Banner
হকার উচ্ছেদের কথকতা — শামসুজ্জোহা মানিক

লিখেছেনঃ শামসুজ্জোহা মানিক, আপডেটঃ April 13, 2026, 12:00 AM, Hits: 68

যানজট ও জনজটে প্রায় অচল রাজধানী ঢাকা নগরকে সচল করার লক্ষ্যে সরকার রাস্তার ফুটপথগুলিকে হকারদের অস্থায়ী দোকানমুক্ত করার উপর বিশেষ মনোযোগ দিয়েছে। ইতিমধ্যে গুলিস্তান, নিউমার্কেটসহ অনেক জায়গার ফুটপথ অস্থায়ী দোকানমুক্ত ও ফলে জনচলাচলের উপযোগী হয়েছে।

আপাতদৃষ্টিতে এর সুফল আছে। ফুটপথ দোকানীদের দখলমুক্ত হবার ফলে পথচারীদের চলাচল যেমন অনেকটা স্বচ্ছন্দ হয়েছে তেমন গাড়ী চলাচলের পথের উপর মানুষের চাপ কমায় বাস-ট্রাক-কারসহ বিভিন্ন যান চলাচলও এখন অনেকটা স্বচ্ছন্দ হয়েছে। ঢাকাবাসী এর অনেক সুফল ভোগ করছে বৈকি।

জাতিসংঘের ‘ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্ট্স ২০২৫’ (World Urbanisation Prospects 2025)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, বর্তমানে ঢাকা মহানগরীর জনসংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৬৬ লাখ। জনসংখ্যার বিচারে বর্তমানে ঢাকা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। শীর্ষে আছে ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা (৪ কোটি ১৯ লাখ)।

এই সাড়ে তিন কোটিরও বেশী জনসংখ্যা অধ্যুষিত নগরে অবৈধভাবে ফুটপথ দখলকারী দোকানীদের সংখ্যা কত হতে পারে? বিভিন্ন হকার সংগঠনের তথ্যমতে ঢাকায় হকার বা অবৈধভাবে দোকান করে ব্যবসা করছেন এমন ব্যবসায়ীদের সংখ্যা ২ লক্ষ ৫০ হাজার থেকে ২ লক্ষ ৭০ হাজার যেটা ঈদ জাতীয় কোনও উৎসব উপলক্ষ্যে ৩ লক্ষ ছাড়িয়ে যায়।

আমার ধারণা সাড়ে তিন কোটিরও বেশী মানুষ অধ্যুষিত এই নগরে রাস্তার উপর অস্থায়ী দোকানদার তথা হকারদের সংখ্যা মোটামুটি ৩ লক্ষ হওয়া স্বাভাবিক। আর একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। সেটা হল চাঁদাবাজীর অর্থনীতি। যেহেতু অবৈধভাবে সরকারী রাস্তার জায়গা দখলে নিয়ে ফুটপথে এবং এমনকি রাস্তায়ও ভ্যানের উপর দোকানদারী চলে সেহেতু এই সমগ্র প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে আছে ঘুষ বা বাধ্যতামূলক চাঁদাবাজী। ক্ষমতার নিম্ন পর্যায় থেকে উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত এই অর্থ বণ্টিত হয়। এই টাকার ভাগ শুধু পুলিশ পায় না, এটা পাড়ার মাস্তান থেকে রাজনীতির বিভিন্ন পর্যায়ে থাকা ‘বড় ভাই’রাও পায়। এটা দেশের একটা শক্তিশালী কালো অর্থনীতি গড়ে উঠতে সাহায্য করে। বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের একটা তথ্যে দেখলাম ঢাকায় প্রতিদিন হকার প্রতি ৩০০ টাকা চাঁদা আদায় করা হয। বছরে এটার পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা।

চাঁদা নাম দেওয়া হলেও এটা পুরাটাই অবৈধ। কারণ সরকারী সম্পত্তি ও ক্ষমতা ব্যবহার করে এই অর্থনীতি গড়ে উঠলেও এর পুরাটাই বেআইনীভাবে কিছু ব্যক্তির পকেটে যায়। ১৯৭২ তথা জন্মলগ্ন থেকে ঘুষ, দুর্নীতি ও লুটপাটের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে যে অর্থনীতি গড়ে উঠেছে এটা যে শুধু সেই লুণ্ঠন ও বৈষম্য মূলক অর্থনীতিকে বেগবান ও শক্তিশালী করে তাই নয়, অধিকন্তু যে লুটেরা ও দুর্বৃত্ত শ্রেণী ’৭২ সাল থেকে বাংলাদেশের রাজনীতির নিয়ামক হয়ে আছে তাদের হাতকেও বেগবান ও শক্তিশালী করে।

রাস্তার ধারের হকাররা সমাজের এমন দুর্বল একটা শ্রেণী যাদের অস্তিত্বের কোনও বৈধ সামাজিক ভিত্তি না থাকায় যাদের নিয়ে সমাজের উচ্চবর্গ কিংবা ক্ষমতাশালীদের পক্ষে ছিনিমিনি খেলা খুব সহজ। যখন তখন মিছিল সংগঠন ও পেশীশক্তি প্রদর্শনের জন্য হকারদের এই সামাজিক ভিত্তি খুব কাজে লাগে। কারণ এদের কাছ থেকে আসে সহজ ও নিশ্চিত অর্থ যা দিয়ে পাড়া-মহল্লার খুচরা মাস্তানদের পোষা যায়। এছাড়া পাওয়া যায় বিভিন্ন ধরনের জনশক্তি।

এখন আমার প্রশ্ন, সরকার কোন উদ্দেশ্যে হকার উচ্ছেদ শুরু করেছে? চাইলেও কি সরকার এখন এই কয়েক লাখ মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থান করতে পারবে? শুধু প্রায় তিন লাখ মানুষের কথা ভাবলে হবে না। তাদের পরিবারের কথাও ভাবতে হবে। এক এক জনের আয়ের উপর নির্ভর করে আরও অন্তত ৪/৫ জন। অর্থাৎ মোটাদাগে ধরলেও সরকারের এই অভিযানে ক্ষতিগ্রস্ত হবে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ। এদের জন্য কী করবে সরকার? এরা সব হারিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে মারমুখী ও ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠলে কী করবে সরকার? কয়দিন সামাল দিবে, কীভাবে সামাল দিবে? এটা ঠিক যে, নগরবাসী কয়দিনের জন্য হাঁপ ছাড়বে। পথে ঠিক মত হাঁটবে, গাড়ীতে চলবে। কিন্তু যখন সর্বত্র সহিংসতা ছড়িয়ে পড়বে তখন তারা সরকারকেই দায়ী করতে শুরু করবে।

অবশ্য লক্ষ লক্ষ মানুষকে এমনিতেই এভাবে জীবিকা ছাড়া ঘরে বসিয়ে রাখা সম্ভব না। কর্মসংস্থানের সুযোগহীন গ্রামেও আর ঠেলে পাঠানো সম্ভব না। নানান জন নানানভাবে নানান পেশা বেছে নিতে চেষ্টা করবে। অনেকে মরীয়া হয়ে পুনরায় ফুটপথে দোকান দিবার চেষ্টা করবে। এতে অবশ্য পুলিশ আর মাস্তানদের কিছু বাড়তি আয়ের সুযোগ হবে। এবং নগর পুনরায় তার পূর্বরূপে ফিরবে। মাঝখানে সরকার হারাবে এদেশের নিঃস্ব ও বাস্তুচ্যুত এক বিরাট জনগোষ্ঠীর সমর্থন ও সহানুভূতি।

সরকার তথা সরকারী দল কি এই সহজ অঙ্কটা বুঝে না? আমাদের সহজ বুদ্ধিতে যেটা ধরা পড়ছে সেটা তাদের বুদ্ধিতে ধরা পড়ছে না এটা মনে করার কারণ আমি দেখি না। আমার অনুমান হকার উচ্ছেদের এই কর্মনীতির পিছনে দুইটি প্রধান কারণ কাজ করছে। একটি হচ্ছে সরকারের শক্তিমত্তা প্রদর্শন ক’রে জনতার এক বৃহৎ অংশের ভয় ও আনুগত্য আদায় করা। দুর্বল ও ভঙ্গুর হকার শ্রেণীর মানুষদের উপর শক্তিমত্তা প্রদর্শন করা খুব সহজ উপায় বৈকি! এখন এদের পৃষ্ঠপোষক হিসাবে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় নাই। সুতরাং চাঁদাবাজীর পুরাতন বন্দোবস্ত ভাঙ্গতে অসুবিধা কী?

এবং অপরটি হচ্ছে বাংলাদেশে যে দুর্নীতিগ্রস্ত অর্থনীতি গড়ে উঠেছে তাকে বিএনপি সংশ্লিষ্ট রাজনীতির সহায়ক হিসাবে পুনর্গঠন করা। হকার বা ভাসমান ব্যবসায়ী নির্ভর যে জনসংখ্যা এখন ঢাকায় বিদ্যমান তাদের নেতৃত্ব কাঠামোতে একটা পরিবর্তনের প্রয়োজন এই জন্য। অর্থাৎ পুলিশ ও রাষ্ট্রের সঙ্গে হকার শেণীর মানুষদের সম্পর্ক স্থাপনের জন্য নূতন একদল লোক আসবে। এরা হবে বিএনপি-এর বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা ও কর্মী।

আমার ধারণা সরকারের বর্তমান কর্মকাণ্ডের এই পরিণতি সম্পর্কে সরকার ও সরকারী দল বিএনপিও সচেতন। অর্থাৎ তারা হকার উচ্ছেদের কাজটা সচেতনভাবেই করছে। বিদ্যমান আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা ও আইনী কাঠামো বজায় রেখে হকারমুক্ত ঢাকা গঠন করা আর সম্ভব নয়। এমনকি যে যানজটের যুক্তি তুলে হকার উচ্ছেদ করা হচ্ছে ঢাকা নগরকে সম্পূর্ণরূপে হকারমুক্ত করা হলেও যানজটমুক্ত করা অসম্ভব। আমার অতীতের বিভিন্ন আলোচনায় আমি ঢাকার নগরায়নের মূল সমস্যার দিকে দৃষ্টি নিতে চেয়েছি। ইউটিউব চ্যানেল লোকায়ততেও আমার এ সম্পর্কিত মৌখিক বক্তব্য আছে। এখন আমি এ প্রসঙ্গে বেশী কথা না বলে সংক্ষেপে বলব যে, ঢাকা নগরের জন্মপ্রক্রিয়ার মধ্যেই সঙ্কট আছে। এটি প্রকৃতপক্ষে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলা একটি নগর, যা গড়ে তুলা হয়েছিল বিদেশী শাসকদের অস্থায়ী নিবাস ও তাদের অধস্তন কর্মচারীদের নিবাস হিসাবে। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর আরও অধিকতর অপরিকল্পনার ফসল হিসাবে একটা বিরাট বস্তির রূপ নিয়ে ঢাকার বিকাশ ও বিস্তার ঘটেছে। বস্তুত ঢাকা এখন একটি বিশালায়তন পাকা বস্তি (Slum)।

যাদের হাত দিয়ে ও যেভাবে এই নগর বর্তমান দশা নিয়েছে তাতে একে আর পুনর্গঠনের চিন্তা না করে নূতন কোথায়ও রাজধানী নির্মাণের কথা চিন্তা করা উচিত। একবারে না হলেও পর্যায় ক্রমে কাজটা করতে হবে। সেই মহাযজ্ঞে হাত দিবার মতো নেতৃত্ব কি এখন ক্ষমতায় আছে? এটা আসলেই মহাযজ্ঞের ব্যাপার। কারণ প্রয়োজন শুধু নূতন রাজধানী গঠনের নয় সেই সঙ্গে সমগ্র আর্থ-সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার পরিবর্তনেরও। তবে কাজটা এখন আসন্ন হয়ে উঠছে। অর্থাৎ যে অভিধাই আমরা দিই বাংলাদেশের জন্য এখন একটা বিরাট রাজনৈতিক ও সামাজিক বিপ্লব অনিবার্য হয়ে উঠছে। কোনওভাবেই ঢাকাকে যে সেভাবে মানুষের বাসযোগ্য করা সম্ভব নয় সেটা যেমন বুঝতে হবে তেমন এটাও বুঝতে হবে যে, বিদ্যমান আর্থ-সামাজিক কাঠামো বজায় রেখে বাংলাদেশকেও আর মানুষের বাসযোগ্য করে তুলা সম্ভব নয়। সংবাদপত্রের পাতায় অথবা অগণিত সামাজিক প্রচার মাধ্যমে আমরা প্রতিনিয়ত যে চিত্র পাই তা থেকে কি এটা এখন স্পষ্ট নয় যে, দেশকে কোন্ অতল তলে তলিয়ে দিয়ে হাসিনা ও  তার দল আওয়ামী লীগ দেশ ছেড়ে পালিয়েছে? এখন বিএনপিকে ঠিক করতে হবে তারা হাসিনা ও আওয়ামী লীগের পথ ধরে হাঁটতে গিয়ে সহায়-সম্বলহীন রাস্তার হকারদের নিয়ে ঢাকার রাজপথ পরিষ্কার করার নামে নিষ্ঠুর লুকোচুরি খেলা খেলবে নাকি সারাদেশের জন্য নূতন পথ সন্ধান করবে।

 ১৩ এপ্রিল, ২০২৬

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
Archive