Banner
বাঙ্গালী জন-চরিত্রের কিছু নমুনা বিশ্লেষণ (সম্পূর্ণ বই এক সাথে)

লিখেছেনঃ আজাহারুল ইসলাম , আপডেটঃ July 30, 2012, 12:01 PM, Hits: 1529

(২৩ নভেম্বর, ২০০৮ থেকে ১০ এপ্রিল, ২০০৯ পর্যন্ত সময়ে পাঁচ সংখ্যায় বঙ্গরাষ্ট্রে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত লেখাটিকে গ্রন্থাকারে এক সাথে প্রকাশ করা হল। – বঙ্গরাষ্ট্র)

 

(১) নমুনা – ’৬৯

১৯৬৯ সালে আইয়ূব বিরোধী আন্দোলনের সময়ে ফরিদপুর শহরে সংঘটিত একটি মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় সংঘটিত এক গণ-অভুথানের বিশ্লেষণই হচ্ছে এই নমুনার প্রতিপাদ্য বিষয়।

১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারী ঢাকার অন্যতম ছাত্রনেতা শহীদ আসাদের বর্বর হত্যাকাণ্ডের পর সেই দিনই ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন)-এর তৎকালীন দপ্তর সম্পাদক নূরুল হাসান ফরিদপুর ছাত্র ইউনিয়ন জেলা সেক্রেটারী বরাবর সংক্ষিপ্ত একটা জরুরী টেলিগ্রাম পাঠান আসাদ হত্যার খবর সহ ছাত্র আন্দোলন জোরদার করার আহ্বান জানিয়ে। টেলিগ্রাম পরদিন দুপুর নাগাদ ফরিদপুরে পাওয়ার এক ঘন্টার মধ্যেই জেলার উপস্খিত নেতৃবৃন্দ পরদিন সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হরতাল ও মিছিলের সিদ্ধাìত গ্রহণ করে এবং তার প্রস্তুতির জন্য তাৎক্ষণিকভাবে মাইকের সাহায্যে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে মোড়ে মোড়ে পথসভা পরিচালনা করে। পরদিন ফরিদপুর শহরের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীবৃন্দ বেরিয়ে এসে মিছিলে শরীক হয়। আইয়ূব সরকার সমর্থক এন, এস, এফ, এবং ইসলামী ছাত্র সংঘ ব্যতীত সব ছাত্র সংগঠনই এতে যোগদান করে। এভাবে ফরিদপুর শহরে শুরু হওয়া আন্দোলন ক্রমান্বয়ে সারা জেলার সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শহর-বন্দর-বাজারে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষের অনেকেরই সমর্থন থাকলেও সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ তখনও পর্যìত আন্দোলনে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করে নাই।

তবে একটি ঘটনা এই অবস্খার পরিবর্তন ঘটায়। সেটি হল সূফী হত্যা। তৎকালীন সময় পর্যìত মানুষ-হত্যার ঘটনা খুব কম ঘটত বিধায় যে কোন হত্যাকাণ্ডই ব্যাপক আলোচনায় আসত। কিন্তু সূফী হত্যাকাণ্ড ফরিদপুর শহরে একটা গণ-অভ্যুথানের সৃষ্টি করে, যা আমার জানা মতে গত ৪০ বছরে আর ঘটে নাই। সূফীর সংক্ষিপ্ত পরিচয় ও ঘটনার বিবরণ নীচে দেওয়া হ’ল।

সূফী হচ্ছে ঘটনার নায়কের ডাক নাম, যাকে তৎকালে ফরিদপুর শহরের প্রায় সবাই চিনত একজন সৎ, সাহসী, চরিত্রবান ও অন্যায়ের প্রতিবাদী শক্তিমান যুবক হিসাবে। যতদূর মনে পড়ে তার বাবার নাম সৈয়দ সিদ্দিক আহম্মদ। তিনি তখন অবসরে। পূর্বে সম্ভবত জজকোর্টের কোন করণিকের পদে চাকুরি করতেন। চাকুরি থেকে অবসরের পর তৎকালে টাইপ রাইটার মেশিন নিয়ে কোর্ট এলাকায় বাইরে বসে সংসার চালাবার জন্য কিছু বাড়তি উপার্জন করতেন। সৎ-চরিত্রবান লোক বলে শহরে তার পরিচিতি ছিল। সিদ্দিক সাহেবের মেঝ ভাই কবি ফররুখ আহম্মদ তখন ঢাকায় থাকতেন। বিখ্যাত কবি ছিলেন। তাঁদের পৈত্রিক নিবাস ছিল ফরিদপুর জেলার পশ্চিম প্রাìেত কামারখালী নদী বন্দর-বাজারের পশ্চিম পাড়ে, বর্তমান মাগুরা জেলার মাঝাইল গ্রামে।

সিদ্দিক সাহেবের দুই ছেলের মধ্যে সূফী ছিল ছোট। সূফী প্রথমে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে চাকুরি নিয়ে তৎকালে কিছুদিন পশ্চিম পাকিস্তানে ছিল। সেখানে চাকুরিরত অবস্খায় পাঞ্জাবী এক সেনা সদস্যের অন্যায় ব্যবহারে অতিষ্ঠ হয়ে তাকে মারপিট করে। ফলস্বরূপ তার কোর্ট মার্শাল হয়। বিচারে সূফীর বেত্রদণ্ডের শাস্তি হয় এবং চাকুরি চলে যায়। ফলে সে বাড়ী ফিরে এসে বাবার সাথে বাড়ীতেই বসবাস করতে থাকে।

তৎকালীন সাবেক ফরিদপুর জেলার মুসলিম লীগের সেক্রেটারী ছিলেন সোবান মোল্লা। খুব স্বল্প শিক্ষিত, পাশেই পদ্মার চরের বেশ কিছু ভূ-সম্পত্তির মালিক। জোতদার পরিবার। পদ্মার চরের লাঠিয়াল-সর্দারদের একজন চালক। নিজের সর্দারী-মেজাজ। তারপর দশ বছর ধরে এক টানা ক্ষমতার অধিকারী আইয়ূব খানের দলের জেলা সেক্রেটারী। শাসকদের নানাবিধ দুষ্কর্মের উচ্ছিষ্ট ভোগী। রাজনৈতিক ক্ষমতার কারণে অফিস পাড়াতেও তার দুর্দাìত প্রতাপ। শহরের সরকার সমর্থক ছাত্র সংগঠন এন, এস, এফ-এর মদদ দাতা – পৃষ্ঠপোষক। তার বাড়ীও শহর সংলগ্ন উত্তর প্রাìেত গুহ লক্ষীপুর গ্রামে।

এ হেন ক্ষমতাধর সোবান মোল্লা সূফীদের মহল্লার হিন্দু পাড়ায় নানাবিধ অত্যাচার চালাত। বিশেষ করে হিন্দু পরিবারের যুবতী মেয়েদের উপর তার খারাপ দৃষ্টি ছিল। তার চোখে লাগলে সে মেয়ের রক্ষা ছিল না। তার এ জাতীয় অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে অনেক পরিবারই সে সময় নীরবে দেশ ত্যাগ করে পশ্চিম বঙ্গে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিল। তাদের কারো কারো বাড়ীও নানাভাবে মোল্লা দখল করেছিল।

কিন্তু সূফী তার মহল্লার হিন্দু পাড়ায় সোবান মোল্লার এ জাতীয় কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। মহল্লায় এলে ছোবান মোল্লাকে সে বাধা দেয়। কয়েকবার সংঘর্ষ হয়। সোবান মোল্লা প্রতিবারই পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। বেশ কয়েকবার পরাজয়ের পর সোবান মোল্লা মরীয়া হয়ে সূফীকে হত্যার প্রস্তুতি নেয়। চরাঞ্চল থেকে বেছে বেছে সাহসী লাঠিয়াল সর্দারসহ এন, এস, এফ-এর নেতৃস্খানীয় মাস্তান সহযোগে তার বাহিনী তৈরী করে। ঘটনার দিন ফজরের নামাজ শেষে সূফী যখন বাড়ীর অদূরে রাস্তা দিয়ে আসছিল, ঝিলের দক্ষিণ পার্শ্বে চৌরঙ্গীর মোড়ে পূর্ব পরিকল্পনা অনুসারে চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলে ভেলা, বল্লম ও সড়কি দিয়ে প্রথমে দূর থেকে আঘাত করতে থাকে। সূফী চিৎকার দিয়ে মাটিতে পড়ে যায়। তখন চারিদিক থেকে ঘিরে ধরে নির্মমভাবে রামদা ও তরবারি দিয়ে কুঁপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে ঘাতক বাহিনী সরে যায়।

শহরে ©ুত খবর ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমে সবাই হতবাক ও হতভম্ব হয়ে যায়। ভীত-সন্ত্রস্ত ভাব দেখা যায়। ঘটনার প্রায় দেড়-দুই ঘন্টা পর তৎকালীন ফরিদপুর জেলার ভাসানী নেতৃত্বাধীন ন্যাপের জেলা সেক্রেটারী এডভোকেট শামসুল বারী মিঞা মোহন সামান্য কয়েকজন যুব কর্মীসহ একটি মাইক বের করে শহরবাসীকে রাস্তায় বেরিয়ে এসে এ হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের আহ্বান জানাতে থাকেন। অল্পক্ষণেই যেন শহরবাসী জেগে উঠল। প্রথমে কিছু লোক রাস্তায় নেমে তার সাথে যোগ দেয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই লোকসংখ্যা বাড়তে থাকে। ঘন্টাখানেকের মধ্যেই বিপুল সংখ্যক লোক জড়ো হয়। প্রতিবাদ মিছিল শুরু হয়। ক্রমান্বয়ে শহর ও শহরতলীর গ্রামগুলো থেকে ছাত্র-যুবকসহ আবাল-বৃদ্ধ জনতা মিছিলে শামিল হয়। মিছিলের রোষ ক্রমেই রুদ্রমূর্তি ধারণ করে। দেখতে দেখতে গণ- বিস্ফোরণের সৃষ্টি হল।

মিছিলের উপর উদ্যোক্তাদের কোন নিয়ন্ত্রণ থাকল না। দলমত নির্বিশেষে সবাই উত্তাল জনতায় পরিণত হল। মুসলিম লীগ ও জামাত বাদে সব দলের কর্মী ও ছাত্র সংগঠনের কর্মীসহ সবাই একাকার। জনতার মাঝ থেকে আওয়াজ উঠল, "চলো সোবান মোল্লার বাড়ী।' দেখতে দেখতে মিছিল সোবান মোল্লার বাড়ী পৌঁছে গেল। স্বাভাবিকভাবেই মিছিল আসার খবর পেয়ে সোবান মোল্লা পালিয়ে গেছে। জনতা মুহূর্তের মধ্যে তার বাড়ীতে ব্যপকভাবে ভাঙ্গচুর শুরু করে এবং আগুন ধরিয়ে দেয়। পুলিশ খুব দ্রুত ঘটনা স্খলে যায় এবং সেখান থেকে অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার করে। বাড়ীর পাহারাদার লোকজনকে ধরে জনতা পুলিশের কাছে হস্তাìতর করে। তারপর শহরের মাঝখানে সোবান মোল্লার সমর্থক মুসলিম লীগের লোকজনের বাড়ী ভাঙ্গচুর করে।

জনগণ যেন মরীয়া হয়ে গেছে। সেই রকম সময় তৎকালীন ফরিদপুরের আওয়ামী লীগ নেতা ইমামউদ্দিন আহম্মদ হঠাৎ ঘোষণা দেয় শহর থেকে প্রায় আড়াই তিন মাইল দূরে পাল বাড়ীতে ঘাতকরা লুকিয়ে আছে। অথচ মজার ব্যাপার হল পালবাড়ীর সব ছেলে-পেলে প্রথম থেকেই মিছিলের সঙ্গে। এবং প্রথম যারা মাইক বের করে তার সঙ্গেও সেই বাড়ীর কয়েকটি ছেলে প্রথম থেকেই যুক্ত ছিল। এবং প্রথম যার নেতৃত্বে মাইক বের করা হয়েছিল সেই মিঞা মোহনও ঐ বাড়ীর জামাই। এবং অভিযুক্ত এন, এস, এফ,-এর পাণ্ডাদের কখনই পালবাড়ীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিল না। বরং সেই বাড়ীর ছেলেরা সবাই ছাত্র ইউনিয়নের সক্রিয় কর্মী, নেতা এবং সমর্থক ছিল। পালবাড়ীর ছেলেরাসহ ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজের বেশ কিছু শিক্ষকও এর বিরোধিতা করে বলেন এটা বানোয়াট কথা। তা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ নেতা ও কর্মীদের প্ররোচনায় মিছিল এগিয়ে চলে পালবাড়ীর উদ্দেশ্যে।

কলেজের শিক্ষক ও শহরের বুদ্ধিজীবীদের বিরোধিতা সত্ত্বেও মিছিল এগিয়ে যায়। টেপা খোলার ঘাট যেখানে স্বাধীনতার পর লেক ও বেড়িবাঁধ তৈরী হয়েছে, সেখানে মরা নদী ছিল – যা শুকনা মৌসুমে হেঁটে পার হওয়া যেত। মিছিলের সামনের একটা অংশমাত্র অন্য পাড়ে উঠেছে এবং বাকী অংশের কিছু নদীর মধ্যে ও কিছু অংশ শহরের দিকের পাড়ে। তখন মিছিল সংশ্লিষ্ট পাল বাড়ীর ছেলেরা চলতে চলতেই নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে হঠাৎ বলে উঠল "পালবাড়ীতে চরের হাজার হাজার লোক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মিছিল আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হয়েছে, সেখানে গেলে বিপদ হবে। শিগ্গির পালাও।' চিৎকার দিয়ে এই কথা বলে কিছু লোক একসঙ্গে উল্টো দিকে অর্থাৎ শহরের দিকে ছুটতে শুরু করল। মিছিল থমকে গেল এবং পর মুহূর্তেই শহরের দিকে ছুটতে শুরু করল। আওয়ামী লীগের নেতা ইমামউদ্দিনসহ আওয়ামী লীগের কিছু কর্মী যারা মিছিলের সামনে থেকে এই সময়ে নেতৃত্ব দিয়েছিল – তারা সামান্য কিছু লোকসহ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে শহরের দিকে ফিরে যেতে বাধ্য হল।

উপরে উল্লেখিত ঘটনাটা আমাদের জাতীয় বা জন চরিত্র উপলব্ধির ক্ষেত্রে বেশ কিছু শিক্ষা দেয়। যেমন :

(১) হঠাৎ বড় ধরনের আঘাত পেলে সাধারণ বাঙ্গালী হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে। যেমন সূফীর এ ধরনের বিপদ হতে পারে এ কথা কেউ আগে ভাবে নাই, তাই হঠাৎ অপ্রত্যাশিত এ শক্ত আঘাতে সবাই প্রথম একেবারে হতভম্ব হয়ে পড়েছিল। এটা বাঙ্গালী চরিত্রের একটা দুর্বলতা।

(২) বাঙ্গালী চরিত্রের একটা গুণ হল সাহসের জায়গা পেলে অর্থাৎ সাহসী নেতৃত্ব পেলে অতিদ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে প্রতিশোধের জন্য মরীয়া হয়ে ওঠে। বাঁধ ভাঙ্গা জোয়ারের মত অথবা হঠাৎ কাল-বৈশাখী ঝড়ের মত ভয়ঙ্কর রূপ নিতে পারে যা হয়তো আগে থেকে ভাবা কষ্টকর। এখানে মিঞা মোহনের নেতৃত্বে মাইকে আহ্বান শোনার পর দ্রুত তারা সাহস সঞ্চয় করে বেপরোয়া হয়ে ওঠে প্রতিশোধের জন্য।

(৩) এই রকম সময়ে অর্থাৎ কাল-বৈশাখীর মত মরীয়া হয়ে ওঠার সময় তারা বিচার-বুদ্ধির চেয়ে আবেগে তাড়িত হয় বেশী। অনেকটা নেশায় পাওয়া মানুষের মত। হুজুগে একজন কিছু বলল – সে কথার যৌক্তিকতা বিচার না করেই, অনেক সময় নির্বোধের মত সেদিকেই ছোটে – এটা বাঙ্গালী চরিত্রের আর একটা দুর্বলতা।

(৪) বিপদ দেখলে, পিছটান দিতেও তারা সিদ্ধহস্ত। তখন পরিকল্পিত মোকাবিলা নয় – যে কোন ভাবে নিজেকে বাঁচাতে ব্যস্ত হয়।

(৫) উপরে উল্লেখিত আন্দোলনটি সংগঠিত করার ক্ষেত্রে প্রথমে বামপন্থী সংগঠনের নেতা ও কর্মীরা মিঞা মোহনের নেতৃত্বে সাহসী ভূমিকা পালন করলেও দেখা গেল – ক্রমান্বয়ে বিপুল জন-সমাগমের পর তাদের হাতে আর নেতৃত্ব থাকল না। নেতৃত্ব চলে গেল আওয়ামী লীগ নেতাদের হাতে। এই নেতৃত্ব বদলের কারণ বুঝতে হলে ঐ সময়ে ঐ এলাকার সামাজিক ক্ষমতার বিন্যাস বুঝতে হবে। ঐ সময় পর্যìত সামাজিক ক্ষমতার প্রধান অংশের নিয়ন্ত্রণ ছিল মুসলিম লীগ নেতা সোবানের হাতে। অন্য একটি অংশ ছিল আওয়ামী লীগ নেতার হাতে। এরা ছিল বিদ্যমান সামাজিক কাঠামোর স্বাভাবিক নেতৃত্ব। আর বামপন্থীরা ছিল বিদ্যমান সামাজিক কাঠামো বিরোধী আঘাতকারী অংশ। প্রথমে বামপন্থীরা বিদ্যমান নেতৃত্বের প্রধান অংশকে আঘাত করার ফলে সমাজের স্বাভাবিক নেতৃত্বের কাঠামোতে শূন্যতা তৈরী হল। যখন বিপুল সংখ্যায় জনসমাগম হল তখন এই শূন্যতা পূরণের জন্য বিদ্যমান সামাজিক কাঠামোর অপ্রধান অংশ আওয়ামী লীগ এগিয়ে এল এবং প্রধান অংশে পরিণত হল। বিপুল সংখ্যক পশ্চাৎপদ জনগণ একত্রিত হলে তাদের নেতৃত্ব পশ্চাৎপদই হয়, কোন অগ্রসর চেতনার মানুষ নয়। এর কারণ বিদ্যমান ব্যবস্খা বিরোধী অগ্রসর চেতনার রাজনীতির প্রতি সমাজ অবতলের সাধারণ মানুষের অনাগ্রহ, তাদের চেতনার মানের সীমাবদ্ধতা। ফলে তারা প্রচলিত সামাজিক ধারার নেতৃত্বের প্রতি অনুগত থাকে।

 


 

(২) নমুনা – ’৭১

এ সমাজে তিক্ত সত্যের মুখোমুখী দঁড়াবার মত মানুষ খুবই কম। সুতরাং ’৭১-এর আলোকোজ্জ্বল দিকটিকেই মাত্র তুলে ধরা হয়। খণ্ডিত এবং এমনকি অনেক ক্ষেত্রেই খুব ক্ষুদ্র এক সত্যকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বিরাট করে তুলে ধরে সমাজ ও জাতিগতভাবে আমাদের নিজেদের দুর্বলতা, অন্যায়, অপরাধ ও অনৈতিকতাকে ঢাকা দিবার চেষ্টা করা হয়। সুতরাং নীরবতার পাথর দিয়ে ’৭১-এর সময়কার প্রায় সর্বজনবিদিত এক বিরাট সত্যকে আজ অবধি চাপা রাখা হয়েছে। একাত্তর এই জাতির জীবনে এক বিরাট গুরুত্বপূর্ণ এবং নির্ধারক ঘটনা। সুতরাং জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রয়োজনেই সেদিকে দৃষ্টি ফিরাবার প্রয়োজন, চাপা সত্যটিকে উদ্ঘাটনের প্রয়োজন। এই নমুনা বিশ্লেষণ সেই প্রয়োজন বোধ থেকে।

প্রকৃতপক্ষে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর ক্রমান্বয়ে সারা পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানী বাহিনী আক্রমণ অভিযান শুরু করার পর সাধারণ বাঙ্গালী বিশেষ করে বাঙ্গালী মুসলমান – যারা বর্তমান বাংলাদেশ রাষ্ট্রের শতকরা ৮০ ভাগের উপর, তাদের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া থেকে বাঙ্গালী জন-চরিত্র সম্পর্কে ধারণা করা কঠিন নয়। সেই সময়ের অসংখ্য ঘটনা থেকে এই জনগোষ্ঠীর মানস গঠন ও চিìতার স্তর সম্পর্কে ধারণা লাভের জন্য সুস্পষ্ট সাক্ষ্য পাওয়া যাবে। সেই সময়কার বিভিন্ন ঘটনাবলীর নির্মোহ ও নিরপেক্ষ বিচার আমাদের উন্নত সমাজ, জাতি ও রাষ্ট্র গঠনের জন্য অপরিহার্য। সুতরাং আজ সময়ের দূরত্বে দাঁড়িয়ে হলেও নিজ প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ভিত্তিক সেই সময়ের ঘটনাধারার একটা খণ্ডচিত্র নিম্নে তুলে ধরার চেষ্টা করব যা বাঙ্গালী জন-চরিত্রের স্বরূপ নির্ণয়ে সহায়তা করবে।

বর্ণিত এলাকা (১) সাবেক ফরিদপুর জেলার সদর মহকুমার অর্থাৎ বর্তমান ফরিদপুর জেলার সর্ব পশ্চিমে ঢাকা-যশোর মহাসড়ক সংলগ্ন গড়াই-মধুমতি পাড়ের শতাব্দী প্রাচীন বাজার-বন্দর কামারখালী এবং পুরো কামারখালী ইউনিয়ন এবং তৎসংলগ্ন বাগাট ইউনিয়নের কিয়ৎ অংশ, (২) সাবেক ফরিদপুর জেলার সাবেক গোয়ালন্দ মহাকুমা তথা বর্তমান রাজবাড়ী জেলার সাবেক বালিয়াকান্দী থানার প্রায় সম্পূর্ণ – যার দক্ষিণ অংশ বর্তমান ফরিদপুর জেলাধীন মধুখালী উপজেলার অìতর্ভুক্ত এবং উত্তরাংশ বালিয়াকান্দী উপজেলার অìতর্ভুক্ত – যা বর্তমান রাজবাড়ী জেলাধীন এবং রাজবাড়ী সদর উপজেলার বেশ কিছু অঞ্চল।

পাকিস্তানী বাহিনী ফরিদপুর জেলায় প্রবেশের দিন থেকে নিজের এলাকায় লুটপাট প্রত্যক্ষ করেছি। কয়েকদিন পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (এম, এল,)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও ফরিদপুর জেলা শাখার সম্পাদক কমরেড সত্য মৈত্রের সঙ্গে একত্রে বিস্তীর্ণ অঞ্চল ঘুরে দেখেছি। যথা স্খানে সে কথা বর্ণনা করব। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে তখন আমিও গোপন পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (এম,এল)-এর ফরিদপুর জেলা কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলাম। তৎকালে বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার জেলা কমিটির সদস্য সংখ্যা ছিল ৬ জন। অবশ্য ১৯৭৪ সালের জুন মাসের মাঝামাঝিতে আমি ইপিসিপি (এমএল) থেকে পদত্যাগ করি। তবে সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। এখন মূল বক্তব্যে যাব।

১৯৭১ সালের ২১ এপ্রিল তৎকালীন বৃহত্তর ফরিদপুর জেলায় পাকিস্তান বাহিনী দুই জায়গায় দুই ভাবে প্রবেশ করে। এক : গানবোট সহযোগে পদ্মানদী পার হয়ে তৎকালীন গোয়ালন্দ ঘাটে – যেখান থেকে নদী এখন বেশ দূরে সরে গেছে। সেখানে তৎকালে ই, পি, আর, বাহিনীর বেশ কিছু সংখ্যক সদস্যের নেতৃত্বে স্খানীয় জনগণের সহায়তায় একটা প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল। কাজেই সেখানে যুদ্ধ করেই তাদের অবতরণ করতে হয়েছিল। দুই : হেলিকপ্টার যোগে বর্তমান মধুখালী উপজেলা সদরের পূর্বদিকে দিঘলিয়া মাঠে ঢাকা-যশোর মহাসড়কের কাছাকাছি। সেখান থেকে একটা অংশ সড়ক দিয়ে গোয়ালন্দ ঘাটের দিকে যায় গান বোটে আগত সৈন্যদের সাহায্যের জন্য এবং অন্য একটা অংশ যায় কামারখালী ঘাটের দিকে।

কামারখালীতে গড়াই নদীর ঘাটে ই,পি,আর, বাহিনীর ৪/৫ জন সদস্যের নেতৃত্বে স্খানীয় জনগণ প্রতিরোধের একটা পরিকল্পনা করেছিল। তখন পর্যìত ধারণা ছিল যশোর ক্যান্টনমেন্টের সেনাবাহিনীই হয়ত নদী পার হয়ে ফরিদপুরে ঢুকবে। তাই সেটা প্রতিরোধের জন্য একটা প্রচেষ্টা ছিল। সেই ধরনের চিìতা থেকেই ২৫ মার্চের কালো রাতের পর পরই স্খানীয় ছাত্র-জনতা কামারখালী ঘাটের দুইটি ছোট ফেরী ডুবিয়ে দেয়। বড় একটি ফেরীকে ঘাটের কর্মচারীরাই নদীর বাকে ঘুরোপথে প্রায় ৭/৮ মাইল দূরে সরিয়ে রাখে। ঘাটের ফেরী ভিড়াবার পল্টুনও ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

কামারখালী বাজারের দক্ষিণ-পশ্চিম সংলগ্ন মিস্ত্রীবাড়ীর পাশেই নদীর উঁচু পাড়ে ই,পি,আর, বাহিনীর সদস্যদের খোঁড়া বাঙ্কারের পাশে বসে ২০ এপ্রিল সন্ধ্যার কিছু পূর্বে তাদের সঙ্গে আমার শেষ আলোচনা হয়। তাদের সঙ্গে ছিল দুইটি এস,এম,জি, তিনটি থ্রী নট থ্রী রাইফেল এবং সামান্য পরিমাণ গুলি। এই সামান্য অস্ত্র নিয়ে পাকিস্তান বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ য্দ্ধু করা কতটা সম্ভব? এটাই ছিল আলোচনার মূল বিষয়।

মার্চের শেষের দিকে ঝিনাইদহের কাছে গাড়াগঞ্জ-বিষয়খালীর প্রতিরোধ যুদ্ধের কয়েকদিন ধরে কামারখালী এলাকা থেকেও প্রতিরোধকারী যোদ্ধা এবং জনতার জন্য যথেষ্ট উৎসাহের সাথে বাড়ী বাড়ী থেকে রুটি সংগ্রহ করে প্রতিদিন পাঠানো হতো। বিষয়খালী প্রতিরোধ যুদ্ধ ভেঙ্গে পড়ার পর থেকেই উৎসাহ ঝিমিয়ে পড়ে। বেশীর ভাগ জনতাই নিরুৎসাহ হয়ে পড়ে। কিছু সংখ্যক লোক বলতে থাকে এখানে প্রতিরোধের চেষ্টা করলে মিলিটারীরা ব্যাপক ধ্বংস করবে। ক্রমান্বয়ে সেদিকেই লোকের সমর্থন বাড়তে থাকে। সে বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে। বুঝলাম ই,পি,আর, সদস্যগণও খুবই উদ্বিগ্ন চিত্ত। ২০ এপ্রিল সন্ধ্যা রাতেই তারা প্রতিরোধ পরিকল্পনা ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যায়।

২১ এপ্রিল সকাল অনুমান নয় কি সাড়ে নয়টার দিকে ট্রাক যোগে পাকিস্তানী সেনা কিছু দূর থেকে এল,এম,জি,-এর ফাঁকা গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে কামারখালী বাজারে প্রবেশ করে। কিছু গুলি বাজারের ঘরের চালে লাগে। বাজারে প্রবেশের আগ থেকে গুলি ছোঁড়ার শব্দে বেশীর ভাগ মানুষ বাজার থেকে পালাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। পাকিস্তানী বাহিনী বাজারে প্রবেশ করেই ট্রাক থেকে নেমে হাত ইশারায় এবং মুখে ছুটìত লোকজনকে থামাতে চেষ্টা করে। কিছু কিছু লোক থেমে দাঁড়ায়। মিলিটারীরা তাদের কাছে জানতে চায় ‘হিন্দু কাহাঁ?’ ‘হিন্দুকা ঘর কাহাঁ?’ হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক ততক্ষণে বাজার থেকে বেরিয়ে গেছে। দু’একজন থাকলেও দ্রুত সরে পড়ে। কোন হিন্দু সম্প্রদায়ের লোককে কেউ অবশ্য তখন দেখিয়ে দেয় নাই অথবা দেখানোর মত কেউ সেখানে ছিল না। কিন্তু হিন্দু সম্প্রদায়ের দোকান ঘর দেখিয়ে দেয়। মিলিটারীরা তালাবন্ধ ঘরের তালা ভেঙ্গে দিয়ে লোকজনকে মালামাল নিয়ে যেতে বলে। প্রথমে দু’চার জন করে মালামাল নেওয়া শুরু করে। দেখাদেখি ক্রমান্বয়ে উপস্খিত সবাই নিতে থাকে। এই খবর সারা বাজার এবং এর আশে-পাশে দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে। বাজার সংলগ্ন এবং পার্শ্ববর্তী গ্রাম থেকে লোকজন দ্রুক বাজারে ভীড় করে লুটপাটে অংশ নিতে থাকে। লুটেরা মানুষ নিজেরাই পছন্দ মাফিক ঘরের তালা ভেঙ্গে লুটপাট শুরু করে দেয়। বেশ বড় এই বাজারের বেশীর ভাগ ব্যবসায়ীই তখন হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক ছিল। মনোহারী, স্টেশনারী, খাদ্যদ্রব্য, আটা-ময়দা-চালসহ গুদামের ভূষিমাল অর্থাৎ কলাই, মসুরী, ছোলা, গম, খেসাড়ী সব ঘরই তালা ভেঙ্গে লুটপাট শুরু হয়ে যায়। সব শেষে পাটের এ বড় মোকামের বড় বড় পাট গুদামও লুট হয়েছে দুই-তিন দিন ভরে। কিছু মুসলিম ব্যবসায়ীও ইন্ধন দিয়েছে। নিজের ঘর খুলে বসে তারা লুটের পাট বা ভূষিমাল পানির দরে কিনে নিয়েছে লুটেরা জনতার কাছ থেকে। লুটেরারা বেশীর ভাগই এভাবে এক সম্প্রদায়ের মহাজনের ঘরের মাল আর এক সম্প্রদায়ের মহাজনের ঘরে তুলে দিয়েছে মালামাল বহনের নাম মাত্র মূল্যের বিনিময়ে।

সেনাবাহিনী বাজারে এক চক্কর দিয়েই ফেরী ঘাট চালুর প্রচেষ্টায় ঘাট কর্মাচারীদের সন্ধানে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ইতিমধ্যে বাজারে ব্যাপক লুটপাট শুরু হয়ে যায়। যেহেতু অধিকাংশ ঘরই হিন্দু ব্যবসায়ীদের ছিল – তাই প্রায় পুরা বাজারই মনে হয় লুট হয়েছে। তালাভাঙ্গা, দরজা খোলা, অনেক ঘরের ঝাপও ভাঙ্গা বা খোলা। প্রায় ভূতুড়ে কারবার বলে মনে হত – রাতের অন্ধকারে। বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি ঘরও কিন্তু লুট হয় নাই। অর্থাৎ লুটেরা মুসলিম সম্প্রদায়ের লোক স্ব-সম্প্রদায়ের কোন ব্যবসায়ীর ঘর লুট করে নাই। এরকম কোন খবর এ বাজারে শুনা যায় নাই।

মিলিটারী আগমনের ঘন্টা খানেকের মধ্যেই কিছু লোক মিলিটারীদের প্রত্যক্ষ সহযোগী হয়ে পড়ে। ‘হাবে দাওয়ালে’ নামে তখন সবার কাছে পরিচিত প্রায় আধা বয়সী এক লোক কিছু যুবককে সাথে নিয়ে মিলিটারীর সহযোগিতায় নামে। হাবের নেতৃত্বে ৪/৫ জন যুবক কয়েকটিন কেরোসিল তেল বাজারের কোন হিন্দুর দোকান থেকে নিয়ে দুই জন মিলিটারী সাথে করে বাজার থেকে প্রায় সিকি কিলোমিটার দূরে কামারখালী রেল স্টেশনের উত্তর-পূর্ব প্রাìেত মসলন্দপুর হিন্দু পাড়ার পশ্চিম পাশের প্রথম বাড়ীতে টিনের ঘরে তেল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। বাজারে ব্যাপক লুটের খবরে সবাই তটস্খ ছিল। মিলিটারী সাথে করে রেল স্টেশন থেকে হিন্দু পাড়ার দিকে লোক আসতে দেখেই সবাই পালাবার চেষ্টা করে। মাঝ বয়সী এক মহিলা তখনও পালাতে পারে নাই। ঘরে আগুন লাগাবার পর পরই সে ‘মাগো’ বলে চীৎকার করে পালাবার জন্য দৌড় দেয়। তৎক্ষণাৎ একজন মিলিটারী তাকে গুলি করে ফেলে দেয়। তার চীৎকার এবং দৌড় চিরদিনের জন্য থেমে যায়। পুরো মহল্লার মানুষ পূর্ব ও দক্ষিণ পূর্ব দিক দিয়ে প্রাণভয়ে পালাতে থাকে। কয়েক বাড়ীতে আগুন দিবার পর কেরোসিন তেল ফুরিয়ে যায়। আগুন আর দেয় নাই। কিন্তু ততক্ষণে রেললাইনের সামান্য কয়েক গজ ফাঁকা জায়গার পর দক্ষিণের মুসলিম মহল্লার মেয়ে-পুরুষ, জোয়ান-বুড়া মায় বাচ্চা-কাচ্চা ডাক দিয়ে লুট শুরু করে। দাই পাড়া ও কুলুপাড়ার লোকজন সামাদের নেতৃত্বে এসে চীৎকার করতে করতে হিন্দুপাড়ায় লুট শুরু করে দেয়। হিন্দু পাড়ার একেবারে সংলগ্ন উত্তর পাশের মুসলিম পাড়ার লোকজনও একই ভাবে লুটে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মালামাল লুটপাট হওয়ার শেষ পর্যায়ে দুপুরে মসলন্দপুর গ্রামের উত্তর পাশ দিয়ে সংলগ্ন ঢাকা-যশোর মহাসড়কের উত্তরে আড়পাড়া গ্রামের লোকজন উক্ত হিন্দু পাড়ায় আসতে শুরু করে। মসলন্দপুর হিন্দুপাড়াটা বেশ বড়। প্রায় মাঝারি একটা গ্রামের সমান। নানা সম্প্রদায়ের লোকের বাস। ঝোপঝাড়-জঙ্গলও ছিল বেশ। কিছু লোক জঙ্গলে লুকিয়ে ছিল মিলিটারী চলে গেলে বাড়ীতে ফেরার অপেক্ষায়। কিন্তু আড়পাড়ার লোকজন এসে শুধু মালামাল নয়, ঘর ভাঙ্গতে শুরু করে দেয়। ক্রমান্বয়ে তাদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন আর ঘরে ফিরতে পারে নাই। দেখতে দেখতে পুরো গ্রামের ঘরবাড়ী ভাঙ্গা শুরু হয়ে যায়। অলিখিত সমঝোতা অনুযায়ী যে লুটেরা ব্যক্তি এক ঘর ভাঙ্গা শুরু করল সেটা তার দখলে চলে গেল। সেটাতে আর কেউ হাত দিতে পারবে না। এভাবে নিজেদের মধ্যে সমঝোতায় ঘরগুলো ভাঙ্গা হয়। রাত এবং পরের দিনের মধ্যে সব ঘর ভেঙ্গে নিয়ে যায়। দুইদিন ধরে মহালুট উৎসব চলল। দুইদিন পর একটি ঘরও আর অবশিষ্ট থাকে নাই গ্রামটিতে। মসলন্দপুর সংলগ্ন দক্ষিণ-পূর্ব দিকের গোপালদি গ্রামের হিন্দু মহল্লাও লুট হয়ে গেল। ঘর-বাড়ীসহ সব।

কামারখালী বাজারের পূর্ব ও দক্ষিণ পূর্ব দিকের হিন্দুপল্লীর খবর এতক্ষণ বললাম। এবার বাজার সংলগ্ন খুব ছোট মিস্ত্রী পাড়া ও তার দক্ষিণের খুব ছোট রাজধরপুর গ্রামের বিবরণ দিই। খুব ছোট হলেও কিছু সম্পন্ন পরিবারের বাস ছিল এ গ্রামটিতে। একদিকে জমিজমা ও অন্যদিকে বাজারে নিজস্ব ঘরে ব্যবসা-বাণিজ্য। কামারখালী বাজারের অন্যতম প্রধান একটি ধনী ব্যবসায়ীর বাড়ীও ছিল গ্রামটিতে। বাজারে লুটপাট শেষ হতে না হতেই এই গ্রামটিতেও লুটপাট শুরু হয়ে যায়। গ্রামের লোকজন সরে যেতে বাধ্য হয়। রাতে তারা ঘোরা পথে তৎকালীন বালিয়াকান্দী থানার বড় হিন্দু অঞ্চলের নড়কোনা গ্রামে আশ্রয় নেয়। সন্ধ্যার মধ্যেই গ্রামটির সব কয়টি ঘর পার্শ্ববর্তী মসলন্দপুর ও ফুলবাড়ী প্রভৃতি গ্রামের লোকজন এসে ভেঙ্গে নিয়ে যায়। এভাবে ক্রমান্বয়ে গন্ধখালী, সালামতপুর, কোমরপুর, দয়ারামপুর মিশ্রবসতী গ্রাম হয়ে ইউনিয়নের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রাìেতর শুধু হিন্দু বসতী গ্রাম যারজান নগর, ব্রিহষ নগর, চর-কসুন্দী প্রভৃতি গ্রাম পুরোপুরিভাবে লুট হয়ে যায়। শেষ পর্যìত কোন গ্রামই লুটপাটের হাত থেকে রক্ষা পায় নাই। আর লুটকারী গ্রামগুলোর কোন কোন গ্রামের একশ ভাগ মুসলমানই লুটে অংশ নিয়েছে। কোন কোন গ্রামের ২/১ টি কিংবা কোন কোন গ্রামে ঊর্ধ্বপক্ষে ৩/৪টি পরিবার লুটপাট করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থেকেছে। গ্রামে কোন মুসলমান বাড়ী ঘুনাক্ষরেও লুট হয় নাই। আবার লুটকারীরা একঘর একজন ভাঙ্গা শুরু করলে একটা অলিখিত সমঝোতা অনুসারেই যেন সে ঘরের মালিক সেই। অন্য কেউ সে ঘরে হাত দেয় নাই। তবে সাধারণত ঘরদরজা লোকবল সম্পন্ন বা শক্তি সম্পন্ন ব্যক্তিরাই লুট করেছে। দুর্বল লোকেরা সাধারণ মালামাল লুট করেই সন্তুষ্ট থেকেছে।

প্রসঙ্গক্রমে পূর্বে উল্লেখিত কামারখালী বাজার ও মসলন্দপুর গ্রাম সংলগ্ন মহা সড়কের উত্তরে অবস্খিত আড়পাড়া একটি বড় গ্রাম। মুসলিম প্রধান এই গ্রামের এক পাড়ায় সামান্য কিছু হিন্দু সম্প্রদায় বাস করে। বর্তমানে এই গ্রামের ভোটার সংখ্যাই প্রায় পাঁচ হাজার। এতদঞ্চলে লুটের ক্ষেত্রে এই গ্রামটার এক বড় ভূমিকা ছিল। গ্রামটির উত্তর, উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিমে বিশাল হিন্দু প্রধান অঞ্চল। ভূ-প্রকৃতি হিসাবে কিছুটা নিম্নাঞ্চল। স্খানীয় ভাষায় ‘ভড়’ অঞ্চল বলে। রাস্তা বা উচুঁ কোন পথ ছিল না। বর্ষায় বাড়ীর ভিটাগুলো ছাড়া অধিকাংশ গ্রামই পুরো পানিতে ডুবে যেত। শুকনা কালেও ইতস্তত বিক্ষিপ্ত বিলঝিলের ফলে প্রায় জলাভূমি এলাকা ছিল। বর্তমানে অবশ্য পরিকল্পিত খাল-নালা খননের মাধ্যমে ঠিক পূর্বের সে অবস্খা নাই। রাস্তাঘাট বেশ কিছু হয়েছে। তখন মাটির উচুঁ রাস্তা ছিল না। এখন এলাকার কোন কোন অংশে দু’একটা পাকা রাস্তাও হয়েছে। বর্তমানে কোন কোন গ্রামে দু’চার ঘর মুসলমান বসতি হয়েছে।

তুলনামূলকভাবে অঞ্চলটা সে সময় কিছুটা দুর্গম অঞ্চল ছিল বলা চলে। সে অঞ্চলে কখনও পাকিস্তানী মিলিটারী বা বিহারী লুটেরাও যায় নাই। প্রথমত, আড়পাড়া গ্রামের লোক এবং তার পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোর মুসলমান সম্প্রদায়ের প্রায় সমস্ত লোকই লুটে অংশ নিয়েছে। পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোর মধ্যে হিন্দু অঞ্চলটির উত্তরের আর একটি বড় গ্রাম ম্যাকচামী, তারপর পাইককান্দী, খাসকান্দী, ভীম নগর ইত্যাদি। পশ্চিমের বড় গ্রাম ডুমাইন, তারপর ভেল্লাকান্দী, নিশ্চিন্দিপুর, রাজধরপুর প্রভৃতি মুসলিম প্রধান গ্রামের লোকজন প্রায় সবাই লুটে অংশ নিয়েছে। কোন কোন গ্রামে ২/১ ঘর বা কোথাও ২/৪ ঘর মাত্র বিরত ছিল। যেমন আড়পাড়ার মত বড় গ্রামে মাত্র ৩/৪টি পরিবার বা ব্যক্তি লুটে অংশ নেয় নাই। আর সবাই কম-বেশী লুটে অংশ নিয়েছে। তৎকালে বি, বি, সি-র খবরেও আড়পাড়া গ্রামের নাম উল্লেখ করে বলা হয়েছিল এই গ্রামটি ৩০/৩৫টা হিন্দুগ্রাম লুটের জন্য দায়ী। কামারখালীতে পাকিস্তানী মিলিটারী আগমনের তিন কিংবা চার দিন পর বাগাট ইউনিয়নের ঘোপঘাট, বাগাট, বাসপুরসহ কয়েকটি গ্রামের লুটের অবস্খা দেখে বিষণí মনে প্রায় ২৫০/৩০০ বছরের পুরাতন বর্ধিষäু হিন্দু গ্রাম কোড়কদী পৌঁছালাম। বৃটিশ আমলের প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা, পাকিস্তান আমলে দীর্ঘ দিন কারা নির্যাতন ভোগকারী বয়স্ক এবং তখন নিûিক্রয় শ্যামেন ভট্টাচার্যের বাড়ীতে বসলাম। সেখানে দুপুরে খাবার খেলাম। তার বাড়ী সংলগ্ন, বয়সে তার চেয়ে কিছু ছোট, পাকিস্তান আমলের অধিকাংশ সময় রাজবন্দী হিসাবে কারাভোগী, ’৬৯-এর গণ-অভ্যুথানের পর মাত্র ছাড়া পেয়েছেন, সেই সত্য মৈত্রও সেখানে উপস্খিত হলেন। তিনি ’৬৯ সালেই তাঁর বসবাসের ঘরটি বিক্রি করে সমুদয় টাকা তৎকালে গোপন কমিউনিস্ট পার্টি ইপিসিপি (এমএল)-এর ফাণ্ডে জমা দেন। অবশিষ্ট আরও একটি টিনের ঘর নিজ গ্রামেরই এক গৃহহীন পরিবারকে ভিটাসহ স্খায়ী দান করে দেন।

দেশের পরিস্খিতি নিয়ে শ্যামেন ভট্টাচার্যের সঙ্গে মত বিনিময়ের পর তাঁর বাড়ীর দক্ষিণে কয়েকটি পরিবারের কাছ থেকে তাদের কথা শুনলাম। তারা সবাই এক কথা বললেন – যে কোন মুহূর্তে হামলা আসন্ন। প্রচণ্ড আতঙ্কের মধ্যে তারা রয়েছেন। বড় হিন্দু অঞ্চলের পূর্ব-দক্ষিণ কোণের দিকে তাদের গ্রাম। সমগ্র হিন্দু অঞ্চলটির যে অবস্খা – তাদেরও তাই। কোন উপায় নাই। বাধা দেবার মত সংগঠিত কোন শক্তি নাই। অতএব ভারতে পালানো ছাড়া আর উপায় নাই। কমরেড সত্য মৈত্রের সাথে পূর্ব দিকের রাস্তা ধরে একটু এগোলেই চীৎকার-চেচামেচির শব্দে পিছন ফিরে চেয়ে দেখি গ্রামের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তের হাইস্কুলের দক্ষিণের ছোট্ট মাঠের মধ্যে কাটাখালী গ্রামের দিক থেকে দলবদ্ধভাবে ছুটে আসছে কয়েক শত লোক। হাতে লাঠি, রামদা ইত্যাদি অস্ত্রশস্ত্র। দু’জনেই সেই দূর থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম লুটেরারা গ্রামে ঢুকলো। অল্পক্ষণের মধ্যেই গ্রামের লোকজন উত্তর দিক দিয়ে মাঠে বেরিয়ে পড়লো। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা এক সঙ্গে। বোধ হয় বর্ণনাটা পুরা হ’ল না। কারণ কারো কোলে সদ্য প্রসূত শিশু থাকলেও সেই অবস্খায়ই বাড়ী ছেড়ে বেরোতে হয়েছে। পরে লোক মুখে শুনেছি, দুপুরের খাবার যারা দেরী করে খেতে বসেছিল, তাদের থালাটাও টান মেরে নিয়ে গেছে। মুখে মধুর সম্বোধন, ‘শালারা, এখনও যাও নাই?’ কী চমৎকার দৃশ্য! তাই না? পুরো গ্রামটা লুট হয়ে গেল। ঘর-দরজা সবকিছু। দুশ’ বছরের পুরাতন দালান-কোঠার ভগ্নাবশেষ যা ছিল, পরবর্তী কয়েক মাসের মধ্যে লোকজন তাও ভেঙ্গে নিয়ে যায়। প্রতিখানা ইট তুলে নিয়ে গেছে। বর্তমানে কেউ ভাবতেও পারবে না এখানে একদা একটা সমৃদ্ধ গ্রাম ছিল। বৃটিশ আমলে জমিদারদের গ্রাম বলেও পরিচিতি ছিল।

এরপর আমরা একটু এগিয়ে উত্তর মুখী হলাম। গাবুরদিয়া গ্রাম হয়ে কলাগাছি গ্রামে পৌঁছালাম। আমাদের সমর্থক কিছু লোক অনেক আক্ষেপ করল। তাদের মাধ্যমে নড়কোনা, শান্তিপুর, বনগ্রামসহ পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম এলাকার পুরা জঙ্গল ইউনিয়নের গ্রামগুলোর খবর পাওয়া গেল। ছোটখাটো গ্রামগুলো লুট হয়ে গেছে। বড় কয়েকটি গ্রাম এখনও পুরাপুরি হয় নাই – কোড়কদি গ্রামের মত হয়ত আজকেই শুরু হয়ে যাবে বলে তাদের আশঙ্কা। পরদিন সকালেই সমগ্র হিন্দু অঞ্চল আক্রাìত হয়। সমগ্র অঞ্চলের লোকই ভারতের পথে রওনা হয়। আমরা সেদিন নলিয়া জামালপুরের কাছে ছিলাম। এবং সে খবর শুনার পরই আমরা পূর্বদিকে রওনা হয়েছিলাম। পরবর্তী সময়ে বিস্তারিত শুনেছি।

নলিয়া-জামালপুর এসে বাজারের বৃদ্ধ কমরেড ডা: মনোরঞ্জন চৌধুরীর সাথে আমরা দেখা করি। তার বক্তব্যও একই। যে কোন মুহূর্তে হামলা হবে – প্রতিরোধের কোন পথ নাই। সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় যদি আক্রমণ করে তবে নগণ্য সংখ্যক লঘিষ্ঠ সম্প্রদায় কী করবে? বিশেষ করে রাষ্ট্রই যেখানে এই আক্রমণের ইন্ধনদাতা। জীবন বাচাঁবার আশায় দেশ ত্যাগ না করে উপায় নাই। বাজারের পাশের গ্রামে রাত্রি যাপন করে পরের দিন সকালের নাস্তা খেয়ে আমরা বেতেঙ্গা, আড়কান্দী গ্রাম হয়ে আড়কান্দীর ছোট বাজারটায় বসে জিরিয়ে নিই। তখন পর্যìত বাজার ছোট, ঘরদোর লোকজন কম। কিছু দিন পূর্বে নূতন বাজার বসেছে। বাজারে তখনও বসতী গড়ে উঠে নাই। এখান থেকে পূর্ব দিকে ইন্দুরদী গ্রাম হয়ে বারুগ্রাম এবং তারপর বাহুটিয়া প্রবেশ করি। সেখান থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে আর একটি ভড় অঞ্চল ও হিন্দু প্রধান এলাকা। এই এলাকার অবস্খাও নড়কোনা এলাকার মত তটস্খ। যে কোন সময় হামলার আশঙ্কা। এখানে আরো একদিন পর আক্রমণ হয়, লুটপাট হয়। এবং হিন্দু সম্প্রদায় ভারতে চলে যায়। এই গ্রামের অধিবাসী বীরেন দাশ রাজনীতি সচেতন ব্যক্তি। তার কাছে এলাকার অবস্খা শুনলাম। সে দিন আমরা সেখানেই থাকলাম। পরদিন রাজবাড়ীর উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। তবে বড় রাস্তায় নয়, মেঠোপথ দিয়ে রাজবাড়ী থেকে ৫/৬ মাইল দূরে বানিয়া বউ বাজারের দিকে। দুইদিন আগেই বানিয়া বউ বাজার ও তার আশপাশে রাজবাড়ীর বিহারীদের নেতৃত্বে ব্যাপক অগ্নিসংযোগ করা হয়। বাজার ও তার আশপাশে লুটপাটও হয়। বাজার ও তার আশপাশের অগ্নিদগ্ধ ও লুটপাটকৃত গ্রামের লোকজন চলে গেছে। এখানে নারী-পুরুষ মিলিয়ে ৪/৫ জনকে বিহারীরা গুলি করে হত্যা করে। মিলিটারীরা তাদের কাছে রাইফেল সরবরাহ করেছে। বানিয়া বউ এলাকার লোকজনের অনুরোধে আমরা রাজবাড়ীর দিকে যাত্রা বন্ধ করতে বাধ্য হলাম। কারণ বিহারী লুটেরার দল এদিকে আসতে পারে। তাদের সঙ্গে পথে দেখা হয়ে যেতে পারে। রাজনৈতিক নেতা বা কর্মী সন্দেহ করলে ধরে নিয়ে মিলিটারীদের কাছে দিতে পারে আবার নিজেরাও গুলি করে মারতে পারে। কিছু সংখ্যক বিহারী খুবই খারাপ।

রাস্তা দিয়ে অল্পকিছু দূর ভিটেপাড়ার দিকে এগিয়ে বেলগাছির দিকে মোড় নিলাম কিছু মেঠো পথ ধরে। বেলগাছির এক পরিচিত বাড়ীতে পৌঁছালাম। এখানে এসে শুনলাম রাজবাড়ীতে প্রথম যেদিন মিলিটারী আসে ঐদিন সন্ধ্যায় অন্যতম স্খানীয় জোতদার বকু চৌধুরীর নেতৃত্বে বেলগাছি বাজারের হিন্দু ব্যবসীদের সব ঘর লুট হয়েছে। এখানকার অধিকাংশ ব্যবসায়ী ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের এবং বেশ সামর্থ্যবান। বকু চৌধুরী প্রধানত সোনা-রূপা ও টাকা-পয়সা লুট করেছে। পূর্ব থেকেই তার নিজস্ব বন্দুক ছিল। পদ্মার চরের অনেক ভূ-সম্পত্তির মালিক। নূতন চর জাগলে সে তা জবরদখল করায় পূর্ব থেকেই অভ্যস্ত। নিজস্ব লাঠিয়াল বাহিনী রয়েছে। তাদের সহায়তায় প্রথমে বেলগাছি, সূর্যনগর বাজার এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোর হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়ীর টাকা-পয়সা সোনাদানা লুট করে নেয়। তারপর রাজবাড়ী থেকে আগত বিহারী লুটেরারা আসে এবং কয়েকজন মানুষ হত্যা করে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে। এর পর প্রতিবেশী মুসলমানদের দ্বারা লুটপাট শুরু হয়। অধিকাংশ হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। ক্বচিৎ দু’একজন তখনও রয়েছে – দু’একটা সহানুভূতিশীল মুসলিম পরিবারের সহায়তায়। তারাও সিদ্ধাìত নিয়েছে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ভারতে চলে যাবে। রাজবাড়ী থেকে বিহারীরা প্রায় প্রতিদিনই দলবদ্ধভাবে আসছে। কিছু দূরের সূর্য নগর বাজারের অবস্খাও একই রকম। এ অঞ্চলে নিরাপত্তার অবস্খা বিহারীদের কারণে খুব খারাপ। এরপর আমরা অন্যত্র চলে যাবার সিদ্ধাìত নিই। স্খানীয় সমর্থকদের সাহায্যে আমরা নিরাপদ স্খানের দিকে চলে যাই। দীর্ঘদিনের ব্যবধানে সব এলাকার সব কথা মনে করাও কষ্টকর হয়ে পড়ছে। উদাহরণ বাড়িয়ে লাভ হবে না। এখন সিদ্ধাìেতর দিকে যেতে চাই।

তবে তার আগে আমার বিবরণ সম্পর্কে আর একটু স্পষ্ট ধারণা দিবার জন্য আমার ভ্রমণ সম্পর্কে কয়েকটি কথা বলে নিতে চাই। এটি ভ্রমণের পূর্বে ৩/৪ দিন কামারখালীর নিকট আমার বাড়ীতে থেকে এলাকায় ঘুরে এবং এরপর সত্য মৈত্রের সঙ্গে তিন দিনের ভ্রমণের মাধম্যে যা দেখেছিলাম তার একটা সংক্ষিপ্ত বিবরণ। ভ্রমণের তিন দিনের পুরা বা অধিকাংশ সময়ই আমি সত্য মৈত্রের সঙ্গে ছিলাম। ভ্রমনের তিন দিনে আমি আনুমানিক ৪৫-৫০ মাইল পথ পায়ে হেঁটেছিলাম। আমি যে এলাকা পরিদর্শন করেছিলাম তা আয়তনে আনুমানিক ২০০ থেকে ২৫০ বর্গমাইল হবে। এই এলাকার তৎকালীন জনসংখ্যা সম্ভবত ৩ লক্ষের বেশী ছিল। হিন্দু প্রধান এলাকা হিসাবে এই তিন লক্ষাধিক মানুষের মধ্যে কম করে হলেও দেড় লক্ষ মানুষ হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত ছিল বলে অনুমান করা চলে। সে ক্ষেত্রে মুসলমানের সংখ্যা দেড় লক্ষের কাছাকাছি। এখন এই দেড় লক্ষের মত মানুষের ভিতর নারী এবং একেবারে শিশু বাদ দিলেও পঞ্চাশ হাজারের মত সক্ষম পুরুষ থাকে, এক বা দুই শতাংশ বাদে যারা লুটে অংশ নিয়েছিল। হয়তো কোন কোন ক্ষেত্রে লুটে অংশ নেয় নাই এমন মুসলমানের সংখ্যা আর এক বা আধ শতাংশ বাড়তে পারে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে লুট একটা সর্বাত্মক ব্যাপারে পরিণত হয়েছিল। আগেই বলেছি যে লুটে নারী এবং ছোট ছেলেমেয়েরাও অংশ নিয়েছিল। কোলের বাচ্চা বা একেবারে অক্ষম শিশুদের বেলায় সে কথা প্রযোজ্য নয়। সুতরাং লুটের আয়তন এবং রূপ সম্পর্কে এবার আশা করি একটা মোটামুটি স্পষ্ট ধারণা করা সম্ভব হবে। কোথায়ও কোথায়ও পানি শুকিয়ে এলে সবার জন্য উন্মূক্ত বিল বা জলাশয়ে মাছ ধরা যেমন উৎসবে পরিণত হয় এবং তাতে যোগ দিতে দূর দূরাìত থেকে জাল, খালুই ইত্যাদি হাতে নিয়ে হাজার হাজার মানুষ এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে ব্যাপারটা যেন তেমন।

উপরে উল্লিখিত ঘটনাবলী বাঙ্গালীর জাতীয় বা জন চরিত্র উপলব্ধির ক্ষেত্রে বেশ কিছু শিক্ষা দেয়। বিশেষত উপরোক্ত বিবরণের মধ্য দিয়ে অìতত সেই সময়কার সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙ্গালী মুসলমানদের সাধারণ চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য বেরিয়ে এসেছে। যেমন,

(১) বাঙ্গালী সহজ লাভের প্রত্যাশী ও নৈতিকতা বর্জিত :

বাঙ্গালী স্বার্থ পেলেই লোভে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। কোন নৈতিকতা থাকে না। কষ্টকর পথে যেতে অনিচ্ছুক, সহজ লাভই তাদের প্রত্যাশা। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের সময় ব্যাপক সংখ্যায় বাঙ্গালী ভোটাররা জাতীয়তাবাদের সহজ স্নোগানে আকৃষ্ট হয়ে, বাঙ্গালীর হাতে ক্ষমতা আনার মাধ্যমে সহজে সুযোগ-সুবিধা লাভের আশায় যাদেরকে ভোট দিয়েছিল, তারা ক্ষমতায় না যেতে পারার পর পরই যখন শত্রুপক্ষ বাঙ্গালী জাতির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে একটা অংশের সম্পদ লুটের আহ্বান জানাল ও সুযোগ করে দিল অমনি অগ্রপশ্চাৎ চিìতা না করে তাৎক্ষণিক লাভের আশায় লুট শুরু করে দিল। জাতীয়তাবাদের চিìতা মাথা থেকে উবে গেল, শূন্যে মিলিয়ে গেল। তাৎক্ষণিক বৈষয়িক লাভের আশায় শত্রু পক্ষের হয়ে কাজ শুরু করল। অর্থাৎ সহজ প্রাপ্তির প্রতি আকর্ষণ বাঙ্গালী জন-চরিত্রের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এর মূল কারণ হয়ত বাঙ্গালী জাতিগঠন প্রক্রিয়া সুদীর্ঘ বা সুপ্রাচীন নয়। যার ফলে নৈতিকতা বোধ এখনও দৃঢ় ভিত্তি পায় নাই।

(২) বাঙ্গালী ধর্মাচ্ছন্নতা বশত সাম্প্রদায়িক :

সমাজ অবতলের সাধারণ বাঙ্গালী ধর্মীয় মানসিকতায় আচ্ছন্ন। ফলে ভিন্ন ধর্ম বা সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতি সহানুভূতির পার্থক্য রয়েছে। স্ব-ধর্মগোত্রের মানুষের সম্পদ লুট করার ক্ষেত্রে যে সহানুভূতি জন্মায় – ভিন্ন ধর্ম-সম্প্রদায় বা গোত্রের লোকের প্রতি তা হয় না। ১৯৭১ সালের এত ব্যাপক লুটের মধ্যেও মুসলমান সম্প্রদায়ের বাজারের কোন ঘর বা বাড়ী বা গ্রামের কোন বাড়ী লুট হয়েছে বলে শুনা যায় নাই। সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই সেটা হয়েছে।

এই ব্যাপক লুটপাটের মধ্যেও ব্যাতিক্রম যে কিছু ছিল না তা নয়। তবে সংখ্যা বা পরিমাণের বিবেচনায় সে সংখ্যা ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। যেমন আড়পাড়া গ্রামের তৎকালীন চার-পাঁচ হাজার জনসংখ্যার মধ্যে মাত্র তিন কি চারটি পরিবার মাত্র লুট করে নাই। অবস্খাটা সর্বত্রই এরকম। অìতত তৎকালীন বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলের কথা বলতে পারি। ছোট ছোট অনেক গ্রামের একশত ভাগ পরিবারের লোকজনই লুট করেছে, অর্থাৎ প্রতিটা পরিবারের কোন না কোন সদস্য হিন্দুদের বাড়ী লুট করেছে।

অবশ্য এই প্রসঙ্গে এ কথা বলা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, বাঙ্গালী মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে লুটের এই প্রবণতা ইসলামের ধর্মীয় শিক্ষা বা ঐতিহ্যের মধ্যে নিহিত রয়েছে। ইসলাম ধর্ম জন্মকালে যখন যুদ্ধ ও সহিংসতার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে, সেই সময় থেকেই এর রক্তবীজ রোপিত হয়েছে। ইসলামের পয়গম্বর যুদ্ধের পর বিজিত অমুসলিমদের সবকিছু লুটকে যায়েজ করে দিয়েছেন ‘ মালে গণিমত’ হিসাবে। বিজিত সমাজ বা জাতির শুধু স্খাবর-অস্খাবর সম্পদই নয় – তাদের মা, বোন, বউ, ছেলে-মেয়েসহ সবকিছু। যুদ্ধবন্দী হিসাবে – লুটের সম্পদ হিসাবে তাদেরকে মুসলিম যোদ্ধা ও তার নেতাদের মধ্যে পদমর্যাদা অনুসারে ভাগাভাগি করে দেওয়া হত। নবী নিজেও তার ভাগ নিতেন। এই হাদীস ও ইতিহাসের কথা সবাই জানে। সেই লুটতরাজের চরিত্র সরাসরি রক্তের মাধ্যমে না হলেও শিক্ষা ও ঐতিহ্য থেকে এবং ব্যবহারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এই পলি-কাদার দেশের ধর্মাìতরিত মুসলমানদের উত্তর পুরুষদের মধ্যেও সংক্রমিত হয়েছে। এই প্রসঙ্গে একটা সুস্পষ্ট উদাহরণ দিব। লেখার প্রথমদিকে উল্লেখিত লুটতরাজকারী নেতৃস্খানীয় বড় গ্রাম আড়পাড়ার সাধারণ কিছু লোক যখন প্রথমে লুট শুরু করে তখন আড়পাড়া গ্রামে শ্বশুর বাড়ীতে বসবাসকারী মওলানা মোফাজ্জেল হোসেন, যাকে তখন উমর নগরের মওলানা বললেই প্রায় সবাই চিনত, এবং ইসলামী জ্ঞানের একজন পণ্ডিত ব্যক্তি বলে জানত তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ফতোয়া দিলেন, ‘হিন্দুদের সমস্ত সম্পদ লুট করা যায়েজ, এটা “মালে গণিমত”। কারণ এ যুদ্ধ হচ্ছে ইসলামের বিরোধিতাকারীদের সঙ্গে ইসলাম ধর্মের বা মুসলমানদের যুদ্ধ।’ এই বক্তব্যের পর লুটকারীদের মনোবল শুধু শতগুণ নয়, মনে হয় হাজার গুণ বেড়ে গিয়েছিল। তাদের মনের মধ্যে পরস্বাপহরণের ক্ষেত্রে যে দ্বিধা ছিল তা ধর্মীয় প্রভাবে একেবারে কেটে গেল। এই ধরনের বক্তব্য সে সময় নানান জায়গা থেকে ছোট-বড় নানা ইসলামী পণ্ডিতদের দ্বারা সারা দেশেই প্রচারিত ছিল, যা বাঙ্গালী মুসলমান লুটেরাদেরকে লুটে উৎসাহিত করেছিল। সেই সময় ইসলামী দর্শন ও ইতিহাসের এইসব পণ্ডিত ব্যক্তিরা ইসলাম ধর্মের একটা মর্মবস্তু তুলে ধরেছিলেন। বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের বিচারে কিংবা মানবিকতা ও নৈতিকতার বিচারে যত কদর্যই হোক ইসলাম ধর্মীয় দর্শন অনুসারে সেটাই ছিল স্বাভাবিক। এটা ইসলামের অìতর্বস্তুর একটা নির্মম প্রকাশ মাত্র।

এই প্রসঙ্গে এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, উক্ত মওলানা ’৭১-এর ১৬ই ডিসেম্বরের এক/দুই দিন আগেই গা ঢাকা দেয় এবং ©ুত পালিয়ে ভারতের আজমীরে খাজা-ময়নুদ্দীন চিশ্তির মাজারে আশ্রয় গ্রহণ করে। এরপর সে ৮/১০ বছর জীবিত ছিল, কিন্তু কখনও বাংলাদেশে আসে নাই। আড়পাড়া গ্রামে বসবাসকারী তার দুই ছেলে মাঝে মধ্যে আজমীরের উক্ত মাজারে যেয়ে দেখা করে আসতো। বড় ছেলের নাম সাহাঙ্গীর, সে মধুখালীতে অবস্খিত ‘ফরিদপুর চিনি কল’-এ চাকুরী করে। ছোট ছেলের নাম আলমগীর – বাড়ীতে সংসার করে।

(৩) বাঙ্গালী রক্তপাত বিমুখ ও কম সহিংস :

প্রসঙ্গক্রমে এই বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন বলে মনে হচ্ছে যে, এত ব্যাপক আকারের, বলা চলে মহা ব্যাপক আকারে লুটপাটের মধ্যেও কিন্তু বাঙ্গালীরা বিশেষ কোন হত্যাকাণ্ড ঘটায় নাই। মিলিটারীরা লুটের জন্য উদ্বুদ্ধ করার সাথে সাথেই যেমন ব্যাপকভাবে মানুষ লুটে সাড়া দিয়েছে, নিজেরা উৎসাহী হয়ে লুট করেছে, তেমনভাবে সেই অনুসারে কিন্তু হত্যার পথে প্ররোচিত হয় নাই। তাহলে হয়তো ব্যাপকভাবে মানবিক মহা বিপর্যয় সৃষ্টি হত। অর্থাৎ বলা যায় অতিলোভ বশত বাঙ্গালী মুসলমান সম্প্রদায় অমুসলমান প্রতিবেশীদের সম্পদ লুট করেছে, কিন্তু হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে নিষ্ঠুরতার পরাকাষ্ঠা দেখায় নাই। অর্থাৎ বাঙ্গালী মুসলমান সাধারণভাবে লোভী কিন্তু নিষ্ঠুর হত্যাকারী নয়। হয়ত রক্ত দেখতে ভয় পায় বা তা দেখায় অভ্যস্ত নয়। স্বার্থের জন্য চরম নীচতা আছে – কিন্তু সহজে চরম নিষ্ঠুর হত্যাকারী হয় না। জাতি হিসাবে বাঙ্গালীকে চরম লোভী বললেও এই বিচারে চরম নিষ্ঠুর বলা চলে না। অìতত ’৭১ কালপর্বের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী খুব বেশী নিষ্ঠুরতা তার চরিত্রের প্রধান দিক নয়।

আর একটা লক্ষণীয় বিষয়, যে ভাবে লুট হয়েছে সে ভাবে যেমন হত্যাযজ্ঞ হয় নাই তেমন নারী ধর্ষণের দিকেও সেভাবে বাঙ্গালী যায় নাই। ব্যতিক্রমী কিছু ঘটনা ঘটতে পারে – তবে সে রকম কোন ঘটনা আমার মনে পড়ছে না। সাধারণ সময়েও সমাজ বিরোধী স্বল্প সংখ্যক দুষ্ট চক্র এ রকম ঘটনা ঘটাতে পারে – সেটা ব্যতিক্রম। কিন্তু লুটের সময় পাকিস্তানী মিলিটারী ও বিহারী বাহিনী ও পরে রাজাকার বাহিনী এ জাতীয় কাজে জড়িয়েছে – কিন্তু ব্যাপক লুটপাটের সময় সাধারণ বাঙ্গালীরা হত্যা ও ধর্ষণ কাজে লুটের মত জড়িয়ে পড়ে নাই। এটাকে বাঙ্গালী চরিত্রের একটা ইতিবাচক দিক হিসাবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। ধর্মের দোহাই দিয়ে যতই উস্কানি আসুক ’৭১-এ এই পথে তারা ব্যাপকভাবে যায় নাই বলে আমার মনে হয়েছে। বুঝা যায় যুদ্ধ-পরিস্খিতিতেও যুদ্ধবন্দী বা বিধর্মী নারী ধর্ষণ এবং বিধর্মী হত্যার ক্ষেত্রে পাকিস্তানী মুসলমানদের মতো বাঙ্গালী মুসলমানরা ১৯৭১-এ ইসলামী ঐতিহ্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য দুইটিকে ভালভাবে রপ্ত করতে পারে নাই।

উপসংহার

উপরের ঘটনাটি সমগ্র দেশের প্রেক্ষিতে একটি মাত্র এলাকার অভিজ্ঞতার বিবরণ এবং বিশ্লেষণ, যা সেই সময়কার দেশের সামগ্রিক অবস্খাকেও অনেকাংশে প্রতিফলিত করে। এ ঘটনার পর প্রায় ৩৮ বৎসর কাল অতিবাহিত হয়েছে। ১৯৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধের পরিণতিতে প্রায় ৩৭ বৎসর পূর্বে পূর্ব বাংলা স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ের গতিধারায় এ দেশের সমাজ ও রাষ্ট্রে যেমন অনেক বস্তুগত পরিবর্তন ঘটেছে তেমন বাঙ্গালী জন-মানস ও চরিত্রেও নিশ্চয় কম-বেশী পরিবর্তন ঘটেছে। তবে বস্তুগত ক্ষেত্রে উন্নয়নের যেটুকু ছোঁয়া লেগেছে বাঙ্গালী জন-মানস ও চরিত্রে তার কতটুকু ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে সে প্রশ্ন আজ সঙ্গতভাবেই করা যায়। যে কোন একটি নৈরাজ্যমূলক পরিস্খিতিতে ভিন্ন রূপে এবং ভিন্ন ক্ষেত্রে হলেও ’৭১-এর নমুনার যে বিবরণ দিলাম তার পুনরুক্তি যে ঘটবে না তার নিশ্চয়তা কোথায়? জনমানসে লুণ্ঠনপরায়ণতা বা অতি লোভ থাকলে তাকে কাজে লাগাবার জন্য শক্তির অভাব ভবিষ্যতেও যে হবে না তা আমরা কী করে বলি? অতীতে বহি:শক্তিকে ইন্ধন দিতে আমরা দেখেছি। ভবিষ্যতেও ভিন্ন রূপে হলেও বহি:শক্তির ভূমিকা দেখা যেতে পারে। আর তার জন্য ধর্মই যে ইন্ধন হবে তার কি মানে আছে? লুণ্ঠনপরায়ণতা থাকলে তাকে উস্কে দিবার জন্য ইন্ধনের অভাব ঘটার কারণ নাই। সেটা যে কোন একটা কিছু হতে পারে। এ কথা মনে রাখা প্রয়োজন যে, বাঙ্গালী মুসলমান জনতা প্রথমে নিজ উদ্যোগে লুটে নামে নাই, পাকিস্তানী রাষ্ট্র এবং তার হানাদার সেনাবাহিনীর প্রশ্রয় ও উস্কানি পেয়েই তারা সে কাজে নেমেছিল।

 


 

(৩) নমুনা : গায়েবী মাজার

বাঙ্গালী সমাজ ও জীবন ঘনিষ্ঠ সাহিত্যিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্-র ‘লাল সালু’ উপন্যাসের নায়ক ‘কুসংস্কার, শঠতা, প্রতারণা এবং অন্ধবিশ্বাসের প্রতীক হয়ে ওঠা মজিদ, যে কিনা প্রচলিত প্রথাকে টিকিয়ে রাখতে চায়, চায় সমাজে অপ্রতিহত ক্ষমতার অধিকারী হতে। সে জন্য হেন কাজ নাই যা সে করে না।’ তেমন বয়স বা বুদ্ধির অধিকারী না হয়েও সামান্য ১০/১২ বছরের একটি বালকও যে প্রচলিত এই সমাজ বাস্তবতায় যেন-তেন প্রকারেও শুধুমাত্র সমাজের অন্ধ-ধর্মাচ্ছন্নতার কারণে মানুষকে কীভাবে অতি সহজে প্রভাবিত করতে পারে, তারই একটি নমুনা-ঘটনা বিধৃত বা বর্ণনা করব।

ঘটনাটি ১৯৭৫ সালের মার্চ অথবা এপ্রিল মাসের প্রথম দিকের হবে। যতদূর মনে পড়ছে সে সময় চৈতালী ফসল উঠে গেছে, মাঠ ফাঁকা। ঘটনাটির সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে আমি জড়িয়ে পড়েছিলাম। তবে সহায়ক শক্তি হিসাবে নয়; বিরোধী পক্ষ হিসাবে।

ঘটনার দিন বিকালে পড়ìত বেলায় আমাদের তৎকালীন পারিবারিক নিবাস গন্ধখালী গ্রাম থেকে হেঁটে প্রায় আড়াই মাইল দূরবর্তী কামারখালী বাজারে যাচ্ছিলাম। সে সময় অত্র এলাকার কাঁচা রাস্তায় কোন রিক্শা বা ভ্যান জাতীয় যানবাহন চলত না। তাই অভ্যাসবশত খুব স্বচ্ছন্দভাবেই হাঁটতে পারতাম। মাটির কাঁচা রাস্তা মাঝে-মধ্যে ভাঙ্গা, বালুময়। নদীর পাড় ঘেঁষা বেড়িবাঁধের রাস্তা ধরে গন্ধখালী সীমানা অতিক্রম করে ফুলবাড়ী গ্রামের সীমানায় প্রবেশের সময় কালাম নামে ফুলবাড়ীর একটি যুবক আমাকে সালাম জানিয়ে সঙ্গ নিল। সালামের জবাব দিয়ে নানা প্রসঙ্গে আলাপ করতে করতে বাজারের প্রায় উপকণ্ঠে এসে ডানদিকের ছোট ফাঁকা মাঠটার পর একটা ফাঁকা বাড়ীর দক্ষিণ পাশে কয়েকশত মানুষের ভীড় দেখলাম। প্রথমে মনে করলাম হয়তো, কোন গণ্ডগোল মারামারি। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হল মারামারির মত কিছু না। মারামারি চেচামেচির কোন লক্ষণ নাই, একেবারে শাìত। কিছু একটাকে কেন্দ্র করে প্রায় অনড় একটা জটলা। হালকা ভাবে দুই একজন চলাচল করছে মাত্র। কালামকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কী ব্যাপার অনুমান করতে পার?’ ও বলল, ‘জাহাজের বাড়ীতে নাকি একটা গায়েবী কবর উঠেছে স্যার, আপনি শোনেন নাই? সেখানেই লোকের ভীড় জমেছে।’ আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কী বললে? গায়েবী কবর?’ ওর উত্তর ‘জী স্যার, খুব বুজুর্গ লোকের মাজার নাকি!’ আমি বললাম ­ ‘তুমি পাগল হলে নাকি? গায়েবী কবর বা মাজার আবার ওঠে কেমন করে!’ ও বলল, ‘স্যার সপ্তাখানেকের বেশী হয়ে গেল, এর মধ্যেই যথেষ্ট লোক সমাগম শুরু হয়েছে। বেশ দূর থেকেও লোক আসছে দেখতে। ক্রমেই ভীড় বাড়ছে। লোকে পয়সা-কড়িও দিচ্ছে স্যার।’ আমার মাথাটার মধ্যে যেন একটু ঝাঁ করে উঠল। তা হলে এখানেও একটা কবর ব্যবসা শুরু হয়ে গেল! ক্ষণিক পূর্বের হালকা মনটা নিমেষেই ভারী হয়ে গেল। কথা বলতে ইচ্ছা হচ্ছিল না। দাঁড়িয়ে এক মিনিট ভাবলাম। কর্তব্য-কর্মের একটা তাৎক্ষণিক সিদ্ধাìত নিলাম।

গত সপ্তাহখানেক ঢাকায় ছিলাম। গতকাল সন্ধ্যারাতে ঢাকা থেকে ফিরেছি। ভ্রমণজনিত কিছুটা ক্লান্তির কারণে বাজারে কোথাও বসি নাই বা দেরী করি নাই। তাই কথা প্রসঙ্গেও এ ধরণের খবর তখন কানে আসে নাই। এখনই বাধা দিয়ে কবর ভেঙ্গে না দিলে জমজমাট কবর ব্যবসা চালু হয়ে যাবে। কালামকে বললাম, ‘চলো।’ প্রসঙ্গত বোধ হয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, আমার ছাত্র জীবনে রাজেন্দ্র কলেজে পড়াশুনার সময় ১৯৬৫ সালের শেষার্ধে গন্ধখালী ও ফুলবাড়ীর যুবকদের নিয়ে একটি যুবক সমিতি গঠন করেছিলাম এবং তাদের নিয়ে আমার উদ্যোগ ও প্রচেষ্টায় এলাকাবাসীর সক্রিয় সহায়তায় গন্ধখালীতে একটা প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। ছুটি পেলেই মাঝে-মধ্যে বিদ্যালয়টিতে ক্লাস নিতাম। সেই সময়ের ছাত্রদেরকে কোন ভাল কাজে ডাকলেই অনেক সময়েই অনেককে আমি পেয়েছি। আমার উপর তাদের একটা বিশ্বাসও আছে। কালাম তেমনি একজন প্রাক্তন বিশ্বাসী ছাত্র। (১৯৯০ এর দশকে এই বিদ্যালয়ের পাশে আর একটা উচ্চবিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠা করেছি।)

যাহোক, কালামকে সঙ্গে করে চাষ করা ক্ষেতের মধ্য দিয়ে ছোট মাঠটা পেরিয়ে লোক জমায়েত স্খলে পৌঁছলাম। সদ্য ফসল তুলে নেওয়া বাড়ী সংলগ্ন জমিখণ্ডটি মানুষের পায়ের চাপে চাপে কয়েকদিনের মধ্যেই একেবারে সমতল হয়ে গেছে। জটলার ভীড় ঠেলে ভিতরে ঢুকলাম। দেখলাম, একটু ছোট আকারের কবরের মত, লাল সালুতে ঢাকা একটা বেদি। বেদিটার চারিদিকে আগরবাতি জ্বলছে। পূর্ব পার্শ্বে কথিত কবর বা বেদিটা সামনে করে পশ্চিমমুখী হয়ে ১০/১২ বছরের একটি ছেলে নামাজে বসার মত হাঁটু গেড়ে বসা। পরনে লুঙ্গি, গায়ে পাঞ্জাবী, মাথায় টুপি, হাতে একটি তছবির ছড়া। অর্ধমুদ্রিত নেত্রে বসে নি:শব্দ তেলওয়াত করছে বলে মনে হয়। চারপাশে জমায়েত প্রায় ৩/৪ শত বিভিন্ন বয়সী লোক। সংখ্যায় হিন্দু সম্প্রদায়ের মহিলাই বেশী। তন্মধ্যে বিধবা এবং সিঁদুর পরা সধবা উভয়ই প্রায় সমান। দইু-তিন মাইল দূরের নড়কোণা ও শাìিতপুরের মহিলারাও রয়েছে বলে জিজ্ঞাসায় জানা গেল। আমার সামনেই সিঁদুর পরা কয়েকজন মহিলা লাল সালু কাপড়ে মোড়া বেদিটির উপর কিছু আধুলী, সিকি, কাঁচা টাকার মুদ্রা দিল। তাদের বাড়ী জিজ্ঞাসা করায় কেউ বলল ­ শাìিতপুর, কেউ বলল ─ নড়কোণা। আমি দুই তিন মিনিট দাঁড়িয়ে সমগ্র ব্যাপারটা দেখলাম। তারপর তছবি পড়া ছেলেটিকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘এগুলি কী?’ মনে হচ্ছে ও সরলভাবে উত্তর দিল, ‘দিন দশেক আগে রাতে আমাকে স্বপ্নে একজন বুড়া কামেল লোক বললেন, এইখানে আমার মাজার আছে, তুই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে রাখবি, যত্ন করবি। তোর সওয়াব হবে, কোন অভাব হবে না। আমি তখনই উঠে এখানে এসে দেখি ছোট একটা কবর। প্রতিরাতেই একটু করে বড় হচ্ছে।’ ভিতরটা আমার আগুনের মত জ্বলে উঠলেও শাìতভাবে বললাম, ‘তুই দোয়া-কালাম কতটুকু জানিস? বল, আমি শুনবো।’ ও আমতা আমতা করতে থাকে, চাপ দেওয়াতে ও বলল, ‘আমি একটা কলমা জানি, প্রথম কলমাটা। আর জানি না, শুধু আল্লা আল্লা করি।’ আমি বললাম, ‘তুই প্রায় কিছুই জানিস না; আর তোর কাছেই স্বপ্নে দেখালো? তাছাড়া কোরান হাদিস অনুসারেও এরকম কোন কবর উঠতে পারে না। এই ভণ্ডামি কোথা থেকে শিখেছিস শীঘ্র বল? ─ না হলে, তোর কপালে খারাপ আছে। শীঘ্র সত্যি কথা বল।’ এভাবে ক্রমান্বয়ে আমি চাপ দিচ্ছিলাম।

সেই সময় জমায়েতের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে একটু দূরে দাঁড়ান দাওয়ালে বা নলে পাড়ায় বাড়ী, ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য আজিজ মোল্লা এবং তার সাথে গল্পরত এখান থেকে ৫০ গজ দূরে এ গ্রামের বনেদি মোল্লাবাড়ীর যুবক রেজাউল করিম মোহন মোল্লা আমার কাছে আসলো। মেম্বার বললো ‘মাস্টার সাব, আপনি ধর্মের ব্যাপার নিয়ে খামখা টানা-ঁেহচড়া করছেন কেন? ওকে স্বপ্ন দেখিয়েছে, গায়েবী কবর উঠেছে। আমরাও কদিন ধরে দেখছি। আপনি ওকে খামাখা ধমকা-ধমকি করছেন কেন?’ আমি বললাম ‘মেম্বর, এটা মোটেও ধর্মের কাজ নয়, বরং অধর্মের কাজ। কোরান হাদিস মতে এরকম ঘটনা ঘটতে পারে না। সেটা আমি জেনেই বলছি।’ এবার মোহন মোল্লা এগিয়ে এসে বললো, ‘না ভাই, বাধা দেওয়াটা ঠিক হচ্ছে না। নিজে ধর্মের প্রতি উদাসীন বলে সবাইকে তা ভাবাটা ঠিক নয়। ওকে স্বপ্নে দেখাতেই পারে? তাই বলে ওর উপর জুলুম করা ঠিক নয়।’

আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। কারণ এলাকার প্রতিটা লোকই তখন জানত এবং এই দুই ব্যক্তিও ভাল করেই জানে যে আমি যুক্তিহীন কোন কাজ করি না এবং মিথ্যা কথাও বলি না। কোরান-হাদীস অনুসারেও যে এ ধরণের ঘটনা হয় না, সে আমি না জেনে বলি নাই। আমি না জানা কথা নিয়ে তর্ক করি না; – এলাকাবাসী তা জানে। গন্ধখালী গ্রামে তখন পর্যìত প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় আমার ভূমিকা, ১৯৭০ সালে কামারখালী কলেজ প্রতিষ্ঠায় আমার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, ১৯৭৪ সালের শেষের দিকে কলেজের আর্থিক দুরবস্খা দূরীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন, কামারখালী বাজারে ১৯৬৬-’৬৭ সালে ‘সুধী সংঘ’ ও পরে ‘সুধী-বান্ধব’ ক্লাব প্রতিষ্ঠা এবং ক্লাবের মাধ্যমে এলাকায় সামাজিক কল্যাণমূলক কাজ পরিচালনাসহ ১৯৬৯ সালে ফরিদপুর জেলা শহরসহ এতদঞ্চলে আমার সক্রিয় ভূমিকার কারণে আমার প্রতি এলাকাবাসীর একটা আস্খা ছিল। সেই বলে আমিও হঠাৎ সিদ্ধাìত নিয়েছিলাম এসব ভণ্ডামির কার্যকলাপ বন্ধ করতে। কিন্তু উক্ত দুই ব্যক্তির ভূমিকায় আমি খানিকটা চিìিতত হয়ে পড়লাম। উপস্খিত লোকজনও চুপচাপ। আমাকে সমর্থন করছে না। জ্ঞান বা যুক্তির শক্তি দ্বারা বা শুধু কল্যাণমূলক কোন চিìতার দ্বারা এ ভণ্ডামি থামানো যাচ্ছে না বাঙ্গালী সমাজ অবতলের মানুষের চেতনার কোন মান না থাকার কারণে। তাই দ্রুতই আমাকে কৌশল পাল্টাতে হল।

উক্ত দুই ব্যক্তির আপত্তি বা বাধা দান এবং উপস্খিত জনতারও তাদের প্রতিই নীরব সমর্থনের ভাব দেখে আমি বললাম, ‘ঠিক আছে, আমি তোমাদের কথায় এই মুহূর্তে থামছি, কিন্তু আমার কথা সঠিক কি না সেটা যাচাই করার জন্য এখনই বাজার জামে মসজিদে যেতে হবে। ইতিমধ্যে মাগরিবের নামাজের সময় হয়ে গেছে। সেখানে মসজিদের ইমাম সহ আলেমগণের কাছে শুনতে হবে কোন গায়েবী কবর উঠতে পারে কি না?’ তর্ককারী দুই জন সহ সকল জনতাকে আহ্বান জানালাম মসজিদে যেতে। বেশ কিছু সংখ্যক আমার সাথে যেতে রাজি হল, কিন্তু তর্ককারী দুই জন আর গেল না। মসজিদে যেয়ে দেখি নামাজ আরম্ভ হয়ে গেছে। সবাইকে নিয়ে একটু অপেক্ষা করলাম। নামাজ শেষ পর্যয়ে ছিল। তাড়াতাড়ি-ই শেষ হল। প্রথমেই কামারখালী ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান জনাব রুস্তুম আলী খান এবং তার পরপর-ই মসজিদের ইমাম আড়পাড়া নিবাসী মৌলভী বশারত সাহেব বেরুলেন। আমি তাদের কাছে প্রশ্ন করলাম, ‘গায়েবী কোন কবর মাটি ফুঁড়ে উঠতে পারে কি?’ তারা ফয়সালা দিলেন, ‘না।’ তারপর সবিস্তারে ঘটনা বললাম এবং মসজিদ থেকে মাত্র ২/৩ শত গজ দূরে এই অনাচারের উচ্ছেদ আগেই হওয়া উচিত ছিল বলে দাবী করলাম। তারা বললেন, ‘আমরা জানি না।’ আমি বললাম, ‘তাহলে এখনই চলুন।’ চেয়ারম্যান সাহেব নিজে এড়িয়ে যাবার জন্য বৃদ্ধ ইমাম সাহেবের উপর ভার দিয়ে বললেন, ‘আমার জরুরী কাজ আছে, তাই আমি চললাম।’ তিনি চলে গেলেন। মৌলভী সাহেবকে সঙ্গে করে সেই মাজারের কাছে যেয়ে দেখি ছেলেটি সেভাবেই বসে আসে। ভীড় কমে গেছে। তবুও অল্পকিছু মানুষ আছে। মৌলভী সাহেব বললেন, ‘কবর রোজ কেয়ামতের পর পুনরুথানের দিন ছাড়া উঠতে পারে না। তাও সেদিন কবর থেকে শুধু লোক উঠবে, কোন কবর না। তুমি কার কথায় কীভাবে এটা করেছো, বলো?’ কিন্তু ছেলেটি কিছুতেই সত্য কথা বলছে না। অবশেষে আমি বললাম, ‘কোদাল আন। কবর খুঁড়ে দেখব ওর ভিতর কী আছে?’ ছেলেটি তবুও নাছোড়বান্দা, একঘেয়েমি স্বপ্ন বর্ণনা করে গেল। সবাইকে বিশ্বাস করাতে চায় ওর গল্প। শেষে ভীষণ রেগে গিয়ে বললাম, ‘কোদাল আন, নইলে তোকে পিটিয়ে হাত-পা ভেঙ্গে দিব।’ তারপর ওর বাড়ীর ভিতর থেকে কে যেন কোদাল বের করে দিল। আমি নিজ হাতে কবরটির মাটি ফেলতে শুরু করলাম। আলগা মাটি সহজেই কেটে ফেলা গেল। অল্প নিচেই এক খণ্ড কলা গাছ। কাঁচা-ই ছিল। মাটির নিচে থাকায় ১০/১২ দিনেও মোটেও শুকায় নাই। কলা গাছের নিচেই শক্ত জমিনের মাটি। বললাম, ‘উপরের আগলা মাটি কোন জায়গা থেকে এনেছিস? বললো, ‘খাদের মধ্য থেকে।’ তারপর বললাম, ‘সব কথার উত্তর ঠিক ঠিক দিবি, নইলে এখানে সত্যি কবর কেটে তোকে জ্যাìত চাপা দিয়ে মাজার বানাব। নাম দিব জ্যাìত মাজার।’ ততক্ষণে ও ভীত-সন্ত্রস্ত। সব কথা খুলে বলল।

কয়েকমাস পূর্বে ওর এক আত্মীয়ের সঙ্গে ঢাকা গিয়েছিল। কাজের ছেলে হিসাবে কয়েক মাস এক বাসায় ছিল। সেই বাসার অদূরেই একটি মাজার ছিল। সেখানে কয়েক মাস ধরে মাজারের কর্মকাণ্ড দেখে দেখে ওর মনেও লোভ জন্মে। এ রকম একটা মাজার বানাতে পারলে ওর অভাব থাকবে না। কারণ মাজারে মানুষ অনেক পয়সা দেয়, চাইতেও হয় না। সেই লোভ থেকেই পরিকল্পনা মাফিক এই মাজারটি সে করেছিল। বাবা-মার সম্মতি নিয়েই এ কাজটি শুরু করে। মাজারটি হয়ে-ই গিয়েছিল বলা যায়। লোকে পয়সা দেওয়া শুরু করেছিল। ওদের পরিকল্পনা ছিল পরে মাজারটি পাকা করা। তারপর ক্রমান্বয়ে উন্নয়ন করা। মাজারের ব্যবসা যে খুব লাভজনক সে সম্পর্কে তার খুব আস্খা ছিল। আমার বিরোধিতার কারণে তার স্বপ্নসাধ ভেঙ্গে গেল। ঘটনার নায়ক সেই ছেলেটির নাম মোস্তফা। বাপের নাম জাহাজে। জাহাজে তখন কামারখালী বাজারে কুলির কাজ করতো। ১২/১৪ বছর পূর্বে জাহাজে কামারখালীর বাড়ী বিক্রি করেছে। তিন ভাইয়ের মধ্যে মোস্তফা বড়। বর্তমানে সে ভ্যান চালায়।

গায়েবী মাজারের ঘটনাটা নিয়ে মানুষের মনে কী ক্রিয়া, প্রতিক্রিয়া হয়েছিল তা দেখা যাক এবং সেই সঙ্গে করা যাক বাঙ্গালী জন-চরিত্রের কিছু বৈশিষ্ট্যের বিশ্লেষণ।

জন-মানসের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ :

কোন্ আসক্তি থেকে সে দিনের বালক মোস্তফা গায়েবী মাজার গড়ার প্রচেষ্টা নিয়েছিল আশা করি পাঠকবৃন্দের কাছে সেটা পরিষ্কার। ঢাকায় যেয়ে মাজার দেখে এবং তার আয়ের ব্যবস্খা দেখে সে আকৃষ্ট হয়েছিল অনুরূপ একটা ব্যবস্খা গড়ে তোলার জন্য। বাঙ্গালী সমাজ অবতলের ধর্মাচ্ছন্ন মন-মানসিকতার বাস্তব রূপ দেখে আকৃষ্ট হয়ে সে এই ব্যবসায় নামতে চেয়েছিল। প্রথমত, সে কৃতকার্যও হয়েছিল। সমাজের অন্য কোথাও থেকে সে বাধার সম্মুখীন হয় নাই। সমাজের গড়পড়তা সাধারণ মানুষ বিনা বাক্যেই তা মেনে নিয়েছিল। সে প্রায় নাবালক ছেলে হলেও কেউ কোন প্রশ্ন তোলে নাই। সমাজের সচেতন অংশের কাছ থেকে যখন প্রশ্ন উথাপিত হল সে সময় বরং তারা নাবালক ছেলেটিকেই সাহায্য করল। তার মানে সমাজ অবতলের বাঙ্গালীর সাধারণ প্রবণতা হচ্ছে অন্ধ-ধর্মাচ্ছন্নতা। সেখানে তারা কোন যুক্তি দিয়ে বিচার-বিবেচনা করতে নারাজ। সচেতন মানুষের বাস্তব যুক্তি তাদের মন:পুত নয়। এমন কি পরীক্ষিত সমাজ হিতৈষী সৎ ব্যক্তির বক্তব্যও এ সময় সহজে তাদের মধ্যে কাজ করে না। এই অন্ধ অচলায়তন মানসিকতার জগদ্দল পাথর প্রায় পুরা সমাজের উপর চেপে বসে আছে। এটা শুধু মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে নয়, দ্বিতীয় বৃহত্তম সম্প্রদায় হিন্দু সমাজেও সমান ভাবে প্রযোজ্য। বিশেষ করে হিন্দু মহিলাদের মাঝে এর প্রভাব খুব বেশী। মুসলমান সম্প্রদায়ের ধর্মীয় মাজার বা কবরে নির্দ্বিধায় তারা এসেছে। পয়সা দিয়েছে। অনুমতি পেলে বোধ হয় কপাল ঠেকিয়ে প্রণাম করতেও আনন্দ পেত। যে মানসিকতার কারণে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক মুসলমান পীর, ফকির, দরবেশের কাছে যায় সেটা হচ্ছে ভক্তিবাদের মাধ্যমে পরলৌকিক মুক্তির আশায়। তার হেরফের এখন পর্যìত কতটা হয়েছে? আমার তো মনে হয় না গ্রামাঞ্চলের আমজনতার মধ্যে তেমন কোন উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়েছে। এমনকি শহরের সাধারণ মানুষের জন্যও কথাটা প্রযোজ্য।

রেজাউল করিম মোহন মোল্লা ও আজিজ মেম্বার আমার সঙ্গে তর্ক করেছিল এই ধর্মাচ্ছন্ন মানসিকতার কারণেই। এই ধর্মাচ্ছন্নতার জন্য কোনটা সত্যিকার ধর্ম তাও অনেক সময় বুঝতে পারে না। একদিকে বিভিন্ন কার্যকলাপের মধ্য দিয়ে আমার প্রতি বিশ্বাস থাকলেও তার চেয়েও প্রবলতর ছিল অন্ধ- ধর্মবিশ্বাস। ফলে ধর্মের নামে যখন কোন কাজ হয় তখন প্রবলতর বিশ্বাসের কারণে সে দিকেই ঝুঁকে যায়। উল্লেখিত রেজাউল করিম ঘটনাটার বেশ কয়েক দিন পর আমার সাথে দেখা করে অত্যìত বিনীত ভাবে বলল, ‘ভাই, আসলে ধর্মের নামে কাজটা করায় আমরা অন্ধ-বিশ্বাস থেকেই সেদিন তর্ক করেছিলাম। অতটুকু ছেলে যে এত বড় মিথ্যা ধাপ্পা দিবে তা ভাবতেই পারি নাই। আমরা মনে করেছি সত্যি বুঝি ওকে স্বপ্নে দেখিয়েছে এবং গায়েবী কবর উঠেছে। যখন আপনি মসজিদে ইমামের কাছে যাবার প্রস্তাব দিলেন এবং অন্যদের নিয়ে রওয়ানা হলেন, তখনই আমাদের ধারণা হল আপনিই ঠিক, তা না হলে অìতত আপনি যেতে পারেন না। না জেনে এতবড় চ্যালেঞ্জ আপনি দিতে পারেন না। সে ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত ছিলাম। তাই আমরা আর মসজিদে যাই নাই।’

এটা তার সরল স্বীকারোক্তি। তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অনুসারে সে কখনও প্যাঁচের লোক নয়। কামারখালীতে ক্লাব-পাঠাগার গড়া, নানা সামাজিক কাজ, খেলাধূলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সব সময়ই সে সরলভাবেই আমার সাথে থাকত। উক্ত মেম্বারও, অন্য ত্রুটি থাকলেও, বেশী প্যাঁচের লোক নয়। তাই তার কথাটা আমি বিশ্বাস করেছি। তার বক্তব্যও আমার কথার-ই সাক্ষ্য দিচ্ছে।

বাঙ্গালী মানস সাধারণ ভাবে অন্ধ-ধর্মাচ্ছন্ন, কুসংস্কারপূর্ণ। হিন্দু-মুসলমান সবাই। এবং এ ক্ষেত্রেও বাঙ্গালী হুজুগে মাতে অর্থাৎ হুজুগপ্রিয় জাতি। যার অজস্র উদাহরণ প্রায় প্রতিনিয়ত বিভিন্ন স্খানে ঘটে থাকে। বড় বড় কিছু মাতা-মাতির ঘটনা মাঝে-মধ্যে পত্রিকাতেও এসে থাকে। আমাদের এলাকার পাশেই মধুমতি নদীর ও পারে বৃহত্তর যশোর তথা বর্তমানের মাগুরা জেলার বাগবাড়িয়া গ্রামে কয়েক বছর পূর্বের এক বিরাট হুজুগে মাতামাতির ঘটনা প্রায় শত বর্গমাইল এলাকাকে দারুণ ভাবে আলোড়িত করেছিল, যার বিবরণ তৎকালীন সময়ে প্রথম শ্রেণীর সবচেয়ে জনপ্রিয় পত্রিকা সহ বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। এক পর্যায়ে কমপক্ষে সেখানে প্রতিদিন ৬০ হাজার মানুষও উপস্খিত হত। পরে চেষ্টা করব তারও একটা নমুনা অনুসন্ধান লিখতে।

 


 

(৪) নমুনা : স্বপ্নে পাওয়া চিকিৎসা

বাঙ্গালী একদিকে যেমন চরম অন্ধ বিশ্বাসী তেমন সমানভাবেই প্রচণ্ড আবেগপ্রবণ জাতি। সে যেমন যুক্তি, বিচার-বুদ্ধি হারিয়ে একেবারে অন্ধের মত চোখ বুঁজে বিশ্বাস করে, আবার আবেগ সঞ্চারিত হলে তেমনিভাবে আবেগে ভেসে চলে; তখন আর বিচার-বুদ্ধি সক্রিয় থাকে না। সেই মুহূর্তে আবেগের স্রোতে ভাসতে ভাসতে তার মধ্যে উন্মাদনার সৃষ্টি হয়ে যায় – যেন বোধ-বুদ্ধিহীন উন্মাদনাগ্রস্ত এক জনসমষ্টি মাত্র। এই উন্মাদনা প্রক্রিয়া অতি অল্প সংখ্যক লোক থেকে শুরু করে শত শত, হাজার হাজার, লাখ লাখ, এমনকি কোটি কোটি মানুষের মধ্যেও সংক্রামিত হতে পারে।

এই উন্মাদনা কোন্ ক্ষেত্রে নাই? রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্ম, চিকিৎসা ইত্যাদি যে কোন ক্ষেত্রই এই উন্মাদনা দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। আজ আমি স্বপ্নে পাওয়া চিকিৎসা নিয়ে এই ধরনের উন্মাদনা বা মাতামাতির একটি ঘটনা তুলে ধরব। তবে তার আগে এ ধরনের চিকিৎসা সম্পর্কে প্রাসঙ্গিক আরও কিছু কথা বলব ঘটনাটির তাৎপর্য স্পষ্টতর করার জন্য।

সাধারণভাবে গ্রামে-গঞ্জে, পথে-ঘাটে, হাটে-বাজারে সর্বত্রই এই অভাগা দেশে অন্ধ বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এ ব্যবসা চলছে যুগ যুগ ধরে। বিভিন্ন বড় বড় শহরের মোড় থেকে শুরু করে খোদ রাজধানী ঢাকা শহরে জাতীয় মসজিদ বলে খ্যাত বায়তুল মোর্কারমের দক্ষিণ গেটের চত্বরে কিছু দিন আগেও দেখেছি স্বপ্নে পাওয়া ঔষধ, তাবিজ কীভাবে বিক্রি হয়। বর্তমানে দক্ষিণ গেট চত্বরে যাতায়াত নাই বিধায় বলতে পারছি না ওগুলো এখনও বিক্রি হয় কিনা।

মজমা মিলিয়ে বা অনেক সময় মজমা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এখনও রমরমা ভাবেই এ জাতীয় ব্যবসা চলে। কিন্তু ব্যবসায়ীর ব্যক্তিত্ব ও কলা-কৌশলের কারণে এ ব্যবসায় মাঝে-মধ্যে যে ব্যাপক উন্মাদনার সৃষ্টি হয়, তার নজির অহরহই দেশের বিভন্ন প্রান্তে পাওয়া যায়। এ ধরনের উন্মাদনাকর অবস্খা খোদ রাজধানী শহরেও সময় সময় সৃষ্টি হওয়ার নজির আছে। যেমন, ১৯৭০-এর দশকের শেষের দিকে বুড়িগঙ্গার ওপারে একবার একটা পুকুরের পানি খাওয়ার হিড়িক পড়েছিল। প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে শুনেছিলাম পুকুরের পানি কমে কর্দমাক্ত হওয়ার পরও নাকি লোকের ভিড় কমে নাই। ঘোলা পানিই পরম বিশ্বাসে পান করেছে। উক্ত পুকুরের পানিকে সে সময় ‘বাগ্গোর পানি’ বলা হত।

ফরিদপুর জেলা শহরের দক্ষিণে নগরকান্দা অথবা ভাঙ্গা উপজেলার কোন এক গ্রামের নাম ‘ছাগলদি’। বেশ কয়েক বছর আগে সেখানেও মহা হুলুস্খূলকারী পুকুরের আবিষ্কার হয়েছিল। পানি খেলেই সব রোগ থেকে মুক্তি! প্রতিদিন হাজার হাজার লোক কয়েক মাস ধরে সেখানে হুমড়ি খেয়ে পড়ত। এভাবে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্খানে বিভিন্ন নামে আজগুবি বা স্বপ্নে পাওয়া পুকুরের পানি বা ঔষধ অথবা তাবিজের কাহিনী বিস্তর শোনা যায়। এখন এখানে সে জাতীয় একটি ঘটনার কথা বলছি।

২০০৩ সালের কথা। বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে ধারাবাহিকভাবে খবর প্রকাশিত হয় যে, ঝিনাইদহ জেলা শহরে আনসার ব্যাটেলিয়নের এক সদস্যের “স্বপ্নে পাওয়া” ঔষধে ক্যান্সারসহ বিভিন্ন রোগের মুক্তি হচ্ছে। ঔষধ পাওয়ার জন্য প্রতিদিন হাজার হাজার লোক সমাগম হচ্ছে ক্রমবর্ধমান হারে। ক্রমান্বয়ে সংখ্যা বাড়তে থাকে। তিরিশ, চল্লিশ, পঞ্চাশ, ষাট হাজার ছাড়িয়ে, হাজার ছাড়িয়ে লাখো মানুষের জমায়েতের সংবাদ প্রকাশিত হতে থাকে। পশ্চিম বঙ্গ থেকেও সেখানে বিপুল সংখ্যক লোক আসতে থাকে।

ব্যাটেলিয়ন আনসারের সাধারণ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় কর্তৃপক্ষ তাকে মাদারীপুর বদলী করে দেয়। কিন্তু তার প্রতিক্রিয়ায় সেদিনই ঝিনাইদহ শহরে সমাগত মানুষ সুবিশাল মিছিল বের করে। প্রশাসনের উপর চাপ সৃষ্টি হয়। অবস্খা বেগতিক দেখে প্রশাসন মাত্র এক রাত্রি মাদারীপুর থাকার পর আবার সেই স্বপ্নৌষধ প্রাপ্ত আনসার কবিরাজকে ঝিনাইদহে ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হয়। শুধু তাই নয়, তার জন্য চার জন দেহরক্ষীও নিয়োজিত করতে হয়।

স্খির হয় সপ্তাহে ৬ দিন ঝিনাইদহ এবং ১ দিন (শুক্রবার) মাগুরা অর্থাৎ মাগুরার অদূরে তার নিজ বাড়ী পাতুড়িয়া গ্রামে রোগী দেখে ঔষধ দেওয়া হবে। অল্পদিনের মধ্যেই কবিরাজ সিদ্ধান্ত নেয় সপ্তাহে তিন দিন ঝিনাইদহ এবং তিন দিন মাগুরা তথা তার বাড়ীতে রোগী দেখবে। আরো কিছুদিন পর পুরোপুরিভাবেই কবিরাজ তার নিজ গ্রামের বাড়ী পাতুড়িয়ায় থেকে সকলকে চিকিৎসা দিবেন স্খির হয়। এ সময় তার বাড়ীতে প্রতিদিন অগুন্তি লোক সমবেত হতে থাকে।

পার্শ্ববর্তী কয়েকটি জেলা থেকে প্রতিনিয়ত ব্যাগভর্তি পানির বোতলসহ হাজার হাজার লোক আসতে থাকে। আশপাশের এলাকার সাধারণ যাত্রীদের বাসে উঠাই দুর্বিসহ হয়ে পড়ে। বাস ছাড়াও টেম্পু, রিকশা-ভ্যান এবং মধুমতি নদীপথে অসংখ্য ট্রলার বোঝাই করে লোক জমায়েত হতে থাকে। ট্রলারের যাত্রীদের মধুমতি নদীর ঘাট থেকে মাইল খানেক পথ পায়ে হেঁটে তার গ্রামে পৌঁছতে হত।

মাঠ-ঘাট, গ্রাম্য কাঁচা রাস্তা লোকে লোকারণ্য। জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ়-শ্রাবণ-এর প্রখর রৌদ্র ও বৃষ্টি কোন কিছুই এ জন সমাগমের জোয়ার খাটো করতে পারে নাই। হঠাৎ দেখলে মনে হবে হয়ত কোন গ্রাম্য মেলার সমাবেশ। কিন্তু গ্রাম্য মেলায় এত লোকের সমাগম তো হয় না! আর সবাই ছুটছে ঊর্ধ্বশ্বাসে এক দিকে। কোথাও মেলার তৈজশপত্র নাই। শুধু ব্যাগভর্তি পানির বোতল। কারো কারো ব্যাগে রান্না করা মুরগীর মাংস। হ্যাঁ, শুধু কচি মুরগীর মাংস। মোরগের মাংস হলে নাকি মহা সর্বনাশ হয়ে যাবে!

কবিরাজের বাড়ী বা আশপাশে কোথাও এত লোক জমায়েতের মত খালি মাঠ বা জায়গা নাই। তাই বাড়ীর তিন দিকে তিনটি কাঁচা গ্রাম্য রাস্তার দুই ধার দিয়ে গায়ে গায়ে লাগিয়ে সবাইকে দাঁড়াবার অথবা বসবার নির্দেশ কবিরাজের। তদারকিতে নিয়োজিত হয়েছে কবিরাজের গ্রামের বিশ্বস্ত অনুগত লোক বা স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী। তাদের কাজ হচ্ছে ঐ তিনটি রাস্তায় দু’পাশ দিয়ে লাইন ঠিক করে সবাইকে দাঁড় করিয়ে দেওয়া এবং শৃঙ্খলা বিধান করা।

এত লোক সমাগমকে কেন্দ্র করে আশে-পাশের কোন বাড়ী বা ঘরে বা গাছ তলায় বা একটা কাপড় টানিয়ে তার তলায়, অথবা টিন দিয়ে অস্খায়ী ছাপড়াঘর করে মাঝে মাঝে কিছু দোকান বসেছে। রুটি, বিস্কুটসহ পান সিগারেট বা চায়ের দোকান চলছে ভালই। দাম একটু বেশী হলেও ক্রেতাদের তাতে আপত্তি নাই। পাওয়া যাচ্ছে তাই তো বেশী!

কবিরাজ বাড়ী থেকে বেরিয়ে একটি রাস্তায় যাবে। দু’পাশে মেলে ধরা ব্যাগভর্তি মুখ খোলা পানির বোতল এবং ক্যান্সার রোগীর জন্য কবিরাজের নির্দেশ মত রান্না করা মুরগীর মাংসের উন্মুক্ত পাত্র একটু উঁচু করে ধরতে হবে। কবিরাজ মাংস পাত্রে ঔষধি গুল্মের চূর্ণ কিছুটা ছিটিয়ে দিবে এবং তুলে ধরা পানির বোতলের দিকে একটা করে ‘ফুঁ’ দিতে দিতে ক্রমান্বয়ে সামনে এগোবে। এভাবে প্রায় দেড়-দু’মাইল লম্বা এক একটা লাইন অতিক্রম করতে কয়েক ঘন্টা সময় লেগে যায়। এভাবেই একের পর এক লাইন অতিক্রম করে কবিরাজ তার স্বপ্নপ্রাপ্ত ঔষধ বিতরণ করছে। এভাবে সারাদিনে কয়েকবার করে এক একটা রাস্তার লাইন ঘুরতে হয়।

প্রথম দিকে কবিরাজ নাকি কোন পয়সাই নিত না বলে শোনা যায়। জনপ্রিয়তা অর্থাৎ ভীড় বাড়ার পর নীতি পাল্টে যায়। কেউ স্বেচ্ছায় দান করলে সেটা গ্রহণ করতে বাধা নাই। ফলে অনুমান করা যায় স্বেচ্ছা প্রদত্ত পয়সাটার পরিমাণ নেহায়েত কম নয়। কারণ বেশীর ভাগ রোগীই কিছু প্রদান করতে আগ্রহী। মাঝে মধ্যে কেউ কেউ মোটা অংকের দানও করত। এই পয়সা থেকেই স্খানীয় স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী ও প্রয়োজনীয় লোকদের খুশী করা হত। কোন প্রশাসনের লোক বা অন্য কোন ক্ষমতাবান লোকদেরকেও আপ্যায়ন করতে হত।

কবিরাজের তৎকালীন বসত বাড়ী পাতুড়িয়ার পার্শ্ববর্তী এক গ্রামে বসবাসকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত জনৈক প্রধান শিক্ষক তথ্য দিলেন যে, কবিরাজ তার জনপ্রিয়তার সময়ে একটা ওরশ করে, তাতে একদিনে ওরশে দানের পরিমাণ নগদ ৩৭ লক্ষ টাকা হয়েছিল বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জেনেছিলেন। তবে সঠিকভাবে এটা যাচাই করা খুবই কঠিন ব্যাপার। কবিরাজের জনপ্রিয়তা বা জন-জমায়েতের এই জোয়ার ৫/৭ মাস টিকে ছিল। তার পর ধীরে ধীরে কমতে থাকে। ভাটার টান শুরু হয়। তারপর অল্প দিনের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায় এই গণ-জোয়ার বা ‘গণ হিস্টিরিয়া’ও যাকে বলা যায়।

২০০৫ সালে কবিরাজ তৎকালীন বসতগ্রাম পাতুড়িয়া ছেড়ে কয়েক মাইল দূরে ‘দুর্গাপুর’ নামে এক হিন্দু গ্রামে বাড়ী করেছে। একটি শ্যালো টিউবওয়েল বসিয়ে ধান, গম ইত্যাদি চাষ করছে। দিনের একটা বড় অংশ তার এসব তদারকিতেই ব্যয় হয়। কিছুটা অস্খির স্বভাবের লোক। এক জায়গায় স্খির হয়ে বেশীক্ষণ বসে না। তথ্যগুলো দিলেন তার বাড়ীর পাশে তার স্খাপিত মসজিদের ইমাম সাহেব। দু’এক জন রোগী মাঝে মধ্যে আসে। একটি ঘর করে দিয়েছে। কোন রোগী চিকিৎসা নিতে আসলে সেই ঘরে থাকতে হবে। নিজে অথবা লোক দ্বারা রান্না করিয়ে খেতে হবে। ঘর ভাড়া বাবদ নির্দিষ্ট অংকের টাকা কবিরাজকে দিতে হবে। রোগী নিজের বাড়ী থাকলে কবিরাজ এখন আর কাউকে চিকিৎসা দেয় না। চিকিৎসার সর্বনিম্ন মেয়াদ তিন মাস। এর মধ্যে ঘরটাই কবিরাজের আয়। ওষুধ ‘ফিন্স’। তবে খুশি হয়ে কেউ দান করলে সেটা অন্য কথা। যে কোন ধর্মের লোককেই সে চিকিৎসা দিবে। তবে প্রত্যেককেই স্ব-স্ব ধর্মের ক্রিয়াকর্ম করতে হবে। আলাদাভাবে ধর্মীয় ক্রিয়াকর্ম পালন ছাড়া ওষুধ দেয়া হয় না।

আমি দুইটি রোগী দেখলাম। একজন সবেমাত্র আমার ভ্যানের আগে এসে দাঁড়িয়ে ভ্যানের পয়সা দিয়ে বেডিংসহ নির্দিষ্ট ঘরে চলে গেল। অপর রোগীর নাম – মুজিবুর রহমান, সাং­মহম্মদ জমা, পো:- সরজগঞ্জ বাজার, উপজেলা-চুয়াডাঙ্গা, জেলা-কুষ্টিয়া। পেশায় ড্রাইভার। দশ বৎসর রিয়াদে ছিল। দেশে এসে রোগ ধরা পড়েছে। ঢাকা থেকে ক্যান্সারের কথা জানার পর কলকাতায় যায়। সেখানকার ডাক্তারদের রিপোর্টও খারাপ। খুব জটিল অপারেশন করতে হবে। সুস্খতার সম্ভাবনা খুব সামান্যই। বাহ্যিকভাবে দেখে রোগের অতটা গুরুত্ব বোঝা যাচ্ছে না। বসা বা হাঁটাচলা করতে পারছে। ডাক্তারি চিকিৎসায় সারার সম্ভাবনা নাই জেনে মানসিকভাবে মৃত্যুকে মেনে নিয়েই শেষ চিকিৎসা মনে করে এখানে এসেছে। তার এক আত্মীয়ের কাছ থেকে কবিরাজের নাম শুনেছে। এখন যা হবার হবে। তিন দিন আগে এখানে এসেছে। ঔষধ খাচ্ছে। এত অল্প সময়ে কিছু বুঝতে পারছে না। কম পক্ষে তিন মাস ঔষধ খেতে হবে। দোয়া চাইল আর শেষ কথা বলল­ মৃত্যুতো হবেই, তবু শেষ চেষ্টা করে দেখি।

এ ধরনের কিছু রোগী মাঝে মধ্যেই আসে পুরোনো সেই প্রচারের ফলে। দুর্গাপুর এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামের বেশ কয়েক জনের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেল স্খানীয় কোন লোক চিকিৎসার ব্যাপারে এখন আর তার কাছে যায় না। তার বর্তমান বসত গ্রাম দুর্গাপুরের হিন্দু অধিবাসীরা সহজে কেউ মুখ খোলে না। বিশেষ কোন মন্তব্যই করে না। কারণ কবিরাজের মূল গ্রাম বাগবাড়িয়া এতদঞ্চলের বিশেষ প্রভাবশালী বড় গ্রাম। আর ঐ গ্রামকে আশপাশে গ্রামের লোকজন ভয় পায়। কবিরাজের আত্মীয় স্বজনকে বিশেষ করে হিন্দু গ্রাম বিধায় দুর্গাপুরের সবাই ভয় পায়। এই গ্রামের উত্তরে ঢাকা-যশোর মহাসড়কের উত্তরে জোতশ্রীপুর গ্রামের (পো: হাজরাতলা, ইউপি – নাকোল, থানা – শ্রীপুর, জেলা – মাগুরা) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মিন্টু কুমার বিশ্বাস বলল (সংস্কৃতে অনার্স, জগন্নাথ হল) প্রথম দিকে গণ-জোয়ারের সময় তাদের গ্রামের একশত ভাগ মানুষই তার পানি পড়া বা ঔষধ খেয়েছে। সে নিজেও খেয়েছে – কিন্তু কারুর কোন অসুখই সারে নাই। প্রথমে কয়েক সপ্তাহ কম মনে হয়েছিল। কিন্তু তার পর বুঝা গেল কারুর কিছুই সারে নাই। পূর্বাবস্খা ফিরে আসে সবারই। জিজ্ঞাসায় জানতে পারলাম তাদের গ্রামে প্রায় আশি ঘর লোক বাস করে। তাদের গ্রাম ও আশেপাশে কোন গ্রামের কোন লোকের ভাল হবার খবর সে আজ পর্যন্ত পায় নাই। জিজ্ঞাসা করলাম কেন তাহলে ওখানে যাওয়া হয়েছিল। হেসে দিয়ে বলল যে, ‘বিশ্বাসে মুক্তি মেলে তর্কে বহুদূর’– এই প্রবাদের উপর ভরসা করে সবার সঙ্গে আমিও গিয়েছিলাম। তখন আমি স্কুলের ছাত্র ছিলাম।

এ নিবন্ধের একেবারে প্রথমেই ভূমিকা স্বরূপ লিখে ছিলাম ‘বাঙ্গালী সমান ভাবেই অন্ধ বিশ্বাসী ও আবেগপ্রবণ।’ উল্লেখিত ঘটনাটির অথবা এ জাতীয় অন্য কোন ঘটনার বিশদ বিবরণ নিলেও সে কথাই প্রমাণিত হবে। স্বপ্নে পাওয়া কোন ঔষধ বা তাবিজের প্রতি এদেশের মানুষের অগাধ অন্ধ বিশ্বাস এখনও সমানভাবে বিদ্যমান। ২০০৩ সালের এ ঘটনা বেশী দিনের কথা নয়। সমাজ অবতলের মানুষের চরিত্রের মৌলিক কোন পরিবর্তন হয় নাই। ধর্ম নির্বিশেষে সব সম্প্রদায়ের সমাজ অবতলের চেতনার রূপ একই ধরনের। যার প্রমাণ শুধু বাংলাদেশ নয়, পশ্চিম বাংলার সীমান্ত সংলগ্ন মানুষের বিপুল সংখ্যায় উক্ত কবিরাজের কাছে উপস্খিতি। দেশের মধ্যেও সব সম্প্রদায়ের লোকই সমান ভাবে উক্ত কবিরাজের পানিপড়া ও ঔষধ পেতে পাগলপারা হয়ে গিয়েছিল। আসলে এই বৈশিষ্ট্যের মধ্যেও রয়েছে বাঙ্গালীর সহজপ্রাপ্তির লোভ এবং অন্ধ ধর্ম বিশ্বাস, যা তাকে এতটা পাগল করে তোলে। সমাজ অবতলের সকল সম্প্রদায়ের লোকের মধ্যেই এই প্রবণতা সমভাবে বিদ্যমান।

 


 

(৫) নমুনা : কাজলের হুন্ডি ব্যবসা।

বাঙ্গালী যে কেমন বেহিসাবী লাভের প্রত্যাশী তার একটি নমুনা কাজলের হুন্ডি ব্যবসা। আসলে এটা কোন প্রকৃতির ব্যবসা আমি সঠিক করে বলতে পারব না। তবে লোকের মুখে মুখে এটা হুন্ডি ব্যবসা নামেই পরিচিতি পেয়েছে। আমিও সে নামেই উল্লেখ করছি।

লাভের কথা শুনলেই বাঙ্গালী সেখানে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। একটুও খোঁজ নেওয়ার বা হিসাব করার দরকার আছে বলে ভেবেও দেখে না। এর ফলে প্রতি নিয়ত ব্যক্তিগতভাবে কতজন যে ঠগের পাল্লায় পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে তার হিসাব কেউ রাখে না। গ্রাম বা শহরে যেখানেই থাকুন না কেন, বিশেষ করে গ্রামে, এ জাতীয় ছোট-বড় অনেক কাহিনী মাঝে-মধ্যেই শোনা যায়। লাইসেন্সধারী বিভিন্ন এনজিওর নামে বা বিভিন্ন কর্মসংস্খানকারী প্রতিষ্ঠানের নামে বড় বড় কাহিনীর খবর প্রায়শ পত্রিকায় দেখা যায়। কাজলের কাহিনীও প্রায় সমস্ত জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে। প্রায় সমগ্র জাতিই বোধ হয় এ বিষয়ে অবহিত আছে। কয়েক বছরের ব্যবধানে হয়ত একটু আড়ালে চলে গেছে। আরো কিছু কাল পরে হয়ত ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ মনেই রাখবে না।

কাজল গ্রাম্য এক মুদি দোকানদার। স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কিছুদিন চাকরি খুঁজাখুঁজি করে শেষে মুদি দোকান দিয়ে বসে। হঠাৎ করে কারো কাছ থেকে বুদ্ধি নিয়ে এই হুন্ডি ব্যবসা বা সুদের ব্যবসা শুরু করে। তার বাড়ী সাবেক যশোর হাল ঝিনাইদহ জেলার কোট চাঁদপুর উপজেলায় সলেমানপুর গ্রামে। বাবার নাম পঁচা মিঞা। পরবর্তী সময় মারা গেছেন। মা ভানুবিবি কাজলের ব্যবসা আরম্ভের পূর্বেই মারা গেছেন। তিন ভাইয়ের মধ্যে একজন মারা গেছে। যাইহোক, কয়েক বছরের মুদি দোকানদার সেই কাজল কার কাছ থেকে কি যুক্তি নিয়ে বা শিখে সে এই তথাকথিত হুন্ডি ব্যবসা শুরু করে কেউ বলতে পারে না।

মজার ব্যাপার সে লোকের কাছ থেকে উচ্চ সুদে টাকা নিয়ে কোথায় কী করে তা কেউ বলতে পারে না। উচ্চ সুদে অন্যের কাছ থেকে টাকা নিয়ে প্রতিমাসে উচ্চ হারের সেই সুদ সে পরিশোধ করে। সে ব্যাপারে সে খুব নিষ্ঠাবান। কোন ত্রুটি হয় না। সুদের টাকা যথা নিয়মে সবাই পেয়ে যায়। ছোট পরিসরের এ সংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সবাই কাজলের বিশ্বস্ততার প্রসংশা করতে থাকে। কিন্তু এক বারও কেউ ভাবে না কোথায় কীসের ব্যবসায় এত টাকা খাটিয়ে দ্রুত লাভ করে সুদ পরিশোধ করছে কীভাবে?

এলাকার লোকের মধ্যে একটা জোয়ারের সৃষ্টি হয়। ক্রমান্বয়ে চারিদিকে এই ব্যবসার জোয়ারের পরিধি বিস্তৃত হতে থাকে। ঝিনাইদহসহ বৃহত্তর যশোরের বিভিন্ন অঞ্চল, কুষ্টিয়ার কিছু অঞ্চল, মাগুরা হয়ে ফরিদপুরের প্রান্তেও তার ব্যবসার বিস্তৃতি ঘটে। মাস্টার মানুষ, স্কুল নিয়েই ব্যস্ত থাকি, ব্যবসা বাণিজ্যের বৈষয়িক খবর খুব একটা রাখি না। কিন্তু আমার বিদ্যালয় বীরশ্রেষ্ঠ মন্সী আব্দুল রউফ উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মুন্সী আয়ূব আলী, যে কিনা আত্মীয়তার সম্পর্কে ছোট ভাই হয়, বললো, ‘ভাই, ছোটখাটো ব্যবসা-বাণিজ্যে তো বেশী সুবিধা করতে পারছি না, তা একটা সুযোগ আসছে ব্যবসার পুঁজিটা সেখানেই খাটাতে চাই।’ আমি জিজ্ঞাসা করায় সবিস্তারে কাজলের কাহিনী বর্ণনা করলো। আরো জানালো, ‘আমাদের বাজারে কিছু পুঁজি সম্প্রতি লগ্নি হয়েছে, আরও হবে। আমার কাছেও শুভানুধ্যায়ীরা প্রস্তাব দিয়েছে এবং আমি মোটামুটি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ­ তবে আপনার কাছে পরামর্শ নিতে চাই। আপনি কী বলেন?’ আমি বললাম, ‘যদি তুমি সিদ্ধান্ত নিয়েই থাক এবং আমার কাছে শুধু কথার কথা হিসাবে জিজ্ঞাসা করে থাক তা হলে বলার কিছু থাকে না, তবে সত্যি যদি আমার কথা বিবেচনায় নাও ­ তাহলে কোন অবস্খায়ই ওখানে টাকা দিবে না। বর্তমান যে হারে লাভ দিচ্ছে তার তিনগুণ বা চারগুণ দিলেও নয়।’ বললেন, ‘বুঝতে পাররাম না ­ কারণটা কী বলবেন?’ আমি তাকে বুঝাবার চেষ্টা করলাম, ‘নিশ্চয় পুরা ব্যাপারটাই একটা ধাপ্পাবাজি। তোমার কাছেই জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম সে এই টাকা কীসে বিনিয়োগ করে এত পরিমাণ লাভ করে যে এত চড়া সুদসহ টাকা পরিশোধ করতে পারে তার খবর কেউ জানে না। তা হলে সে কি মন্ত্র দিয়ে টাকা বানিয়ে সুদ পরিশোধ করে?’ জবাবে সে বললো, ‘খোঁজ নিয়ে জেনেছি প্রত্যেকের টাকাই সে নিয়মিত পরিশোধ করে, কোন ত্রুটি হয় না।’ আমি বললাম, ‘সেটাই তার চালাকি, ­ লোক আকৃষ্ট করার সর্বোত্তম কৌশল। এখন সে পুঁটির তেল দিয়ে পুঁটি ভাজছে, এক বিরাট অংকের টাকা জালে আটকিয়ে গুটিয়ে নিবে। কিছুই দিবে না।’ আমার কথা সে বিশ্বাস করলো। কাজলকে দিবার জন্য সংগৃহীত পুঁজি অন্য ব্যবসায় লাগাল। মাত্র ১৫/২০ দিন পরই জাতীয় দৈনিকসমূহে কাজলের বিশ্বাসঘাতকতার খবর বেরোতে শুরু করল।

কাজলের কৌশল ছিল প্রথমে চরম বিশ্বাস স্খাপন। তার সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে জানা যায় যে তার এমন পুঁজি ছিল না যা দ্বারা বড় অংকের টাকা সে লগ্নি করতে পারে। মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়ে প্রতিমাসে তার ১৪% সুদ সে পরিশোধ করত। এমনকি মূলধন চাইলে তৎসহ পরিশোধ করত। তাহলে প্রথমে তার বেশ কিছু পুঁজি খাটাতে হয়েছে। এখন প্রশ্ন হল এই প্রাথমিক পুঁজি সে পেল কোথায়? নিশ্চয়ই কোন বড় পুঁজির মালিক তার পিছনে ছিল ­ যে কখনই নিজেকে প্রকাশ করে নাই। তারপর ব্যবসা পুরা চালু হলে আর পুঁজির অভাব হবার কথা নয়। কারণ মানুষ একবার তাকে বিশ্বাস করে জোয়ারের মত যখন তাকে টাকা দিচ্ছে তখন তার হাতে অঢেল পুঁজি। হাজার হাজার মানুষ তাকে টাকা দিবার জন্য ছুটে আসছে। বহু এজেন্ট নিয়োগ করতে হয়েছে ঋণের টাকা সংগ্রহ করার জন্য। প্রত্যেক এজেন্টের একাধিক কর্মচারী। কোথাকার কে কত টাকা দিচ্ছে ইত্যাদি লিখে নিবার বিরাম নাই। আবার পূর্বে প্রদত্ত টাকার প্রতিমাসের সুদ মিটিয়ে দিবার জন্যও রয়েছে হিসাবের খাতা খুলে বিশাল কর্মচারী বা এজেন্ট বহর। এলাহী কারবার!

প্রশাসনের চোখের উপর দিয়ে হলেও এ ব্যাপারে কেউ কখনও খোঁজ-খবর নেয় নাই। বিশাল আকারে কারবার চলছে। মনে হচ্ছে ­ টাকা নিচ্ছে ­ সিন্দুকে রাখছে ­ এক মাসে টাকায় ডিম দিচ্ছে ­ আর সেখান থেকে নিয়ে সুদ বা সুদসহ মূল টাকা ফেরত দিচ্ছে চাহিদা মত। আসলে মানুষ লাভের আশায় সুদসহ মূলধন আবার লগ্নি করছে। যেন আনন্দে সবাই মাতোয়ারা। কোন ঝুঁকি নাই, কষ্ট নাই, পরিশ্রম নাই ­ অথচ নিশ্চিত লাভ। যে শোনে তারই লোভ হয়। কৃষক, শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, মাঝারী ব্যবসায়ী, চাকুরীজীবি, এমনকি কিছু কিছু উচ্চপদস্খ চাকুরীজীবিও এ ফাঁদে আটকা পড়ে। শিক্ষক, আইনজীবী, অতি দরিদ্রও। ডিম বেচে, মুরগী বেচে, ছাগল বেচে। যার গাভী আছে সেই দুধেল গাভী বেচে। হালের বলদ বেচে। সব সম্বলটুকু কাজলের হুন্ডির ফান্ডে জমা দেয়। মাস গেলে সুদ তুলে সেটাও আবার জমা দেয়। দশজন বা বিশ জন নয়, এমনকি শত শতও নয়, হাজার হাজার লোক আলোর পানে আঁধার রাতে যেমন পঙ্গপাল ছুটে আসে, তেমনি করে কাজলের পানে সবাই ছুটে এসে যথা সর্বস্ব জমা রাখে লাভের আশায়, সুদের আশায়। এভাবে ২৫ থেকে প্রায় ৫০ হাজারের মত লোক নাকি তার কাছে বিভিন্ন অংকের টাকা জমা করে। অতি দরিদ্ররা কয়েক শত বা হাজার আর একটু ভাল অবস্খা যাদের তারা হাজার হাজার বা লাখ টাকা একেক জনে লগ্নি করে। অবশ্য সামর্থ্যবানেরা ৫/১০/২০/৩০ বা ৫০ লাখের মত টাকাও নাকি অনেকে জমা দিয়েছিল।

এভাবেই তার ব্যবসার ক্রম প্রসার চলছিল। তার পর একদিন বলে বসল, ‘আমার কাছে টাকা নাই, দিব কোথেকে? আপনারা যেসব এজেন্টের মাধ্যমে টাকা জমা দিয়েছেন, তারা আমার কাছে টাকা জমা দেয় নাই।’ অথচ সমস্ত এজেন্টই তার নিয়োজিত। সবাই তার নিয়ন্ত্রণেই ছিল। তার পর যে রকম আমাদের দেশে হয় সেই রকম ঘটনা। খবর পেয়ে লোকজন কাজলের বাড়ীতে দ্রুত জমায়েত হতে থাকে। গ্রামের প্রভাবশালী লোকজনসহ বেশীর ভাগ তার পক্ষ হয়ে বাধাদানের চেষ্টা করতে থাকে এবং দ্রুত পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। ঝিনাইদহ জেলহাজতে সে বহাল তবিয়তে আছে। বছর তিনেক পরে মাঝে একবার জামিনে জেল হাজত থেকে বেরিয়ে বাড়ীতে এসেছিল। লোকজন খবর পেয়ে বাড়ী ঘেরাওয়ের উদ্যোগ নেয়। এবারও গ্রামের মানুষ তার পক্ষ নিয়ে তাকে রক্ষা করে। পুলিশ এসে আবার তাকে উদ্ধার করে ঝিনাইদহ জেল হাজতে রেখেছে। এদিকে বাড়ীতে তার সংসার নাকি দিব্যি ভালই চলছে। স্ত্রী, সন্তান, ভাইয়েরা সবাই বহাল তবিয়তে সংসার করছে। অভাব নাই বলেই সবাই মনে করে। গ্রামের প্রধান অংশ যারা বারবার তার পক্ষ অবলম্বন করে ­ তাদের সংসারও নাকি ভালই চলে বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ। কাজলের নিয়োজিত এজেন্টদের প্রায় সবাই ছিল ঐ সমস্ত পরিবারের সদস্য। কাজলের সাথে থেকে তারা প্রচুর লাভবান হয়েছিল।

ভুক্তভোগী জনগণের অভিযোগ সরকার বা প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ কাজলের এতবড় প্রতারণার বিরুদ্ধে কোন কার্যকরী ব্যবস্খা গ্রহণ করে নাই। তাদের কারো কারো ধারণা কয়েক হাজার কোটি টাকা এই প্রক্রিয়ায় জনগণের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে সহায়-সম্বলহীন লোকের সংখ্যাই বেশী হবে। তাদের অভিযোগ সম্পর্কে কোন দ্বিমত নাই। সরকার বা প্রশাসনের উচিত এতবড় প্রতারণার যথাযথ অনুসন্ধান করে অপরাধী বা অপরাধী চক্রের যথাযথ শাস্তি বিধান করা এবং সেটা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।

উপরোক্ত ঘটনাটির সঙ্গে খানিকটা সামঞ্জস্য ছিল ১৯৯৬ সালে ঢাকা স্টক এক্সেঞ্জের শেয়ার মার্কেটের ফটকা কারবারের সঙ্গে। সে ক্ষেত্রেও দেখেছি ঢাকা শহরের পান দোকানদার, চা দোকানদার থেকে শুরু করে প্রায় সর্বস্তরের মানুষের এই শেয়ার মার্কেটের ব্যবসায় হুমড়ি খেয়ে পড়ার দৃশ্য। সর্বক্ষেত্রেই আবেগ তাড়না! আর এ আবেগ সৃষ্টির পিছনের কারণ বাঙ্গালীর অতি লোভের প্রবণতা। লাভ দেখলে বা লোভের বিষয় হলে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে আমরা বাঙ্গালীরা প্রায় পাগলের মত আবেগ প্রবণ হয়ে পড়ি, কাণ্ডজ্ঞানহীনভাবে বন্যাস্রোতের মত দুকূল প্লাবিত করে ছুটে চলি; শেষ পর্যন্ত কী হতে পারে, যুক্তিগ্রাহ্যভাবে ভেবে দেখার অবসর আমাদের হয় না। আসলে বাঙ্গালীর বুদ্ধিবৃত্তির মান নীচের অঙ্কে বলেই আমাদের এমনটা হয়ে থাকে। শিক্ষা এবং জ্ঞান সাধনার মাধ্যমে বাঙ্গালীর বুদ্ধিবৃত্তির মানকে উন্নত করা একান্ত প্রয়োজনীয়।

[লেখক : পাকিস্তান আমলে তৎকালীন বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার সাবেক ছাত্র-কৃষক-ন্যাপ ও কমিউনিস্ট নেতা। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর একটা সময়ে রাজধানী ঢাকায় কেন্দ্রীয় পর্যায়ে শ্রমিক আন্দোলন ও জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করলেও বিভিন্ন প্রশ্নে নেতৃত্বের সঙ্গে মতপার্থক্যের কারণে দলীয় রাজনীতি পরিত্যাগ করেন। একটি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক হিসাবে দীর্ঘদিন নিয়োজিত থেকে অল্পদিন হল অবসরপ্রাপ্ত। – বঙ্গরাষ্ট্র, ২২ নভেম্বর, ২০০৯]

অনলাইন : ২২ নভেম্বর, ২০০৯

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
Archive