Banner
জাতির মুক্তি কোন পথে ─ শামসুজ্জোহা মানিক

লিখেছেনঃ শামসুজ্জোহা মানিক, আপডেটঃ July 10, 2010, 4:51 PM, Hits: 9365


 

প্রকাশকের কথা

 

‘জাতির মুক্তি কোন পথে’­এর লেখক শামসুজ্জোহা মানিক একজন সমাজ গবেষক, রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এবং দার্শনিক। তিনি গত তিন দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতির সাথে জড়িত রয়েছেন। ছেলেবেলা থেকেই তিনি ছিলেন প্রতিবাদী একজন মানুষ, যে কোন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা তাঁর স্বভাবজাত। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রধান অংশ মার্কসবাদী অনুশীলনের মধ্য দিয়ে কেটেছে। তবে তাঁর মার্কসবাদী হয়ে ওঠার পথ ছিল অন্যদের থেকে আলাদা। পিতা ছিলেন একজন আমলা। আর সে কারণে রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পর্ক প্রথম দিকে সেভাবে গড়ে ওঠেনি। জানা-বোঝার প্রচণ্ড আকাঙ্ক্ষা তাঁকে ছোটবেলা থেকেই অধ্যয়নমুখী করে তোলে। অধ্যয়ন থেকেই তৈরী হয় প্রধান বন্ধুবান্ধব। লাইব্রেরীতে পড়াশুনা আর দেয়াল পত্রিকায় লেখালেখি করতে গিয়ে তাঁর স্বাধীন চিন্তা ও অনুশীলন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। তার প্রতিবাদী মন আইয়ুবের ‘মার্শাল ল’­এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে আর এ সকল কাজের মধ্য দিয়ে তিনি সেই তরুণ বয়সেই ঢাকা কলেজের ছাত্রদের নেতা হয়ে ওঠেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন একটি সময় ঢুকেন, যখন ’৬২­এর ছাত্র আন্দোলন সবে শুরু হয়েছে। ঢাকা কলেজের অন্যতম ছাত্রনেতা হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকেই তিনি বাম ছাত্র রাজনীতির নীতি নির্ধারণী ভূমিকায় চলে আসেন। অথচ ব্যক্তি প্রতিষ্ঠার প্রতি নির্মোহ এ ব্যক্তিটি কোন দিনই নেতৃত্বের লোভ করেন নি। আত্মপ্রচারবিমুখ এ ব্যক্তিটি এক সময় অনুভব করেন গ্রামের অসহায় মানুষের জন্য কাজ করা প্রয়োজন। নিজের ভিতরের তাড়না থেকেই তিনি একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশুনা অসমাপ্ত রেখে গ্রামে চলে যান। সেই ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৭২ পর্যন্ত গোটা অর্ধযুগ গ্রামের কৃষক জনতার জন্য সংগ্রাম করতে করতেই তাঁর কেটে যায়। তবে জ্ঞান তাপস এ ব্যক্তিটির বিদ্যা অনুশীলন কখনও থেমে থাকেনি। তবে এ ছয় বছরের রাজনৈতিক অনুশীলন তাঁর বহু বিশ্বাসকে প্রশ্নের মুখোমুখি এনে দাঁড় করায়। পুরোনো বিশ্বাসগুলি সম্পর্কে সংশয় সৃষ্টি হয়, কিন্তু সেই সংশয় নিয়েই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের আরো ৭/৮ বছর কেটে যায়। সত্তর দশকের শেষ দিক থেকে প্রায় পুরো আশির দশক তিনি আরো গভীর পড়াশুনায় নিমগ্ন হয়ে পড়েন, সত্য অনুসন্ধানের নেশায় তিনি খেয়ে না খেয়ে মাসের পর মাস কাটিয়ে দিয়েছেন পড়ার টেবিলে আর সে সাথে করেছেন বিভিন্ন ধরনের বাস্তব পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এই দীর্ঘ অনুসন্ধানের মাধ্যমে তিনি এমন কিছু বিষয় আবিষ্কার করেছেন যার অনেক কিছুই হয়ত এই মৌলবাদ পরিবেষ্টিত দেশে প্রকাশ করা সম্ভব নয়, কিন্তু সে সব মানব সমাজ ও তার সভ্যতার ইতিহাসে একেকটি অমূল্য সম্পদ। আর যে বিপুল পরিমাণ লেখা শেষ করে তিনি সংশয়মুক্ত হয়েছেন তার পরিমাণ এত বিশাল যে তার একবারে প্রকাশ করা খুবই কঠিন। তাঁর মৌলিক লেখাগুলি সেভাবে এখনও প্রকাশিত হয়নি। কয়েকটি ছোট ছোট লেখা বুকলেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে। অতি সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘রাজনীতি অর্থনীতি জার্নালের’ দু’টি সংখ্যায় দু’টি মৌলিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।

 

রচনাটি লেখা হয়েছিল ১৯৮৯ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে। সে কারণে এক দুটি উদাহরণে সে সময়ের ঘটনাবলির উল্লেখ রয়েছে। তবে মাঝখানের এই দীর্ঘ সাড়ে তিন বছর কাল অতিবাহিত হওয়ার পরও লেখার সাম্প্রতিকতা এতটুকুও ক্ষুণ্ন হয়নি। তিনি এ গ্রন্থে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় একটি জাতি হিসাবে বাঙ্গালীর বিপর্যয়ের কারণ একে একে তুলে ধরেছেন এবং এ সকল বিপর্যয় থেকে মুক্তির পথ তিনি অনুসন্ধান করেছেন। ছোট এ লেখার মধ্য দিয়ে লেখক সিদ্ধান্ত আকারে কয়েকটি পথ নির্দেশ করেছেন যেগুলি অনুসরণ করলে সর্বাত্মক সংকট ও বিপর্যয়ের হাত থেকে মুক্ত হয়ে দেশ ও জাতি উন্নতি, প্রগতি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে বলে তিনি দৃঢ় আস্থা ব্যক্ত করেছেন। ‘প্রাচ্য বিদ্যা প্রকাশনী’ এ ধরনের একখানি গ্রন্থ প্রকাশ করতে পেরে গর্বিত।

 

লেনিন আজাদ

১লা জানুয়ারি, ১৯৯৩

 

 

 

 

ভূমিকা

 

গভীর সংকট আজ জাতির জীবনকে সর্বগ্রাসী আঁধারের মতো ঘিরেছে। জাতির অনেক সুন্দর স্বপ্ন ও শ্রেষ্ঠ অর্জনকে আমরা হারিয়েছি। ১৯৭১ থেকে এ পর্যন্ত এ জাতির ইতিহাস এক দিক থেকে ক্রমিক অধোগতি ও অবক্ষয়ের ইতিহাস। একদিকে সমাজে সব নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ ও আদর্শ প্রায় অপসৃত, জীবনের প্রায় সর্বক্ষেত্রে দুর্নীতি, হীন স্বার্থপরতা ও নৃশংস পশুত্বের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত, আরেকদিকে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকট ও বিপর্যয়ের আঘাতে মানুষের জীবনের সব স্বপ্ন, সৌন্দর্য ও আনন্দ ক্রমবর্ধমানভাবে ছত্রভঙ্গ। পাকিস্তান আমলেও সাধারণ মানুষ যে স্বপ্ন নিয়ে অসংখ্য সংগ্রাম করেছিল এবং একটা আদর্শের প্রেরণা নিয়ে সমস্ত অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়বার সাহস পেত সে সব আজ অনেকটাই স্তিমিত। স্বাধীনতা যুদ্ধের মহৎ অর্জনগুলো এক এক ক’রে হাতছাড়া হচ্ছে জাতির। স্বাধীনতার সুফল তাদেরই হাতে যারা স্বাধীনতার প্রকৃত শত্রু। দেশের নিয়ন্ত্রণ আজ তাদেরই হাতে যারা দেশের প্রকৃত শত্রু। জনগণের তারাই ভাগ্যবিধাতা যারা জনগণের শত্রু।

 

এমন একটা অবস্থায় আজ প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে, জাতির পরিণতি কি বৃহত্তর কোনও ধ্বংস, নাকি সত্যিই কোথায়ও আছে তার মুক্তির কোন উজ্জ্বল ইঙ্গিত? আসলে আমাদের চারধারে আজ যতোই ব্যর্থতা ও অন্ধকার থাক এ জাতির ইতিহাসে আছে অনেক গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রাম এবং অনেক সাফল্য ও অগ্রগতিও। অনেক অভিজ্ঞতায় এই ইতিহাস সমৃদ্ধ। শুধু যে ইংরেজ গেছে তাই নয় পাকিস্তানও আজ অতীতের বিষয়বস্তু। এই ঘটনাগুলো কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এবং এগুলো নিঃসন্দেহে আমাদের জাতির অগ্রগতি ও সাফল্যের প্রমাণ।

 

এতো হতাশার মধ্যেও এ দেশে মুক্তিকামী মানুষের সংগ্রাম থেমে নেই। এ দেশের ইতিহাসে সংগ্রামী মানুষের অভাব হয় নি। জাতি যতোদিন মুক্তি অর্জন করতে না পারবে ততোদিন তার মুক্তির সংগ্রামও চলবে। কোন ব্যর্থতাই এই সংগ্রামকে শেষ পর্যন্ত থামিয়ে দিতে পারে নি, পারবেও না। আমাদের আজকের করণীয় হ’ল এই সংগ্রামের সঠিক পথ নির্ধারণ করা যাতে ক’রে জাতির মুক্তি অনিবার্য বাস্তবতা হয়ে দেখা দেয়। এর জন্য আজ প্রয়োজনীয় হ’ল পুরাতন গৎবাঁধা দৃষ্টিভঙ্গী ও ভ্রান্ত বিচার পদ্ধতির বদলে নূতন ও সঠিক দৃষ্টিভঙ্গী ও বিচার পদ্ধতি। দেশের সমস্যা সমাধানের জন্য অত্যাবশ্যক হ’ল সঠিক বিচার পদ্ধতি। বস্তুত আমাদের অতীত সকল ব্যর্থতার একটি প্রধান কারণই হ’ল এ দেশের প্রগতিশীল ও বিপ্লবী আন্দোলনের মধ্যে ভ্রান্ত ও গোঁড়া বিচার পদ্ধতির আধিপত্য। স্বাধীন, সৃজনশীল ও সাহসী দৃষ্টিভঙ্গী ও বিচার পদ্ধতির অভাব থাকায় এ দেশে অতীতে আমরা যেমন এ দেশ ও তার সমস্যাগুলিকে সঠিকভাবে বুঝি নি তেমন খুঁজে পাই নি জাতি ও জনগণের মুক্তি সংগ্রাম গড়ে তোলার সঠিক কোন পথ ও পদ্ধতিও। ফলে শেষ পর্যন্ত জাতির জীবনে নেমে এসেছে আজকের এই ব্যর্থতার অন্ধকার।

 

বস্তুত যদি নূতন ও মুক্ত দৃষ্টিতে আমরা আমাদের সমাজ ও বাস্তবতার বিশ্লেষণ করি এবং আমাদের অতীত অভিজ্ঞতার সার সংকলন করি তবে আমরা যেমন সমস্যাগুলির প্রকৃত স্বরূপ বুঝতে পারব এবং খঁুজে পাব সঠিক পথ তেমন অতীতের অসংখ্য সংগ্রামের ঐতিহ্যকে আমরা পরিণত করতে পারব আমাদের আগামী বিজয়ের ভিত্তিতে। যে কোন সংগ্রামের সাফল্যের একটি পূর্বশর্ত হচ্ছে তার ব্যর্থতার স্বীকৃতি। সুতরাং এ দেশের জনগণের মুক্তি সংগ্রামের ব্যর্থতাগুলিকে নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হবে। আমরা জাতির মুক্তি সংগ্রাম সম্পর্কে আশাবাদী হলেও তাই তার ব্যর্থতাগুলিকে অবশ্যই চিহ্নিত করব। এই ব্যর্থতা চিহ্নিতকরণের মাধ্যমে আমাদের সমস্যাগুলিকেও আমরা অনেক স্পষ্টরূপে দেখতে পাব।

 

আমরা এ দেশে সংগ্রামের এক মহান ঐতিহ্যের অধিকারী। ১৯৪৭ পূর্বকালে ব্রিটিশ বিরোধী অসংখ্য সশস্ত্র ও নিরস্ত্র সংগ্রাম ছাড়াও ১৯৫২’র ভাষা আন্দোলন, ’৬৮-৬৯’-এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধ, ’৭১ উত্তরকালে এ পর্যন্ত প্রতিটি সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সশস্ত্র ও নিরস্ত্র রাজনৈতিক দলের অব্যাহত সশস্ত্র ও নিরস্ত্র সংগ্রাম, ’৮৩-এর ছাত্র অভুøত্থান ­ এগুলি এই জাতির গৌরবময় ও ইতিবাচক অর্জন। এটা ঠিক যে, এই সকল সংগ্রাম প্রকৃত অর্থে বা পরিপূর্ণরূপে আজও সফল হয় নি। তবে বাংলা ভাষা শুধু রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি লাভ করে নি উপরন্তু তা আজ একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সরকারী ভাষা। এই বিচারে ’৫২ সফল। কিন্তু ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য শুধু ভাষার মধ্যে সীমিত নয়। বরং ’৫২-এর আন্দোলনের মর্মে ছিল এ দেশের বাঙ্গালীর বাঙ্গালী জাতিসত্তা হিসাবে চেতনার জাগরণ যা ’৭১-এ বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মুহূর্ত থেকে মুছতে মুছতে এখন প্রায় সম্পূর্ণরূপে মুছে গেছে। প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশ আজ আর বাঙ্গালীর জাতীয় রাষ্ট্র নয়। বাংলাদেশ আজ একটি ইসলামী সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র।

 

এ দেশে স্বাধীনতা আন্দোলনের পটভূমি রচনায় জনগণের গণতান্ত্রিক চেতনা ও আকাঙ্ক্ষা ছিল এক অন্যতম নিয়ামক শক্তি। কিন্তু বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মুহূর্ত থেকে আমরা পেয়েছি এমন রাজনৈতিক ও সামরিক-বেসামরিক আমলাতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র যা এখন পরিণত হয়েছে সামরিক-বেসামরিক আমলাতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক স্বৈরতন্ত্রে। অর্থাৎ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর যে স্বৈরতন্ত্র পরিচালিত ছিল মুজিবী রাজনীতিকদের দ্বারা এখন সেটা পরিচালিত হচ্ছে এরশাদী সামরিক আমলাদের দ্বারা।

 

স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম চালিকা শক্তি ছিল পশ্চিমা ও বৈদেশিক ধনিকদের লুণ্ঠন ও শোষণ এবং আমলাদের নির্যাতন, স্বৈরাচার ও লুণ্ঠন থেকে বাঙ্গালী জনগণের মুক্তি অর্জন দ্বারা সাধারণ মানুষের জন্য অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক সমতা ও অধিকার অর্জনের স্বপ্ন। এটাও আজ এক মিথ্যা স্বপ্নে পরিণত হয়েছে। পাঞ্জাব কেন্দ্রিক পশ্চিমা স্বৈরাচারী ও লুটেরা আমলা ও ধনিকরা গেছে ঠিকই, কিন্তু তাদের জায়গা নিয়েছে এবং তাতে আরও জাঁকিয়ে বসেছে বাংলাভাষী স্বৈরাচারী ও লুটেরা সামরিক-বেসামরিক আমলা আর তাদের সহযোগী নানান পেশা ও ধরনের ধনিকরা। শুধু তাই নয়, ইউরোপ-আমেরিকার যে সকল লুণ্ঠক ও নয়া উপনিবেশবাদী শক্তি পাকিস্তান আমলে এ দেশের শাসক-শোষক শ্রেণীসমূহের প্রভু ও রক্ষক ছিল আজও তারা ঠিক একই অবস্থায় আছে। এ ছাড়া পাকিস্তানের প্রত্যক্ষ ও জবরদস্তিমূলক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক লুণ্ঠনের বদলে দেখা দিয়েছে প্রতিবেশী ভারত রাষ্ট্রের অসম বাণিজ্যের শোষণ ও লুণ্ঠন।

 

এই অবস্থার পাশাপাশি জনগোষ্ঠীর অর্ধেক অংশ নারীর অবস্থায় দেখা দিয়েছে সংকট ও অবনতি। পাকিস্তানী আমলের বর্বরতা থেকে নারীর অবস্থার যে উন্নতির স্বপ্ন বাঙ্গালী জাতি দেখেছিল তা আজ দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় শক্তি আজ পাকিস্তান আমলের মতো নারীকে অবরোধে ঠেলে রাখতে, অশিক্ষা ও লাঞ্ছনার মধ্যে ধরে রাখতে সক্ষম না হলেও নারীর অবস্থা এখনও মূলত একই অবস্থায় আছে বরং সামাজিক ক্ষেত্রে নারীর এগিয়ে আসবার পাশাপাশি তার উপর স্বৈরাচারী পুরুষ ও রাষ্ট্রের আক্রমণ ও উৎপীড়ন বেড়ে গেছে পূর্বের তুলনায় অনেক বেশী। এটা ঠিক যে, সকল বাধাকে ভেঙ্গেই আজ নারী শক্তি এবং তার মুক্তির সপক্ষের গণতান্ত্রিক পুরুষ শক্তি পূর্বের তুলনায় বহু বেশী সাহস ও দৃঢ়তা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। সব রকম ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় আক্রমণ ও বাধা এবং সামাজিক সন্ত্রাস সত্ত্বেও নারীর অগ্রযাত্রা অপ্রতিরোধ্য। কিন্তু একই সঙ্গে সামাজিক ক্ষেত্রে নারীর নিদারুণ নিরাপত্তহীনতা, অমর্যাদা ও অনিশ্চয়তা যে আজ একটি প্রবল বাস্তবতা এ কথা আমাদের মেনে নিতেই হবে।

 

’৭১ যেমন আমাদের এক বিরাট বিজয় তেমন এক বিরাট ব্যর্থতাও। একটা দীর্ঘ সংগ্রামের সফল পরিণতি হ’তে পারত ’৭১ যা আমাদেরকে উপহার দিত বাঙ্গালীর একটি নিজস্ব গণতান্ত্রিক জাতীয় রাষ্ট্র। কিন্তু তা হয় নি। বরং ’৭১ যা দিয়েছে তা শেষ পর্যন্ত হয়েছে বাঙ্গালীর জাতীয় বা অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক চেতনা ও আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে একটি সাম্প্রদায়িক স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এক অর্থে ’৭১-এ আমরা বিজয়ী। কারণ আমরা বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী গণতন্ত্রের পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধ’রে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক ও স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র পাকিস্তানকে ধ্বংস করতে পেরেছিলাম। কিন্তু ’৭১-এ আমরা বাঙ্গালীর নিজস্ব জাতীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠ করতে পারি নি। ’৭১-এ আমরা বিজয়ী হয়েও পরাজিত হয়েছি এই বাস্তবতার উপলব্ধি আমাদের যতোদিন না হবে ততোদিন আমরা সত্যিকার বিজয় অর্জন করতে পারব না, মুক্তি পাব না; এবং ঘুরপাক খাব সংকট ও বিভ্রান্তির আবর্তে।

 

এটা আমাদের উপলব্ধি করা অপরিহার্য যে, বাঙ্গালীর প্রকৃত জাতীয় গণতান্ত্রিক শক্তি এ দেশের রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করতে পারে নি। এমনকি তাদের হাত থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্বও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল একটি বিদেশী শক্তির প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ দ্বারা। বহিরাবরণে অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক হলেও অন্তর্বস্তুতে এবং বাস্তবে হিন্দু সাম্প্রদায়িক ও স্বৈরতান্ত্রিক ভারত রাষ্ট্র আওয়ামী লীগের মাধ্যমে পূর্ব বঙ্গের জাতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ দখল করে নেয় এবং পাকিস্তানের ইসলামী স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে ভেঙ্গে দুই ভাগ করে। এইভাবে ভারত রাষ্ট্র তার প্রতিদ্বন্দ্বী বৃহত্তর পাকিস্তানকে বিভক্ত ও দুর্বল করে এবং পূর্ব বঙ্গে একটি দুর্বল ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য মূলত মুসলিম সাম্প্রদায়িক ও স্বৈরাচারী আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ক’রে তার শাসন ক্ষমতায় আওয়ামী লীগকে বসিয়ে দিয়ে যায়। আর এ থেকে শুরু আজকের যাবতীয় সংকট ও ব্যর্থতার ইতিহাস।

 

আমাদের আজকের একটি প্রয়োজন এই সংকট ও ব্যর্থতার উৎস ও বৈশিষ্ট্য সন্ধান ক’রে তার প্রতিকারের পথ খুঁজে বের করা। আজ আমাদের দেশ ও জনগণের সংকট যতোই গভীর ও সর্বব্যাপী হোক আমাদের সম্ভাবনাও বিপুল। কারণ অসংখ্য সংগ্রাম, আত্মদান ও প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে এ দেশের জনগণ যে বিপুল অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে তার মূল্য অপরিমেয়। অন্যদিকে এইসব প্রয়াস ও লড়াই জাতির মনে যে প্রচণ্ড আবেগ ও সংকল্প জন্ম দিচ্ছে তা ক্রমেই এক প্রচণ্ড ও অদম্য বিপ্লবী শক্তিতে পরিণত হ’তে বাধ্য। আমাদের কাজ হ’ল পুরাতন স্থবির ও ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গী ও বিচার পদ্ধতি বর্জন ক’রে সঠিক, সজীব, গতিশীল ও নূতন দৃষ্টির আলোকে সবকিছু নূতনভাবে বিচার করা। আমাদের সঠিক বিচার পদ্ধতি দ্বারা আমাদের জাতি ও জনগণের আজকের সমস্যা ও সংকটের উৎস যেমন সঠিকভাবে নির্ণয় কতে পারব তেমন নির্ধারণ করতে পারব আমাদের আজকের সঠিক করণীয়ও, যার ফলে আমাদের সাফল্য ও বিজয় হবে অনিবার্য ও অপ্রতিরোধ্য।

 

এখন আমরা জাতির এই মুহূর্তের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা ও করণীয়গুলিকে বিশ্লেষণ করব।

 

 

 

বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ

 

এ দেশে সাম্প্রদায়িক ও স্বৈরাচারী শাসক ও শোসক শ্রেণীসমূহ প্রচলিত ধর্মকে দাঁড় করিয়েছে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে। ধর্মের ভিত্তিতে বাঙ্গালী জাতির বিভক্তি রক্ষা করার উদ্দেশ্যে তারা বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের জায়গায় এনেছে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ। হাজার বৎসরের বাঙ্গালী জাতীয়তা তথা বাঙ্গালীর পরিচয়কে ধ্বংস করার জন্য এটা তাদের এক সুকৌশ পদক্ষেপ। এইভাবে তারা রাষ্ট্রের নাম বা পরিচয় ব্যবহার ক’রে মুছে দিতে চেয়েছে বাঙ্গালীর প্রকৃত পরিচয়কে এবং তার সুদীর্ঘ ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে। বস্তুত এর উদ্দেশ্য হ’ল ১৯৭৪ সালে ধর্মের পরিচয় দ্বারা বাঙ্গালী সঙ্গে বাঙ্গালীর যে রাষ্ট্রীয় বিচ্ছেদ ঘটেছিল তাকে চিরস্থায়ী রূপ দান করা। অর্থাৎ বাঙ্গালীর বিভক্তির মূল কারণ ধর্ম ও ধর্মীয় সম্প্রদায়িকতাকে রাজনীতিতে রক্ষা ও লালনের এ এক নূতন কৌশল। এরই সর্বশেষ পদক্ষেপ হয়েছে ইসলামকে রাষ্ট্রীয় ধর্ম ঘোষণা। এইভাবে পাকিস্তানের ধর্মীয় দ্বি-জাতিত্ত্বকে পুনরায় বাঙ্গালীর উপর চাপিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধের অর্জনকে তার হস্তচ্যুত করা হয়েছে।

 

বস্তুত ১৯৭১-এ বাঙ্গালী জাতি যুদ্ধ করেছিল শুধু পশ্চিমাদের স্বৈরাচারী শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে নয়, সেই সঙ্গে ধর্মীয় দ্বি-জাতিতত্ত্বের বিপরীতে বাঙ্গালী জাতির স্বাধীন জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্যও। অর্থাৎ বাঙ্গালীর স্বাধীন জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ছিল পাকিস্তানের অবৈজ্ঞানিক ও প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মীয় চেতনার বিরুদ্ধে বাঙ্গালীর বৈজ্ঞানিক, জাগতিক ও প্রগতিশীল জাতীয় চেতনার বিজয়।

 

এই বৈজ্ঞানিক ও জাগতিক বা ইহবাদী জাতীয় চেতনার দাবী ১৯৭১-এর পূর্বকালে ছিল স্বাধীন পূর্ব বাংলা বা পূর্ব বঙ্গ প্রতিষ্ঠা করা। ১৯৭১-এ পূর্ব বঙ্গ স্বাধীন হবার পর এই চেতনার দাবী ছিল সমগ্র বাঙ্গালী জাতির পুনকেত্রীকরণ দ্বারা ঐক্যবদ্ধ ও স্বাধীন বঙ্গ প্রতিষ্ঠা করা। এইভাবে স্বাধীনতা যুদ্ধের মর্মবাণী হ’ল নূতন রূপে শাশ্বত বঙ্গের পুনরভ্যুদয় ঘটানো। অর্থাৎ ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বরের পর পূর্ব বঙ্গের স্বাধীনতার কর্মসূচী রূপান্তরিত হয় বাঙ্গালী জাতির পুনরেকত্রীকরণের কর্মসূচীতে। ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের এটাই হ’ল যৌক্তিক পরিণতি। তা না হলে ধর্মীয় দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭-এ প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানের ধর্ম-সম্প্রদায়গত ভিত্তি ও চেতনাকে পুনরায় গ্রহণ করে নিতে হয়।

 

বস্তুত স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর নূতন রাষ্ট্রের লক্ষ্য ঘোষণা করা উচিত ছিল বাঙ্গালী জাতির পুনরেকত্রীকরণ অর্জনকে। বাঙ্গালী জাতির পুনরেকত্রীকরণ কখন ও কিভাবে হবে সেটা বলা না গেলেও এটুকু বলা যায় যে, পূর্ব ও পশ্চিম উভয় বঙ্গের বাঙ্গালী জনগণের প্রতিনিধিবৃন্দ নিজেদের মধ্যে স্বেচ্ছামূলক ও শান্তিপূর্ণ আলাপ-আলোচনা দ্বারা এই পুনরেকত্রীকরণ অর্জন করবে। এই পুনকেত্রীকরণের অর্থ অবশ্যই বহুজাতিক রাষ্ট্র ভারতে যোগদান হবে না বরং বাঙ্গালী জাতির একটি ঐক্যবদ্ধ ও স্বাধীন জাতীয় রাষ্ট্র গঠন হবে।

 

বহুজাতিক ভারতের ঐক্যের মূল সূত্র ভাষা না হওয়ায় ধর্মই সেই স্থান নিয়েছে। বিভিন্ন ভাষাভাষী জাতিগুলির মধ্যে সংযোগ ও ঐক্যের সূত্র হিসাবে অভিন্ন মাতৃভাষা না থাকায় প্রচলিত ধর্ম এই সূত্র হিসাবে দেখা দিতে বাধ্য। তা না হলে ভারতের রাষ্ট্রীয় ঐক্য টিকতে পারে না। প্রকৃত পক্ষে বর্তমান ভারত-রাষ্ট্রের ঐক্যসূত্র অলিখিতভাবে হলেও হয়ে রয়েছে হিন্দুধর্ম। পাকিস্তানে বিভিন্ন জাতিকে ঐক্যবদ্ধ রাখার এই কাজ ব্যক্তরূপে এবং লিখিতভাবে করছে ধর্ম ­ ইসলাম ধর্ম। বাস্তবে পাকিস্তান হ’ল হিন্দু ভারতের পাল্টা রূপ মুসলমান ভারত। অর্থাৎ ভারত এবং পাকিস্তান উভয় বহুজাতিক রাষ্ট্রের ঐক্যের মূল সূত্র এবং ভিত্তিই হ’ল ধর্ম বা ধর্মীয় চেতনা ও অনুভূতি। এই ধর্মীয় অনুভুতিকে কৌশলপূর্ণভাবে ব্যবহার ক’রে ভারতের অবাঙ্গালী পশ্চিমা শাসক শ্রেণী সেখানকার বাঙ্গালী সহ বিভিন্ন জাতির উপর গণতন্ত্রের আবরণে নিজেদের স্বৈরাচারী শাসন ও শোষণকে টিকিয়ে রেখেছে।

 

আমরা পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে এসেছি পাকিস্তানের অবাঙ্গালী পশ্চিমা শাসকদের ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক ও স্বৈরাচারী শাসন ও নির্যাতন থেকে মুক্ত হয়ে ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য। সুতরাং পুনরায় আর এক ধর্মীয় ও জাতিগত সমস্যা সৃষ্টির জন্য ভারত রাষ্ট্রে যোগদানের প্রশ্নই ওঠে না। বরং প্রশ্নটা বাঙ্গালী জাতির পুনরেকত্রীকরণ অর্জন দ্বারা বাঙ্গালীর ঐক্যবদ্ধ ও স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার, এবং সকল বাঙ্গালীর অবাঙ্গালী শাসক ও শোষকদের শোষণ, নিপীড়ন ও লুণ্ঠন থেকে মুক্তিলাভের। পুনরেকত্রীকরণের লক্ষ্য ঘোষণা বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর আমাদের সামনে একটি নীতিগত বিষয় হয়ে দেখা দিয়েছে। এই নীতিগত বিষয়টিকে অস্বীকার করার ফলেই এসেছে আজকের বাঙ্গালীর জাতীয়তার সংকট, পরিচয় সংকট।

 

জাতির এই পরিচয় সংকট, জাতি হিসাবে আত্মগৌরবহীনতা, লক্ষ্যহীনতা ও অস্থিরতা জাতির কাছ থেকে মহত্ব ও দেশপ্রেম কেড়ে নিয়ে তাকে দিয়েছে ব্যক্তিস্বার্থ সর্বস্বতা, হীনমন্যতা ও দাস মানসিকতা। এর পরিণতিতে সমাজ হ’তে বিদায় নিয়েছে প্রায় সমস্ত শুভ চেতনা, আদর্শ ও ন্যায়-নীতি বোধ। আর এইভাবে আত্মঠিকানা, আত্মগৌরব হারিয়ে আজ দেশ হয়েছে বিদেশের বৃহৎ শক্তিগুলির আধিপত্য ও শোষণের সহজ শিকার। দেশের এই দুর্যোগ ঘটিয়ে এবং আবার তার সুযোগ নিয়েই সাম্প্রদায়িক ও স্বৈরতান্ত্রিক শাসক ও শোষকেরা দরিদ্র, উৎপাদক ও শ্রমজীবী জনগণের শ্রম, সম্পদ, শক্তি ও মর্যাদাকে বিদেশীদের হাতে তুলে দিয়ে নিজেরাও গড়ছে বিপুল সম্পদ ও বিত্তের পাহাড়।

 

আত্মপরিচয়হীন ও আত্ম-অধিকার অচেতন হয়ে গরীব, উৎপাদক ও শ্রমজীবী জনগণ যাতে পরলোকবাদী ধর্মকে আঁকড়ে ধ’রে পরকালে সুখের আশায় জীবনের সকল অন্যায় ও অবিচারকে বিনা প্রশ্নে মাথা পেতে মেনে নেয় সেইজন্য এই স্বৈরাচারী ও অনাচারী শাসক ও শোষকরা রাষ্ট্র ও সমাজে ধর্মীয় উন্মাদনার প্রসার ঘটাচ্ছে। তারা সচেতনভাবে ও উদ্দেশ্যমূলকভাবে সমাজে উগ্র ও অন্ধ ধর্মীয় মূল্যবোধ ও ধ্যান-ধারণাকে ছড়িয়ে দিয়ে জনগণের সমস্ত যুক্তি, বিচার-বুদ্ধি, জাগতিক আকাঙ্ক্ষা ও চিন্তা এবং বিজ্ঞান চেতনাকে ধ্বংস করতে চেষ্টা করছে। এইভাবে সাম্প্রদায়িক ও স্বৈরাচারী শাসক শ্রেণী প্রচলিত ধর্মকে দাঁড় করিয়েছে এবং ব্যবহার করছে জাতির গৌরব, চেতনা ও স্বাধীনতা, দেশের উন্নয়ন এবং জনগণের মুক্তির বিরুদ্ধে।

 

এই সাম্প্রদায়িক ও স্বৈরাচারী শাসক শ্রেণী দীর্ঘকাল ধরে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাকে রক্ষা ও লালন ক’রে রাষ্ট্রটিকে ক্রমশ একটি ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। তারা এই রাষ্ট্রের জন্মলগ্ন থেকেই তাদের এই ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক পরিকল্পনা অনুযায়ী সুচতুরভাবে অগ্রসর হয়েছে। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর ১৯৭৩-এ শেখ মুজিব কর্তৃক স্বাধীনতার শত্রুদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা এবং ১৯৭৪-এ পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের সম্মেলনে মুসলিম রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবের যোগদান, জিয়াউর রহমান কর্তৃক সংবিধান সংশোধন দ্বারা সংবিধানের ইসলামীকরণ, এরশাদ কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলামকে রাষ্ট্রীয় ধর্ম ঘোষণা ­ এদের এই বৃহত্তর সাম্প্রদায়িক পরিকল্পনারই কয়েকটি ধাপ। এইভাবে এই সাম্প্রদায়িক ও স্বৈরাচারী শাসকেরা শেষ পর্যন্ত বাঙ্গালীর স্বাধীনতা যুদ্ধের আদর্শকে ধূলায় লুণ্ঠিত করেছে এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রটিকে পরিণত করেছে একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে, খণ্ডিত কিংবা নূতন পাকিস্তানে।

 

বস্তুত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর বাঙ্গালী জাতির পুনরেকত্রীকরণের লক্ষ্যকে রাজনীতিতে তুলে ধরতে না পারার পরিণতি হ’ল রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার কর্তৃত্ব পুনঃ প্রতিষ্ঠা। আর এর ফলে ভিন্ন নাম ও রূপে ফিরে এসেছে পাকিস্তান।

 

আসলে বাঙ্গালী জাতির স্বাধীনতার কর্মসূচী নিয়ে যারা যুদ্ধ করেছিল স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্ব তাদের হাতে যেতে না পারায় এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ভারতের আশ্রয়ে ও সাহায্যে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব যুদ্ধকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়। আরও সঠিকভাবে বললে, আশ্রিত আওয়ামী লীগের মাধ্যমে ভারত সরকারই স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রধান ধারাকে নিয়ন্ত্রণ করে। এছাড়া যুদ্ধের মাধ্যমে যাতে প্রথাগত আমলাতান্ত্রিক সেনাবাহিনী ভেঙ্গে গিয়ে বাঙ্গালী জনগণের নূতন ও বিপ্লবী সেনাবাহিনী গড়ে না ওঠে, পাকিস্তানের বিদ্রোহী বাঙ্গালী সেনাবাহিনীকে নিজ নিয়ন্ত্রণে রেখে ভারত সরকার সেই দিকটাও নিশ্চিত করে।

 

এখানে স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রদান ধারার বিষয়টিকে একটু ব্যাখ্যা করা দরকার। তা না হলে স্বাধীনতা যুদ্ধের সমস্যা বুঝতে আমাদের অসুবিধা হ’তে পারে। ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর গণহত্যা অভিযানের প্রতিক্রিয়ায় শেখ মুজিবের অনুপস্থিতি ও আওয়ামী লীগের  নেতৃত্বহীনতা সত্ত্বেও দেশের ভিতরে ব্যাপক জনগণের সশস্ত্র প্রতিরোধের পাশাপাশি বাঙ্গালী সেনা, ইপিআর, পুলিশ ইত্যাদিতে ব্যাপক বিদ্রোহ ঘটে। এইভাবে দেশের ভিতরেই বাঙ্গালীর স্বাধীনতা যুদ্ধের একটি স্বাধীন, বৃহত্তর ও সাধারণ স্রোতধারা গড়ে ওঠে। কিন্তু আওয়ামী লীগ ভারতে আশ্রয় নিলে প্রতিরোধ যুদ্ধের একটা বৃহৎ অংশ পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিল। ভারত সরকার এই প্রতিরোধ যুদ্ধকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আওয়ামী লীগকে সর্বাত্মক সাহায্য দিল। ভারতের ভূমি থেকে বেতার কেন্দ্র স্থাপন দ্বারা সমগ্র পূর্ব বঙ্গ ব্যাপী অবিরাম প্রচার, ভারতের ভূমিতে সামরিক প্রশিক্ষণ, অস্ত্র প্রদান, মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচালনা ইত্যাদি দ্বারা ভারতের ছত্রছায়ায় ও আশ্রয়ে আওয়ামী লীগ স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রধান স্রোতাধারাকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হ’ল, যদিও এর পাশাপাশি থাকল পূর্ব বঙ্গের অভ্যন্তরে বিভিন্ন বামপন্থী সংগঠনসহ বিভিন্ন গোষ্ঠী ও ব্যক্তির নেতৃত্বে পূর্ব বঙ্গের বাঙ্গালী জনগণের নিজস্ব ও স্বাধীন প্রতিরোধ যুদ্ধের ধারা, যা দেশের ভিতর থেকেই পরিচালিত হ’ল। কিন্তু পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ও দালাল বাহিনীর প্রচণ্ড ও অব্যাহত আক্রমণ, বামপন্থী নেতৃত্বের বিভ্রান্তি এবং পূর্ব থেকে সঠিক প্রস্তুতির অভাব, অনেক ক্ষেত্রে ভারত থেকে আগত আওয়ামী লীগ পরিচালিত বাহিনীর আক্রমণ, বহিঃশক্তির সাহায্যহীনতা অথচ আওয়ামী লীগের প্রতি বিশেষত ভারতের সর্বাত্মক সাহায্য ও সমর্থন এবং পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধের সুযোগ নিয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনী কর্তৃক পূর্ব বঙ্গে সামরিক অভিযান দ্বারা বাঙ্গালীর স্বাধীনতা যুদ্ধের দ্রুত পরিসমাপ্তি ইত্যাদির কারণে দেশের ভিতরে সূচিত বাঙ্গালী জনগণের স্বাধীনতার যুদ্ধের এই ধারা আর প্রধান ধারা হয়ে উঠতে পারে নি, বরং ভারতে আওয়ামী লীগ কর্তৃক সংগঠিত ও নিয়ন্ত্রিত সেনাবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের ধারাই স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রধান ধারা হিসাবে গড়ে ওঠে।

 

ভারত সরকার স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রধান স্রোতধারাকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করে যে, যুদ্ধের বিকাশ ভারতের অনুকূলে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধে পরিণত হয়। পশ্চিম পাকিস্তানের সীমান্তেও ভারতীয় সেনাবাহিনী জয় লাভ করতে থাকলেও পাকিস্তানের মূল ভূ­খণ্ড কিংবা রাজধানী জয়ের চেষ্টা না ক’রে তা পূর্ব বঙ্গে বিজয় অর্জনের উপরই গুরুত্ব দেয়। এখানে পাকিস্তানের বিশাল সেনাবাহিনীকে নিদারুণভাবে পরাজিত ক’রে ভারত বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে এবং তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগকে বসিয়ে দেয়।

 

এইভাবে ভারত সরকার বাঙ্গালীর নিজস্ব স্বাধীনতা যুদ্ধের বিকাশও ঘটতে দেয় নি। শুধু তাই নয় বাঙ্গালী জাতি যাতে পাকিস্তানী হানাদার সেনাবাহিনীর বর্বরতা ও পাশবিক নির্যাতনের কোনও বিচার করতে ও প্রতিশোধ নিতে না পারে ভারত সরকার সেই উদ্দেশ্যে বন্দী প্রায় এক লক্ষ পাকিস্তানী সৈনিককে পূর্ব বঙ্গ থেকে ভারতে নিয়ে যায় এবং পরে পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে চুক্তি দ্বারা তাদেরকে নিরাপদে পাকিস্তান ফেরত পাঠিয়ে দেয়। অর্থাৎ বাঙ্গালী জাতি যাতে তার জাতীয় কর্তব্য পালন করতে না শেখে, তার প্রকৃত শত্রুদের ঘৃণা করতে না শেখে এবং প্রকৃত ও পরাজিত শত্রুর মুখোমুখি হয়ে বাঙ্গালী যাতে সত্যিকারভাবে জাগ্রত ও আত্মবিশ্বাসী না হয় তার জন্য ভারত সরকার পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে বাঙ্গালী জাতির হাতে পড়তে দেয় নি। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সমঝোতার দ্বারা পূর্ব বঙ্গে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর হাই কম্যান্ড বাংলাদেশী সেনাবাহিনী বা মুক্তিবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ না ক’রে আত্মসমর্পণ করেছিল ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছেই।

 

ভারত সরকার এক ঢিলে দুই পাখি মারল। পাকিস্তান রাষ্ট্র বিভক্ত হ’ল। পূর্ব বঙ্গ আলাদা রাষ্ট্র হ’ল। অথচ প্রকৃত বাঙ্গালী জাতীয়তার শক্তির বিজয় হ’ল না। ফলে পশ্চিম বঙ্গের বাঙ্গালীর সঙ্গে পূর্ব বঙ্গের বাঙ্গালীর ঐক্য চেতনার উদ্ভবের সম্ভাবনা সাময়িকভাবে হলেও রোধ হ’ল। এইভাবে পশ্চিম বঙ্গেও বাঙ্গালীর মধ্যে বাঙ্গালী জাতীয় চেতনা ও আবেগের বিকাশের পথ রুদ্ধ হ’ল। কাজেই ভারত সরকার নিশ্চিন্ত হ’ল পশ্চিম বঙ্গের বাঙ্গালী জাতির উপর ভারত রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ রক্ষার বিষয়ে। বাঙ্গালী জাতির দুর্ভাগ্য যে, ভারত-পাকিস্তান সমঝোতা ও ভারত সরকারের কূটচালে বাঙ্গালী কোথায়ও ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িকতাকে নির্মূল ক’রে প্রকৃত বাঙ্গালী হ’তে পারল না। বাঙ্গালীর স্বাধীনতা যুদ্ধের মাঝখানে ভারতের হস্তক্ষেপে বাঙ্গালী যে রাষ্ট্র পেল তা সত্যিকারভাবে তার রাষ্ট্র হ’ল না। এইভাবে বাঙ্গালীর সমগ্র স্বাধীনতা যুদ্ধকে ভারত সরকার চমৎকারভাবে নিজ স্বার্থে ব্যবহার করে এবং এখানে বাঙ্গালীর একটি প্রকৃত জাতীয়তাবাদী ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে।

 

আওয়ামী লীগ প্রকৃতপক্ষে ইহবাদ ও বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের শক্তি ছিল না। মুখে ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের ধ্বনি দিলেও অন্তর্বস্তুতে তা ছিল সাম্প্রদায়িক। এই দলটির উদ্ভব হয়েছিল ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক দল মুসলিম লীগের ভিতর থেকে। আওয়ামী লীগের এই নেতৃত্বই এক কালে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় এবং সাম্প্রদায়িকতায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল। ১৯৪৯­এ মুসলিম লীগ পরিত্যাগী মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম হয় এবং অসাম্প্রদায়িক রূপ গ্রহণের জন্য তা ১৯৫৫­তে মুসলিম শব্দটি বর্জন করে। কিন্তু তাতে এই সংগঠনের মৌলিক বিন্যাস কিংবা চরিত্রে বিশেষ কোনও পরিবর্তন হয় নি। ১৯৫৬­তে আওয়ামী লীগের অন্যতম নেতা হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবার পর পূর্ব বঙ্গের স্বায়ত্তশাসন ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্র নীতির প্রশ্নে যুক্তফ্রন্টের একুশ দফা কর্মসূচী এবং আওয়ামী লীগের গৃহীত মূল কর্মসূচীর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতামূলকভাবে তীব্র বিরোধিতা করেন। সোহ্‌রাওয়ার্দীর মন্ত্রিসভার সদস্য হিসাবে শেখ মুজিবও বাঙ্গালীর স্বার্থের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতায় তাঁর গুরু সোহত্মাওয়ার্দীকে অত্যন্ত উলঙ্গভাবে সমর্থন দেন। তবে পরবর্তী কালে ১৯৬৬­তে তিনি স্বায়ত্ত্বশাসনের কর্মসূচী হিসাবে ছয় দফা কর্মসূচী প্রদান করেন, যা তাঁকে ক্রমে বিপুল জনপ্রিয়তা দান করে।

 

কিন্তু তিনি স্বায়ত্তশাসনের যে কর্মসূচী দেন তা ছিল পাকিস্তানের কাঠামোর ভিতর পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের কর্মসূচী। এটা যেমন ছিল না স্বাধীনতার কর্মসূচী কিংবা বাঙ্গালীর জাতীয়তাবাদের কর্মসূচী, তেমন শেখ মুজিব প্রকৃত বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী চেতনাকে লালনও করেন নি। প্রকৃতপক্ষে তাঁর নেতৃত্বের মাধ্যমে পাঞ্জাবী প্রাধান্য বিশিষ্ট পশ্চিম পাকিস্তানী সাম্প্রদায়িক শাসক শ্রেণীর সঙ্গে পূর্ব বঙ্গের বাংলাভাষী মুসলমান সম্প্রদায়ের উঠতি আমলা ও ধনিক শ্রেণীর দ্বন্দ্ব ও সংঘাত রূপ নেয়। এই দ্বন্দ্বে তাঁকে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদকে ব্যবহার করতে হয়। কারণ এ ছাড়া পাকিস্তানী শাসকদের সঙ্গে সংঘাতে বাঙ্গালী জনগণের সমর্থন জাগ্রত কিংবা ব্যবহার করা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। কিন্তু এটাকে কোন যৌক্তিক ও সুসংগত পরিণতিতে নেবার পরিকল্পনা তাঁর কোন কাজ দ্বারা প্রকাশ পায় নি। বরং তাঁর কাজের ধারা থেকে এমন মনে করাই সংগত যে, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় যাবার উদ্দেশ্যে তিনি ছয় দফার মতো কর্মসূচী দিয়েছিলেন। বিশ্বাসঘাতকতা তিনি একুশ দফার প্রতিও করেছিলেন, যে কারণে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা মওলানা ভাসানী ১৯৫৭­তে আওয়ামী লীগ পরিত্যাগ ক’রে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠন করেন। সুতরাং ছয় দফা ছিল শেখ মুজিবের পাকিস্তানের ক্ষমতায় যাবার হাতিয়ার, বাঙ্গালীর জাতীয় অধিকার প্রতিষ্ঠার নয়। আর ছয় দফা দিলেও শেখ মুজিবের একক নেতৃত্বে বাঙ্গালীর জাতীয় আন্দোলন বিকাশ লাভ করে নি। এবং প্রকৃত জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে নেতৃত্বে তিনি দেন নি। তাই পাকিস্তানী সেনাবাহিনী যখন বাঙ্গালী জাতির উপর আক্রমণ শুরু করল তখন তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধে জাতিকে নেতৃত্ব দেবার পরিবর্তে পাকিস্তানী হানাদার সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করলেন। তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হ’তে পারলে কি করতেন এটা তারই ইঙ্গিতবাহী। এইভাবে একুশ দফার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার পর এই আত্মসমর্পণ হ’ল বাঙ্গালী জাতর প্রতি শেখ মুজিবের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিশ্বাসঘাতকতা।

 

বস্তুত এই আত্মসমর্পণ দ্বারা শেখ মুজিব এটা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তিনি বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ কিংবা স্বাধীনতা কোনটাই চান নি। আসলে দেশের বিরাজমান জাতীয়তাবাদকে ব্যবহার করতে গিয়ে তিনি ঘটনাধারার উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। ২১ দফার সময় থেকে ৬ দফার সময়ে সমাজে যে বিরাট গুণগত পরিবর্তন ঘটেছে এটা তিনি ঠিক সময়ে বুঝতে পারেন নি। এখন ইচ্ছা করলেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে অন্যদিকে ঘটনাধারার মোড় ঘোরানো সম্ভব নয়। ফলে তিনি ঘটনার নায়ক আর থাকেন নি। বরং নিজ ইচ্ছার বিরুদ্ধে ঘটনাস্রোতের হাতেই বন্দী হয়েছিলেন। এমন অবস্থায় তাঁর পক্ষে যেটা করা সংগত ছিল তিনি সেটাই করেছিলেন। বাঙ্গালীর জাতীয় সংগ্রামের পক্ষ ত্যাগ ক’রে তার শত্রুদের হাতে ধরা দিলেন এই আশায় যে, যেখানে তিনি ঘটনার স্রোতকে আটকে রাখতে চান হয়তো পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ট্যাংক আর কামান, বন্দুকের জোরে তাকে সেখানে দাঁড় করিয়ে দিতে সক্ষম হবে, আর তার ফলে তখন তিনি পুনরায় বাইরে মুক্ত হয়ে এসে পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে মিলনের দূত হয়ে সবার কাছ থেকেই লাভ করবেন সম্মান ও সমর্থন। পরাজিত ও দমিত হলে বাঙ্গালী বুঝবে যে, পশ্চিমাদের সঙ্গে আপোস করেই চলতে হবে, আর পশ্চিমারাও বুঝবে যে, এতো বড় জনগোষ্ঠীকে শুধু অস্ত্রের জোরে দীর্ঘ সময় দাবিয়ে রাখা যাবে না। সুতরাং উভয় পক্ষের আপোসের ফল হিসাবে তিনি বেরিয়ে আসবেন।

 

কিন্তু বাঙ্গালী জাতি শেখ মুজিবের নেতৃত্বের অপেক্ষায় বসে থাকে নি বা আত্মসমর্পণ করে নি। সমগ্র জাতি পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞকে মোকাবিলা করেছে পাল্টা যুদ্ধ দ্বারা। এই যুদ্ধের প্রধান স্রোতকেই ভারত সরকার আওয়ামী লীগের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করল এবং তাকে ব্যবহার করল নিজেদের স্বার্থে।

 

এ দেশের প্রকৃত স্বাধীনতা ভারত সরকারের কাম্য নয়। কারণ এখানে বাঙ্গালীর একটি অসাম্প্রদায়িক জাতীয় এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে তা ভারত রাষ্ট্রের বহুজাতিক সাম্প্রদায়িক ও স্বৈরাচারী ভিত্তিকে আঘাত করবে। এর ফলে পূর্ব বঙ্গের বাঙ্গালীর সঙ্গে পশ্চিম বঙ্গের বাঙ্গালীর ঐক্য এবং অখন্ড রাষ্ট্র গঠন দ্বারা ভারত রাষ্ট্র হ’তে পূর্ব ভারতের বিশাল অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতা অনিবার্য ঘটনা হয়ে দেখা দিবে। সুতরাং পূর্ব বঙ্গের স্বাধীনতা যুদ্ধ যাতে স্বাধীনভাবে বিকাশ লাভ না করে সেই বিষয়ে ভারত সরকার খুবই উদগ্রীব ছিল। একই সঙ্গে এই স্বাধীনতা যুদ্ধের সুযোগ নিয়ে ভারত তার প্রধান শত্রু পাকিস্তানকেও ভেঙ্গে ফেলতে চেয়েছিল। অর্থাৎ ভারত সরকারের জন্য প্রয়োজন ছিল একটি শক্তিশালী অখণ্ড পাকিস্তানকে ভেঙ্গে দুইটি দুর্বল পাকিস্তান সৃষ্টি করা। কাজেই আওয়ামী লীগকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার ক’রে ভারত সরকার স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং সমস্ত ঘটনাধারা এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করল যাতে স্বাধীনতা সংগ্রামের মাধ্যমে বাঙ্গালী জাতির নিজস্ব নেতৃত্বের শক্তির বিকাশের পূর্বেই এখানে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে  এমন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা যায় যার বাইরের আবরণ যা-ই হোক মর্মগতভাবে তা হবে সাম্প্রদায়িক ও স্বৈরাচারী। ইহবাদী, বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী ও গণতান্ত্রিক শক্তির বিকাশ ঠেকানো যায় নি বটে তবে আওয়ামী লীগ ও প্রথাগত আমলাতান্ত্রিক সেনাবাহিনীর মাধ্যমে তার পূর্ণ বিকাশ ও ক্ষমতা দখলকে ঠেকানো গেল। কিন্তু সেটাও রয়ে গেল প্রবলভাবেই নূতন রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে, তার ক্ষমতা যন্ত্রের ভিতরেই।

 

এইভাবে নূতন রাষ্ট্র দ্বৈততা নিয়ে, স্ববিরোধ নিয়ে যাত্রা শুরু করল। একদিকে থাকল ইহবাদী তথা অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্রের শক্তি, আরেক দিকে থাকল ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা ও স্বৈরাচারের শক্তি। কিন্তু রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব থাকল শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগের হাতে যারা প্রতি মুহূর্তে স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল শক্তি ও ভাবপ্রেরণাকে অন্তর্ঘাত করেছে। ফলে ক্রমেই জাতীয়তাবাদের শক্তি দুর্বল হয়েছে এবং সেই সঙ্গে সাম্প্রদায়িকতার শক্তি প্রবলতর হয়েছে এবং অবশেষে এক সময়ে রাষ্ট্রকে সম্পূর্ণরূপে অধিকার করে নিয়েছে।

 

ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা এ দেশে গণবিরোধী ও জাতিবিরোধী স্বৈরাচারের ভিত্তি। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার উচ্ছেদ ছাড়া দেশপ্রেমিক ও জাতীয়তাবাদী চেতনার জাগরণ যেমন হবে না তেমন গণতান্ত্রিক ও মানবিক মুল্যবোধ ও চেতনার জাগরণ ঘটানোও সম্ভব হবে না। সুতরাং স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল আদর্শকে ফিরিয়ে আনতে হবে এবং এই ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের জায়গায় বাঙ্গালী জাতির অসাম্প্রদায়িক ও জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এর জন্য আজ প্রয়োজন নূতন করে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরা। আর বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে হলে আজ আমাদেরকে অবশ্যই বাঙ্গালী জাতির পুনরেকত্রীকরণের লক্ষ্যকে আমাদের সামনে রাখতে হবে। শুধু পূর্ব বঙ্গ ভিত্তিক বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ ধর্মের ভিত্তিতে ’৪৭-এ বাঙ্গালীর বিভক্তিকে মেনে নেয়। কাজেই শুধু পূর্ব বঙ্গ তথা আজকের বাংলাদেশ রাষ্ট্র ভিত্তিক বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ বাস্তবে হয়ে দাঁড়ায় ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাবাদ। এই “জাতীয়তাবাদ” বাঙ্গালীর চেতনায় এমন এক ফাঁক রেখে দেয় যা দিয়ে অনায়াসে ফিরে আসে মুসলিম লীগের ধর্মীয় দ্বি-জাতিতত্ত্ব ভিত্তিক সাম্প্রদায়িকতাবাদ। অর্থাৎ বাঙ্গালী জাতির পুনরেকত্রীকরণের লক্ষ্য নিয়েই আজ বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ দাঁড়াবে। এছাড়া বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ আজ আর বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদই নয়।

 

এইভাবে দেখা যাচ্ছে যে, বাঙ্গালী জাতির পুনরেত্রীকরণের লক্ষ্য ছাড়া আজ যেমন বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ দাঁড়াতে পারে না তেমন রাষ্ট্র ও রাজনীতিকে পরলোকবাদী ধর্মের প্রভাব ও আধিপত্য মুক্ত তথা ইহবাদী করারও আর কোন উপায় নেই। অর্থাৎ এদেশে ইহবাদ ও জাতীয়তাবাদ এক ও অভিন্ন।

 

এখানে জাতীয়তাবাদ প্রসঙ্গে আমাদের নিকট একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্ট থাকা প্রয়োজনীয় যে, বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ যেমন বাঙ্গালী জাতির সংহতি ও মুক্তির পতাকাবাহী এবং বাঙ্গালী জাতির উপর পরজাতির আধিপত্য ও আগ্রাসন বিরোধী তেমন তা একইভাবে সকল জাতির স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। অর্থাৎ বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ কখনই ভিন্ন জাতির উপর বাঙ্গালী জাতির আগ্রাসন ও উৎপীড়নকে সমর্থন করবে না। এই কারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে অবাঙ্গালী পাহাড়ী জাতিসত্তাসমূহের উপর সাম্প্রদায়িক ও স্বৈরাচারী শাসক শ্রেণী যে নির্যাতন ও উৎখাত অভিযান পরিচালনা করছে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ তারও বিরোধিতা করে। সকল জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার বা স্বাধিকারের গণতান্ত্রিক নীতি এই সকল পাহাড়ী জাতিসত্তার জন্যও প্রযোজ্য। সুতরাং পররাজ্য ও পরজাতিগ্রাসী হবার পরিবর্তে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ হবে গণতান্ত্রিক। অর্থাৎ সকল স্বাধীন ও মর্যাদাবান জাতির শান্তিপূর্ণ ও বন্ধুত্বমূলক সহাবস্থানের ভিত্তিতে এক গণতান্ত্রিক পৃথিবী ও মানব সমাজ নির্মাণ হবে গণতান্ত্রিক বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের একটি লক্ষ্য।

 

 

 

জনগণের গণতন্ত্র

 

এ দেশে জনগণের উপর ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক ও স্বৈরাচারী শাসক শ্রেণীর নিপীড়নমূলক শাসন ও শোষণ পরিচালনার জন্য এক প্রধান হাতিয়ার হ’ল আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রযন্ত্র। এই রাষ্ট্রযন্ত্রের মূল নিয়ন্তা হ’ল তার কর্মচারীরাই। অর্থাৎ রাষ্ট্রের সামরিক ও বেসামরিক আমলারা। কখনও নির্বাচনমূলক জন­প্রতিনিধিত্বশীল কিংবা রাজনৈতিক শাসনের আড়াল নিয়ে আবার কখনও সরাসরি সামরিক শাসনের মাধ্যমে তথা সেনাবাহিনীর আমলাদের নেতৃত্বে রাষ্ট্রীয় আমলারাই মূলত এ দেশের জনগণকে শাসন করে। এ দেশে নির্বাচনমূলক যে সংস্থাগুলি শাসনকার্যে অংশ নেয় বস্তুত সেগুলির ক্ষমতা খুবই সীমিত। অনেক ক্ষেত্রে সেগুলি আমলাদের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল এবং আমলাদের দ্বারাই পরিচালিত। রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্রের অধীনস্থ ও সহযোগী হিসাবে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ কিংবা পৌরসভা কার্যকর। এগুলির নির্বাচিত জন-প্রতিনিধিরা রাষ্ট্রীয় আমলাদের লুটপাট, দুর্নীতি ও স্বৈরতান্ত্রিক শাসনকে জন-প্রতিনিধিত্বের নামে একটা আড়াল দেয়। এরা নিজেরাও প্রশাসনে নিয়োজিত আমলাদের ঘুষ, দুর্নীতি ও লুটপাটের একটা অংশ ভোগ করে। তবে এর সমস্ত দুর্নাম এবং দায়ের বোঝা বহন করে প্রধানত এই নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই। বলা যায় এরা রাষ্ট্রীয় আমলাদের চুরি, দুর্নীতি, লুট, ঘুষ এবং স্বৈরাচারী শাসনের হাতিয়ার। এরা আছে বলেই আমলাদের পক্ষে এতো সহজে, এতো সঙ্গোপনে এবং গণ-অসন্তোষকে সেভাবে না জাগিয়ে এভাবে লুটতরাজ ও নির্যাতন চালানো সম্ভব হচ্ছে।

 

রাষ্ট্রীয় আমলাদের এই স্বৈরাচারী ও নির্যাতনমূলক শাসন ও শোষণকে রাষ্ট্রীয় বা জাতীয় পর্যায়ে আড়াল দেবার জন্য রয়েছে কিংবা থাকে নির্বাচনমূলক জাতীয় সংসদ এবং সরকার। নির্বাচিত সরকার সম্পূর্ণ রাজনৈতিক হ’তে পারে, আবার কখনও বর্তমানের মতো সামরিক চরিত্র বিশিষ্ট হ’তে পারে। পরেরটা হ’তে পারে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হিসাবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত প্রাক্তন সেনাপতির শাসন দ্বারা, যার ক্ষমতার মূল ভিত্তি কিংবা উৎস হ’ল সেনাবাহিনী। কিন্তু সকল রকম শাসনের ব্যবস্থাতেই সরকার কিংবা সংসদের কাজ হয়ে থাকে রাষ্ট্রীয় আমলাদের স্বেচ্ছাচারী ও নির্যাতনমূলক শাসন-শোষণ এবং সুযোগ-সুবিধা সংরক্ষণ করা।

 

নির্বাচিত জাতীয় সংসদ আইন তৈরী করতে পারে। রাষ্ট্রপতি পরিচালিত কিংবা প্রধানমন্ত্রী পরিচালিত যা-ই হোক নির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনা করে নির্বাচিত জন-প্রতিনিধিদের মাধ্যমে নয় বরং রাষ্ট্রীয় বেসামরিক আমলাদের মাধ্যমে। বিভিন্ন ধরনের সিভিল সার্ভেন্ট এবং পুলিশের দ্বারা তৈরী এক বিশাল ও লৌহকঠিন শাসনের জালে সারা দেশের গরীব, শ্রমজীবী ও উৎপাদক জনগণ আষ্টেপৃষ্ঠে আবদ্ধ থাকে। এই ব্যবস্থাকেই পাহারা দেয় আমলাতান্ত্রিক সেনাবাহিনী তথা সামরিক আমলারা। এই ব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দিলে কিংবা আমলাদের ক্ষমতার প্রতি গুরুতর হুমকি দেখা দিলে অথবা অধিকতর উচ্চাভিলাষী হয়ে উঠলে সামরিক আমলারা সেনাবাহিনী ব্যবহার ক’রে সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতা তথা রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দখল ক’রে নেয় এবং এইভাবে সামরিক ও বেসামরিক আমলাদের শাসন ও শোষণকে নিরংকুশ করে। এই রকম অবস্থায় উপরে নির্বাচিত সরকার উৎখাত হলেও তখনও নীচে থাকতে পারে নির্বাচিত সংস্থাগুলি। নূতন সামরিক সরকারের নেতৃত্বাধীন হয়ে পূর্বের মতোই এগুলি তখন সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রকে সেবা করে।

 

এই আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা বা শাসন পদ্ধতির উদ্দেশ্য হ’ল শ্রমজীবী ও উৎপাদক জনগণকে স্বৈরাচারী বা স্বেচ্ছাচারী পদ্ধতিতে বলপূর্বক দমন করে রেখে ইচ্ছামতো শোষণ ও লুণ্ঠন দ্বারা একদল ধনী সৃষ্টি করা। এই ধনিক শ্রেণী গড়ে ওঠে রাষ্ট্রযন্ত্রের ভিতরের আমলা আর তার বাইরে তাদের সহযোগী কিংবা তাদের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, ভূস্বামী, রাজনীতিক, নির্বাচিত জন­প্রতিনিধি, আইনজীবী, সাংবাদিক, শিক্ষক, ধর্মজীবী, দালাল, টাউট, দুর্বৃত্ত এবং আরও বিভিন্ন পেশা কিংবা ধরনের লোকদের নিয়ে। আমলা এবং বিভিন্ন ধরনের ধনিকদের সমন্বয়ে গঠিত এই শ্রেণীকে আমরা বলতে পারি আমলা­ধনিক শ্রেণী।

 

এ দেশে ধনিক শ্রেণী গঠনের মূল পদ্ধতি হ’ল আমলা শাসিত রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যবহার। অর্থাৎ গঠন পদ্ধতির বিচারে ধনিক শ্রেণী আমলা ব্যবস্থা বা আমলাতন্ত্রেরই অংশ। অবশ্য এই আমলাতন্ত্রের প্রেরণা বা উদ্দেশ্য হ’ল উৎপাদক ও মেহনতী জনগণের উপর স্বৈরাচারী পদ্ধতিতে লুণ্ঠন ও শোষণ পরিচালনা দ্বারা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে একটি সম্পত্তিবান বা ধনিক শ্রেণী গঠন করা যাতে করে রাষ্ট্রীয় আমলারা নিজেরাও ধনিক হ’তে পারে। এই উদ্দেশ্যে আমলারা এতো সযত্নে ব্যাক্তিগত মালিকানা বা ব্যক্তিগত সম্পত্তি ব্যবস্থাকে রক্ষা করে। অর্থাৎ প্রেরণা বা উদ্দেশ্যের বিচারে এবং বাস্তব অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা এবং সম্পদের বিচারে আমলারাও ধনিক শ্রেণীর অংশ। ধন-সম্পদ সঞ্চয়ের মাধ্যমে ধনিক শ্রেণী গঠনের অর্থনৈতিক প্রেরণা দ্বারা যে আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা পরিচালিত হয় তা যেমন রাষ্ট্রীয় আমলাদেরকে করে ধনিকতান্ত্রিক তেমন গঠন পদ্ধতির বিচারে ধনিকরা আবার হয় আমলাতান্ত্রিক।

 

অবশ্য আমলা এবং ধনিক উভয়ে এক নয়। উভয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে। প্রত্যক্ষ শাসন ক্ষমতায় পেশাগত দায়িত্ব নিয়ে থাকা এবং না থাকার পার্থক্য। আমলারা যেখানে রাষ্ট্র পরিচালনায় নিয়োজিত, ধনিকরা সেখানে ব্যক্তিগত মালিকানাধীন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় নিয়োজিত। এদেশে শাসন ক্ষমতা মূলত আমলাদের হাতে। সুতরাং এদেশে রাষ্ট্রীয় আমলারাই মূলত শাসক শ্রেণী গঠন করে। এরা যে শুধু রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে তাই নয়, উপরন্তু এদের নিয়ন্ত্রণেই সংগঠিত ও সংরক্ষিত হয় ধন-সম্পত্তির ব্যবস্থা বা ধনিক শ্রেণী।

 

কিন্তু  আমলারা শাসক শ্রেণী হলেও তারা সর্বদা জনগণকে একা শাসন করে না। নির্বাচনমূলক ব্যবস্থা দ্বারা বেসরকারী ধনিক বা রাষ্ট্রযন্ত্র বহির্ভূত ধনিকেদের মধ্য থেকে এক দল লোককে তারা সঙ্গে নেয় গরীব, মেহনতী ও উৎপাদক জনগণকে স্বৈরাচারী পদ্ধতিতে শাসন করার জন্য। তারা একা জনগণকে শাসন কিংবা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না বলেই তাদেরকে এই বলপ্রয়োগমূলক ও স্বৈরাচারী শাসনে অন্যদেরকে সাথে নিতে হয়। তাছাড়া নির্বাচনমূলক ব্যবস্থা আমলাদের স্বৈরাচারকে একটা আড়াল দেয়। একইভাবে রাষ্ট্রীয় আমলারা নিজেদের স্বৈরাচারী শাসন এবং লুণ্ঠন ও শোষণকে নিরাপদ করার জন্য নিজেদের চারপাশে বিভিন্ন ধরনের অর্থ-বিত্তের অধিকারী একদল ধনিক সৃষ্টি করে, যারা আমলাদের দ্বারা পরিচালিত নির্যাতনমূলক ও স্বৈরাচারী শাসন ও শোষণের ব্যবস্থার সহযোগী হয় নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও শোষণের স্বার্থেই। সুতরাং আমলারা নিজেরা যেমন একটা স্বতন্ত্র শ্রেণী গঠন করে তেমন এই শ্রেণীর অংশ করে নেয় ধনিকদেরকেও। আবার নিজেদের সম্পদ সৃষ্টির দ্বারা এবং ধনিক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষণ দ্বারা অর্থনৈতিক বিচারে আমলারা নিজেরাই হয় ধনিক কিংবা ধনিক শ্রেণীর অংশ।

 

অর্থাৎ আমলা এবং ধনিক এই উভয় শ্রেণী উভয়ের মধ্যে প্রবেশ করে। এরা পরস্পর বিজড়িত। সুতরাং রাষ্ট্রযন্ত্রে প্রত্যক্ষভাবে অবস্থান করা এবং না করার কারণে আমলা এবং ধনিক উভয় শ্রেণীর মধ্যে পার্থক্য থাকলেও জনগণের উপর স্বৈরাচারী পদ্ধতিতে লুণ্ঠন ও শোষণ এবং জনগণের বিপরীতে স্বার্থগত অবস্থানের অভিন্নতার কারণে আমলা ও ধনিক এই উভয় শ্রেণী গরীব, মেহনতী ও উৎপাদক জনগণের বিপরীতে সম্মিলিতভাবে একটি অভিন্ন ও সাধারণ  শ্রেণী গঠন করে। এই শ্রেণী নির্যাতনমূলক আমলাতান্ত্রিক ও লুণ্ঠনমূলক ধনিকতান্ত্রিক শ্রেণীসমূহের সাধারণ ও অভিন্ন বৈশিষ্ট্যগুলিকে ধারণ করে। সুতরাং গরীব, মেহনতী ও উৎপাদক জনগণের বিপরীতে স্বৈরাচারী শাসক ও শোষক আমলা ও ধনিকদের দ্বারা গঠিত এই সাধারণ ভাগটিকে আমরা চিহ্নিত করতে পারি আমলা-ধনিক শ্রেণী হিসাবে।

 

এ দেশে গরীব, মেহনতী ও উৎপাদক জনগণের উপর চেপে আছে আমলা-ধনিক শ্রেণীর স্বৈরাচারী ও নির্যাতনমূলক শাসন ও শোষণ। এদের শোষণের প্রধান এবং  স্থায়ী হাতিয়ার হ’ল আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রযন্ত্র অর্থাৎ সামরিক ও বেসামরিক আমলাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রযন্ত্র। উৎপাদন পরিচালনা কিংবা অর্থনীতি সংগঠনের পরিবর্তে বলপ্রয়োগের বৈধ যন্ত্র স্বরূপ রাষ্ট্রের ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারাই এ দেশে ধন-সম্পদ কিংবা পুঁজি  সঞ্চয় ও বৃদ্ধির শ্রেষ্ঠ উপায়। এই রাষ্ট্রযন্ত্রের উপর নিয়ন্ত্রণই তাই ধনিক হিসাবে অস্তিত্ব রক্ষা বা ধন-সম্পদ ও সম্পত্তি রক্ষার শ্রেষ্ঠ পথ।

 

এ দেশের অর্থনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রকৃত বৈশিষ্ট্য ও সমস্যা বুঝতে হলে আমাদের এই বিষয় বুঝতে হবে যে, এ দেশে মূলত সম্পদ দ্বারা ক্ষমতা করায়ত্ত হয় না, বরং মূলত ক্ষমতা দ্বারাই করায়ত্ত হয় এবং  রক্ষিত হয় সম্পদ।

 

এ দেশে মুখ্যত উৎপাদন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পত্তিবান কিংবা ধনিক শ্রেণী পড়ে না উঠে রাষ্ট্রের স্বৈরতার শক্তি দ্বারা শ্রমজীবী ও উৎপাদক জনগণকে লুণ্ঠন ও শোষণের মাধমে এই শ্রেণী গড়ে ওঠায় এই অবস্থা দেখা দিয়েছে। ব্রিটিশ এ দেশে অস্ত্রশক্তি দ্বারা রাষ্ট্রক্ষমতা অধিকার ক’রে যে উপনিবেশিক লুণ্ঠন ও শোষণের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে সেই লুণ্ঠন ও শোষণের সহযোগী হিসাবেই গড়ে ওঠে এ দেশের আমলা-ধনিক শ্রেণী। ১৯৪৭-এ নির্বাচনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে এই শ্রেণীর হাতেই ক্ষমতা হস্তান্তর ক’রে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীরা এ দেশ ত্যাগ করে। পাকিস্তান আমলে যেমন আজও তেমন মূলত এই শ্রেণীই দেশে শাসন ক্ষমতায় এবং সামাজিক কর্তৃত্বে অধিষ্ঠিত। স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্যে ভারতের হস্তক্ষেপের ফলে আমলা-ধনিক শ্রেণী অনিবার্য ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে যায়। পশ্চিম পাকিস্তানীদের বদলে পূর্ব বঙ্গের বাংলাভাষীদের দ্বারা গঠিত হয়ে এই স্বৈরাচারী আমলা-ধনিক শ্রেণী ভারতের সাহায্যে এ দেশের রাষ্ট্র ক্ষমতা হাতে পেয়েছে।

 

এ দেশে সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে কিংবা ধনিক শ্রেণী গঠনে উৎপাদন প্রক্রিয়ার তুলনায় বলপ্রয়োগ কিংবা রাষ্ট্র ক্ষমতার গুরুত্ব কতো বেশী তা বোঝা যায় যখন আমরা দেখি যে, রাষ্ট্র ক্ষমতার উপর নিয়ন্ত্রণ বা রাষ্ট্র ক্ষমতার আশ্রয় হারাবার সাথে সাথে কিভাবে  এ দেশের কোটি কোটি হিন্দু কিংবা লক্ষ লক্ষ উর্দূভাষী সম্পদ ও সম্পত্তির উপর অধিকার কিংবা ধনিক হিসাবে অস্তিত্বের ভিত্তি হারিয়ে ফেলে। রাষ্ট্র ক্ষমতার উপর দখল নিয়ে এ দেশে একাধিকবার এক এক দল  লোক দ্রুত ধন-সম্পত্তি অর্জন করেছে, দ্রুত নির্বিত্ত থেকে বিত্তবানে পরিণত হয়েছে এবং এদের সহযোগী হয়েই অন্যরা ধন-সম্পত্তি অর্জন করতে পেরেছে। আবার রাষ্ট্র ক্ষমতার হস্তচ্যুতি কিংবা আশ্রয়চ্যুতি এখানে এক এক দল বিত্তবানকে নিমেষে নিঃস্ব ও নিঃসহায় করেছে।

 

অথাৎ এ দেশে ধন-সম্পত্তি অর্জনের মূলে যে বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সেটি হ’ল ক্ষমতার উপর নিয়ন্ত্রণ। এই ক্ষমতার একটি উদ্দেশ্য যেমন অর্থ ও সম্পত্তি অর্জন করা তেমন এই অর্থ ও সম্পত্তি আবার সাহায্য করে ক্ষমতা রক্ষা করতে। তবে শেষ বিচারে অবশ্য ক্ষমতাই প্রধান শক্তি। সুতরাং বলপ্রয়োগের বা ক্ষমতা প্রয়োগের সর্ববৃহৎ, স্থায়ী এবং  একমাত্র বৈধ উৎস রাষ্ট্র  হওয়ায় রাষ্ট্রের কর্মচারী বিশেষত তার সশস্ত্র অংশসমূহই এ দেশে স্বৈরাচারী শাসন ও শোষণের ব্যবস্থা রক্ষায় ও পরিচালনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ধারক শক্তি হিসাবে দেখা দিয়েছে। অস্ত্র ব্যবহার বা বলপ্রয়োগের ক্ষমতা ও সুযোগ যার যতো বেশী সে ততো বেশী সুযোগ-সুবিধা, সম্মান ও অর্থ- বিত্তের অধিকারী হ’তে পারে।

 

গোটা ব্যবস্থার সংগঠনে, রক্ষায় ও পরিচালনায় অস্ত্রশক্তির ভূমিকা এতো বেশী বলে সমাজে পুলিশের ভূমিকা ও গুরুত্ব এতো বেশী। এবং অস্ত্রশক্তি বা সামরিক শক্তি সবচেয়ে বেশী যেখানে কেন্দ্রীভূত হয় সেই সেনাবাহিনীই সমগ্র আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় শক্তি হিসাবে ভূমিকা পালন করে। প্রকৃতপক্ষে সেনাবাহিনীই এই স্বৈরাচারী আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় স্তম্ভ। এই কারণে এ দেশের সেনাবাহিনীর এতো ক্ষমতার উচ্চাভিলাষ। রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব দখল ক’রে তারা তাদের প্রকৃত ভূমিকার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি আদায় করে এবং সেই সঙ্গে আদায় করে স্বৈরাচারমূলক প্রশাসনে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণজাত সুযোগ-সুবিধাও।

 

সুতরাং আমরা দেখছি যে, এ দেশে শাসক শ্রেণী গঠনের মূল শর্ত হ’ল স্বৈরতার শক্তি বা বলপ্রয়োগের ক্ষমতা অর্জন করতে পারা। উৎপাদন সংগঠন ও পরিচালনার তুলনায় স্বৈরতার শক্তি স্বরূপ রাষ্ট্রের ক্ষমতা প্রয়োগ দ্বারা উৎপাদক জনগণকে অবাধে লুণ্ঠন ও শোষণ করে সহজে ধনিক ও সম্পত্তিবান হওয়া যায় বলে সেই পথেই এ দেশে ধনিক শ্রেণী গড়ে উঠেছে। আর তাই এই শ্রেণী যেমন আমলাতান্ত্রিক তথা প্রধানত আমলাতন্ত্র দ্বারা সংগঠিত ও নিয়ন্ত্রিত তেমন অবশ্যম্ভাবীভাবেই এই শ্রেণী উৎপানবিরোধী  বা অনুৎপাদনশীল। ফলে দুর্নীতিগ্রস্ত, ন্যায়-নীতি বোধহীন ও লুণ্ঠনপ্রিয়।

 

সুতরাং উৎপাদনের পরিবর্তে রাষ্ট্র ক্ষমতা ব্যবহার  কিংবা তার সংরক্ষণ দ্বারা এ দেশে যে পুঁজি গড়ে উঠেছে তা ইউরোপের পুঁজির মতো উৎপাদনশীল পুঁজি না হয়ে সেটা পরিণত হয়েছে উৎপাদনশীলতা খর্বকারী আমলা-ধনিক পুঁজিতে। এই পুঁজি উৎপাদনশীলতা তথা উৎপাদন শক্তির বিকাশের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় বলে এই স্বৈরাচারভিত্তিক পুঁজি নিজের অস্তিত্বকে নিশ্চিত করে বিদেশের সম্প্রসারণবাদী কিংবা সাম্রাজ্যবাদী  বা নয়া উপনিবেশবাদী পুঁজির অধীনতার মধ্যে আশ্রয় নিয়ে। এইভাবে এই পুঁজি দেশের পশ্চাৎপদতা ও বিদেশের অগ্রগতির মাঝখানে সেতু হিসাবে অবস্থান করে। এই সেতু দিয়ে এ দেশে বিদেশের উন্নত ও প্রবল পুঁজির শোষণ, লূণ্ঠন ও নিয়ন্ত্রণ পরিচালিত হয় এ দেশের তুলনামূলকভাবে পশ্চাৎপদ ও দুর্বল জনগণের উপর। এইভাবে এ দেশ দাঁড়িয়ে থাকে উন্নত বিদেশী শক্তির বাজার হিসাবে। সুতরাং আমলা-ধনিক শ্রেণীর নেতৃত্বে যে অর্থনীতি বিকাশ লাভ করে সেটাকে শিল্প অর্থনীতি কিংবা উৎপাদনশীল না বলে বাজার অর্থনীতি বলাই সঙ্গত।

 

এইভাবে বিদেশের উপনিবেশিক শাসন দূর হলেও দেশটা হয়ে আছে নয়া উপনিবেশ। এক সময় ছিল শুধু ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের উপনিবেশ। এখন তা পরিণত হয়েছে ব্রিটেনসহ বিদেশের বৃহৎ শক্তিবর্গের যৌথ নয়া উপনিবেশ। বিদেশের এই বৃহৎ শক্তিবর্গের মধ্যে এখন আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করেছে। তবে এই উপনিবেশ পুরাতন ধরনের প্রত্যক্ষ উপনিবেশ না হয়ে নূতন ধরনের যেখানে বিদেশীদের প্রত্যক্ষ শাসনের ঝামেলা এবং ব্যয় নেই, বরং আছে পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ, আধিপত্য ও শোষণ। বিদেশীদের হয়ে প্রত্যক্ষ শাসনের কাজটা এখন করে এ দেশেরই রাষ্ট্র। বিদেশী ব্রিটিশ উপনিবেশিক রাষ্ট্র ও পঁুজির নিয়ন্ত্রণে এ দেশে যে আমলা-ধনিক শ্রেণী গড়ে উঠেছিল এবং এখনও যা বিদেশের পঁুজি ও রাষ্ট্রশক্তির প্রভাবে, আশ্রয়ে ও সাহায্যে টিকে আছে সেই আমলা-ধনিক শ্রেণী এ দেশে বিদেশী বৃহৎ পঁুজি ও রাষ্ট্রশক্তির অংশ হয়ে আছে বলে এদের পঁুজি এ দেশে বিদেশের বৃহৎ পঁুজির অংশ হিসাবেই ভূমিকা পালন করছে। সুতরাং এ দেশে পরোক্ষ সাম্রাজ্যবাদের নয়া উপনিবেশ বা নূতন ধরনের বাজার ব্যবস্থা রক্ষা করাই এই আমলা-ধনিক শ্রেণীর মূল ভূমিকা হয়ে  দেখা দিয়েছে।

 

এই বাজার ব্যবস্থার একটা বৈশিষ্ট্য হল দেশের সীমিত উন্নয়ন। এ দেশে বিদেশের পণ্য বিক্রির জন্য বিংবা বাজার অর্থনীতি রক্ষার জন্য এবং শাসক শ্রেণীর সুখভোগের জন্য যেটুকু উন্নয়ন প্রয়োজন হয় সেইটুকু উন্নয়ন ঘটানো হয় রাষ্ট্রের কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রেখে। এই উন্নয়ন হয় সীমিত। ফলে এর সুবিধা ভোগ করে মুষ্টিমেয় আমলা-ধনিক শ্রেণীই এবং ব্যাপক জনগণ পড়ে থাকে পশ্চাৎপদতায়, দুর্বলতায় এবং দারিদ্রে। জনগণের পশ্চাৎপদতাকে রক্ষা করা হয় সচেতনভাবে এবং পরিকল্পিতভাবে। জনগণকে চেতনার ক্ষেত্রে এবং বাস্তবেও পশ্চাৎপদতায় ধরে রাখার প্রয়োজন থেকে সাম্প্রদায়িক ও স্বৈরাচারী শাসক শ্রেণী অলৌকিক শক্তিতে বিশ্বাস নির্ভর ও পরলোকবাদী ধর্মীয় চেতনাকে এতো উৎসাহের সঙ্গে রক্ষা ও লালন করে। এর ফলে জনগণ যেমন হয় ইহলোক বিমুখ ও পরলোক মনস্ক তেমন হয় ভাগ্যবাদী ও স্বৈরচারের নিকট সহজ আত্মসমর্পণকারী। কাজেই জনগণের জাগরণ ও সামগ্রিক উন্নয়ন হয়ে ওঠে দুঃসাধ্য, যা সাহায্য করে দেশী­বিদেশী স্বৈরাচারী শাসক, শোষক ও লুটেরাদেরকে।

 

জনগণ পশ্চাৎপদ ও দুর্বল হলে তাদেরকে স্বৈরাচারী পদ্ধতিতে শাসন ও শোষণ করা আমলা­ধনিক শ্রেণীর পক্ষে সহজ হয়। এই কারণে এরা নিজেরা যথেষ্ট পরিমাণে উন্নত কিংবা আলোকপ্রাপ্ত হলেও নিজেদের চারপাশে রক্ষা করে অনুন্নয়ন, পশ্চাৎপদতা ও অন্ধত্বের আবেষ্টন। এই আবেষ্টনে তারা ব্যাপক গরীব, দুর্বল, মেহনতী ও উৎপাদক জনগণকে ধরে রাখে। জনগণের পশ্চাৎপদতা ও দুর্বলতা রক্ষা দ্বারা আমলা­ধনিক শ্রেণী দেশকে করে রাখে উন্নত পৃথিবীর তুলনায় পশ্চাৎপদ ও দুর্বল। যার ফলে এ দেশ উন্নত বিদেশী শক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও লুণ্ঠিত হয়। এইভাবে আমলা­ধনিক শ্রেণীর স্বৈরাচারী ও গণবিরোধী চরিত্র তাদেরকে যেমন দেশের প্রকৃত উন্নয়ন বিরোধী করে তেমন তাদেরকে করে দেশের ও জাতির শত্রু এবং বিদেশী আধিপত্যবাদী কিংবা সাম্রাজ্যবাদী, নয়া উপনিবেশবাদী শক্তিসমূহের সহযোগী ও দালাল। উৎপাদনের বদলে রাষ্ট্রের স্বৈরশক্তির ব্যবহার দ্বারা গরীব, শ্রমজীবী ও উৎপাদক জনগণের শ্রমশক্তি, সম্পদ ও সম্পত্তি লুণ্ঠন যাদের ধন ও সম্পত্তি অর্জনের প্রধান পদ্ধতি সেই ধর্ম-সাম্প্রদায়িক ও স্বৈরতান্ত্রিক শাসক শ্রেণীর কাছ থেকে অবশ্য দেশপ্রেম কিংবা গণতান্ত্রিক ও মানবিক মূল্যবোধ একেবারেই আশা করা উচিত নয়।

 

এমন অবস্থায় এ দেশে আমলা­ধনিক শ্রেণীর স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ও শোষণ উচ্ছেদ করতে হলে তাদের শক্তির মূল উৎসটিকে তাদের হাত থেকে কেড়ে নিতে হবে। অর্থাৎ আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দেশ শাসনের সকল স্তরে আমলাদের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে অর্পণ করতে হবে। সেনাবাহিনীকে নিতে হবে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। এর ফলে প্রতিষ্ঠিত হবে জনগণের গণতন্ত্র এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা। এতে করে আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রযন্ত্র ভেঙ্গে পড়বে, শাসনযন্ত্রে বেসামরিক কিংবা সামরিক আমলাদের আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ উচ্ছেদ হবে এবং গরীব, দুর্বল, শ্রমজীবী ও উৎপাদক জনগণের উপর অত্যাচার, লুণ্ঠন, ঘুষ, দুর্নীতি ও চুরির মাধ্যমে যে স্বৈরাচারী ধনিক শ্রেণী গড়ে উঠেছে তার হাত থেকে রাষ্ট্র ক্ষমতা চলে যাওয়ায় তার দুর্নীতি ও লুণ্ঠনলব্ধ ধন­সম্পত্তি জনগণের কাছে ফিরিয়ে নেওয়াও সম্ভব হবে।

 

অবশ্য শুধু রাজনৈতিক গণতন্ত্র বা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাই আমলা­ধনিক শ্রেণীর স্বৈরাচারী শাসন ও শোষণ উচ্ছেদ করার জন্য যথেষ্ট হবে না। কারণ এই শ্রেণী যে স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা করে তার একটি প্রধান উদ্দেশ্যই হ’ল স্বৈরাচারী পদ্ধতিতে লুণ্ঠন ও শোষণ দ্বারা অর্থ ও সম্পত্তি অর্জন করা। এইভাবে এই শ্রেণী অর্থনৈতিকভাবে ধনিক শ্রেণীতে পরিণত হয়। কাজেই এই ধনিক শ্রেণীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অস্তিত্ব বিলুপ্ত করতে হলে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হিসাবে তার পুঁজি ও ধন­সম্পত্তি জাতীয়করণ করতে হবে।

 

বস্তুত আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার সঙ্গে অবাধ ব্যক্তিমালিকানার অবস্থানই স্বৈরাচারী আমলা-ধনিক শ্রেণীর জন্ম ও বিকাশ ঘটায়। ব্যক্তিগত মালিকানার সুযোগ নিয়ে আমলা-ধনিকরা তাদের লুণ্ঠন ও শোষণলব্ধ অর্থ ও সম্পদ রক্ষা ও বৃদ্ধি করে। রাষ্ট্র ক্ষমতা পরিচালনা ক’রে কিংবা রাষ্ট্র ক্ষমতার আশ্রয় লাভ ক’রে তারা যে অর্থ বা সম্পদ উপার্জন করে সেটাকে তারা রূপান্তরিত কিংবা রক্ষা করে শহরে ও গ্রামে জমি ও বাড়ী, ব্যাংক ব্যালান্স, ব্যবসা, শিল্প ইত্যাদিতে। এইভাবে এদের সম্পদ দ্বারা এরা অর্থনীতি ও সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করে।

 

এমন অবস্থায় এদের হাত থেকে শুধু রাষ্ট্র ক্ষমতার স্বেচ্ছাচারী ব্যবহারের সুযোগ কেড়ে নিলেই হবে না সেই সঙ্গে এদের অর্থনৈতিক ভিত্তিও ধ্বংস করতে হবে। নতুবা এরা এদের আর্থিক শক্তি দ্বারা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে পঙ্গু বা ধ্বংস ক’রে রাষ্ট্র ক্ষমতা পুনরায় দখল করবে কিংবা নূতন শাসকদেরকে প্রলুব্ধ ও দুর্নীতিগ্রস্ত ক’রে নিজেদের শ্রেণীভুক্ত ক’রে নিয়ে পূর্বাবস্থা ফিরিয়ে আনবে। ফলে গণতন্ত্র ব্যর্থ হবে এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার জায়গায় পুনরায় ফিরে আসবে স্বৈরতন্ত্র এবং স্বৈরতন্ত্রের প্রয়োজনে গণ-বিরোধী ও দুর্নীতিবাজ সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র ও আমলা শাসন।

 

সুতরাং জাতীয়করণ এ দেশে জনগণের গণতন্ত্রেরই এক অপরিহার্য স্তম্ভ। অবশ্য একই সঙ্গে এটাও ঠিক যে, এই জাতীয়করণের কর্মনীতি মূলত পরিচালিত হবে পরশ্রমজীবী, অনুৎপাদক ও স্বৈরাচারী ধনিক শ্রেণীর বিরুদ্ধেই। এদের অর্থনৈতিক ভিত্তি ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু শ্রমজীবী জনগণ, প্রকৃত ও প্রত্যক্ষ উৎপাদক শ্রেণীর বিরুদ্ধে জাতীয়করণের কর্মনীতি পরিচালিত হবে না। কাজেই কৃষক, কারিগর, ক্ষুদ্র কারখানার মালিক যে নিজেই শ্রম করে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও দোকানদার ইত্যাদির ক্ষেত্রে ব্যক্তি মালিকানা থাকবে।

 

কারণ ব্যক্তি মালিকানার নিরংকুশ অবসান আবার সমাজে নূতন রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্রের নিরংকুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা ক’রে আরেক ধরনের স্বৈরতন্ত্রের জন্ম দেয় যা কমিউনিস্ট সমাজতান্ত্রিক দেশগুলিতে দেখা গেছে। এই ব্যবস্থায় ব্যক্তি তার অর্থনৈতিক ক্ষেত্র হারায় বলে হারায় ব্যক্তি স্বাধীনতাও। ব্যক্তির নিজস্ব উদ্যোগ ও কর্মের স্বাধীনতা নষ্ট হয় বলে তার মেধা ও চিন্তাশক্তির বিকাশ হয় না। ফলে সমাজে ও অর্থনীতিতে নেমে আসে বন্ধ্যাত্ব।

 

সুতরাং জনগণের গণতন্ত্র স্বৈরাচারকে উৎখাত ক’রে যে নূতন অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করবে তা উৎপাদনশীলতা খর্বকারী আমলা­ধনিক শ্রেণীর পুঁজি ও সম্পত্তি জাতীয়করণ করলেও প্রত্যক্ষ উৎপাদক তথা ক্ষুদে উৎপাদকদের ক্ষেত্রে ব্যক্তি মালিকানা সংরক্ষণ করবে। কাজেই জাতীয়করণের আওতায় পড়বে সমস্ত বৃহৎ মালিকানা, বৃহৎ শিল্প, বাণিজ্য, ব্যাংক, বীমা, বৈদেশিক মালিকানাধীন শিল্প ও পুঁজি ইত্যাদি। [ * ] এই সঙ্গে জমি, বাড়ী ইত্যাদির মাধ্যমে ধনিক শ্রেণীর শোষণের পথ বন্ধ করার জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণের উপর বাসস্থান জাতীয়করণ এবং ভূমি সংস্কারের কর্মনীতি গ্রহণ করতে হবে। এ ছাড়া দুর্নীতি ও লুণ্ঠনলব্ধ সমস্ত সম্পত্তি বিনা ক্ষতিপূরণে বাজেয়াপ্ত করতে হবে। ভূমি সংস্কার দ্বারা অকৃষক ভূমি মালিকানা বাতিল ক’রে প্রকৃত কৃষকদের মধ্যে কৃষি জমির মালিকানা হস্তান্তর করতে হবে।

 

ধনিক শ্রেণীর সম্পত্তি ও পুঁজি জাতীয়করণ এবং ভূমি সংস্কার দ্বারা শ্রমজীবী ও উৎপাদক জনগণের ব্যক্তি মালিকানা বা বেসরকারী মালিকানায় যে নূতন ধরনের পুঁজি গড়ে উঠবে তা শ্রম ও উৎপাদনশীলতা দ্বারা সংগঠিত হবে বলে স্বৈরতানির্ভর ও একচেটিয়ামূলক না হয়ে তা হবে গণতান্ত্রিক এবং গণকল্যাণমুখী। অন্যদিকে বাইরের সাম্রাজ্যবাদী বা নয়া উপনিবেশবাদী বৃহৎ পুঁজির প্রভাবে এটা সংগঠিত হবে না বলে এটা চরিত্রে হবে স্বাধীন।

 

এমতাবস্থায় এ দেশে জনগণের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বিষয়টি একটি রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক বিপ্লবের কর্মে পরিণত হয়েছে। এ দেশে জনগণের প্রকৃত ও পূর্ণ গণতন্ত্র তথা জনগণের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে যে গণতান্ত্রিক বিপ্লব সংগঠিত হবে তা এ দেশের সকল দুঃখ, দুর্গতি, অনুন্নয়ন, পশ্চাৎপদতা, সাম্প্রদায়িকতা ও পরদাসত্বের উৎস সাম্প্রদায়িক ও স্বৈরাচারী আমলা-ধনিক শ্রেণীর সকল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়ে এ দেশকে দিবে স্বাধীনতা, সমৃদ্ধি ও বাধাহীন অগ্রযাত্রার অভূতপূর্ব সুযোগ।

 

 

 

নারী অধিকার

 

নারীর উপর পুরুষের স্বৈরতান্ত্রিক আধিপত্য ও নির্যাতন এবং নারীর অধিকারহীনতা এ দেশের সকল দুর্গতি ও সমস্যার অন্যতম উৎস হয়ে আছে। নারী সমাজের অর্ধেক। সুতরাং তার দাসত্ব কিংবা অধিকারহীন অবস্থা সমগ্র সমাজকে প্রভাবিত করে। তাছাড়া নারী মানবজাতির জননী। মূলত নারী দ্বারা সন্তানের জন্ম, লালন ও বিকাশ হয়। সুতরাং প্রধানত নারীর উপর নির্ভর করে জাতির ভবিষ্যৎ গঠন। এই নারী যখন থাকে অশিক্ষা­কুশিক্ষার অধীনে, অবদমনের ভিতরে তখন তার প্রভাব পড়তে বাধ্য জাতি ও সমাজের ভবিষ্যৎ গঠনে। স্বৈরতান্ত্রিক শাসনে বাঁচতে অভ্যস্ত ভীত­সন্তস্ত্র নারী তার সন্তানদেরকেও স্বৈরতন্ত্র ও নির্যাতনকে মেনে চলার শিক্ষাই দেয়। তার শিক্ষার গুণে সমাজে কোথায়ও স্বাধীন মানুষ জন্মাতে পারে না এবং শাসক ও প্রবল হয় নিপীড়ক, বর্বর, স্বৈরাচারী এবং তার বিপরীতে শাসিত ও দুর্বল হয় নিশ্চেষ্ট আত্মসমর্পণকারী, ভাগ্যবাদী এবং প্রবল ও স্বৈরাচারী শাসকের ভক্ত ও অন্ধ অনুসারী। বস্তুত এই নারীর হাতে লালিত হয়ে গোটা সমাজই হয় পশ্চাৎপদ, অন্ধ, উগ্র, বিবেকহীন ও বিচারবুদ্ধিহীন।

 

কাজেই সমাজকে অন্ধত্ব থেকে, স্বৈরাচার থেকে, পশ্চাৎপদতা ও অশিক্ষা থেকে মুক্ত করতে হলে নারীকে পুরুষের স্বেচ্ছাচারী ও নিপীড়নমূলক আধিপত্য ও শাসন থেকে মুক্ত করতেই হবে এবং নারীর জন্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে সমাধিকার। অর্থাৎ মুক্ত ও স্বাধীন সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য চাই মুক্ত ও স্বাধীন নারী। উন্নত ও মানবিক মানুষ সৃষ্টির জন্য চাই উন্নত ও মানবিক নারী।

 

নারীর স্বাধীনতা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নারীর কতকগুলি বিশেষ অধিকার দরকার। কারণ নারী দৈহিকভাবে পুরষের তুলনায় দুর্বলতর এবং নারীকে সন্তান ধারণ ও লালন করতে হয়। সুতরাং সবক্ষেত্রে নারীকে পুরুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেওয়া মানে নারীর পরাজয় ও হীন অবস্থাকে নিশ্চিত করা। কাজেই নারীর সমাধিকার রক্ষার জন্যই নারীকে কতকগুলি ক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় অগ্রাধিকার ও সুবিধা দেবার প্রয়োজন আছে। নতুবা নারীর অধিকার হস্তচুøত হবে। বিশেষত নারীর প্রতি রাষ্ট্রকে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। চাকুরীর ক্ষেত্রে গর্ভধারণ ও সন্তান প্রসবকালীন ছুটি, সন্তান পালনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সহায়তা লাভ, কর্মজীবী নারীদের জন্য বাসস্থান, জীবনযাত্রা ও চলাফেরায় নিরাপত্তা ইত্যাদি কতকগুলি ব্যবস্থা নারীর জন্য পাওনা। শুধু তাই নয় রাষ্ট্রের শাসন বা ক্ষমতাযন্ত্রের উপর নারীর নিয়ন্ত্রণ যদি নিশ্চিত করা না যায় তবে নারীর সমাধিকারও নিশ্চিত হবে না। সুতরাং নারীর সমাধিকার নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রের শান্তিরক্ষা, প্রশাসন, প্রতিরক্ষা, বিচার ইত্যাদি বিভাগের পরিচালনায় নারীর নিজস্ব প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা করতে হবে।

 

মানবজাতির বিপুল অভিজ্ঞতার পর আমাদের এই বিষয়টি বোঝা একান্ত প্রয়োজনীয় যে, রাষ্ট্রের শাসন বা ক্ষমতা যন্ত্রের উপর নিয়ন্ত্রণ ছাড়া নারী মুক্তি বা নারীর জন্য সমাধিকার প্রকৃতপক্ষে বিশেষ কোন তাৎপর্য বহন করে না। কারণ চূড়ান্ত বিচারে কোন অধিকারই অধিকার নয় যদি সেই অধিকারের ভিত্তি স্বরূপ না থাকে ক্ষমতার উপর অধিকার বা নিয়ন্ত্রণ। জাতির স্বাধীনতা কিংবা অধিকার তখনই জাতির জন্য স্বাধীনতা কিংবা অধিকার হিসাবে দেখা দেয় যখন জাতির নিজেকে শাসন করার অধিকার থাকে তার নিজেরই হাতে। এইকভাবে জনগণের অধিকার বা গণতন্ত্রও তখনই প্রকৃত অর্থ বহন করে যখন জনগণ নিজেরাই ভোগ করে আত্মশাসনের অধিকার, যা কার্যকর হয় তাদের নিজেদেরই নির্বাচিত বা পছন্দনীয় প্রতিনিধিদের দ্বারা। এই কারণে শুধু ভোটাধিকার কোনই অর্থ বহন করে না যদি তা জনগণের আত্মশাসন ক্ষমতার প্রকাশ না হয়। এমন নির্বাচনমূলক শাসনও গণতন্ত্র নয় যদি তা জনগণের জন্য হয়ে দাঁড়ায় ধরাছোঁয়ার ঊর্ধ্বে অবস্থিত স্বৈরাচারী শাসক বা সরকার বেছে নেবার অধিকার যে সরকারের নামে স্বৈরাচারী সরকারী আমলারা জনগণকে শাসন ও উৎপীড়ন করবে। এই জন্য শুধু দূরবর্তী কেন্দ্রে নির্বাচনমূলক শাসন জনগণের উপর একদল নির্বাচিত ধনিকের স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠা করে। কারণ এতে শাসনযন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা গ্রাম ও শহরের জনগণের থাকে না। সুতরাং নিম্নতম পর্যায় থেকে উচ্চতম পর্যায় পর্যন্ত সকল স্তরের সকল শাসন যন্ত্র যখন সকল পর্যায়ের জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত হয় কেবলমাত্র তখনই গণতন্ত্র স্বৈরাচারী আমলা­ধনিকের গণতন্ত্র না হয়ে জনগণের গণতন্ত্র হয়ে দেখা দিতে পারে।

 

একইভাবে নারীর অধিকার বা মুক্তিও তখনই প্রকৃত রূপ নেয় যখন নারী নিজের শাসনভার পুরুষের হাতে ছেড়ে না দিয়ে নিজেই নিজেকে শাসন করে। অর্থাৎ নারী যখন শাসন ক্ষমতা হাতে পায় তখন সে মুক্ত হয়। তার আগে নয়। এই শাসন ক্ষমতা ব্যতীত নারীর অধিকার নারীর জন্য সমাধিকার নয়। ক্ষমতাবিহীন নারীমুক্তি প্রকৃতপক্ষে নারী কর্তৃক পুরুষের অবাধ মনোরঞ্জনের অধিকারে পরিণত হয়।

 

এটা ঠিক যে, পুরুষ হ’তে নারী স্বতন্ত্র হলেও নারী সেই অর্থে ভিন্নভাবে কোনও জাতি বা সমাজ গঠন করে না কিংবা পুরুষ থেকে দূরে ও বিচ্ছিন্নভাবেও বসবাস করে না। বরং নারী ও পুরুষ উভয়ের সম্মিলনেই সংগঠিত হয় সমাজ বা জাতি। সুতরাং নারীর ক্ষমতার সীমানা নির্দিষ্ট করে দেওয়া কঠিন। এইজন্য যেটা দরকার সেটা হ’ল রাষ্ট্রের পরিচালনায় নারীর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার জন্য তার নিজস্ব প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা করা।

 

এ কথা সত্য যে, সার্বজনীন ভোটাধিকার নারীর জন্যও রাষ্ট্র ক্ষমতাকে প্রভাবিত কিংবা নিয়ন্ত্রণ করার কিছু সুযোগ এনে দেয়। কিন্তু এটা আমাদের বোঝা দরকার যে, নারীর কিছু দৈহিক সীমাবদ্ধতা ও সন্তান পালনের দায়িত্বের কারণে বৃহৎ সমাজ সংগঠনে নারীর প্রত্যক্ষ ভূমিকা ক্রমশ গৌণ হয়। সমাজ যতো বৃহৎ ও জটিল হয় সমাজ ও তার কেন্দ্রীয় সংগঠন রাষ্ট্রের প্রক্রিয়ায় নারী সাধারণত ততো পিছিয়ে পড়ে। অবশ্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশ নারীকে বহু সীমাবদ্ধতা থেকেই মুক্ত করেছে এবং তার মেধা ও মানবিক ক্ষমতার বিকাশ ও প্রয়োগের অভূতপূর্ব সুযোগ এনে দিচ্ছে। তবু এখনও নারীর দৈহিক সীমাবদ্ধতা, সন্তান পালন এবং গৃহের দায়িত্ব নারীর সামাজিক গতিশীলতাকে যথেষ্ট রকম খর্ব করে। ফলে সমাজ ও রাষ্ট্রের নেতৃত্ব পুরুষের হাতে রয়ে যায়। আর বিশেষত পুলিশ, সেনাবাহিনী, প্রশাসন ইত্যাদি শাসন ও বলপ্রয়োগের যন্ত্রগুলি প্রধানত পুরুষদের দ্বারাই গঠিত হয় পুরুষদের দৈহিক সুবিধার কারণে। এইভাবে রাষ্ট্রের শাসনযন্ত্র ও সরকার উভয় স্থানেই পুরুষের নিয়ন্ত্রণ থাকে এবং সমগ্র সমাজ হয় পুরুষ শাসিত বা পুরুষতান্ত্রিক। আজকের সমগ্র পৃথিবীর চিত্র মূলত এটাই। সমস্ত সভ্য রাষ্ট্র তা যতো উন্নতা ও গণতান্ত্রিকই হোক পুরুষতান্ত্রিক। ইদানীং কিছু রাষ্ট্রে নারী রাষ্ট্রপ্রধান বা প্রধান মন্ত্রী হলেও সেটা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অবস্থায় বিশেষ কোনই হেরফের ঘটায় না। এ ক্ষেত্রে পুরুষতন্ত্রকে পরিচালনার দায়িত্ব যায় ব্যক্তি নারীর হাতে। কিন্তু এটা সমগ্র নারী সম্প্রদায়ের হাতে কোনও নূতন ক্ষমতা এনে দেয় না।

 

এই রকম গণতন্ত্রও তাই পুরুষের গণতন্ত্র, নারীর গণতন্ত্র নয়। কারণ এই ধরনের ভোটাধিকারে নারীর জন্য বিশেষ অধিকার না থাকায় সে পুরুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় হেরে যায়। রাজনীতি ও সরকার পরিচালনায় যারা নেতৃত্ব দেয় তারা প্রধানতই পুরুষ, যারা নির্বাচিত হয় তারা প্রধানত পুরুষ। সুতরাং এই ধরণের রাজনৈতিক সমাধিকার নারীর জন্য হয়ে দাঁড়ায় নির্বাচনের আবরণে বহু হাজার বৎসরের পুরুষ শাসনেরই ধারাবাহিকতা।

 

সেই কারণে যদি নারীর জন্য গণতন্ত্রকে অর্থবহ করতে হয় এবং নারীকে মুক্ত করতে হয় পুরুষের স্বৈরাচারী সামাজিক শাসন ও আধিপত্য থেকে তবে নারীর জন্য এমন ব্যবস্থার প্রয়োজন যেটা ক্ষমতা যন্ত্রের উপর সমগ্র নারী সম্প্রদায়ের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা দ্বারা নারীর ক্ষমতা ও স্বার্থ রক্ষা করবে। আসলে সমস্ত বিধান তো মানুষের জন্য, জীবনের জন্য, মানবিক চেতনার সুখ, সমৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য। সুতরাং মানুষ হিসাবে নারীর যে মানবিক অধিকার প্রয়োজন সেটা দাবী করে রাষ্ট্রের উপর নারীর নিয়ন্ত্রণ রক্ষার জন্য নারীর একটা নিজস্ব প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা এবং ক্ষমতা যন্ত্রের ভিতর নারীর নিজস্ব অবস্থান। অর্থাৎ রাষ্ট্রের পরিচালনায় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে জনগণের প্রতিনিধিত্ব যেমন থাকবে তেমন তার পাশাপাশি থাকবে নারীর নিজস্ব স্বতন্ত্র প্রতিনিধিত্বও, যা নারীর দৈহিক সীমাবদ্ধতা, সাংসারিক দায়িত্ব এবং সন্তান পালন জনিত অসুবিধার কারণে সমাজে নারীর যে গৌণ ভূমিকা দেখা দেয় তার সুযোগ নিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রে পুরুষ যাতে তার প্রতি অবিচার করতে না পারে সেই দিকটি নিশ্চিত করবে। তাছাড়া প্রশাসন, পুলিশ ও সেনাবাহিনী ইত্যাদি ক্ষমতা যন্ত্রগুলিতেও নারীর নিয়োগ এবং নারীর স্বতন্ত্র ইউনিট গঠনের প্রয়োজন রয়েছে, যা রাষ্ট্রে নারীর নেতৃত্বের ভিত্তি রক্ষ করবে। শুধু রাষ্ট্রের উপর তলায় নয়, গ্রাম থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত রাষ্ট্রের সকল স্তরেই নারীর এই নিজস্ব প্রতিনিধিত্ব ও অংশ গ্রহণের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই ব্যবস্থায় নারীর মত ও অংশগ্রহণ ছাড়া রাষ্ট্র পরিচালনা অসম্ভব হবে। ফলে সমাজের কেন্দ্রীয় সংগঠন রাষ্ট্র নারীর স্বার্থ রক্ষা করতে বাধ্য হবে।

 

অবশ্য নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি আমাদের সমাজে অত্যন্ত কঠিন কাজ। কারণ প্রচলিত ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং বিধি এ ক্ষেত্রে এক বিরাট প্রতিবন্ধক হয়ে আছে। প্রচলিত ধর্মীয় বিধানে নারীর জন্য অবরোধ এবং পুরুষের অধীনে জীবন যাপনের যে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা দেওয়া আছে তাতে ক’রে নারীর আত্মবিশ্বাসের জাগরণ ও মুক্তি এবং তার সপক্ষে সামাজিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার জন্য চাই ব্যাপক ও গভীর সামাজিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক আন্দোলন।

 

নারী যে পুরুষের তুলনায় মানবিক চেতনার বিচারে হীন বা খাটো নয় এই সত্য সম্পর্কে সমাজকে সচেতন করতে হবে। নারী শারীরিক ক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় সাধারণভাবে দুর্বল হলেও মানুষের জন্মদান ও লালনের ক্ষেত্রে তার ভূমিকা যে পুরুষের তুলনায় অনেক বেশী এবং মৌলিক এবং এটা যে তাকে এ দিক থেকে পুরুষের তুলনায় শ্রেষ্ঠত্ব দান করে এবং শ্রমের ক্ষেত্রে তার ভূমিকা যে কম নয় এই সত্যকে সমাজ চেতনায় প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। তাছাড়া দৈহিক বলই যদি অধিকারের মাপকাঠি হয় তবে সমাজে শুধু কুস্তিগীর ও পেশীবলের অধিকারী পুরুষদেরই অধিকার থাকা উচিত এবং দুর্বলতর পুরুষদেরও অধিকার কেড়ে নেওয়া উচিত।

 

কিন্তু এসব যুক্তির কথা প্রাচীনপন্থী ও পরলৌকিক ধর্মীয় শক্তি সহজে মানবে না। রাষ্ট্রটাও আছে মূলত এদের কিংবা এদের প্রতিপালকদের হাতে। অর্থাৎ যে আমলা-ধনিক শ্রেণী এ দেশে রাষ্ট্র ও সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করছে তারা নিজেরা যেমন সাম্প্রদায়িক ও স্বৈরাচারী তেমন সাম্প্রদায়িকতা ও স্বৈরাচারের ভিত্তি হিসাবে সমাজে লালন করে অবৈজ্ঞানিক ও অন্ধ ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং নারীর অধিকারহীনতার ধারণা। আধুনিক যুগের চাপে এবং বিশেষত সীমিত উন্নয়নমূলক বাজার অর্থনীতি ও বাজার সমাজকে রক্ষা করার জন্য তারা মুখে বা কাগজেকলমে নারীর কিছু সীমিত অধিকার দিলেও বাস্তবে সেগুলিকে কার্যকর করার ব্যাপারে আগ্রহী হয় না। শুধু তাই নয় পুরুষের স্বৈরাচারের অধীন নারীর এই সীমিত অধিকারও যাতে বাস্তবে যথেষ্ট সংকুচিত থাকে সাম্প্রদায়িক ও স্বৈরাচারী শাসক শ্রেণী তাদের রাষ্ট্র বা ক্ষমতাযন্ত্র দ্বারা সেই ব্যবস্থাও করে। তাই নারী নির্যাতনের বিচার ও শাস্তি যেমন অনুল্লেখ্য তেমন নারীর নিরাপত্তা ও অধিকারের সীমানাকে পুলিশ ও প্রশাসন দ্বারাও কঠোরভাবে সীমাবদ্ধ করে রাখা হয়। এমনও ঘটে যে, পুরুষের মতো পোশাক পরার জন্য নারীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। এছাড়াও আছে অজস্রভাবে রাষ্ট্রের ও সমাজের হাতে নারীদের অবিরাম হয়রানি ও নিগ্রহ।

 

সুতরাং নারী মুক্তির জন্য এ দেশে প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় ও সমাজিক বিপ্লব, যা উৎখাত করবে বর্তমান পরলোকবাদী ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক ও স্বৈরাচারী আমলা-ধনিক শ্রেণীকে এবং প্রতিষ্ঠা করবে ইহবাদী তথা অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ।

 

 

 

উপসংহার

 

আমাদের আলোচনা থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, ইহবাদ, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ও নারী মুক্তির সংগ্রাম এক ও অভিন্ন। পরলোকবাদী ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এক অখণ্ড সংগ্রামেরই চারটি দিক হ’ল ইহবাদ, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ও নারী মুক্তি। এই চারটির যে কোনও একটির অসম্পূর্ণতায় সমগ্র সংগ্রাম ব্যর্থ হ’তে বাধ্য।

 

এ দেশের সমস্যা পর্বতপ্রমাণ। দারিদ্র্য, স্বৈরাচার, অশিক্ষা, পশ্চাৎপদতা ইত্যাদি অজস্র সমস্যার আঘাতে জাতির জীবন ভেঙ্গে পড়ছে। এই সমগ্র সমস্যাকে মোকাবিলা করার কাজ যেমন বিশাল তেমন করণীয়ও আছে অনেক। কিন্তু এই সকল করণীয়ের মধ্যে যে চারটিকে দৃঢ়ভাবে ধরলে আমরা সকল সমস্যা ও সংকটের গ্রন্থি খুলতে পারব সেই চারটি করণীয়ের বিষয়ে এখানে আলোচনা করা হ’ল।

 

আমরা দেখেছি এ দেশের উন্নয়ন ও মুক্তির পথে স্বৈরাচার কতো বড় বাধা। কিন্তু এই স্বৈরাচারের একটি প্রধান উৎস হ’ল প্রচলিত ধর্ম ও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা এবং অপর একটি প্রধান উৎস হ’ল নারী­পুরুষ সম্পর্কের অসমতা। জনগণের উপর আমলা­ধনিকদের স্বৈরাচারী নিয়ন্ত্রণ রক্ষা করার প্রধান নৈতিক হাতিয়ার প্রচলিত ধর্ম। প্রধানত এই ধর্মকে ব্যবহার ক’রে এ দেশে এই স্বৈরাচারী শ্রেণী জনগণের নৈতিক ও ব্যবহারিক আনুগত্য ও বাধ্যতা লাভ করেছে। নতুবা শুধু বলপ্রয়োগ দ্বারা এদের পক্ষে জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হ’ত না। অর্থাৎ জনগণকে দমন ও নিয়ন্ত্রণ করার জন্য তারা যেমন ব্যবহার করে আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রযন্ত্রকে ঠিক তেমন তারা ব্যবহার করে ধর্মকে। ধর্ম এ দেশে স্বৈরাচার রক্ষার হাতিয়ার হয়েছে বলে স্বৈরাচারী আমলা­ধনিক শ্রেণী সমাজ ও জনগণকে নিয়ন্ত্রণে রাখার উদ্দেশ্যে পশ্চাৎপদ ধর্মীয় চেতনাকে উস্কে দেয়, যা আবার নারীর অবস্থার উন্নতিকে অসম্ভব ক’রে রাখে। ইহবাদ ও বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাকে আঘাত করে বলে তা আঘাত করে এই সাম্প্রদায়িকতার উৎস প্রচলিত ধর্মীয় চেতনাকে এবং এইভাবে তা জাগরণ ঘটায় জনগণের ইহলৌকিক বা জাগতিক আকাঙ্ক্ষার এবং যুক্তি, বিবেক ও বিজ্ঞান চেতনার। এর ফলে জনগণ অধিকার সচেতন ও সাহসী হয়ে আঘাত করে স্বৈরাচারী আমলা­ধনিক শ্রেণীকে।

 

আমলা­ধনিক শ্রেণী লুণ্ঠনের প্রয়োজনে যেমন ধর্মকে ব্যবহার করতে গিয়ে হয় সাম্প্রদায়িক তেমন জবরদস্তি ও স্বৈরতার আশ্রয় নিতে গিয়ে হয় স্বৈরাচারী। ক্ষমতার অপব্যবহার তথা স্বৈরাচার দ্বারা এই শ্রেণীর জন্ম ও বিকাশ হয় বলে তারা কখনই গণতান্ত্রিক হ’তে পারে না অর্থাৎ জনগণকে প্রকৃত ক্ষমতা দিতে পারে না। তারা আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর ভিতরে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে মাঝে মাঝে নির্বাচনের ব্যবস্থা দিলেও সেটার ভিত্তিতে থাকে আমলা শাসন, আমলা নিয়ন্ত্রণ ও স্বেচ্ছাচার বা স্বৈরতন্ত্র। তখন আমলাদের সঙ্গে সম্মিলিত হয়ে ক্ষমতার জবরদস্তিমূলক ব্যবহার দ্বারা ক্ষমতাসীন রাজনীতিকরা আমলাতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্রকে রাজনৈতিক রূপ দেয়। সুতরাং এই ধরনের গণতন্ত্র আমলা নিয়ন্ত্রিত ধনিকদের গণতন্ত্র হয়ে দেখা দেয়, যেটা জনগণের প্রতি প্রতারণা ছাড়া আর কিছু নয়। এটা গণতন্ত্রের নামে যেটা প্রতিষ্ঠা করে সেটা হ’ল রাজনৈতিক স্বৈরাচার। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিবের সন্ত্রাসী শাসনে আমরা রাজনৈতিক স্বৈরাচারের রূপই দেখতে পেয়েছি, যা বাকশালে বিশেষ রূপ নিয়েছিল। জনগণকে লুণ্ঠন করার প্রয়োজনে এই স্বৈরাচার কখনো আমলা শাসন দূর করে না বরং তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিজের শাসনকে একচেটিয়া ও নিরংকুশ করে। উদ্দেশ্য, রাষ্ট্র ক্ষমতার জবরদস্তি ব্যবহার দ্বারা ক্ষমতাহীন ও দুর্বল জনগণকে লুটতরাজ করে ধনী হওয়া। আওয়ামী লীগ এই কাজই করেছিল।

 

আমলাদের সঙ্গে এই ক্ষমতাসীন রাজনীতিকদের দ্বন্দ্বও হয়। এটা হয় লুণ্ঠনের সুযোগ ও ক্ষমতার ভাগ নিয়ে, প্রাধান্য নিয়ে। এই দ্বন্দ্বে আমাদের দেশে রাজনীতিকরা একাধিকবার আমলাতন্ত্রের প্রধান স্তম্ভ সেনাবাহিনীর কাছে হেরেছে এবং বারবার সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব মেনে নিয়েই তারা নিয়মতন্ত্র ও নির্বাচনের পথে যাত্রা শুরু করেছে।

 

এই রাজনীতিকদের ক্ষমতায় যাবার পথ হ’ল আমলাতান্ত্রিক নিয়মতন্ত্র ও এই নিয়মতন্ত্রের অংশ হিসাবে নির্বাচন। জনতার সমর্থন ও আন্দোলনকে পঁুজি ক’রে এরা নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যায় ঠিকই কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে তারা প্রতিনিধিত্ব করে ভোটদাতা জনগণকে নয় বরং আমলাদেরকে এবং ধনিকদেরকে। এ ছাড়া তাদের উপায়ও থাকে না। কারণ আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থাধীন নির্বাচনের যে পথ নিয়মতন্ত্র দেয় সেই পথ ধ’রে ক্ষমতায় গিয়ে ক্ষমতার মুল ভিত্তি আমলাতন্ত্রের বিপক্ষে দাঁড়ানো যায় না।

 

আসলে আমলাদের সঙ্গে ধনিক শ্রেণীর প্রতিনিধি ও অংশ স্বরূপ নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিকদের ঐক্য ও ক্ষমতা ভাগাভাগির মূল পদ্ধতি হ’ল নির্বাচন। সুতরাং আমলা ব্যবস্থাধীন নিয়মতন্ত্র ও নির্বাচনের পথ ধরে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিকদের যে উত্থান তাতে আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে পাল্টাবার কোনও বাস্তব শক্তি অর্জন করা যায় না বলে এই রাজনীতিকরা আমলাতন্ত্রকে এবং সেই সঙ্গে আমলা সমন্বয়ে গঠিত এবং আমলাতান্ত্রিক ধনিক শ্রেণীকে প্রতিনিধিত্ব করে। তবু আমলারা সর্বদা খুশী হয় না। তখন তারা তাদের সামরিক নেতৃত্ব দ্বারা রাজনীতিকদেরকে ক্ষমতাচ্যুত করে। অর্থাৎ তখন আমলা-ধনিক শ্রেণীর রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ক্ষমতাচ্যুত করে তার সামরিক নেতৃত্ব। এতে রক্তপাতও ঘটতে পারে। বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক অন্তর্দ্বন্দ্বের সঙ্গে আমলাতন্ত্রের প্রধান শক্তি সেনাবাহিনীর ক্ষোভ ও অসন্তোষ যুক্ত হওয়ায় ১৯৭৫-এ সামরিক অভ্যুত্থানে শেখ মুজিবকে নিহত হতে হয়।

 

আমরা দেখেছি যে, বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের প্রতি মৌখিক সমর্থন দিলেও শেখ মুজিব সাম্প্রদায়িক শক্তিকে রক্ষা করেছিলেন। বস্তুত মুক্তিযুদ্ধের দ্বারা মুক্ত বিপুল জাতীয়তাবাদী গণশক্তির বিরুদ্ধে তখনও যাওয়া সম্ভব ছিল না বলে শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগ তখন বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অবস্থান নেয় নি। কিন্তু তারা প্রকৃতপক্ষে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের প্রতি আন্তরিক ছিল না বরং তাকে তারা অন্তর্ঘাত করেছিল। যে কারণে ধর্ম-সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে ’৪৭-এ বিভক্ত বঙ্গের সীমানাকেই তারা মেনে নিয়েছিল। সুতরাং যেটাকে তারা বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ বলে চালিয়েছিল সেটা প্রকৃতপক্ষে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ ছিল না, বরং সেটা ছিল ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার নূতন নামকরণ, বাঙ্গালী নামকরণ। অর্থাৎ শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগের বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের অন্তর্বস্তু হল পূর্ব বঙ্গের মুসলিম সাম্প্রদায়িকতাবাদ। জিয়াউর রহমান বস্তুত এই সাম্প্রদায়িকতাবাদেরই নূতন নামকরণ করেছেন বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ। এতে অন্তত শেখ মুজিবের কথা ও কাজের অসঙ্গতি দূর হয়েছে।

 

এ দেশে সাম্প্রদায়িক শক্তির শেখ মুজিবের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ থাকা উচিত। কারণ তিনি তাদেরকে অনিবার্য ধ্বংস থেকে রক্ষা করেছিলেন। দেশ স্বাধীন হবার পর তাদের বিরুদ্ধে যে সর্বাত্মক অভিযান ছিল একান্ত স্বাভাবিক ও যৌক্তিক তাকে রোধ ক’রে শেখ মুজিব ভবিষ্যতে তাদের পুনর্বাসন ও পুনঃ প্রতিষ্ঠার পথ ক’রে দেন।

 

বাঙ্গালী জাতির ঐক্য শেখ মুজিবের কাম্য হ’তে পারে না। কারণ ভারতের রাষ্ট্রীয় স্বার্থে আঘাত করা তাঁর পক্ষে যেমন সম্ভব ছিল না তেমন এ দেশে স্বৈরাচারী রাষ্ট্র ব্যবস্থা রক্ষার যে দায়িত্ব তিনি গ্রহণ করেছিলেন তাতে প্রচলিত ধর্মীয় চেতনা ও সাম্প্রদায়িকতা রক্ষা করা তাঁর জন্য ছিল অত্যাবশ্যক। ফলে ভারতের হস্তক্ষেপে ’৭১-এ এ দেশে যে রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠিত হয় তার গোড়াতেই থেকে যায় স্ববিরোধ। একদিকে এতে ঘটে বাঙ্গালী জাতির সংগ্রাম ও চেতনার প্রতিফলন, অপর দিকে এতে ঘটে বৈদেশিক হস্তক্ষেপ ও ষড়যন্ত্র জনিত সাম্প্রদায়িকতা ও স্বৈরাচারের প্রতিফলন। ভারতের হস্তক্ষেপ দ্বারা সাম্প্রদায়িকতা ও স্বৈরাচারের শক্তিই এ দেশে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ক্ষমতা দখল করে।

 

কিন্তু প্রথমেই নূতন চেতনাকে এক আঘাতে ধ্বংস করা সম্ভব ছিল না। সুতরাং শেখ মুজিব নিয়েছিলেন কৌশলের পথ। তিনি চেয়েছিলেন পর্যাক্রমে সাম্প্রদায়িকতা ও স্বৈরাচারকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে।

 

যুদ্ধের দ্বারা মুক্ত সামাজিক চেতনার শক্তি, বাঙ্গালীর জাতীয়তাবাদী, ইহবাদী বা জাগতিক, বৈজ্ঞানিক এবং গণতান্ত্রিক চেতনার শক্তি ছিল প্রবল। ফলে সাম্প্রদায়িকতা ও স্বৈরাচারের সঙ্গে ইহবাদ, জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্রের এক প্রবল লড়াই চলেছে শুধু রাজনৈতিক অঙ্গনেই নয় খোদ রাষ্ট্রযন্ত্রে ভিতরেও। এই লড়াই বা স্ববিরোধের আবর্তে প্রাণ দিতে হয়েছে শেখ মুজিবকে, জিয়াকেও। অবশেষে এরশাদের নেতৃত্বে সাম্প্রদায়িকতা ও স্বৈরাচার রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে অর্জন করতে পেরেছে নিরংকুশ প্রাধান্য।

 

এই অবস্থায় এ দেশে সাম্প্রদায়িকতা ও স্বৈরাচার বিরোধী সংগ্রাম নবতর পর্যায়ে পৌঁছেছে। এ দেশে স্বৈরাচার বিরোধী গণতন্ত্রের সংগ্রাম বিরোধী সংগ্রাম সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী ও জাতীয়তাবাদী হতে বাধ্য। একই সঙ্গে এই সাম্প্রদায়িকতা ও স্বৈরাচার বিরোধী সংগ্রাম অসম্পূর্ণ ও খণ্ডিত হ’তে বাধ্য যদি এই সংগ্রাম পুরুষের স্বৈরাচার বিরোধী নারী মুক্তির সংগ্রামের সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করতে না পারে। যে স্বৈরাচার জনগণের অধিকার তথা গণতন্ত্রকে দমন করে এবং বিজ্ঞান ও জাতীয় চেতনা বিরোধী ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাকে লালন করে সেই স্বৈরাচারই নারীর অধিকারকে সংকুচিত ক’রে রাখে। নারীর অধিকার সমাজে স্বৈরাচারের শক্তিকে দুর্বল করে, ধর্মীয় পশ্চাৎপদতা, অন্ধত্ব ও উগ্রতার শক্তিকে দুর্বল করে, কারণ প্রাচীন অন্ধ ধর্মীয় চেতনার একটি প্রধান কাজই হ’ল রাষ্ট্রীয় স্বৈরতন্ত্র রক্ষার পাশাপাশি নারীর উপর পুরুষের সামাজিক স্বৈরতন্ত্র রক্ষা করা। শুধু যে জনগণ স্বেচ্ছাচারী শাসককে মেনে চলবে তাই নয় উপরন্তু নারীকেও মানতে হবে পুরুষের স্বেচ্ছাচারী শাসন এই যে শিক্ষা প্রচলিত ধর্ম অবিরামভাবে ছড়ায় সমাজে তা অবিরামভাবে সমাজে জন্ম দেয় ও প্রবল করে স্বৈরাচারকে। তাই নারীর মুক্তি ঘটলে বহু হাজার বৎসরের প্রাচীন স্বৈরাচার ও ধর্মীয় অন্ধত্বের শৃংখল ভেঙ্গে সমাজে এমনই এক নূতন ও প্রবল শক্তি মুক্ত হবে যার আঘাতে গুঁড়িয়ে যাবে সমস্ত প্রাচীন জরাগ্রস্ত ব্যবস্থা।

 

আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখেছি এ দেশে পরলোকবাদী ধর্ম কিভাবে রাষ্ট্র ও রাজনীতিকে অধিকার ক’রে দেশের প্রগতির বিরুদ্ধে ভূমিকা পালন করে। শুধুমাত্র বাঙ্গালী জাতিকে বিভক্ত করার ক্ষেত্রেই তা ভূমিকা রাখে নি, উপরন্তু পরলোকবাদী হওয়ায় তা জনগণের দৃষ্টিকে ইহলোক বা জীবনের দিক থেকে সরিয়ে নিয়ে মৃতুø পরবর্তী জীবনের কল্পনা তথা কল্পিত পরলোকের দিকে চালিত করে। এই রকম ধর্মের প্রভাবে সমাজ ও জীবনের উন্নয়নের প্রশ্ন গৌণ হওয়ায় মানুষ শাসকের স্বেচ্ছাচারের নিকট সহজ আত্মসমর্পণকারী এবং বাস্তব জীবনে উন্নয়নের প্রশ্নে নিশ্চেষ্ট হবার শিক্ষা পায়। ফলে দেশ, সমাজ ও জাতির উন্নতি অসম্ভব হয়ে থাকে। এই ধর্মের প্রভাবে জাতীয় ও গণতান্ত্রিক চেতনার বিকাশ, নারীর অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতি অসম্ভব হয়ে থাকে। যে আমলা-ধনিক শ্রেণী দেশ ও সমাজের পশ্চাৎপদতা ও অনুন্নয়নের ফলভোগী তারা এই কারণে রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে প্রচলিত ধর্মকে এত উৎসাহের সঙ্গে লালন ও ব্যবহার করে। সুতরাং এ দেশে রাষ্ট্র ও রাজনীতিকে প্রচলিত ধর্মের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করা ছাড়া জাতি ও জনগণের মুক্তি এবং সমাজ প্রগতির সামনে আর কোন পথ খোলা নেই। দেশ ও জাতিকে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা ও স্বৈরতন্ত্রের আধিপত্য থেকে মুক্ত করার পথ তাই রাষ্ট্র ও রাজনীতিকে ধর্মনিরপেক্ষ বা জাগতিক তথা ইহবাদী করা অর্থাৎ রাষ্ট্র ও রাজনীতিকে প্রচলিত ধর্ম ও ধর্মীয় সম্প্রদায়িকতার কবলমুক্ত করা। রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে ইহবাদ বা ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ প্রতিষ্ঠা তাই এ দেশে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাবাদ ও স্বৈরতন্ত্রের রাহুগ্রাস মুক্ত জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ও নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার একান্ত প্রাথমিক দাবী হয়ে দেখা দিয়েছে।

 

সুতরাং ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আজ এ দেশে গণমানুষের মুক্তির সংগ্রামের পতাকায় যে চারটি সর্বাধিক উজ্জ্বল নক্ষত্র খচিত সেই চারটি হচ্ছে ইহবাদ, বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ, জনগণের গণতন্ত্র ও নারী অধিকার।

 

এই চারটির প্রতিষ্ঠা এ দেশে রাষ্ট্র ও সমাজ বিপ্লবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ করণীয় হয়ে দেখা দিয়েছে। এই দেশে বাঙ্গালী জনগণের জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব বিজয়ী হবে প্রধানত এই চার করণীয় সম্পাদন দ্বারা। অর্থাৎ সকল স্বৈরাচারমূলক দেশী ও বিদেশী শাসন, শোষণ, নির্যাতন ও আধিপত্যের বিরুদ্ধে বাঙ্গালী জনগণের জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের পরিপূর্ণ বিজয়ের চারটি মৌল ও অপরিহার্য পূর্বশর্ত হ’ল (. রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে ইহবাদ প্রতিষ্ঠা, ২. সমগ্র বাঙ্গালী জনগণের জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, ৩. জনগণের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং ৪. নারীর সমাধিকার প্রতিষ্ঠা বা মুক্তি অর্জন।

 

আমরা দেখেছি যে, আজকের সকল সংকটে ও বিপর্যয়ের প্রধান কারণ হ’ল এ দেশের আমলা-ধনিক শ্রেণীর আধিপত্য। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা ও স্বৈরাচারের অব্যাহত চর্চা দ্বারা এই শ্রেণী জাতি ও জনগণের জাগরণ ও মুক্তি অসম্ভব করে রেখেছে। জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব দ্বারা এই আমলা-ধনিক শ্রেণীর বৈষয়িক ও নৈতিক আধিপত্য নির্মূল হবে। ফলে আজ দেশ যে সর্বাত্মক সংকট ও বিপর্যয়ের সম্মুখীন তা থেকে মুক্ত হবে এবং দেশ ও জাতি এগিয়ে যাবে উন্নতি, প্রগতি ও সমৃদ্ধির পথ ধ’রে।