লিখেছেনঃ শমীন্দ্রঘোষ, আপডেটঃ July 17, 2025, 12:00 AM, Hits: 1033
(বর্তমানে ভারতে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে এমন এক নূতন বিতর্ক শুরু হয়েছে যাতে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বাংলা ভাষা ও বাঙ্গালী জাতিকে বাংলাদেশী বা বিদেশী বলে দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। এই চেষ্টায় যুক্ত হয়েছে সম্প্রতি আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার বাংলাবিরোধী বক্তব্য। সেখানে তিনি বলেছেন, বাংলাভাষাকে যারা মাতৃভাষা বলবে তাদেরকে বিদেশী হিসাবে চিহ্নিত করা হবে। এমন অবস্থার প্রেক্ষিতে ভারতের বাঙ্গালী লেখক শমীন্দ্রঘোষের সংক্ষিপ্ত কিন্তু গবেষণামূলক নিবন্ধটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে এই বিবেচনা থেকে এটি ওয়েবসাইট ‘বঙ্গরাষ্ট্র’-এ প্রকাশ করা হল। — বঙ্গরাষ্ট্র)
O বিভিন্ন তত্ত্ব, ঐতিহাসিক তথ্য অনুসারে #বাংলা ভাষা ও লিপি অন্তত ২,০০০ বছর পূর্বের।
"বঙ্গৃদ" শব্দটি ঋগ্বেদের।
তো, এই ভাষাটা যারা বলতো তাদেরই "বঙ্গ" বা "বঙ্গী" বা "বোঙ্গালী" বলা হতো।
বাঙালি আদি কবি "বঙ্গীশথের" ছিলেন গৌতমবুদ্ধের অন্যতম শিষ্য এবং কবি; অর্থাৎ, ২৫০০ খ্রিস্টপূর্বের আশেপাশে।
◾তখনও "আসাম", "অহম" এবং "অসমীয়া", "অহমীয়া" কিছুরই অস্তিত্ব ছিল না। কিন্তু "বোঙ্গালী" ছিল, এবং ডিমাসা, বোরো, কোকবরক, মুণ্ডা, সাঁওতালি, ভূমিজ, হাজং ভাষাভাষী মানুষ ছিল।
O আর, এই বাঙালিই ছড়িয়ে বসবাস করতো মিজোরামের পশ্চিম ও উত্তরাংশ, ত্রিপুরা, আসাম, মণিপুরের পশ্চিমাংশ, নাগাভূমির পশ্চিম ও উত্তরাংশ, মেঘালয়, বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা জুড়ে। এসব বহুকাল ধরে বারেবারে প্রমাণিত।
◾তখনও "আসাম", "অহম" এবং "অসমীয়া", "অহমীয়া" কিছুরই অস্তিত্ব ছিল না। কিন্তু "বোঙ্গালী" ছিল, এবং ডিমাসা, বোরো, কোকবরক, মুণ্ডা, সাঁওতালি, ভূমিজ, হাজং ভাষাভাষী মানুষ ছিল।
O এখনও "বাংলা মাতৃভাষী" আছে উক্ত পুরো অঞ্চল জুড়ে; কিন্তু, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ বাদে বাকি অঞ্চলে সংখ্যায় কম।
✅বরং অসমীয়া মাতৃভাষীরাই আসামে অনুপ্রবেশকারী। তাদের পূর্বপ্রজন্ম ১২০০ খ্রিস্টাব্দের আগে এখনকার ভারতের মানচিত্রের ভিতরের অঞ্চলে আসেনি। প্রাচীন রাজত্ব ১২২৮-এ শুরু। "সুকাফা" নামক লুটেরা, তাদেরই আরও কয়েকটি গোষ্ঠীর সহায়তায় দক্ষিণ চীনের "মোঙ মাও" রাজ্য থেকে পাটকাই শৃঙ্গ পেরিয়ে এখনকার পূর্ব অরুণাচল, আসাম - সাদিয়া অঞ্চলে অনুপ্রবেশ করে। এই অঞ্চল তখন কামরূপ রাজ্যের অন্তর্গত।
✅অসমীয়াদের নৃতাত্ত্বিক পরিচয় --- মঙ্গোলিয় পর্যায়ের তিব্বতী-বর্মি, মারমা এবং ডিমাসা, বোরো, কোকবরক, মুণ্ডা, সাঁওতালি, ভূমিজ, হাজং, বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সংকর।
✅অসমীয়া হওয়ার পূর্বে তারা ছিল "চুতিয়া"। তখন তারা "চুতিয়া", এখনকার "সাদিয়া" অঞ্চল দখল করেছিল এবং রাজ্য গড়েছিল। এসেছিল দক্ষিণ চীন থেকে। তারপরে ধীরে ধীরে এখনকার আসাম দখল করে ব্রাহ্মণ্যবাদী এবং ইসলামীদের সহায়তায়।
O সেইসময়ে লোহিত (ডিলাও) - ড্রি - ডিহাং - ব্রহ্মপুত্র (ৎসাং) - নাওডিহিং - ডিহিং - ডিসিং - ডিখাও এবং বরাক থেকে ধানসিরি, সুবাংসিরি, কপিলিং, কোলোং, মানস, সংকোষ হয়ে করতোয়া নদী পর্যন্ত এই বিশাল নদী উপত্যকার অধিবাসীরা হলো ডিমাসা, বোরো, কোকবরক, মুণ্ডা, সাঁওতালি, ভূমিজ, বাংলা, হাজং ভাষাভাষী মানুষ। তাদের মধ্যে অনেকেই স্বতন্ত্র গ্রাম-রাজ্য গঠন করেই বাস করতো। আর, বৃহৎ একাধিক রাজ্য তো ছিলই।
O ডিমাসা, বোরো, কোকবরক, হাজং ভাষাভাষী মানুষ এসেছে ১০০০ - ১০০ খ্রিস্টপূর্বের মধ্যে।
O মুণ্ডাদের একটি সুবৃহৎ শাখা এসেছে ২৫০০ - ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে।
O সাঁওতালদের পূর্বপ্রজন্ম আরও ২০ হাজার বছর আগে যাতায়াত করেছিল এখনকার আসামের মধ্য দিয়ে এবং বসবাস করতো।
O এ ছাড়া মারমাদের একাংশ ছিল। তারা গুপ্তসম্রাটদের আমলেই আসে। তারা অসমীয়া নয়, আরাকানি তথা মঘ। "মারমা" বা "ম্রানমা" একই। এর থেকেই বর্মা, দেব জুড়ে দেববর্মা, বর্মন, দেববর্মণ। মায়ানমার এসেছে "ম্রানমা" থেকে।
O গুপ্তসম্রাট সমুদ্রগুপ্ত এখনকার আসাম জয় করেন যখন, তখন কামরূপে রাজত্ব ছিল নরকবংশ তথা নরকাসুর। এরা ভূমিজ, বিহার থেকে ওখানে সাম্রাজ্য পত্তন করে পুষ্যমিত্রের অভ্যুত্থানের পরে। সমুদ্রগুপ্ত জয় করেন এর পাশের রাজ্য "দেবক"; এখনকার হোজাই জেলা। এরসঙ্গে "সমতট" রাজ্য জয় করেন।
সমুদ্রগুপ্তের "এলাহাবাদ স্তম্ভ"এ দেখে আসবেন।
তখন "আসাম", "অহম" এবং "অসমীয়া", "অহমীয়া" নামকরণ হয়নি; কারণ, অসমীয়ারা ছিল না; এসব শব্দের অস্তিত্ব ছিল না। কিন্তু "বোঙ্গালী" ছিল, এবং ডিমাসা, বোরো, কোকবরক, মুণ্ডা, সাঁওতালি, ভূমিজ, হাজং ভাষাভাষী মানুষ ছিল।
O কামরূপ তথা আসামের রাজা ভাস্করবর্মা তো বাংলার রাজা শশাঙ্কের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন রাজা হর্ষের সঙ্গে আঁতাত করে। ভাস্করবর্মা অসমীয়া ছিলেন না।
তখনও "আসাম", "অহম" এবং "অসমীয়া", "অহমীয়া" শব্দগুলোর অস্তিত্ব ছিল না। কিন্তু "বোঙ্গালী" ছিল, এবং ডিমাসা, বোরো, কোকবরক, মুণ্ডা, সাঁওতালি, ভূমিজ, হাজং ভাষাভাষী মানুষ ছিল।
O "বড়ুয়া" অসমীয়া নয়। বড়ুয়া শব্দটি এসেছে বোইওয়া" থেকে। তারা আরাকানি তথা মঘ। "বো" অর্থ সেনাপ্রধান; "ইওয়া" বা "ডুয়া" অর্থ অঞ্চল বা গ্রাম। উচ্চারণ বিপর্যয়ে বোউয়া > বোডুয়া > বড়ুয়া শব্দের অর্থ সেনাপ্রধানের আবাস অঞ্চল।
▪বোরো ভাষায় "বরা" - "বোরো" - "বোরোক" শব্দের অর্থ "মানুষ"।
▪মুণ্ডা ভাষায় "বারা", "বারাম", "বরাম", "বরা" শব্দের অর্থ মানুষের মুণ্ডু, অর্থাৎ মগজওয়ালা মানুষ (Headman)।
▪কোকবরক শব্দের অর্থ "মানুষের ভাষা"। "কোক" অর্থ ভাষা। এই ভাষা বোরো ভাষারই অংশ।
▪ডি-মা-সা শব্দের অর্থ "বড়ো জলের মানুষ", অর্থাৎ বড়ো নদীর মানুষ। "ডি" অর্থ জল, শব্দের আগে বসে। অসংখ্য স্থাননাম আছে "ডি" দিয়ে।
▪সাঁওতালি, বাংলায় "ডি" অর্থ জল, শব্দের শেষে বসে --- সাঁওতালডি ইত্যাদি। ডি থেকে দি --- তালদি ইত্যাদি।
▪আসামের বঙ্গাইগাঁও, বোঙ্গাবাড়ি, বোঙ্গাও, বোঙ্গামাটি, বঙ্গউ, বঙ্গাইউসু গাঁও হলো সাঁওতালি ভাষার। "বোঙ্গা" তাদের উপাস্য।
▪হাজং শব্দের অর্থ হলো "হাজো"র উত্তরসুরি। হাজো কামরূপ জেলায়।
O আসামে প্রাচীন শত শত অঞ্চলের নাম, নদীর নাম ডিমাসা, বোরো, কোকবরক, মুণ্ডা, সাঁওতালি, বাংলা, হাজং ভাষার।
▪গারো জনগোষ্ঠী অসমীয়াদের পূর্বেই এখনকার আসাম অঞ্চলে প্রবেশ করেছিল।
✅উক্ত সব ভাষাভাষীদের হটিয়ে দিয়েছিল দক্ষিণ চীন থেকে আগত "চুতিয়া" লুটেরা, নৃশংস হ*ত্যাকারীরা। সেই "চুতিয়া"রা আদপে গারোদের মতন নৃশংস, অনৈতিক যোদ্ধা, লুটেরা ছিল। এমনটা ওই বিশাল অঞ্চল জুড়ে গারো ছাড়া আর কেউই ছিল না।
✅ফলে, বোঙ্গালী, মারমা এবং ডিমাসা, বোরো, কোকবরক, মুণ্ডা, সাঁওতালি, ভূমিজ, হাজং, গারো ভাষাভাষী মানুষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছিল।
✅শেষে উক্ত অঞ্চলে টিকে থাকার জন্যেই বাংলা ভাষার পূর্বাইয়া অপভ্রংশ তথা কামরুপী ভাষা সহ স্থানীয় ভাষা ধার নিয়ে এবং মিশিয়ে স্থানীয় অধিবাসী সেজেছিল।
◾এমনকী সাংস্কৃতিক আচরণ, উৎসব পর্যন্ত ধার নিয়েছিল। মিশে গিয়েছিল স্থানীয় অবশিষ্ট অধিবাসীদের একাংশের সঙ্গে। নিজেদের স্বাতন্ত্র্য গড়ে তুলতে এরপরে সহায়তা নিয়েছিল স্থানীয় ব্রাহ্মণ্যবাদীদের। তখনও তারা "আসাম" ও "অসমীয়া" নয়।
◾"অহম" আসলেই সংস্কৃত "অহংকার" অর্থে।*** কিন্তু, অসমীয়ারা এর ব্যাখ্যা যেটা দেয়, সেটা ভ্রান্ত। আদপে, স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে এবং পরিচিতি দৃঢ় করতে ব্রাহ্মণ্যবাদীদের এই উমদা চাল কাজে যে লেগেছিল তার অন্যতম একটি প্রমাণ গত প্রায় ৬০ বছর যাবত অসমীয়াদের দ্বারা বাঙালি বিদ্বেষ, "বাঙালি খেদাও" হুজুক।
◾অহম নামাঙ্কিত রাজ্যের রাজার সঙ্গে ত্রিপুরারাজের এখনকার রংপুরে সন্ধি হয় ১৪-১৫ শতকে; অন্যতম সাক্ষী ছিলেন ত্রিপুরার পক্ষে রাজপুরোহিত রামেশ্বর তর্কালঙ্কার। এই উপলক্ষে দুর্গাপূজা করা হয়।
◾এরপরে "অহম"রাজও ত্রিপুরা রাজ্যের রাজাদের মতন "বুরুঞ্জি" বানায় এবং নিজেদের প্রাচীনত্ব প্রতিষ্ঠা করে; যার ৯০%ই কাল্পনিক গপ্প।
◾খ্রিস্টীয় ৫ম শতকের "উমাচল শিলালিপি" অসমীয়া ভাষার নয়। বরং সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ স্তম্ভ লিপির সঙ্গে সামঞ্জস্য আছে। আর, তখন "আসাম", "অসমীয়া", "অহম", "অহমিয়া" নামক কিছুর অস্তিত্ব ছিল না।
◾আসলে, অসমীয়া ভাষার লিপি ছিল তিনটি --- "কৈথেলি" (কামরূপী লাকারী), "বামুনিয়া" (দেবনাগরী মিশ্রিত), "গর্হগয়" লিপি। মধ্যযুগে ব্যবহৃত হতো। এরপরে হয় বাংলা লিপি। ঊনবিংশ শতকে এক খ্রিস্টান যাজকের প্রচেষ্টায় আত্মারাম সর্মাহ বাংলা লিপি ধার করা ছাঁচে "অসমীয়া লিপি" নাম দেয় এবং আরও স্বাতন্ত্র্য দেয় বিচ্ছিন্ন করে শাসনের উদ্দেশ্যেই। সেই লিপিতে ছাপা হয় পশ্চিমবঙ্গের শ্রীরামপুর ছাপাখানায়।
◾"আসাম" নামকরণও ব্রিটিশদের দ্বারা অষ্টাদশ - ঊনবিংশ শতকের। তার পূর্বে কামরূপ, দেবক প্রভৃতি নাম ছিল।
◾"টলেমি" বলেছেন "কিরাত"; "আসাম", "অহম", "অসমীয়া", "অহমিয়া" উল্লেখ করেননি। গ্রিক এবং রোমান সূত্রে এই নামই পাওয়া যায়, কোনো অহমিয়া, অসমীয়া, অহম, আসাম পাওয়া যায় না। কিরাতও তিব্বতী-বর্মি; তখন ছিল ডিমাসা, বোরো, কোকবরক, মুণ্ডা, সাঁওতাল, ভূমিজ, হাজং, মারমা; এরাই একত্রে "কিরাত"।
◾আসামে অসমীয়া ছাড়াও বহু ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী অসমীয়াদের পূর্ব থেকেই বসবাস করে।
◾এখনও অসমীয়ারা নিজেদের "তাই অহম" বলে*। এই "তাই" হলো একটি ভাষা। পূর্বকালে দক্ষিণ চীনের "মোঙ মাও" রাজ্যের ভাষার জনগোষ্ঠী। এখন ভাষা-সাংস্কৃতিক জনগোষ্ঠী। এখনও "তাই" আছে। "তাই" উত্তরসূরিরা এখন "ডাই" বা "দাই", "থাই", "তাই ইয়াই", "লাও", "তাই অহম" --- প্রায় ৯.৩ কোটি জনসংখ্যার ভাষা-সাংস্কৃতিক জনগোষ্ঠী। এই "তাই", "থাই" থেকেই থাইল্যান্ড। থাইল্যান্ডের পূর্বসূরি এবং অসমীয়াদের পূর্বসূরি এক হলেও অসমীয়ারা ডিমাসা, বোরো, কোকবরক, মুণ্ডা, সাঁওতালি, ভূমিজ, হাজং, বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সংকর।
◾এখনও অসমীয়ারা তাদের বিভিন্ন সংগঠনের নামের সঙ্গে "তাই", "অহম" শব্দ ব্যবহার করে তাদের উৎসের জানান দেয়। যেমন, All Tai Ahom Students Union (ATASU) ইত্যাদি।
✡এবারে হিমন্ত বিশ্বশর্মা নামক অনুপ্রবেশকারী লুটেরা, ডাকাতের উত্তরপুরুষ এবং তার অনুগামীরা বলুক তাদের জন্যে ঠিক কী কী পুরস্কার দেওয়া আমাদের কর্তব্য। বিদেশী কারা?
⬛রাজা তোর কাপড় কোথায়!?
***"তাই অহম" থেকে অহম এবং অহম মানে অহংকার --- এই দুইয়ের সমীকরণ করে ব্রাহ্মণ্যবাদীরা।
১৫/০৭/২৫