Banner
বাহাত্তরের সংবিধান অগণতান্ত্রিক, সাম্প্রদায়িক, জাতিবিদ্বেষী, একনায়কতান্ত্রিক : প্রয়োজন জনগণের গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রতিষ্ঠা -- আলী মাহফুজ

লিখেছেনঃ আলী মাহফুজ, আপডেটঃ December 13, 2012, 5:53 AM, Hits: 1749

 

এক.

 

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সংবিধান নিয়ে যত আলোচনা আর নানামুখী রাজনৈতিক তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে ইতিপূর্বে কখনই এমনটি দেখা যায়নি। সংবিধান প্রণয়নের সময়ও শাসকশ্রেণীর মধ্যে বিষয়টি নিয়ে এতখানি রাজনৈতিক আলোচনা-সমালোচনা আর হইচই হয়েছিল কিনা বলা মুশকিল। সংবিধান এখন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে উপস্থিত। রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি এবং নাগরিকগণের অভিপ্রায়ের সনদ হিসেবে সংবিধান আলোচনা রাজনীতিতে গুরুত্ব পাওয়া, গণতন্ত্র বা নাগরিকদের অধিকার কার্যকর রাখার ক্ষেত্রে ইতিবাচক। তবে বর্তমানে সংবিধানের বিষয়টি শাসকশ্রেণী যেভাবে জনগণের সামনে উপস্থিত করেছে তা গভীরভাবে ভাবনার ও বিশ্লেষণের অবকাশ তৈরি করেছে। কারণ সংবিধানের বর্তমান এই পরিবর্তন সংবিধানের গণতন্ত্রায়ন বা জনগণের অধিকার সংহত করার জন্য যে করা হচ্ছে মোটেও তা নয়। বরং শাসকশ্রেণীর কোনো অংশের ক্ষমতায় থাকা বা যাওয়ার সুযোগ-সুবিধার বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই করা হচ্ছে।

 

২০০৮ সালের ডিসেম্বরে সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর থেকে সংবিধান সংশোধন করে ১৯৭২ সালের সংবিধানকে তার ‘পূর্ব গৌরবে’ প্রতিষ্ঠিত করা জন্য নানা তৎপরতা দেখাচ্ছে। এনিয়ে তাদের নেতা-নেত্রী থেকে শুরু করে তাদের ঘরানার বুদ্ধিজীবীরা সভা-সমিতিতে বিস্তর কথা বলছেন, পত্র-পত্রিকায় কলাম লিখছেন। তাদের এই কাজ থেকে মনে হয় তারা সত্যি সত্যি ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানকে তার আদি রূপে ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে বদ্ধপরিকর। সেই তৎপরতার অংশ হিসাবে সংবিধান সংশোধনের জন্য ইতিমধ্যে ৩০ জুন ২০১১ পঞ্চদশ সংশোধনী সংসদে পাশ করা হয়েছে। এই সংশোধনীতে বলা হয়েছে - ‘এই সংবিধান বা ইহার কোনো বিধানের প্রতি নাগরিকদের আস্থা, বিশ্বাস বা প্রত্যয় পরাহত করিলে কিংবা উহা করিবার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ বা ষড়যন্ত্র করিলে তাহার এই কার্য রাষ্ট্রদ্রোহিতা হইবে এবং এই ব্যক্তি রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে দোষী হইবেন।’ পরে আরো বলা হয়েছে - ‘এই অনুচ্ছেদে বর্ণিত অপরাধে দোষী ব্যক্তি প্রচলিত আইনে অন্যান্য অপরাধের জন্য নির্ধারিত দণ্ডের মধ্যে সর্বোচ্চ দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।’ সুতরাং শাস্তির ঝুঁকি নিয়েই সংবিধান আলোচনা করতে হচ্ছে।

 

পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আগের অর্থাৎ ’৭২-এর মূল সংবিধানে ফিরে যাওয়া হয়েছে বলে আওয়ামী লীগের দিক থেকে বলা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের দিক থেকে আরও বলা হচ্ছে সংবিধানের গণতন্ত্রয়ান, ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষা এবং ভবিষ্যতে যাতে অসাংবিধানিকভাবে কেউ ক্ষমতায় যেতে না পারে সেজন্য এই সংশোধনী। তাছাড়া চলতি সংবিধানে যে তত্ত্ববধায়ক ব্যবস্থার বিধান আছে তা গণতান্ত্রিক সংবিধানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং ’৭২-এর আদি সংবিধানের সাথে বিরোধপূর্ণ, সুতরাং তা বাতিল করা হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিলের ফলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নির্বাচিত সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত হবে। প্রধান বিরোধীদল বিএনপি সংবিধানের এই পরিবর্তনকে চরম অগণতান্ত্রিক অ্যাখ্যা দিয়ে অভিযোগ উত্থাপন করেছে যে, আওয়ামী লীগ স্বৈরতান্ত্রিক কায়দায় ক্ষমতায় থাকার দুরভিসন্ধি থেকে সংবিধান সংশোধন করেছে, বিশেষ করে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করেছে। এ পরিবর্তন তারা মানে না। নির্দলীয়, নিরপেক্ষ, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ছাড়া তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না। তারা আরও বলেছে যে, আগামীতে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে সংবিধানের এই সংশোধনী বাতিল করা হবে।

 

বামপন্থী দলগুলোর একটা অংশ ’৭২-এর আদি সংবিধানে ফিরে যেতে চায়, যে সংবিধানের চার মূলনীতি- জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। এই বাম দলগুলোর প্রায় সকলে মহাজোট সরকারের শরিক অথবা কোনো না কোনোভাবে সমর্থিত। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আসলে ’৭২-এর সংবিধানে প্রবর্তন ঘটেনি। সংবিধানের মধ্যে সাম্প্রদায়িক উপাদান যুক্ত হয়েছে, বিশেষ করে ৪ মূলনীতি পুনঃস্থাপিত হয়নি। তাদের দাবি ’৭২-এর সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে, সংবিধানের অসঙ্গতি দূর করতে হবে। ইতিমধ্যে এই দাবির ভিত্তিতে তারা যৌথভাবে রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। তথাকথিত ‘সিভিল সোসাইটি’ ’৭২-এর সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠার ব্যাপারে লেখালেখি ও সভা-সেমিনার করছেন। বামপন্থীদের অন্য অংশটি অবশ্য ’৭২ এর সংবিধানকে অগণতান্ত্রিক অ্যাখ্যা দিয়ে একটি গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রতিষ্ঠার কথা বলছেন, যা জনগণের দ্বারা নির্বাচিত একটি সংবিধান সভা প্রণয়ন করবে।

 

এসকল বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে গেলে ’৭২-এর আদি সংবিধানের দিকে নজর দিতে হবে, গভীরভাবে অনুসন্ধান করতে হবে এই সংবিধানে কী আছে, অসঙ্গতিইবা কী? তারও আগে অনুসন্ধান ও পর্যালোচনা করতে হবে ’৭২-এর সংবিধান প্রণয়নের ইতিহাস, প্রক্রিয়া ও বাস্তবতা।

 

 

দুই.

 

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন। মূলত সংবিধান হলো একটি দেশের মৌলিক আইন যার কাঠামোর মধ্যে এবং যার সাথে সঙ্গতিপূর্ণভাবে প্রয়োজন অনুযায়ী ধারাবাহিকভাবে অন্যান্য আইন প্রণীত হয়ে থাকে। এই মূল আইন বা সংবিধান দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। এজন্য রাষ্ট্রের সাথে সংবিধানের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। শুধু তাই নয়, রাষ্ট্রের চরিত্রই নির্ধারণ করে দেশের সংবিধানের চরিত্র। রাষ্ট্র যে সকল স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে ও যে সকল স্বার্থ রক্ষা করে, সেই স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব ও রক্ষা রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে সংবিধানের নির্ধারিত কাজ। কাজেই রাষ্ট্রের চরিত্রই এক্ষেত্রে মৌলিক। সংবিধানের চরিত্র রাষ্ট্রের চরিত্র কাঠামোর দ্বারা সর্বতোভাবে নির্ধারিত হওয়ার কারণে রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে যেমন সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান পরিবর্তিত হয়ে থাকে, তেমনি সংকটজনক ও জরুরী পরিস্থিতিতে প্রচলিত সংবিধান রাষ্ট্রীয় শক্তির স্বার্থ রক্ষা করতে ব্যর্থ হলে সংবিধান উচ্ছেদের ঘটনাও ঘটে। ১৯৭২ সালের সংবিধানে ফেরত যাওয়া এবং রঙ-বেরঙ এর সামরিক অভ্যুত্থান প্রসঙ্গে এ বিষয়টি বিচেনায় রাখার প্রয়োজন অপরিহার্য।

 

স্বেচ্ছাচারিতার অবসান সাংবিধানিক শাসনের প্রধানতম উদ্দেশ্য, সে কারণে সংবিধান প্রণয়নের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি হলো, সরাসরি জনগণের ভোটের মাধ্যমে শুধু সংবিধান প্রণয়নের জন্যেই একটি সংবিধান সভার নির্বাচন। পাকিস্তানে ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি জাতীয় সংসদ গঠিত হয়েছিল। সে জাতীয় সংসদের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানের জন্য একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন। এ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে আওয়ামী লীগের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান বার বার বলেছিলেন যে, ৬ দফা ও ১১ দফার ভিত্তিতেই নতুন সংবিধান নির্মিত হবে। ১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) শেখ মুজিব নিজে কোন শপথ গ্রহণ না করলেও (!) তিনি জাতীয় সংসদ ও প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সদস্যদের এক শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেছিলেন। তাঁরা এই মর্মে শপথ গ্রহণ করেছিলেন যে, জনগণ আত্মনিয়ন্ত্রণের নীতি প্রতিষ্ঠার জন্য ৬ দফা ও ১১ দফা’র ভিত্তিতে সংবিধান প্রণয়নের উদ্দেশ্যে তাঁদেরকে নির্বাচিত করেছেন এবং তাঁরা সেই ভিত্তিতেই সংবিধান রচনার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন। বলাই বাহুল্য যে, ৬ দফা ও ১১ দফা’র ভিত্তিতে আত্মনিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা ছিল পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে। পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার কোনো প্রশ্ন সেখানে ছিল না, স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের কোনো চিন্তা করে জনগণ সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ভোট প্রদান করেন নি। নির্বাচনের মাধ্যমে জাতীয় সংসদকে সে সময় ৬ দফা ও ১১ দফা’র ভিত্তিতে সংবিধান রচনার যে ম্যাণ্ডেট বা এখতিয়ার দেয়া হয়েছিল সেটা ছিল পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে এমন একটি সংবিধান প্রণয়ন যাতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার স্বীকৃত হবে।

 

কোনো রাষ্ট্রের একাধিক অঞ্চলের স্বায়ত্তশাসনের ভিত্তিতে রচিত সংবিধান এবং একটি স্বাধীন দেশের সংবিধান এক জিনিস নয়। শুধু তাই নয়, একটি দেশ বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙ্গে স্বাধীন হওয়ার পর সেই স্বাধীন দেশের সংবিধান রচনার ঘোষিত লক্ষ্যকে সামনে রেখে নতুন নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই সংবিধান সভা হিসেবে এই দায়িত্ব পালন করতে পারেন। এইভাবে প্রাপ্ত দায়িত্ব বা এখতিয়ার ব্যতীত একটি স্বাধীন দেশের সংবিধান প্রণয়নের কোন গণতান্ত্রিক বৈধতা অন্য কোনো ধরনের সংসদেরই নেই।

 

এই সামগ্রিক বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে পাকিস্তান আমলে ১৯৭০ ও ’৭১ সালে পাকিস্তানের সংবিধান রচনার জন্য যে জাতীয় সংসদ নির্বাচিত হয়েছিল সেই সংসদের সাথে একই সময়ে নির্বাচিত পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক সংসদকে যুক্ত করে উভয় সংসদের সদস্যদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ। এইভাবে গঠিত জাতীয় সংসদেই স্বাধীন বাংলাদেশের খসড়া সংবিধান উপস্থিত করা হয়েছিল। সেই খসড়া সংবিধান অনুযায়ী সেই সংসদ প্রণয়ন করেছিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান।

 

১৯৭১ সালে একটি রক্তাক্ত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। এই সংগ্রামে জামায়াতে ইসলাম সহ একটি ক্ষুদ্রগোষ্ঠী যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল তারা ছাড়া গোটা দেশের জনগণ এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন এবং অবর্ণনীয় দুর্ভোগের মধ্যে নয় মাস অতিবাহিত করেছেন। এর আগে এই জনগণের রয়েছে ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনের এবং ষাটের দশকের পাকিস্তানী স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন শেষে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। তবে ’৪৭-এ সদ্য প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের শাসকদের বিরুদ্ধে ভাষার জন্য সংগ্রামের মাধ্যমে মূলত এ এলাকার জনগণের মধ্যে নতুন চেতনার উন্মেষ ঘটে, স্বাধিকার আকাঙ্ক্ষা তীব্রতা লাভ করে। ফলে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের চেতনা পরবর্তী সকল আন্দোলনে প্রভাবক হিসেবে বিদ্যমান ছিল। কিন্তু ’৭১-এর নয় মাসের সর্বাত্মক প্রতিরোধ সংগ্রামে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন দান, উদ্বাস্তু ও বিপন্ন হয়ে পড়া, অবর্ণনীয় অমানবিক অবস্থার মধ্যে বসবাস, বর্বর নির্যাতন, স্বজন হারানোর বেদনা, প্রতিরোধের স্পর্ধিত সাহস, সবকিছু মিলিয়ে মানুষের চেতনার আমূল পরিবর্তন ঘটে যায়। অতি অল্প সময়ের মধ্যে এই পরিবর্তন এত দ্রুত গতিতে এবং ব্যাপকভাবে ঘটে যে যুদ্ধের আগের মানুষ, যুদ্ধকালীন এবং যুদ্ধ পরবর্তী মানুষের মধ্যে চেতনাগতভাবে বলা যায় মূলগতভাবে পরিবর্তিত এক নতুন মানুষের উন্মেষ ঘটে। ফলে পাকিস্তানের নাগরিক যারা ছিলেন পরাধীন, স্বাধীন বাংলাদেশে স্বাধীন নাগরিক হিসাবেই তাদের আত্মপ্রকাশ ঘটে। এই স্বাধীন জনগণ এমন একটি দেশের নাগরিক যারা এখন আর পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী দ্বারা পরাধীন নয়। এবং আমাদের স্বাধীনতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার দিক হলো স্বাধীন জনগণের স্বাধীন চেতনাগত দিকটি।

 

কিন্তু স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের শাসকরা এই বিষয়টিকে একেবারেই আমলে না নিয়ে পুরনো পাকিস্তানী ধ্যান-ধারণা ও কাঠামোর মতো চিন্তা করেই তাদের রাজনৈতিক পদক্ষেপগুলো নেয়া শুরু করলেন। বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নও ছিলো সেই একই পদ্ধতি ও ধারাবাহিকতার অংশ।

 

৮ জানুয়ারি ১৯৭২ পাকিস্তানের কারাগার থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তি পান এবং ১০ জানুয়ারি বাংলাদেশে আসেন। ঐদিনই ইতিপূর্বে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তিনি রাষ্ট্রপতি ধরনের শাসনের বদলে ওয়েস্ট মিনিস্টার ধরনের সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা করেন। স্বাধীন বাংলাদেশের নতুন সংবিধান প্রণয়নের জন্য ১৯৭২ সালের ২২ মার্চ ‘বাংলাদেশ গণপরিষদ আদেশ’ জারি করা হয়। এই আদেশ (এবং এর আগে ১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারি প্রণীত বাংলাদেশ অস্থায়ী সংবিধান আদেশ) অনুযায়ী গঠিত গণপরিষদই বাংলাদেশের সংবিধান সভা হিসাবে দায়িত্ব পালন করে। এই সংবিধান সভার সদস্যরা হলেন ১৯৭০ ও ১৯৭১ সালে নির্বাচিত পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ (ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি) ও প্রদেশিক পরিষদের (প্রভিন্সিয়াল অ্যাসেম্বলি) নির্বাচিত বাংলাদেশের পক্ষাবলম্বনকারী জীবিত সদস্যবৃন্দ। এই নির্বাচনদ্বয়ে নির্বাচিত মোট সদস্য সংখ্যা ৪৬৯ জন (১৬৯ জন জাতীয় পরিষদ সদস্য ও ৩০০ জন প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য) হলেও শুরুতে গণপরিষদের সর্বমোট সদস্য সংখ্যা ছিলো ৪৩০ জন। বাকি ৩৯ জনের মধ্যে ১০ জন ইতিমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন (৫ জন পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর হাতে শহীদ হন), ২ জন পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য দেখানোর জন্য অযোগ্য ঘোষিত হন এবং ৪ জন বাংলাদেশ যোগসাজসকারী বা দালাল (বিশেষ ট্রাইবুনাল) আইনে গ্রেফতার হন, আরো ২৩ জন সদস্য দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে ২২ মার্চ ১৯৭২ রাষ্ট্রপতি কর্তৃক জারি করা বাংলাদেশ গণপরিষদ সদস্য (সদস্যপদ বাতিল) আদেশ [কন্সটিটুয়েন্ট অ্যাসেম্বলি (সিসেশন অব মেম্বারশিপ) অর্ডার (পিওন. ২৩ অব ১৯৭২)] এর অধীনে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত হয়ে গণপরিষদের সদস্যপদ হারান। এই ৪৩০ জনের মধ্যে অচিরেই আরও ১৯ জন তাদের সদস্যপদ হারান আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত হয়ে। অন্যদিকে সরকারের দুর্নীতি আর অসদাচরণের প্রতিবাদে গণপরিষদের ৩ জন সদস্য আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করে তাদের সদস্যপদ হারান, ৩ জন মৃত্যুবরণ করেন, সংবিধান পরিষদ থেকে ১ জন পদত্যাগ করে বৈদেশিক দপ্তরে যোগ দেন। অবশিষ্ঠ ৪০৩ জন সদস্য সংবিধান পরিষদে শেষ পর্যন্ত ছিলেন। এদের মধ্যে ৩ জন ছিলেন বিরোধী দলীয় সদস্য।


গণপরিষদ আদেশ অনুযায়ী সংবিধান প্রণয়নের উদেশ্যে গঠিত সংবিধান সভার (গণপরিষদ) গঠন ও কার্যপ্রণালী নিয়ে শুরুতেই দু’টি বিতর্ক উঠেছিল। একটি হলো গণপরিষদের বৈধতার ভিত্তি, অপরটি হলো গণপরিষদের এখতিয়ার।
 

স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই ১৯৭১ সালের ২১ ডিসেম্বর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (মোজাফ্ফর) এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সর্বদলীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন ও অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধান গ্রহণের জন্য আহ্বান জানায়। ওই সংবাদ সম্মেলনে ন্যাপ নেতা মোজাফ্ফর আহমেদ গুরুতর প্রশ্নটি উত্থাপন করেন, তাঁর মতে- ‘আর একটি সাধারণ নির্বাচন না করে দেশের জন্য কোনো স্থায়ী সংবিধান গ্রহণ করা যেতে পারে না।’ তাৎপর্যপূর্ণ যে উপলব্ধি থেকে তিনি এই প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন তা হলো- ‘স্বাধীনতাযুদ্ধকালে দেশে একটা গুণগত পরিবর্তন সাধন হয়েছে এবং এই পরিস্থিতিতে ভোটাভুটির মাধ্যমে জনগণের মতামত যাচাই ও বিবেচনা করার উদ্দেশ্যে অপর একটি নির্বাচন করা অপরিহার্য।’

মওলানা ভাসানী’র নেতৃত্বাধীন তখনকার একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল ‘ন্যাপ’ ‘ভোটের আগে ভাত চাই’ শ্লোগান দিয়ে ১৯৭০ সালে নির্বাচন বর্জন করে। মওলানা ভাসানী ও তাঁর সমমনা অনেক রাজনৈতিক দলেরই বেশ আগে থেকেই ‘স্বাধীন পূর্ব বাংলা’ গড়ে তোলার লক্ষ্যে জোর রাজনৈতিক তৎপরতা ছিল। সে কারণেই তারা ইয়াহিয়া খানের অধীনে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। এই দলটি নতুন সংবিধান প্রণয়নের পদ্ধতি ও বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

 

১৯৭২ সালের ১৭ মার্চ প্রকাশিত এই দলের মুখপত্র সাপ্তাহিক ‘হককথা’য় ‘সংবিধান প্রণয়ন করবে কারা’ শীর্ষক এক নিবন্ধে ইয়াহিয়া খানের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের ম্যান্ডেট নিয়ে বিজয়ী হওয়া ব্যক্তিদের স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের এখতিয়ার বিষয়ে প্রথম ইঙ্গিতপূর্ণ কথা তোলা হয়। পরবর্তীতে ১৪ জুলাই সংখ্যাটিতে আরও স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করে ‘গণপরিষদের আইনী ভিত্তি কোথায়’ শীর্ষক নিবন্ধটিতে বলা হয়- ‘জেনারেল ইয়াহিয়া খানের ৫ দফা শর্ত মেনে এই সদস্যরা নির্বাচনে গিয়েছিল। সেই নির্বাচনে পাকিস্থানের শাসনতন্ত্র প্রণয়নের জন্য জাতীয় পরিষদ তথা গণপরিষদ নির্বাচিত হয়েছিল, তৎসহ নির্বাচিত হয়েছিল প্রাদেশিক পরিষদ।...পাকিস্তান কায়েম থাকাকালে এবং বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এই দুই সময়ের ব্যবধান মাত্র নয় মাস হলেও রাজনৈতিক সচেতনতা, আশা-আকাঙ্খা ও মূল্যবোধের দিক থেকে জনগণ অনেক এগিয়ে গেছে।’ এরপর গণপরিষদ খসড়া সংবিধান উত্থাপন করলে মওলানা ভাসানী ও তাঁর রাজনৈতিক দল ন্যাপ এর বিভিন্ন ধারার তীব্র সমালোচনার পাশাপাশি গণপরিষদের বৈধতা নিয়ে আবারও সরাসরি প্রশ্ন তোলেন। ২০ অক্টোবর ১৯৭২ দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত বর্ণনা অনুযায়ী মওলানা সাহেব ভাসানী ন্যাপের কেন্দ্রীয় কমিটির বর্ধিত সভায় আবারও বলেন, ‘বর্তমান গণপরিষদে ফ্যাসিস্ট ইয়াহিয়া সরকারের আইনগত কাঠামোর অধীনে নির্বাচিত সদস্যগণ ৬ দফা দাবি আদায়ের জন্য জনগণের ম্যান্ডেট পাইয়াছিল। সুতরাং দেশের বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলির সম্মিলিত সংগ্রামে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান রচনায় তাদের কোনো অধিকার নাই।’

 

ছাত্র লীগের দুই প্রভাবশালী নেতা আসম আবদুর রব ও শাহজাহান সিরাজ ১৯৭২ সালের ৬ অক্টোবর প্রদত্ত এক বিবৃতিতে (৭ অক্টোবর দৈনিক গণকণ্ঠে প্রকাশিত) বলেন, পরিষদ সদস্যের শতকরা ৯০ জনই যেখানে স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে যুক্ত না থেকে আরাম-আয়েশে গা ভাসিয়ে দিয়ে এবং নানা ধরনের অসামাজিক কাজে লিপ্ত থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সম্পূর্ণ সময়টুকু ভারতে নির্লিপ্ত জীবন যাপন করেছে, সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের শাসনতন্ত্র প্রণয়নের অধিকার সেই সব গণপরিষদ সদস্যের আদৌ আছে বলে দেশবাসী মনে করেন না। তাঁরা আরও একটি গুরুতর প্রশ্ন তোলেন, সেটা হলো, ‘প্রায় ৫০ জনের অধিক গণপরিষদ সদস্যের (যারা দুর্নীতির দায়ে বহিস্কৃত, অনুপস্থিত ও পদত্যাগী) অবর্তমানে অর্থাৎ বাংলাদেশের এক কোটিরও বেশী লোকের প্রতিনিধিত্ব ছাড়াই গণপরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এরকম একটি অসম্পূর্ণ সংসদ সংবিধান প্রণয়নের অধিকার রাখে কিনা?’

 

উল্লেখ্য এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সদ্য দায়িত্ব গ্রহণ করা প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান শীঘ্রই কতকগুলি উপ-নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও এই উপনির্বাচনগুলো আদৌ আর অনুষ্ঠিত করা হয়নি।

 

আওয়ামী লীগের ক্ষমতাসীন নেতা শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রীয় ও সরকারি ক্ষমতা হাতে নিয়ে প্রকৃতপক্ষে স্বেচ্ছাচারী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তিনি মনে করেছিলেন, নতুন সংবিধান সভা গঠনের জন্য নির্বাচন দেয়া অর্থহীন, কারণ সে সময় নির্বাচন দিলে তাঁরাই নির্বাচিত হবেন ও সংবিধান সভা গঠন করে সংবিধান তৈরি করবেন। কাজেই নতুন নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সংবিধান সভা গঠনের কোন প্রয়োজন নেই। এর মধ্যে শেখ মুজিবের চিন্তার যে বিপজ্জনক সীমাবদ্ধতার দিকটি স্পষ্ট হয়েছিল তা হলো, পাকিস্তান আমলের পূর্ব বাংলা বা পূর্ব পাকিস্তানের সাথে স্বাধীন বাংলাদেশের পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে তাঁর অক্ষমতা। তাঁর এই উপলব্ধির অভাবের মূল কারণ ছিলো, ১৯৭১ সালে নয় মাসের স্বাধীনতা যুদ্ধকালে তাঁর নিজের কোনো প্রত্যক্ষ ভূমিকা না থাকা। শুধু তাই নয়, তাঁর এই ভূমিকার অভাব, তাঁর অনুপস্থিতি সত্ত্বেও স্বাধীন বাংলাদেশের সৃষ্টি, যা তিনি ১৯৭১ সালের মার্চ মাসেও অনেক বাগাড়ম্বর করা সত্ত্বেও বিশ্বাস করতে অপরাগ ছিলেন। তাঁর মধ্যে এমন নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল, তাঁর অহমিকাকে আঘাত করেছিল যাতে তিনি ১৯৭১ সালে কি ঘটেছিল তার বিবরণ জানার কোনো চেষ্টাই করেননি। তাঁকে তাজউদ্দিন প্রমুখ অন্যরা সেটা জানানোর চেষ্টা সত্ত্বেও তিনি তা শোনেননি, শুনতে প্রস্তু'ত ছিলেন না।

 

সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশের সরকারী দলের এবং গণপরিষদ সদস্যদের দেশব্যাপী নিপীড়ন, ত্রাণ সামগ্রী চুরি, সম্পত্তি দখল, বেপরোয়া দুর্নীতি, লুণ্ঠন সহ নানা অপরাধমূলক তৎপরতার অজস্র সংবাদ পত্রিকায় প্রচারিত হওয়া শুরু হলে অচিরেই গণপরিষদের এই সদস্যদের সংবিধান প্রণয়নের নৈতিক অধিকার নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।

 

গণপরিষদ আদেশের মাধ্যমে সদস্যগণ সংবিধান প্রণয়নের আইনগত ক্ষমতা পেলেও রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান প্রথমেই গণপরিষদকে দুই ভাবে ক্ষমতাহীন করেন। প্রথমত, আর সব গণতান্ত্রিক দেশে সংবিধান প্রণয়নী সভার হাতে রাষ্ট্রের প্রায় সকল ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকলেও গণপরিষদকে এ থেকে বঞ্চিত করা হয়। দ্বিতীয়ত, গণপরিষদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের অধিকার আইন করে রুদ্ধ করা হয়।

 

২২ মার্চ ১৯৭২ রাষ্ট্রপতি কর্তৃক জারি করা বাংলাদেশ গণপরিষদ সদস্যপদ বাতিল আদেশ [কন্সটিটুয়েন্ট অ্যাসেম্বলি (সিসেশন অব মেম্বারশিপ) অর্ডার (পিওন ২৩ অব ১৯৭২)] বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক চেতনা বিরোধী আইন। এই আদেশের মত আরও অনেক নির্বাহী আদেশেই তখন দেশ পরিচালিত হচ্ছিল এবং নির্বাহী আদেশ প্রদানের এই ধরনের মাঝেই সেই সঙ্কটের বীজ নিহিত ছিল, যা পরবর্তীতে মহীরূহ আকারে বাংলাদেশের শাসনতান্ত্রিক ইতিহাসকে আচ্ছন্ন করেছে।

 

ব্যরিস্টার আব্দুল হালিম এই প্রেক্ষিতে একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার কথা তাঁর ‘মেকিং দা কন্সটিটিউশন অব বাংলাদেশ’গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। দেশে প্রত্যাবর্তনের পর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারির যে বৈঠকে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি ধরনের সরকার থেকে ‘প্রধানমন্ত্রী ধরনের সরকার’ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন, ওই একই বৈঠকে তিনি জানান যে সংবিধান পরিষদকে আইন প্রণয়নী কিংবা মন্ত্রীসভার কাজকর্ম তদারকির কোন ক্ষমতাই দেয়া হবে না। শেখ মুজিবুর রহমানের দেবতুল্য জনপ্রিয়তার মুখে কেউ এর প্রতিবাদ করতে সাহস করেননি, কেবলমাত্র আমীর-উল-ইসলাম ‘অনভিজ্ঞতাহেতু’ আপত্তি প্রকাশ করেন এবং তাকে বোঝাবার চেষ্টা করেন যে, অস্থায়ী সংবিধান আদেশ এর খসড়া প্রণয়নের আগেই নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সভা অবশ্যই আহ্বান করা উচিৎ, আর আইন পরিষদকে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা না দেয়াটাও চরম অগণতান্ত্রিক হবে। শেখ মুজিবুর রহমান তাকে তিরস্কার করে থামিয়ে দেন- [ভাষ্যটা আব্দুল হালিম সাহেবের ‘মেকিং দা কন্সটিটিউশন অব বাংলাদেশ’ গ্রন্থ অনুযায়ী এরকম : : At this suggestion Sheikh Mujib stopped him (Amir-ul-Islam) by saying you are an inexperienced young man what khnowledge do you keep about state adminstration? হালিম সাহেবের বিবরণ অনুযায়ী ‘আমীর সাহেব ঐ বৈঠকে নিজেকে ‘স্টুপিড’ হিসাবে আবিষ্কার করলেন, ‘এক্সপিরিয়েন্সড’ ব্যক্তিরা কেউ তার সমর্থনে কিছু বলার সাহস পেলেন না।’


সংবিধান পরিষদ যে অস্থায়ী সংসদ হিসেবে বিবেচিত হবে না এবং সংবিধান গৃহীত না হওয়া পর্যন্ত প্রয়োজনীয় আইনসমূহ প্রণয়নের দায়িত্ব পাবে না, সেটা একটি তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পরবর্তী ঘটনা প্রবাহে একটা ঈঙ্গিতও এখানে পাওয়া যায়। সংবিধান প্রণীত হওয়া পর্যন্ত কেবলমাত্র রাষ্ট্রপতির নির্বাহী আদেশে রাষ্ট্র পরিচালিত হবার সাথেও এর একটা গুরুতর সম্পর্ক রয়েছে। আদতে এই কয়েকমাসের ক্ষমতার চর্চার ধরনই পরবর্তী কালের বাংলাদেশের সমগ্র রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হবার ভিত্তি রচনা করেছে এবং সেদিক থেকে বলা যায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতা চর্চার ধারাবাহিকতা প্রথমদিন থেকেই শুরু হয়ে আজও অব্যাহত আছে।

 

স্বাধীনতা পাবার পর ভারত ও পাকিস্তান উভয় রাষ্ট্রেই ১৯৩৫ সালের ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেনডেন্স অ্যাক্ট এর অধীনে ’৪৬ সালের নির্বাচনে বিজয়ীরা দুটি পৃথক সংবিধান পরিষদ গঠন করেন। তাদের বৈধতার উৎস ছিল এই যে, ওই নির্বাচনে নির্বাচিতগণ অবিভক্ত ব্রিটিশ-ভারতের জনগণের কাছ থেকে ভারত ও পাকিস্তান এই দুইটি রাষ্ট্রের সংবিধান প্রণয়নের জনরায় গ্রহণ করেছিলেন। নতুন সংবিধান গৃহীত না হওয়া পর্যন্ত নতুন রাষ্ট্রদ্বয়ের কেন্দ্রীয় আইনসভা হিসাবেও এই দুই সংস্থাই কার্যকর ছিল। এভাবে ভারত ও পাকিস্তান উভয় রাষ্ট্রে সংবিধান পরিষদ সংবিধান সভা ও আইনসভার দ্বিবিধ ভূমিকাই পালন করে। মন্ত্রীসভার উপর এর কর্তৃত্ব ছিল, মন্ত্রীসভা সংবিধান পরিষদের নিকট দায়বদ্ধ ছিল। পরিষদের অনুমতি ছাড়া সরকার কোন অর্থ ব্যয় করতে পারতো না।

 

অন্যদিকে বাংলাদেশের সংবিধান রচনার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত এই গণপরিষদের কোন আইন প্রণয়নী ক্ষমতা ছিল না, মন্ত্রীসভার ওপর কোন নিয়ন্ত্রণ ছিল না, ছিল না সরকারের ব্যয়ের ওপরও কোন তদারকির ক্ষমতা। ফলে যে বিপুল বিস্তারী রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির লুণ্ঠন, অপব্যয় এবং তাকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বৃদ্ধির কাজে বেপরোয়া ব্যবহার তা বন্ধ করার কোন আইনী ব্যবস্থা কিংবা জবাবদিহিতা আদায়ের উপায় প্রথম থেকেই ছিল না। তুলনামূলক কম দামে ইউরোপীয় নতুন জাহাজ না কিনে কিভাবে পুরনো ভারতীয় জাহাজ কিনে রাষ্ট্রীয় অর্থের লোপাট করা হচ্ছিল তাঁর বিবরণ ঐ সময়ের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় পাওয়া যাবে। ঐ সময়ে এ ধরনের অজস্র ঘটনা ঘটছিল। কলকারখানার যন্ত্রাংশ ক্রয়, ঠিকাদারী, সকল কাজেই রাষ্ট্রীয় অর্থের ব্যাপক লুণ্ঠন তদারক করার মত কোন ব্যবস্থা প্রথম থেকেই করা হয়নি। প্রায় সকল গণতান্ত্রিক দেশে এই কাজটি সংসদই করে থাকে।

 

গণপরিষদকে সংবিধান প্রণয়নের বাইরে আর কোন দায়িত্ব না দেওয়া ছিল কার্যত গণপরিষদকে ক্ষমতাচ্যুত করা, তার এখতিয়ারকে সমূলে বিনষ্ট করা। নিজ দলের ভিতরের অবিশ্বাস এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতির কারণে পরিস্থিতির বিকাশের উপর আস্থার ঘাটতি থেকেই এটা করা হয়েছিল। বিষয়টি বোঝা যায় আব্দুল হালিমকে দেয়া ঐ একই সাক্ষৎকারের উদ্ধৃতি থেকে। উদ্ধৃতিটি ছিল এরকম- ‘ব্যারিস্টার আমীর অচিরেই আবিষ্কার করেন উক্ত বৈঠকে এই মতামত ব্যক্ত করার কারণে শেখ মুজিবুর রহমান এই সন্দেহ করা শুরু করেন যে, ব্যারিস্টার আমীর নিজে তাজউদ্দীনের নেতৃত্বে একটি সংসদীয় ক্যূ করার মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমানকে উচ্ছেদ করার ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত, এবং এরই অংশ হিসেবে এ প্রস্তাব তোলা হচ্ছে। এই অভিজ্ঞতার পর আমীর সাহেব প্রত্যক্ষ রাজনীতি থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করেন।’


গণপরিষদের ভিতরে থাকা সদস্যরা কেউ কেউ গণপরিষদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে আইন প্রণয়ন, সরকার পরিচালনা, অর্থ বিষয়ক সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহ কিছু বিষয়ে ক্ষমতা প্রদানের দাবি উত্থাপন করেছিলেন বটে, তবে তারাও ব্যারিস্টার আমীরের মতই তিরস্কার ও নিগ্রহের শিকার হয়েছিলেন।


১০ এপ্রিল ১৯৭২ সংবিধান পরিষদ তার প্রথম বৈঠকে মিলিত হয় এবং ৩৪ সদস্যের একটি খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠিত হয়। এই খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটিতে একমাত্র বিরোধীদলীয় সদস্য ছিলেন ন্যাপের (মোজাফফর) সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। সংবিধান পরিষদের দ্বিতীয় দিনের সভায় শেখ মুজিবুর রহমান আশ্বাস প্রদান করেন যে, সকল ধরনের মতামতকে বিবেচনা করা হবে। কিন্তু যখনই আওয়ামী লীগের দলীয় সদস্য কে. এম. ওবায়দুর রহমান গণপরিষদের হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দায়িত্ব দাবি করেন আওয়ামী লীগের পার্লামেন্টারী পার্টির প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান তাকে হুঁশিয়ার করে বলেন যে, কোন দলীয় সদস্য দলকে আগে না জানিয়ে এবং অনুমোদন না নিয়ে কোন প্রস্তাব উত্থাপন করতে পারবে না। এই শৃঙ্খলার যে কোন অনিয়মের ফল হবে ‘বাংলাদেশ গণপরিষদ সদস্য (সদস্যপদ বাতিল) আদেশ’ অনুযায়ী এই সদস্যের গণপরিষদ সদস্যপদ থেকে বহিষ্কার। পরিস্থিতিটিকে সমাজবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী যেভাবে মূল্যায়ন করেছেন তার বঙ্গানুবাদ মোটামুটি এই রকম : ‘শেখ মুজিবের উপরোক্ত বক্তব্যে শেখ মুজিব আর নেতৃবৃন্দের এই দৃষ্টিভঙ্গি আর চিন্তাভাবনাই প্রতিফলিত হয় যে, গণপরিষদের দলীয় সদস্যগণ নেতৃবৃন্দের হাতের মুঠোয় থাকা নামমাত্র প্রতিনিধি মাত্র।’ এরপর থেকে কোন কার্যকর বিষয়েই গণপরিষদ আর আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের সাথে কোন পার্থক্য আর রইল না। মুজিব আমলের প্রথম রাজনৈতিক আদেশটি এভাবেই সত্যিকারের সংসদীয় প্রকৃতির শাসনের বদলে প্রধানমন্ত্রীর একনায়তন্ত্রে পর্যবসিত হয়। এবং এই আদেশ বলেই আওয়ামী লীগের বহু সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা গণপরিষদ সদস্য, যারা স্বৈরতান্ত্রিক কায়দায় সংবিধান প্রণয়নের সাথে একমত হতে পারেননি তারা দল থেকে এবং গণপরিষদ থেকে বহিষ্কৃত হন।

 

১৯৭২ সালের ১২ অক্টোবর খসড়া সংবিধান প্রস্তাব আকারে সংসদে উত্থাপন করা হলে- ন্যাপ (মোজাফ্ফর)-এর সদস্য সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত সংসদে তাদের আলোচনায় খসড়া শাসনতন্ত্র নিয়ে জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব দিয়ে বলেন, আওয়ামী লীগের সকল গুরুত্বপূর্ণ নেতাও ১৯৫৬ সালের পাকিস্তানের সংবিধানের উপর জনরায় নেয়ার জন্য গণভোটের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, যেসব ধারার নিন্দা আওয়ামী লীগ ’৫৬ সালে করেছিল, হুবহু সেগুলোই তারা স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে প্রবিষ্ট করিয়েছে। তিনি আরো বলেন, ‘৬২ সালের শাসনতন্ত্র করা হয়েছিল আইয়ুব খানকে সামনে রেখে; বর্তমান শানসতন্ত্রে প্রধানমন্ত্রীকেও বেশি ক্ষমতা দেয়া হয়েছে।....শাসনতন্ত্রে যখন সমাজতন্ত্র করার কথা বলা হয়েছে তখন শাসনতন্ত্রের উপর বিশেষজ্ঞদের মতামত নিতে আইনমন্ত্রী গিয়েছেন ব্রিটিশের কাছে।’

 

মানবেন্দ্র লারমা বলেন, ‘শাসনতন্ত্র বিলের প্রতিটি ধারাই প্রমাণ দেয় যে, এক হাতে জনগণকে অধিকার দেয়া হয়েছে, আবার অন্য হাতে সে অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। জাতিসত্তার স্বীকৃতি দাবি করে তিনি বলেন, আমি সেই নির্যাতিত ও নিপীড়িত জাতিসত্তার একজন।....আমরা বাংলাদেশের জনগণের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে বাঁচতে চাই। কিন্তু আমাদের দাবি আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনের। খসড়া সংবিধানে আমাদের জাতিসত্তার কথা নেই।’

 

সংবিধানের নানান ধারার মাঝে স্বৈরতান্ত্রিক উপদান বিষয়ে বিরোধীদলগুলো নানাভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। গবেষক, লেখক বদরুদ্দীন উমরের একটি পর্যবেক্ষণ এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য। এই পর্যবেক্ষণে তিনি বলেন - এই সংবিধান প্রণয়নের দায়িত্ব পেটিবুর্জোয়া শ্রেণী পালন করেছিল, তাদের শ্রেণীগত দুর্বলতা আর অস্থিরতা দিয়েই সংবিধানের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি চিহ্নিত করেছেন। যে ধারার উপস্থিতির কারণে গণপরিষদের কোন সদস্য স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে আইনানুগভাবে অক্ষম ছিলেন, এবং যে ধারাটি গণপরিষদকে কার্যত আওয়ামী লীগের পার্লামেন্টারি পার্টির সাথে একাকার করে ফেলেছিল, সেই বাংলাদেশ গণপরিষদ সদস্য (সদস্যপদ বাতিল) আদেশটিও খসড়া সংবিধানের একটি অনুচ্ছেদ হিসাবে (অনু: ৭০) সংযোজিত হয়। এই ধারাটিকে উপলক্ষ্য করে বদরুদ্দীন উমর বাংলাদেশের শাসকশ্রেণীর সংকটটিকে যেভাবে বিশ্লেষণ করেছেন, খসড়া সংবিধান প্রকাশ হবার পর ১৯৭২ সালের ২৯ অক্টোবর A constitution for perpetual emergency নামের একটি নিবন্ধে তা প্রকাশিত হয়, বাংলা অনুবাদে দাঁড়ায় চিরস্থায়ী জরুরি অবস্থার একটি সংবিধান। এখান থেকে একটি দীর্ঘ অনুচ্ছেদের আংশিক উদ্ধৃতি খুবই প্রাসঙ্গিকভাবে তুলে ধরা হলো : ‘শাসকশ্রেণী যে রাষ্ট্রের মৌলিক সবগুলো প্রতিষ্ঠানকে বিপুল পরিমাণে অবিশ্বাস করে এই সংবিধান তারই ইঙ্গিতবহ এবং সংবিধানটি সংসদীয় সংখ্যাধিক্যের সাহায্যে সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় রসদ যোগান দেয়। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ ইঙ্গিত দেয় যে বর্তমান পরিস্থিতিতে এমনকি সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতাকেও নির্ভরযোগ্য শর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না। ফলে এটাকে স্রেফ প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব একটা হাতিয়ার বানিয়ে ফেলা হয়েছে, যাকে শাসকগোষ্ঠীর একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রে অসীম ক্ষমতা চর্চা করার অধিকার দেয়া হয়েছে।’
 

১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর নতুন সংবিধান কার্যকরী হয়। তবে ১৯৭৩ সালের ৭ এপ্রিল নতুন সংসদের সভা অনুষ্ঠিত হবার আগ পর্যন্ত ২১০টি নির্বাহী আইন প্রণয়ন করা হয় কোনরকম আলোচনা বা জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থার সাথে পরামর্শ বা বৈঠক ছাড়া। এভাবে নতুন সংসদের অধিবেশন বসার আগ পর্যন্ত রাষ্ট্র কার্যত রাষ্ট্রপতির নির্বাহী আদেশবলে পরিচালিত হয়।

 

১৯৭০ সালে নির্বাচিত জাতীয় সংসদ ও প্রাদেশিক পরিষদের সমন্বয়ে গঠিত পার্লামেন্টের অধীনে সংবিধান প্রণয়নের উদ্দেশ্যে একটি নতুন সংবিধান সভার জন্য কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠান না করার মধ্যে যে অবৈধতা ও ক্ষমতাসীনদের বেপরোয়া ঔদ্ধত্য ছিল তাই ১৯৭২ সালের সংবিধানে খুব স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। একটি সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার প্রক্রিয়ায় রাজনীতির ক্ষেত্রে যে সব নতুন শক্তির আবির্ভাব ঘটেছিল এবং সংবিধান রচনার ক্ষেত্রেও তাদের যে প্রতিনিধিত্বমূলক ভূমিকার প্রয়োজন ছিল তার গুরুত্ব উপলব্ধি নতুন রাষ্ট্রের প্রধানের পক্ষে সম্ভব হয় নি। কমিউনিস্ট নামধারী যে বামপন্থীরা আওয়ামী লীগের তল্পিবাহক হিসাবে ভূমিকা পালন করেছিলেন এ ব্যাপারে তাদেরও উপলব্ধি ছিলো না। কাজেই স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যেসব রাজনৈতিক দলের সংবিধান রচনা সহ অন্যান্য ক্ষেত্রে অবদান রাখার সুযোগ ছিলো ও যাঁদের প্রতিনিধিত্বের জন্য পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সংবিধান সভার নতুন নির্বাচন দরকার ছিলো তা সম্পূর্ণ অস্বীকার করে পাকিস্তানী জাতীয় সংসদকে দিয়েই ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন করা হয়েছিলো।

 

 

তিন.

 

এখন দেখা দরকার ’৭২ এর মূল সংবিধানে জনগণের অধিকারের কী বার্তা আছে। সেখানে অসংগতি, স্ববিরোধিতা অথবা প্রতারণাই বা কী আছে। ’৭২ এর সংবিধানের কয়েকটি অতি ব্যবহৃত ধারা নিয়ে সংক্ষেপে আলোকপাত করা যাক।

 

ক) রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ (প্রয়োগের মালিক প্রধানমন্ত্রী): সংবিধানের ১ম ভাগের অনুচ্ছেদ ৭-এ পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করেছে ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ’। কিন্তু বিষয়টি এখানে শেষ হয়নি, বাক্যটি একটি সেমিকোলন (;) চিহ্ন দিয়ে ঘোষণা করা হয়েছে যে, ‘এই ক্ষমতা কেবল সংবিধানের অধীনে ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে’। এখানে যে প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবে আসে তাহলো সংবিধান জনগণের এ ক্ষমতা কাদের কিভাবে প্রয়োগের দায়িত্ব দিয়েছে?

 

সংবিধানের ৪র্থ ভাগ থেকে একাদশ ভাগ পর্যন্ত ক্ষমতা প্রয়োগের বিভিন্ন দিক নির্ধারিত আছে। সংবিধানের ৪র্থ ভাগ হলো রাষ্ট্রপতি বিষয়ক। এ ভাগের অনুচ্ছেদ ৪৮(৩) লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে [অনু: ৪৮(৩): এই সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের (৩) নং দফা অনুসারে কেবল প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের ক্ষেত্র ব্যাতীত রাষ্ট্রপতি তাঁহার অন্য সকল দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কার্য করিবেন; তবে শর্ত থাকে যে, প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে আদৌ কোন পরামর্শ দান করিয়াছেন কিনা এবং করিয়া থাকিলে কি পরামর্শ দান করিয়াছেন, কোন আদালত সেই সম্পর্কে কোন প্রশ্নের তদন্ত করিতে পারিবেন না] রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ ব্যতীত সকল ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করেন। অর্থাৎ সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে যে সকল ক্ষমতা দিয়েছে বলে প্রাথমিক পাঠে মনে হয় তার কোনটাই তার এখতিয়ারাধীন নয়, সবই তিনি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োগ করতে বাধ্য। বিচারপতি বা নির্বাচন কমিশনের নিয়োগ, যে কোন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামীর দণ্ড মওকুফ, কোন কিছুই প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ব্যতীত করার ক্ষমতা সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে দেয়নি।

 

সংবিধান সাধারণভাবে পাঠ করলে মনে হতে পারে রাষ্ট্রপতি প্রতিরক্ষা বিভাগের সর্বাধিনায়ক (অনু: ৬১) তিনি প্রধান বিচারপতি সহ অন্যান্য বিচারপতি ও এটর্নী জেনারেল নিয়োগ করার অধিকারী (অনু: ৬৪ ও ৯৫), কিংবা তিনি নির্বাচন কমিশন (অনু: ১১৮) মহাহিসাব নিরীক্ষক (অনু: ১২৭) বা কর্মকমিশন প্রতিষ্ঠা ও নিয়োগের ক্ষমতার অধিকারী (অনু: ১৩৭)। কিন' পূর্বোক্ত অনুচ্ছেদ ৪৮(৩) মনে রাখলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে এ সকল ক্ষমতা প্রয়োগ দৃশ্যত রাষ্ট্রপতি কর্তৃক হলেও প্রকৃতপক্ষে তিনি প্রধানমন্ত্রীর ক্রীড়নক বৈ কিছু নয়। সংবিধান তাঁকে দিয়েছে অনুচ্ছেদ ৫৬(৩) অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের ক্ষমতা। তবে অনুচ্ছেদ ৫৬(৩) এ বলা হয়েছে, যে সংসদ সদস্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন বলিয়া রাষ্ট্রপতির নিকট প্রতীয়মান হইবেন, রাষ্ট্রপতি তাহাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করিবেন। অর্থাৎ প্রকৃতঅর্থে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের ক্ষমতাও তার নয়, এটি হলো সংসদ সদস্যের ক্ষমতা। রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রয়োগকৃত ক্ষমতার বাইরে সংবিধান প্রধানমন্ত্রীকে প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী করেছে (অনু: ৫৫), মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী নিয়োগ ও নিয়োগের অবসান ঘটানোর এখতিয়ারও সংবিধান প্রধানমন্ত্রীকেই দিয়েছে [অনু: ৫৬(১) ও ৫৮(২)]। মন্ত্রীসভাকে যদিও যৌথভাবে সংসদের কাছে দায়বদ্ধ করা হয়েছে [অনু: ৫৫(৩)], কিন্তু সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ [(১) কোন নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোন ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি (ক) উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা (খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোট দান করেন, তাহা হইলে সংসদে তাঁহার আসন শূন্য হইবে] উল্টো সংসদকে দলের কাছে জিম্মি করে দিয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী যদি দলীয় প্রধান হন তবে সংবিধান তার কাছে যে ক্ষমতা অর্পণ করেছে তা পুরাকালের সম্রাটদের জন্যও ঈর্ষণীয়। সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে উচ্চকণ্ঠে রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার মালিকানা জনগণের বলে ঘোষণা করলেও তা ভোগ করার সকল ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করে দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীকে। জনগণকে নির্বাচন কমিশন নির্ধারিত পদ্ধতিতে ও সময়ে ভোট দানের অধিকার ছাড়া তার ক্ষমতা প্রয়োগের অন্য কোন বিধান এ সংবিধানের কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না।

 

তবে এসব আলোচনার কেন্দ্রে একটি বিবেচনা অবশ্যই রাখতে হবে, আর তা হলো, সংবিধান অনুযায়ী সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ হলেও কিভাবে তারা দাস হয়ে যায়। বিবেচনায় রাখতে হবে কে কার কাছে জবাবদিহি করবে, মালিক দাসের কাছে, নাকি দাস মালিকের কাছে। দেখা দরকার ’৭২ এর সংবিধান এ প্রশ্নটি কিভাবে কার পক্ষে ফয়সালা করেছে।

 

খ) রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি ঘোষণা ও বাস্তবায়নের রূপরেখা: সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগ হলো রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি সংক্রান্ত। এই মূলনীতিগুলোকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি পরিচালনার মূলসূত্র, আইন প্রণয়নের কালে প্রয়োগ আইন ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে নির্দেশক হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এসব মূলনীতি হচ্ছে বহুল আলোচিত ‘জাতীয়তাবাদ’, ‘সমাজতন্ত্র’, ‘গণতন্ত্র’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ এবং এইসব মূলনীতি হইতে উদ্ভূত অন্যান্য নীতি। মূলনীতিসমূহ প্রসঙ্গে যদিও বলা হয়েছে যে এসব মূলনীতি অনুযায়ীই রাষ্ট্র পরিচালিত হবে, তবে অনুচ্ছেদ ৮(২) শেষ বাক্যটির শেষ অংশে একটি ‘তবে’ দিয়ে একটি শর্ত যুক্ত করা হয়েছে এইভাবে- ‘তবে এই সকল নীতি আদালতের মাধ্যমে বলবৎযোগ্য হইবে না।’ অর্থাৎ মূলনীতি অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালিত না হলেও কোন প্রশ্ন তোলা যাবে না।

 

মূলনীতি থেকে উদ্ভূত নীতিসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আরো আছে মালিকানার নীতির কথা (অনু: ১৩), কৃষক শ্রমিকের মুক্তির কথা (অনু: ১৪), মৌলিক প্রয়োজনের ব্যবস্থা অর্থাৎ অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা ইত্যাদির কথা (অনু: ১৫), গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষি বিপ্লবের কথা (অনু: ১৬), অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার কথা (অনু: ১৭), জনস্বাস্থ্য ও নৈতিকতার কথা (অনু: ১৮), মানুষে মানুষে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য বিলোপ ও সম্পদের সুষম বন্টন নিশ্চিত করার কথা (অনু: ১৯), কর্মকে অধিকার হিসাবে স্বীকৃতি এবং অনুপার্জিত আয় ভোগ না করতে পারার বিধান চালু করার কথা (অনু: ২০)। মূলনীতিসমূহ একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে, এ অংশটিকে দুইভাগে ভাগ করা যায়। এর একটি অংশ রাজনৈতিক এবং অপরটি অর্থনৈতিক। রাষ্ট্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে তার বাস্তবায়ন আদালতের এখতিয়ারের বাইরে রাখা হয়েছে। এ নিয়ে যদি কোন প্রশ্ন নাও তোলা হয় কিন্তু রাষ্ট্র যদি তার ঘোষিত নীতির বিপরীত কোন নীতি বাস্তবায়নে ব্যাপৃত হয় তবে তা আদালত যোগে বন্ধ করা যাবে কিনা এ প্রশ্নটি কিন্তু চলে আসে। এর উত্তর পেতে হলে দেখতে হবে অনুচ্ছেদ ৮০, সেখানে সংসদকে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, দেখতে হবে অনুচ্ছেদ ২৬, যেখানে আইন প্রণয়নে রাষ্ট্রের ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু তার চাইতেও বেশি দেখতে হবে সংবিধানের দশম ভাগে অনুচ্ছেদ ১৪, সেখানে সংসদকে দুই তৃতীয়াংশ ভোটে সংবিধানের সবকিছুই পরিবর্তন বা রহিতকরণের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে- হোক তা মূলনীতি, হোক তা মৌলিক অধিকার, হোক তা অন্য যা কিছু। এখানে এসে রাষ্ট্রের মূলনীতি শুধুমাত্র কাগুজে সু-সমাচারে পর্যবসিত হয়ে যায়। যা সংবিধানের শোভা বর্ধনকারী কিন্তু বাস্তবে যার প্রয়োগ না করে এর সম্পূর্ণ বিপরীত পথে চললেও তা কোনভাবেই সংবিধান লঙ্ঘন হয় না এবং তা বন্ধ করার কোন বৈধ বা সাংবিধানিক ব্যবস্থা রাখা হয়নি। গুরুত্বপূর্ণ হলো, সংবিধান সংশোধনের এখতিয়ার কার কাছে থাকবে? এই যে গণতান্ত্রিক কায়দায় সংবিধান প্রণীত হলো তাতে পার্লামেন্টে দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেই সংবিধান সংশোধন করা যাবে। এভাবে কি সংবিধান সংশোধন করা যায়? যায় না। জনগণের অভিপ্রায়ের প্রকাশ যদি হয় সংবিধান, তার স্বাধীনতা রক্ষার সনদ যদি হয় সংবিধান তাহলে জনগণের ঊর্ধ্বে কারো অবস্থান হতে পারে না। সুতরাং জনগণ তার অভিপ্রায় হিসাবে যা ঠিক করবেন সেটা সংশোধনের এখতিয়ার কোনভাবেই আইনসভার কাছে থাকতে পারে না। তার মানে জনগণের অনুমোদন ছাড়া সংবিধান সংশোধন হতে পারে না। আমেরিকার বিপ্লবের সময়, তার স্বাধীনতার সময় আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের যিনি রচয়িতা সেই থমাস জেফারসন পরিষ্কার করে বলেছিলেন যে, সংবিধান সংশোধন করার এখতিয়ার সাধারণ পার্লামেন্টের হাতে থাকতে পারে না। আইনসভার সদস্যরাতো নিজেরাই এই সংবিধানের, অর্থাৎ জনগণের অভিপ্রায়ের আইনী সনদ কর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত। সুতরাং তারা নিজেরা যদি সংবিধান সংশোধন করতে যান তাহলে তাদের নিজেদের ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের যা উৎস তাকেই অস্বীকার করেন। কাজে কাজেই তারা নিজেদেরকেও অস্বীকার করেন। সুতরাং সাধারণ পার্লামেন্টের কাছে সংবিধান সংশোধনের এখতিয়ার থাকতে পারে না। সংবিধান সংশোধন করতে হলে আবশ্যিকভাবে জনগণের অনুমোদন নিতে হবে। আজকের দিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও যেমন পার্লামেন্ট সংবিধান সংশোধন করতে পারে না তেমনি ইউরোপের বহু দেশে সংবিধান সংশোধনে জনগণের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। ড. কামাল হোসেন যিনি বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতাদের অন্যতম প্রধান সম্প্রতি তিনি বলেছেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর জন্য গণভোটের প্রয়োজন ছিল। অথচ এর বিধান কিন্তু তারাই রাখেননি। এমনকি ’৭২ এর সংবিধান প্রণয়নের সময়ও গণভোটের ব্যাপারটি বিবেচনায় নেননি। এমনকি সংবিধানের ৪র্থ সংশোধনীর মাধ্যমে যখন সংবিধানের চরিত্রের আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে একদলীয় শাসনব্যবস্থা ‘বাকশাল’ কায়েম করা হলো তখনও কিন্তু তারা জনগণের মতামতের তোয়াক্কা করেননি। শাসকশ্রেণীর কী স্ববিরোধিতা!

 

গ) রাষ্ট্রের আয়-ব্যয়: (প্রশ্নের উর্ধ্বে?) : সংবিধানের ৫ম ভাগ রাষ্ট্রের আইন প্রণয়নের জন্য আইনসভা তথা সংসদকে ক্ষমতা প্রদান করেছে (অনু: ৬৫) এবং আইন প্রণয়ন ও অর্থ সংক্রান্ত পদ্ধতির বিধান নির্ধারিত করা আছে অনুচ্ছেদ ৮০-৯২ এ। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৮১ অনুযায়ী কর আরোপ, নিয়ন্ত্রণ, রদবদল, মওকুফ, সরকার কর্তৃক ঋণ গ্রহণ, গ্যারান্টিদান, কিংবা সরকারের আর্থিক দায়দায়িত্ব সম্পর্কিত আইন সংশোধন ইত্যকার যাবতীয় বিল অর্থবিলের আওতাভুক্ত করা হয়েছে। সহজভাবে বললে রাষ্ট্র কিভাবে, কার কাছ থেকে কত টাকা আদায় করে কার জন্য কত টাকা খরচ করবে তা নির্ধারণের জন্য যে বিল আনা হয় তাকে অর্থ বিল বলা হয়। সংবিধানের ৮৩ নং অনুচ্ছেদ যদিও সংসদ সদস্য কর্তৃক পাশকৃত আইনের অনুমোদন ছাড়া এ কাজটি করার ক্ষমতা কাউকে দেয়নি কিন্তু অনুচ্ছেদ ৮১(৩) অনুযায়ী স্পীকার কোন বিলকে অর্থ বিল হিসাবে সার্টিফিকেট দেওয়ার পর এ বিষয় চূড়ান্ত এবং এ সম্পর্কে আদালতে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না। কী ভয়ঙ্কর? রাষ্ট্রের অর্থ যে কোন ভাবে খরচ করলে, আত্মসাৎ করলে, লুণ্ঠন করলেও তার বৈধতার কি চমৎকার আইনী প্রক্রিয়া। জনগণের কোনো প্রশ্নেরও কোন অবকাশ সেখানে নেই। হায় সেলুকাস! আর এ অনুচ্ছেদ সমূহের সাথে আগে উল্লেখিত রাষ্ট্রের মূলনীতি অংশের সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা (অনুচ্ছেদ ১০), জনগণের অনগ্রসর অংশকে সকল প্রকার শোষণ থেকে মুক্তি দান (অনু: ১৪), অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা-চিকিৎসা সহ জীবনধারণের অধিকার (অনু: ১৫), নগর ও গ্রামাঞ্চলের বৈষম্য ক্রমাগত দূর করা ইত্যাদি সু-সমাচার সমূহের বিপরীতে রাষ্ট্র ক্রমাগত পুঁজির দাসে পরিণত হলেও কেন তা সংবিধান সম্মত রয়ে যায় ধাঁধাটির কিছুটা উত্তর এখানে এসে পাওয়া যাবে।

 

ঘ) রাষ্ট্রের নাম বাংলাদেশ (আইন পাকিস্তানের/ব্রিটিশের) : সংবিধানের একাদশ ভাগে অর্থাৎ একেবারে শেষ দিকে একটি প্রায় অনুল্লেখ্য অনুচ্ছেদ হলো ১৪৯, যাতে বলা হয়েছে- “১৪৯। এই সংবিধানের বিধানবলী সাপেক্ষে সকল প্রচলিত আইনের কার্যকরীতা অব্যাহত থাকিবে, তবে অনুরূপ আইন এই সংবিধানের অধীন প্রণীত আইনের দ্বারা সংশোধিত বা রহিত হইতে পারিবে।”

 

এখানে আইন এবং প্রচলিত আইন বলতে কি বুঝাবে তার সংজ্ঞা ও ব্য্যখ্যা দেয়া হয়েছে অন্যান্য ব্যাখ্যার সাথে অনুচ্ছেদ ১৫২ তে। ‘আইন’ অর্থ কোন আইন, অধ্যাদেশ, আদেশ, বিধি, প্রবিধান, উপ-আইন, বিজ্ঞপ্তি ও অন্যান্য আইনগত দলিল এবং বাংলাদেশে আইনের ক্ষমতাসম্পন্ন যে কোন প্রথা বা রীতি। এবং ‘প্রচলিত আইন’ অর্থ এই সংবিধান প্রবর্তনের অব্যবহিত পূর্বে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সীমানায় বা উহার অংশ বিশেষে আইনের ক্ষমতাসম্পন্ন কিন্তু কার্যক্ষেত্রে সক্রিয় থাকুক বা না থাকুক, এমন যে কোন আইন। উপরোক্ত অংশটুকু পাঠ করলে যে কোন পাঠকেরই অনুধাবন করার কথা যে সংবিধানটি গৃহীত হওয়ার পূর্বে যা ছিলো, সংবিধান গৃহীত হওয়ার পরও তাই আছে- অর্থাৎ পাকিস্তানী আমলে যে সব আইন, বিধি-বিধান জারী ছিলো, যা ছিলো ব্রিটিশদের পরিত্যক্ত- তাই দুই দুইবার স্বাধীনতার পরও দাড়ি, কমা সমেত বাংলাদেশে জারী করা হলো। ’৭১ সালে আমরাতো পাকিস্তানের সামরিক, আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই লড়েছিলাম এবং তাকে পরাস্তও করেছিলাম। তাহলে আমরা কী করে ঠিক ঠিক সেই পাকিস্তানী আমলের সামরিক, আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রকেই কার্বন কপি করে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশে অতি দ্রুত পারদর্শীতায় খাড়া করলাম?

 

সংবিধানে বহু কথা বলা আছে। বহু অসম্ভব অঙ্গীকার করা হয়েছে, ন্যায়ানুগ- সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার, একটি গণতান্ত্রিক ও মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন সমাজ গড়ার অঙ্গীকার। কিন্তু এখানে এসে সংবিধান একদম চুপ। শুধু বলা হলো সংসদ এইসব আইন পরিবর্তন করতে পারবে। এই ঘোষণা অর্থহীন, তাতো পারবেই, কিন্তু কোথাও উচ্চারণ করা হলো না এ আইনসমূহকে সংবিধানের মূলনীতি বা বাংলাদেশের মানুষের আকাঙ্খার সাথে সঙ্গতিপূর্ণভাবে পরিবর্তন করার জন্য নিকট বা দূর ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের দায় আছে কিনা। বরং উল্টো, সংবিধানে যেখানে মৌলিক অধিকার সমূহের বিবরণ দেয়া হয়েছে সে অধিকারসমূহকে ‘আইনানুযায়ী’ বা ‘আইনের বিধান সাপেক্ষে’ বা ‘জনস্বার্থে প্রচলিত আইনের বিধি নিষেধ সাপেক্ষে’ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করে কিভাবে পঙ্গু করে দেয়া হয়েছে তার একটি উদাহরণ এখানে দেয়া যেতে পারে। অনুচ্ছেদ ৩২-এ বলা হয়েছে- “আইনানুযায়ী ব্যাতীত জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতা হইতে কোন ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাইবে না।”

 

তার অর্থ দাঁড়ায়- আইনের মাধ্যমে ছাড়া কোন ব্যক্তিকে জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতা হতে বঞ্চিত করা যাবে না, অর্থাৎ আইন নির্ধারিত পদ্ধতিতে তা করা যাবে। এবং এ জন্যই ‘ক্রসফায়ার’ এর মতো বর্বর ব্যবস্থাটিও সংবিধানসম্মত হয়ে যায়। কারণ দেখানো যায় ‘ক্রসফায়ার’ও আইনসম্মত। ১৮৯৮ সালের ব্রিটিশ প্রবর্তিত ফৌজদারী কার্যবিধি বা সংবিধানের ১৪৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আইন তার ৪৬ ধারা অনুযায়ী বিচারে মৃত্যুদণ্ড বা যাবৎজীবন কারাদণ্ড হতে পারে এমন অভিযোগে অভিযুক্ত আসামীকে গ্রেফতার করার ক্ষেত্রে ছাড়া পুলিশ কাউকে হত্যা করতে পারবে না। তবে এমন কোন ঘটনা ঘটলে ১৮৬১ সালে প্রবর্তিত পি.আর.বি-এর ১৫৭ নং রেজুলেশন অনুযায়ী একটি প্রশাসনিক তদন্তে গুলি ছোঁড়ার ঘটনাটিকে justified করলেই হত্যাকাণ্ডটি আইন অনুযায়ী হয়ে যায়। সেই জন্য পুলিশের/র‍্যাবের গুলিতে নিহত প্রত্যেককে সন্ত্রাসী ও খুনের মামলার আসামী হতে হয়।

 

সংবিধান অনুযায়ী ব্যাংক-বীমা লুটপাট করা যায়, লুটপাটকৃত অর্থের উৎস না জানিয়েই বিনিয়োগ করা যায়। সংবিধান অনুযায়ীই যেমন বিনা বিচারে খুন করা যায়, সংবিধান অনুযায়ী তেমন বিনা বিচারে আটক রেখে নির্যাতন করা যায়। তেমনি যত খুশি লুটপাট করে অর্থ সম্পদের মালিক হওয়া যায় (অনু: ৪২) এর সকল কিছুর পক্ষে আইন তৈরি করাই আছে, আর না থাকলে ইচ্ছা করলেই তৈরি করা যায়। ’৭২ এর সংবিধান কোনভাবেই তার প্রতিবন্ধক নয়।

 

ঙ) সংবিধানের বর্ণবাদী ও সাম্প্রদায়িক ভিত্তি (বাঙালী ছাড়া অন্যান্য জাতির অস্বীকৃতি) : বাংলাদেশের জনগণ পাকিস্তানী শাসকদের বিরুদ্ধে ২৩ বছর ধরে জাতিগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে স্বাধীনতা অর্জন করে। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির মধ্য দিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পরেই পাকিস্তানী শাসকদের বিরুদ্ধে ভাষার সংগ্রামে লিপ্ত হতে হয়েছিল এদেশের জনগণকে। এই সংগ্রামে জীবন উৎসর্গ করেছেন অনেকেই। বলা যায় ভাষা সংগ্রামের চেতনা আমাদের স্বাধিকারের চেতনার উৎসমুখ। সেই সংগ্রামের ধারাবহিকতায় ’৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলে শামিল হয়েছিলেন। দুর্ভাগ্যজনক হলো, বাংলাদেশের স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই প্রতিষ্ঠিত ’৭২ এর সংবিধানে বাঙালী ছাড়া অন্য কোন জাতিসত্তার স্বীকৃতি মিললো না। সংবিধানের প্রথম ভাগে অনুচ্ছেদ ৬ এ নাগরিকত্ব সম্পর্কে বলা আছে ‘বাংলাদেশের নাগরিকগণ বাঙালী বলিয়া পরিচিত হইবেন’ অর্থাৎ সংবিধানে একেবারে প্রথমেই বাঙালী ছাড়া অন্যান্য জাতির অস্তিত্বকে স্বীকার করা হলো না। এমনকি মুক্তিযুদ্ধে যে বাঙালী ছাড়াও অন্যান্য জাতিসত্তার অংশগ্রহণ ছিলো, জীবনদান ছিলো তা বেমালুম অস্বীকার করা হলো। ’৭২ এর সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে অনুচ্ছেদ ৯-এ রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম মূলনীতি জাতীয়তাবাদ অংশে বলা আছে ‘ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত একক সত্তা বিশিষ্ট যে বাঙালী জাতি ঐক্যবদ্ধ ও সংকল্পবদ্ধ সংগ্রাম করিয়া জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জন করিয়াছেন সেই বাঙালী জাতির ঐক্য ও সংহতি হইবে বাঙালী জাতীয়তাবাদের ভিত্তি।’

 

এই অনুচ্ছেদে আসলে যা বলা হচ্ছে- ক) বাঙালী জাতি ভাষাগত কারণে একক সত্তা বিশিষ্ট, খ) সংস্কৃতির বিচারে ও ভাবেও একক সত্তা বিশিষ্ট, গ) ভাষা ও সংস্কৃতির কারণে একক সত্তা বিশিষ্ট এই বাঙালী জাতিই শুধু মুক্তিযুদ্ধ করেছে, ঘ) বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব শুধু এই বাঙালী জাতিই অর্জন করেছে, অতএব ঙ) এই ভাষা ও সাংস্কৃতিক গৌরবে গরীয়ান একক সত্তা বিশিষ্ট বাঙালী জাতির ঐক্য ও সংহতি বাঙালী জাতীয়তাবাদের ভিত্তি হবে। অন্য সকল জাতিসত্তার অস্তিত্ব পরিপূর্ণভাবে অস্বীকার করে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির এক নম্বর নীতি হিসেবে এই জাতীয়তাবাদকেই সাংবিধানকিভাবেই প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।

 

ভাষাগত ও সাংস্কৃতিকভাবে ‘একক সত্তা বিশিষ্ট জাতি’ তত্ত্বটা আসলেই ভুয়া। যদি তাই হয় তাহলে পশ্চিম বাংলার বাঙালীরা আমাদের সঙ্গে এসে একই রাষ্ট্র গড়ে তুললো না কেন? সেটা ভিন্ন বিতর্ক, সে আলোচনা এখানে নয়। তাহলে দেখা যাচ্ছে জাতির সংজ্ঞা ও রাষ্ট্রের মূলনীতির মধ্যে কোথাও বাংলাদেশের সংখ্যালঘু জাতিসত্তার প্রশ্নটি নেই। শুধু অনুপস্থিতই নয় বরং প্রবল বাঙালী অহমিকা এবং উগ্রতাকে সাংবিধানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করে তাদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা হয়েছে এবং নাগরিক অধিকারটুকুকে হরণ করে নেয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। যারা ভাষাগত ও সংস্কৃতিগতভাবে বাঙালী নন, সংবিধান অনুযায়ী তাহলে তারা তো বাংলাদেশের নাগরিকই নন। অথচ রাষ্ট্র পরিচালনার এক নম্বর মূলনীতি হচ্ছে অন্য জাতিগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয় এবং নাগরিক অধিকার স্বীকার করা। এই প্রবল জাতিগত অহমিকা এবং বাঙালী সাম্প্রদায়িকতা কেবল এই অনুচ্ছেদেই সীমাবদ্ধ নেই। একদিকে সংবিধানে বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত, অন্যদিকে অন্য ভাষাভাষী জাতিগোষ্ঠীর যে অন্তত মাতৃভাষায় শিক্ষা লাভের অধিকারটুকু আছে তার কোন স্বীকৃতি নেই। এমনকি কোন ইঙ্গিত-ইশারাও নেই। যে ভাষাগত ও জাতিগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে এদেশের জনগণ জীবন-মরণ সংগ্রাম করলো, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর সেই একই ভাষাগত ও জাতিগত নিপীড়ন ও বঞ্চনা শুরু করলো নব্য শাসকগোষ্ঠী ও তাদের প্রতিষ্ঠিত সংবিধান।

 

সংবিধানের বর্ণবাদী ভিত্তির আরেকটি দৃশ্যমান অভিপ্রকাশ হলো ১৩নং অনুচ্ছেদ। এখানে রাষ্ট্র সাংবিধানকিভাবে উৎপাদন যন্ত্র, উৎপাদন ব্যবস্থা, বণ্টন প্রণালী সমূহের মালিকানা ব্যবস্থা ও নানারূপের স্বীকৃতি দিচ্ছে। ১৩ নং অনুচ্ছেদে বলা হচ্ছে ‘মালিকানা ব্যবস্থা নিম্নরূপ হইবে: ক) রাষ্ট্রীয় মালিকানা.... খ) সমবায় মালিকানা.... গ) ব্যক্তিগত মালিকানা.... ইত্যাদি। বর্ণবাদী জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিতে এই সত্য ধরা পড়েনি যে সংখ্যালঘু জাতিসত্তাগুলোর মালিকানা ব্যবস্থার রূপ স্বতন্ত্র। সেখানে গোষ্ঠী মালিকানা (common property) সম্পত্তির ধরনের প্রধান রূপ। যার অধীনে গোষ্ঠীর সদস্যরা কিছু জমি ব্যক্তিগত ভোগ দখলের জন্য ব্যবহার করে আর বাকিটুকু সাধারণ সম্পত্তি (common property) হিসাবে থাকে। গোষ্ঠীর সদস্যদের বন, নদী, পশুচারণ ভূমিসহ আরো অনেক কিছু সাধারণ সম্পত্তি হিসাবে ভোগদখল করার অধিকার থাকে, কিন্তু সেই সম্পত্তি ব্যক্তিগত দখলে রাখা যায় না। মোটকথা সম্পত্তির ধরন এখানে রাষ্ট্রীয়, সমবায়ী বা ব্যক্তিগত মালিকানার রূপ হিসাবে হাজির নেই, হাজির হয়েছে গোষ্ঠীর সম্পত্তি হিসাবে। সেই সম্পত্তি ভোগদখলের স্বতন্ত্র ও সুনির্দিষ্ট নিয়ম আছে। আরেকটি অনুচ্ছেদ অর্থাৎ ৪২ অনুচ্ছেদে ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকারকেই কেবল স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে ‘কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি বাধ্যতামূলকভাবে গ্রহণ, রাষ্ট্রায়ত্ত বা দখল করা যাবে না।’ কিন্তু যে সম্পত্তির মালিক জাতিগোষ্ঠীর সকলে, সেই ক্ষেত্রে কী হবে তার কোন কথা সংবিধানে নেই। অথচ বাংলাদেশে পাহাড়ে ও সমতলে প্রায় অর্ধশতাধিক বিভিন্ন সংখ্যালঘু জাতিসত্তার বসবাস।

 

’৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের সময় সংবিধানের বর্ণবাদী, অগণতান্ত্রিক ও গণবিরোধী চরিত্রের প্রশ্ন তুলে সংখ্যালঘু জাতিসত্তার একমাত্র প্রতিনিধি ও সংসদে বিরোধী দলীয় সদস্য হিসেবে যে মানুষটি সংগ্রাম করেছিলেন তিনি হচ্ছেন মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা। সংসদে সংবিধান বিলের উপর আলোচনা করতে গিয়ে ১৯৭২ সালের ২৫ অক্টোবর সংসদে দেয়া ভাষণে তিনি বলেন, ‘....বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতিসত্তার কথা বলা যেতে পারে। বাংলাদেশের সেইসব জাতির কথা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের এই খসড়া সংবিধানে নেই। আমি খুলে বলছি। বিভিন্ন জাতিসত্তার কথা যে এখানে স্বীকৃত হয়নি সেকথা আমি না বলে পারছি না।....পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি উপজাতীয় এলাকা। এই এলাকার সেইসব ইতিহাসের কথা, আইনের কথা এই সংবিধানে নেই।....

 

মাননীয় স্পিকার সাহেব, এই মহান সংসদে দাঁড়িয়ে আজকে আমি আপনার মাধ্যমে একজন সরল মানুষের অভিব্যক্তি প্রকাশ করছি। আমাদের এলাকাটা একটি উপজাতি এলাকা। এখানে বিভিন্ন জাতি বসবাস করে। এখানে চাকমা, ত্রিপুরা, লুসাই, বোম, পংখো, খুমি, সিয়াং এবং চাক এইরূপ ছোট ছোট দশটি উপজাতি বাস করে। এই মানুষের কথা আমি বলছি।

 

এই উপজাতি মানুষদের কথা ব্রিটিশ স্বীকার করে নিয়েছিল। পাকিস্তানের স্বৈরাচারী গভর্নমেন্ট আমাদের অধিকার ১৯৫৮ এবং ১৯৬২ সালের সংবিধানে স্বীকার করে নিয়েছিল। জানিনা আজকে যে গণতন্ত্র হতে যাচ্ছে, সমাজতন্ত্র হতে যাচ্ছে তখন কেন আপনারা আমাদের কথা ভুলে যাচ্ছেন।’

 

সংখ্যালঘু জাতির এই প্রতিনিধির আকুতিকে সেদিন কর্ণপাত করা হয়নি বরং নতুন রাষ্ট্রের কর্ণধার অন্য সকল জাতিসত্তার মানুষকে বাঙালী হয়ে যাবার পরামর্শ দিয়েছিলেন। সংখ্যালঘু জাতিসত্তার উপর এই জাতিগত নিপীড়ন আর অপমানের ফলাফল আমরা পরবর্তীতে লক্ষ্য করি অধিকার আদায়ের জন্য পাহাড়ী জনগণের সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগ্রাম গড়ে তোলার ভিতর দিয়ে।

 

ছ) অন্যান্য : ’৭২ এর সংবিধানে ‘বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সীমার মধ্যে অবস্থিত সকল প্রকার খনিজ ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রীর উপর রাষ্ট্রীয় মালিকানা’ ঘোষণা করা হয়েছে ১৪৩ নং অনুচ্ছেদে এবং পরবর্তী অনুচ্ছেদ অর্থাৎ ১৪৪ অনুচ্ছেদে সরকারকে বিভিন্ন প্রকার কারবার বা ব্যবসা পরিচালনার ক্ষমতা অর্পণ করেছে এবং অনুচ্ছেদ ১৪৫-এ প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী কর্তৃত্বে বিভিন্ন চুক্তি বা দলিল করার ক্ষমতা অর্পণ করেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক চুক্তি বিষয়ে কোন অনুচ্ছেদ যুক্ত করেনি। কোন চুক্তি, হোক তা জাতীয় বা আন্তর্জাতিক তা সম্পাদনের পূর্বে বা পরে জনগণের কোন মতামত গ্রহণের জন্য কোনভাবেই জনগণের কাছে বা তার প্রতিনিধির কাছে উপস্থাপনের কোনো ব্যবস্থা রাখেনি। সেজন্য ’৭২ এর সংবিধান অনুযায়ী তেল-গ্যাস-কয়লা রপ্তানি, অন্য কোন রাষ্ট্রের সাথে কোন প্রকার চুক্তি, হোক তা ট্রানজিট বা করিডোর, কোনো কিছুর জন্যই চুক্তির আগে বা পরে তা কোথাও আলোচনার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নেই।

 

৭২ এর সংবিধানের আরো অনেক দিক যেমন জাতীয়তার প্রশ্ন, নির্বাচন কমিশন, ন্যায়পাল, বিচার বিভাগ, স্থানীয় সরকার ইত্যাদি বিষয় নিয়ে গভীরভাবে আলোচনার দাবি রাখে। আর এ সংবিধানে নারীর অধিকার ও ক্ষমতার প্রশ্ন, প্রকৃতি আর পরিবেশের কথা তো উল্লেখই নেই।

 

সুতরাং দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের মূল সংবিধান আদতে অগণতান্ত্রিক, জাতিবিদ্বেষী, বর্ণবাদী ও নারীবিরোধী তো বটেই, এমনকিও ধর্মনিরপেক্ষও নয়। যে সংবিধান পারিবারিক সম্পর্ক ও সম্পত্তির বিলিবন্টনের বিষয়কে ধর্মের অধীনস্থ রেখে দেয়, সেই সংবিধান আর যাই হোক ধর্মনিরপেক্ষ হতে পারে না। এই সংবিধানে পাকিস্তান আমলের বর্বর অর্পিত সম্পত্তি আইন বাতিল করা হয়নি। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবুল বারাকাতের গবেষণাতেও পরিষ্কার, সর্বাধিক পরিমাণ অর্পিত সম্পত্তি আওয়ামী লীগের লোকজনের দখলে আছে। আর ধর্মনিরপেক্ষতার হাকডাক যেটুকু দেয়া হয়েছিল, সেটা সম্পূর্ণভাবেই মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জনগণের চেতনার যে বিকাশটি ঘটেছিল তার সাথে একটা ছেলে ভোলানো আপোষ ছাড়া আর কিছু নয়। বরং বলা চলে সংবিধানটি সাংবিধানিক একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার উপযোগী একটি দলিল, গণতন্ত্র কায়েমের জন্য নয়। যারা ক্ষমতায় থাকছেন রাষ্ট্র তাদেরই দলীয় একনায়কতন্ত্রের অধীনস্থ হয়ে পড়ার পুরো শর্ত এই সংবিধানে বিদ্যমান। যা কখনোই একটি গণতান্ত্রিক সংবিধানের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।

 

এখনো যারা ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানকে একটি গণতান্ত্রিক সংবিধান বলে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন, তখন তার বা তাদের বদ মতলবকে প্রতিরোধ করা সচেতন নাগরিকের কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে। কারণ সেক্ষেত্রে তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে অগণতান্ত্রিক ও পশ্চাৎপদ ধ্যান-ধারণাকেই টিকিয়ে রাখা।

 

চ) জবাবদিহিতা: গণতান্ত্রিক সংবিধানে জবাবদিহিতার প্রশ্নটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জনপ্রতিনিধিরা জনগণের কাছে তার উপর অর্পিত দায়িত্ব ও কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি করতে বাধ্য। কিন্তু ’৭২ সালের সংবিধানে জবাবদিহিতার প্রশ্নটি একটি গুঢ় রহস্য হয়ে রয়েছে। আমাদের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রীয় সমস্ত সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করলেও দিনের পর দিন সংসদে যাচ্ছেন না। তা নিয়ে তাদেরকে প্রশ্ন করা যাবে না। এমনকি যে নির্বাচনী এলাকা থেকে তিনি নির্বাচিত সেই নির্বাচকরা যদি মনে করেন তাঁকে আর তাদের প্রতিনিধি রাখবেন না, তাহলে ঐ জনগণের হাত-পা বাঁধা, কিছুই করার নেই অর্থাৎ প্রতিনিধি প্রত্যাহার করার (re-call) কোনো সুযোগ সংবিধানে নেই। এ যেন হাতের তীর পাঁচ বছরের জন্য হাত থেকে ছুঁড়ে যাওয়ার মতো।

 

সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে ঠুটো জগন্নাথ বানিয়ে রেখেছে। সংবিধান পরিষ্কারই প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতির নিয়োগ ছাড়া রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর অধীনস্থ করেছে। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ-প্রক্রিয়া বাদ দিয়ে রাষ্ট্রপতি নিজে কোন সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নেবেন সেই ক্ষমতা সংবিধান তাকে দেয়নি। প্রশ্ন করি, প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে যদি কোন অভিযোগ ওঠে তাহলে তদন্ত করবে কে? এটাও কি রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করে করতে হবে। প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে যদি কোন অভিযোগ ওঠে তাহলে সেটা তদন্ত করবার অধিকারীই বা কে? তিনি কেমন করে সেটা করবেন? প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় ও পররাষ্ট্রীয় বিষয় রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করবেন। ঠিক আছে। কিন্তু অবহিত হয়ে থাকাই কি যথেষ্ট? যদি প্রধানমন্ত্রীর কোন রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড বা পররাষ্ট্রীয় সম্পর্ক নির্ণয় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব কিংবা বাংলাদেশের সংবিধানের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ হয় তাহলে তার বিচার কে করবে? এই বিচারের সুযোগ আমাদের সংবিধানে নেই। সুতরাং সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে।

 

বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ইমপিচ বা অভিশংসন করা যায়। আর আমাদের আছে এমন সংবিধান যাতে প্রধানমন্ত্রীকে ইমপিচ করা দূরে থাক সাংবিধানকিভাবে তার কাছে জবাবদিহিতা চাইবার ও আদায় করবার কোন সুযোগ নেই, ব্যবস্থাও নেই। গণতান্ত্রিক সংবিধানে কি এটা হতে পারে?

 

অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, অর্থনীতি, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা সৃষ্টির জন্য বা দেশদ্রোহিতার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে দায়ী, দোষী ও বিচার করবার সাংবিধানিক সুযোগ অবশ্যই থাকতে হবে। রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে চুক্তি করছেন, ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক পররাষ্ট্রীয় সম্পর্ক গড়ছেন অথবা বহুজাতিক কোম্পানির সাথে যে সকল চুক্তি করছেন সেটা বাংলাদেশের স্বার্থ, শত্রুমিত্র প্রশ্ন ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে সঙ্গতিপূর্ণ কিনা সেই প্রশ্ন আমরা কোথায় তুলবো? রাষ্ট্রের সকল ব্যক্তির ঊর্ধ্বে বিরাজমান রাষ্ট্রপতির কাছে নয় কি? রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানের বিচার কিংবা তার কর্মকাণ্ড সংবিধানসম্মত কিনা সেটা নিয়মিত নিরীক্ষার কোন সুযোগ নেই। সত্যিকার অর্থে আমাদের রাষ্ট্র জনগণের ক্ষমতার উপর নির্ভর করে পরিচালিত হয় না। পরিচালিত হয় সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের উপর। ফলে জনগণের কাছে জবাবদিহিতা গুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয় নয়। এটা সেই সামন্ত ঔপনিবেশিকতার ধারাবাহিকতা, যে ধারাবাহিকতায় একদিকে আমাদের দেশে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও নিপীড়নের সকল রাষ্ট্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে উঠেছে আর অন্যদিকে আরো মজবুত হয়েছে গণবিচ্ছিন্ন আমলাতন্ত্র। সশস্ত্রতা ও আমলাবাজিতায় আপাদমস্তক বাঁধা এই ধরনের সামরকি-আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সামন্তীয় পশ্চাৎপদতা আরো বেশি নগ্ন হয়ে ধরা পড়ে যখন দেখা যায় রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ভিত্তি হচ্ছে অস্ত্র, জনগণের ইচ্ছা নয়। ফলে জনগণের কাছে কোন কিছুতেই জবাবদিহিতা তার প্রয়োজন পড়ে না।

 

 

চার.

 

’৭২ এর সংবিধানপন্থীদের বিভ্রান্তির জবাবে : শাসক শ্রেণীর পক্ষ থেকে ’৭২ এর সংবিধান নিয়ে অনেকগুলো বিভ্রান্তিকর ও চাতুরীপূর্ণ বক্তব্য জনগণের সামনে উপস্থাপন করা হয় এবং এর মধ্যদিয়ে ’৭২ এর সংবিধান পুনপ্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তাকে যুক্তিগ্রাহ্য করার অপচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। বুর্জোয়া দলগুলোর বক্তব্য আর বুর্জোয়াদের লেজুড় বামপন্থী বলে পরিচিত রাজনৈতিক দল যারা ’৭২ এর সংবিধান পুন:প্রতিষ্ঠার তৎপরতায় সক্রিয় তাদের যুক্তি এবং বক্তব্য অবশ্য ভিন্ন। ’৭২ এর সংবিধানপন্থী বামদের বক্তব্যে যে বিষয়টি প্রাধান্য পায় তাহলো সংবিধানের ৪ মূলনীতি, ‘সমাজতন্ত্র’ যার অন্যতম সেটা ’৭২ এর সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত থাক। প্রথমত বলতে হয় সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদের উপর নির্ভরশীল সামন্ত চরিত্রের রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবে এর চেয়ে হাস্যকর আর কী হতে পারে? যেখানে বর্তমান আওয়ামী লীগ একটি সমাজতান্ত্রিক সংবিধানে সমাজতন্ত্রের কথা বলে বাংলাদেশকে তুলে দিচ্ছে মার্কিন-ভারত অক্ষ শক্তির হাতে। প্রশ্ন হচ্ছে সংবিধানে ‘সমাজতন্ত্র’ শব্দটি লেখা থাকলেই কি সমাজতন্ত্র কায়েম হয়ে যায়? এমন আরো অনেক বিষয় সংবিধানে লেখা আছে কিন্তু বাসবায়ন নেই। ব্যক্তি মালিকানার অবসান সমাজতন্ত্র তথা সাম্যের মূল কথা। বাংলাদেশের সংবিধান প্রতিষ্ঠার পর এরকম কোনো পদক্ষেপই রাষ্ট্রের দিক থেকে নেয়া হয়েছে? বরং ’৭২-এর সংবিধানে সম্পত্তির ব্যক্তিগত মালিকানার অনুমোদন দেয়া হয়েছে। শুধু তাই নয় যে দল ’৭২-এর সংবিধান প্রণয়ন করেছে সেই আওয়ামী লীগের শাসনামলে ব্যক্তিগত সম্পদ তৈরির জন্য যে দুর্নীতি আর পুকুর চুরি সেই দলের নেতৃবৃন্দ করেছেন তা থেকে কী ধরনের সমাজতন্ত্রের কথা তারা বলেছেন সেটা বুঝতে অসুবিধা হয় না। বরং এই শব্দটি সংবিধানে সংযোজন করে সেই সময় সমাজতন্ত্র কায়েমের ব্যাপারে জনগণের যে আকাঙ্ক্ষা ও চেতনার বিকাশ ঘটেছিল তাকে বিভ্রান্ত করার কূটকৌশল হিসাবেই যে সেটা করা হয়েছিল তা স্পষ্ট। আজো এসব শব্দমালার কথা বলে জনগণকে প্রতারিত-বিভ্রান্ত করার চেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। স্মরণ করা যেতে পারে ফ্যাসিস্ট হিটলারের দলের নাম ছিল ‘সমাজতান্ত্রিক দল’। সুতরাং নাম বা চিহ্ন দিয়ে কিছু আসে যায় না, চরিত্রটা হলো আসল।

 

এই চরিত্র নবগঠিত বাংলাদেশ রাষ্ট্রের এবং শাসক শ্রেণীর চরিত্র-বৈশিষ্ট্যের মধ্যে নিহিত। রাষ্ট্রের চরিত্রের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তার শ্রেণী চরিত্র। পুঁজিবাদী বা সমাজতান্ত্রিক যে রাষ্ট্রেই হোক, তার শ্রেণী চরিত্র থাকে, অন্তত তাতে পুঁজির স্বার্থ অথবা শ্রমজীবী জনগণের স্বার্থ নির্ধারক ভূমিকা পালন করে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ১৯৭১ সালের রাষ্ট্র ক্ষমতার হস্তান্তর কোন নির্দিষ্ট শ্রেণী অর্থাৎ উৎপাদনের সাথে সম্পর্কিত শ্রেণী, যেমন ভুমি মালিক, শিল্প-ব্যবসা-বাণিজ্য মালিকের কাছে হয়নি। এ হস্তান্তর হয়েছিল এমন একটি রাজনৈতিক দলের কাছে যারা ছিল উৎপাদনের সাথে সম্পর্কহীন প্রধানত মধ্যস্বত্বভোগীদের দ্বারা গঠিত। আওয়ামী লীগের গঠন (composition) এর দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, এই সংগঠনের নেতৃত্ব ছিল পাটের দালাল, বীমার দালাল, উকিল-মোক্তার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র ভুমিমালিক, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষক, বেকার যুবক ও ছাত্রদের হাতে। নতুন একটি রাষ্ট্রে ক্ষমতার অধিকারীদের এই ধরনের শ্রেণী চরিত্র ছিল এক অতি ব্যতিক্রমী ব্যাপার। এর তুল্য কোন দৃষ্টান্ত ইতিহাসে বিরল।

 

সংবিধানে একটা বিষয় উল্লেখ থাকলেই যে সেটা বাস্তবায়ন হয় না, যা বাস্তবায়িত হয় আসলে তা ক্ষমতাসীন শাসক শ্রেণীর যেটা প্রয়োজন সেটা। বিষয়টা বুঝতে শেখ মুজিবের শাসনামলে তার নিজের প্রতিষ্ঠিত সংবিধানের সাথে বিরোধপূর্ণ এরকম একাধিক কর্মাকাণ্ড আর সিদ্ধান্তের উদাহরণই যথেষ্ট হবে- ১) সংবিধানের মূল চার নীতির অন্যতম ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’। কিন্তু এই মূলনীতিকে বিসর্জন দিয়ে ধর্মের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ইসলামী সম্মেলন সংস্থা' (Organization of Islamic Conference-OIC)-এর সদস্যপদ গ্রহন করলো বাংলাদেশ ১৯৭৪ সালে এবং ঐ বছরই পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসাবেশেখ মুজিব যোগদান করেন। ২) সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৭(ক)-তে পরিষ্কারভাবে ‘একই পদ্ধতির গণমুখী ও সার্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থার’ ঘোষণা থাকা সত্ত্বেও ধর্মীয় শিক্ষার প্রসারের জন্য মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্মীয় শিক্ষার পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়। সংবিধানে ‘একই পদ্ধতির গণমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা' প্রতিষ্ঠা এবং সমাজের প্রয়োজনের সহিত শিক্ষাকে সঙ্গতিপূর্ণ করিবার জন্য এবং সেই প্রয়োজন সিদ্ধ করিবার উদ্দেশ্যে যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সদিচ্ছা প্রণোদিত নাগরিক সৃষ্টির’ কথা বলা হয়েছে [অনু: ১৭(খ)], অথচ সরকারি অর্থ, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সরকারের স্বীকৃতির মাধ্যমে দেশে নানামুখী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু হয়েছে, চালু হয়েছে শ্রেণী-বৈষম্যমূলক ও অসম শিক্ষাব্যবস্থা: শিক্ষাব্যবস্থাকে উৎপাদন, পুনরুৎপাদন, উদ্ভাবন, যোগাযোগ ও পরিবহন, পরিসেবামূলক, হিসাব-নিকাশ ও বণ্টনমুখী তথা সমাজের প্রয়োজনের সাথে সামঞ্জস্য বিধান করে বিজ্ঞানভিক্তিক না করে তাকে একদিকে ধর্মমুখী ও অন্যদিকে পুঁজিপতিদের তথা সাম্রাজ্যবাদীদের অনুগত চাকর-বাকর সৃষ্টির পর্যায়ে পর্যবসিত করা হয়েছে- যা সংবিধান পরিপন্থী। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসাবে কোন বিশেষ ধর্মের বা ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতি আলাদাভাবে রাষ্ট্রের কোন দায়দায়িত্ব সাংবিধানিকভাবে না থাকা সত্বেও ‘ইসলামিক ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি পদক্ষেপ ছিল সংবিধান পরিপন্থী।

 

সমাজতন্ত্র একটি শ্রেণী রাজনীতির প্রশ্ন। সংবিধানে লেখা থাকলেই তা আপনা-আপনিই বা বুর্জোয়াদের দ্বারা বাস্তবায়িত হতে পারে না। '৭২-এর সংবিধান সাধারণ অর্থে একটি বুর্জোয়া সংবিধান। বুর্জোয়াদের নেতৃত্বে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা একটি মার্কসবাদ বিরোধী বক্তব্য। এই বামপন্থী দলগুলো যারা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ’৭২-এর সংবিধানের আলোকে সমাজতন্ত্র কায়েমের কথা বলছেন, তারা আসলে বুর্জোয়াদের নেতৃত্বে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাজতন্ত্রে উত্তরণের তত্ত্বকেই ফেরি করছেন। সোভিয়েত ইউনিয়নে ক্রুশ্চেভ শ্রেণী সমঝোতার লাইনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাজতন্ত্রে উত্তরণ ইত্যাদি লাইন গ্রহণ করে সোভিয়েত ইউনিয়নকে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে পুনঃপ্রবর্তিত করেছিলেন। সোভিয়েত রাষ্ট্রের পতনের পর আজ আর কেউ অস্বীকার করবেন না যে চূড়ান্ত অর্থে তা ছিলো একটি অধঃপতিত ও সংশোধনবাদী তত্ত্ব। এতদিন পর বাহাত্তরপন্থী বামরা সেই পুরনো তত্ত্বকেই নতুন করে জনগণকে গেলাবার চেষ্টা করছেন।

 

বাংলাদেশের এরকম সমাজতন্ত্রকে শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দল বলেছিল, ‘পরিত্যক্ত সম্পত্তির সমাজতন্ত্র’। পাকিস্তানীদের ফেলা যাওয়া যে সম্পত্তি রাষ্ট্রীয়করণ হয়, সেটাকেই তারা সমাজতন্ত্রের নামে চালায়। লেনিনবাদী কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক অমল সেন সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, ‘এই সংবিধান সমাজতান্ত্রিক তো নয়ই, এমনকি অন্যান্য বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকদের যে ধরনের সাংবিধানিক অধিকার থাকে, তাও নেই।’ ন্যাপ নেতা (বর্তমানে আওয়ামী লীগ নেতা) সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সংবিধানে স্বাক্ষর করেননি, তিনি তার বাকি সব দাবি ছেড়ে দিয়ে বলেছিলেন অন্তত বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা সাংবিধানিকভাবে নিশ্চিত করা হোক। সেটুকুও করা হয়নি এই সমাজতান্ত্রিক সংবিধানে। ভূমিসংস্কার বা গ্রামাঞ্চলের ক্ষমতা সম্পর্কের ন্যূনতম কোন বদল করা হয়নি। কারখানায় পাকিস্তান আমলের চেয়ে শ্রমিকদের বেতন অতি সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছিল বটে, তবে অব্যাহত পরিকল্পিত দুর্নীতির কারণে রাষ্ট্রায়ত্তকৃত কারখানাগুলো অচিরেই অলাভজনক হয়ে পড়ে, সেগুলো জনগণের অর্থের ভর্তুকিতে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় গুটিকতক মানুষের সম্পদ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। একে সমাজতান্ত্রিক বলা অর্থহীন, গণতান্ত্রিকও এটা ছিল না।

 

এই সংবিধানে কোনো মৌলিক অধিকারকেই আদালতে বলবৎযোগ্য করা হয়নি। প্রদত্ত সবগুলো গণতান্ত্রিক অধিকারই প্রকারান্তরে কেড়ে নেয়া হয়েছে। সংবিধান রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলনীতি। সুতরাং রাষ্ট্রের উপযোগী করেই সংবিধান রচিত হবে এটাই স্বাভাবিক। রাষ্ট্রকে অক্ষুণ্ন রেখে সংবিধান সংস্কারের মধ্য দিয়ে জনগণেরর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক মুক্তি আসবে এরকম বক্তব্য অবান্তর ও কল্পনাপ্রসূত শুধু নয় চরম বিভ্রান্তিমূলক ও সুবিধাবাদীও বটে।



শুধুমাত্র সংবিধান সংস্কার আর অসংগতি দূর করার মধ্য দিয়ে যে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা হবে না সেটা বোঝা যায় স্বাধীনতার পর এ যাবৎকালে প্রচলিত সংবিধান অনুযায়ী জনগণের কোন অধিকার না পাওয়ার উদাহরণ থেকে। অদ্যবধি ’৭২-এর সংবিধানের যে ১৫টি সংশোধনী হয়েছে সেই সংশোধনীগুলোর মধ্যে মৌলিক অধিকার (অনুচ্ছেদ ১৫) যার মধ্যে আছে ক) অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা; খ) কর্মের অধিকার ও যুক্তিসংগত মজুরীর ব্যবস্থা; গ) যুক্তিসংগত বিশ্রাম, বিনোদন ও অবকাশের অধিকার; ঘ) সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার অর্থাৎ বেকারত্ব, ব্যাধি বা পঙ্গুত্বজনিত কিংবা বৈধব্য, মাতা-পিতৃহীনতা বা বার্ধক্যজনিত কিংবা অনুরূপ অন্যান্য পরিস্থিতিজনিত আয়ত্তাতীত কারণে অভাবগ্রস্ততার ক্ষেত্রে সরকারি সাহায্য লাভের অধিকার ইত্যাদি এ সকল অধিকার কোন সংশোধনীতে স্থগিত বা বাতিল বা সংশোধন করা হয়নি। অথচ গত ৪০ বছরে এর কোন সুফল জনগণ পায়নি।

 

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৯-এ ‘সুযোগের সমতা’ বিষয়ে বলা আছে- ‘১) সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করিতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হইবেন ২) মানুষে মানুষে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্য বিলোপ করিবার জন্য নাগরিকদের মধ্যে সম্পদের সুষম বন্টন নিশ্চিত করিবার জন্য এবং প্রজাতন্ত্রের সর্বত্র অর্থনৈতিক উন্নয়নের সমান স্তর অর্জনের উদ্দেশ্যে সুষম সুযোগ সুবিধাদান নিশ্চিত করিবার জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।’

 

সংবিধানের এই অধিকার কোন সংশোধনীর মাধ্যমে বাতিল হয়নি। তাহলে রাষ্ট্রের নাগরিকদের কেন সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হয়নি? মানুষে মানুষে কেন অর্থনৈতিক সাম্য সৃষ্টি হচ্ছে না? সম্পদের সুষম বন্টনের পরিবর্তে কেন বেশিরভাগ মানুষ হতদরিদ্র আর অল্প কিছু মানুষের সম্পদের পাহাড় গড়ে উঠছে? কেন রাষ্ট্রের সকল সুযোগ সুবিধা সকলের জন্য সুষম না হয়ে দলীয়করণ, আত্মীয়করণ, স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি আর ধনীকগোষ্ঠী ও ক্ষমতাসীনদের পদানত হয়ে পড়ছে? লেলিন বলেছেন- সংবিধানের অসঙ্গতি দূর করলেই সংবিধান দ্বারা জনগণের মুক্তি আসবে না। তিনি আরো বলেছেন- বুর্জোয়া পার্লামেন্ট জনগণকে নির্মম নিষ্ঠুর শোষণের কৌশলমাত্র....।

 

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের কেন্দ্রীয় বিষয় হচ্ছে সংবিধান। রাষ্ট্র ও রাজনীতির প্রাণভোমরা এই দলিলটির মধ্যেই নিহিত। ফলে যে কোন দেশের সংবিধান রচনার ক্ষেত্রে সেই দেশের বিশাল পরিপ্রেক্ষিত, ভাবগত ও দার্শনিক ভিত্তি এবং প্রতিটি দেশের নিজস্ব ইতিহাস ও বৈশিষ্ট্যের কথা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হয়। আমরা লক্ষ্য করবো বাংলাদেশের সংবিধান রচনায় এবং এই সমস্ত ক্রিয়াকর্মের মধ্যে জনগণের ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, সংকল্পের মর্ম বা ভাষা ধারণ করবার কোন প্রক্রিয়াই ছিল না। আমরা যখন ডক্টর কামাল হোসেন এবং তাঁর সংবিধান কমিটির হাতে তৈরি সংবিধান এবং তার ক্রমিক দুর্দশার ইতিহাস গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করি, তখন মনে হয় সংবিধান এই দেশের কোটি কোটি মানুষের সাথে কি ক্ষমার অযোগ্য তামাশাই না করেছে। এই দেশের মানুষকে সংবিধান প্রণয়নের নামে অপমানই করা হয়েছে। সংবিধান লেখা হয়েছে জনগণের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে একজন ব্যক্তি ও দলের হাতে ক্ষমতার একনায়কতান্ত্রিক কেন্দ্রীভবন ঘটাবার দরকারে। বাংলাদেশের ইতিহাসতো এই একনায়কতান্ত্রিক কেন্দ্রীভবন ও তার বিরুদ্ধে জনগণের বিক্ষোভ আন্দোলনের ইতিহাস। যে দেশ ভাষার জন্য লড়াই করেছে, জীবন দিয়েছে, মুক্তিযুদ্ধে রক্তাক্ত স্নান সেরে দেশ স্বাধীন করেছে- যুদ্ধের পরপরই সেই দেশের সংবিধান লেখা হয়েছে ইংরেজিতে। ইংরেজি থেকে বাংলা করবার বিপদ, মুশকিল এবং বিভ্রান্তি সম্পর্কে সকলের জানা আছে। বাংলা সংবিধানের ব্যাখ্যা কী ভাষায় হবে? বাংলায় না ইংরেজিতে? প্রশ্ন হলো, সংবিধান তো সাহিত্য রচনার মতো ব্যাপার নয় যে আক্ষরিক অনুবাদ করলে ল্যাঠা চুকে যায়। সুপ্রিম কোর্টতো সংবিধানের ব্যাখ্যা সংক্রান্ত রায় ইংরেজিতেই দিয়ে থাকে। তাহলে? কীসের মাতৃভাষার সংগ্রাম, কীসের মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে মুখে ফেনা তুলি আমরা? কীসের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা? যে চেতনা রাষ্ট্ররূপে তার অভ্যন্তরীণ ভাব ও সংকল্পের প্রকাশ মাতৃভাষায় করবার সিদ্ধান্ত নেয়নি। ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে সংবিধান ও আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করা দূরে থাকুক, যুক্ত রাখবার কোন ব্যবস্থাই রাখেনি, এদের আবার কিসের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা? এদের কীসের গণতন্ত্র? জনগণের ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা ও সংকল্পতো তার মাতৃভাষাতেই প্রকাশিত হয়। সেই ভাষা কই? গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের লড়াই মানে প্রথমে সহজ সরল বাংলাভাষার সংবিধান রচনার লড়াই, যে সংবিধান যে কোন নাগরিক অনায়াসে বুঝতে সক্ষম। আইনী মারপ্যাচ, ‘যদি’, ‘কিন্তু’, ‘তবে’ ইত্যাদি শব্দ দিয়ে জটিল, ভারাক্রান্ত এবং বিভ্রান্ত করা নয়। ইংরেজিতে সংবিধান লেখা হয়েছে কারণ এই শাসকরা জনগণকে কোনদিনই বিশ্বাস করেননি। বাংলাভাষার উপরও তাদের আস্থা ছিল না। এর প্রমাণ পরবর্তীতে আরো পাওয়া যায় সরকারের দাপ্তরিক ও আদালতের ভাষা হিসাবে সর্বস্তরে বাংলা চালু না হওয়ায়। সংবিধানের ৩নং অনুচ্ছেদে ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’ ঘোষণার পরও সরকারি অফিসে ইংরেজি ভাষার ব্যবহার প্রধানভাবে লক্ষ্য করা যায়। এখনো পর্যন্ত আামাদের সুপ্রিম কোর্ট ইংরেজিতে রায় প্রদান করে। ইংরেজিতে আরজি লেখা, এমনকি উকিলরা ইংরেজিতে যুক্তিতর্ক করে থাকেন। সুতরাং বাংলার উপর এই আদালত এবং উকিলদের আস্থা কি রকম সেটা বুঝতে অসুবিধা হয় না। সংবিধান উকিল-মোক্তারদের মোসাবিদা করা কোনো বিষয় হতে পারে না। জনগণের অংশগ্রহণে এবং বোধগম্য ভাষায় সেটা হওয়া আবশ্যক। আসলে সংবিধান প্রণেতারা ডক্টর কামাল হোসেন আর আনিসুজ্জামানকে দিয়ে সংবিধান ইংরেজিতে লিখিয়ে আর বাংলায় অনুবাদ করিয়ে আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছেন।

 

এটা পরিষ্কার যে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন হওয়া একটা জনগোষ্ঠী এবং অন্য দেশের স্বীকৃতি পেয়ে বিশ্বের রাষ্ট্রসভায় উদিত একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক পরিপঠন সম্পন্ন করবার জন্য কোন সাংবিধানকি প্রক্রিয়া প্রবর্তন করা হয়নি। সেই উদ্দেশ্যে সংবিধান লেখাও হয়নি। কী করে শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে সাংবিধানিকভাবে একনায়কতান্ত্রিক ক্ষমতা দেয়া যায় এসবই ছিল প্রধান বিবেচনা। এই বিবেচনার ভয়াবহ পরিণতি এখন আমাদের ভোগ করতে হচ্ছে।

 

 


পাঁচ.

 

সুতরাং দেখা যাচ্ছে, একেবারে শুরুতেই বাংলাদেশ রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য গৃহীত দলিলটি নজিরবিহীন অগণতান্ত্রিক, অবৈধ ও অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে রচিত ও গৃহীত হয়েছে। এই সংবিধানে নানা ধরনের চটকদার ‘শব্দমালা’ থাকলেও সামগ্রিক বিচারে তা অসার, প্রতারণামূলক, স্ববিরোধিতায় ভরপুর। শুধু তাই নয়- বাংলাদেশ দীর্ঘ সংগ্রামের এবং সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বৃটিশ ও পাকিস্তানী উপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি লাভ করলেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আকাঙ্ক্ষার কোন প্রতিফলন ঘটেনি বরং নতুন সংবিধানে সেই ঔপনিবেশিক আইনসমূহ বহাল রাখা হয়েছে। ফলে এই সংবিধান একটি স্বাধীন দেশের জনগণের আশা-আকঙ্খার প্রতিনিধিত্ব করে না। দেশের নাম বাংলাদেশ হলেও আইন বহাল থাকলো বৃটিশ ও পাকিস্তান আমলের। কার্যত রাষ্ট্রের চরিত্রই অপরিবর্তিত থাকলো।

 

বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের ইতিহাসে শুরুতইে আমরা দেখব একদিকে ব্রিটিশ কায়দায় সংসদীয় সরকার গড়ে তোলার প্রকাশ্য ঘোষণা অপরদিকে চরমতম ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রকাশ্য উদ্যোগ। গণপরিষদের সদস্যদের স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দান এবং সেই মত প্রকাশ মনমত না হলে তা দলন। উপনিবেশিক ধারাবাহিকতায় স্বাধীনতাপ্রাপ্ত হওয়া ভারত-পাকিস্তানের মত নয় বরং একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের গণপরিষদের বিপ্লবাত্মক চরিত্র থাকার কথা ছিল, কিন্তু তাতো হয়নি, এমনকি আওয়ামী লীগের নিজেরই আয়ত্তে থাকা গণপরিষদের কাছ থেকেও তার স্বাভাবিক ক্ষমতাটুকু কেড়ে নেয়া হয়েছিল।

 

সুতরাং জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করে সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিকভাবে প্রতিষ্ঠিত প্রচলিত বুর্জোয়া পার্লামেন্ট সিস্টেমকে রক্ষার সংগ্রাম কমিউনিস্ট বামপন্থীদের কাজ হতে পারে না। তাদের কর্তব্য হবে এই বুর্জোয়া পার্লামেন্ট ব্যবস্থার শোষণ নির্যাতনের কৌশল, শঠতা, অসারতা এবং প্রতিক্রিয়াশীলতার নগ্ন রূপটি জনগণের সামনে মেলে ধরা এবং তাকে নাকচ করা। কোনো অবস্থাতেই তার চরিত্রকে আড়াল করা নয়, তাকে গ্রহণ করা নয়।

 

তাই আজ যারা জনগণের অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক মুক্তির জন্য প্রকৃত মুক্তি সংগ্রাম তথা প্রকৃত শোষণমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্য সংগ্রাম করছেন তাদের অবশ্যই সাম্রাজ্যবাদ-আধিপত্যবাদের স্বার্থরক্ষাকারী শাসক শ্রেণীর বিরুদ্ধে সংগ্রামের পাশাপাশি ’৭২-এর সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সক্রিয় বুর্জোয়াদের তল্পিবাহক বামদের মুখোশ উন্মোচন করাও জরুরি কর্তব্য। কারণ এর মধ্যদিয়ে তারা প্রচলিত শোষণ-নির্যাতনমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা রক্ষার পক্ষেই কাজ করছেন। যা জনগণের প্রকৃত মুক্তির সংগ্রামকেই বাধাগ্রস্ত করছে।

 

এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ’৭২ সালের সংবিধানে সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রতিফলন ঘটেনি। এই সংবিধান মূলত একটি শ্রেণীর সংবিধান। স্বাধীনতার পর উঠতি বাঙালি ধনিকগোষ্ঠী যারা বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতার মালিক হলো এবং আজ ফুলে-ফেঁপে কলাগাছ হয়েছে, সেই লুম্পেন ধনিক শ্রেণীর স্বার্থে এই সংবিধান প্রণীত হয়েছে। এর সাথে সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদ ও বিশ্বপুঁজির স্বার্থ অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত। পরবর্তীতে এই শ্রেণীর প্রয়োজনেই সংবিধানে সংশোধনীসমূহ আনা হয়েছে এবং আজ আবার তা বাতিল করে নিজেদের সুবিধামতো নতুন রঙে রাঙানো হচ্ছে। সুতরাং জনগণের মুক্তির সাথে এই সংবিধানের কোনো সম্পর্ক নেই। প্রয়োজন শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত, বিভিন্ন শ্রেণী-পেশা এবং জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের স্বার্থরক্ষাকারী একটি গণতান্ত্রিক সংবিধান যা কেবলমাত্র জনগণের আন্দোলন-সংগ্রামের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সংবিধান সভা ও জনগণের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সরকার প্রতিষ্ঠার পথ বেয়ে প্রণীত হতে পারে।

 

সহায়ক রচনা :

১। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান
(১৯৭২ এর মূল সংবিধান)
২। বাংলাদেশের শাসকশ্রেণী ও সংবিধান বিতর্ক
বদরুদ্দীন উমর, সংস্কৃতি, অক্টোবর ২০১০
৩। মুক্তিযুদ্ধে জনগণের আকাঙ্ক্ষা এবং গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রতিষ্ঠার লড়াই
একটি গণসংহতি পত্রিকা প্রকাশনা
৪। ’৭২ এর সংবিধান অধ্যয়ন ও পর্যালোচনা সহায়ক কয়েকটি নোটের খসড়া
এ্যাডভোকেট হাসনাত কাইয়ুম, অপ্রকাশিত
৫। সংবিধান ও গণতন্ত্র, ফরহাদ মজহার, আগামী প্রকাশনী