Banner
শ্রেণীতত্ত্ব ও বিপ্লব -- শামসুজ্জোহা মানিক

লিখেছেনঃ শামসুজ্জোহা মানিক, আপডেটঃ July 13, 2010, 6:33 AM, Hits: 4476

 

 

শ্রেণী সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা এ দেশে বিপ্লবী আন্দোলনের ব্যর্থতার একটি প্রধান কারণ হয়েছে। এই ধারণা ভাঙ্গা ছাড়া এবং শ্রেণী সম্পর্কে সঠিক ধারণা অর্জন করা ছাড়া এ দেশে সমাজ বিপ্লব সফল করা এবং জনগণের মুক্তি অর্জন করা অসম্ভব।

 

শ্রেণী সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা বা প্রচলিত শ্রেণীতত্ত্ব এ দেশে রাজনীতিতে এসেছে মার্কসবাদের মাধ্যমে। কাজেই শ্রেণীতত্ত্ব বুঝতে হলে আমাদের মার্কস ও এঙ্গেলস -এর বক্তব্য দিয়েই শুরু করা উচিত। মার্কস-এঙ্গেলস কমিউনিস্ট ইশতেহার শুরু করছেন এভাবে, ‘আজ পর্যন্ত যত সমাজ দেখা গেছে তাদের সকলের ইতিহাস শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস। ‘স্বাধীন মানুষ ও দাস, প্যাট্রিশিয়ান এবং প্লিবিয়ান, জমিদার ও ভূমিদাস, গিল্‌ড্‌-কর্তা আর কারিগর, এক কথায় অত্যাচারী এবং অত্যাচারিত শ্রেণী সর্বদাই পরস্পরের প্রতিপক্ষ হয়ে থেকেছে, অবিরাম লড়াই চালিয়েছে, কখনও আড়ালে কখনও বা প্রকাশ্যে; প্রতিবার এ লড়াই শেষ হয়েছে গোটা সমাজের বিপ্লবী পুনর্গঠনে অথবা দ্বন্দ্বরত শ্রেণীগুলির সকলের ধ্বংসপ্রাপ্তিতে।

 

‘ভূতপূর্ব ঐতিহাসিক যুগগুলিতে প্রায় সর্বত্র আমরা দেখি সমাজে বিভিন্ন বর্গের একটা জটিল বিন্যাস, সামাজিক পদমর্যাদার নানাবিধ ধাপ। প্রাচীন রোমে ছিল প্যাট্রিশিয়ান, যোদ্ধা (Knights), প্লিবিয়ান এবং ক্রীতদাসেরা; মধ্য যুগে ছিল সামন্ত প্রভু, অনু-সামন্ত (Vassals), গিল্‌ড্‌-কর্তা, কারিগর, শিক্ষানবিশ কারিগর এবং ভূমিদাস। এইসব শ্রেণীর প্রায় প্রত্যেকটির মধ্যে আবার অভ্যন্তরীণ স্তরভেদ।

 

‘সামন্ত সমাজের ধ্বংসাবশেষ থেকে আধুনিক যে বুর্জোয়া সমাজ জন্ম নিয়েছে তার মধ্যে শ্রেণী বিরোধ শেষ হয়ে যায় নি। এ সমাজ শুধু প্রতিষ্ঠা করেছে নূতন শ্রেণী, অত্যাচারের নূতন অবস্থা, পুরাতনের বদলে সংগ্রামের নূতন ধরন।

 

‘আমাদের যুগ অর্থাৎ বুর্জোয়া যুগের কিন্তু এই একটা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য আছে; শ্রেণীবিরোধ এতে সরল হয়ে এসেছে। গোটা সমাজ ক্রমেই দু’টি বিশাল শত্রুশিবিরে ভাগ হয়ে পড়ছে, ভাগ হচ্ছে পরস্পরের সম্মুখীন দুই বিরাট শ্রেণীতে-বুর্জোয়া এবং প্রলেতারিয়েত।’

 

অর্থাৎ মার্কসবাদের দুই মূল প্রতিষ্ঠাতা মার্কস এবং এঙ্গেলস অন্তত ঐতিহাসিক যুগ থেকে মানব সমাজকে দু’টো সাধারণ শ্রেণীতে বিভক্ত দেখতে পাচ্ছেন, একটা অত্যাচারী আর একটা অত্যাচারিত। বর্তমান যুগে এই দুই শ্রেণীর একটা হ’ল বুর্জোয়া বা পুঁজিপতি আর একটা প্রলেতারিয়েত বা সর্বহারা-শ্রমিক।

 

এই বুর্জোয়া শ্রেণী এবং প্রলেতারিয়েত শ্রেণী সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে কমিউনিস্ট ইশতেহারের ১৮৮৮ সালের ইংরাজী সংস্করণের টীকাতে এঙ্গেলস বলছেন, ‘বুর্জোয়া বলতে আধুনিক পুঁজিপতি শ্রেণী বোঝায়, যারা সামাজিক উৎপাদনের উপায়গুলির মালিক এবং মজুরি-শ্রমের নিয়োগ কর্তা। প্রলেতারিয়েত হল আজকালকার মজুরি-শ্রমিকেরা, উৎপাদনের উপায় হাতে না থাকার দরুণ যারা বেঁচে থাকার জন্য স্বীয় শ্রমশক্তি বেচতে বাধ্য হয়।’ তাছাড়া ‘কমিউনিস্ট ইশতেহারে’ বুর্জোয়া শ্রেণীর অন্যান্য অংশ সম্পর্কে বলা হচ্ছে, ‘শিল্পের মালিক কর্তৃক মজুরের শোষণ খানিকটা হওয়া মাত্র অর্থাৎ তার মজুরির টাকাটা পাওয়া মাত্র, তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বুর্জোয়া শ্রেণীর অন্যান্য অংশ বাড়ীওয়ালা, দোকানদার, মহাজন প্রভৃতি।’

 

এই হ’ল আধুনিক বুর্জোয়া শ্রেণী সম্পর্কে মার্কসবাদের ব্যাখ্যা। মার্কসবাদের শ্রেণীতত্ত্ব বোঝার জন্য আমরা এঙ্গেলসের আরও কিছু বক্তব্য দেখতে পারি। কমিউনিস্ট ইশতেহারের ১৮৮৮ সালের ইংরাজী সংস্করণের ভূমিকাতে তিনি বলছেন,

 

‘যদিও “ইশতেহার” আমাদের দু’জনের রচনা, তবু আমার মনে হয় আমার বলা উচিত যে, এর মূলে রয়েছে যে প্রধান বক্তব্য সেটা মার্কসেরই নিজস্ব। সে বক্তব্য হল এইঃ ইতিহাসের প্রতি যুগে অর্থনৈতিক উৎপাদন ও বিনিময়ের প্রধান পদ্ধতি এবং তার আবশ্যিক ফল যে সামাজিক সংগঠন তাই হল একটা ভিত্তি যার উপর গড়ে ওঠে সে যুগের রাজনৈতিক ও মানসিক ইতিহাস এবং একমাত্র তা দিয়েই এ ইতিহাসের ব্যাখ্যা করা চলে; সুতরাং মানবজাতির সমগ্র ইতিহাস (জমির উপর যৌথ মালিকানা সম্বলিত আদিম উপজাতীয় সমাজের অবসানের পর থেকে) হল শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস, শোষক এবং শোষিত, শাসক এবং নিপীড়িত শ্রেণীর সংগ্রামের ইতিহাস; শ্রেণী সংগ্রামের এই ইতিহাস হল বিবর্তনের এক ধারা যা আজকের দিনে এমন পর্যায়ে পৌঁছিয়েছে যেখানে একই সঙ্গে গোটা সমাজকে সকল শোষণ, নিপীড়ন, শ্রেণী পার্থক্য ও শ্রেণী সংগ্রাম থেকে চিরদিনের মতো মুক্তি না দিয়ে শোষিত ও নিপীড়িত শ্রেণীটি­­অর্থাৎ প্রলেতারিয়েত­­শোষক ও শাসকের, অর্থাৎ বুর্জোয়া শ্রেণীর কর্তৃত্বের কবল থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারে না।’

 

মার্কস এবং এঙ্গেলসের উপরোক্ত বক্তব্যগুলো থেকে আমরা শ্রেণী ও শ্রেণী সংগ্রাম সম্পর্কে একটা ধারণা পাচ্ছি। এই সমগ্র শ্রেণী পার্থক্যের ভিত্তি হিসাবে তাঁরা ধরেছেন উৎপাদনের উপায়সমূহের উপর মালিকানার পার্থক্যকে। উৎপাদনের উপায়ের মধ্যে আসে জমি, গরু, লাঙ্গল, বিভিন্ন হাতিয়ার, যন্ত্র, শিল্প-কারখানা ইত্যাদি সবই। এই উৎপাদনের উপায়সমূহের উপর ব্যক্তি মালিকানা উচ্ছেদ করে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠা করলেই শ্রেণীভেদ, শ্রেণী দ্বন্দ্ব ও শ্রেণী শোষণের অবসান হবে। যে কারণে মার্কস-এঙ্গেলস কমিউনিস্ট ইশতেহারে বলছেন,

 

‘এই অর্থে কমিউনিস্ট তত্ত্বকে এক কথায় প্রকাশ করা চলেঃ ব্যক্তিগত মালিকানার উচ্ছেদ।’ মার্কস ও এঙ্গেলসের মতে উৎপাদন ও তার সামগ্রিক পদ্ধতি বা অর্থনীতিই হচ্ছে সমাজ বা সমাজ-সংগঠনের উৎস। যে কারণে এঙ্গেলস বলছেন ‘ইতিহাসের প্রতি যুগে অর্থনৈতিক উৎপাদন ও বিনিময়ের প্রধান পদ্ধতি এবং তার আবশ্যিক ফল যে সামাজিক সংগঠন’। অর্থাৎ সমাজ সংগঠন হ’ল অর্থনীতির ফল। একই কথা কাল মার্কস বলছেন,

 

‘সামাজিক উৎপাদনে মানুষ বেঁচে থাকার প্রয়োজনে উপকরণ সৃষ্টি করতে গিয়ে তার ইচ্ছা নিরপেক্ষভাবে নির্দিষ্ট ও প্রয়োজনীয় উৎপাদন সম্পর্কের মধ্যে প্রবেশ করে। এই উৎপাদন সম্পর্ক মানুষের বস্তুগত উৎপাদন শক্তির বিকাশের নির্দিষ্ট স্তরের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। উৎপাদন সম্পর্কগুলির সমষ্টি দ্বারা গঠিত হয় সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামো। এই অর্থনৈতিক কাঠামোই হচ্ছে সেই বাস্তব ভিত্তি যার উপর গড়ে ওঠে বৈধ এবং রাজনৈতিক অধিকাঠামো এবং এই কাঠামোর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হয়েই সামাজিক চেতনার নির্দিষ্ট রূপ বিকাশ লাভ করে। বাঁচার জন্য প্রয়োজনীয় বস্তুগত উপকরণসমূহ উৎপাদনের পদ্ধতি দ্বারাই নির্ধারিত হয় সমাজ, রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তির সমগ্র প্রক্রিয়া।’

 

সুতরাং আমরা দেখছি যে, মার্কসবাদের মতে উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে মানুষের সবকিছু আসে। শ্রেণীও এসেছে এখান থেকে। উৎপাদনের মালিক আর কর্মীদের পার্থক্য থেকে।  এটা হ’ল উৎপাদন সম্পর্কের এক বিশেষ রূপ। অসম উৎপাদন সম্পর্কের প্রকাশ। উৎপাদন সম্পর্কের সঙ্গে উৎপাদন শক্তির ভেদ ও দ্বন্দ্বের প্রকাশ। সমাজ বিভক্ত দু’টি শ্রেণীতে, একদিকে উৎপাদনের উপায়সমূহের মালিক আর একদিকে উৎপাদনে নিয়োজিত শ্রমিক বা কর্মী। সুতরাং মার্কসবাদের শ্রেণী হ’ল মূলত অর্থনৈতিক শ্রেণী। এটা রাজনৈতিক রূপ নিতে পারে। কিন্তু সেটাও অর্থনীতির প্রকাশ বা ফল। রাজনীতির উৎস অর্থনীতি। তাই অর্থনৈতিক সংগ্রাম করলে সেটা পরিণত হবে রাজনৈতিক সংগ্রামে। মার্কস ও এঙ্গেলস কমিউনিস্ট ইশতেহারে বলছেন, ‘কিন্তু প্রত্যেকটা শ্রেণী সংগ্রামই হল রাজনৈতিক সংগ্রাম।’

 

অর্থনীতিকে মানুষের সমস্ত কিছুর ভিত্তি বা উৎস হিসাবে, অবকাঠামো হিসাবে চিন্তা থেকে এই ধারণা এসেছে যে, অর্থনীতিতে ব্যক্তি মালিকানার অবসান ঘটাতে পারলে উৎপাদন সম্পর্কের সঙ্গে উৎপাদন শক্তির বৈপরীত্য ও সংঘাত দূর হবে; ফলে দূর হবে শ্রেণী-ভেদ, শ্রেণী দ্বন্দ্ব, শ্রেণী শোষণ এবং শ্রেণী শাসনও।

 

 

 

মার্কসবাদের শ্রেণীতত্ত্ব পাশ্চাত্যের সমাজ সম্পর্কে অনেকাংশে প্রযোজ্য যেখানে বুর্জোয়া শ্রেণীর উদ্ভব ও বিকাশ হয়েছে মূলত উৎপাদন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এবং যেখানে বুর্জোয়া শ্রেণী প্রধানত তার অর্থনৈতিক বা উৎপাদন শক্তি দ্বারা প্রভাবিত কিংবা নিয়ন্ত্রণ করেছে সমাজ ও রাষ্ট্রকে। কিন্তু যে সব সমাজকে ব্যক্তি মালিকানা ভিত্তিক অর্থনৈতিক কোনও শ্রেণী নিয়ন্ত্রণ না ক’রে সামরিক শক্তি কিংবা ধর্ম দ্বারা কোনও শ্রেণী নিয়ন্ত্রণ করে সেই সব সমাজে মার্কসবাদের এই শ্রেণীতত্ত্ব কতটুকু খাপ খায়?

 

আধুনিক যুগে প্রবর্তিত মার্কসীয় সমাজতন্ত্রের পূর্বেও রাষ্ট্রীয় কিংবা সামাজিক মালিকানা বহু সমাজেই ছিল। এটা শুধু আদিম উপজাতীয় সমাজে নয়, উপরন্তু ভারতসহ প্রায় সমগ্র প্রাচ্য সমাজের এটা একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল। ব্রিটিশ শাসনামলের পূর্ব পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশে উৎপাদনের প্রধান উৎস ভূমি ছিল সাধারণভাবে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সম্পত্তি। ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণ ক্ষেত্র বিশেষে থাকলেও রাষ্ট্রই ছিলো চূড়ান্ত অধিকারী এবং রাষ্ট্র ও সামাজিক গোষ্ঠীগুলির নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধানে সাধারণভাবে কৃষি ও হস্তচালিত শিল্প উৎপাদন পরিচালিত হ’ত। ব্যক্তির মালিকানা কিংবা ভূমিকা ছিল এক্ষেত্রে রাষ্ট্র এবং বর্ণজাতিভেদ ভিত্তিক সামাজিক কর্তৃত্বের অধীনস্থ।

 

যে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব বঙ্গে কিংবা ভারতীয় উপমহাদেশে ছিল তা ছিল প্রধানত সামরিক শক্তি নির্ভর আমলাতান্ত্রিক শাসক শ্রেণীর হাতে। বহিরাগত মুসলিম যোদ্ধাদের পরিচালনায় গঠিত হয়ে এই সামরিক অভিজাত শ্রেণী উৎপাদন পরিচালনায় ভূমিকা রাখত প্রধানত রাষ্ট্রের মাধ্যমে। বাঁধ, খাল নির্মাণ ইত্যাদি দ্বারা জলসেচের ব্যবস্থা করা, শান্তি-শৃংখলা রক্ষা করা ইত্যাদি দ্বারা তা সামাজিক উৎপাদনে ভূমিকা রাখত। কিন্তু উৎপাদন পরিচালনা দ্বারা এই শ্রেণীর উদ্ভব বা বিকাশ কিছুই হয় নি। বরং তার বিপরীতে এদের আবির্ভাব হ’ত সাধারণত ভিন্ন সমাজ হ’তে সামরিক অভিযান দ্বারা। তারা অস্ত্রের জোরে এসে অস্ত্রের জোরেই রাষ্ট্রের মাধ্যমে সমস্ত উৎপাদন ব্যবস্থার মালিক হয়ে বসত এবং উৎপাদনের ফলভোগী হ’ত। একইভাবে বাহিরের হানাদারদেরকে প্রতিরোধের প্রয়োজনেও সমাজের ভিতর থেকে এমন একদল যোদ্ধা বা একটা সামরিক শক্তির বিকাশ হ’ত যা এক সময় রাষ্ট্রক্ষমতার মাধ্যমে সমগ্র সমাজের উৎপাদন পদ্ধতির নিয়ামক হ’তে পারত।

 

কাজেই সমাজ বা জনগণকে নিয়ন্ত্রণের জন্য শুধু যে অর্থনীতি বা উৎপাদনের উপায়ের উপর নিয়ন্ত্রণ বা মালিকানার প্রয়োজন হয় তা নয়। এটা ছাড়াও বলপ্রয়োগের সামরিক সংগঠন দ্বারাও অর্থনীতি বা উৎপাদনের উপায়কে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। উৎপাদনের উপায় ব্যক্তিগত মালিকানায় রেখে বা না রেখেও এই সামরিক শক্তি নির্ভর শাসক শ্রেণী সমাজকে নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়ন্ত্রণজাত সুবিধা ভোগ করতে পারে।

 

অতীতে এই উপমহাদেশে জমির উপর যেমন রাষ্ট্রীয় মালিকানা দেখা যায় তেমন কখনও ব্যবসাতেও কম বা বেশী রাষ্ট্রীয় মালিকানা দেখা গেছে। আবার কখনও ব্যবসা ব্যবসায়ীদের হাতেই থাকত। কিন্তু এই ব্যবসায়ীরা কখনই প্রধান্যে আসতে কিংবা রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে নি।

 

একইভাবে আমরা এমন সমাজ কিংবা এমন সময়ের সন্ধান পাই যেখানে কিংবা যখন বাহুবল কিংবা অর্থবল বা উৎপাদনের মালিকানা সমাজ নিয়ন্ত্রণের প্রধান পদ্ধতি ছিল না, বরং তার বদলে এটা ছিল ধর্ম। পঞ্চাশের দশকেও তিব্বতের শাসক শ্রেণী জমির মালিক সামন্ত বা দাস মালিক কিংবা পুঁজিপতি কিংবা যোদ্ধা আমলা শ্রেণী ইত্যাদি কিছুই না হয়ে ছিল বৌদ্ধ ধর্মীয় অহিংস লামা সম্প্রদায়। এই সম্প্রদায়ের অধীনে থেকে সেখানে ক্রিয়াশীল ছিল রাষ্ট্রীয় আমলা সহ অন্যান্য সুবিধাভোগী শ্রেণী।

 

সমাজ, রাষ্ট্র কিংবা শাসক শ্রেণী সংগঠনে ধর্মের প্রবল ভূমিকা ইতিহাসে নূতন নয়। এমনকি ইসলাম দ্বারাও একটা নূতন সমাজ, রাষ্ট্র কিংবা শাসক শ্রেণী সংগঠিত হয়েছে। উৎপাদন সংগঠন দ্বারা সমাজকে সংগঠিত ও নিয়ন্ত্রণ না করে এই শাসক শ্রেণী প্রধানত ইসলামের নির্দিষ্ট বিশ্বাস ও নিয়মের মাধ্যমে সমরতন্ত্র সংগঠন দ্বারা ইসলামী সমাজকে সংগঠিত ও নিয়ন্ত্রণ করেছে। ইসলামে আমরা এমন এক ধর্মতন্ত্র পাই যা রাষ্ট্রের সঙ্গে একীভূত। তাই মোল্লাদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব গোড়ায় ছিল না। মোল্লা, সমরনায়ক ও শাসক ছিল একই ব্যক্তি। পরে সুবিধার প্রয়োজনে মোল্লাদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব গড়ে উঠলেও রাষ্ট্রের বাইরে তাদের কোনও স্বতন্ত্র সাংগঠনিক অস্তিত্ব গড়ে ওঠে নি যেমনটা খ্রীষ্ট ধর্মে দেখা যায়। খ্রীষ্ট ধর্মে চার্চ ও রাষ্ট্র ভিন্ন সত্তা। এক সময়ে চার্চের অধীনে রাষ্ট্র চলে গিয়েছিল। তবু রাষ্ট্র ও চার্চ সব সময়েই স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসাবে টিকে ছিল। এক সময়ে আবার ইউরোপে রাষ্ট্রকে চার্চের অধীনতা থেকে মুক্ত করার জন্য প্রচণ্ড সংগ্রাম করতে হয়েছে এবং সেই সংগ্রামে বিজয়ের মাধ্যমে আধুনিক যুগের সূত্রপাত হয়েছে।

 

কিন্তু ইসলামে চার্চ ও রাষ্ট্র একীভূত। এই জন্য ইসলামের শাসক শ্রেণী একই সঙ্গে ধর্ম, সমাজ ও রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক। অবশ্য ইসলামের শাসক ধর্ম প্রচারের মাধ্যমে সমাজ সংগঠিত করতে গিয়ে বেছে নিয়েছে যুদ্ধের পথ। এইভাবে ইসলাম গড়ে তুলেছে সমরতন্ত্র। আর তাই ইসলামের শাসক প্রধানত সমরনায়ক। ইসলামের শাসক শ্রেণীও প্রধানত যোদ্ধা শ্রেণী, সামরিক আমলা শ্রেণী। এই অবস্থায় ধর্ম চর্চার নির্দিষ্ট প্রয়োজনে সমাজে রাষ্ট্রীয় সামরিক আমলা শ্রেণীর সহযোগী হিসাবে গড়ে উঠেছে মোল্লা শ্রেণীও। তবে এই মোল্লাতন্ত্র রাষ্ট্র থেকে ভিন্ন কোনও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান কিংবা শ্রেণী হয়ে উঠতে পারে নি।

 

তাই সপ্তাহে অন্তত একদিন হলেও জুম্মার নামাজ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করত অনেক মুসলমান শাসকই। তত্ত্বগতভাবে মুসলিম উম্মা বা সম্প্রদায়ের নেতা হ’ল মুসলিম রাষ্ট্রনায়ক। মোট কথা, সমাজ গঠনে কিংবা নিয়ন্ত্রণে উৎপাদন ব্যবস্থা বা পদ্ধতির চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে ধর্ম বা সমরতন্ত্র ইত্যাদির গুরুত্ব বেশী দেখা যায়। কাজেই শুধু অর্থনীতিকে উৎস বা ভিত্তি ধরাটা কি ঠিক?

 

 

 

মার্কস-এঙ্গেলস যেটাকে শাসন বলছেন, ধরে নিয়েছেন সেটা অর্থনৈতিক শোষণের ফল বা তার প্রয়োজনে উদ্ভূত। এর ফলে শোষণ যে শাসনের ফল হ’তে পারে অর্থাৎ শাসন দ্বারাও যে হ’তে পারে শোষণ এই সত্য আড়াল হয়। আসলে শ্রেণী সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা অর্জনের জন্য প্রয়োজন হ’ল অর্থনীতিই সমাজের একমাত্র নিয়ামক এই ধারণা বর্জন করা। এমন কি এটা সর্বাবস্থায় প্রধান নিয়ামকও নয়। অর্থাৎ সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রধান পদ্ধতি সর্বদা অর্থনীতি হয় না। এটা ক্ষেত্র বিশেষে ধর্ম, ক্ষেত্র বিশেষে বাহুবল বা অস্ত্রবল এবং ক্ষেত্র বিশেষে রাজনীতি হ’তে পারে। কাজেই একটা সমাজের প্রধান নিয়ন্ত্রণকারী শ্রেণীকে বুঝতে হলে তা কোন পদ্ধতিতে সেই সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করছে সেটা বুঝতে হয়। আবার কোন সমাজেই জনগণকে একটা মাত্র পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। তার জন্য প্রধান পদ্ধতির সহযোগী হিসাবে থাকে আরও পদ্ধতি। অর্থাৎ একটা শ্রেণী প্রধান হলেও তার সহযোগী হিসাবে থাকে আরও শ্রেণী।

 

সংগঠিত সমাজ মানে বহু সংখ্যক মানুষের উপর একটা কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ। অর্থাৎ একদল লোক হয় নিয়ন্ত্রণকারী আর একদল নিয়ন্ত্রিত। সমাজকে যারা নিয়ন্ত্রণ করে তারা সমাজের শৃঙ্খলা, উৎপাদন ও নিরাপত্তা ইত্যাদি কাজ পরিচালনার মাধ্যমে সমাজের উৎপাদনের একটা অংশ ভোগ করে। সমাজ তাদেরকে এটা দিতে বাধ্য হয় নিজের অস্তিত্বের প্রয়োজনেই। সমাজের নিয়ন্ত্রণকারীরা এরই সুযোগ নিতে পারে বিভিন্নভাবে। এখন যে যুগে সামাজিক উৎপাদন এতো বিপুল ছিল না এবং উৎপাদন ছিল সম্পূর্ণরূপে মানুষের দেহশ্রম নির্ভর সেই যুগে সংখ্যালঘু একদল লোকের আরাম, বিশ্রাম ও মেধার বিকাশ ইত্যাদির জন্য অপরিহার্য ছিল সমাজের ব্যাপকতর অংশের উপর তুলনামূলকভাবে অনেক বেশী বঞ্চনা ও শ্রমের বোঝা চাপানো। এই জন্য অতীতে কোনও দাস বিদ্রোহ যেমন দাস ব্যবস্থার উচ্ছেদ ঘটায় নি তেমন কোনও কৃষক বিদ্রোহই ভূমিভিত্তিক অভিজাততন্ত্র বা রাজতন্ত্রের উচ্ছেদ ঘটায় নি। প্রতিটি সফল কৃষক বিদ্রোহ নূতন রাজতন্ত্র ও ভূমিভিত্তিক অভিজাততন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে মাত্র। রোমের দাস বিদ্রোহের নায়ক স্পার্টাকাস বিজয়ী হলে দাসত্বকেই অব্যাহত রাখতে বাধ্য হতেন। কারণ উন্নততর বিকল্পের সন্ধান তখনও মানুষের জানা ছিল না। দাসত্ব থেকে মুক্তির উপায় ছিল এই সভ্যতার ধ্বংস সাধন। যে দাস অনিচ্ছুকভাবে হলেও একবার সভ্যতা গড়ার কর্মী হয় সেই দাস তার নিজ হাতে গড়া সভ্যতার কারাগারকে ধ্বংস করতে পারে না। বড় জোর সে নিজেই তার অধিপতি হ’তে চাইতে পারে। অর্থাৎ তখন ভিন্ন কেউ হবে তার দাস। তাই দাসত্বের ভয়াবহ অভিশাপ থেকে মানুষকে মুক্তি দেবার জন্য প্রয়োজন হয়েছে সভ্যতা ধ্বংসকারী বাহিরের বর্বরের যার কাছে সভ্যতার কোনই আবেদন থাকে নি ধ্বংস দ্বারা লুণ্ঠন ছাড়া।

 

মানুষ সভ্যতা দ্বারা সবার জন্যই জ্ঞান, মর্যাদা ও প্রাচুর্যের স্বপ্ন দেখতে পারছে প্রকৃতপক্ষে আধুনিক কালে এসেই। বিজ্ঞান, শিল্প ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব বিকাশ এবং শিল্প বিপ্লবের বিস্তার আজকের যুগে বাস্তবেই সবার জন্য সম্পদ, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তা বণ্টনের যে বাস্তবতা এনে দিয়েছে তার ফলে আজ সাম্য ও গণতন্ত্র পৃথিবীব্যাপী ক্রমবর্ধমানভাবে  এক সর্বজনীন আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হচ্ছে।

 

এই আকাঙ্ক্ষা মার্কসবাদে শোষণহীন, শাসনহীন ও শ্রেণীহীন সমাজের স্বপ্নে পরিণত হয়েছে। আসলে শোষণ যদি জনগণের বা শ্রমিকের শ্রমের কেন্দ্রীভবন হয় তবে শোষণ কোন দিনই দূর হবে না। উৎপাদন যতোদিন আছে শোষণও ততোদিন কোন না কোন রূপে আছে এবং থাকবে। আর শাসন যদি সামাজিক ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন এবং এই কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার প্রয়োগ হয় তবে এটাও চিরকালই থাকবে কোন না কোন রূপে। যে হাতে থাকবে উৎপাদন পরিচালনার দায়িত্ব সেই হাত যেমন সম্পদ কেন্দ্রীভবনের কিছু না কিছু সুবিধা ভোগ করবে তেমন যে হাতে থাকবে ক্ষমতা প্রয়োগের দায়িত্ব সেই হাতও নিজ হাতে সঞ্চিত উদ্বৃত্ত ক্ষমতার বদলে সমাজের উৎপাদনেরও একটা অংশ ভোগ করবে।

 

প্রশ্নটা তাই শোষণ ও শাসন উচ্ছেদের নয় বরং একটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নির্মাণের যেখানে সমাজের উৎপাদন ও ক্ষমতার ফল কম বেশী সকলেই ভোগ করতে পারে। উৎপাদনের দায়িত্বে যারা থাকবে, ক্ষমতার দায়িত্বে যারা থাকবে, সমাজকে স্থিতিশীল ও বিকাশশীল রাখার দায়িত্বে যারা থাকবে তারা যাতে তাদের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার জোরে সমস্ত সম্পদ ও সুখ-সুবিধা নিজেদের হাতে কেন্দ্রীভূত না করে সেইটুকু দেখতে হবে। অর্থাৎ সমাজে প্রয়োজন সম্পদ ও সুখ-সুবিধার একটা সুষম বণ্টনের ব্যবস্থার। এর জন্য প্রয়োজন সমাজকে যারা বা যে শ্রেণীগুলো নিয়ন্ত্রণ করে তাদের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার উপর জনগণের পাল্টা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কায়েম করা।

 

 

 

যদি শুধু অর্থনীতি বা উৎপাদনের প্রয়োজনে কিংবা তা দিয়ে মানুষ সমাজবদ্ধ হত তা হলে পৃথিবীতে মানুষের একটাই সমাজ ও রাষ্ট্র হতে পারত। কিন্তু একই রকম অর্থনীতি কিংবা উৎপাদনের উপকরণ ও পদ্ধতি নিয়েও বিভিন্ন ধরনের সমাজ ও রাষ্ট্রই যে শুধু অবস্থান করে তাই নয় উপরন্তু এগুলোর ধর্ম, মতাদর্শ, মূল্যবোধ, সংস্কৃতি, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, দর্শন ইত্যাদিতেও থাকতে পারে বিরাট ব্যবধান, বিভিন্ন স্তরের অবস্থান।

 

সুতরাং একটা সমাজ গঠনের সহজ কোন ফর্মূলা বা সূত্র নেই। শুধু অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ দ্বারা একটা সমাজ গঠন করা যায় না। যেমন শুধু রাষ্ট্র বা ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ দ্বারাও একটা সমাজ গঠন করা যায় না। একটা নির্দিষ্ট সমাজ গঠনের জন্য প্রয়োজন হল নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ঐক্য অর্জন করা। এই ঐক্য আসে একটা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ থেকে। এই কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব একটা নির্দিষ্ট পদ্ধতি দ্বারা জনগোষ্ঠীর আস্থা, আনুগত্য, বাধ্যতা ও শৃঙ্খলা অর্জনের মাধ্যমে একটা নির্দিষ্ট সমাজ বা রাষ্ট্র গঠন করে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কর্তৃক সমাজে ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য যে নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গড়ে তুলতে হয় তা শুধু একটি পদ্ধতি হলে তা ব্যর্থ হতে বাধ্য হয়। সুতরাং সমাজ সংগঠন ও নিয়ন্ত্রণে একটা পদ্ধতি প্রধান হলেও তার পাশে বা অধীনে আরও কতোকগুলি পদ্ধতি কার্যকর থাকে সমাজ-সংগঠনকে রক্ষা করার জন্য। আমরা কিছু আগেই দেখেছি যে সব সমাজকে নিয়ন্ত্রণের বিশেষ একটা প্রধান পদ্ধতি নেই। কোনও সমাজে ধর্ম, কোনও সমাজে ক্ষমতা বা অস্ত্রশক্তি, কোনও সমাজে রাজনীতি, কোনও সমাজে অর্থনীতি সমাজকে গড়ে তোলার কিংবা নিয়ন্ত্রণ করার প্রধান কিংবা কেন্দ্রীয় পদ্ধতি হতে পারে। কিন্তু সেক্ষেত্রেও পাশে থাকে এক বা একাধিক নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি।

 

যারা সমাজকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে তারা সবাই কোন না কোন পদ্ধতিতে সমাজের উদ্বৃত্ত শ্রম ভোগ করে। এই শ্রম উৎপন্ন ও সেবা আকারে কেন্দ্রীভূত হয় তাদের হাতে বা তাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত কেন্দ্রে। সুতরাং তারা শোষক। কিন্তু শ্রম-শোষক হলেই কি সমাজ বা রাষ্ট্র শাসক হওয়া যায়? শাসক তারাই যারা সমাজকে শাসন করে বা শাসন ক্ষমতাকে প্রত্যক্ষ ও বৈধভাবে নিয়ন্ত্রণ করে।

 

অতীতে এ দেশে বণিকরা শ্রম-শোষক ছিল বৈকি। কিন্তু তারা কি রাষ্ট্র ক্ষমতায় কখনও ছিল? তাদের মধ্যে যারা খুব অর্থ ও প্রভাবশালী হত তারা রাষ্ট্র ক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারত। কিন্তু তাদের কোন বৈধ রাজনৈতিক অধিকার ছিল না। দেশ শাসনের প্রত্যক্ষ ক্ষমতার তো প্রশ্নই ওঠে না। মুসলিম যুগে প্রধানত বহিরাগত মুসলমান সামরিক ও বেসামরিক আমলা এবং রাষ্ট্রের অধিকারী অভিজাতরা ছিল প্রধান শাসক এবং মোল্লারা ছিল এই শাসকদের সহযোগী। হিন্দু যুগে ক্ষত্রিয়রা দেশ শাসন করত। ব্রাহ্মণ ও পুরোহিতরা ছিল ধর্ম ও সমাজ নেতা। এরা এই শাসনে সহযোগিতা দিত ধর্মের মাধ্যমে জনমত সৃষ্টি করে এবং শাসনেও নানাভাবে অংশ নিয়ে। অর্থাৎ ব্রাহ্মণ ছিল সহযোগী শাসক শ্রেণী। কিন্তু বণিকরা কোন দিনই রাষ্ট্র শাসনের অংশীদার সেই অর্থে ছিল না। শাসক তারাই যারা শাসন ক্ষমতার মাধ্যমে সমাজকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে। সব শ্রম-শোষক সর্বদা এই শাসক নাও হতে পারে। অর্থাৎ অর্থনৈতিক কোন শ্রেণী শাসক শ্রেণী হিসাবে দেখা নাও দিতে পারে। এমন কি এই শ্রেণীও জনগণের বিভিন্ন অংশের মতো রাষ্ট্রের শাসক শ্রেণী দ্বারা নিগৃহীত ও অত্যাচারিত হতে পারে।

 

সুতরাং মার্কসবাদ শ্রেণী ও শাসক শ্রেণী সম্পর্কে যে ধারণা সৃষ্টি করেছে তা থেকে আমাদের মুক্ত হওয়া দরকার। শাসক শ্রেণী সম্পর্কে ও তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম সম্পর্কে মার্কসবাদের যান্ত্রিক ও একপেশে ধারণা আমাদের দেশে সমাজ বিপ্লবের জন্য অপরিমেয় ক্ষতির কারণ হয়ে আছে।

 

মার্কসবাদ ধরে নিয়েছে যে, উৎপাদনের উপায়ের উপর ব্যক্তিগত মালিকানা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে যে শ্রমভেদ দেখা যায় তা থেকে আসে শ্রেণীভেদ আর  এইভাবে সমাজ বিভক্ত হয় শাসক ও শাসিতে, শোষক ও শোষিতে, অত্যাচারী ও অত্যাচারীতে। কিন্তু সমাজে শ্রেণীভেদের যে একটি মাত্র উৎস নেই তা আমরা দেখেছি। সমাজ সৃষ্টির সাথেই শ্রেণীভেদের সূত্রপাত। কারণ সংখ্যাগুরুর উপর সংখ্যালঘুর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা দ্বারা সমাজ সৃষ্টি হয়েছে। সমাজ নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ সমাজের যেমন অংশ তেমন তার ঊর্ধ্বেরও একটা শক্তি। আমরা দেখেছি সমাজের উপর এই নিয়ন্ত্রণ বিভিন্ন পদ্ধতিতে নেওয়া সম্ভব। এবং এই সঙ্গে এটাও দেখেছি একটা মাত্র পদ্ধতি দ্বারা সমাজকে নিয়ন্ত্রণ বা সংগঠিত করা যায় না। অপ্রধান বা সহযোগী হিসেবে আরও পদ্ধতির প্রয়োজন হয়। এই নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি দ্বারা গড়ে ওঠে শ্রেণী। অর্থাৎ একটা বিশেষ শ্রেণী গড়ে ওঠে বিশেষ নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি অবলম্বন করতে গিয়ে। কিন্তু এদের মধ্যে সর্বদা সবগুলিই শাসক শ্রেণী হয় না। অর্থাৎ সব শ্রেণী সমাজের প্রধান পরিচালক বা নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি হয় না।

 

সুতরাং শ্রম শোষণ করলেই সেই শ্রেণী শাসক হয় না। শাসক শ্রেণী হ’ল সেই শ্রেণী যে শ্রেণী সমাজের সামগ্রিক প্রক্রিয়ার, সমগ্র কর্মকাণ্ডের প্রধান নিয়ন্ত্রক, প্রধান পরিচালনাকারী, সমাজ শাসনের বৈধ অধিকারী। সুতরাং সমাজের সকল নিয়ন্ত্রক ও সুবিধাভোগী শ্রেণীগুলিকে একত্রে একটি বৃহত্তর নিয়ন্ত্রক শ্রেণী হিসাবে বলতে চাইলে শাসক ও শোষক শ্রেণী বলাই সঙ্গত।

 

বুর্জোয়ারা পুঁজিবাদী সমাজকে যে পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রণ করে সেটা দিয়ে তাদেরকে শোষক শ্রেণী বলা যায়, কিন্তু সেটা সর্বদা তাদেরকে প্রকৃত অর্থে শাসক শ্রেণী হিসাবে চিহ্নিত করে কি না সেই বিষয়টিও আমাদের ভাবা দরকার। শাসক শ্রেণী বিচারের মার্কসবাদী পদ্ধতির ফলে ইউরোপে প্রত্যক্ষ শাসনকারী আমলাতন্ত্রকে শাসক শ্রেণী হিসাবে দেখা হয় নি বরং তাকে দেখা হয়েছে এক সময়ে সামন্তের এবং পরবর্তীতে বুর্জোয়ার ভৃত্য ও অংশ হিসাবে। এই আমলা শ্রেণীর প্রধান ছিল রাজা বা রাণী। আর তাই ইউরোপে সামন্তবাদ শেষ হলেও বহু দেশেই গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার পাশে রাখা হয়েছে রাজতন্ত্র। এটা সেখানে আমলাতন্ত্র কিংবা প্রশাসনের নির্দিষ্ট ব্যবস্থার সঙ্গে শুধু পুঁজির নয় রাজনীতিরও আপোস।

 

গণতন্ত্রে রাজনীতি একটা নূতন শক্তি ও অর্থ নিয়ে দেখা দিয়েছে। রাজনীতি আগে ছিল রাজার রাষ্ট্র শাসনের বা ক্ষমতা পরিচালনার বিষয়। কিন্তু আজকের যুগে রাজনীতি হ’ল জনগণের সম্মতি নিয়ে বা মত সংগঠিত করে রাষ্ট্র পরিচালনা করার বিষয়। অর্থাৎ রাজনীতিকরা এখন এমন একটা শ্রেণী যারা আমলা নয়  এবং পুঁজিপতি বা ব্যবসায়ী হয়েও কিংবা না হয়েও রাষ্ট্র পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের জন্য জনগণের মত সংগঠিত করে। বস্তুত পাশ্চাত্যে আধুনিক গণতন্ত্রের বদৌলতে নূতন একটা শাসক শ্রেণী গড়ে উঠেছে যারা হ’ল রাজনীতিক।

 

একটু চিন্তা করলে আমরা দেখতে পাব এক অর্থে ইউরোপে মধ্যযুগ রূপান্তরিত হয়েছে আধুনিক যুগে। মধ্যযুগ নূতন রূপ নিয়ে এগিয়ে এসেছে। মধ্যযুগের ধর্মের স্থান নিয়েছে রাজনীতি। চার্চের স্থান নিয়েছে স্বাধীন জনমতের উপর নির্ভরশীল রাজনৈতিক সংগঠন। মধ্যযুগের ধর্মনেতা বা চার্চের মতো রাজনীতিক বা রাজনৈতিক সংগঠনসমূহ জনমতের সাহায্যে অধীনস্থ করেছে রাষ্ট্রকে। ভূস্বামী-সামন্তের স্থান নিয়েছে পুঁজিজিপতি। আর রাষ্ট্রের সামন্তবাদী ও রাজতন্ত্রী আমলা-প্রশাসকদের স্থানে এসেছে আধুনিক গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক এবং বুর্জোয়া ব্যবস্থার সংরক্ষক আমলা-প্রশাসক।

 

পশ্চিম ইউরোপে প্রধান শাসক শ্রেণী হ’ল জনগণের সমর্থন প্রাপ্ত রাজনীতিকরা। তারা সমাজ ও রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে রাজনীতির মাধ্যমে জনমত সৃষ্টি দ্বারা। এই রাজনীতিকরা অনেকে পুঁজিপতি হলেও রাজনীতির পেশা এবং পদ্ধতি ভিন্ন। এবং সেখানে চাকুরীরত অবস্থায় সামরিক কিংবা বেসামরিক আমলার পক্ষে রাজনীতি করা সম্ভব নয়। রাজনীতিকরা পুঁজিপতিদের বিভিন্ন গোষ্ঠীকে যেমন প্রতিনিধিত্ব করে তেমন প্রতিনিধিত্ব করে ভোটদাতা জনগণকেও। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের কর্মচারী বা আমলা শ্রেণীর স্বার্থেরও কিছু না কিছু প্রতিনিধিত্ব তাদেরকে করতে হয়। রাষ্ট্র, পুঁজি এবং শ্রমের দ্বন্দ্ব ও ঐক্যের ভারসাম্যের ব্যবস্থা হিসাবে সেখানে রাজনীতিক শ্রেণী গড়ে উঠেছে এবং এটাই সেখানকার প্রকৃত শাসক শ্রেণী। তবে সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবস্থার বিচারে আমরা এই শ্রেণীকে বুর্জোয়া বা পুঁজিপতি শ্রেণীর অংশ বলতে পারি। কিন্তু আমাদের এটাও বুঝতে হবে তারা সর্বদা পুঁজিপতি শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষাও করে না সেইভাবে। যে কারণে পাশ্চাত্যে বিভিন্ন পুঁজি বা শিল্প জাতীয়করণ নূতন ঘটনা নয়।

 

সুতরাং আমরা দেখছি মার্কসবাদ যত সহজ করে শ্রেণীকে উপস্থিত করছে অর্থনীতির যোগফল হিসাবে, এটা ততো সহজ নয়। অর্থনীতির সঙ্গে এর সমীকরণ সঠিক নয়। অর্থনৈতিক শ্রেণী গঠনের ফলেই তাই সর্বদা রাজনীতি আসে না। শ্রেণী গঠন ও শ্রেণী সংগ্রামের ভিতরে যদি রাজনৈতিক পদ্ধতি বা রাষ্ট্রক্ষমতার উপাদান না থাকে তবে তা কখনই রাজনৈতিক রূপ নিতে পারে না। ঐতিহাসিক কালে ভারতে অতীতে বণিক শ্রেণী কোন দিন রাষ্ট্র শাসনের স্বপ্ন দেখে নি। এবং এরা জনগণকে অত্যাচার করার বদলে নিজেরাই অনেক ক্ষেত্রে ছিল অত্যাচারিত। এমন কি বঙ্গের শ্রেষ্ঠ বণিক ও ব্যাংকার জগৎ শেঠ যাঁর হাতে ছিল নওয়াবের টাকশালের দায়িত্ব এবং যিনি গোটা নওয়াবী প্রশাসনকে যথেষ্ট পরিমাণে প্রভাবিত করতেন তিনিও নওয়াবের স্বেচ্ছাচারকে প্রতিরোধ করার উপায় পান নি। নওয়াব সরফরাজ খাঁর আদেশে তিনি তাঁর রূপসী পুত্রবধূকে বিধর্মী নওয়াবের রাজপ্রাসাদে পাঠাতে বাধ্য হয়েছিলেন।

 

মার্কসবাদী সূত্র অনুযায়ী শ্রেণী ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এ দেশে সব কিছুই তালগোল পাকিয়ে গেছে। এ দেশে অতীতে যেমন অর্থনৈতিক কোনও শ্রেণী শাসক শ্রেণী ছিল না তেমন আজও তারা অন্তত প্রাধান্যে নেই। মার্কসবাদীরা প্রাণপণে ট্রেড ইউনিয়ন বা পেশাভিত্তিক আন্দোলন করেছে শাসক শ্রেণীর বিরুদ্ধে জনগণের বিপ্লবী রাজনৈতিক আন্দোলন সংগঠিত করার জন্য। এ দেশে জমিদার, জোতদার কিংবা পুঁজিপতি কখনই এ দেশের প্রধান বা কেন্দ্রীয় শাসক শ্রেণী নয়। কাজেই এই সমস্ত আন্দোলন কখনই রাজনৈতিক আন্দোলন হয় নি বরং অর্থনৈতিক আন্দোলনেই শেষ হয়েছে। এইসব আন্দোলন যতই স্ফীত হোক রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপান্তরিত হয় নি, বরং এ দেশে যে রাজনীতিকরা শোষণ ও শাসনের প্রচলিত স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার সপক্ষে থেকেই শাসকদের প্রধান গোষ্ঠীর হাত থেকে শাসনভার নিজেদের হাতে নিতে চেয়েছে তারাই লাভবান হয়েছে এইসব অর্থনৈতিক আন্দোলনের চাপকে প্রধান শাসকের বিরুদ্ধে এবং নিজের পক্ষে ব্যবহার ক’রে।

 

মার্কসবাদীরা মনে করে অর্থনৈতিক সংগ্রাম খুব তীব্র ও ব্যাপক হলে পরিমাণগত পরিবর্তন থেকে গুণগত পরিবর্তনের নিয়মে তা বিপ্লবী রাজনৈতিক সংগ্রামে রূপান্তরিত হয়। কিন্তু মার্কসবাদীদের পরিমাণগত পরিবর্তন থেকে গুণগত পরিবর্তন কস্মিনকালেও ঘটে না। বিড়ালকে যতোই খাওয়ানো যাক এটা পুষ্টি পেয়ে বড় হ’তে হ’তে বাঘ হয় না, বড় জোর মোটা বিড়াল হয়। সুতরাং মালিকের বিরুদ্ধে এ দেশে শ্রমিক আন্দোলন খুব বেশী হলে দেশব্যাপী বেতন বাড়াও কিংবা সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির আন্দোলন হিসাবে ছড়িয়ে যায়। কিন্তু শাসন ক্ষমতা দখলের জন্য সশস্ত্র শ্রমিক অভুøত্থান বা সংগ্রামে পরিণত হয় না।

 

ইউরোপে অতীতে মজুরি-শ্রমিক অনেক সশস্ত্র বিপ্লবে অংশ নিয়ে লড়াই করেছে। কৃষকও সেখানে যুদ্ধে পিছিয়ে থাকে নি। কিন্তু এ দেশে মজুরি শ্রমিকরা কি সেভাবে তা করেছে? এ দেশে গ্রামীণ কিংবা শহুরে মজুরি-শ্রমিক প্রচলিত ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠনে রায় দিয়েছে ’৪৭-এ। কিংবা সাম্প্রদায়িক দাংগা করেছে। শহরের মজুরিজীবীও শিল্পজীবী কিংবা স্বাধীন কারিগর হবার তুলনায় গ্রামের বাড়ীতে জমি কেনার প্রতিই বেশী আগ্রহী হয়েছে। গ্রামের ভূমিভিত্তিক মজুরি-শ্রমিকের কথা বাদ দেওয়া যাক। শহরের মজুরি-শ্রমিকের মন-মানসিকতাতেও ইউরোপের শিল্পের মজুরি-শ্রমিকের সন্ধান কতোটা পাওয়া যায়?

 

এখানে মার্কসবাদ কথিত বা সংজ্ঞায়িত বুর্জোয়া বা পুঁজিপতি ভক্তির সাথে পীরের নির্দেশ নিয়ে শুভ দিনক্ষণ দেখে যে মিলাদের মাধ্যমে কারখানা কিংবা তার নূতন বিভাগের উদ্বোধন করে সেই মিলাদে শুধু বুর্জোয়াই নয় তার মজুরি-শ্রমিকও সমান উৎসাহে শরীক হয়। এবং এই বুর্জোয়ারও তার মজুরি-শ্রমিকের মতো শহরে কিংবা গ্রামে জমি কেনার দিকে সমান আগ্রহ। মধ্যযুগের ধর্মের চাপে ন্যূব্জ ও শাসকের ভয়ে সন্ত্রস্ত দাসানুদাস বণিক যেন এখানে বুর্জোয়া নাম নিয়ে দেখা দিয়েছে। এবং এই বুর্জোয়ার মধ্যে যেন ছায়া ফেলে আছে বহিরাগত হানাদার ও লুটেরা প্রশাসকের অংশীদারিত্ব। মধ্যযুগেও রাজা, নওয়াব ইত্যাদি শাসকদের অনেকেই বণিকদের ব্যবসার অংশীদার হ’ত নানাভাবে। আর এ দেশে আজো যেন সেই প্রাচীন নিরস্ত্র, অহিংস, ভাগ্যবাদী, নির্বিবাদী অথচ হুজুগে ও কূপমণ্ডুক শূদ্র কৃষক, কারিগর ও শিল্পী ধুতি, লেংটি বদলে প্যান্ট, লুঙ্গি, জামা পরিধান করে কারখানায় প্রবেশ করে, জমিতে উচ্চ ফলনশীল ধান চাষ করে। আর একটু ভালো করে লক্ষ্য করলেই এ দেশে এখনও দেখা যাবে মধ্যযুগের বহিরাগত ও বিজাতীয় হানাদার ও লুটেরা সামরিক প্রশাসক ও তার সহযোগী অসামরিক প্রশাসককে। তার রূপ অনেক বদলাতে পারে পোষাক আর ভাষার সঙ্গে। কিন্তু আজও যেন সেই সন্ত্রাসী বহিরাগত হানাদার সমরনায়ক শাসকই তার এক হাতে বিশেষ ধর্মগ্রন্থ আর এক হাতে অস্ত্র ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তার অস্ত্রে পরিবর্তন হয়েছে। তলোয়ারের বদলে সে হাতে নিয়েছে উন্নততর অস্ত্র বন্দুক। কিন্তু তার ধর্মগ্রন্থ অপরিবর্তিত। মোল্লারা আজও আছে তার এই শাসনকে ঐশ্বরিক অনুমোদন দিতে। তবে এখন এখানে আধুনিক যুগের চাপে রাষ্ট্র শাসনে একদল রাজনীতিককেও সাথে রাখতে হয়। তা না হ’লে শুধু মোল্লাদের অনুমোদন দ্বারা জনগণের সমর্থন লাভ হয় না। এই অবস্থার সঙ্গে পশ্চিম বঙ্গ বা ভারতের অবস্থার কিছু পার্থক্য আছে। তবে তাতে সেখানেও অবস্থার খুব বেশী হেরফের হয় নি।

 

 

 

মার্কস কিংবা এঙ্গেলস মানুষের জীবনে বস্তুগত উপকরণাদি উৎপাদন কিংবা অর্থনীতির যে গুরুত্বের কথা বলেছেন তার মধ্যেও সত্য আছে। মানুষের জীবনে, মানুষের মানুষ হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে তার বৈষয়িক উপকরণ উৎপাদনের ভূমিকা কিংবা শ্রমের ভূমিকা  আবিষ্কার নিঃসন্দেহে মার্কসের এক বিশাল ও মহান আবিষ্কার। কিন্তু এই একটিকেই সব কিছুর উৎস ভাবার ফলে এসেছে আবার ভ্রান্তি। এই বিষয়টিও আমাদের বোঝা অত্যাবশ্যক।

 

আমরা দেখছি শুধু উৎপাদন পদ্ধতি কিংবা অর্থনীতি দ্বারা সমাজ সংগঠিত হয় না। এমনকি উৎপাদন সংগঠিত ও রক্ষা করার জন্যও চাই সমাজ-সংগঠন। আবার এই সমাজ সংগঠনের জন্য চাই মানুষের ঐক্যের অনুভূতি জাগ্রত করতে বিভিন্ন দৈহিক, মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া। মানুষের জীবন এক জটিল প্রক্রিয়ার ফল। এখানে অনেকগুলি উপাদান ক্রিয়াশীল। এটা ঠিক যে, মানুষের বৈষয়িক উপকরণ ও বাস্তব অবস্থা মানুষের জীবন ও চিন্তা-চেতনাকে নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু এগুলির কোনও একটি মাত্র উপকরণ কিংবা সত্তা মানুষের জীবন ও চেতনার নিয়ামক নয়। একাধিক বা অনেকগুলি উপকরণ ও বাস্তবতা মানুষের জীবনে ক্রিয়াশীল থাকে বলেই মানুষের চিন্তারও একটা তুলনামূলক স্বাধীন অস্তিত্ব সম্ভব হয়। বাস্তব বিভিন্ন উপকরণ কিংবা উপাদানের ভিতরের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও ঐক্যের প্রক্রিয়ার ফলে মানুষের চেতনা শুধু বাস্তবের প্রতিচ্ছবি না হয়ে বাস্তবকে গ্রহণ করেই হয়ে উঠতে পারে বাস্তবের বাইরের বা ঊর্ধ্বেরও একটা শক্তি যা বাস্তবকে নিজের মধ্যে গ্রহণ করতে পারে নিজের মতো ক’রে। এর ফলে মানুষের চেতনায় ঘটতে পারে লাফ বা উল্লম্ফন। তখন মানুষ তার বাস্তব পরিস্থিতিকে অতিক্রম ক’রে এগিয়ে যেতে পারে এবং নিজের চেতনা অনুযায়ী বাস্তবকে রূপ দিতে চেয়ে তাকে পরিবর্তিত করে চলে সচেতনভাবে। মানুষ যদি শুধু উৎপাদন কিংবা উৎপাদন প্রক্রিয়ার ফল হ’ত তা হলে মানুষের চেতনার এই স্বাধীনতা আসতে পারত না। সেক্ষেত্রে মানুষের চেতনা হ’ত বাস্তবের প্রতিচ্ছবি মাত্র। নূতন করে কিছুই করা বা চিন্তা করা মানুষের পক্ষে সম্ভব হ’ত না।

 

এইভাবে মানুষের জীবনে এসে দেখা দিয়েছে তার চেতনার ভূমিকা। শুধু শ্রম নয় এই চেতনা দ্বারাও মানুষ মানুষ হয়েছে। প্রকৃতির অংশ হয়েও নিজেকে নিয়েছে প্রকৃতির বাইরেও। মানুষ যেন প্রকৃতির প্রতিরূপ। অচেতন প্রকৃতির সন্তান হয়েও এক স্বতন্ত্র ও সচেতন প্রকৃতি। আর এইভাবে মানুষ এমন এক সত্তা যাকে দিয়ে কিছু করতে হ’লে তার চেতনাকে ক্রিয়াশীল করতে হয়। এই চেতনায় ঐক্য না এলে সমাজ গঠিত হয় না। এই চেতনাকে ক্রিয়াশীল করা না গেলে মানুষের হাত কিংবা দেহ কাজ করে না। ভয়, পীড়ন, লোভ, কাম, ক্ষুধা, প্রেম, বিশ্বাস, আশা, সহানুভূতি, ঘৃণা ইত্যাদি প্রবৃত্তি ও উপাদানগুলি এই চেতনাকে তথা মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে। সমাজ গঠনে কিংবা মানুষের জীবনের নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া গঠনে এক এক পরিস্থিতিতে এগুলির মধ্যে বিশেষ একটা উপাদান প্রধান ভূমিকা নিতে পারে। কিন্তু সবগুলিই কোন না কোন রূপে ক্রিয়াশীল থাকে। এগুলি দ্বারা মানুষের চেতনার নির্দিষ্ট ধরন গড়ে ওঠে। এইভাবে মানুষের চেতনার প্রকাশ হিসাবে দেখা দেয় সংস্কৃতি। সমাজ সংগঠন, উৎপাদন প্রক্রিয়া ও পরিচালনা, প্রজনন ও যৌনতা থেকে শুরু করে সবকিছুর ক্ষেত্রে এক প্রচণ্ড শক্তি হিসাবে দেখা দেয় সংস্কৃতি। অর্থনীতি বা বস্তুগত উৎপাদন দ্বারা অনেক কিছু বুঝেও শেষ পর্যন্ত কিছুই বোঝা যায় না, যদি মানুষের চেতনার প্রকাশ হিসাবে সংস্কৃতির সমস্যাকে বোঝা না যায়। অনেক কিছু বুঝেও কিছুই বোঝা যায় না যদি বোঝা না যায় মানুষের ব্যক্তিগত সমস্যা, মানসিকতার জটিলতা, তার আবেগ-অনুভূতির সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম সমাবেশগুলিকে। স্থূল ও যান্ত্রিক বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গীর ফলে চেতনার গুরুত্ব আড়াল হয় বলে সমাজ গঠনে কিংবা পরিবর্তনে আদর্শের ভূমিকাও আর বোঝা যায় না।

 

মার্কসবাদীরা মার্কসবাদের কল্যাণে বুর্জোয়া আর প্রলেতারিয়েত খুব ভালোভাবে বুঝলেও এ দেশের কিছুই বুঝতে পারে না। এ দেশে যাদেরকে বুর্জোয়া বলা হয় সেই কংগ্রেস, মুসলিম লীগ কিংবা আওয়ামী লীগ কৃষক-শ্রমিককে রাজনৈতিক আন্দোলনে অনেক বেশী জমায়েত করতে পেরেছে রাষ্ট্র ক্ষমতার প্রশ্নে সোজাসুজি তাদের মতো করেই বক্তব্য দেবার জন্য। শ্রেণী সংগ্রাম যদি রাজনৈতিক সংগ্রাম হয়ে থাকে তবে মার্কসবাদীরা এই দেশে যাদেরকে বুর্জোয়া কিংবা সামন্ত-মুৎসুদ্দি ইত্যাদি বিশেষণে ভূষিত করেছে প্রধানত তারাই এ দেশে শ্রেণী সংগ্রাম করেছে, মার্কসবাদীরা নয়। হাঁ, মার্কসবাদীরা শ্রেণী সংগ্রাম করেছে কিন্তু সেটা অর্থনৈতিক শ্রেণী সংগ্রাম, যারা এ দেশে রাষ্ট্র ও সমাজ নিয়ন্ত্রণের প্রধান বা কেন্দ্রীয় শক্তি নয় সেই সব অর্থনৈতিক শ্রেণীর বিরুদ্ধে মার্কসবাদীদের বিশুদ্ধ অর্থনৈতিক সংগ্রাম। তাই এ দেশে মার্কসবাদীরা সাধারণভাবে রাজনৈতিক আন্দোলনে গৌণ বা অপ্রধান শক্তি হিসাবে থাকতে বাধ্য এবং তাদের সকল আন্দোলন রাষ্ট্র ক্ষমতার কিংবা রাষ্ট্র ক্ষমতাজাত সুযোগ-সুবিধার প্রত্যাশী এবং ধনিকদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বা প্রভাবিত রাজনৈতিক দলগুলোর অধীনস্থ কিংবা সহায়ক হ’তে বাধ্য।

 

 

 

অবশ্য প্রশ্ন আসতে পারে যে, মার্কসবাদের শ্রেণীতত্ত্ব নিয়েই তো বহু দেশে সমাজ ও রাষ্ট্র বিপ্লব হয়েছে, সমাজ প্রগতি অর্জন হয়েছে। তাহলে কেন আমাদের দেশে তা সফল হ’ল না? এটা দীর্ঘ আলোচনার দাবী করে। তবু এখানে খুব সংক্ষেপে আমরা এর উত্তর পেতে চেষ্টা করব।

 

মার্কসবাদ যে পশ্চিম ইউরোপে বুর্জোয়া শ্রেণীর বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণীর বিপ্লবের তত্ত্ব দিয়েছিল সেখানেই তা ব্যর্থ। এর সহজ কারণ এই যে, সমাজ প্রগতির জন্য সর্বহারা শ্রেণীর বিপ্লবের যে তত্ত্ব মার্কস-এঙ্গেলস দিয়েছিলেন তা সেখানকার প্রয়োজন বা আকাঙ্ক্ষা পূরণ করে নি, এমনকি শ্রমিক শ্রেণীরও নয়। অর্থাৎ মার্কসবাদ শ্রমিক শ্রেণীর মতবাদ নয়। বরং এটা সমাজ নিয়ন্ত্রণের একটা বিশেষ পদ্ধতি যার দ্বারা সৃষ্টি হয় নূতন শাসক শ্রেণী। এই শাসক শ্রেণী মার্কসবাদী বা কমিউনিস্ট দর্শনকে অবলম্বন ক’রে সমাজ থেকে ব্যক্তি মালিকানা উচ্ছেদ করে, সমাজকে শিল্পায়িত ও আধুনিক করে এবং রাজনৈতিক শাসক শ্রেণী হিসাবে রাষ্ট্রকে নিজ অধিকারে নেয়। রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকে উৎপাদনের সমস্ত উপায় এবং এগুলির ব্যবস্থাপনায় থাকে যে আমলা শ্রেণী তাও থাকে এই কমিউনিস্ট রাজনৈতিক শাসক শ্রেণীর অধীনে। এই সমাজের প্রধান নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি হ’ল কমিউনিস্ট আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি। এটা ইউরোপের অতীতের কেন্দ্রীভূত ক্যাথলিক চার্চের ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির অনুরূপ একটা আধুনিক নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি। রাষ্ট্রীয় আমলাতান্ত্রিক পদ্ধতি হ’ল এই পদ্ধতির অধীনস্থ ও সহযোগী। তবে উৎপাদন পরিচালনার ভার থাকে প্রত্যক্ষভাবে আমলাতন্ত্রের হাতে। ফলে কমিউনিস্ট শাসক শ্রেণী আমলাতন্ত্রের উপর নির্ভরশীল শ্রেণীতে পরিণত হয়।

 

পশ্চিম ইউরোপ এই ধরনের সামাজিক নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির বদলে গড়ে তুলেছে এমন এক নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি যেখানে থাকে একদলীয় রাজনীতির বদলে বহুদলীয় রাজনীতি এবং এই বহুদলীয় রাজনীতির সহযোগী ও অধীনস্থ হিসাবে ব্যক্তি মালিকানায় এবং প্রয়োজনে রাষ্ট্রীয় মালিকানায়ও পুঁজি এবং রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও সেনাবাহিনী তথা আমলাতন্ত্র। পশ্চিম ইউরোপের এই ব্যবস্থাই সম্প্রসারিত হয়েছে পশ্চিম ইউরোপীয়দের নূতন বাসভূমি কানাডা, আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ইত্যাদি দেশে।

 

মার্কসবাদের সর্বহারা শ্রেণীর মতবাদ ততোটাই শ্রমিক শ্রেণীর মতবাদ যতোটা শ্রমিক শ্রেণীর মতবাদ হ’তে পারে যে কোনও বুর্জোয়া মতবাদ। অর্থাৎ সমাজকে যে নিয়ন্ত্রণ করে সে যে নামই নিক নিজে কখনই শ্রমিক হ’তে পারে না। শ্রমিকের সমর্থন পেলেই সেটা শ্রমিক হয় না। আর শ্রমিক বা জনগণের সমর্থন না পেলে নূতন কোনও শক্তিই ক্ষমতা দখল করতে বা প্রাধান্য অর্জন করতে পারে না। জনসমর্থন পেলেই সেটার নেতৃত্ব বাস্তবে শ্রমজীবী জনগণের হয় না, যদিও তাতে থাকতে পারে শ্রমজীবী জনগণের স্বার্থেরও প্রতিফলন। তাছাড়া শ্রমজীবী জনগণের সমর্থন নিয়েও অসংখ্য মানবতাবিরোধী ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি পৃথিবীতে বিজয়ী হয়েছে।

 

আজকের পরিচালক বা শাসক অতীতের শ্রমিক হ’তে পারে। কিন্তু সে যখন পরিচালক বা শাসক হয় তখন সে শ্রমিক নয়। তখন সে শ্রমিক হিসাবে সমাজকে পরিচালনা করতে পারে না। একটা ব্যবস্থার অধীনে সমাজ পরিচালনায় সে শ্রমিক তথা সমাজ সদস্যদের পরামর্শ বা মত নিতে পারে। শ্রমের ব্যবস্থাপনায় শ্রমিকের মত প্রতিফলনের একটা পদ্ধতি গড়ে তোলা যায় বটে। কিন্তু ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব আর শ্রমিকের শ্রম এক নয়। তবে ব্যবস্থাপনা দ্বারা শ্রমিক যাতে নির্যাতিত ও বঞ্চিত না হয় তার জন্য ব্যবস্থাপনায় শ্রমিকের মত প্রতিফলনের পদ্ধতি গড়া যায়। ইউরোপে শ্রমিক, মালিক, রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী-দার্শনিক সবাই নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক সংগ্রাম ও ঐক্যের মাধ্যমে এই ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। ফলে মার্কসবাদের সমাজ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ইউরোপের শ্রমিকেরও প্রয়োজন হয় নি, বুর্জোয়া, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিকের জন্যও প্রয়োজন হয় নি।

 

এইভাবে আমরা ইউরোপে এমন এক বুর্জোয়া সমাজ পাচ্ছি যেটা শুধু অর্থনীতির দিক থেকে ‘বুর্জোয়া’ নয়, সংস্কৃতির দিক থেকেও অর্থাৎ দর্শন, দৃষ্টিভঙ্গী, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি ক্ষেত্রেও ‘বুর্জোয়া’। আর তাই ইউরোপের শ্রমিকও এই অর্থে বুর্জোয়া। কাজেই সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার মার্কসীয় ‘সর্বহারা’ বা ‘শ্রমিক’ পদ্ধতি সে গ্রহণ করে নি।

 

অর্থনীতিকে ভিত্তি হিসাবে দেখাতে চাইলেও কিংবা উৎপাদন ও শ্রমশক্তির কাঁধে সওয়ার হলেও প্রকৃতপক্ষে মার্কসবাদের শ্রমিক বা সর্বহারা একটা অর্থনৈতিক শ্রেণী নয়, এটা মূলত একটা দৃষ্টিভঙ্গীর প্রতিনিধি। এটা সমাজ ও রাষ্ট্র শাসন এবং উৎপাদনের একটা নির্দিষ্ট পদ্ধতির প্রতিনিধি। কাজেই আমরা বলতে পারি মার্কসবাদ এবং কমিউনিজম দেয় একটা বিশেষ সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতি দ্বারা মার্কস-এঙ্গেলস ইউরোপের শ্রমিক ও জনগণকে সংগঠিত ও নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিলেন।

 

এ দেশে বুর্জোয়া পদ্ধতি এবং সংস্কৃতি এ দেশের প্রয়োজন পূরণ করতে পারছে না, বরং এটা এ দেশের জনগণের অনুন্নয়ন, পরদাসত্ব ও অশেষ দুঃখের কারণ হয়ে আছে। এমনকি যাকে বুর্জোয়া বলা হয় তাও এখানে ইউরোপীয় অর্থে বুর্জোয়া হতে পারছে না এখানকার বিশেষ পরিস্থিতি এবং এ দেশে বুর্জোয়ার আগমন বা প্রবেশের নির্দিষ্ট পদ্ধতির কারণে। তাই এ দেশে বুর্জোয়া ব্যবস্থা ব্যর্থ। ইউরোপের উপনিবেশবাদের লুটেরা আমলা ও বণিকের কাঁধে সওয়ার হয়ে যে বুর্জোয়া এ দেশে এসেছে তা নিজের বিকৃতি ও পঙ্গুত্ব দিয়ে এ দেশ ও সমাজকে করেছে বিকৃত ও পঙ্গু।

 

এইভাবে মার্কসবাদের পদ্ধতি ও সংস্কৃতি, সর্বহারা শ্রেণীতত্ত্ব এ দেশের বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খায় না বলে তা এখানে সমস্যাগুলোকে যেমন বুঝতে সাহায্য করে না তেমন এখানকার সমাজের উন্নয়নকামী চেতনার দরজা খুলতে পারে না বলে জনগণের মনের ভিতরে ঢুকতে ও জায়গা নিতেও পারে না। এ দেশে যে বিশেষ ধরনের সামাজিক নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গড়ে উঠেছে সেই নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে এ দেশের সকল দুঃখ, গ্লানি ও বিকৃতির মূল উৎস। এই নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির দ্বারা এ দেশে যে শ্রেণীগুলি সমাজ ও ব্যাপক জনগণের সকল দুঃখ, গ্লানি ও বিকৃতির বিনিময়ে নিজেরা ভোগ করছে সুখ, সম্মান ও ক্ষমতা সেই শ্রেণীগুলিকে উৎখাত করা ছাড়া এই দেশ ও জাতির মুক্তি ও উন্নয়ন অসম্ভব। আর এর জন্য প্রয়োজন হ’ল এ দেশের এই নিয়ন্ত্রক শ্রেণীগুলি কর্তৃক সমাজ, রাষ্ট্র ও জনগণের উপর নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতিগুলিকে চিহ্নিত ও ব্যাখ্যা করা। তবেই আমরা দেশ, জাতি ও জনগণের মুক্তি, উন্নয়ন, সুখ, গৌরব ও প্রগতির জন্য প্রয়োজনীয় পাল্টা সামাজিক নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি খুঁজে পাব।

 

যেসব সমাজ মার্কসবাদের সাহায্যে প্রয়োজনীয় শিল্পোন্নয়ন ও সামাজিক রূপান্তর অর্জন করেছে, সেইসব সমাজের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা হিসাবে, দর্শন হিসাবে মার্কসবাদের কার্যকরতা ছিল বলে সেটা সম্ভব হয়েছে। মার্কসবাদের সাহায্যে এইসব সমাজ বিপুল উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি অর্জন করেছে। আজ এইসব সমাজে যে গণ-বিপ্লব ও বিদ্রোহ দেখা দিয়েছে তা মার্কসবাদের বিরুদ্ধে হতে পারে কিন্তু সমাজ প্রগতির বিরুদ্ধে নয়। সমাজ সেইসব দেশে আরও এগিয়ে যেতে চাইছে। কমিউনিস্ট দলের অধীনে একদলীয় পদ্ধতিতে সেইসব সমাজ যে সমৃদ্ধি ও বিকাশ অর্জন করেছে এখন সেখানকার জনগণ এই সমৃদ্ধি ও বিকাশকে কমিউনিস্ট স্বৈরতন্ত্র থেকে মুক্ত করে তাকে বন্ধ্যাত্ব ও স্থবিরতা মুক্ত এবং আরও প্রবল, বেগবান ও সর্বজনীন করতে চাইছে মাত্র। অর্থাৎ মার্কসীয় সমাজতন্ত্র আজ অগ্রসরমান গণতন্ত্রের দিকে। শিল্প-প্রযুক্তি ও শিক্ষা-সংস্কৃতির বিপুল বিকাশ দাবী করে এই গণতন্ত্রকে। পাশ্চাত্যও এই গণতন্ত্র অর্জন করেছে বলে তার প্রয়োজন হয় না ‘সর্বহারার একনায়কত্বের’ দর্শনের। এমন কি মার্কস যে বুর্জোয়ার বিরুদ্ধে লড়েছিলেন সেই বুর্জোয়াও আর সেই রূপ নিয়ে ইউরোপে নেই। জনগণের দীর্ঘ সংগ্রাম ও সর্বজনীন ভোটাধিকার অনেক আগেই সেই বুর্জোয়ার মৃত্যু ঘটিয়েছে। পরিবর্তিত বুর্জোয়ার নেতৃত্বে এবং নূতন চেতনায় সমুন্নত কর্মী, চিন্তাবিদ ও রাজনীতিকদের নেতৃত্বে সেখানে শিল্প ও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের উত্তাল জোয়ার সমস্ত সমাজকে প্লাবিত ও পুনর্সংগঠিত করে চলেছে। কিন্তু তার ফলে সেখানে বুর্জোয়ার একনায়কত্ব গড়ে ওঠে নি বরং ক্রমেই বিকশিত হয়েছে একটা কম বা বেশী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা।

 

আমাদের সমাজের মূল সমস্যা ব্যাপক শিল্পায়ন এবং আধুনিক, বৈজ্ঞানিক ও লোকবাদী শিক্ষা-সংস্কৃতির সর্বাত্মক প্রসার ঘটানো। যে মতবাদ বা আদর্শ এবং ব্যবস্থা দেশটাকে দ্রুত শিল্পায়িত ও শিক্ষিত-সংস্কৃত করবে তা-ই এই মুহূর্তে আমাদের প্রয়োজন। এটা কথিত বুর্জোয়া শ্রেণী ও তার আদর্শ যেমন করতে পারে না তেমন পারে না মার্কসীয় সর্বহারা শ্রেণী ও তার তত্ত্বও। বিশেষত এ দেশে সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যে প্রচণ্ড বিপ্লব প্রয়োজন তা পূরণের সাধ্য মার্কসবাদী তত্ত্বে নেই তার অর্থনীতিবাদী দৃষ্টিভঙ্গীর কারণেও। এ ছাড়া ইসলামের অতিকেন্দ্রীভূত বা নিরঙ্কুশ একত্ববাদী চেতনাকে মার্কসবাদী সর্বহারার একত্ববাদ দিয়ে ভাঙ্গা সম্ভব নয়। উপরন্তু এ দেশে হাজার হাজার বৎসর ধরে বর্ণজাতি ব্যবস্থাকে অবলম্বন করে যে বিশেষ আর্থ-সামাজিক কাঠামো ও সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে তার স্বরূপ উন্মোচনের ক্ষমতা মার্কসবাদের আয়ত্ত বহির্ভূত। এই বিশেষ পরিস্থিতি দ্বারা সংগঠিত মানুষের চেতনার কাছে মার্কসবাদ আবেদন রাখবে কেমন করে?

 

সুতরাং আজ প্রয়োজন আমাদের সমাজের জন্য নিজস্ব ও স্বতন্ত্র ব্যাখ্যা ও দৃষ্টিভঙ্গীর যা এই সমাজের সমস্যা ও বাস্তবতাকে বুঝতে আমাদেরকে প্রকৃতভাবে সাহায্য করবে এবং সাহায্য করবে মুক্তি অর্জন করতে। অর্থাৎ আজ আমাদের প্রয়োজন হল আমাদের সমাজ বিপ্লবের নিজস্ব তত্ত্ব সংগঠিত করার।

 

রচনাঃ ৬-৯ ডিসেম্বর, ১৯৮৯

 

উদ্ধৃতিসমূহের উৎসঃ

১। কার্ল মার্কস-ফ্রেডারিক এঙ্গেলস, রচনা সংকলন, প্রথম খণ্ড, প্রথম অংশ, বিদেশী ভাষায় সাহিত্য প্রকাশনালয়, মস্কো। পৃষ্ঠাঃ ২৬-২৭

২। ঐ। পৃষ্ঠাঃ ৩৩

৩। ঐ। পৃষ্ঠাঃ ২০

৪। কার্ল মার্কস তাঁর Critique of Political Economy (1859) এর ভূমিকায় বলছেন,‘In the social Production of their means of exsistence, men enter into definite, necessary relations which are independent of their will, productive relationships which correspond to a definite stage of development of their material productive forces. The aggregate of those productive relationships constitutes the economic structure of society, the real basis on which a juridical and political superstructure arises and to which definite forms of social consciousness correspond. The mode of production of the material means of existance conditions the whole process of social, political and intellectual life.’

৫। কার্ল মার্কস-ফ্রেডারিক এঙ্গেলস, রচনা সংকলন। পৃষ্ঠাঃ ৩৪

 

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
Archive