Banner
স্বপ্নের কাল মিছিলের কাল

লিখেছেনঃ শামসুজ্জোহা মানিক, আপডেটঃ July 10, 2010, 4:07 PM, Hits: 11142

উৎসর্গ

মাতঃ! যত দুঃখ জীবনভর দিয়াছি তোমাকে ওসবই তো তোমার ছিল একান্ত পাওনা,
একদা তুমিই তো শিখায়েছ মোরে মহত্ত্বের পথে যেতে, সত্য ও সুন্দরের করিতে সাধনা,
যা কিছু করেছি ভাল সবই তো সেই তোমার করা, আমি তো সেই তোমারই কল্পনা ও স্বপ্নে গড়া;
সেই নিজেকে পুরুষ রূপে তুমি নিয়াছ পৃথিবীতে, আমি তো নিমিত্ত মাত্র,
সেই তোমারই কীর্তি মাগো রহিবে পৃথিবী জোড়া।

১৯ এপ্রিল ১৯৯৯


ভূমিকা

‘স্বপ্নের কাল মিছিলের কাল’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলি মূলত ষাটের দশকে আমার রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা ও স্মৃতিকে অবলম্বন করে রচিত হলেও ১৯৫৯ সাল যা ছিল আমার কৈশোর জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সময় সেটি যেমন বিভিন্ন কবিতায় এসেছে তেমন ১৯৭১ সাল যা শুধু আমার জীবন নয় অধিকন্তু বাঙ্গালী জাতির জীবনেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ একটি সময় সেটিও আমার বিভিন্ন কবিতায় এসেছে। অর্থাৎ ষাটের দশক এই কাব্যগ্রন্থের মূল কালপর্ব হলেও ১৯৫৯ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত তেরো বৎসর কাল সময় এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলির মূল প্রেক্ষিত। অবশ্য বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতও বিভিন্ন কবিতায় প্রসঙ্গ ক্রমে এসেছে। প্রকৃতপক্ষে কাব্যগ্রন্থে অতীতের স্মৃতিচারণ হয়েছে বর্তমানের প্রেক্ষিতে। সুতরাং অধিকাংশ কবিতায় স্মৃতিচারণ মূল বিষয় হলেও কিছু সংখ্যক কবিতায় অতীতের পাশে বর্তমানও যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পেয়েছে।

এই গ্রন্থের কবিতাগুলিতে ষাটের দশকের পূর্ণাঙ্গ চিত্রণ হয়েছে এমন দাবী করা ভুল হবে। এমন কি আমার জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি এবং ঘটনাকেও এখানে আনতে পারি নি। কবিতাগুলোও একটা সংক্ষিপ্ত সময়ে রচিত যা কবিতার নীচে দেওয়া তারিখ থেকে বোঝা যাবে। অর্থাৎ এই সংক্ষিপ্ত সময়ে যে চিন্তা বা কল্পনাগুলো কাব্যিক আবেগে প্রকাশ পেয়েছে শুধু সেগুলোই এখানে স্থান পেয়েছে। অনেক কবিতার নীচে পাঠকদের বোঝার সুবিধার জন্য পাদটীকা দিয়েছি। তাতে কবিতার প্রয়োজনে ব্যবহৃত কিছু আঞ্চলিক কিংবা কম প্রচলিত শব্দের অর্থ বা ব্যাখ্যা দিয়েছি। এছাড়া বিভিন্ন চরিত্র ও ঘটনার তাৎপর্য বুঝতে যাতে পাঠকদের সুবিধা হয় সেই জন্য পাদটীকায় সেগুলির ব্যাখ্যা দিয়েছি। একই প্রয়োজন থেকে কিছু সংখ্যক কবিতার বিষয়বস্তুর তাৎপর্যও টীকায় সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করতে চেষ্টা করেছি।
 
শামসুজ্জোহা মানিক
১৯ এপ্রিল ২০০৬

 
স্মৃতির পৃথিবী
 
তিস্তার চর
এখন অনেক দূর
পার হয়ে গেছে অনেক বছর।
তবু তার ধুলো এখনও কিছু উড়ে
মনের ভিতর।
চিলমারী পার হয়ে রৌমারী
কিংবা ব্রহ্মপুত্র-যমুনার আর সব চর
মাঝে মাঝে মনে ভাসে,
সেই সব নদী এখনও বহমান
বুকের ভিতর,
পার হয়ে যদিও গেছে অনেক বছর।
দেশ ও জনতার মুক্তির প্রয়োজনে
অনেক অনেক গ্রাম করেছি সফর।
তারা ভরা আকাশের নীচে খুলি বৈঠকে১
কৃষক আসত দলে দলে।
স্বপ্ন ছিল কত মনে সে দিন তখন
কৃষকের বাহিনী হবে গঠন­­
যুদ্ধের বাহিনী, মুক্তির হবে আয়োজন।
এভাবে চলে এল একদা একাত্তর
সেও তো অনেক বছর।
কিছু ভুলে গেছি
কিছু মাঝে মাঝে জাগে মনের ভিতর।
স্মৃতির পৃথিবী কি খুব বেশী দূরে
সময়ের বিস্তারে?
বার বার ঘুরে-ফিরে
ফিরে যাই ষাটের দশক আর একাত্তর,
আহ্‌ একাত্তর, আমার একাত্তর !
আমাদের স্বপ্নের, সাধনার, গৌরবের একাত্তর,
আমাদের দুঃখের, বেদনারও একাত্তর।

২১ জুন ২০০৪

১ বৃহত্তর দিনাজপুর-রংপুর অঞ্চলে গ্রামের গৃহস্থ বাড়ীর বাইরের ছোট খোলা আঙ্গিনা বা উঠানকে খুলি বলে। আর বাড়ীর ভিতরের উঠানকে বলা হয় আঙ্গিনা বা আঙ্গ্‌ন্যা। খুলিতে অনুষ্ঠিত সভাকে সেখানে খুলি বৈঠক বলা হয়। বিশেষত কৃষক সংগঠন ও আন্দোলনের প্রয়োজনে খুলিতে অনুষ্ঠিত ছোট সভাগুলি তৎকালে খুলি বৈঠক হিসাবে কথিত হত।
 

জ্যোৎ্নায় হাওয়ার রাত

সেটা ছিল এক দখিন হাওয়ার রাত
পৃথিবী ছিল সে রাতে জ্যোৎ্নায় ্নাত।
পিছনে রেখে বাঁশ ঝাড়, কয়েকটা ছড়ানো গ্রাম
আমরা হেঁটে গিয়েছিলাম রেল লাইন ধরে
অনেক দূরের পথ, সঙ্গে ছিল
দুই চার জন সহকর্মী কৃষক আন্দোলনের।
সেটা ছিল বুঝি কোনো এক ফাল্গুন জ্যোৎ্নার রাত,
নাকি ফাল্গুন অথবা শরতের রাত ?
একই কথা; সেটা ছিল জ্যোৎ্নায় হাওয়ার রাত।
সে রাতে স্বপ্ন ছিল আমাদের মনে অনেক কিছুর
বাঙ্গালীর স্বাধীনতা আর কৃষক বিপ্লবের,
আর ছিল সাথে কয়েকজন কর্মী কৃষক আন্দোলনের।
তারপর চলে গেছে বহু কাল, অনেক বছর,
পঁয়ত্রিশ বছর­­
সময়ের বিচারে সে অনেক দীর্ঘ সময়।
তবু মনে জাগে আজও সেই জ্যো্নায় হাওয়ার রাতে
রেল লাইন ধরে অনেক দূরের গ্রামে
আমাদের হেঁটে চলে যাওয়া।

২১ জুন ২০০৪
 

স্বপ্ন কি তখনও ছিল ?

[দিনাজপুর জেলার ফুলবাড়ীর প্রয়াত কৃষক কর্মী শফদা (শরফুদ্দিন) স্মরণে]

শফদা১! তুমি যখন মাটিতে শয়ান হলে
তখনও কিছু স্বপ্ন ছিল কি বুকে,
নাকি ছিল সব কিছু হারাবার ক্রন্দন ?
মাথার উপরে যদিও ছিল খড়ের ভাঙ্গা চালা
জমি তো কিছুই ছিল না,
তাই সম্বল ছিল কামলা খাটা
আর কখনও দুধেল গাইয়ের দুধ বেচা।
শফদা! তারই মাঝ দিয়ে
স্বপ্নকে কেমন করে বুকে রেখেছিলে ধরে ?
তে-ভাগা আন্দোলন কী দিল তোমাকে
হিসাব কি করেছিলে ? হয়ত করেছিলে।
তবু স্বপ্ন কিছু ছিল,
তাই তো তে-ভাগার যুবক কর্মী তুমি
ষাটের দশকে পুনরায়
কৃষক কর্মী হলে
মাথা ভরা পাকা চুল নিয়ে।
মিছিল, আন্দোলনে এল একাত্তর,
যা চেয়েছিলে তার কতটুকু পেলে ?
তোমার যা কিছু ছিল লুট হয়ে গেল,
কোথা দিয়ে সব কেমন হয়ে গেল !
শফদা! এক দিন ক্লান্ত শরীরে, মনে
তুমি মাটিতে শয়ান হলে,
স্বপ্ন কি তখনও কিছু মনে ছিল ?

২১ জুন ২০০৪

১ তৎকালীন দিনাজপুর জেলার ফুলবাড়ী থানার বিখ্যাত কৃষক কর্মী শরফুদ্দিন শফদা নামে সমধিক পরিচিত ছিলেন। তিনি ছিলেন ভূমিহীন ও দিন মজুর। ১৯৪৬-এ তে-ভাগা কৃষক আন্দোলনে একনিষ্ঠ কর্মী হিসাবে তিনি খ্যাতি অর্জন করেন। ১৯৬৬-তে কৃষক সংগঠন ও আন্দোলন গড়ার উদ্দেশ্যে তৎকালীন বৃহত্তর দিনাজপুর জেলায় যাবার পর ক্রমে তাঁর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং নিদারুণ দারিদ্র্য সত্ত্বেও তিনি পুনরায় ষাটের দশকে সক্রিয় কৃষক কর্মী হিসাবে যথেষ্ট ভূমিকা পালন করেন।বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার কয়েক বৎসর পর তিনি মৃতুø বরণ করেন।
 

ঘুম ধান আঁটির ঘরে

সে রাতে আমিও ঘুমিয়েছিলাম
ধান কাটা মাঠের ভিতর
ধানের আঁটিতে তৈরী ধান পাহারার ঘরে১।
দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে
সেটা ছিল পৌষের রাত,
সে রাতে বড় শীত ছিল
খোলা আকাশের নীচে কুয়াশা ঝরছিল।
শফদার কাছে গিয়েছিলাম
তাই ঘুমাতে হল মাঠে তোলা তার অস্থায়ী ঘরে
ধানের আঁটিতে তৈরী ধান পাহারার ঘরে।
বাইরে ঝরছিল তখন কুয়াশা
আর শিস দিচ্ছিল হিমেল বাতাস।
কিন্তু ভিতর ছিল বড় উমে২ ভরা
সেখানে দু’জনে গল্প করতে করতে
আমরা পড়েছিলাম ঘুমিয়ে।
বাইরে শিস দিচ্ছিল হিমেল বাতাস।


২২ জুন ২০০৪

১ অগ্রহায়ণ-পৌষে আমন ধান কাটার পর তৎকালীন বৃহত্তর দিনাজপুর-রংপুর অঞ্চলে ধান গাছ ভালভাবে শুকাবার জন্য ৫/৭ দিন ধান ক্ষেতে ফেলে রাখা হত। তখন কাটা ধান পাহারার জন্য ধান গাছের বাঁধা আঁটি (ধানের শীষসহ) সাজিয়ে এস্কিমোদের বরফ ঘর বা ইগলুর মত এক ধরনের অস্থায়ী ঘর করা হত। এতে ছোট একটা মুখ থাকত যা দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে বা উবু হয়ে ঢুকে ধানের আঁটি দিয়ে মুখ বন্ধ করলে ভিতরে আরামদায়ক উষ্ণতায় ঘুমানো যেত। এখনও এ ধরনের ব্যবস্থা সেখানে চালু আছে। এ ধরনের ঘরকে এলাকা ভেদে ধুরা বা ড্যারা বলা হয়। র-এর উচ্চারণ ব্যক্তি ও এলাকা ভেদে ড়-ও হতে পারে।
২ আরামদায়ক উষ্ণতাকে স্থানীয় ভাষায় উম বলা হয়।
 

ধরণীকে

ধরণী১! সব আশা তবে ছেড়ে দিলে,
না হল বিপ্লব, সংসারও
কেমন এলোমেলো হল!
কিছু তো হয়েছে ভাই ভাল,
একাত্তর একেবারে ব্যর্থ কেন বলো?
কিছু কি পাও নি
একাত্তরের রাজনীতি যারা গড়েছিল
তুমি কি ছিলে না একজন তাদেরই?
সংসারে দুঃখ আছে জানি
জানি আছে তোমার স্বপ্নের ব্যর্থতার গ্লানি
তবু সাফল্যও একেবারে কম কী?
হিসাব করো তো একটু
দেখবে অনেকই হয়েছে পাওয়া,
আর জীবনে মিলে কি সব চাওয়া?
একাত্তরও দিয়েছে অনেক
যদিও হয় নি বহুটুকু পাওয়া।
ধরণী! ঝেড়ে ফেলো অবসাদ
সংসার-হাল শক্ত হাতে ধরো।
ভয় কেন করো,
চিরকাল কি রবে শূন্যতা?
একাত্তরও একদিন পাবে পূর্ণতা।

২২ জুন ২০০৪

১ ধরণী মোহন বর্মণ ষাটের দশকের শেষ দিকে তৎকালীন বৃহত্তর রংপুর জেলার (বর্তমানে লালমণিরহাট জেলা) আদিতমারীর কৃষক আন্দোলনের একজন কর্মী এবং আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। তিনি জীবিত আছেন।
 

তফেজুল

তফেজুল১! হাল ছেড়ে বিকালে তুমি মাঝে মাঝে দেখা দিতে,
সন্ধ্যায় দু’জনে মিলে যেতাম কখনো দূর কোনো গ্রামে
কৃষক সমিতির সংগঠন গড়ার প্রয়োজনে।
ফুটকিবাড়ী, গরিনাবাড়ী, হাড়িভাসা আর নাম মনে নাই
কয়টা মনে থাকে বলো এতকাল পর? প্রায় ছত্রিশ বছর।
পঞ্চগড়, কত কাল যাই না সেখানে, বড় দূর !
আরো দূর আলোয়াখাওয়া, আটোয়ারী।
স্মৃতির দিনগুলো শুধু মাঝে মাঝে জাগে
সেখানে আসে অনেকে, যাদের অনেকে বেঁচে আর নাই।
মংলু কমরেড, ভবদা২ অনেক আগেই গত
শ্যামাদা কি বেঁচে আছে জানি না সে খবর।
শুনেছি তুমিও আর বেঁচে নাই তফেজুল,
তবু কল্পনায় মাঝে মাঝে হেঁটে যাই দু’জনে পাশাপাশি
দূর কোনো গ্রামে কৃষক সমিতির প্রয়োজনে
যদিও শুনেছি তুমি আর নাই।

২২ জুন ২০০৪

১ তফেজুল ইসলামের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে ১৯৬৭ সালে যখন আমি তৎকালীন দিনাজপুর জেলার (বর্তমান পঞ্চগড় জেলার) বোদা থানায় অবস্থিত ফুটকিবাড়ী জুনিয়র বিদ্যালয়ে (পরবর্তী কালে উচ্চ বিদ্যালয়) প্রধান শিক্ষক হিসাবে যোগদান করি এবং পাশাপাশি জেলাব্যাপী কৃষক সমিতি এবং ন্যাপের কাজ শুরু করি। ঐ বিদ্যালয়ের প্রধান প্রতিষ্ঠাতা এবং ঐ ইউনিয়নের (গরিনাবাড়ী ইউনিয়ন) চেয়ারম্যান আশরাফুল ইসলামের বাড়ীতে আমার থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা হয়। তিনি ছিলেন ন্যাপের একজন স্থানীয় নেতা। ঐ সময় পাশের বাড়ীর কৃষক তফেজুল ইসলামকে আমি কৃষক সংগঠন গড়ার কাজে ঐ এলাকায় আমার প্রধান সহকর্মী এবং বন্ধু হিসাবে লাভ করি। ফুটকিবাড়ীতে আমি ১৯৬৯-এর মার্চে ইয়াহিয়ার সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠার সময় পর্যন্ত ছিলাম।

২ মংলু মোহাম্মদ এবং ভবদা উভয়ে ১৯৪৬-এর তে-ভাগা আন্দোলনের একনিষ্ঠ কর্মী ছিলেন। উভয়ের বাড়ী আটোয়ারী থানায় এবং উভয়ে অনেক আগে প্রয়াত।
 

আবদ্ধ অন্ধ মতবাদের জালে

শফদা! তেমার কি মনে আছে
আবদুল হক কী বলে থামালো আমাকে
সাতষট্টির সেই সভাতে?
মাকড়সার মত নিপুণ কারিগর
মিথ্যার জাল রচনায়
ও তাতে শিকার ধরায়,
আবদুল হক তার মোহজাল করলে বিস্তার
কৃষক নেতারা সকলে ধরা পড়লেন তাতে।
সভাসদেরা সকলে বন্দী যেখানে,
রাজা একা কী করতে পারে?
কিছুক্ষণ তার আকুল ক্রন্দন
নীরবে বসে থেকে
আমরা শুনলাম সকলে।
শফদা! তোমার কি মনে আছে
ক্ষুব্ধ ভাসানী উঠে চলে গেলে
এবং সভার বিরতি হলে
ধূর্ততার কারিগর আবদুল হক
তার বয়ান শোনাতে ও বোঝাতে
আমাকে ডেকে নিল রাস্তাতে ?
তার আর কথা এখানে থাক,
এর পরেও বহু চেষ্টা করেছিলাম
কিন্তু বাম নেতাদের পারি নি বোঝাতে।
কখনও তাই আসে নি
ছয় দফার সমান্তরালে
একটি উন্নততর কর্মসূচী;
ওটা তাদের দেওয়াতে পারি নি।
আসলে এক অন্ধ মতবাদের জালে
আবদ্ধ ছিল সকলে।১

২৩ জুন ২০০৪

১ কবিতাটিতে ষাটের দশকে বিপ্লবী তরুণ প্রজন্ম এবং মওলানা ভাসানীর সংকটের চিত্র আঁকা হয়েছে। এখানে ১৯৬৭ সালে অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির যে সভার কথা বলেছি সেখানে আমার মত কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য না হয়েও শফদারও উপস্থিত থাকার সুযোগ ঘটেছিল। ঐ সভায় তৎকালীন পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের কর্মসূচীর প্রশ্নে আবদুল হকের সঙ্গে আমার বিতর্ক হয়। সেখানে তিনি মিথ্যা উদাহরণ দিয়ে এবং ধমক দিয়ে আমাকে থামিয়ে দেন। ঐ সভাতে পরবর্তী সময়ে মওলানা ভাসানী আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের প্রয়োজন তুলে ধরেন। কিন্তু তিনি পুরাতন ও প্রতিষ্ঠিত কোনো বাম নেতারই সমর্থন পান নি। ঐ সভায় বাম নেতা আবদুল হকের সঙ্গে আমার বিতর্ক, তাঁর মিথ্যাচার এবং মওলানা ভাসানীর একাকীত্ব ও অসহায়তার কিছু বিবরণ আমি ব-দ্বীপ প্রকাশন কর্তৃক প্রকাশিত আমার লেখা বই ‘রাজনীতির পুনর্বিন্যাস’-এর চতুর্থ অধ্যায়ে দিয়েছি।
 

স্বপ্নের ধোক্‌ড়া

শফদা! তুমিও ছিলে এক মজার কারিগর,
স্বপ্নের ধোক্‌ড়া১ বুনে
তাতেই শুয়ে
কাটালে বেশ অনেক বছর।
শীতের হিমেল বাতাসে
তুমি পেতে ভালই উম
ঐ ধোকড়াতে শরীর ঢেকে।
পৌষের ধান কাটা মাঠে
ধান আঁটির ধুরার২ ভিতর
অথবা তোমার কুড়ে ঘরে
মাটিতে মাদুর কিংবা ধোক্‌ড়া পেতে
রাতে ঘুমাবার কালে
আমিও ভাগ করে নিতাম
তোমার ধোক্‌ড়ার উম।
তখন দু’জনে মিলে
পুনরায় ধোক্‌ড়া বুনতাম,
আর গায়ে চাপিয়ে তার উমে
দিতাম তোফা ঘুম।

২৩ জুন ২০০৪

১ বৃহত্তর দিনাজপুর-রংপুর অঞ্চলে সাধারণত গ্রামীণ মহিলারা অবসর সময়ে পাটের আঁশ দিয়ে সূতা বা সুতলি পাকিয়ে তা দিয়ে চটের মত এক ধরনের বস্ত্র বয়ন করে। এগুলোতে নানান নকশা বা কারুকাজ হতে পারে। এগুলো বিছানা কিংবা মাদুর অথবা গায়ে দেবার কাঁথা বা কম্বল হিসাবে ব্যবহার করা হয়। এগুলোকে বলা হয় ধোক্‌ড়া। ধোক্‌ড়া ঐ অঞ্চলে এক সময় ব্যাপকভাবে প্রচলিত থাকলেও এখন তার ব্যবহার কমে গেছে। তবে এটা এখনও লোপ পায় নি। বিশেষত দরিদ্রদের মধ্যে এর ব্যবহার এখনও যথেষ্ট।

২ ধান আঁটি দিয়ে তৈরী অস্থায়ী ঘর।
 

’৬৯-’৭০-এর স্মৃতিচারণ

একদিন অনেক মানুষের ভীড়ে
সাহাপুর১ উঠেছিল মেতে,
সেখানে উঠেছিল হুঙ্কার
অগণন জনতার­­ -- কৃষকের, শ্রমিকের, ছাত্রের।
পাঁচবিবি, সন্তোষও উঠেছিল ভরে
লাল টুপি পরা অগণন মানুষের ভীড়ে।
সাহাপুর, পাঁচবিবি, সন্তোষ
প্রতিটি সমাবেশে
মাথা তুলে আকাশে
দাঁড়ালেন ভাসানী।
বজ্র নির্ঘোষ আমরা শুনলাম
তার কণ্ঠ হতে
কৃষক-শ্রমিক জনতার মুক্তির বাণী।
আমাদের প্রাচীন পিতৃ-পুরুষ যখন
চোখে জ্বেলে বহু শতাব্দীর আগুন
সেনাপতি-রাজার দিকে আঙ্গুল উঁচালেন
তখন উঠল ধ্বনি চতুর্দিক কাঁপিয়ে
সারা দেশ জুড়ে সমাবেশে, মিছিলে;
আর এভাবে তিনি দেশটাকে জাগালেন।
সেনাপতি রাজা ভয় পেলেন
এবং বন্দুক তুলে
দিলেন পাল্টা হুঙ্কার,
কিন্তু ভয় ছিল না জনতার,
বরং আকাশ বিদীর্ণ করে
তারা ধ্বনি দিল সজোরে
সমাজতন্ত্র ও পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার।

২৪ জুন ২০০৪

১ ১৯৬৯ সালে জেনারেল ইয়াহিয়ার নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানের সামরিক শাসনকে উপেক্ষা করে মওলানা ভাসানী নেতৃত্বাধীন কৃষক সমিতির উদ্যোগে পাবনা জেলার অন্তর্গত ঈশ্বরদীর নিকটবর্তী সাহাপুর গ্রামে প্রথম কৃষক মহা-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এভাবে এটি ছিল সামরিক আইনের প্রথম কার্যকর লংঘন। এরপর আরও দুইটি কৃষক মহা-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। একটি টাঙ্গাইল জেলার সন্তোষে অপরটি তৎকালীন বগুড়া (বর্তমান জয়পুরহাট) জেলার পাঁচ বিবিতে। এসব সমাবেশে লাল টুপি পরে বিপুল সংখ্যক কৃষক, ছাত্র, শ্রমিক ও বিভিন্ন পেশার মানুষ অংশ নেয়।
 

ভাসানী মানে

ভাসানী মানে কী ?
ভাসানী নামের মানে বা অর্থ ?
ভাসানী মানে লক্ষ জনতার মিছিল,
ভাসানী মানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন আর বিদ্রোহ,
ভাসানী মানে মেহনতী মানুষের মর্যাদা নিয়ে বাঁচা,
ভাসানী মানে মানুষের মানবিক মানুষ হয়ে ওঠা,
ভাসানী মানে সুবিধাবাদের কাছে মাথা নত না করা,
ন্যায় ও সত্যের পথে অবিচল লেগে থাকা,
ভাসানী মানে লাল পতাকার আকাশে মাথা তোলা,
ভাসানী মানে আইয়ুবের ভেসে যাওয়া,
ভাসানী মানে পাকিস্তান ভেঙ্গে যাওয়া,
ভাসানী মানে ধর্মের নামে অপ-রাজনীতি শেষ হওয়া,
ভাসানী মানে সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্রের জয় হওয়া,
ভাসানী মানে বাংলা ও বাঙ্গালীর স্বাধীনতা,
ভাসানী মানে সকল জাতির সম-অধিকার পাওয়া।


২৪ জুন ২০০৪
 

বিদীর্ণ জিজ্ঞাসা

কাজী জাফর !
তুমিও কি ছিলে শুধুই
এক মঞ্চাভিনেতা,
অভিনয়ে দক্ষ কারিগর?
তাই নিজেকে কী সহজেই তুলে দিলে
এক নষ্ট-ভ্রষ্ট সময়ের হাতে,
এভাবে এক নষ্ট রাজা পেল
তোমাকে সাথে।
নষ্ট সময়ে নষ্টরা আসে,
সুতরাং নষ্টামির শিরোপাধারী
যে রাজা হবে এবং সিংহাসনে বসে
নষ্টদের বসাবে নিজের চারপাশে
সেটাই স্বাভাবিক
এবং ভেবে দেখলে একান্ত যৌক্তিক।
সুতরাং ডাক পেতেই তুমি গেলে,
তুমি তো গেলেই গেলে
সঙ্গে নিয়ে গেলে তোমার ঝুলিতে
অনেকের অনেক স্বপ্ন বেঁধে
এবং সেগুলো খুব সস্তায়
নষ্ট সেই রাজার কাছে
বিকিয়ে দিলে।

বার বার জিজ্ঞাসার খঁুজি উত্তর
বাষট্টি, তেষট্টি, সত্তর
এসবই কি ছিল শুধু
অভিনয়ে তোমার দক্ষতার স্বাক্ষর ?
মনে প্রশ্ন জাগে
কীভাবে এমন অভিনয় করেছিলে ?
সত্তরে স্বাধীনতার ঘোষণাও দিলে,
বাঙ্গালী জাতিকে তবে কি
তুমিও চেয়েছিলে ?
নাকি তুমিও ছিলে এক মিথ্যার কারিগর
সারাটি জীবন তাই শুধু মিথ্যাই দিলে ?
কাজী জাফর!
তুমিও কি তবে
নষ্ট-ভ্রষ্ট সময় তৈরীর
এক দক্ষ কারিগর ?
আসলে তুমি কে ছিলে
কাজী জাফর১ ?

২৪ জুন ২০০৪

১ কাজী জাফর আহমদ ১৯৬২-’৬৩ সালে সামরিক একনায়ক আইয়ুব বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অন্যতম প্রধান নেতা ছিলেন। পরবর্তী কালে তিনি সামরিক একনায়ক এরশাদের প্রধান মন্ত্রী হন।
 

৬৪-এর এক মিছিলের দিন

এখনো কি মনে আছে কামাল সিদ্দিকী তোমার
সেই সব মিছিলের দিন, চৌষট্টির এক দিন ?
আইয়ুবের ক্রীতদাস মোনেমের নির্দেশে
পথে পথে ধেয়ে এল ঘাতকের দল, তারপর
হিন্দু মারতে হবে বলে তলোয়ার ঘোরালো আক্রোশে।
মনে আছে কামাল তোমার
পাল্টা মিছিলে আমরা নামলে দলে দলে
এখানে সেখানে কিছু লাশ ফেলে
ঘাতকেরা পালালো সকলে?
সেই অশ্রু ও রক্ত ঝরানো দিনে
ভীত মানুষেরা হল নির্ভয়,
যারা ভীত কপোতের মত থর থর কাঁপছিল
সে দিন তারা হেসেছিল,
আমাদের মিছিলের হল জয়।
বাঙ্গালী চেতনার সেই বিজয়ের মিছিলে
মনে কি আছে তোমার তুমিও ছিলে,
রাত জেগে পাহারাও দিলে।

এত কাল পর সেই সব দিন
ক’জনই বা মনে রাখে!
রাজ-দরবারে নিয়মিত কুর্নীশ দেবার
চাকুরীতে ঢুকলে, সেই কত কাল আগে।
পেয়াদা-বরকন্দাজ সামলাতে দিন কাবার
ওসব দিনের কথা কি আর মনে জাগে ?

বহু কাল আগে বিপরীত স্রোতে
তুমি চলে গিয়েছিলে
তবু এক দিন তুমি মিছিলে ছিলে।
চৌষট্টির সেই এক দিন
আমাদের মিছিলে
কামাল তুমিও ছিলে।১

২৪ জুন ২০০৪

১ ১৯৬৪-এর জানুয়ারী মাসে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খানের ইঙ্গিতে সূচিত হিন্দু সম্প্রদায়-বিরোধী দাঙ্গার বিরুদ্ধে প্রধানত বামপন্থীদের উদ্যোগে ও নেতৃত্বে যে আন্দোলন গড়ে ওঠে তার একটি দিনের চিত্র কবিতাটিতে আঁকা হয়েছে। এই প্রতিরোধ আন্দোলনে অনেকের মত ছাত্র ইউনিয়নের তৎকালীন সক্রিয় কর্মী কামাল উদ্দিন সিদ্দিকীর আন্তরিক ও বলিষ্ঠ ভূমিকা ছিল। বর্তমানে তিনি প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ের মুখ্যসচিব হিসাবে কর্মরত।
 

শফদা! গুরু আমার

শফদা ! সাতষট্টির১ কোনো এক দিন
আমাদের প্রথম দেখা।
সিংহের মত বিশাল মাথা
শুভ্র চুলে ভরা,
ঐ বয়সেও যেন বসানো ছিল
পেটানো লোহার মত
বৃষস্কন্ধের উপর।
অভাবেও ভেঙ্গে না পড়া শরীর
আর শালপ্রাংশু বাহু নিয়ে
দাঁড়ালে কাছে
আমি অবাক দৃষ্টি মেলে
দেখেছিলাম চেয়ে
তে-ভাগার এক বীর যোদ্ধাকে।
লড়াইয়ের সৈনিক তুমি
অনেক বয়সে দেখলে চেয়ে
্নেহের দৃষ্টি মেলে
এক তরুণ কীভাবে
তোমার কাছে এগিয়ে গেছে
গুরুর কাছ থেকে লড়াইয়ের শিক্ষা নিতে চেয়ে।

শফদা! কত কাল চলে গেছে
দেখা হয় নাই,
দেখা হবে না আর কোন দিন।
দুঃখ আছে মনে
তোমার কাছ হতে বিদায় নেবার পর
কোনো দিন পারি নি জানাতে
পারব নাও এ কথা জানাতে আর কোনো দিন
তোমাকে ভুলি নাই,
ভুলি নাই শিক্ষাও তোমার
ওগো গুরু আমার।

২৬ জুন ২০০৪

১ ১৯৬৭ সালে শফদার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়।
 

যে পাখী বন্দী হল

তুমি ভুলে গিয়েছিলে আমজাদ১ একাত্তরে এসে
এক দিন আমরা কয়েকটি কিশোর
মুক্ত পাখীর মত উড়ে যেতাম স্বপ্নের আকাশে।
আমাদের চোখ হতে ঝরত স্বপ্ন অনাগত কালের
স্বপ্ন ছিল এক মানবিক রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের।

তুমি ভুলে গিয়েছিলে আমজাদ একাত্তরে এসে
ঊনষাটে দশম শ্রেণীর ছাত্র থাকা কালে
আমরা ক’জন কিশোর মিলে
কল্পনা করতাম বাঙ্গালীর স্বাধীনতার,
ভাবতাম আকাশে পতাকা উড়বে এক দিন
জনতার স্বাধীন বাংলার।

নেতা হয়ে আমজাদ
তুমি এক বন্দী পাখী হলে
তুমিও হলে এক অন্ধ আদর্শের ক্রীতদাস,
ভুলে গেলে সেই স্বপ্নের কথা
যে স্বপ্ন এক দিন ডালপালা করেছিল বিস্তার
তোমারও কিশোর মনের আকাশে।
আমজাদ! নেতা হয়ে তুমি চলে গেলে
ঐসব পুরাতন নেতাদের দলে
যারা খাঁচায় বন্দী পাখীর মত
অনেক আগেই হারিয়ে বসেছিল
স্বপ্নের আকাশে ডানা মেলে উড়বার সাধ।
তাই হাজার বছরের ঘুম ভেঙ্গে
একাত্তরে বাঙ্গালী জাগল যখন
তখন তুমি রেডিও পিকিং কানে ধরে
বসে রইলে প্রভুর কাছ হতে
কী নির্দেশ আসে সেই অপেক্ষায়,
এবং অপেক্ষায় বসে থেকে থেকে
ক্লান্ত হয়ে অবশেষে পুরো একাত্তর জুড়ে
অকাতরে ঘুম দিলে।
সে ঘুম অনেক ঝাঁকুনিতেও
আমি পারি নি ভাঙ্গাতে।

যে একাত্তর আমরা গড়লাম
তার অধিকার ছেড়ে দিলে তাদেরই হাতে
যারা স্বপ্নেও কোনো কালে ভাবে নাই
এ স্বপ্নের তারা দাবীদার হবে,
বিস্তীর্ণ মাঠ জুড়ে এমন ফলানো ফসল
তাদের অনায়াস লব্ধ হবে এবং
এ ফসল ফলালো যারা এত শ্রমে
তারা এভাবে মাঠে পাকা শস্য ফেলে রেখে
পুণ্য অর্জন করতে চেয়ে চলে যাবে তীর্থে।
মাঠ কি আর ফাঁকা থাকে ?
দলে দলে লোক পেল তারা
চর দখলের লাঠিয়াল আর ঢাল-সড়কি,
পেল কামলা-কিষাণ যত লাগে
এবং সেই সঙ্গে অর্থ-কড়ি, কাস্তে-হাসুয়া,
সকলই দিলেন রাণী পার্শ্ব দেশ হতে;
আর এভাবে তারাই ভাগ-যোগ করে নিল
মাঠের সমস্ত ফসল।
অবশেষে পুণ্য অর্জন শেষে
বাড়ী ফিরে গৃহস্থ পড়ল অকূল পাথারে।

আমজাদ! পুণ্য অর্জন করলে তো মেলা
বলো তো লাভ কী হয়েছে ?
এভাবে নিজেদের অর্জন তুলে দিলে তাদেরই হাতে
যারা এক দিন ছিল
এরই বিরুদ্ধ স্রোতে।
আমজাদ! তোমাকে বন্দী করেছিল এক অন্ধ মতবাদ
তাই তুমিও বন্দী পাখীর মত একদিন হারালে
ডানা মেলে স্বপ্নের আকাশে উড়বার সাধ।

২৬ জুন ২০০৪

১ প্রাক্তন বামপন্থী নেতা ও বর্তমানে বহু গ্রন্থের প্রণেতা আমজাদ হোসেন আমার কৈশোরের বন্ধু। ১৯৫৯ সালে যশোর জেলা স্কুলের দশম শ্রেণীতে আমরা সহপাঠী ছিলাম। তখন থেকে তিনি আমার বাঙ্গালী জাতির স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চিন্তার সমর্থক ছিলেন। ষাটের দশকে এই চিন্তা বামপন্থী তরুণ প্রজন্ম বিশেষত বামপন্থী ছাত্রদের মধ্যে ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করলেও প্রবীণ বা সনাতন কমিউনিস্ট নেতৃত্ব সাধারণভাবে এই চিন্তার ঘোর বিরোধী ছিল। সনাতন কমিউনিস্ট আন্দোলনের দক্ষিণপন্থী বা মস্কোপন্থী অংশ আওয়ামী লীগের সমর্থক ছিল এবং বামপন্থী বা পিকিংপন্থী অংশ শ্রেণী সংগ্রামের নামে কার্যত আইয়ুব সরকার এবং পাকিস্তানের সহায়কে পরিণত হয়। পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৬৮-এর শেষ দিকে দেবেন শিকদার, আবদুল মতিন এবং আলাউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হবার পর তৎকালীন বামপন্থী ছাত্র ও তরুণ প্রজন্মের ব্যাপক অংশকে নিয়ে আমরা ঐ পার্টিতে যোগ দিলে কিংবা তার সঙ্গে ঐক্য করলে আমরা তার নেতৃত্বের বিভিন্ন চক্রান্তের শিকার হই। বিশেষত স্বাধীনতার রাজনীতিকে বানচাল করার জন্য ঐ পার্টির নেতৃত্ব আমাকে কোণঠাসা করে রাখে এবং এই প্রয়োজন থেকে আমজাদ হোসেনকে নেতৃত্বে নেয়। অন্ধ পিকিংপন্থা এবং চারু মজুমদারের রাজনৈতিক পথের অন্ধ অনুসরণ দ্বারা আমজাদ হোসেন কমিউনিস্ট রাজনীতিতে নেতা হন বটে কিন্তু ’৭১-এ স্বাধীনতা যুদ্ধে যথাযথ ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হন। অবশ্য ’৭১-এ যুদ্ধ শুরু হলে সনাতন বামপন্থী কমিউনিস্টদের একাংশ এবং বামপন্থী ছাত্র-যুবকদের বিরাট অংশ তৎকালীন ভারত সরকার এবং তার আশ্রিত আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন বাধা, চক্রান্ত এবং হত্যাকাণ্ড সত্ত্বেও তাদের নিজেদের রাজনীতির পরিণতিতে সূচিত স্বাধীনতা যুদ্ধে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে। এসব বিষয়ে আমি ‘রাজনীতির পুনর্বিন্যাস’-এ আলোচনা করেছি।
 

অন্ধ মুসল্লি ও মূর্খ পণ্ডিত

(এক)
বাড়ীতে আগুন লেগেছিল,
ঠিক তখন মোয়াজ্জিন মসজিদে দিলে আজান
গৃহস্থ মুসল্লি হয়ে মাথায় চাপাল টুপি,
বলল, ‘ইবাদত আগে না সংসার আগে ?
ইবাদত আগে সেরে আসি
তারপর দেখা যাবে সংসারের কী হল।
আল্লাহ্‌ তো আছেনই উপরে
আমি কেন বৃথা চিন্তা করি ?
সংসারের ভাবনা বেশী ক’রে
ইবাদতে গাফিলতি দিলে
আমার কী হবে পরকালে
যদি আল্লাহ্‌ হন বেজার?’
সুতরাং মাথায় টুপি দিয়ে
মুসল্লি চলল মসজিদে।
বৌ-ছেলে-মেয়ে যতই চেচায়, কাঁদে
‘আল্লাহ্‌ কী হবে’ বলে,
মুসল্লি বেজার তত, বলল
‘চুপ করো, ঈমানের পরীক্ষায় জিতে আসি আগে
তারপরে দেখা যাবে কী হবে।’
ফিরে এসে মুসল্লি দেখে
ছাইয়ের গাদার পাশে
বৌ-ছেলে-মেয়ে কাঁদে,
পাড়া-প্রতিবেশী এসে তাকেই শাসায়,
‘আমাদের ডাকিস নাই কেন আগে ?’
ঈমানের পরীক্ষায় এভাবে জিতেও
মুসল্লি এখন কপাল চাপড়ায়।

(দুই)
সন ঊনিশশ’ একাত্তর­­
দেশে আগুন লেগেছিল
তখন এক পাঠশালার নামী-দামী পণ্ডিতেরা
শুরু করলেন বিষম বিবাদ
কোনটা প্রধান কাজ
আগুন নিভানো আগে
নাকি এ আগুনের চরিত্র বিচার করা?
বহু দূর দেশ থেকে আনা
রাশি রাশি পুথি ছিল
আলমারী, টেবিলে সাজানো
এবং কিছু ছিল এখানে সেখানে পড়ে।
সেগুলো সব নিয়ে বসা হল
এবং রাত-দিন ধরে সেগুলো পাঠ করা হল।
পুথিতে লেখা ছিল যেসব কথা
সেসব পাঠ করে অনেক তত্ত্বালোচনা শেষে
এই সিদ্ধান্ত হল
আগুন নিভাবার আগে
এ আগুনের চরিত্র কী তা ঠিক করতে হবে।
এবার শুরু হল আরেক ফ্যাসাদ,
আগুনের চরিত্র বিচার নিয়ে
দেখা দিল বহু মত পণ্ডিতদের ভিতর।
প্রত্যেকেই পুথি ঘেটে বাহির করেন নজীর,
বলেন তিনিই সঠিক
এবং বাকী আর সকলেই বেঠিক
সুতরাং অজ্ঞ এবং মূর্খ।
এবার শুরু হল আরেক নূতন দ্বন্দ্ব
এবং মুখ দেখাদেখিও বন্ধ।
এভাবে আসল কাজ রইল পড়ে
আগুন আর হল না নিভানো।
এ আগুনে দেশ হল ছারখার
পাঠশালাও পুড়ে ছাই
পুথি-পত্রও সেই সাথে গেল।
অবশেষে আগুন নিভার পর
পিঠে পোটলা, কাঁধে ঝোলা নিয়ে
সব হারিয়ে পণ্ডিতেরা নানান দলে ভাগ হয়ে
ভিক্ষায় বের হল।১

২৭ জুন ২০০৪

১ কবিতাটিতে পাঠশালা শব্দ দ্বারা ষাটের দশকে অন্ধ পিকিংপন্থীদের বুঝানো হয়েছে।
 

বিদায় স্মৃতি

তুমি বুঝি জানতে শফদা
তোমাদের কাছ হতে
সেই হবে আমার শেষ বিদায়।
তাই বিদায়ের বেলা
তোমার দু’চোখে ছিল অমন জলের ধারা
আমাকে বিদায় জানাতে এসে।
আমি যে বিদায় নিব তাই ছিল স্বাভাবিক
তোমারও কাছে।
কেননা আমি এক গানের পাখী
যার চাই পাখীর কাকলিতে মুখরিত
নির্ভয় বনস্থলী,
আর চাই আদিগন্ত বিস্তৃত
অবারিত শস্যভরা মাঠ।
আমি কী করে থাকব তাই
দাবানলে পুড়ে যাওয়া বনে
কিংবা অফলা, পতিত, বিরান প্রান্তরে ?
তুমি জানতে আমি উড়ে যাব
অন্য কোনো বনস্থলীর আশে,
চলে যাব অজ্ঞাতবাসে;
তাই আর কোনো দিন আমার
ফেরা হবে না তোমাদের কাছে।
তুমি লড়াকু সৈনিক একদা ছিলে
কিন্তু এখন ধরেছে জরা
বয়সের ভারে শরীর হয়েছে স্থবির,
শ্রান্তিতে, অবসাদে অসময়ে
মাঝে মাঝে চোখে নেমে আসে ঘুম,
তখন বসে থেকে ঝিমাতে ভাল লাগে।
অত দূর দেশে কিংবা অজ্ঞাতবাসে
তোমার যাবার উপায় কোথায় ?
তাই বিদায় জানাতে এলে সেই কত কাল আগে
ঊনসত্তরে এক দিন ফুলবাড়ী স্টেশনে।
ট্রেন এলে আমরা প্ল্যাটফর্মে
দু’জনে আবদ্ধ হলাম গভীর আলিঙ্গনে
যেন দুই কালের দুই সৈনিক­­ পিতা ও পুত্র তারা।
তখন তোমার চোখ হতে নামল জলের ধারা
যত বার মোছ তত নামে জল ঝর ঝর করে।
ট্রেন ছেড়ে দিতে
শফদা বিদায় নিলাম আমি
তুমি দাঁড়িয়ে রইলে অশ্রু ভেজা মুখে
জলভরা দু’টি চোখে দেখলে ট্রেনের চলে যাওয়া,
যেন দেখলে ক্লান্ত পাখীর মত
এক গানের পাখীর দূর নীলিমায় উড়ে চলে যাওয়া।১

২৯ জুন ২০০৪
১৬ আষাঢ় ১৪১১

১ ১৯৬৯-এর ২৫ মার্চ তারিখে পাকিস্তানের সেনা প্রধান জেনারেল ইয়াহিয়ার সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠার পর পঞ্চগড়ের নিকটবর্তী আমার মূল অবস্থান এলাকা ফুটকিবাড়ীতে ইপিআর (বর্তমান বিডিআর-এর পূর্ববর্তী তৎকালীন সীমান্ত রক্ষী বাহিনী) বাহিনীর সন্ত্রাস নেমে আসার ফলে এবং তৎকালীন দিনাজপুর জেলায় সামরিক প্রশাসন কর্তৃক আমাকে গ্রেফতারের নির্দেশ থাকায় এবং তৎকালীন দিনাজপুর জেলার বাস্তবতার প্রেক্ষিতে আমার পক্ষে তৎকালীন বৃহত্তর দিনাজপুর জেলায় কার্যকরভাবে কৃষক এবং অন্যান্য গণ-আন্দোলন গড়ে তোলা যে অত্যন্ত সময় সাপেক্ষ এবং কষ্ট সাধ্য হবে তা বুঝার পর আমি আমার অন্যতম কর্মক্ষেত্র তৎকালীন রংপুর জেলার কালীগঞ্জ থানাধীন আদিতমারীতে অবস্থান নিয়ে কৃষক আন্দোলন ও সংগঠন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিই। এই সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিনাজপুরের সহকর্মী ও কমরেডদের নিকট বিদায় নিই। দিনাজপুর জেলার ফুলবাড়ী স্টেশনে ১৯৬৯-এর এপ্রিল-মে মাসের কোনও একদিন শফদা আমাকে চোখের জলে বিদায় দেন।
 

১৯৬২ আর ১৯৬৯

মিছিল আর মিছিলের দিন
বাষট্টির সেই এক দিন
বাষট্টির সেই বহু দিন
মিছিল নেমে এল রাজপথে,
পাঠ কক্ষ হতে
যৌবন ধেয়ে এল পথে-প্রান্তরে,
নামল জোয়ার, যৌবন জোয়ার,
ভেসে গেল ক্রমে পথ-মাঠ-ঘাট
যৌবন জোয়ারে।
এভাবে কিছু দিন গেলে
বাষট্টি স্তিমিত ধীরে ধীরে হল,
যেন ঝড় আসার আগে সেটা
পৃথিবীর শান্ত ভাব ছিল।
অবশেষে প্রাচীন পুরুষ এক
পরনে লুঙ্গি, মাথায় বেতের টুপি
আর মুখ ভরা দাড়ি নিয়ে
ধেয়ে এলেন ঝড় আর জলোচ্ছ্বাসের
প্রমত্ততা নিয়ে, দিয়ে সব ভাসিয়ে।১
শুরু হল নবতর বেগে
মিছিল, মিছিল আর মিছিলের বহু বহু দিন,
সারা দেশ ভেসে গেল
ঊনসত্তর জুড়ে।
দূর দেশী রাজা ছিল
সিংহাসনে বসে,
পেয়াদা-বরকন্দাজ ছিল
রাজাকে ঘিরে,
সকলই ভেসে গেল
জনোচ্ছ্বাস আর জন-জোয়ারে।
ঊনসত্তর জুড়ে
মিছিল, মিছিল আর মিছিল ছিল
যেন অগণন আর অন্তবিহীন;
বায়ান্নর পথ ধরে আসা
বাষট্টি আর ঊনসত্তর এইভাবে হল
বাঙ্গালীর জাগরণ আর বিজয়ের দিন।২

১ জুলাই ২০০৪
১৭ আষাঢ় ১৪১১

১ জন-নেতা মওলানা ভাসানীকে বোঝানো হচ্ছে।

২ ১৯৬২-তে ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে এ দেশে সামরিক একনায়ক আইয়ুব সরকারের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৬৯-এ গণ-অভুøত্থান ঘটে ১৯৬৮-এর ৬ ডিসেম্বর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) নেতা আবদুল হামিদ খান ভাসানী কর্তৃক আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের সূচনার পরিণতিতে। ভাসানীর নেতৃত্বে গণ-অভুøত্থান এমনই ব্যাপ্তি ও প্রচণ্ডতা লাভ করে যে তার আঘাতে দশ বৎসর ব্যাপী ক্ষমতাসীন আইয়ুব খানের পতন ঘটে।
 

ক্যানভাসের মিছিল

ফারুক, বুলবুল ! মনে কি আছে তোমাদের
ঢাকা কলেজে
কীভাবে আমরা আড়ালে থেকে
একটু একটু করে
বিরাট ক্যানভাসে
মিছিলের ছবি এঁকেছিলাম ?
রাজরোষ ভয়ে
সে ছবি লুকানোও ছিল
যথারীতি যেন বহু কাল।
অবশেষে বাষট্টিতে সহসা
সে ছবি টাঙ্গালাম আমরা
ঢাকা কলেজের সামনের রাজপথে।
আশ্চর্য তুলির টানে আঁকা
ছবিগুলো রাজপথে সহসা
ক্যানভাস থেকে নেমে এসে
্লোগানে রাজপথ মুখরিত করে
জীবন্ত মানুষের
মিছিল হয়ে গেল।
ঐ মিছিলে আঁকা হয়েছিল তখন
আরেক অদৃশ্য ক্যানভাসে
ঊনসত্তরে আইয়ুবের পতনের ছবি।

বাষট্টির ঐ দিন
ঢাকা কলেজের সামনে
রাজপথে সহসা
মিছিল হয়েছিল;
ফারুক, বুলবুল!
মনে কি আছে তোমাদের আজ
সেই মিছিলে আমরা ছিলাম? ১

১ জুলাই ২০০৪
১৭ আষাঢ় ১৪১১

১ ১৯৬০ সালে আমি ঢাকা কলেজে ইন্টারমিডিয়েট আর্টস-এ ভর্তি হলে বর্তমান কলেজ শিক্ষক নেতা কাজী ফারুক আহমদ (’৬২-এর ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম নেতা এবং প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমদের ছোট ভাই) এবং কবি বুলবুল খান মাহবুবকে আমার সহপাঠী হিসাবে পাই। আমরা তিনজন ঢাকা কলেজ, নর্থ হোস্টেলের আবাসিক ছাত্র ছিলাম। আমরা তিনজন হোস্টেলে ‘শিখা’ নামে একটা পাক্ষিক দেওয়াল পত্রিকা দুই বৎসরের অধিকাংশ সময় জুড়ে প্রায় নিয়মিত ভাবে বের করতাম। এই পত্রিকা আমার সহপাঠীদের মধ্যে ধর্ম, রাজনীতি ও দর্শন সংক্রান্ত আমার তৎকালীন দৃষ্টিভঙ্গী প্রচার এবং রাজনৈতিক চেতনা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে খুব সহায়ক প্রমাণিত হয়। বিশেষত এই পত্রিকাকে ঘিরে যে কর্মকাণ্ড চলে তার ফল বোঝা যায় ১৯৬২-তে পাকিস্তানের সামরিক একনায়ক আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র অভুøত্থান ঘটলে। ১৯৬২-এর জানুয়ারীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আকস্মিক ছাত্র আন্দোলন বিস্ফোরিত হলে ঢাকা কলেজের ছাত্র হিসাবে আমরাও রাজপথে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল বের করি।
 

সময়

বহু কাল আগে এক দিন হেঁটেছিলাম
মাইল মাইল পথ যেইসব গ্রাম আর জনপদ
সেগুলি কি আজ আর তেমন আছে?
কখনো পায়ে হেঁটে চলা,
কখনো নৌকা, লঞ্চ, ট্রেন অথবা বাসে
ঘুরেছিলাম যেইসব দেশ
যেইসব গ্রাম, শহর, হাট-বাজার, গঞ্জ, বন্দর
এত কাল পর সেগুলি আর কি তেমন আছে?
যেইসব মেঠো পথ ধরে
এক দিন হেঁটে গিয়েছিলাম
কোনো গহীন অচেনা গ্রাম
হয়ত বা আজ সেখানে হয়েছে শহর
পিচ ঢালা পথে চলে বাস আর ট্রাক।
যেইসব খড়ো বাড়ী কৃষক কিংবা মজুরের
যেইখানে একদিন ঘুমাতাম
শীতের রাতে
কাঁথা গায়ে দিয়ে
কিংবা মাটিতে পোয়ালের১ ’পর ধোক্‌ড়া পেতে
কিংবা কখনো পোয়ালের গাদার ভিতর
সেইগুলি কি আর এখনো আছে?
হয়ত বদল হয়েছে সেগুলো বহুবার
কোনোটা হয়ত নাই একেবারে
কোনোটা হয়ত হয়েছে ইটের।
সেই সব মানুষেরা যারা ছিল অনেক কাছের
অনেকে ছিল মিছিলে পাশে
আজ তারা কে কোথায়, কেমন আছে?
সময় নিয়েছে যাদের তার কাছে টেনে
তারা হারিয়ে গিয়েছে একেবারে
বাকীরা হয়ত আজ অনেকেই ক্লান্ত
বয়সের ভারে, সময় রাখে যে
এইভাবে তার স্বাক্ষর
সবার উপর।
তবু মাঝে মাঝে মন কেমন করে,
জানতে ইচ্ছা করে।

২ জুলাই ২০০৪
১৮ আষাঢ় ১৪১১

১ বৃহত্তর দিনাজপুর-রংপুর অঞ্চলে ধান মাড়াইয়ের পর খড়কে বলা হয় পোয়াল। বিশেষত আমন ধানের পোয়াল এক জায়গায় পঁুজ দিয়ে বা বিশেষ কায়দায় স্তূপ করে রেখে সারা বছর গরুকে খাওয়ানো হয়। এই পোয়াল বা খড় উষ্ণতাকে ধরে রাখে। সুতরাং ঐ অঞ্চলের তীব্র শীতের রাতে কৃষকদের বাড়ীতে ঘুমাবার সময় কখনো কখনো স্তূপ করা পোয়ালের ভিতর চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমাতাম। এতে বেশ আরাম পাওয়া যেত। আর মাটিতে খড় বিছিয়ে তার উপর ধোকড়া (ঐ অঞ্চলে প্রচলিত হাতে বোনা এক ধরনের পাটের চট) পেতে শুয়ে গায়ে চাদর দিয়ে তার উপরে বেশ পরিমাণ খড় চাপা দিয়ে ঘুমিয়েও বেশ আরাম পেতাম। সাধারণ কৃষকরা লেপ দিতে পারত না। অনেক সময় বাড়তি কাঁথা দেওয়াও তাদের জন্য কষ্টকর হত।
 

একাত্তরের কড়চা

জয়নুল! ওটা ছিল স্বপ্ন দেখার কাল
তাই তুমিও তৈরী করতে চেয়েছিলে এক স্বপ্ন-ভূমি
সাগর গর্ভ থেকে জেগে ওঠা এই ব-দ্বীপ ভূমিতে।
তাই বিহারের উন্মূল শিকড় তোমার ছড়াতে চাইলে
এক দিন এই বাংলার পলির গভীরে।
তাই আরো অনেক উন্মূল মানুষের মত
তুমিও এক দিন এসেছিলে আমাদের মিছিলে,
তুমিও এক দিন বাঙ্গালীর পাশে এসে
ধ্বনি দিয়েছিলে স্বাধীন পূর্ব বাংলার।
জয়নুল! সেটা ছিল স্বপ্ন দেখার কাল
তাই আমরাও স্বপ্ন দেখতাম আর
খেলতাম অবিরাম নানান স্বপ্ন নিয়ে।
ইচ্ছা হলে সূর্যের সাত রং ছড়াতাম আকাশে
অথবা শস্যের ক্ষেত আর বনে ছড়াতাম,
ইচ্ছা হলে দূর নক্ষত্রের দেশে
উল্কার গতিতে উড়ে চলে যেতাম,
কখনো বা বালি হাঁস হয়ে
উড়ে যেতাম অচেনা মহা সাগরের পাড়।
জয়নুল! অমনই এক কালে তুমি
উর্দূ ভাষাতেই আরো অনেকের মত
অমনই সব স্বপ্ন নিয়ে খেলতে খেলতে
চলে এলে আমাদের মিছিলে,
যেখানে উচ্চারিত ধ্বনি ছিল সকলের
স্বাধীন পূর্ব বাংলার,
কৃষকের, শ্রমিকের, মেহনতী মানুষের,
অগণন বাঙ্গালী ও অবাঙ্গালী জনতার বাংলার,
স্বাধীন ও মুক্ত মানুষের বাংলার।

স্বপ্ন তো স্বপ্নই তাই না জয়নুল !
তার বিচরণ বাস্তব থেকে পরাবাস্তবে,
তাই স্বপ্নের কাল স্বপ্নেই রবে
এই বুঝি নিয়ম জয়নুল
যা আমরা বুঝি নি সে দিন বড় ভুল করে !
অথবা এও বুঝি জানা ছিল না আমাদের
স্বপ্নও অপহৃত হতে পারে অসতর্ক কোনো সময়ে,
অথবা প্রবল কোনো দসুø এসে
কেড়ে নিতে পারে তা।
জয়নুল ! ঐসব স্বপ্ন আজ কী অর্থ বহন করে,
কী অর্থ বহন করে আজ ঐসব উচ্চারিত ধ্বনি ?
তবে কি স্বপ্নময় এত প্রাণ এক তুচ্ছ ভুলের খেলায়
একাত্তরে শেষ হয়ে গেছে,
নাকি স্বপ্নেরা অপহৃত হয়েছে একাত্তরে?
জয়নুল! তুমি চলে গেছ বাংলার মাটি ছেড়ে,
পিছনে রেখে গেছ শুধু আমাদের বুকে কিছু দীর্ঘ নিঃশ্বাস।
তুমি আর ফিরবে না সেখানে
যেখানে তোমার স্বপ্নেরা মৃত অথবা অপহৃত,
উচ্চারিত ধ্বনিগুলো কেবলই তামাশা।

জয়নুল ! একাত্তর কি তবে দিয়েছে এক মস্ত তামাশা,
অথবা পিছন থেকে আর কেউ দিয়েছে তা ?১

৩ জুলাই ২০০৪
১৯ আষাঢ় ১৪১১

১ ষাটের দশকে তৎকালীন রংপুর জেলার (বর্তমান নীলফামারী জেলাধীন) সৈয়দপুর রেলওয়ে ওয়ার্কশপের বিহারী যুবক জয়নুল আবেদীন ছিলেন সৈয়দপুর এবং উত্তর বঙ্গের রেলওয়ে শ্রমিক আন্দোলনের একজন নেতৃস্থানীয় কর্মী। তিনি তৎকালীন গোপন পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মী ছিলেন। ১৯৬৯-’৭১ পর্বে আমি পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির রংপুর জেলা কমিটির সম্পাদক হিসাবে ভূমিকা পালন করা কালে তাঁর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সেই সময় আমাদের পার্টির ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা তৎকালীন পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা আন্দোলনে যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিহারী এবং উর্দূভাষী যোগ দিয়েছিলেন জয়নুল আবেদীন ছিলেন তাদেরই একজন। ’৭১-এ তিনি সৈয়দপুরে অনেক বাঙ্গালী রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং পাকিস্তানীদের হাতে নির্যাতন ভোগ করেন। ১৯৭১ সালে বামপন্থী আন্দোলনে বিপর্যয়ের প্রেক্ষিতে তিনি পূর্ব বাংলা ত্যাগ করে পাকিস্তান চলে যান।
 

জয়নুল ! তুমি বনস্পতি হতে চেয়েছিলে
 
জয়নুল ! বাংলার মাটিতে
তুমি বনস্পতি হতে চেয়েছিলে।
বিহারের জমি হতে উপড়ে আসা
বৃক্ষ-শিশু তুমি
ভেবেছিলে বাংলার নরম পলির গভীরে
ছড়াবে শিকড় তোমার,
তারপর মাটির গভীর হতে
রস টেনে নিয়ে
ক্রমশ পুষ্ট হয়ে
অনেক উঁচুতে মাথা তুলে
আকাশের সীমানাতে ডালপালা ছড়িয়ে
সূর্যের আলো যত পারো
পান করে হবে
আরও সবল ও প্রবল
বনস্পতি এক
শক্ত বর্মের মত বাকলে
শরীর ঢেকে।

জয়নুল! বিহারের উদ্ভিদ তুমি
বাংলার জমিতে বনস্পতি হতে চেয়েছিলে।
এমনই সবল বনস্পতি এক
প্রবল ঝড়ও পারবে না যাকে নোয়াতে।
ভেবেছিলে দলে দলে পাখীরা আসবে
তারা গাইবে, নীড় বাঁধবে
তোমার ডালে ডালে যুগ যুগ ধরে।
চৈত্র দিনের রোদের আগুন
যখন ঝরবে দুপুরে
তখন ক্লান্ত কৃষকেরা
জমি হতে ফিরে কিছুক্ষণ
বিশ্রাম নিবে তোমার শীতল ছায়ায়
অথবা পথিকেরা কখনো
অলস দুপুরে বিশ্রাম নিতে গিয়ে
কিছুক্ষণ ঘুমাবে তোমার ছায়ার নীচে।
তুমি দেখবে সকলই অদৃশ্য নয়নে,
অনুভব করবে
অপার আনন্দ আর কৌতুক।

জয়নুল ! তুমি বৃথা বাংলার মাটিতে
বনস্পতি হতে চেয়েছিলে।
বিহারে উদ্ভিদ হতে
সেই হয়ত হত ভাল।
এখানে যেন এক হঠাৎ প্রবল জলোচ্ছ্বাস
একাত্তরে এক দিন
সমুদ্র থেকে উঠে এসে
তছনছ করে দিল
উপকূল, বনস্থলী আর
আমাদের স্বপ্নময় ব-দ্বীপ ভূমি।
তোমারও স্বপ্ন ভেসে গেল
সেই সাথে তুমি,
শ্যাওলার মত ভেসে গেলে
জয়নুল তুমি
আরব সাগর পারে;
পিছনে রেখে দিয়ে গেলে
এ বাংলার মাটিতে
আমাদের কাছে
শুধু কিছু স্মৃতি,
আমাদের ব্যর্থতা, বিপন্নতা
ও বেদনার অশ্রু মাখা স্মৃতি।

৩ জুলাই ২০০৪
১৯ আষাঢ় ১৪১১
 

আটত্রিশ বছর আগে দেখা শালিক
 
আটত্রিশ বছর আগে যে শালিক তুমি
এক চৈত্রের দুপুরে নির্জন গোলাপগঞ্জের হাটে
আমাকে দেখেছিলে অবাক চোখ মেলে
বহু দূর পথ আমাকে পায়ে হেঁটে যেতে
সে শালিক তুমি তো নাই আর বেঁচে
বহু কাল আগে তুমি চলে গেছ প্রকৃতিতে।
যদিও আমি বেঁচে, তবু সেই যুবকও নই আর
এক দিন যে কৃষক সমিতির কাজে
দূর পথ হেঁটে যেতে গিয়ে দেখেছিল তোমাকে
চৈত্রের রৌদ্র ক্লান্ত দুপুরে
নির্জনে পড়ে থাকা গোলাপগঞ্জের হাটে।
এক চালার উপর অস্থির স্বরে কথা বলছিলে,
ভাষা বুঝি নাই তবু দেখলাম তোমাকে,
তুমিও অবাক চোখে দেখলে আমাকে
পশ্চিমের লু হাওয়ার প্রবল দাপট
ঠেলে ঠেলে নির্জন হাটের ভিতর দিয়ে
দূর পথে একা হেঁটে যেতে।
আজিও সে কথা মনে রেখে
মনে ভাবি, ওগো পাখী !
তুমি আছ কোথায়?
মৃতুøর পরপারে? প্রকৃতির মাঝে ?
সে কোথায় ? কীভাবে ?
তুমি মিশে গেছ জানি প্রকৃতির মাঝে
মিশে কি গেছে তবে প্রাণ, মন, কল-কাকলি
যা কিছু ছিল তোমার একদিন অধিকারে ?
সে সব আজ হয়েছে কেমন তবে ?
ওগো পাখী ! আমার স্মরণে যদিও আছ তুমি
তবে তাতে তোমার কী যায় আসে ?
লাভ-ক্ষতি যদি কিছু থাকে সে শুধু আমার
তোমার কী লাভ, কী বা ক্ষতি তাতে ?
তুমি তো জানবে না কিছু, পাবে নাও আর কিছু
আটত্রিশ বছর আগে
গোলাপগঞ্জের হাটে
শুধু একবার দেখা ওগো অচেনা শালিক পাখী!১

৬ জুলাই ২০০৪
২২ আষাঢ় ১৪১১

১ এটা ১৯৬৬ সালের ঘটনা। আমি সে বৎসর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তৎকালীন দিনাজপুর জেলায় কৃষক আন্দোলন গড়ার উদ্দেশ্যে খানসামা থানার অন্তর্ভুক্ত আমার পৈত্রিক গ্রাম হোসেনপুরে যাই এবং সেখানে কিছু দিন থাকি। হোসেনপুর থেকে ১২/১৩ মাইল দূরে বীরগঞ্জ থানার ভিতর মরিচার নিকটবর্তী এক গ্রামে (নাম সম্ভবত ব্রাহ্মণভিটা) কৃষক সমিতি গড়ার উদ্দেশ্যে ২/৩ বার পায়ে হেঁটে গিয়েছিলাম। হোসেনপুর থেকে প্রায় আট মাইল দূরে গোলাপগঞ্জের হাট। চৈত্র মাসে দিনাজপুর অঞ্চলে সাধারণত লু হাওয়া প্রবাহিত হয় যা পশ্চিম দিক থেকে বিহারের প্রবল উত্তাপ বয়ে নিয়ে আসে। পশ্চিমের এই প্রবল ঝড়ো হাওয়াকে সেখানে পশ্চিয়া বলে। এই রকম পশ্চিয়ার ভিতর চৈত্রের দুপুরে নির্জন গোলাপগঞ্জের হাটের ভিতর দিয়ে যাবার সময় একটি খড়ের চালার উপর একটা শালিক পাখী অস্থির ভাবে কিচির মিচির শব্দ করে আমার মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল, যার স্মৃতি আমি আজও ভুলি নি।
 

বিজয় স্মৃতি
 
মনে কি আছে গোলোক তোমার
ঊনসত্তরে আমরা কীভাবে
দুর্বৃত্ত কবলিত আদিতমারীকে
মুক্ত করেছিলাম ?
ছোরা-বল্লম-লাঠি হাতে
লাফাতে লাফাতে হুঙ্কার দিয়ে ধেয়ে যাওয়া
আমাদের মিছিল দেখেই
দুবৃêত্তরা পালালো চিরতরে।
আদিতমারী স্টেশন ঘিরে
সেই সব গ্রামে
কয়েকটি জ্যোৎ্নার রাতে
আমাদের মিছিল হয়েছিল
যেই সব গ্রাম একদা হিংস্র পশু সম
দুর্বৃত্ত কবলিত হয়েছিল।
হিন্দুরা যারা ভারতের পথে
দেশ ছেড়ে চলে যেত
পায়ে হেঁটে কিংবা ট্রেনে
তারা ছিল তাদের সহজ শিকার,
নিঃস্ব করত তাদের,
আর মাঝে মাঝে ট্রেন থেকে
হিন্দু নারীদের জোর করে নামাত,
এই ছিল তাদের নিয়মিত কাজ।
মনে কি আছে গোলোক তোমার
তাদের অত্যাচারে
হিন্দুরা কীভাবে নীরবে
দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছিল ?
কীভাবে হিন্দু গ্রামগুলো
বিরান করছিল তারা
দখল করছিল বাড়ীঘর?
অবশেষে ঊনসত্তর এসে
ডাক দিল প্রতিরোধের, বলল­­
ধর্মের ভেদ ভুলে কৃষক অস্ত্র ধরো,
দানব বিনাশ করো
বেশী দেরী হবার আগে।
কৃষকেরা ভুলে গেল ধর্মের ভেদ
সবাই সবার ভাই হল;
তারপর ছোরা-বল্লম­-লাঠি
যার যা ছিল তাই নিয়ে
মিছিলে শরীক হল,
মিছিলে মিছিলে জ্যোৎ্নার রাতগুলো ভরে গেল।
সেইসব মিছিলে
আকবর, আফতাব, ধরণী ছিল
গোলোক তুমিও ছিলে।
গোলোক! মনে কি আছে তোমার
এই মিছিল দেখেই
দখল করে নেওয়া বাড়ীঘর ফেলে
দুবৃêত্তরা পালালো সকলে
গ্রাম ছেড়ে চিরতরে ?
এরপর কোনো দিন তারা
ফেরে নাই আর আদিতমারীর মাটিতে।
গোলোক ! মনে কি আছে তোমার
এভাবে একদিন ঊনসত্তরে
আদিতমারীকে আমরা মুক্ত করেছিলাম ?১

৫ জুলাই ২০০৪
২১ আষাঢ় ১৪১১

১ ঊনসত্তরে আদিতমারী স্টেশন ও গ্রাম ছিল তৎকালীন রংপুর জেলার কালীগঞ্জ থানার অন্তর্ভুক্ত। বর্তমানে ভারত সীমান্তবর্তী আদিতমারী একটি স্বতন্ত্র থানা বা উপজেলা, যা এখন লালমণিরহাট জেলার অন্তর্ভুক্ত। ১৯৬৯-এ আমি যখন আদিতমারী এলাকায় কৃষক সংগঠন ও আন্দোলন করতে যাই তখন সেখানে হিন্দুদের করুণ অবস্থা দেখতে পাই। বিশেষত আদিতমারী স্টেশন ছিল বহিরাগত দুবৃêত্তদের নিয়ন্ত্রণাধীন। আদিতমারী এলাকার বিভিন্ন গ্রামের কৃষকদের সংগঠিত করার পর আদিতমারী স্টেশন সংলগ্ন পল্লীগুলিতে আমরা কয়েক রাত মিছিল করি। এইসব মিছিলে মুসলমান কৃষকদের পাশাপাশি বিভিন্ন পল্লীর হিন্দু কৃষকরাও অনেকে ছোরা, বল্লম ইত্যাদি নিয়ে যোগ দেন। সম্ভবত আমরা ২/৩ রাত এভাবে মিছিল করতেই আদিতমারী স্টেশন সংলগ্ন পল্লীর দখল করা বাড়ীঘর ফেলে বহিরাগত দুবৃêত্তরা চিরতরে পালিয়ে যায়।
আমাদের ঐ আন্দোলনের ফল কালীগঞ্জ-আদিতমারী-লালমনিরহাট অঞ্চলের জন্য সুদূর প্রসারী হয়। ’৭১-এর ঘটনাগুলো বাদ দিলে আজ অবধি ঐ সমগ্র অঞ্চলকে সাম্প্রদায়িক নির্যাতন মুক্ত হিসাবে সাধারণভাবে বিবেচনা করা যায়। আদিতমারীর গোলোকচন্দ্র বর্মণ ছিলেন ঐ সময় ঐ এলাকার কৃষক আন্দোলনের একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। তিনি এখনও জীবিত আছেন। কৃষক কর্মী আকবর আলী এবং ধরণী মোহন বর্মণ জীবিত থাকলেও আফতাব জীবিত নেই।
 

স্বপ্নের কাল মিছিলের কাল ষাটের দশক
 
সেটা ছিল মিছিলের কাল
ছিল স্বপ্নের কাল
মানুষেরা ছিল অনেকে তখন
স্বপ্নের মত
অথবা স্বপ্নলোকে
বিচরণ করে হত
অনেক অন্য রকম।
সেইসব মানুষেরা
নাই আর, যদিও
অনেকে বেঁচে আছে এখনো
তবু তারা প্রায় সকলে হয়েছে
অনেক অন্য রকম,
স্বপ্ন যে নাই আর
স্বপ্ন মুছে গেছে।
পরাবাস্তব থেকে বাস্তবে
অনেকে ফিরেছে, ফিরে
হয়েছে বেজায় সংসারী,
অনেকে তুখোড় বণিকের মত
হিসাবী।
এখনো মিছিল আছে,
তবে সময়ের ভিন্নতা
মেনে নিয়ে
তা একেবারে ভিন্ন রকম।
সময় বদলে দিয়েছে
পৃথিবীকে,
তাই সব
বদলে গিয়েছে;
সময়ের কাছে
হেরে যেতে হয়
এ বুঝি নিয়ম
প্রকৃতির ।
তাই তারা
এভাবে হেরেছে।
তবু বিপরীত কিছু থাকে
প্রকৃতির ভিতরে,
তাই থাকে কিছু এমন মানুষ
যারা স্বপ্নকে ধরে রাখে,
যাদের মনের ভিতর
সঞ্চিত হতে থাকে
অনাগত কালের
প্রবল আবেগ
যা মানে না
বাস্তব পৃথিবীর সবকিছুকে,
বরং বাস্তব হতে পরাবাস্তবে
নিতে চায় সবারে।
এও তো নিয়ম প্রকৃতির,
এভাবে প্রকৃতি নিজেকে বদলায়
বদলায় সময়ের গতিকে।
তবে কি এ কালও
বদলাবে পুনরায়?
আসবে নূতন সময়
নূতন স্বপ্নকে
ছড়াতে ?
স্বপ্নের মানুষেরা
তবে কি পুনরায়
দেখা দিবে এক দিন,
নূতন মিছিলের দিন
পুনরায় আসবে ?

৫ জুলাই ২০০৪
২১ আষাঢ় ১৪১১
 

নদীর নাম স্বর্ণামতী

বড় বেশী বাঁক নেওয়া নদী
স্বর্ণামতী নামে ছোট এক নদী
এখনো কি তেমন আছে
নাকি আরো বেশী আঁকাবাঁকা হয়ে
বয়ে গেছে তিস্তার দিকে ?
শিবের মন্দির এখনো কি আছে
তেমন নদীর পাড়ে, বটগাছটি
এখনো কি আছে যেন নদী জল ছঁুয়ে ?
মন্দির ডানে রেখে নদী গেছে ছুটে
পিছনে আদিতমারী সামনে সাপটিবাড়ী
আরো দূর তিস্তা নদীর বুকে।
দু’পাশে ধান ক্ষেত, গাছ-গাছালি,
ছড়ানো গ্রামগুলো শুয়ে বসে থাকে,
এরই মাঝ দিয়ে
স্বর্ণপ্রসবিনী নদী স্বর্ণামতী
বড় বেশী আঁকাবাঁকা পথে
ছুটে গেছে তিস্তার দিকে।
স্বর্ণামতী পার হয়েছি কত
কখনো পায়ে হেঁটে
যখন হাঁটু জল থাকে,
কখনো নৌকাতে চেপে
যখন ভরা নদী থাকে,
উত্তরে কমলাবাড়ী
অথবা আরো দূরে গেছি।
হাজীগঞ্জের হাট, তারপর
সীমান্ত রেখার ওপারে কুচবিহার,
যেই সব পথ এক দিন হেঁটেছিলাম
এখন এত কাল পর
অনেক বদলে গেছে জানি,
সময় যে বদলায়।
যে নদী পার হয়ে কত বার
দূর গ্রামে গেছি
সে নদী স্বর্ণামতী আজো কি তেমন আছে
নাকি বদলে গিয়েছে ?

৭ জুলাই ২০০৪
২৩ আষাঢ় ১৪১১
 

মহানদ ব্রহ্মপুত্র

মহানদ ব্রহ্মপুত্র আর তার চরগুলো
এখন কেমন আছে এতকাল পর ?
কেমনই বা আছে সেইসব মানুষেরা
যারা ছিল এক দিন ব্রহ্মপুত্রের দুই তীর বরাবর
আর তার অনেক চরের ভিতর?
ব্রহ্মপুত্র বয়ে গেছে এসে উত্তর দিক থেকে
উলিপুর, গাইবান্ধা, রৌমারী আরো সব জনপদ
কাউকে রেখে ডানে, কাউকে বামে, দক্ষিণের দিকে।
ষাটের দশক কিংবা যুদ্ধের বছর
খেয়া নৌকায় উঠে চিলমারী বন্দর হতে
যেতাম রৌমারী কিংবা আর কোনো চর।
তখন হেঁটেছি অনেক পথ চরের ভিতর,
কখনো থাকত শুধু ধূ ধূ বালুচর,
কখনো দু’পাশে নানান ফসলের ক্ষেত
থাকত ছড়ানো নরম পলির উপর।
চিনা, কাউন, ধনে আর জিরার ফলন
ছিল চোখে পড়ার মতন।
হত মিষ্টি আলু আর প্রচুর গম
তবে ধানের আবাদ ছিল তুলনায় কম।
ঐসব চরে চিনা, গমের ভাত অথবা কাউন খেতাম
কখনো মিষ্টি আলু সকালে নাস্তা পেতাম।১
ব্রহ্মপুত্র নদী থেকে অল্প কিছু দূর
একটা চরের উপর
ছিল রৌমারী বাজার আর থানা সদর।
আসলে ব্রহ্মপুত্রের দুই পাশে সবই নদী-চর
কখনো নদী হতে জাগে
কখনো আবার যায় জলের ভিতর।
রৌমারী থেকে পূবে কিছু দূর গেলে
মেঘালয় সারি সারি পাহাড়ের কোলে।
যুদ্ধের প্রয়োজনে দুই বাংলার অনেক গ্রাম-শহর
যেমন করেছি সফর
তেমন সেখানেও যাওয়া হয়েছিল যুদ্ধের বছর।
এতকাল পর ব্রহ্মপুত্র আর তার চরগুলো আছে কেমন,
আর তার মানুষেরা যারা এক দিন কাছে ছিল
তারাই বা কেমন এখন?
জানি না বহু কাল বহু কিছু, তবু
বিশাল বিস্তার নিয়ে ব্রহ্মপুত্র মহানদ
আর তার চরগুলো আর সেই লোকজন
যারা ছিল সাথী হয়ে একদিন আমাদের পাশে
স্মৃতিতে এখনো তেমনই মাঝে মাঝে আসে।

৭ জুলাই ২০০৪
২৩ আষাঢ় ১৪১১

১ পাকিস্তান আমলে উলিপুর, গাইবান্ধা, রৌমারীর বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমে কৃত্রিম উপায়ে জলসেচের ব্যবস্থার অভাব থাকায় এবং আমন ধানের আবাদের সময় বন্যার প্রাদুর্ভাবের কারণে ধানের আবাদ কম হত। ফলে চালের ভাতের পরিববর্তে চিনা, কাউন আর গমের ভাতের চল বেশী ছিল। গমের রুটিও খাওয়া হত। তবে ভাতের পরিবর্তে গম সিদ্ধ করে খাওয়ার প্রচলন বেশী ছিল। সাধারণ কিংবা দরিদ্র গৃহস্থরা বৎসরের একটা উল্লেখযোগ্য সময় সকালের নাস্তা হিসাবে সিদ্ধ মিষ্টি আলু খেত। কৃষক সংগঠন এবং পার্টি গড়ার প্রয়োজনে চরাঞ্চলে ঘোরার সময় আমাকেও এসব খেয়ে থাকতে হত। কৃত্রিম উপায়ে জলসেচের সাহায্যে ইরির ব্যাপক চাষের ফলে এখন প্রচুর ধানের ফলন হওয়ায় রৌমারী অঞ্চলের ঐ চিত্র বদলে গেছে বলে শুনেছি। ঐ সময় ইঞ্জিন চালিত নৌকাও ছিল না। সবই ছিল পাল এবং হাল চালিত। এতে যাতায়াতে অনেক সময় লাগত। চিলমারী থেকে দিনে সাধারণত একটা নৌকা রৌমারী যেত। যাত্রী নিয়ে সকালে কিংবা দুপুরে তা যাত্রা শুরু করত এবং রৌমারী বাজারে বা থানা সদরের নিকট পৌঁছাতে তার বিকাল এমন কি কখনো সন্ধ্যা হত।
 

পটভূমি নির্মাণ

আমজাদ ! আমরা কয়টি তরুণ যখন
যশোহর শহরের পথে হাঁটতাম
সে হাঁটা যেন ছিল স্বপ্নে বিচরণ।
তাই আমাদের আরচণ ছিল
স্বপ্নের মানুষের মতন।
তুমি অনর্গল কখনো
মধুসূদনের মেঘনাদবধ হতে
মুখস্থ বলে যেতে, আমরা শুনতাম,
যেন কবিতার উচ্চারণে ঝরত
আকাশের যত আলো বৃষ্টির মত।
দড়াটানা, তারপর ব্রীজ পার হয়ে
ঘোপের দিকে অথবা ঘোপের পাশে
জেলখানার সামনের পথ ধরে
গ্রামের দিকে হেঁটে যেতে যেতে
কথা বলতাম অথবা শুনতাম
কবিতা আবৃত্তি তোমার।
আর আমার ছিল
নানান বিশ্লেষণ আর স্বপ্নের বর্ণন­­
দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ ও সমাজ পরিবর্তন,
কখনো স্বাধীনতা, বাঙ্গালীর রাষ্ট্র গঠন,
কখনো সমাজতন্ত্র ও সশস্ত্র সংগ্রাম,
কখনো কল্পস্বর্গীয় কমিউনিজম।
এভাবে যশোহরে কখনো এখানে সেখানে বসে
কখনো রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে
আমরা কয়েকটি কিশোর
সন ঊনষাটে নির্মাণ করতাম যা
তা অনেকটা পরিমাণে হয়ে উঠেছিল
ষাটের দশক আর কিছুটা একাত্তর।১

৭ জুলাই ২০০৪
২৩ আষাঢ় ১৪১১

১ আমার পিতা ১৯৫৮ সালের শেষ দিকে রাজশাহী থেকে যশোরে বদলী হয়ে গেলে আমি কিছুদিন রাজশাহীতে থেকে নবম শ্রেণীর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যশোরে যাই এবং ১৯৫৯ সালে যশোর জেলা স্কুলে দশম শ্রেণীতে ভর্তি হই। সেই সময় আমার সহপাঠী হিসাবে পাই পরবর্তী কালের রাজনৈতিক নেতা আমজাদ হোসেন এবং খালেদুর রহমান টিটোকে। আমি সেখানে দশম শ্রেণীর ছাত্র থাকা কালে একটা তরুণ গোষ্ঠী গড়ে তুলি যা পরবর্তী কালে রাজধানী ঢাকা কেন্দ্রিক জাতীয় ছাত্র এবং রাজনৈতিক আন্দোলনকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
 

স্মৃতিতে বাঁচা

শফদা ! যে শুধু স্মৃতিতেই বেঁচে থাকে
তার আর দুঃখ কীসের?
কঠিন বাস্তব তাকে আর দেয় না আঘাত
সুখ-দুঃখ কিছুই থাকে না তার,
সুতরাং তুমিও ভাল আছ এখন, অনেক ভাল।
ঘরের খড়ের চালা হতে বৃষ্টির জল
ঝরল কি না ঝরল তোমার কী যায় আসে
দুধ বেচা হল কি না, গাইয়ের খোরাক
অথবা কার কাছ থেকে কিছু টাকা নিবে
কাজের বিনিময়ে
সে সব চিন্তাও আর নাই,
নাই যে সংসার জ্বালা
বৌ-ছেলে-মেয়ে কারো ভাবনা,
শফদা ! এইতো অনেক ভাল, তাই না ?

শফদা ! তে-ভাগার১ সাথীরা কোথায়
দেশ কেন ভাগ হল
কেন তছনছ হল এত আয়োজন,
কেন ষাটের দশক
আর একাত্তর
এত যে ধান ভরা মাঠ দিল
তার সব দানা কেন চিটা২ হল
সে সব কথা ভেবে কষ্ট পাবে না আর
বিপ্লব যাতনাও আর রইল না মনে,
শফদা ! এই তো অনেক ভাল, তাই না?

শফদা ! আমার মতন দুই চার জন
এখনো তোমাকে হয়ত স্মরণ করে
তাদের মনের মাঝে তুমি তাই বেঁচে,
সেই তো আনন্দ তোমার, কষ্ট তাদের।

৮ জুলাই ২০০৪
২৪ আষাঢ় ১৪১১

১ ১৯৪৬-’৪৭-এর তে-ভাগা কৃষক আন্দোলন।

২ যে সব ধানের মধ্যে কোন দানা থাকে না খোসা সর্বস্ব এমন সব ফাঁকা ধানকে চিটা বা চিটা ধান বলে।
 

কষ্ট

কত কাল আগের কথা
সেটা ছিল ঊনিশশ’ চৌষট্টির এক দিন
বরিশাল লঞ্চ ঘাটে
আমাকে তুলে দিতে এসে
বিমল! তুমি বলেছিলে,
‘দাদা! এই বুঝি আমাদের শেষ দেখা,
দেশ ছেড়ে আমরা যাচ্ছি চলে।’
আমার বুকের ভিতর তখন
আহত পাখী ডানা ঝাপটালো,
বিষণ্ন চরাচরে কেউ ছিল না তখন
তার বুকের কাছটিতে
অথবা তাকে শুশ্রূষা দিতে।
সময় তো বয়ে যায় আপন গতিতে
সুতরাং বয়ে গেল আরো কুড়িটি বছর।
অবশেষে অনেক কষ্ট করে
কলকাতার ঠিকানা বের করে
চুরাশিতে তোমাদের দেখা পেলাম।
সেই ছিল শেষ দেখা
বিমল তোমাদের সাথে,
আর হবে না দেখা সেও জানি,
সেই ভাল আর কষ্টের ভার না বাড়ানো,
ধ্বংসের ছবি আর নাই বা দেখলাম।
তোমাদের ঠিকানাও হারালাম
তোমরাও চাও না আর
পিছনের দিকে চেয়ে কষ্টকে বাড়াতে।
বিমল! জানি না এখন
তুমি কেমন আছ;
বেঁচে আছ কি না জানি না তাও।
শুধু এইটুকু জানি
আমাদের আর হবে না দেখা,
তবু কষ্টের বোঝাটুকু
আমাকে বইতে হবে
যতদিন বেঁচে রব­­
তোমরা যে এভাবে এক দিন
দেশ ছাড়া হয়েছ,
নিজ ভূমি হতে বিতাড়িত হয়েছ­­
এ দুঃখ বইব আপনি।১

৮ জুুলাই ২০০৪
২৪ আষাঢ় ১৪১১

১ ১৯৬২-’৬৪ পর্বে আমার পিতা তৎকালীন বরিশাল জেলায় একজন সরকারী কর্মকর্তা হিসাবে কর্মরত ছিলেন। এ সময় আমি প্রথমে ঢাকা কলেজ এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছিলাম। ছুটি হলে বরিশালে যেতাম। সেই সময় যুবক বিমলের সঙ্গে পরিচয় হয়। সে তখন সম্ভবত কলেজের ছাত্র ছিল এবং আমার ছোট ভাই-বোনদের গৃহশিক্ষক ছিল। পারিবারিকভাবে তাদের সঙ্গে আমাদের সুসম্পর্ক ছিল। ’৬৪- তে তাদের পরিবার ভারতে চলে যায়। দেশত্যাগ তাদের পরিবারের উপর ভয়ানক আঘাত হানে। তপতী তার ছোট বোন, যার উপর পরবর্তী কবিতা ‘তপতীর সংসার হল না’ লেখেছি। ‘কষ্ট’ এবং ‘তপতীর সংসার হল না’ এই কবিতা দুইটি ধর্ম-সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে বাংলা ভাগের এবং অব্যাহত ধর্ম-সাম্প্রদায়িকতার কুফল যে এই বাংলার বিশেষত হিন্দু জনগোষ্ঠীকে কী ভয়ংকরভাবে ভোগ করতে হয়েছে এবং আজও হচ্ছে তার সামান্য প্রতীকী চিত্রণ।
 

তপতীর সংসার হল না

তপতী! তুমি কারো বৌ হলে না
কোনো পুরুষের বুকের কাছটিতে
বৌ হয়ে তুমি ঘুমালে না।
তপতী ! তুমি কারো মা হলে না
কোনো শিশু এল না তোমার কোল জুড়ে
কেউ তাই ডাকল না তোমাকে মা বলে।
বাষট্টি-চৌষট্টিতে কিশোরী তুমি
তখন তোমাকে দেখেছি বরিশালে
সেও তো ক্বচিৎ-কদাচিৎ এবং
মৃদু দৃষ্টির আলোতে।
তুমি আসতে আমার বোনের কাছে,
ঢাকা থেকে গেলে তখন কখনো দেখেছি
শান্ত মেয়েটিকে চুপচাপ দাঁড়ানো।
তারপর কত কাল পর চুরাশিতে
কলকাতাতে তোমাকে দেখেছিলাম।
তখন যৌবন প্রান্ত সীমায় তোমার,
তবু ্নিগ্ধ জোৎ্না ঝরে পড়ছিল
তোমার হালকা শরীর, সুন্দর মুখ আর
বিষণ্ন দুই চোখ হতে।
আমার মনের ভিতরে এত কাল
ভাল লাগা যে অনুভবে ছিলে তুমি
সে অনুভব তখন ব্যথা কাতর হয়ে
তোমাকে দেখছিল চেয়ে।
দেখলাম একটি পরিবার
কীভাবে ধ্বংস হল
দেশ ভাগের আঘাতে।
তপতী ! মনে মনে ভেবেছি তখন
আর কোনো দিন কষ্ট পেতে ও দিতে
যাব না তোমাদের দেখতে।
তপতী! রূপ-গুণ সব ছিল তোমার
তবু তুমি কারো বৌ হলে না
তুমি কারো মা হলে না
তোমার সংসার করা হল না।

৮ জুলাই ২০০৪
২৪ আষাঢ় ১৪১১
 

উত্তরণ

এক অজপাড়াগাঁর
কয়টি তরুণ প্রাণ
যে স্বপ্ন নিয়ে
বাঁধল তারা
একটি বেড়ার ঘর,
এক দিন তা আলো দিল
বিন্নাগাড়ী বিলের পাড়ে
গাছ-গাছালির ফাঁকে থাকা
বিন্নাগাড়ী নামের গ্রামের ’পর।
সন ঊনিশশ’ ষাট
কয়টি তরুণ প্রাণ
বিন্নাগাড়ী বিলের পাড়ে
বিন্নাগাড়ী গ্রামের ভিতর
গড়ল যেই ক্লাব,
রাজা নামে তরুণ যার
হল প্রবল প্রাণ,
আদিতমারীর জাগরণে
সেটিই হল ক্রমে ক্রমে
একটি বিরাট ধাপ।
প্রায় দশটি বছর পর
ঐ ভিত্তিভূমির ’পর
ঊনসত্তর সনে,
আদিতমারী জাগল এবার
কৃষক আন্দোলনে।
কয়টি তরুণ প্রাণের
দশ বছরের শ্রমের পর
ঘটল নূতন আন্দোলন,
কৃষক আন্দোলনে
সংস্কৃতির হল এবার
রাজনীতিতে উত্তরণ।১

৯ জুলাই ২০০৪
২৫ আষাঢ় ১৪১১

১ ১৯৬০ সালে যশোর থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেবার পর আমি আমার নানা-নানির বাড়ী তৎকালীন রংপুর জেলার কালীগঞ্জ থানাধীন আদিতমারীর বিন্নাগাড়ী গ্রামে বেড়াতে গিয়ে প্রায় তিন মাস থাকি। ঐ সময় আমার প্রস্তাবে এবং আমার ছোটমামা (এডভোকেট নূরুন্নবী রাজা, বর্তমানে লালমনিরহাট জজ কোর্টে উকিল, তখন রংপুর কারমাইকেল কলেজের ছাত্র) এবং আমার যৌথ নেতৃত্বে বিন্নাগাড়ী গ্রামের শিক্ষিত ছাত্র-তরুণরা ‘জাগরণী সংসদ’ নামে একটা ক্লাব প্রতিষ্ঠা করে। রাস্তা সংস্কার, বৃক্ষ রোপণ, পাঠাগার প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা এবং দীর্ঘ কাল ব্যাপী নাট্য চর্চা ইত্যাদির মাধ্যমে ক্লাবটি লালমণিরহাট থেকে পাটগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত একটি অঞ্চল ব্যাপী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কেন্দ্রে পরিণত হয়, যার প্রাণ-পুরুষ ছিলেন এডভোকেট নূরুন্নবী (রাজা)। ঐ ক্লাবের মাধ্যমে একটি রাজনীতি সচেতন যুব শক্তি গড়ে ওঠে। যুবকদের প্রায় সকলে ছিল সাধারণ বা ছোট জোতদার কিংবা মধ্যবিত্ত গৃহস্থ পরিবারের ছেলে। ১৯৬৯ সালে আমি তৎকালীন দিনাজপুর জেলা থেকে রংপুর জেলায় আমার কর্মক্ষেত্র স্থানান্তরিত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে বিন্নাগাড়ীতে গিয়ে ঐ ক্লাবের যুবকদের সহায়তায় তৎকালীন রংপুর জেলায় কৃষক ও রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তোলার কাজ শুরু করি। সে সময় পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির মাধ্যমে পূর্ব বাংলার (বর্তমান বাংলাদেশ) স্বাধীনতার রাজনীতি গড়ার এবং ’৭১-এ স্বাধীনতা যুদ্ধ অপরিহার্য করার ক্ষেত্রে আমার যদি কোন ভূমিকা থেকে থাকে তবে সে ক্ষেত্রে আদিতমারী কৃষক আন্দোলনের ভূমিকা ছিল অপরিমেয়। কারণ তা আমাকে পার্টির ভিতরে স্বাধীনতার লক্ষ্যাভিমুখী রাজনৈতিক সংগ্রাম পরিচালনায় প্রভূত শক্তি যুগিয়েছিল। আমার লেখা ‘রাজনীতির পুনর্বিন্যাস’ এবং ‘কৃষক আন্দোলনঃ অভিজ্ঞতার সারসংকলন’ নামক গ্রন্থ দুইটিতে আমার সেকালের অভিজ্ঞতা ও ভূমিকার উপর কিছু আলোকপাতের চেষ্টা করেছি। গ্রন্থ দুইটি ব-দ্বীপ প্রকাশন কর্তৃক প্রকাশিত।
 

অনাথ ! তুমি অমনই থাকো

অনাথ! বহু কাল হল
গান শুনি না তোমার
ভাওয়াইয়া সুরে দেহতত্ত্বের১ গান।
মাঝে মাঝে তাই মনের ভিতর
চলে যাই সেই সুদূরে
সীমা পার হয়ে সময়ের,
ফুটকিবাড়ীর পাশে
ভারত সীমান্ত রেখার কাছে
তোমার বেড়ার বাড়ীতে।২
তখন সন্ধ্যা বেলা
বাজিয়ে দোতরা৩
তুমি গান গাও,
উদাস ভাওয়াইয়া সুরে
দেহতত্ত্বের গান
মন উদাস করা।
খঁুটিতে হারিকেন বাঁধা
তুমি টংয়ে৪ বসা
আমিও টংয়ে
পাশে তফেজুল,
তোমার গানের সুর
বাতাসে ভাসে।
স্তব্ধ চরাচর যেন
সে গানের ভাষায়
বেদনায় কাঁপে,
তোমার হাতের দোতরা বাজে।

এইটুকু থাক স্মৃতিতে গাঁথা
আর চাই না জানতে
তুমি আছ কেমন কোথায়
বেঁচে থাকলে বয়স কত।
প্রায় পঁচিশের যুবক ছিলে
সাইত্রিশ বছর আগে,
এখনো মনের ভিতর
তুমি তেমনই থাকো,
মাঝে মাঝে দোতরা বাজিয়ে
ভাওয়াইয়া সুরে
তুমি এক মনে গান গাও।
অনাথ! তুমি অমনই থাকো।

৯ জুলাই ২০০৪
২৫ আষাঢ় ১৪১১

১ বাংলা একাডেমীর ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে প্রদত্ত সংজ্ঞা অনুযায়ী­­‘দেহের মধ্যেই সকল সত্য নিহিত এই তত্ত্ব; দেহ আত্মা ইত্যাদির তত্ত্ব (দেহতত্ত্বের গান)’। রংপুর-দিনাজপুরে ভাওয়াইয়া সুরে দেহতত্ত্বমূলক যে সব গান আমি শুনেছি সেগুলোর মধ্যে দেহ কিংবা বস্তুগত বিষয়ের চেয়ে অতীন্দ্রিয় রহস্যময়তা এবং আধ্যাত্মিকতার প্রভাব বেশী দেখেছি।

২ ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯-এর মার্চ পর্যন্ত তৎকালীন দিনাজপুর জেলার ভারত সীমান্তবর্তী ফুটকিবাড়ীতে আমরা থাকা কালে সীমান্তের নিকটবর্তী গ্রামে কৃষক সমিতির সদস্য যুবক কৃষক অনাথ বর্মনের বাড়ী ছিল।

৩ বৃহত্তর দিনাজপুর-রংপুর অঞ্চলে দোতারাকে দোতরা উচ্চারণ করা হয়।

৪ বাঁশের যে মাচায় বসা বা শোওয়া হয় তাকে দিনাজপুর-রংপুর অঞ্চলে টং বলা হয়।
 

বিজয় দিবসের প্রশ্ন

বিজয় দিবস তোমরা বলছ যাকে
সে কাহাদের বিজয় দিবস শুধাই আমি কাকে ?
মিত্র বেশে ছদ্ম বেশে বিজয় যারা নিল
বুঝাও দেখি কেমনে সেটা মোদের বিজয় হল ?
মিত্র হত পাশে থেকে সেই তো ভাল হত,
তাদের এনে করল কারা বাঙ্গালীকে নত?
দুই তরফে বসল যারা তারা মোদের কে,
কাদের হাতে বিজয় গেল কাদের নিকট থেকে ?
এক পাকিস্তান ভেঙ্গে যারা দুই পাকিস্তান দিল
আসল বিজয় এভাবেই তো ছিনিয়ে তারা নিল।
যে দিনেতে দুবৃêত্তরা রাজদণ্ড পেল
সেই দিনেতে কেমন করে জাতির জয় হল?

১০ জুলাই ২০০৪
২৬ আষাঢ় ১৪১১
পাতাঃ ৩৭
৩৮

স্বাধীনতার তামাশা
যুদ্ধের আয়োজন করলাম আমরা
তোমরা হলে তার দাবীদার !
বাহ, বেশ চমৎকার !
স্বাধীনতা দূরে থাক
যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলে যারা
তারা হলে আজ
মুক্তি ও যুদ্ধ নামক
দুই শব্দের পাহারাদার,
এও এক আজব কাণ্ড বটে,
বাহ্‌, বেশ চমৎকার!
যারা বাঙ্গালীর রাষ্ট্র,
গণ-মানুষের রাষ্ট্র
হতে দিবে না
তাদেরই হাত দিয়ে
পেলে যে বস্তুখানা,
যে নামই দাও তাকে
কিছু যায় আসে না,
বাঙ্গালীর রাষ্ট্র ওটা
এভাবে হবে না,
গণ-মানুষেরও রাষ্ট্র যেমন
ওটা এভাবে হবে না।
দুই দলে ভাগ হয়ে
এ ওকে দোষ দিয়ে
কত কাল পাবে পার?
ভেবেছ জয় ঢাক পেটালেই
মিথ্যা সত্য হয়
সত্যের হয় হার,
আর মিলে চিরকাল
রাজসিক পুরস্কার ?
স্বাধীনতা আনতে
যে রাজনীতি লাগে,
যুদ্ধেরও আগে যে
তার রাজনীতি থাকে
সে কি জানা আছে?
সেটা জানবে কী করে ?
তোমরা কি ছিলে কভু
সে চিন্তার কাছে?
ছিল কি চিন্তা নূতন সমাজ
কিংবা রাষ্ট্র গড়ার ?
ছিল তো চিন্তা একটাই
ভোট জিতে নিয়ে
ক্ষমতায় গিয়ে
অর্থ-বিত্ত লুটার।
ভোট ভোট করে
খেলেছিলে খেলা,
গলাবাজী করে
বাধালে ঝামেলা,
গোলমালে পড়ে শেষে
কেউ ধরা দিলে
বাড়ীতেই বসে,
বাকীরা সকলে
দৌড়ঝাঁপ দিয়ে
গেলে প্রতিবেশী এক দেশে।
এভাবে তোমরা
সবটুকু দিলে
এর তার হাতে তুলে,
তারপর পেলে যা
নাম দিলে স্বাধীনতা,
ভালই তামাশা !
এভাবে ভাল কিছু হয়
হয়েছে কোথাও ?
তাই তো হয়েছে এমন,
বিকৃত এক রাষ্ট্র-সমাজ
আমরা দেখছি যেমন।
সারা দেশ জুড়ে
স্বাধীন বাংলার
যারা রাজনীতি গড়ল,
কৃষক-শ্রমিক জনতার বাংলার
যারা চেতনাকে আনল,
তাদেরই ধ্বংস করে
তোমরা হলে দাবীদার তার !
বাহ্‌, বেশ চমৎকার !
এ বড়ই মজার আবদার !
বড় তামাশার কারবার !

৯ জুলাই ২০০৪
২৫ আষাঢ় ১৪১১
 

কিছু কৈশোর স্মৃতি

সে কালে আমাদের বেশ পাঠাভ্যাস ছিল, তাই না আমজাদ ?
বই খঁুজে বেড়াতাম, কোথায় একটা ভাল বই পাওয়া যায়!
খাতির ছিল তার আমাদের কাছে যার ছিল পাঠাভ্যাস
অথবা বইয়ের সংগ্রহ যার ছিল আমাদের কাছে লোভ জাগানীয়া।
আমরা ঘুরতাম, কথা বলতাম আর পড়তাম,
সমাজ, পৃথিবী, বই সব দিকে ছিল কড়া নজর,
যেন পৃথিবীকে জয় করে নিতে চাইতাম বুদ্ধি ও হৃদয় দিয়ে,
আর আমার ছিল স্বপ্ন সুন্দর পৃথিবীর, সুতরাং তা গড়তে চাইতাম।
যশোর তখন ছিল ছোট্ট শহর ছবির মতন ছিমছাম
স্বপ্নের ঘোরে যেন হাঁটতাম তার রাস্তায় দু’জনে মিলে।
গ্রাম ছিল চারপাশে নিকটে, সেখানে মাঝে মাঝে যেতাম
ঘর-বাড়ী, মানুষের চলাচল সবই জাগাত অসীম কৌতূহল।
তুমি ছিলে দারুণ কৌতূহলী পড়ার বিষয়ে
রাস্তায় পড়ে থাকা ছেঁড়া কাগজও তুলে নিয়ে দেখতে
কাগজের ঠোঙাও উল্টেপাল্টে মনোযোগ দিয়ে পড়তে
তারপর কখনো যত্ন করে পকেটে রেখে নিয়ে যেতে বাড়ীতে।
আমজাদ! তোমার ছিল কবিতার হাত, অবিরাম লেখতে
ভাবতাম মহাকবি হতে পারো কোনোদিন; হলে না কেন তা ?
কখনো রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আবৃত্তি করতে, যেন নদী বয়ে যেত অবিরাম,
আমি ছিলাম মুগ্ধ শ্রোতা তোমার, নীরবে শুনতাম।
গান শোনায়ও তোমার ছিল নিদারুণ ঝোঁক
হঠাৎ রেডিওর গান শুনে আলাপ বন্ধ করে রাস্তায় দাঁড়াতে।
আমিও গান খুব ভালবাসি তবু তোমার মত ছিল না তা,
গভীর বিষয় নিয়ে কথার সময় আমি ছেদ ভালবাসি না।
দর্শন, রাজনীতি, সমাজ, ইতিহাস এসবে আগ্রহ আমারই বেশী ছিল,
আমি বলতাম বেশী, তুমি নীরবে শুনতে, ক্বচিৎ মত দিতে
এভাবে আমাদের দু’জনের দশম শ্রেণীর সময় ছিল যশোরে
আনন্দ, রোমাঞ্চ আর স্বপ্নময়তায় পরিপূর্ণ এক কাল।
সেই সব দিন এখন স্মৃতির বিষয় মাত্র তাই না আমজাদ!
ফেরা যায় না সেখানে আর, তবু মাঝে মাঝে স্মৃতির জানালা দিয়ে দেখি।

১১ জুলাই ২০০৪
২৭ আষাঢ় ১৪১১
 

মধুর ক্যান্টিন আর মধুদা

মধুর ক্যান্টিন বলতে আমাদের স্মৃতিতে জাগে
আমতলার পাশে মধুদার ক্যান্টিন
যেখানে এক দিন ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে
আমরা আড্ডা জমাতাম আর চা খেতাম।
চায়ের স্বাদ পেতাম না তেমন
তবু আড্ডার জন্য তাই ছিল নিত্য প্রয়োজন,
চা খেতাম ২/১ কাপ আর কথা বলতাম।
রাজনীতি-আন্দোলনে উদ্দীপিত দিনগুলো
ক্লাসের সময়ের পর মধুর ক্যান্টিনে
একবার ঢুকলে বেরোতে চাইত না যেন আর।
জাফর, রনো, মেনন ইত্যাদি বড় নেতারা
সেখানে যেমন যেতেন তেমন জায়গা ছিল
সেখানে সকলের, সকলে আসর জমাতেন।
তবে তুলনায় আমি কম বসতাম
বরং কাজের আলাপ সেরে হলে চলে যেতাম
তারপর খাওয়া সেরে লাইব্রেরীতে যেতাম
পছন্দের বইয়ের সন্ধানে, অথবা হাঁটতাম
ঢাকার পথে পথে একা যেন স্বপ্নের ঘোরে।
তবু মধুর ক্যান্টিনের স্মৃতি প্রায়শ মনে জাগে
সেই সব মুখ এখনো চতুর্দিক ভাসে
যেন বসে আছে জীবন্ত সকলে
টেবিলের চারপাশে সারিবদ্ধ চেয়ারে।
হাট ভেঙ্গে গেলে শূন্য হাট পড়ে থাকে,
এখানে তাও নাই, বিশ্ববিদ্যালয় চলে গেছে দূরে
মধুর ক্যান্টিনও গেছে সেই সাথে বর্তমান অবস্থানে।
মধুদা সেই একাত্তরে নিহত পাকিদের গুলিতে
বাকীরাও চলে গেছে সকলেই দূরে।
তবু স্মৃতির আলোয় মাঝে মাঝে মধুর ক্যান্টিন জাগে
সেই সাথে জাগে মধুদার প্রসন্ন পিতৃসুলভ মুখ
যেন জানতে চাইছেন কত আমার হয়েছে বিল।১

১১ জুলাই ২০০৪
২৭ আষাঢ় ১৪১১

১ এখানে ১৯৬২-’৬৪ সালের স্মৃতিচারণ করা হয়েছে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল বর্তমান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরী বিভাগের স্থানে।
 

ভাসানীর যুগ চলে গেছে

জানি ভাসানীর যুগ চলে গেছে বহু কাল আগে
তবু মাঝে মাঝে ভাবি যদি তার মত প্রবল প্রাচীন পুরুষ
আজ হুঙ্কার দিয়ে দাঁড়াতেন--তবে কেমন হত ?
‘খামোশ’ বলার সাথে সাথে থেমে যেত সব চুরিদারী,
ভয়ে কাঁপত আমলা-পুলিশ, মাস্তানেরা পালাত।
লাখো জনতার মিছিল নামত পথে, মঞ্চে তিনি পদাঘাত করতেই
চুলোচুলি বন্ধ করে দুই মহিলা এক সাথে প্লেনের টিকিট কাটত।
জানি এ সবই ভাবনা শুধু, অলস কল্পনা, এসব কিছুই হবে না,
ভাসানীর কথা এখন শুনত ক’জন, ক’জনকে তিনি পেতেন এখন ?
কৃষকের ছেলেরা হর্তাকর্তা হয়েছে এখন দিন বদলের সাথে
শ্রমিক সে শ্রমিক নাই, ছাত্রও নাই তা, মিছিলের লোক তিনি পেতেন ক’জন ?
কৃষকও আর সে কৃষক নাই, অনেক বদল হয়েছে তার
নূতন প্রযুক্তির সাথে বাজার অর্থনীতি তাকে নিত্য শেখাচ্ছে পণ্যভোগ;
সেই ছোট ঢাকা শহরও নাই আর, এখন তা মহানগর
উচ্চ ও মধ্য শ্রেণীরও এখন বিরাট বিস্তার, আর আছে বাইরের যোগাযোগ।
আসলে সময় বদলেছে, তাই একজন ভাসানী এখন হবে না আর,
হলে হবে ভিন্ন কিছু, ভিন্ন সময় এখন, তাই দাবী তার ভিন্নতার।

১২ জুলাই ২০০৪
২৮ আষাঢ় ১৪১১
 

দুঃস্বপ্নের কাল

স্বপ্ন গড়ার কাল নয় এটা
এটা স্বপ্ন ভাঙ্গার কাল।
স্বপ্ন যত গড়া হয়েছিল
সেসবই তো ষাটের দশক জুড়ে।
স্বপ্ন ছিল সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা
আর জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ রচনার।
সেইসব স্বপ্ন গড়া মানুষেরা আজ কে কোথায়,
কোথায় হারালো তারা তেত্রিশ বছর ধরে?
অনেকে মরে গেছে­­ -- কেউ নিহত, মৃত কেউ,
অনেকে চলে গেছে বিস্মৃতির অন্ধকারে,
অনেকে স্বপ্ন হারিয়ে গেছে বিপরীত স্রোতে।
এক প্রতিবেশী রাষ্ট্র প্রবল প্রতাপ আর কূটচাল দিয়ে
ছিনিয়ে নিয়েছিল স্বপ্নগুলো, তারপর
বেচে দিল এক দল আশ্রিত বেনিয়ার কাছে।
এভাবে স্বপ্নগুলো হাত ছাড়া হয়ে চলে গেল
একদল চতুর, স্বার্থপর বেনিয়ার অধিকারে।
এরা এবার এসব স্বপ্নকে ভেঙ্গেচুরে সের দরে, মণ দরে
হাটে-বাজারে-চোরা মার্কেটে আজ অবধি বেচে খেতেছে।
এ কারবারে প্রচুর লাভ পেতেছে তারা
তেত্রিশ বছরে হয়েছে অনেক কিছুই তাদের
এভাবে এ কাল হয়েছে তাদের, এ কাল তাদের অধিকারে।
স্বপ্ন গড়ার কাল নয় এটা,
এটা স্বপ্ন ভাঙ্গার কাল।
তাই যেখানে যেটুকু মহৎ স্বপ্ন আছে
সেসবই কেড়ে নিয়ে ধ্বংসের কাল এটা,
এটা ধূর্ততায় পারঙ্গমতার কাল
এটা যা ইচ্ছা তাই করে আত্মোন্নতির কাল।
স্বপ্ন গড়ার কাল নয় এটা
এটা স্বপ্ন ভাঙ্গার কাল
এটা দুঃস্বপ্নের কাল।

১২ জুলাই ২০০৪
২৮ আষাঢ় ১৪১১
 

জনতা জাগাবার কারিগর
 
ভাসানী গর্জন করলেন, ‘খামোশ!’১
সব গোলমাল থেমে গেল তৎক্ষণাৎ,
সভায় পিন পতন নিস্তব্ধতা,
যেন নিঃশ্বাস ফেলতেও ভুলে গেল
সভায় উপস্থিত জনতা।
অতঃপর ভাসানী থামলেন কিছুক্ষণ,
দেখলেন এদিক ওদিক চেয়ে, শ্বাস টানলেন,
জনতা উদগ্রীব, কী বলেন তিনি এখন।
সহসা প্রবল বেগে তিনি মঞ্চে পদাঘাত করলেন
বললেন সেই সাথে, ‘আইয়ুবের গদিতে লাথি মারি!’
যেন কেঁপে উঠল আইয়ুবের সিংহাসন;
এভাবে কয়েকবার বলতেই
উত্তেজিত জনতা তুলল ধ্বনি
‘হুজুর বলেন কী করতে হবে, এখনই বলেন,
দেখেন আমরা কী করতে পারি!’
বললেন তিনি, ‘আগুনে ছাই করো আইয়ুবের সিংহাসন।’
তৎক্ষণাৎ শুরু হল প্রজ্বলন,
জ্বলল আগুন মানুষের মনে
অতঃপর সে আগুন ছড়ালো অগণন মিছিলে
দেশের প্রতিটি কোণে।
ভাসানী ছুটলেন মিছিলের আগে আগে
মুখে ছিল অবিরাম ‘জ্বালাও আগুন’ এই উচ্চারণ।
যেন সেই প্রাচীন পুরুষ শিবের ধ্বংস নৃত্যে মেতেছেন তখন,
সর্বত্র ছুটলেন তিনি আগুনে জ্বালাতে আইয়ুবের সিংহাসন
এবং সেই সাথে বহু শতাব্দী প্রাচীন দাসত্বের বন্ধন।
ছাই হল সে আগুনে আইয়ুবের সিংহাসন,
মুক্ত হল জন-জোয়ার,
এমনই বীর বিক্রম ছিলেন ভাসানী
যেন এক আশ্চর্য যাদুকর,
জনতাকে জাগাবার এত বড় কারিগর
এ দেশে কখনো আসে নি আর।২

১৩ জুলাই ২০০৪
২৯ আষাঢ় ১৪১১

১ ‘খামোশ’ ভাসানীর এক বিখ্যাত উচ্চারণ। গোলমাল থামাবার জন্য তিনি প্রায়শ এই হুঙ্কার দিতেন।

২ কবিতাটিতে ১৯৬৯-এর গণ-অভুøত্থানের একটা চিত্রকল্প উপস্থিত করা হয়েছে।
 

বাঙ্গালীর স্বাধীনতার প্রথম ঘোষণা

সন ঊনিশশ’ সত্তর, বাইশে ফেব্রুয়ারী
বাঙ্গালীর ইতিহাসে
স্বাধীনতার প্রথম প্রকাশ্য ঘোষণা দিতে
দাঁড়ালো কয়টি যুবক
পল্টন ময়দানে;
যেন মুক্ত কয়টি পারাবত
এখনই উড়ে যাবে আকাশে
মুক্তির বার্তা নিয়ে।
কিছু স্থবির প্রবীণ
গলা-মাথা মাফলারে ঢেকে
ছিল বড় ভয়ে
কী না করে বসে
মাথা গরম যুবকেরা
চির চেনা পৃথিবীটাকে
লণ্ডভণ্ড করে দিতে;
তারা না ডুবায় তাদের
ধর্ম-রাষ্ট্রটাকে ধ্বংস করে দিয়ে।
সভাস্থলে উপস্থিত জনতা
ছিল প্রত্যাশায় উন্মুখ
বিরাট একটা কিছু হবে,
অথবা শঙ্কা ছিল কারো মনে
কী জানি কী হয় !
যুবকেরা এল মিছিলে মিছিলে
স্বাধীনতা যুদ্ধের শক্তিকে নিয়ে
মুহুর্মুহুঃ স্লোগানে মাঠ ভরে গেল
স্বাধীনতা যুদ্ধের দাবীতে।
সহসা যেন বজ্রপাত হল
ধর্ম-রাষ্ট্রের বুকে,
মঞ্চ থেকে এল দৃপ্ত কণ্ঠে
বাংলার স্বাধীন গণ-রাষ্ট্রের ঘোষণা­­
এগারো দফা কর্মসূচী
স্বাধীন জন-গণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলার।
এভাবে তা ঘটালো
ছয় দফা থেকে স্বাধীনতায়
আন্দোলনের উত্তরণ।
ইতিহাসের অভিমুখ
নির্ধারণ করে দিয়ে
মঞ্চ থেকে মাঠে
যুবকেরা নেমে এল দৃঢ় পদক্ষেপে।
অতঃপর শুরু হল যে মিছিল
সে মিছিল জন্ম দিল একাত্তরে
স্বাধীনতা যুদ্ধের বাহিনীকে।১

১৪ জুলাই ২০০৪
৩০ আষাঢ় ১৪১১

১ ১৯৭০ সালের ২২ ফেব্রুয়ারী তারিখে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষ থেকে পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত প্রকাশ্য জন-সভায় স্বাধীন জন-গণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১১ দফা কর্মসূচী ঘোষণা করা হয়। এই কর্মসূচীতে পাকিস্তানের পরিবর্তে তৎকালীন পূর্ব বাংলার বুকে বাঙ্গালীর স্বাধীন রাষ্ট্রের রূপরেখা দেওয়া হয়। এটা ছিল বাঙ্গালী জাতির রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রথম প্রকাশ্য ঘোষণা। এই কর্মসূচীর সমর্থনে জন-সভায় বক্তৃতা দেন তৎকালীন প্রাক্তন ছাত্র নেতা এবং শ্রমিক নেতা কাজী জাফর আহমদ, প্রাক্তন ছাত্র নেতা রাশেদ খান মেনন এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মোস্তফা জামাল হায়দার এবং সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল্লাহ প্রমুখ। স্বাধীন রাষ্ট্রের কর্মসূচী ঘোষণার প্রেক্ষিতে সামরিক আদালত কাজী জাফর আহমদ ও রাশেদ খান মেননকে সাত বৎসর এবং মোস্তফা জামাল হায়দার ও মাহবুব উল্লাহকে এক বৎসরের সশ্রম কারাদণ্ডাদেশ দেয়। মাহবুব উল্লাহকে ১৯৭০-এর ২১ মার্চ গ্রেফতার করে কারাগারে নেওয়া হয় এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত তাকে কারারুদ্ধ থাকতে হয়। বাকীরা আত্মগোপন করেন এবং ১৯৭১-এ বাঙ্গালীর স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে তার পরিচালনায় আত্মনিয়োগ করেন।
 

স্বাধীনতার দুর্দশা

ঐ যুবকেরা১ এক দিন
স্পর্ধা ভরে বুনেছিল
স্বাধীন বাংলার বীজ
পূর্ব বাংলার জমিতে।
পূর্ব বাংলার
নরম পলির বুকে
তারা বুনেছিল
যে স্বপের বীজ
তা-ই এক দিন
মাঠ ভরা ফসলে
পরিণত হল।
তাতেই বিপদ এল,
এমন ফসল দেখে
অনেকেরই লোভ হল,
সে ফসল লুট করে নিতে
সহযোগী সাথে নিয়ে
ওপারের গ্রাম হতে
বর্গীর মত লাঠিয়াল এল।
তারা লুট করে নিল
যেটুকু পারে, রেখে গেল
পিছনে লণ্ডভণ্ড জনপদ
বিরান প্রান্তর
এখানে সেখানে ভস্মস্তূপ,
আর রেখে গেল পিছনে
স্বজনদ্রোহী সহযোগীদের
জমির দখলে দিয়ে।
স্বজনদ্রোহী দুবৃêত্তরা এবার
বাকীটুকু লুট করবে।
এতকাল জমি ও গ্রাম
এদেরই দখলে আছে।
এভাবে স্বাধীনতা নামের
সেই বীজের ফসল
স্বজনদ্রোহী দুর্বৃত্তদের
লুটের সম্পদ হল।

১৫ জুলাই ২০০৪
৩১ আষাঢ় ১৪১১

১ যে বিপ্লবী ছাত্র-যুব সমাজ ষাটের দশকে তৎকালীন পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার রাজনীতি গড়েছিল তাদের কথা বলা হচ্ছে।
 

স্বাধীনতার ঘোষকদের উদ্দেশ্যে

এক দিন সত্তরে
যে যুবকেরা বিদ্রোহের পতাকা
আকাশে প্রথম উড়ালে,
স্বাধীন রাষ্ট্রের
দিয়েছিলে প্রথম প্রকাশ্য ঘোষণা
সেই যুবকেরা
অনেক বয়সে এসে
আজ কে কোথায়,
কী করিতেছ বলো তো ?
প্রতিযোগী যারা ছিল
অথবা ছিল শত্রু তোমাদের
তাদের শক্তি ও বুদ্ধি
অনেক বেশী ছিল
অনভিজ্ঞ তোমাদের চেয়ে।
ভিতর ও বাহিরে
সর্বত্র ছিল যে
বাধা ও চক্রান্তের জাল
তা ছিন্ন করে যে দাঁড়াবে
সে সাধ্য সে কালে হয় নি তোমাদের;
সুতরাং স্বাভাবিক নিয়মে
তোমরা পরাজিত হলে
এবং তোমাদেরই গড়া স্বপ্ন
শত্রুরা লুট করে নিল।
পরাজিত হয়ে শেষে
মতিচ্ছন্ন হয়ে কেউ
যেটুকু স্বপ্ন ছিল
অবশিষ্ট রূপে
তারেও বিকিয়ে দিলে
বড়ই সস্তা দরে
এর তার কাছে,
কেউ বা ঘুরছ আজো
গোলোক-ধাঁধার ঘুরপাকে,
কেউ বা অবসাদে
হয়ত ঝিমাতেছ।
ঊনিশশ’ সত্তর সনে
কয়টি তরুণ প্রাণ
যে স্বাধীনতা চেয়েছিলে,
ঘোষণা দিয়েছিলে তার
সে কি এসেছে?
জাতি কি পেয়েছে স্বাধীনতা ?
তবে বাঙ্গালী কোথায়
কোথায় মেহনতী জনতার বাংলা
জাতিসমূহের অধিকারে সমুন্নত বাংলা
যা চেয়েছিলে তোমরা
চেয়েছিল একদা জাগ্রত জনতা ?
বহু কাল ধরে
নষ্ট মানুষেরা নিয়েছে অধিকারে
যে বাংলাকে
তা কি রইবে চিরকাল
তাদের পদানত ?
স্বাধীনতা মুক্তি কি পাবে না ?
বয়স হয়েছে অনেক
দেখলেও কম না
জানলেও কম না,
এখনো তবে কি
স্বপ্ন ফিরিয়ে নেবার
সময় আসে নি,
এখনো কি তোমরা
ঘুরে রুখে দাঁড়াবে না ?১

১৫ জুলাই ২০০৪
৩১ আষাঢ় ১৪১১

১ যে বামপন্থী ছাত্র-যুবকেরা ১৯৭০-এর ২২ ফেব্রুয়ারী তারিখে ঢাকার পল্টন ময়দানের জন-সভায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষ থেকে স্বাধীন জন-গণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলার ১১ দফা কর্মসূচী ঘোষণা করেন এবং তার সমর্থনে বক্তব্য দেন তাদেরকে উদ্দেশ্য করে কবিতাটি লেখা।
 

জাতি-রাষ্ট্রের তামাশা

ষাটের দশক ছিল বাঙ্গালীর
জাতি-রাষ্ট্র গঠনের
স্বপ্ন দেখার কাল।
সে স্বপ্ন দেখেছিল
সে কালে কয়টি তরুণ প্রাণ
এবং ছড়ায়ে দিয়েছিল তা
ক্রমে জাতির চেতনাতে।
সে স্বপ্নের পথ ধরে
অবশেষে বাঙ্গালী
জেগেছিল একাত্তরে
ধর্ম-সম্প্রদায় চেতনার জাল
ছিন্নভিন্ন করে।
কিন্তু প্রবল প্রতিবেশী ছিল
এ স্বপ্নের বিপরীতে,
বাঙ্গালীর জাতি-রাষ্ট্র চায় নাই তারা।
তাই সে স্বপ্নকে বানচাল করে দিতে
কূটচাল চেলেছিল তারা
নিপুণ হাতে সাজিয়ে ছক,
মঞ্চে পুতুল সাজিয়ে দিয়ে
আড়ালের খেলা খেলেছিল তারা।
যে পুতুল নাচের খেলা
খেলেছিল তারা
আজো চলিতেছে তা।
পিছনের খেলোয়াড়
বদল হয়েছে বটে,
কিন্তু পুতুলেরা আজো
মঞ্চের ’পর দেখায় তামাশা
পিছনের সূতার টানে।
যে স্বপ্ন ছিল জাতি-রাষ্ট্রের
সেটা বহু কাল আগে
ভেঙ্গে গেছে,
জাতিও গেছে সেই সাথে।
আছে শুধু আরো বিকট রূপ
ধর্মের নামে গঠিত
রাষ্ট্রের খণ্ডিত অংশটুকুর।
আমরা দেখি তাই আজ যা
সেটা জাতি-রাষ্ট্র নয় মোটেই,
সেটা জাতি-রাষ্ট্রের তামাশা।১

১৬ জুলাই ২০০৪
১ শ্রাবণ ১৪১১

১ ১৯৭১-এ তৎকালীন ভারত সরকার এবং তার আশ্রয়, নিয়ন্ত্রণ ও পৃষ্ঠপোষকতায় থাকা আওয়ামী লীগের ভূমিকা এবং এ দেশে স্বাধীনতা যু্‌েদ্ধর মূল সংগঠক তৎকালীন বামপন্থী তরুণ প্রজন্ম এবং বাঙ্গালী জাতির দুর্ভাগ্যকে এই কবিতায় বলা হয়েছে।
 

একাত্তরে আশার প্রদীপ নিভানো হল

গরীব বিধবা মায়ের আশার প্রদীপ
স্বাধীনতার স্বপ্ন গড়া ছাত্র কর্মী শফিক ১
একাত্তরে খুন হল লড়াইয়ের মাঠে।
ছয় মেয়ে এক ছেলের বিধবা মা’র আশা ছিল
শান্ত, ভদ্র অথচ শক্ত মনের ছেলে শফিক
এক দিন সংসারের হাল ধরবে শক্ত হাতে
এবং গরীব বিধবা মায়ের দুঃখ ঘুচাবে।
কিন্তু একাত্তর হঠাৎ করে এল
এবং বিধবা মায়ের সে স্বপ্ন কেড়ে নিল।
রংপুরের কলেজ ছাত্র শফিক
ছাত্র ইউনিয়ন করত এবং স্বপ্ন গড়ছিল স্বাধীনতার।
তাই স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু হলে
লড়াই করতে গিয়েছিল পাক-বাহিনীর বিরুদ্ধে
এবং পাটগ্রাম রণাঙ্গনে লড়াই করতে গিয়ে
সেখানেই শহীদ হয়েছিল,
তবে সামনের শত্রুদের গুলিতে নয়
বরং পিছনের মিত্রের ছদ্মবেশে শত্রুদের গুলিতে।
যাদের সঙ্গে মিলে শফিক
পাক-বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়তে গিয়েছিল
লড়াইয়ের মাঠে তারাই তাকে
পিছন থেকে গুলি করে খুন করেছিল।
রংপুরের ছাত্র ইউনিয়ন নেতা এবং
গরীব বিধবা মায়ের একমাত্র ছেলে শফিক
পাক-বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে
খুন হয়েছিল আওয়ামী লীগের লোকদের গুলিতে।
এভাবে একাত্তরে গরীব বিধবা মায়ের
আশার প্রদীপ নিভানো হল,
এভাবে একাত্তরে স্বাধীনতার স্বপ্নকে
পিছন থেকে গুলি করে খুন করা হল।

১৭ আগস্ট ২০০৪
২ ভাদ্র ১৪১১

১ দরিদ্র পরিবারের মেধাবী ছাত্র শফিক ছিল রংপুর কারমাইকেল কলেজের ছাত্র এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী। সম্ভবত ১৯৭০-এ সে ছাত্র ইউনিয়নের রংপুর জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়। রংপুর শহরে ছাত্রদের মধ্যে স্বাধীন পূর্ব বাংলার রাজনীতি সংগঠনে তার অগ্রণী ভূমিকা ছিল। তার পুরো নাম ছিল সম্ভবত শফিকুল ইসলাম। খুব নম্র, ভদ্র, শান্ত, আদর্শনিষ্ঠ এবং মেধাবী ছাত্র শফিক দরিদ্র বিধবা মায়ের এক মাত্র পুত্র সন্তান ছিল। তার ছয়টি বোন ছিল। আমার যত দূর মনে পড়ে সে ছিল সবার বড় এবং তার বোনেরা ছিল তখন পর্যন্ত অবিবাহিত। সে রংপুর শহরে লজিং থেকে কলেজে পড়ত। ১৯৭১-এ ২৫ মার্চ পাক-হানাদার বাহিনীর আক্রমণ অভিযান শুরু হলে শফিক দেরী না করে ভারতে গিয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেয়। সম্ভবত এপ্রিল অথবা মে মাসে তৎকালীন রংপুর জেলার সীমান্তবর্তী পাটগ্রাম (বর্তমানে লালমণিরহাট জেলাধীন) রণাঙ্গনে যখন সে পাকিস্তানী সেনার সঙ্গে লড়াই করছিল তখন তার পিছন থেকে তার সহযোদ্ধা আওয়ামী লীগের লোকরা তাকে গুলি করে হত্যা করে। এভাবে এক সম্ভাবনাময় জীবনের করুণ পরিসমাপ্তি ঘটানো হয়।
 

স্বাধীনতা ! আজ তোমাকে কৈফিয়ৎ দিতে হবে

স্বাধীনতা ! আজ তোমার কাছে
অনেক কিছুর কৈফিয়ৎ চাই আমি,
অনেক প্রশ্নের আমি উত্তর চাই।
স্বাধীনতা ! আজ আমাকে এ প্রশ্নের উত্তর দাও
তুমি কি দিয়েছ রংপুরের শফিকের ১ বিধবা মাকে,
যে শফিক স্বাধীনতার রাজনীতি গড়েছিল
এবং তার জন্য যুদ্ধ করতে গিয়ে
শহীদ হয়েছিল লড়াইয়ের মাঠে
পিছনের শত্রুর গুলিতে ?
স্বাধীনতা ! তোমাকে কৈফিয়ৎ দিতে হবে
কেন পৈশাচিকতার সাথে
খুন করা হয়েছিল স্বাধীন দেশে
জয়পুরহাটের সমীরের কর্মী রাবেয়াকে,২
যে সমীর খুন হয়েছিলেন একাত্তরে রাজাকারের হাতে ?
এভাবেই কি স্বাধীনতা তুমি
স্বাধীনতা যোদ্ধাদের প্রতিদান দিয়েছিলে ?
স্বাধীনতা ! তুমি জবাব দাও
যশোরের নজরুলের বাবা-মাকে
তুমি কী দিয়েছ স্বাধীন বাংলাদেশে,
যে তরুণ নজরুল ৩ একাত্তরে খুন হয়েছিল
পাক-সেনার হাতে ধরা পড়ে ?
স্বাধীনতা ! তুমি জবাব দাও
যে অগণিত হিন্দু শুধু ধর্মের কারণে
লুণ্ঠিত, ধর্ষিত, নিহত, বিতাড়িত হয়েছিল একাত্তরে
তাদের তুমি কী দিয়েছ স্বাধীন বাংলাদেশে ?
স্বাধীনতা ! তোমার কী কৈফিয়ৎ আছে
বিহারী জয়নুল ও ইব্রাহীমকে৪ দেশ ছাড়া করার কিংবা
অগণিত উর্দূভাষী নির্বিচার নিধনের,
যাদের অনেকে ষাটের দশকে ছিল
স্বাধীনতা আন্দোলনের মিছিলে ?
স্বাধীনতা ! যে আদিবাসীরা ছিল একদিন
স্বাধীনতা আন্দোলনে
তাদের কেন তুমি করেছ
অধিকার বঞ্চিত এতটা কাল ধরে ?
এ প্রশ্নের কী উত্তর তুমি দিবে ?
স্বাধীনতা ! অগণন নারীর চোখের জল
রয়েছে তোমাকে ঘিরে, অগণন নারীর
প্রাণ-সম্মান একাত্তর নিয়েছিল কেড়ে।
অথচ এই বাংলায় আজো
এতগুলো বছর পরেও নারী আছে
একাত্তর থেকে কতটুকু দূরে ?
এ প্রশ্নের উত্তর আজ তোমাকে দিতে হবে।
স্বাধীনতা ! এতটা কাল ধরে গলাবাজি শুনেছি অনেক
কিন্তু বলো, ষাটের দশকে যারা
তোমার রাজনীতি গড়েছিল
তাদের তুমি কী দিয়েছ অপমান আর বঞ্চনা ছাড়া ?
কিংবা যে কোটি কোটি মানুষের রক্ত ও ঘামে
তুমি এসেছিলে একাত্তরে
তাদের তুমি কী দিয়েছ এতগুলো বছরে ?
হে স্বাধীনতা ! যে অগণন মানুষ আজ অসহায়,
যারা ঘুমায় ফুটপাতে কিংবা বস্তিতে,
যাদের জোটে না আজো ঠিকমত কাজ ও খাবার,
যাদের নাই মানুষের মতো বাঁচবার অধিকার,
কিংবা মানুষের মর্যাদা পায় না যারা,
যাদের জন্য নাই কোথায়ও আশ্রয় কিংবা সুবিচার
হে স্বাধীনতা ! তুমি তাদের কী দিয়েছ বলো !
আজ এসব প্রশ্নের জবাব তোমাকে দিতে হবে,
স্বাধীনতা! আজ তোমার কাছে আমি কৈফিয়ৎ চাই,
আজ তোমাকে কৈফিয়ৎ দিতে হবে।

১৮ই আগস্ট ২০০৪
৩ ভাদ্র ১৪১১

১ পূর্ববর্তী কবিতা ‘একাত্তরে আশার প্রদীপ নিভানো হল’-তে শফিক সম্পর্কে বলা হয়েছে।

২ সমীর মণ্ডল ছিলেন তৎকালীন পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার লক্ষ্যে গঠিত গোপন পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। প্রকাশ্যে তিনি ছিলেন তৎকালীন বগুড়া জেলার জয়পুরহাটের (বর্তমানে জেলা) ন্যাপ ও কৃষক সমিতির নেতা। ১৯৭১-এ তিনি রাজাকারদের হাতে ধরা পড়ে নিহত হন। তার কর্মী রাবেয়া বেলী ছিলেন গোপন পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির একজন কর্মী। এছাড়া প্রকাশ্যে তিনি ছিলেন ছাত্র ইউনিয়ন ও কৃষক আন্দোলনের কর্মী। ১৯৭১-এ তিনি ভারতে আশ্রয় নেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি জয়পুরহাটে ফিরে এলে মুজিববাদীরা তাকে ধরে নৃশংস ভাবে অত্যাচার করে হত্যা করে। প্রথমে তারা তাকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করে, এরপর প্রকাশ্যে উলঙ্গ অবস্থায় তার দুই স্তন কেটে ফেলে এবং অকথ্য কষ্ট দিয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে খঁুচিয়ে খুঁচিয়ে এবং কেটে কেটে তাকে হত্যা করে।

৩ যশোরের কলেজ ছাত্র নজরুল ছিল পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী- লেনিনবাদী) এবং ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী। ’৭১-এ পাক-বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে নিহত হয়।

৪ পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী জয়নুল সম্পর্কে ইতিপূর্বে দুইটি কবিতায় বলা হয়েছে। উর্দূভাষী ইবরাহীম ছিলেন সৈয়দপুরের রেলওয়ে শ্রমিক নেতা। তিনি তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান রেলওয়ে এমপ্লয়ীজ লীগ (ইপরেল)­এর একজন নেতৃস্থানীয় কর্মী ছিলেন।

সাম্প্রতিক পোষ্টসমূহ