ্ধ। তবে অর্থনীতিতে রাষ্ট্রীয় মালিকানার পরিবর্তে এখন ব্যক্তি মালিকানাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। সমাজতান্ত্রিক বাজার অর্থনীতি নাম দিয়ে সেখানে যে অর্থনীতি গড়ে তোলা হয়েছে সেটাকে মিশ্র অর্থনীতি বলা যায়। ভিয়েৎনামও একই পথ অনুসরণ করছে। এই উভয় দেশে বহু দলীয় গণতন্ত্র এখন পর্যন্ত না থাকলেও সমাজ ও অর্থনীতির উন্নয়ন এবং স্বাধীন ব্যক্তিসত্তার বিকাশ যে সেদিকে দেশকে নিবে তা বলা যায়। তবে সেটা কখন কীভাবে হবে তা এখন পর্যন্ত বলা যায় না।

 

আসলে প্রত্যেক সমাজকে স্বাধীনভাবে তার বাস্তবতা অনুযায়ী উন্নয়ন ও গণতন্ত্রায়নের নিজস্ব পথ উদ্ভাবন করা উচিত। যারা স্বাধীন থাকতে অথবা হতে চায়, জাতি বা রাষ্ট্র হিসাবে নিজেদের মর্যাদা রক্ষা করতে চায় তারা সেটাই করে। এর আর একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত জাপান।

 

কিন্তু ইসলামের অবিশ্বাস্য রকম কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ভিতর থেকে স্বাধীন ব্যক্তিসত্তার জাগরণ যেমন অসম্ভব হয়ে থাকে তেমন অসম্ভব হয়ে থাকে উন্নত সমাজ শক্তির উদ্ভব ও বিকাশ। ইসলামে ভিন্নতা তথা ভিন্ন মত বা চিন্তার সামান্যতম জায়গা নাই। তার সমগ্র চিন্তা পদ্ধতিই চরম ও নিরঙ্কুশভাবে একনায়কী। কারণ সকল ক্ষমতা, গুণ ও প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ্‌র। আল্লাহ্‌র কোন শরীক বা অংশীদার নাই। তার শরীক বা অংশীদার করাকে সবচেয়ে বড় অপরাধ হিসাবে গণ্য করা হয়। বস্তুত আল্লাহ্‌র একক ক্ষমতার ধারণার মাধ্যমে সমাজে নিরঙ্কুশ এককেন্দ্রিক তথা একনায়কী ক্ষমতার সপক্ষে চিন্তা-চেতনা ও সংস্কৃতি গড়ে উঠে। খ্রীষ্টধর্মের মত ক্ষমতার বিভাজন এখানে নাই। কিংবা বৌদ্ধ ধর্মের মত ঈশ্বর ধারণার অনুপস্থিতির ফলে উদার চিন্তার বিকাশের সুযোগও নাই। অন্যদিকে, আল্লাহ্‌ ও মানুষের সম্পর্কের ধারণা মোটেই খ্রীষ্টধর্মের ঈশ্বর ও যীশু তথা মানুষের মধ্যকার প্রেমময় পিতা ও সন্তানের সম্পর্কের অনুরূপ নয়। বরং ইসলামে আল্লাহ্‌ ও মানুষের সম্পর্ক মালিক ও বান্দার তথা দাস মালিক ও দাসের। এটা প্রকৃতপক্ষে শাসক ও শাসিতের সম্পর্ককে দাস মালিক ও দাসের সম্পর্ক রূপে দেখার আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। এই মালিকও এক কঠোর সত্তা। তার দয়াও এক কঠোর সত্তার দয়া মাত্র, যে দয়া তার স্বেচ্ছাচারের প্রকাশ। সুতরাং ইসলামে স্বাধীন ব্যক্তি মানুষের অস্তিত্ব নাই। আল্লাহ্‌র নিঃশর্ত দাসত্বের বিরোধিতা করতে গিয়ে শয়তান যেমন অভিশপ্ত ও ঘৃণিত হয়েছে, ইসলামী সমাজ শাসকের বিরোধিতাকারীও তেমন অভিশপ্ত ও ঘৃণিত। এখানে বিরোধিতাকারী, ভিন্ন মত পোষণকারী শয়তান স্বরূপ।

 

সনাতন ইসলামী সমাজে শাসক বা নেতার প্রতি বিরোধিতার কোন প্রকাশ্য এবং স্বাভাবিক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নাই, থাকতেও পারে না। সুতরাং গোপন চক্রান্ত এবং এই চক্রান্তের ফল স্বরূপ রক্তক্ষয়ী প্রাসাদ অভ্যুত্থান কিংবা রক্তক্ষয়ী বিদ্রোহ এই সমাজে বিরোধিতার স্বাভাবিক পদ্ধতি হয়ে দেখা দেয়।

 

এটা ঠিক যে, ইসলামের প্রবর্তক মোহাম্মদের মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিকারী খলীফা নির্বাচনের জন্য প্রাচীন আরবীয় ঐতিহ্য অনুসরণ করে এক ধরনের গণতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছিল। কিন্তু সেই সঙ্গে এ কথাও সত্য যে, কোন উন্নত ও নির্দিষ্ট গণতান্ত্রিক পদ্ধতি যেমন প্রবর্তন করা হয় নাই তেমন প্রথম থেকেই ছিল মোহাম্মদের চাচাতো ভাই আলীকে বঞ্চিত করার চক্রান্ত। প্রথম খলীফা আবু বকরের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সেটা যেমন স্পষ্ট তেমন দ্বিতীয় খলীফা ওমর এবং তৃতীয় খলীফা ওসমানের নির্বাচন বা মনোনয়নের মধ্য দিয়েও সেটা স্পষ্ট হয়েছে। এটাও লক্ষণীয় যে, শুধু ওমর এবং ওসমান নন, উপরন্তু চতুর্থ খলীফা আলীও ঘাতকের ছুরিতে নিহত হন। ইতিপূর্বে কোরাইশসহ আরব উপজাতিসমূহের ভিতর নেতা নির্বাচনের জন্য যে এক ধরনের গণতান্ত্রিক প্রথা ছিল তার প্রভাবে প্রথমেই বংশীয় রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত না হলেও শাসক বাছাইয়ে অনিশ্চয়তা, অস্থিরতা, রক্তপাত এবং বৈধতার সঙ্কট এড়াবার জন্য আলীর মৃত্যুর পর নির্বাচনের পথে না গিয়ে বংশগত রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। আলীর মৃত্যুর পর মোয়াবিয়া খলীফার পদ দখল করে বংশগত রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। এভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বরং সনাতন আরব উপজাতীয় সমাজের গণতান্ত্রিক রীতিনীতিরও অবসান ঘটে এবং ইসলামী সমাজ প্রবেশ করে চরম স্বৈরতন্ত্রের ভিতর, যেখানে ব্যক্তিসত্তার সামান্যতম অস্তিত্বও রইল না।

 

ইসলামী সমাজে গণতন্ত্রের সমস্যাকে আর একটু স্পষ্ট করার জন্য এই বিষয় বলা দরকার যে, বৌদ্ধ কিংবা খ্রীষ্টান ধর্মে ধর্ম নেতা ও রাষ্ট্র নেতা যেমন পৃথক হতে পেরেছে ইসলামে তেমন হতে পারে নাই রাষ্ট্র ক্ষমতাকে অবলম্বন করে ইসলামের বিকাশ ও প্রসার ঘটায়। বুদ্ধ কিংবা যীশু রাষ্ট্র নেতা ছিলেন না। কিন্তু মোহাম্মদ একই সঙ্গে ধর্ম নেতা এবং রাষ্ট্র নেতা। এর ফলে ইসলামে বৌদ্ধ বা খ্রীষ্ট ধর্মের মত রাষ্ট্র থেকে পৃথক পুরোহিততন্ত্র গড়ে উঠে নাই। মোহাম্মদের মৃত্যুর পর খলীফা কিংবা রাষ্ট্র শাসকরা ছিলেন একই সঙ্গে ধর্ম নেতা এবং রাষ্ট্র নেতা। তবে ধর্মীয় বিশেষ কর্মকাণ্ড পরিচালনা যেমন মসজিদে নিয়মিত নামাজ পরিচালনা, ওয়াজ অনুষ্ঠান ইত্যাদির জন্য রাষ্ট্র শাসকদের পক্ষে সময় ও মনোযোগ দেওয়া সম্ভব না হওয়ায় তাদের অধীনে এবং তাদের ধর্মীয় প্রতিনিধি হিসাবে মোল্লা সম্প্রদায় গড়ে উঠে। তাছাড়া ধর্মীয় বিধি-বিধান সম্পর্কে জ্ঞান লাভের প্রয়োজনে ধর্ম শাস্ত্রজ্ঞ বা আলেম সম্প্রদায় গড়ে উঠে। সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি যেহেতু কোরআন-সুন্না ভিত্তিক ধর্মীয় বিধি-বিধান সেহেতু মোল্লা এবং আলেম সম্প্রদায় সেগুলোর ব্যাখ্যা দিয়ে শাসকদেরকে সাহায্য করত।

 

বৌদ্ধ এবং খ্রীষ্ট ধর্মের সঙ্গে ইসলামের অপর একটা পার্থক্যকে বিবেচনায় নিতে হবে। সেটা হচ্ছে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব গঠন পদ্ধতির পার্থক্য। ইসলামে রাষ্ট্র থেকে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের স্বাতন্ত্র্য না থাকায় রাষ্ট্র প্রধানই এখানে ধর্ম প্রধান। ধর্ম ও রাষ্ট্র প্রধান নির্ধারণে নির্বাচনমূলক ব্যবস্থা গড়ে না উঠায় এখানে বংশগত রাজতন্ত্র এবং সেই সঙ্গে চক্রান্ত ও যুদ্ধ শাসক ও ধর্ম নেতা নির্ধারণের পদ্ধতি হিসাবে অনুসৃত হয়। কিন্তু বৌদ্ধ ও খ্রীষ্ট সমাজে ধর্মীয় নেতা প্রতিষ্ঠায় কম-বেশী নির্বাচনমূলক ব্যবস্থা থেকেছে। বৌদ্ধ এবং ব্যাথলিক খ্রীষ্টান সমাজে পুরোহিত সম্প্রদায়ের ভিতর বিবাহ নিষিদ্ধ হওয়ায় এখানে ধর্ম নেতা প্রতিষ্ঠায় বংশতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সুযোগ থাকে নাই। সঙ্ঘ বা চার্চ প্রধান নির্বাচিত হয়। বৌদ্ধ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ক্যাথলিক চার্চের মত কেন্দ্রীভূত প্রতিষ্ঠান নয়। তবে স্বতন্ত্র সঙ্ঘগুলির প্রধানগণ নির্বাচিত হন। একইভাবে রোমান ক্যাথলিক চার্চ প্রধান বা পোপও যাজক সম্প্রদায় কর্তৃক নির্বাচিত ধর্ম নেতা। ইসলামে এমন কোন ব্যবস্থা টিকতে পারে না বলেই টিকে নাই।

 

এই ব্যবস্থা সাধারণভাবে কাউকেই যুক্তিবাদী ও সহনশীল থাকতে দেয় না। শুধু যে শাসকই কঠোর ও স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠে তা-ই নয়, উপরন্তু শাসিতও এমন শাসকের উপযুক্ত হয়। ফলে পরিচালক বা শাসকের উদারতাকেও অনেক সময় দুর্বলতা রূপে ধরে নিতে পারে শাসিত জনগণ। ধর্ম বিশ্বাস এবং সেই সঙ্গে তার নিয়মিত চর্চা দ্বারা প্রতিটি মানুষ তার মনোজগতে হয়ে উঠে একই সঙ্গে একজন কঠোর, স্বেচ্ছাচারী মালিক এবং আত্মসমর্পিত বান্দা। শক্তি বা ক্ষমতা থাকলে প্রত্যেকে হয়ে উঠে স্বেচ্ছাচারী মালিক বা দাস প্রভু আর না থাকলে অনুগত বান্দা বা দাস। নেতা বা শাসকের স্বৈরতার ক্ষমতা এবং অনুসারী বা শাসিতের প্রশ্নহীন আনুগত্য এই ব্যবস্থার মূল ভিত্তি। এখানে কারও স্বাধীন সত্তা নাই। নাই ভিন্ন চিন্তা ও জীবনাচরণের প্রতি সহিষ্ণুতা বা অনুমোদন। সুতরাং নাই গণতান্ত্রিকতা। ধর্মীয় বিধান দ্বারা সমগ্র চিন্তা প্রক্রিয়া ও জীবনাচরণকে নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে কঠোরভাবে আবদ্ধ করে দেওয়া আছে। ছকের বাইরে যাতে কেউই যেতে না পারে সে দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখার দায়িত্ব শুধু শাসকের নয়, উপরন্তু প্রতিটি ব্যক্তি এবং সমগ্র সমাজের। তবে উপর তলায় স্বৈরতান্ত্রিক ক্ষমতার অধিকারী শাসকের ধর্মীয় বিধানের কিছু সীমিত লঙ্ঘন সমাজ মেনে নিলেও সাধারণের সে ধরনের লঙ্ঘনের প্রতি হয়ে থাকে নিদারুণভাবে আক্রমণাত্মক। আসলে গোটা ব্যবস্থাটাই সর্বস্তরে একনায়কী কঠোরতা ও সহিংসতা দাবী করে, যার অংশ হিসাবে থাকে দয়া ও বিবেচনা। কারণ শুধু কঠোরতা দিয়ে জীবন যেমন চলে না তেমন শুধু কঠোরতা দিয়ে সবচেয়ে কঠোর ব্যবস্থাকেও রক্ষা করা যায় না। এই কারণে চেঙ্গিস খানের মত নৃশংস যোদ্ধা ও শাসকও তার অনুসারী ও অনুগতদের প্রতি দয়া ও বিবেচনার প্রকাশ ঘটাতে জানতেন।

 

এই রকম এক সমাজের অস্তিত্ব, প্রসার ও বিকাশের এক প্রধান উপায় ছিল যুদ্ধ। যুদ্ধ দ্বারা ভিন্ন সমাজের সম্পদ, মেধা ও শ্রমশক্তি অব্যাহতভাবে লুণ্ঠন দ্বারা এক সময় এই সমাজের যেটুকু সম্ভব সেটুকু বিকাশ হয়েছিল। কিন্তু যখন অন-ইসলামী সমাজ বিশেষত ইউরোপ উন্নততর সংস্কৃতি, সমাজ সংস্থা এবং প্রযুক্তি ও অস্ত্রের অধিকারী হয়ে আঘাত করেছে তখন ইসলামী সমাজের পতন শুরু হয়েছে এবং তার সনাতন ব্যবস্থাও ভেঙ্গে পড়তে শুরু করেছে।

 

কিন্তু ইসলামী দেশগুলি রাশিয়া, চীন বা ভিয়েৎনামের মত বাস্তবতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের উত্তরণ ঘটাতে পারে নাই। ফলে মুসলিম পৃথিবীর নিয়তি হয়েছে সমাজ সংগঠন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উন্নততর পশ্চিম ইউরোপ বা পাশ্চাত্যের অধীনতা ও দাসত্ব। শত শত বৎসর যাবৎ মুসলিম পৃথিবীর উপর পাশ্চাত্যের আধিপত্য চলছে। এর ফলে মুসলিম সমাজও আর পূর্বের রূপে থাকতে পারে নাই। পাশ্চাত্য প্রভুদের চাপে এবং প্রয়োজনে এখানে পরিবর্তন ঘটেছে এবং আজও ঘটে চলেছে। কিছু করে বিদেশী পুঁজি ও শিল্প এসেছে। তার প্রভাবে ভিতর থেকেও পুঁজি ও শিল্পের সীমাবদ্ধ হলেও বিকাশ হয়েছে। আধুনিক শিক্ষা ও প্রযুক্তির প্রভাবে সমাজ চেতনায়ও কিছু পরিবর্তন হয়েছে। ফলে ব্যক্তিরও কিছু মুক্তি হয়েছে। অনেক দেশে গণতন্ত্রের কিছু উপাদানও আমদানী হয়েছে, যেমন নির্বাচনমূলক শাসন ব্যবস্থা।

 

কিন্তু সমাজ তল বাহির থেকে আসা এইসব পরিবর্তনকে আত্মস্থ করতে তথা ভেঙ্গেচুরে নিজেদের মত করে রূপ দিতে পারে না বলে এই সকল পরিবর্তন হয়ে থাকে শুধুই উপর থেকে চাপানো বা আরোপ, শিকড়হীন ও ভাসমান। সর্বদা কম-বেশী অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতা ঘিরে রাখে এইসব বহিরারোপিত পরিবর্তনকে। মরুভূমিতে যেমন কৃষি বা ধান চাষ হয় না তেমন মরুময় চেতনার ক্ষেত্রে সভ্যতার ফসল ফলবে কেমন করে? এই রকম সমাজে পরিবর্তন ও অগ্রগতির বল্‌গা ধরা আছে মার্কিন নেতৃত্বাধীন পাশ্চাত্যের হাতে।

 

পাশ্চাত্যের বাজার রক্ষার স্বার্থেই এখানে উন্নয়ন কিছু করে হবে। যতই ইসলামী জঙ্গীবাদীরা পাশ্চাত্যকে প্রতিহত করতে চাক এটা অসম্ভব হয়ে থাকবে। এ হল চিন্তার জগতে ঢাল-তলোয়ার-ঘোড়া নিয়ে কামান-বন্দুক-ট্যাংকের বিরুদ্ধে এক হাস্যকর অসম যুদ্ধ। পাশ্চাত্য ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিবেচনা থেকে ইসলামী উগ্রপন্থীদেরকে ভয় পেতে পারে। কিন্তু সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার ক্ষমতা যে জঙ্গী ইসলামী শক্তিসমূহের নাই সে কথা পাশ্চাত্য শক্তিবর্গ খুব ভালভাবেই জানে।

 

এই বাস্তবতায় আমাদেরকে ঠিক করতে হবে আমরা উন্নয়নের নিজস্ব এবং স্বাধীন পথ উদ্ভাবন বা নির্মাণ করব, নাকি পাশ্চাত্যের অনুগামী ও অধীনস্থ হয়ে পায়ে শিকল বাঁধা দাসের মত সীমাবদ্ধ উন্নয়নের পথ ধরে হোঁচট খেয়ে এগিয়ে যাব।

 

হাঁ, এটাও একটা পথ। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে আড়াই শত বৎসর ধরে আমরা এ পথেই চলছি। এ পথে চলতে চাওয়ার লোকের অভাব এ দেশে আজ অবধি হয় নাই। মীর জাফর আর তার দল-বল শুধু ১৭৫৭-তে পলাশীর প্রান্তরে উপস্থিত ছিল তা তো নয়, এ কালেও আছে। সামরিক-বেসামরিক আমলা, রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীদের সকলে না হোক অনেকে যে এ পথের সমর্থক, প্রবক্তা সে কথা কে না জানে? আর এ পথের বাইরে নূতন পথ নির্মাণ করতে হলে আমাদের চেতনার জগতে ঘটাতে হবে এক নবজাগরণ। কারণ আগে চেতনার জগৎকে মুক্ত করতে না পারলে বাস্তবের মুক্তি অসম্ভব হয়ে থাকবে।

 

কিন্তু ধর্মের আধিপত্য মুক্ত হয়ে মুসলিম পৃথিবীর নবজাগরণ মার্কিন নেতৃত্বাধীন পাশ্চাত্য স্বার্থের নিকট কাম্য হতে পারে না। তাদের প্রয়োজন এমন এক মুসলিম সমাজ যার নেতৃত্বকারী শ্রেণীসমূহ তথা মাথা হবে পুরোটা না হলেও অনেকটা আধুনিক, অন্যদিকে আম জনতা তথা শরীর হবে যথেষ্ট পরিমাণে ধর্ম নির্ভর ও পশ্চাৎপদ। এই অবস্থায় সমাজ সর্বদা এমন এক অস্বাভাবিক আত্মদ্বন্দ্বের ভিতর থাকবে যার কারণে নেতৃত্বকারী শ্রেণীগুলি বাধ্য হবে পাশ্চাত্যের উপর নির্ভর করে টিকে থাকতে এবং ফলে সমগ্র সমাজও বাধ্য হবে পাশ্চাত্যের অধীনতায় থাকতে।

 

যদি আমরা সীমাবদ্ধ উন্নয়নের পরিবর্তে অবাধ উন্নয়নের নিজস্ব পথ নির্মাণ করে এগিয়ে যেতে চাই তবে শুধু রাষ্ট্র ব্যবস্থা ও অর্থনীতিতে পরিবর্তনে কি কাজ হবে, নাকি ভাবাদর্শেও পরিবর্তন আনতে হবে? পশ্চাৎপদ ভাবাদর্শে আচ্ছন্ন সংখ্যাগুরু ভোটারদের ভোটে যারা নির্বাচিত হয়ে আসবে তারা কি পুরাতন ব্যবস্থাটাকেই পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে না কিংবা অব্যাহত রাখবে না? ১৯৭২-এর সংবিধানের চার মূলনীতি, সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ১৯৯০-এর গণ-অভ্যুত্থান কালীন তিন জোটের রূপরেখা এবং সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদের* মাধ্যমে দেশ শাসনের প্রতিটি স্তরে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠার সুস্পষ্ট সাংবিধানিক নির্দেশ এবং সর্বোপরি ক্ষমতায় যাবার পর প্রতিটি নির্বাচনের পূর্বে দেওয়া রাজনৈতিক দলগুলির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কী পরিণতি হয়েছে তা কি আমাদের জানা নাই? আসলে একনায়কতান্ত্রিক, স্বৈরতান্ত্রিক ধর্ম-সংস্কৃতির নিগড়ে আবদ্ধ সমাজ তথা গরিষ্ঠ জনগণের ভিতর থেকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র চেতনার উন্মেষ বা উত্থান ঘটানোর চিন্তা একটা হাস্যকর কল্পনা মাত্র। এই ধরনের চেতনা বরং একনায়কী এবং স্বেচ্ছাচারী সেনা শাসনের সঙ্গে অনেক বেশী সঙ্গতিপূর্ণ।

 

---------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
* বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৯ এবং ৬০ অনুচ্ছেদ নিম্নরূপঃ

স্থানীয় শাসনঃ

৫৯। (১) আইনানুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহের উপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক এককাংশের স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান করা হইবে।

(২) এই সংবিধান ও অন্য কোন আইন-সাপেক্ষে সংসদ আইনের দ্বারা যেরূপ নির্দিষ্ট করিবেন, এই অনুচ্ছেদের (১) দফায় উল্নিখিত অনুরূপ প্রত্যেক প্রতিষ্ঠান যথোপযুক্ত প্রশাসনিক এককাংশের মধ্যে সেইরূপ দায়িত্ব পালন করিবেন এবং অনুরূপ আইনে নিম্নলিখিত বিষয়­সংক্রান্ত দায়িত্ব অন্তর্ভুক্ত হইতে পারিবেঃ

(ক) প্রশাসন ও সরকারী কর্মচারীদের কার্য;

(খ) জনশৃংখলা রক্ষা;

(গ) জনসাধারণের কার্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন­সম্পর্কিত পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন।

৬০। এই সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদের বিধানাবলীকে পূর্ণ কার্যকরতাদানের উদ্দেশ্যে সংসদ আইনের দ্বারা উক্ত অনুচ্ছেদে উল্নিখিত স্থানীয় শাসন­সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানসমূহকে স্থানীয় প্রয়োজনে কর আরোপ করিবার ক্ষমতাসহ বাজেট প্রস্তুতকরণ ও নিজস্ব তহবিল রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষমতা প্রদান করিবেন।
---------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

 

এই কারণে এ দেশে পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে এরশাদীয় শাসন পর্যন্ত প্রতিটি সেনা শাসনের পর দেশে প্রবলতর মাত্রায় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ইসলামীকরণ হয়েছে। সেনাবাহিনীর যে জনভিত্তি ও সংযোগের অভাব এ দেশে থেকেছে তা পূরণ করার জন্য সেনাবাহিনী সবচেয়ে সহজ এবং কার্যকর হাতিয়ার হিসাবে বার বার দেখেছে ধর্মকে। ধর্মের আবেদনের সামনে আম জনতা দুর্বল হয়ে যায়। উপরন্তু ইসলাম ধর্মের ভিতরে সামরিক একনায়কতন্ত্রের অনুকূলে যে ঐতিহ্য ও চিন্তা পদ্ধতি আছে এ ক্ষেত্রে সেটা খুব কাজে লাগে। এটা ঠিক যে, সামরিক শাসন শেষ পর্যন্ত টিকে নাই। কিন্তু সেটা মূলত উদারনৈতিক চেতনার অধিকারী ও অগ্রণী ছাত্র, মধ্যবিত্ত এবং শ্রমিক-কৃষকদের আন্দোলনের ফলে। অবশ্য একদিকে মধ্যবিত্তের বিকাশ, এবং অপর দিকে গণতান্ত্রিক পাশ্চাত্য সভ্যতার ভাবাদর্শগত ও বাস্তব প্রভাব এবং যোগাযোগ সামরিক শাসনকে নৈতিকভাবে যথেষ্ট দুর্বল করে বলেও সামরিক শাসনকে বেশী দিন টিকানো যায় না। একটা পর্যায়ে তাকে দলীয় এবং নির্বাচনমূলক রূপ দিতে হয়। তবে তাতেও কাজ হয় না। জনগণের সচেতন ও অগ্রণী অংশের আন্দোলনে নির্বাচিত দলের আবরণ দেওয়া সামরিক স্বৈরতার পতন হয়। জনগণের এই অংশকে পশ্চাৎপদ সংখ্যাগুরু আম-জনতার সঙ্গে মিলাবার চেষ্টা করাটা ভুল হবে। বরং নির্বাচনের মাধ্যমে এই অগ্রণী ও প্রগতিশীল জনশক্তি বার বার এ দেশে পরাজিত ও কোণঠাসা হয়েছে। এবং ক্ষমতা কেন্দ্রিক রাজনৈতিক দলগুলো সকলেই ধর্মের আবেদনকে কম-বেশী যার যার মত ক’রে ব্যবহার ক’রে নির্বাচনে জয়লাভের পথ সুগম করতে চেয়েছে। এভাবে সেনা রাজনীতির মত দলীয় রাজনীতিতেও ধর্মের ব্যবহার অব্যাহত থাকে। সুতরাং নির্বাচনের রাজনীতিতে শুধু অর্থ ও পেশীশক্তির ব্যবহারকে দেখলে হবে না, ধর্মের ব্যবহারকেও দেখতে হবে।

 

ধর্মের ব্যবহার দ্বারা জনপ্রিয় হওয়া যেতে পারে, কিন্তু গণতান্ত্রিক হওয়া যায় না। বরং ব্যাপক জন-সমর্থিত ও নির্বাচন নির্ভর বৃহৎ দলগুলির ভিতর গণতন্ত্রের অভাব, একনাযকতন্ত্র এবং পরিবারতন্ত্রের সবচেয়ে বড় উৎস হয়ে আছে জন-চেতনায় ধর্ম-সংস্কৃতির প্রভাব। ইসলামের নিরঙ্কুশ একত্ববাদী চিন্তা-চেতনা এবং মালিক-বান্দা সম্পর্কমূলক ধারণার প্রভাব গরিষ্ঠ জন-সমর্থিত রাজনৈতিক দলের ভিতর গণতন্ত্রের বিকাশের কোনও বাস্তবতাই রাখে না। সুতরাং গণতন্ত্রের সমস্যাকে শুধু রাষ্ট্র কাঠমোর দিক থেকে না দেখে এ দিক থেকেও দেখতে হবে।

 

আমাদের সমাজের বাস্তবতায় বহু দলীয় নির্বাচন পদ্ধতিতে নির্বাচিত জন-প্রতিনিধিদের কাছ থেকে আমরা উন্নত গণতান্ত্রিক আচরণ এবং নৈতিক মূল্যবোধ যেন আশা না করি। এ পথে বার বার ফিরে আসবে রাষ্ট্র ব্যবস্থার ক্রমিক অধোগতি, রাজনৈতিক অচলাবস্থা, তথাকথিত দাতা দেশগুলোর প্রতিনিধিদের আমাদের জন্য অসম্মানজনক ঘন ঘন দৌড়-ঝাঁপ, পরামর্শ, পর্দার আড়ালে কূটচাল এবং যে নামেই হোক সামরিক হস্তক্ষেপ। এরপর পুনরায় নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের নামে শুরু হবে আর এক ইতরতন্ত্রের পথে যাত্রা।

 

এমন কি সকল স্তরে জন-প্রতিনিধিত্বমূলক শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করে বহু দলীয় নির্বাচন দেওয়া হলেও কি সেই ব্যবস্থা টিকসই হবে? স্বৈরতান্ত্রিক ও নিরঙ্কুশভাবে এককেন্দ্রিক সংস্কৃতি ও ভাবাদর্শে অভ্যস্ত সংখ্যাগুরু জনগণ স্ব-শাসনমূলক স্থানীয় ব্যবস্থাকে রক্ষা করতে অক্ষম হবে। শুধু তা-ই নয়, বরং ভাবাদর্শিক ও সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি না থাকায় দেশ শাসনের সকল স্তরে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন প্রবর্তন করার ফলে প্যান্ডোরার বাক্স খুলে যাবে। কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্রের যত দোষ থাক, রাষ্ট্রীয় ঐক্য ও প্রশাসনের কেন্দ্রীয় শক্তি হিসাবে তার কাজ করার দক্ষতা ও ক্ষমতা থাকায়, সমাজে যেটুকু ঐক্য, শৃঙ্খলা ও স্থিতি আছে আমলাতন্ত্রের কঠোরতাপূর্ণ কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের অবসানের সঙ্গে সঙ্গে সেসবই ভেঙ্গে পড়বে এবং সর্বত্র বিস্তৃত হবে বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য। এভাবে প্রকৃতপক্ষে সমাজ ও রাষ্ট্রের ধ্বংসের শক্তি মুক্ত হবে। এই অবস্থায় সমাজের শৃঙ্খলা, স্থিতিশীলতা এবং রাষ্ট্রের অখণ্ডতা রক্ষার জন্য জনগণই দাবী করবে সুকঠোর সামরিক একনায়কী হস্তক্ষেপ।

 

তাহলে কি জনগণকে গণতান্ত্রিক ভাবাদর্শে দীক্ষিত করার পূর্ব পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে? এ ধরনের মত দেওয়ার অর্থ হবে বিদ্যমান ব্যবস্থাকে অনন্তকাল স্থায়ী করতে চাওয়া। বস্তুত গরিষ্ঠ জনগণ চেতনাগতভাবে এতটা উন্নত নয় যে, বাস্তব কাঠামোগত অবলম্বন ছাড়া তারা তার উপযোগী চেতনা বা ভাবাদর্শকে ধারণ করবে। কাজেই গণতান্ত্রিক কাঠামো হিসাবে স্তর বিন্যস্ত স্বায়ত্তশাসনমূলক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি গণতান্ত্রিক ভাবাদর্শ প্রতিষ্ঠার কাজও করতে হবে। এই দুই কাজ সমন্বিতভাবে করতে হবে।

 

কিন্তু প্রশ্ন, কাজটা করবে কে? আমলাতন্ত্রের অংশ হিসাবে সেনাবাহিনীর নিকট থেকে একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা ও তার উপযোগী ভাবাদর্শ প্রতিষ্ঠার নেতৃত্ব আশা করা যায় না। অন্যদিকে বহুদলীয় নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠা রাজনৈতিক দলগুলির কোনটির কাছ থেকেই আমরা এই নেতৃত্ব আশা করতে পারি না। কারণ তাদের গঠন প্রকৃতিই ভিন্ন। তাহলে কাজটা এ দেশে করবে কে?

 

এ কাজ করতে পারে একমাত্র একটি শক্তিশালী ও আদর্শনিষ্ঠ রাজনৈতিক দল বা শক্তি। এমন একটি দল গঠনের উপাদান সমাজের সর্বস্তরে কম-বেশী থাকলেও সাধারণভাবে সমাজ তলের অক্ষমতার জন্য তেমন একটি দল বা শক্তি এ দেশে আজ অবধি নীচ থেকে কার্যকরভাবে গড়ে উঠতে পারে নাই। এই অবস্থায় বর্তমান গভীর সঙ্কট ও অচলাবস্থার অবসান ঘটিয়ে একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এগিয়ে যাবার জন্য ’৭২-এর সংবিধানের চার মূলনীতিসহ কতকগুলি মূলনীতি ও কর্মসূচীর ভিত্তিতে একটি জাতীয় সরকার গঠনকেই আমি এই মুহূর্তে একমাত্র বিকল্প হিসাবে দেখি।

 

 

জাতীয় সরকারের গুরুত্ব ও ভূমিকা

 

বাংলাদেশের জন্য পথ পরিবর্তনের সময় হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে ৩৫ বৎসর কাল যে পথে বাংলাদেশ চলেছিল তা ছিল চরম আত্মদ্বন্দ্ব, মিথ্যা, প্রতারণা, দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন এবং দেশ ও জনগণকে নিয়ে একদল ক্ষমতাসীন দলীয় ও সামরিক রাজনীতিকের ছিনিমিনি খেলার পথ। ২০০৭-এর ১১ জানুয়ারীর রাজনৈতিক পট পরিবর্তন এই পথ চলায় পরিবর্তনের সম্ভাবনা উপস্থিত করেছে। তবে এটা এখন পর্যন্ত একটা সম্ভাবনা মাত্র এবং বাস্তবে এখনও বাংলাদেশের জন্য নূতন যাত্রাপথ রচিত হয় নাই।

 

অথচ বিগত ৩৬ বৎসর কাল ধরে বিভিন্ন দিক থেকে সৃষ্ট সঙ্কট ও দ্বন্দ্বগুলির পুঞ্জিভূত চাপ ক্রমে একটা বিস্ফোরণোন্মুখ পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে, যা দেশের জন্য অশুভ পরিণতি বয়ে আনতে পারে। ২০০৭-এর জানুয়ারীর পট পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত বর্তমান সরকার যেমন এই পরিস্থিতিকে সামাল দিবার জন্য উপযুক্ত নয় তেমন তার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ২০০৮-এর মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিণতিও যে দেশের জন্য শুভ হবে না সে কথা এই আলোচনা থেকে আশা করি কিছুটা হলেও স্পষ্ট হয়েছে।

 

অবশ্য শুধু অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির কারণে যে সঙ্কট ঘনীভূত হচ্ছে তা-ই নয়, উপরন্তু বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণেও বাংলাদেশের জন্য সঙ্কট ঘনীভূত হচ্ছে। বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান ও গুরুত্ব, খনিজ সম্পদ এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ইত্যাদি সব মিলিয়ে এমন এক পরিস্থিতির ভিতর বাংলাদেশ আছে যা তার অস্তিত্বকে যে কোন সময় বিপন্ন করতে পারে।

 

এই রকম পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হলে ৩৬ বৎসরের অনুসৃত পথ থেকে সরিয়ে নূতন পথে তাকে নিতে হবে। অর্থাৎ এ বাংলাদেশ হবে নূতন বাংলাদেশ। আর এই নূতন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথে যাত্রাবিন্দু হতে পারে জাতীয় সরকার।

 

জাতীয় সরকার গঠিত হবে ’৭১-এর জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার ও ভাবপ্রেরণাকে ধারণ ক’রে এবং ’৭২-এর সংবিধানের চার মূলনীতির ভিত্তিতে। এটা ঠিক যে, ’৭১-এর জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের অনেক সীমাবদ্ধতা ও সমস্যা আছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও জাতীয় মুক্তিযুদ্ধকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের নূতন যাত্রা পথ নির্মাণ করা অসম্ভব। বরং তার ভাবপ্রেরণাকে ধারণ ক’রে এবং সীমাবদ্ধতা ও সমস্যাগুলিকে চিহ্নিত ক’রে আমাদেরকে নূতন যাত্রা পথ নির্মাণ করতে হবে। এই প্রসঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি বলা দরকার যে, ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে ’৬০-এর দশকে বাঙ্গালী জাতির স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক ও লোকবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে রাজনীতি ও আন্দোলন গড়ে উঠেছিল ’৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল তারই পরিণত রূপ। কিন্তু নেতৃত্বের সমস্যা, ভারতের ভূমিকা, ইত্যাদি কারণে এই যুদ্ধ যেমন তার যথাযথ পরিণত রূপ নিতে পারে নাই তেমন ’৭১-উত্তর বাংলাদেশও এই যুদ্ধের ভাবপ্রেরণাকে ধারণ করে সঠিক পথে এগিয়ে যেতে পারে নাই।

 

১৯৭২-এর সংবিধানকেও দেখতে হবে একই দৃষ্টি থেকে। এই সংবিধানের কিছু সীমাবদ্ধতা ও ত্রুটি সত্ত্বেও তার চার মূলনীতি, যথা, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও লোকবাদ বা সেকিউলারিজম প্রকৃতপক্ষে বাঙ্গালীর ইতিহাসের প্রথম জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের ভিতর থেকে উঠে আসা কয়েকটি আকাঙ্ক্ষার একটি ঘনীভূত ও মূর্ত রূপ। এই চার মূলনীতিকে যারা সংবিধানে বিধৃত করেছিলেন তাদের সীমাবদ্ধতার কারণে সেগুলির বাস্তবায়ন হয় নাই। বরং দেশ সেখান থেকেও সরে গেছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, সেগুলির বাস্তবায়ন অবাস্তব বা অসম্ভব। বরং যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে স্বাধীনতার যুদ্ধ তিল তিল করে গড়ে উঠেছিল কেবলমাত্র সেই আকাঙ্ক্ষা ধারণকারী চার মূলনীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়েই বাংলাদেশ তার নূতন পথে যাত্রা শুরু করতে পারে। সুতরাং জাতীয় সরকারকে গঠন করতে হবে ’৭২-এর সংবিধানের চার মূলনীতির ভিত্তিতে। এই ভিত্তি বাদ দিয়ে যে ধরনের সরকার গঠিত হোক এবং তার যে নাম দেওয়া যাক তা বাংলাদেশকে সঙ্কট থেকে মুক্ত করে নূতন পথে নিতে পারবে না।

 

জাতীয় সরকার গঠনের শুরুতেই থাকতে হবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি। সুতরাং এটির গঠন পদ্ধতি হওয়া উচিত ’৭২-এর সংবিধানের চার মূলনীতির ভিত্তিতে একটি কনভেনশন অনুষ্ঠান। এই কনভেনশনে চার মূলনীতির প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ এবং পরীক্ষিত সৎ, দেশ প্রেমিক ও যোগ্য রাজনীতিক, ছাত্র, শিক্ষক, শ্রমিক, কৃষকসহ বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার প্রতিনিধিবৃন্দ অংশ নিবেন। একইভাবে সেনাবাহিনীসহ রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিবৃন্দও এই কনভেনশনে অংশ নিবেন। কনভেনশনের মাধ্যমে প্রতিনিধিগণ এমন একটি সরকার নির্বাচন করবেন যার সদস্যরা সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গের প্রতিনিধিত্ব ঘটাতে সক্ষম হবেন।

 

কিন্তু মনে রাখতে হবে জাতীয় সরকার গঠন প্রক্রিয়ার নেতৃত্বে যদি শুরু থেকেই সৎ, দেশ প্রেমিক ও যোগ্য রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদেরকে রাখা না যায় তবে পর্বতের মূষিক প্রসবের মত সকল আয়োজনই ব্যর্থ হবে। সমাজ ও রাষ্ট্র কাঠামোর যে পরিবর্তনের কথা ইতিপূর্বে আলোচনা করেছি জনগণের ভিতর গভীরভাবে প্রোথিত একটি শক্তিশালী ও কার্যকর রাজনৈতিক দল ছাড়া ভাসমান কোন সরকার দ্বারাই সেই পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব নয়। আর এই ধরনের দল কেবলমাত্র এমন নেতাদের নেতৃত্বেই গঠন করা সম্ভব।

 

সুতরাং অভিজ্ঞ, সৎ, যোগ্য ও দেশ প্রেমিক নেতা-কর্মীদের নেতৃত্বে একটি ঐক্যবদ্ধ, শক্তিশালী ও কার্যকর রাজনৈতিক দল গঠন করে তাকে জনগণের ভিতর নেওয়া জাতীয় সরকারের অন্যতম প্রধান করণীয়। সমাজ ও রাষ্ট্র কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের সমগ্র কর্মকাণ্ড সম্পাদনের অংশ হিসাবেই চলবে দল গঠনের কাজ। আবার বলছি, এই সমগ্র কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দিবার জন্য অপরিহার্য হচ্ছে দল গঠন ও রাজনৈতিক আন্দোলন পরিচালনার অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ এবং পোড় খাওয়া রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের নেতৃত্ব। অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের নেতৃত্বে দল গঠনের পরিণতি আমাদের অনেক দেখা আছে। আইয়ুবের কনভেনশন মুসলিম লীগ, জিয়ার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি এবং এরশাদের জাতীয় পার্টির মত খচ্চর পয়দা করে মীর জাফরের মত নওয়াবী করা যায়, কিন্তু স্বাধীন জাতীয় অর্থনীতি এবং উন্নত, গণতান্ত্রিক ও সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠন করা যায় না।

 

এখন হয়ত বলা হবে, বড় মাপের সৎ, যোগ্য ও দেশ প্রেমিক নেতা কোথায়? অর্থাৎ লক্ষ লক্ষ মানুষ দ্বারা সমর্থিত এবং চোখে পড়ার মত নেতা কোথায়, এই তো? এ কথার সহজ উত্তর হচ্ছে, বিগত ছত্রিশ বৎসর ছিল দুর্বৃত্তায়নের কাল। এ কালে সৎ ও দেশ প্রেমিক ব্যক্তি চোখে পড়ার মত বড় মাপের নেতা হবে কীভাবে? এ কালের বড় মাপের (!) নেতারা সবাই দুর্বৃত্ত অথবা দুর্বৃত্তায়নের পৃষ্ঠপোষকতাকারী কিংবা দেশের পরিবর্তে বিদেশী স্বার্থের সংরক্ষক। যারা সৎ, যোগ্য এবং দেশ প্রেমিক তারা কোণঠাসা এবং অপাংক্তেয় হয়ে গেছে। সমাজের লালনের অভাবে অনেকের যোগ্যতাও কমে গেছে। কারণ কোন না কোনভাবে সমাজের লালন বা সমর্থন ছাড়া সামাজিক কোন কিছুই দাঁড়ায় না। সমাজ বরং তাদেরকেই অনেক বেশী লালন করেছে যারা অধঃপতিত, যারা দুর্বৃত্ত অথবা যারা দুর্বৃত্তদেরকে সেবা করেছে নানানভাবে।

 

এই বাস্তবতায় বড় মাপের এবং যোগ্য বলে বিবেচনা করতে হবে তাদেরকে যারা শত প্রলোভন, চাপ ও বিপর্যয় সত্ত্বেও আত্মবিক্রয় না করে সৎ ও দেশ প্রেমিক থাকতে পেরেছে। ছত্রিশ বৎসরের সিডর বা ঝড় ও মহাপ্লাবনের তাণ্ডবের পরেও যে এ দেশে কিছু সংখ্যক সৎ, দেশ প্রেমিক ও আদর্শনিষ্ঠ রাজনীতিক বেঁচে বা টিকে আছে সেটাই কি তাদের শ্রেষ্ঠত্ব ও যোগ্যতার সবচেয়ে বড় মানদণ্ড হওয়া উচিত নয়?

 

দেশকে বাঁচতে হলে এখন এই মুষ্টিমেয় সংখ্যক সৎ ও দেশ প্রেমিক রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের নেতৃত্বকে অবলম্বন করা ছাড়া কোন উপায় নাই। হয়ত সমাজের লালনের অভাবে, বৈরী সময়ের স্রোতের আঘাতে কিছু ক্ষেত্রে অনেকেরই যোগ্যতা কমেছে। কিন্তু তাতে কী? নেতৃত্ব একক কোন ব্যাপার নয়। এটা একটা সামষ্টিক ব্যাপার। এখানে একজন প্রধান থাকে বা হয়ে উঠে মাত্র। যদি শুরুতে কিছু ক্ষেত্রে কম যোগ্য হয়েও থাকে তবে যোগ্যতর অনুসারীদের আবেষ্টন ও লালন পেলে সেসব ক্ষেত্রে কম যোগ্যরাও যোগ্যতর হয়ে উঠতে পারে। যদি তা না পারে তবে তারা ঝরে যাবে। কিন্তু তার আগে অনভিজ্ঞ ও নূতনরা অভিজ্ঞ ও সৎ নেতাদের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেরা নেতৃত্ব দানে যোগ্য হয়ে উঠে তাদের জায়গা নিবে। ইতিমধ্যে সৎ ও দেশ প্রেমিক নেতাদের চরিত্র সঞ্চারিত হবে তাদের ভিতর এবং সেখান থেকে ক্রমে সমগ্র সমাজ দেহে।

 

এ কথা বুঝতে হবে রাতারাতি বড়লোক হবার কাল যেমন শেষ হয়েছে তেমন কোন প্রস্তুতি ছাড়া হঠাৎ করে নেতা হবার কালও শেষ হয়েছে। এখন নেতা হতে হলে তাকে আগে একজন কর্মী হিসাবে রাজনীতির অনেক কিছু শিখতে এবং বুঝতে হবে।

 

যাইহোক, জাতীয় সরকার প্রাথমিক সংস্কার ও পরিবর্তনের পর এবং জাতীয় ঐক্য ও সংহতির প্রতীক হিসাবে একটি রাজনৈতিক দল গঠনের পর নির্বাচন দিবে। তার জন্য পাঁচ বৎসর সময়ই যথেষ্ট হবে। এই নির্বাচনে জাতীয় সরকার কর্তৃক গঠিত দলই প্রার্থী মনোনয়ন দিবে। পরবর্তী সরকার হবে এই দল কর্তৃক গঠিত সরকার।

 

নির্বাচনের মাধ্যমে এককভাবে এই দল কর্তৃক সরকার গঠন এক দলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবে। কিন্তু একটা পর্যায় পর্যন্ত এর কোন বিকল্প আমাদের সামনে নাই। রাজনৈতিক দলীয় শাসনের বিকল্প সেনা শাসন, যেটা কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ দেশের দুর্বৃত্তায়নে সেনা শাসনের ভূমিকা ভুলে যাওয়া হবে মস্ত ভুল। অন্যদিকে, বাংলাদেশ যে বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে আছে তাতে করে কোন ধরনের সেনা শাসন বা সামরিক সরকার এ দেশকে রক্ষা করতে পারবে না, বরং দেশকে দ্র্নত ধ্বংসের দিকে নিবে। এমনকি অসামরিক নির্দলীয় সরকারের দীর্ঘস্থায়িত্বও এ দেশের অস্তিত্বকে বিপন্ন করবে। ফখরুদ্দীন আহমদ নেতৃত্বাধীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বয়স মাত্র এক বৎসর পূর্ণ হয়েছে। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে সঙ্কট ও ব্যর্থতা প্রবল রূপ নিয়ে দেখা দিয়েছে। এখন যত দিন যাবে এই সরকারের ব্যর্থতা তত প্রবল রূপ নিয়ে দেখা দিবে।

 

সুতরাং আমাদের দেশের জন্য এখন দল ও দলীয় শাসনের বিকল্প নাই। এখন আমাদেরকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা এক দল নাকি বহু দলের নির্বাচনমূলক শাসন গ্রহণ করব। বহুদলীয় শাসন তথা বহুদলীয় গণতন্ত্রের অভিজ্ঞতা আমাদের হয়েছে। এটা যে আমাদের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দেখা দিয়েছে সে সম্পর্কে ইতিপূর্বে আলোচনা করেছি। আশা করি এ নিয়ে আর আলোচনার প্রয়োজন নাই। তাহলে আমাদের সামনে থাকে একমাত্র বিকল্প হিসাবে একদলীয় গণতন্ত্র।

 

একদলীয় গণতন্ত্রে রাষ্ট্র শাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচন হলেও তা হবে একদলের ভিত্তিতে। এখানে বহুদলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে না। তবে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন থাকবে দলের ভিতরে। অর্থাৎ দল একটা পর্যায় পর্যন্ত বহুদলীয় গণতন্ত্রের উপাদানকে ধারণ করবে নিজের ভিতরে। আসলে এই ব্যবস্থায় উন্নত ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ অথচ স্বাধীন ব্যক্তিসত্তার বিকাশ ঘটবে দলের আশ্রয়ে। এই ব্যক্তিসত্তার বিকাশের জন্য যে ধরনের লোকবাদী ও যুক্তিবাদী ভাবাদর্শিক আন্দোলন পরিচালনার প্রয়োজন আমাদের মত সমাজে একমাত্র এ ধরনের দলই সে কাজ সবচেয়ে কার্যকরভাবে করতে পারে।

 

একদলীয় শাসনকে দেখতে হবে উত্তরণের পর্যায় হিসাবে। ফলে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় সংস্কার ও পুনর্গঠনের পর একদলীয় গণতন্ত্র থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্রে উত্তরণ ঘটবে।

 

একদলীয় শাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাজের উন্নয়নের দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে আজকের যুগে ভুরি ভুরি আছে। শুধু কমিউনিস্ট দেশগুলিতে নয়, কিছু সংখ্যক অ-কমিউনিস্ট দেশেও ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে একদলীয় শাসনের মাধ্যমে। আমাদের নিকটবর্তী দেশ মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদ এবং সিঙ্গাপুরের লি কুয়ান ইউ কার্যত একদলীয় শাসনের মাধ্যমে তাদের দেশের অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধন করেন। অথচ এই দেশ দুইটিই ব্যক্তি পুঁজিবাদের পথ অনুসরণকারী। এই ধরনের শাসন ব্যবস্থা আসলে প্রাচ্য ও পৃথিবীর অনুন্নত দেশগুলিকে পাশ্চাত্যের আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ মুক্ত করার, দ্রুত উন্নত করার এবং সবচেয়ে কার্যকরভাবে সুস্থ বহুদলীয় গণতন্ত্রের দিকে এগিয়ে নিবার পথ।

 

এ প্রসঙ্গে হয়ত ভারতের বহুদলীয় গণতন্ত্রের কথা আসবে। কারণ সেখানে বহুদলীয় গণতন্ত্র অন্তত আমাদের তুলনায় অনেক সফল। ভারতের অর্থনৈতিক উন্নয়নও অনেক দেশের জন্য ঈর্ষণীয়। কিন্তু ভারতের সম্পদ, বিশালতা ও একই সঙ্গে জনগোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্য ও জটিলতাকে হিসাবে নিতে হবে। এবং এ কথাও ঠিক যে সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠী যে দারিদ্র্য, বঞ্চনা ও সামাজিক বৈষম্যের শিকার হয়ে আছে এবং নিম্নবর্ণ, অস্পৃশ্য জনগোষ্ঠী ও নারীর উপর যে সামাজিক নির্যাতন ও বৈষম্য রয়েছে তাতে ভারতের গণতন্ত্র এবং উন্নয়ন কোন মডেল বা আদর্শ হতে পারে না। বরং অনেক পিছন থেকে এবং তুলনায় অনেক বেশী সমস্যা ও সঙ্কট নিয়ে যাত্রা শুরু ক’রে যারা ইতিহাসের পথ অবিশ্বাস্য দ্রুত গতিতে এগিয়ে গেছে বা যাচ্ছে আমাদের সামনে দৃষ্টান্ত হবে তারা। আর সেখানেই আসে একদলীয় গণতন্ত্রের প্রশ্ন।

 

এ দেশেও অতীতে এ ধরনের চেষ্টা যে হয় নাই তা নয়। মুজিবের বাকশাল গঠন তেমন একটা চেষ্টা ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগের মত দুর্নীতি কবলিত দলের নেতৃত্বে এমন এক মহৎ উদ্যোগ সফল হবার কারণ ছিল না। মুজিবের সর্বাধিক ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত সহকর্মীদের একাংশ সেনাবাহিনীর একাংশের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তাকে সপরিবারে হত্যা ক’রে এই উদ্যোগকে অঙ্কুরেই বিনাশ করে। পিছনে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাত।

 

বাকশাল ছিল জাতীয় মুক্তিযুদ্ধে অনুপস্থিত এবং স্বাধীনভাবে নেতৃত্ব দিতে অক্ষম এক নেতৃত্বের ব্যর্থ প্রয়াস। তবু স্বাধীনতা যুদ্ধের অনিবার্য গতিধারায় এসেছিল তা, যদিও অনেক দেরীতে এবং ভুলভাবে, ভুল নেতৃত্বে। সুতরাং চার মূলনীতির মত একই পরিণতি বরণ করতে হয়েছিল তাকে।

 

আসলে ভারত সরকারের হস্তক্ষেপের ফলে স্বাধীনতা যুদ্ধ অববিকশিত ও নানান সীমাবদ্ধতা দ্বারা অধিকৃত ছিল। এর পরিণতিতে যুদ্ধ পরবর্তী করণীয়গুলিও অসমাপ্ত বা অসম্পাদিত রয়ে গেল। ৩৬ বৎসর পর এখন সেই করণীয়গুলি সমাপ্ত কিংবা সম্পাদন করার অপরিহার্যতা ও অনিবার্যতা উপস্থিত হয়েছে নূতন করে। এই রকম একটি সময়েই জাতীয় সরকার বিশেষ তাৎপর্য ও গুরুত্ব নিয়ে দেখা দিয়েছে।

 

ভারত সরকারের নিয়ন্ত্রণে গড়ে উঠা স্বাধীনতা যুদ্ধের ভিতর যে সীমাবদ্ধতা ও সঙ্কট ছিল তার জের বাংলাদেশকে টানতে হচ্ছে আজ অবধি। সুতরাং ভারত সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে যে স্বাধীনতা যুদ্ধের ধারা গড়ে উঠেছিল আমাদেরকে হাত বাড়াতে হবে মূলত তার দিকে। এর ফলে ষাটের দশকে পূর্ব বাংলায় বাঙ্গালীর স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল এবং ১৯৭১-এর মার্চ মাসে প্রধানত ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙ্গালী সৈনিকদের বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধের যে সূচনা হয়েছিল সেটাই আমাদের মূল উত্তরাধিকার হয়ে দাঁড়ায়।

 

ভারত সরকারের ভূমিকা এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কারণে স্বাধীনতা যুদ্ধের এই ধারা প্রাধান্যে আসতে না পারলেও রাজনীতির বিচারে বাঙ্গালী জাতির স্বাধীনতা যুদ্ধ তথা জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের মূল ধারা এইটাই। স্বাধীনতা যুদ্ধের এই প্রকৃত মূল ধারাকে স্বীকৃতি না দিয়ে বাংলাদেশ তার প্রকৃত মুক্তির পথে এক পাও অগ্রসর হতে পারবে না। এই সত্যকে অস্বীকারের মধ্য দিয়ে ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর থেকে যে মিথ্যা ও ফাঁকির যাত্রা শুরু হয়েছে তা তার অনৈতিকতার কারণেই দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের ক্রম প্রসার ঘটাতে বাধ্য। এই মিথ্যা ও ফাঁকির অনৈতিকতা এই রাষ্ট্রের জন্মলগ্ন থেকেই সত্য, ন্যায়, সুন্দর ও জন-কল্যাণকে বিদায় দিয়ে গণ-মানুষের মুক্তির স্বপ্নকে দুঃস্বপ্নে পরিণত করেছে।

 

তবে যুদ্ধে ভারত ও আওয়ামী লীগের ভূমিকাকে অস্বীকার করা হলে তা হবে আর এক ভুল। কারণ স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে বাঙ্গালী জাতির অগ্রযাত্রায় সেই সময়ে তাদের ভূমিকা ছিল সকল সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয়। সুতরাং ভারতের নিয়ন্ত্রণে এবং ভারতের আশ্রয়ে থাকা লীগ নেতৃত্বে পরিচালিত স্বাধীনতা যুদ্ধের উত্তরাধিকারকে বাদ দিয়ে নয় তবে তার সীমাবদ্ধতা ও ত্রুটিগুলির প্রতি সমালোচনা রেখে এবং দেশের ভিতরে সূচিত এবং দেশের মাটিতে স্বাধীনভাবে পরিচালিত যুদ্ধের ধারাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে এ দেশের আগামী যাত্রা পথ নির্মাণ করতে হবে। সুতরাং জাতীয় সরকার গঠনেও অগ্রাধিকার দিতে হবে সেইসব ব্যক্তিকে যারা ষাটের দশকে এ দেশে স্বাধীনতা আন্দোলনের সংগঠক ছিলেন এবং ’৭১-এ যুদ্ধের সময় যারা ভারত সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে এ দেশের ভিতর স্বাধীনভাবে স্বাধীনতা যুদ্ধ সংগঠিত করেছিলেন।

 

এভাবে জাতীয় সরকার হয়ে উঠতে পারে বাঙ্গালী জাতির স্বাধীনতা যুদ্ধের নব উত্তরাধিকার। স্বাধীনতা যুদ্ধকে ঘিরে এ দেশে এতকাল যাবৎ যেসব মিথ্যা ও ফাঁকির সৌধ নির্মাণ করা হয়েছে সেগুলির অবসানও হবে এভাবে।


রচনাঃ ১০ জানুয়ারী-১২ ফেব্রুয়ারী, ২০০৮

অনলাইন প্রকাশঃ ১৬ ফেব্রুয়ারী, ২০০৮

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
Archive