Banner
কাশ্মীর : ইসলামের প্রসার এবং সূফীদের সন্ত্রাস ─ এম,এ, খান

লিখেছেনঃ এম,এ, খান, আপডেটঃ August 1, 2012, 3:48 PM, Hits: 1968

 

কাশ্মীরে কীভাবে ইসলাম এসেছিল? এই প্রশ্নের উত্তর আসে যে, সূফীদের শান্তিপূর্ণ মিশনারী প্রচারের মাধ্যমে কাশ্মীরে ইসলাম এসেছিল। কিন্তু সত্য হচ্ছে এই যে, সূফীদের কল্যাণে কাশ্মীরের হিন্দুদের জন্য বাস্তবতা ছিল ভয়াবহ এবং ধ্বংসাত্মক।

---------------------------------------------------------------------------------------

কাশ্মীরে কীভাবে ইসলাম এসেছিল? এই প্রশ্নের উত্তর আসে যে, সূফীদের শান্তিপূর্ণ মিশনারী প্রচারের মাধ্যমে কাশ্মীরে ইসলাম এসেছিল।

পৃথিবী ব্যাপী শান্তিপূর্ণভাবে ইসলাম প্রচারের জন্য সর্বজনীনভাবে সূফীদেরকে কৃতিত্ব দেওয়া হয়। এক কিংবদন্তী অনুযায়ী কাশ্মীরে কোন এক সময় একজন রাজা ছিলেন যার কোন ধর্ম ছিল না। একদিন তিনি ঠিক করলেন যে তিনি কোন একটি ধর্ম গ্রহণ করবেন। মুসলমান এবং হিন্দু উভয় দলই রাজাকে স্বধর্মে দীক্ষিত করতে এল। অতঃপর রাজা উভয় পক্ষের পরসপর বিরুদ্ধ বক্তব্য শুনে বিভ্রান্ত হলেন এবং ঠিক করলেন যে, “পরদিন সকাল বেলায় তিনি প্রাসাদ থেকে রাস্তায় বেরিয়ে যে ব্যক্তিকে প্রথম দেখবেন তিনি তার ধর্ম গ্রহণ করবেন।” (Chapter 2, Baharistan-i-Shahi, an anonymous 17th-century Persian book on the history of Kashmir, translated by Prof. K. N. Pundit)। এবং পরদিন রাজা একজন দরবেশের প্রথম দেখা পেলেন এবং এভাবে কাশ্মীর ইসলামে প্রবেশ করল।

অনেক জায়গাতে এই ধরনের কিংবদন্তী প্রচলিত আছে যে, একজন সূফী তার অলৌকিক ক্ষমতাবলে অথবা অন্য কোনভাবে সেখানকার রাজাকে দীক্ষিত করেছিলেন। এইভাবে ঐ স্থান শান্তিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করে এবং ইসলামের এই শান্তিপূর্ণ প্রচারের জন্য সূফীদেরকেই ধন্যবাদ দিতে হয়।

আমার একজন কাশ্মীরী বন্ধু ইসলামের বর্বর শিক্ষার জন্য ইসলামের উচ্ছেদ চাইলেও আমাকে বলেছিলেন এই বর্বর চরিত্র সত্ত্বেও কীভাবে সূফীদের শান্তিপূর্ণ প্রচারের মাধ্যমে কাশ্মীরে ইসলাম এসেছিল। বর্তমানে ইসলামের সেই শান্তিময় উপত্যকা কীভাবে বর্বরতার ভূমিতে পরিণত হয়েছে? এর জন্য তিনি দায়ী করেছেন ওয়াহাবী মতবাদকে, যেটা তার মতে কুরআন ও নবীর প্রকৃত ইসলাম।

কাশ্মীর এবং সারা পৃথিবী ব্যাপী সূফীদের শান্তিপূর্ণ প্রচারের মাধ্যমে ইসলাম প্রসার লাভ করেছে - এই ধারণা মুসলিম এবং অমুসলিম পণ্ডিতদের মধ্যে সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত। ইসলামের একজন খ্যাতনামা পণ্ডিত ও ঐতিহাসিক এবং সূফীদের উপরে বিশেষজ্ঞ হিসাবে পরিজ্ঞাত ডঃ য়োগিন্দর সিকান্ত্‌কে জিজ্ঞাসা করুন, তিনি এই কথাই বলবেন।

সহজে পাওয়া যায় এমন সব ঐতিহাসিক দলিল থেকে ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেলেও এই ধারণাই সফলভাবে এবং একচেটিয়াভাবে প্রচারিত হয়ে চলেছে।

কাশ্মীরে ইসলামী শাসন কখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেটা জানা কঠিন। ৭১৫ খ্রীষ্টাব্দে মুহামমদ বিন কাসিম কাশ্মীর আক্রমণের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। তারপর থেকে কাশ্মীর অনেকগুলি ইসলামী আক্রমণের শিকার হয়। মুসলমানরা যাকে নিয়ে গর্ব করে কিন্তু যিনি বর্বর-শ্রেষ্ঠ ছাড়া আর কিছু নন সেই সুলতান মাহমুদও সেখানে একটি ব্যর্থ অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। হিন্দু অঞ্চলগুলির বিরুদ্ধে ধর্মযুদ্ধ পরিচালনার জন্য খলীফা আল মনসুর (৭৫৫-৭৪) হাশাম বিন আমরুর নেতৃত্বে একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। কান্দাহার এবং কাশ্মীরের মধ্যে বহু স্থান তিনি দখল করেন, তিনি “কাশ্মীরকে পদানত করে বহু সংখ্যক বন্দী ও দাসকে নিয়ে যান” [Elliot & Dawson, History of India as Told by Its Historians (এতে মুসলমানদের দ্বারা লিপিবদ্ধ ঘটনাপঞ্জি থেকে বিভিন্ন অংশ নেওয়া হয়েছে )Vol 203Vol. 1. p. 122-23, 203]। সুলতান মাহমুদের পুত্র সুলতান মাসুদ তার পিতার মত কীর্তিমান ছিলেন না। ১০৩৩ খ্রীষ্টাব্দে তিনি তার পিতার ব্যর্থতার প্রতিকারের উদ্দেশ্যে “কাশ্মীরের সুরসুতি দুর্গ আক্রমণ করেন। নারী ও শিশু বাদে দুর্গের সকল সৈন্যকে হত্যা করা হয় এবং জীবিত নারী ও শিশুদেরকে দাস হিসাবে নিয়ে যাওয়া হয়।”

এটা বলা কঠিন যে এ সকল অভিযানের মধ্যে কোনটি দ্বারা কাশ্মীরে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তবে ইসলামীকরণে ইসলামের কথিত শান্তির প্রবক্তা সূফীদের যে একটা প্রধান ভূমিকা ছিল সে কথা বলা যায়। কিন্তু সেটা ছিল বর্বরোচিত।

কাশ্মীরে জনগণের ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে আমরা যে ধারণা পাই সেটা হচ্ছে এ রকম যে, ১৩৭১ অথবা ১৩৮১ সালের দিকে একজন বিখ্যাত সূফী দরবেশ বা সাধু সাঈদ আলী হামদানী কাশ্মীরে প্রবেশ করেন, এবং তার সঙ্গে ইসলামও কাশ্মীরে প্রবেশ করে। তিনি প্রথম যে কাজ করেছিলেন সেটা হচ্ছে “একটি ছোট মন্দির যেটাকে ধ্বংস করা হয়েছিল” সেই জায়গার উপর তার খানকা (আস্তানা বা আশ্রম) স্থাপন করা (Baharistan, p. 36)। তার আগমনের পূর্বে শাসনকারী সুলতান কুৎবুদ্‌-দীন ইসলামী আইন বলবৎ করার ব্যাপারে খুব সামান্যই মনোযোগ দিয়েছিলেন। কাশ্মীরের সহনশীল হিন্দু সংস্কৃতি ও আচার-আচরণের ভিতরে সুলতান থেকে কাজী পর্যন্ত সমাজের সকল স্তরের মুসলমানরা নিমজ্জিত হয়ে গিয়েছিল (Baharistan, p. 37) 37।

কিন্তু সূফী দরবেশ সাঈদ হামদানী কাশ্মীরী মুসলমানদের এই সকল কার্যকলাপ দেখে আতঙ্কিত হন, এবং তিনি ইসলামী নিয়ম পালনে শৈথিল্য দূর করে গোঁড়া ইসলাম প্রবর্তনের চেষ্টা করেন। শাসক কুৎবুদ্‌-দীন তার ব্যক্তিগত জীবনে ইসলামী গোঁড়ামি অনুশীলন করার চেষ্টা করেন, কিন্তু “আমীর সাঈদ আলী হামদানীর ইচ্ছা এবং আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী ইসলাম প্রচারে ব্যর্থ হন” (ঐ)। এর ফলে সূফী দরবেশ পৌত্তলিক সংস্কৃতি, আচার-অনুষ্ঠান এবং ধর্ম শাসিত দেশে বাস করতে না চেয়ে কাশ্মীর ছেড়ে চলে যান।

পরবর্তী কালে তার পুত্র আরেক বিখ্যাত সূফী দরবেশ আমীর সাঈদ মুহামমদ বিখ্যাত প্রতিমা ধ্বংসকারী সুলতান সিকান্দারের শাসনকালে কাশ্মীরে আগমন করেন। সুলতান সিকান্দার পবিত্র সূফী দরবেশ সাঈদ মুহামমদের আগমনের পূর্ব পর্যন্ত এতটা বর্বর ছিলেন না। সূফী দরবেশ কাশ্মীরে ইসলামী আইন কার্যকর করার জন্য সিকান্দারকে প্রণোদিত করেন। সুলতান কুৎবুদ্‌-দীন সূফী দরবেশের নির্দেশনা না মানলেও সিকান্দার তা মেনে নিতে রাজী হন। এইভাবে কাশ্মীর থেকে মূর্তিপূজা এবং তার প্রবক্তাদের সকল চিহ্ন মুছে ফেলার জন্য সিকান্দার এবং সূফী সাধক সাঈদ মুহামমদ ঐক্যবদ্ধ হন।

দিল্লীর সুলতানের একজন ঐতিহাসিক মুহামমদ ফারিশতার (মৃত্যু- ১৬১৪) মত অনুযায়ী (History of the Rise of the Mahomedan Power in India, Vol. 1V. 1997, imprint, p. 268) সিকান্দার আদেশ জারী করেন :      “.... কাশ্মীরে মুসলমান ছাড়া অন্য কোন ধর্মের অনুসারীর বসবাস বেআইনী ঘোষণা ক’রে; এবং তিনি চান যাতে কেউ কপালে কোন চিহ্ন না দেয়। .... সবশেষে তিনি সকল স্বর্ণ ও রৌপ্য নির্মিত প্রতিমা ভাঙ্গার এবং সেগুলি গলিয়ে ধাতব মুদ্রায় পরিণত  করার উপর জোর দেন। অনেক ব্রাহ্মণ তাদের ধর্ম অথবা দেশ ত্যাগের পরিবর্তে বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেন। কেউ কেউ বাসভূমি ত্যাগ করে দেশান্তরী হন, কেউ কেউ বিতাড়নের শাস্তি এড়ানোর জন্য মুসলমান হন। ব্রাহ্মণরা দেশান্তরী হলে সিকুন্দুর (সিকান্দার) কাশ্মীরের সকল মন্দির ধ্বংস করার নির্দেশ দেন। .... কাশ্মীরের সকল প্রতিমা ধ্বংস করে তিনি ’প্রতিমা ধ্বংসকারী’ এই উপাধি অর্জন করেন।”

আরেকটি সপ্তদশ শতাব্দীর পারসীয় বিবরণ HM Chaudurah-এর Tarikh-i-Kashmir-এ বলা হচ্ছে, সিকান্দার “অবিশ্বাসীদেরকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস সাধনের কাজে অবিরামভাবে ব্যস্ত ছিলেন এবং  অধিকাংশ মন্দির ধ্বংস করেছিলেন” Tra(Trans. Razia Bano, Delhi, 1991, p. 55)।

এটাই হচ্ছে বিদ্বান ফারিশতার নিকট সুলতান সিকান্দারের সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি। এর জন্য আসল কৃতিত্ব কার?  এই প্রশ্নের উত্তরBaharistanBaharistanBaharistan Baharistan-i-Shahii-এর গর্বিত লেখকের কথা থেকেই বের করে নিন যিনি লিখছেন, “... এই ভূমির বাসিন্দাদের বিবেকের আয়না থেকে নাস্তিকতা এবং সত্য ধর্মে অবিশ্বাসের চিহ্ন পর্যন্ত মুছে ফেলার কৃতিত্ব” সূফী দরবেশ সাঈদ মুহামমদের (ঐ, পৃঃ ৩৭)।

প্রতিমা ধ্বংসকারীর পুত্র আমীর খান (আকা আল্লী শাহ্‌) কাশ্মীরে হিন্দু নিধন অব্যাহত রাখেন। ফারিশতা বলেন, “এরপরেও যে সামান্য কিছু সংখ্যক ব্রাহ্মণ তাদের স্ব-ধর্মে অটল ছিলেন তাদেরকে নির্যাতন করেন এবং যারা ইসলাম গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন তাদের সকলকে হত্যা করেন। এরপরেও যারা কাশ্মীরে ছিলেন তাদের সকলকেই সেই রাজ্য থেকে বিতাড়ন করেন” (ঐ, পৃঃ ২৬৯)।

এরপর উদার এবং সহিষ্ণু সুলতান জয়নুল আবেদীন (১৪২৩-১৪৭৪) নিগৃহীত অমুসলমানদের জন্য স্বস্তির নিঃশ্বাস ফিরিয়ে আনেন। তিনি ধর্মীয় স্বাধীনতাকে অনুমোদন দেন, এমনকি জবরদস্তিমূলকভাবে      ধর্মান্তরিত হিন্দুদেরকেও তাদের নিজ ধর্মে ফিরে যেতে দেন। এটা হিন্দু ধর্মের সমৃদ্ধি ঘটতে সাহায্য করে, “যা কিনা প্রতিমা ভগ্নকারী সুলতান সিকান্দারের ইতিপূর্বেকার শাসনকালে উচ্ছেদ হয়েছিল” (ঐ, পৃঃ ৭৪)। সিডনি ওয়েন বলছেন ভিন্ন ধরনের মানুষ জয়নুল আবেদীনের শাসনাধীনে, “অনেক হিন্দু (অর্থাৎ জবরদস্তির মাধ্যমে ইসলামে দীক্ষিত হিন্দুগণ) হিন্দু ধর্মে প্রত্যাবর্তিত হয়”  (From Mahmud Ghazni to the Disintegration of Mughal Empire, Delhi, p. 127)| Baharistan-i-Shahi-এর আতঙ্কিত লেখক সুলতান জয়নুল আবেদীনের অধীনে হিন্দুধর্মের উত্থান এবং ইসলাম ধর্মের পতনের কথা উল্লেখ করেন (পৃঃ ৭৪) ঃ

“... অবিশ্বাসীরা এবং তাদের দুর্নীতিগ্রস্ত ও অনৈতিক আচার-আচরণ এতটাই জনপ্রিয়তা অর্জন করে যে, এমনকি এ দেশের উলেমা (জ্ঞানী সম্প্রদায়), সাইয়ীদ (সমভ্রান্ত) এবং কাজীগণও (ইসলামী বিচারক) এগুলির কোন রকম বিরোধিতা করার পরিবর্তে বরং এগুলি পালন করতে শুরু করেন। তাদেরকে নিষেধ করার মত কেউ ছিল না। এর ফলে ইসলাম ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং এর অনুশাসন ও নীতিমালা পালনে শিথিলতা দেখা দেয়; প্রতিমা পূজা এবং দুর্নীতিগ্রস্ত ও অনৈতিক আচার-অনুষ্ঠান বিস্তার লাভ করে।”

আকবরের মত সুলতান জয়নুল আবেদীন ধার্মিকদেরকে অগ্রাহ্য ও ক্রুদ্ধ করে সকল ধর্মের প্রতি তার উদার কর্মনীতি অনুসরণ করেন। উদাহরণ হিসাবে পারস্য দেশীয় পণ্ডিত মুল্লা আহমদের চিঠির কথা উল্লেখ করা যায় যেখানে তিনি তাকে স্মরণ করিয়ে দেন,

“... তাদের উপর জিযিয়া কর আরোপের প্রধান উদ্দেশ্যই হচ্ছে তাদেরকে অপমান করা।... তাদেরকে অপমানিত করার জন্যই ঈশ্বর জিযিয়া কায়েম করেছিলেন। উদ্দেশ্য হচ্ছে তাদের অবমাননা এবং মুসলমানদের মর্যাদা ও সমমান (প্রতিষ্ঠা)” (Quted by KS Lal, Theory and Practice of Muslim State in India, p.113))।

কিন্তু মালিক রাইনা এবং কাজী চাকের রাজত্বকালে কাশ্মীরের অমুসলিমদের উপর পুনরায় সন্ত্রাস নেমে এল। তারা হিন্দুদেরকে তলোয়ার দ্বারা ইসলামে ধর্মান্তরিত করলেন। এবার উস্কানীদাতা ছিলেন আরেক সূফী দরবেশ আমীর শামসুদ্‌-দীন মুহামমদ ইরাকী, যিনি কিনা কাশ্মীরে আগত সর্বশ্রেষ্ঠ সূফী সাধক হিসাবে পরিচিত।

মালিক মুসা রাইনা ১৫০১ সালে কাশ্মীরের প্রশাসক হবার পর মুহামমদ ইরাকী কাশ্মীরে আগমন করেন, এবং তার সঙ্গে জোট বেঁধে ও তার পৃষ্ঠপোষকতা ও কর্তৃত্ব নিয়ে যা করেন সে সম্পর্কে Baharistan-i-Shahi (p. 93-94))-তে বলা হয়েছেঃ

“আমীর শামসুদ্‌-দীন মুহামমদ সকল মূর্তিপূজার গৃহ পাইকারীভাবে ধ্বংস করেন এবং সেই সঙ্গে নাস্তিকতা ও অবিশ্বাসের ভিত্তিমূল পর্যন্ত সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত করেন। মূর্তিপূজার প্রতিটি গৃহ ধ্বংস করার পর ইসলামী কায়দায় উপাসনা করার জন্য তার উপর মসজিদ নির্মাণ করার আদেশ দেন।”

এবং “শামসুদ্‌-দীন ইরাকীর অনুরোধে মুসা রাইনা আদেশ জারী করেন যে, প্রত্যেক দিন ১৫০০-২০০০ অবিশ্বাসীকে মীর শামসুদ্‌-দীনের অনুসারীরা তার বাড়ীর দরজার সামনে নিয়ে যাবে, তারা তাদের পবিত্র সূতা খুলে ফেলবে, তাদেরকে কলেমা (ইসলামের মূল মন্ত্র) পড়াবে, খৎনা করবে এবং গরুর মাংস খাওয়াবে”; এবং এইভাবে “বলপ্রয়োগ এবং বাধ্যতাপূর্বক ২৪০০০ (চব্বিশ হাজার) হিন্দু পরিবারকে ইরাকীর ধর্মবিশ্বাস গ্রহণ করানো হল (কাহ্‌রান ওয়া যাবরান)” (ঐ, পৃঃ ১০৫-১০৬)।

যখন সুলতান মুহামমদ শাহের অধীনে ১৫১৯ খ্রীষ্টাব্দে মালিক কাজী চাক সেনানায়ক হলেন তখন সাধু সুলভ ইরাকী তার ভয়াবহ কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখলেন। Baharistan-i-Shahi (p. 116)-তে বলা হয়েছে ঃ “তিনি (কাজী চাক) আমীর শামসুদ্‌-দীন মুহামমদ ইরাকীর যে একটা প্রধান নির্দেশ কার্যকর করেন সেটা হল এ দেশের অবিশ্বাসী ও বহুদেবতাবাদীদেরকে পাইকারীভাবে হত্যা।”এই নিহতদের মধ্যে এমন অনেকেই ছিল যারা মালিক রাইনা কর্তৃক জোরপূর্বক ইসলামে ধর্মান্তরিত হলেও পরবর্তী সময়ে বহুদেবতাবাদ (হিন্দুধর্ম)-এ ফিরে গিয়েছিল। মুসলমানরা এই গুজব ছড়িয়ে দিয়েছিল যে, এই ধর্মত্যাগীরা “পাছার নীচে পবিত্র কুরআন রেখে তার উপর বসেছিল।” এটা শুনে সূফী দরবেশ ক্রুদ্ধ হয়ে কাজী চাকের নিকট এই বলে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন (ঐ, পৃঃ ১১৭) ঃ

“এই মূর্তি পূজারী সম্প্রদায় ইসলামী ধর্মবিশ্বাস গ্রহণ ও তাতে আত্মসমর্পণ করার পর এখন ধর্মভ্রষ্টতা ও ধর্মদ্রোহে ফিরে গেছে। এখন যদি আপনি নিজে শরীয়ার বিধান অনুযায়ী শাস্তি (ইসলামে ধর্মদ্রোহের শাস্তি হচ্ছে মৃত্যু) না দেন এবং তাদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গ জনিত শাস্তি না দেন তাহলে আমার নিকট স্বেচ্ছা নির্বাসনে যাওয়া প্রয়োজনীয় ও বাধ্যতামূলক হবে।”

লক্ষ্য করুন যে, কুরআন অবমাননার যে অভিযোগের কথা বলা হয়েছে ইরাকী তার উল্লেখ মাত্র করছেন না, বরং তিনি একবার ইসলাম গ্রহণের পর হিন্দুদের দ্বারা তা পুনরায় পরিত্যাগ করার কথা বলছেন ইসলামে যার শাস্তি হচ্ছে মৃত্যু। বাহারিস্তান-ই-শাহী (Baharistan-i-Shahi)-তে বলা হচ্ছে, ক্রুদ্ধ সূফী দরবেশকে শান্ত করার জন্য মালিক কাজী চাক “অবিশ্বাসীদেরকে পাইকারীভাবে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন।” আশুরার পবিত্র পর্বের দিনকে এইভাবে হত্যার দিন হিসাবে ধার্য করা হয় (মুহররম, ১৫১৮ সাল; ইরাকী ছিলেন শিয়া)। বাহারিস্তান-ই-শাহীতে আরও বলা হচ্ছে ঃ

“... প্রায় শাতশত থেকে আটশত অবিশ্বাসীকে হত্যা করা হয়। যাদেরকে হত্যা করা হয় তারা ছিলেন সেই সময় অবিশ্বাসীদের সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব” (পৃঃ ১১৭)।

Baharistan-i-Shahi-এর গর্বিত লেখক আরও বলছেন, “তরবারির মুখে কাশ্মীরে অবিশ্বাসী ও বহুদেবতাবাদীদের সমগ্র সম্প্রদায়কে ইসলামে দীক্ষিত হতে বাধ্য করা হল। এটা মালিক কাজী চাকের একটা প্রধান কীর্তি” (পৃঃ ১১৭)।

এই ভয়ঙ্কর কাজের নির্দেশ যিনি দিয়েছিলেন তিনি কিন্তু মহান সূফী দরবেশ ব্যতীত আর কেউ নন।

সূফীদের আসল চরিত্র তুলে ধরার জন্য আমার আর কিছু বলার প্রয়োজন নাই। ভারতে শান্তিপূর্ণভাবে ইসলাম প্রসারের সর্বশ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত হিসাবে মুসলমানরা যে কাশ্মীরকে ঢাকঢোল পিটিয়ে জাহির করে সেই কাশ্মীরের অবস্থা হচ্ছে এই! চমৎকার শান্তিপূর্ণ পদ্ধতি বটে! এবং এটাই হচ্ছে মুসলিম পৃথিবী থেকে ভারতে আগত সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ সূফীদের কীর্তি-কাহিনী।

ভারতের অন্য সর্বশ্রেষ্ঠ সূফীদের কাহিনীও এর চেয়ে ভাল কিছু নয়। অবিশ্বাসীদের উপর নরমেধ যজ্ঞ চালাবার জন্য তারা তাদের সঙ্গে নিয়ে আসত নিকৃষ্ট জিহাদী যোদ্ধাদেরকে।

আজমীরে মঈনুদ্দীন চিশতি এসেছিলেন মুহামমদ ঘৌরীর সেনাবাহিনীর সঙ্গে, যে ঘৌরী বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ণভাবে মানবিক ও মহানুভব রাজা পৃথ্বীরাজ চৌহানকে পরাজিত করেছিলেন।

নিজামুদ্দীন আউলিয়া মূলতানে এক জিহাদে অংশ নিয়েছিলেন নাসিরুদ্দীন কিবচার সঙ্গে থেকে।

বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সূফী দরবেশ শেখ জালাল সিলেটের হিন্দু রাজা গৌর গোবিন্দের বিরুদ্ধে জিহাদী যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন।

এবং এই সমস্ত সূফীই ঐসব রক্তাক্ত যুদ্ধে জয়লাভের ক্ষেত্রে নিজেদের ভূমিকাকে নির্ধারক হিসাবে দাবী করেছেন। এবং এইভাবে ভারত থেকে আফ্রিকা এবং আফ্রিকা থেকে বলকান পর্যন্ত সর্বত্র শ্রেষ্ঠ সূফীদের অধিকাংশেরই কাহিনী হচ্ছে এই একই রকম যুদ্ধ, বলপ্রয়োগ ও রক্তপাতময়।

--------------------------------------------------------------------------------------------------

* সূফীদের লোকহর্ষক কার্যকলাপ সম্পর্কে আরও বিস্তারিতভাবে জানার জন্য দেখুন আমার বই, Islamic Jihad: A Legacy of Forced Conversion, Imperialism, and Slavery, p. 115-133. --  লেখক

---------------------------------------------------------------------------------------------------

(নিবন্ধটি M. A. Khanhan-এরKashmir: Propagation of Islam and Terror of the Sufiss-এর বাংলায় ভাষান্তর। মূল ইংরাজী নিবন্ধটি ইসলাম ওয়াচ (www.islam-watch.org )-এ ৩০ আগস্ট, ২০০৯ তারিখে প্রকাশিত হয়। এম, এ, খান ইসলাম ওয়াচের সম্পাদক এবং Islamic Jihad: A Legacy of Forced Conversion, Imperialism, and Slavery-এর লেখক। - -- বঙ্গরাষ্ট্র)

অনলাইন :  ২ নভেম্বর, ২০০৯

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
Archive