লিখেছেনঃ শামসুজ্জোহা মানিক ও শামসুল আলম চঞ্চল, আপডেটঃ July 26, 2025, 12:00 AM, Hits: 1169
সূচীপত্র
প্রথম অধ্যায় : ভারতবর্ষে মুসলিম আক্রমণ, বিজয় ও শাসন : একটি পর্যবেক্ষণ
দ্বিতীয় অধ্যায় : বাংলায় ধর্মান্তরকরণের সমাজতাত্ত্বিক পর্যালোচনা
তৃতীয় অধ্যায় : ব্রিটিশ শাসনকাল
চতুর্থ অধ্যায় : ব্রিটিশ শাসনের অবসান ও মুসলিম বাঙ্গালীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পথে যাত্রা
(‘‘প্রথম অধ্যায় : ভারতবর্ষে মুসলিম আক্রমণ, বিজয় ও শাসনঃ একটি পর্যবেক্ষণ’’ ইতিপূর্বে ‘‘বঙ্গরাষ্ট্র’’-এ প্রকাশিত হওয়ায় সেটি [লিংক : http://bangarashtra.net/article/1605.html এখানে প্রকাশ করা হল না। সুতরাং এখানে তারপরের অধ্যায়সমূহ যথাক্রমে দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ অধ্যায় প্রকাশ করা হল। — লেখকদ্বয়)
দ্বিতীয় অধ্যায় : বাংলায় ধর্মান্তরকরণের সমাজতাত্ত্বিক পর্যালোচনা
বাংলার ভূ-প্রাকৃতিক ও সামাজিক বৈশিষ্ট্যের স্বকীয়তা
প্রাচীন ও মধ্য যুগের বাংলা বা বঙ্গ প্রধানত আজকের বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও ভারতের পশ্চিম বঙ্গ নিয়ে গঠিত ছিল। অসংখ্য জলাভূমি সমাকীর্ণ ও অসংখ্য নদ-নদী বিধৌত বৃহৎ ব-দ্বীপ ভূমি হওয়ার বাস্তবতা ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চল থেকে বাংলাকে ভিন্নতা ও এক ধরনের প্রাকৃতিক বিচ্ছিন্নতা দিয়েছিল। উপরন্তু, প্রচুর বৃষ্টিপাত, আর্দ্র, উষ্ণ ও অস্বাস্থ্যকর জলবায়ুর প্রভাবে পোকা-মাকড় ও মশার আধিক্য এবং ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর, ডায়রিয়া, কলেরা, বসন্ত ইত্যাদি ব্যাধির আধিক্যের প্রভাবে মৃত্যুহারের আধিক্যের ফলে বাংলা বাইরের মানুষদের নিকট বসবাসের জন্য আকর্ষণীয় ছিল না। তারপরেও বাংলার ভূমির উর্বরতা ও এখানকার সম্পদের জন্য বাইরে থেকে বিদেশীরা এখানে বারবার আক্রমণাভিযান পরিচালনা করে বাংলাকে অধীনস্থ করতে চেষ্টা করেছে, আবার কেউ কেউ বিপুল সম্পদ ও ফসল এবং খাদ্যের সহজপ্রাপ্যতার জন্য বাইরে থেকে এসে এখানে বসতি স্থাপন করেছে।
ভূপ্রকৃতি ও জলবায়ুর কারণে ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চল থেকে বাংলার এই বিচ্ছিন্নতা ও একই সাথে অসংখ্য নদ-নদী, খাল-বিল দিয়ে এখানকার এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতার ফলে এক ধরনের স্বাধীনতা-স্পৃহা এবং বিশেষত বিচ্ছিন্নতা-প্রিয়তা এদেশের মানুষের চেতনায় কাজ করেছে। এইজন্য বাংলা সম্পর্কে বিদেশীদের বা ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষদের ধারণা ছিল এরা বিচ্ছিন্নতা-প্রিয় ও স্বাধীনচেতা। ফলে এই অঞ্চল কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্র-শাসন ব্যবস্থার বদলে দীর্ঘকাল বিভিন্ন আঞ্চলিক শাসকদের দ্বারা শাসিত হয়েছে। বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিলপত্র এই ধারণা সমর্থন করে যে, বাংলা অঞ্চলের মানুষেরা প্রাচীন কাল থেকে আঞ্চলিক নানা স্থানীয় রাজা বা শাসকদের দ্বারা শাসিত হয়েছে ও তারা স্বাধীন থাকতে চাইত। বহিরাগত শত্রু আক্রমণ করলে এই সমস্ত বিচ্ছিন্ন আঞ্চলিক শাসকরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে যেত ও সমন্বিতভাবে বহিঃশত্রুকে প্রতিরোধ করত। খ্রীষ্টীয় চতুর্থ শতাব্দীর শুরুর দিকে বাংলার সাধারণ রাজনৈতিক অবস্থা পুরাণে যেমন বলা আছে সেখান থেকে খুব বেশী পৃথক ছিল না। বহু সংখ্যক নদী ও জলাভূমি দিয়ে বিচ্ছিন্নতার ফলে বিভিন্ন অঞ্চল নিরাপত্তা পেত ও এর প্রভাবে তারা তাদের নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য নির্মাণ করেছিল। এই সময়ে বাইরের আগ্রাসনকারীদের প্রতিরোধের জন্য তারা প্রায় সময়েই ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সঙ্ঘ গঠন করত।১ গৌড়-বহো গ্রন্থের লেখক বাকপতি বঙ্গের মানুষদের উচ্চ প্রশংসা করেছিলেন এই বলে যে, ‘বিজয়ীকে অভিবাদন জানাবার সময় তাদের মুখমণ্ডল ফ্যাকাশে বর্ণ ধারণ করত, কারণ তারা এই ধরনের কাজে অভ্যস্ত ছিল না।’২ ধারণা করা যায় বাংলার মানুষরা স্বাধীনচেতা ছিল বলেই বাকপতি এমন মন্তব্য করেছিলেন।
-------------------------------------
১ দেখুনঃ R.C. Majumder (ed.), The History of Bengal, Vol, I, Hindu Period, Published by the University of Dacca, Dacca, First edition 1943, pp. 45, 46.
২ প্রাগুক্ত, পৃঃ ৮৯।
-------------------------------------
বাংলায় প্রচুর বৃষ্টিপাত, জলাভূমি ও নদ-নদী সম্পর্কে বহিরাগত মুসলমানদের বিভিন্ন লেখা থেকে বিবরণ পাওয়া যায়। তারিখ-ই ফিরোজ শাহীর লেখক শামস-ই সিরাজ আফিফ লিখেছেন, বাংলা হচ্ছে জলাভূমির দেশ এবং এখানকার অভিজাতরা দ্বীপে তাদের জীবন কাটাত।১ আবুল ফজল আকবর নামা-য় বিশেষভাবে বর্ষার পরে বাংলার বেশীরভাগ অঞ্চল বিষাক্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন।২ তবে বাংলাকে তিনি ‘চমৎকার দেশ’ হিসাবে একাধিকবার বলেছেন।৩ এছাড়াও লোকজনের অবাধ্যতা ও দেশটির মহামারী ঘটাবার মত জলবায়ু, এবং উচ্চ মৃত্যুহার থাকায় মুসলমানদের এখান থেকে চলে যাবার পর পুনরায় বাংলায় ফিরে যেতে অস্বীকার করার ঘটনাও উল্লেখ করেছেন।৪
-------------------------------------
১ আফিফ লিখেছেন, “For Bengal was a land of swamps, and the nobles of the country passed their lives in their islands (jazáírát).” দেখুনঃ Elliot and Dowson, The History of India as Told by its Own Historians, Vo. III, p. 297.
২ আবুল ফজল রচিত আকবর-নামায় এ সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ “… He (Mun’im Khān) did not notice that the atmosphere of the place had acquired poisonous qualities in consequences of the vicissitudes of time and of the decay of the buildings, especially at the time of the end of the rains, when there is a change of climate in most of the districts of Bengal.” দেখুনঃ H. Beveridge (Tran.), The Akbar Nāma of Abu’l-Fazl, Translated from the Persian, Volume III, The Asiatic Society, First published 1939, Reprinted 2000, Calcutta, p. 226.
৩ প্রাগুক্ত, পৃঃ ২২৬, ২২৯,
৪ প্রাগুক্ত, পৃঃ ২৩০।
-------------------------------------
বাংলায় সাধারণত বহিরাগত মুসলমানরা আসতে চাইত না। তাজকিরাতুল ওয়াকিয়াত গ্রন্থের লেখক জওহর আফতাবচী এই রকম একটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন, যেখানে মোগল সম্রাট হুমায়ুন বাংলার শাসন-কর্তৃত্ব অর্পণ করার জন্য জাহীদ বেগকে অনুরোধ করলে বাংলাদেশে থাকতে অনিচ্ছুক হয়ে সম্রাটের কাছে তিনি নিবেদন করলেন, “আমাকে হত্যা করার জন্য বাংলা ছাড়া অন্য কোনো স্থান কি শাহান্শাহ পেলেন না?”১
-------------------------------------
১ দেখুনঃ জওহর আফতাবচী (মূল), তাজকিরাতুল ওয়াকিয়াত, সম্রাট হুমায়ুনের কাহিনী, চৌধুরী শামসুর রহমান অনূদিত, প্রথম প্রকাশ ২০০২, দ্বিতীয় মুদ্রণ, দিব্যপ্রকাশ, ঢাকা, ২০১০, পৃঃ ৩১।
-------------------------------------
পাতা : ১
মীনহাজ তার তবাকাত-ই-নাসিরী গ্রন্থে বর্ষাকালে বাংলার যোগাযোগের সমস্যার কারণে সুলতান গিয়াস উদ্দিন আইয়াজের একটি দীর্ঘ বাঁধ বা পথ নির্মাণের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, লক্ষণাবতী অঞ্চলটি গঙ্গার দুইপাশে দুইটি অংশ। পশ্চিম অংশকে রাঢ় বলে, যে অংশে লাখান’র১ নগরটি অবস্থিত। পূর্ব অংশ বরেন্দ্র অঞ্চল, যে অংশে দেবকোট পড়েছে। বর্ষাকালে সমস্ত পথ বন্যার জলে ডুবে যায় বলে এবং পথটি কাদা-জলে ও জলাভূমিতে নিমজ্জিত হয় বলে সুলতান গিয়াস উদ্দিন আইয়াজ এক পাশে লক্ষণাবতী থেকে লাখান’র নগরের প্রবেশদ্বার ও অন্যদিকে দেবকোট পর্যন্ত প্রায় দশ দিনের ভ্রমণ পথের দূরত্বে একটি বাঁধ নির্মাণ করেন। এই বাঁধটি নির্মাণ করা না হলে মানুষজনের পক্ষে নৌকা ছাড়া তাদের অভিপ্রায় অনুযায়ী কোথায়ও যাওয়া বা বিভিন্ন ঘরে বা বাসস্থানে পৌঁছানো সম্ভব হত না। এই বাঁধ নির্মাণের ফলে এই সময় থেকে এই পথটি লোকজনের নিকট উন্মুক্ত হয়ে যায়।২
-------------------------------------
১ লাখান’র নগরের অবস্থান সম্পর্কে তবাকাত-ই-নাসিরী-র ইংরাজী অনুবাদক মেজর এইচজি রেভার্টি গ্রন্থের টীকায় বলছেন যে, লক্ষণাবতী ও কাটাসিনের পথের মধ্যে লাখান’রের অবস্থান। এটি বীরভূম থেকে আরো দক্ষিণে হবে। এটি লকরকুণ্ডাহ (রেনেলের Lacaracoonda) হওয়া অসম্ভব নয়। দেখুনঃ Tabaqat-i-Nasiri, Vol. I, p. 585.
২ দেখুনঃ Tabaqat-i-Nasiri, Vol. I, pp. 585, 586.
-------------------------------------
এছাড়া বাংলার মানুষদের স্বাধীন থাকবার প্রবণতার কথা ভারতবর্ষের পুরাণ ও প্রাচীন উপকথার কাহিনীগুলির মতই মুসলমান ঐতিহাসিকরাও উল্লেখ করেছেন। সুলতানী আমলে বাংলার শাসকদের দিল্লীর সুলতানদের কাছ থেকে মুক্ত থাকার একটা প্রবণতা দেখা যেত। এই বিষয়ে তারিখ-ই-ফিরুজশাহী-র লেখক জিয়াউদ্দিন বারানীর মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি লিখেছেন, অভিজ্ঞ ও বিচক্ষণ ব্যক্তিরা লক্ষণাবতীকে ‘বলগাকপুর’ (বিদ্র্রোহী অঞ্চল) বলে ডাকতেন। প্রাচীনকাল অর্থাৎ সুলতান মুইজউদ্দিন মুহাম্মদের দিল্লী অধিকার করার পর থেকে দিল্লীর বাদশাহগণ যে সকল লোককে লক্ষণাবতীর শাসক নিযুক্ত করেছেন, তাদের মধ্যে অধিকাংশই বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে; যারা বিদ্রোহ করে নাই, অন্য লোকেরা তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে তাদেরকে হত্যা করেছে। এর কারণ দিল্লী থেকে লক্ষণাবতী অনেক দূরে অবস্থিত এবং বাংলা অঞ্চলটিও বহু দূর বিস্তৃত। ফলে অনেক দিন থেকেই বিদ্রোহ ঘোষণা এই অঞ্চলের লোকজনের স্বভাবে পরিণত হয়েছে এবং যে কোনো শাসক এই অঞ্চলে পদার্পণ করার সাথে সাথে সেখানকার বিদ্রোহী জনগণ তাকে কেন্দ্রের বিরোধী করে তুলে।১
-------------------------------------
১ দেখুনঃ জিয়াউদ্দিন বারানী (মূল), তারিখ-ই-ফিরুজশাহী, পৃঃ ৬৬।
-------------------------------------
বাংলার এই জলবায়ু, ভূপ্রকৃতি ও এখানকার মানুষদের বিচ্ছিন্নতা বা স্বাধীনতা-প্রিয়তার এই বৈশিষ্ট্য এখানে বিভিন্ন ধর্মের বিকাশ ও প্রসারে ভূমিকা রেখেছে এবং এই বাস্তবতায় এখানকার ধর্মান্তরকরণ এক জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে বলে ধারণা করা যায়। আদি বাংলার আমাদের জানা ইতিহাসের পথপরিক্রমায় বৌদ্ধ, জৈন, হিন্দু ও ইসলাম ধর্মের প্রসার সম্পর্কে আলোচনা করার সময় বাংলার এই বৈশিষ্ট্যগুলিকে বিশেষভাবে বিবেচনায় নিতে হবে।
বাংলায় বৌদ্ধ, জৈন ও হিন্দু ধর্মের সূচনা ও বিস্তার
সম্ভবত খ্রীষ্টপূর্ব পঞ্চম শতক থেকে বাংলার কিছু নগর বা শহর কেন্দ্র বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাবাধীনে আসে মগধের সাথে বাণিজ্যিক যোগাযোগ ও উত্তর-মধ্য ভারত থেকে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ও অনুসারীদের অভিগমনের ফলে। এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত বর্তমান বাংলাদেশের নরসিংদী জেলায় উয়ারী-বটেশ্বর, বগুড়া জেলায় মহাস্থানগড় ও পশ্চিম বাংলার চব্বিশ পরগণা জেলার চন্দ্রকেতুগড়ে যে সমস্ত প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায় সেই সমস্ত প্রমাণ যাচাই করে এই অনুমান সঙ্গত বলে মনে হয়।
নরসিংদী জেলায় ও ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা ব-দ্বীপ অঞ্চলে উয়ারী বটেশ্বরে ও বগুড়া জেলার মহাস্থানগড়ে যেসব প্রাচীন বসতি পাওয়া গেছে সেগুলিকে উত্তরাঞ্চলীয় কালো মসৃণ মৃৎপাত্র (Northern Black Polished Ware – NBPW) সংস্কৃতি হিসাবে প্রত্নতাত্ত্বিকরা চিহ্নিত করেছেন। উয়ারী-বটেশ্বরে খ্রীষ্টপূর্ব ৫ম-৪র্থ শতক বা তার পূর্বের সংস্কৃতির প্রমাণ পাওয়া যায়।১ এখানে প্রতিরোধ প্রাচীর ও পরিখা আবিষ্কৃত হওয়ায় এই বসতিটিকে দুর্গ-নগর হিসাবে অভিহিত করা হয়েছে।২ স্বল্প মূল্যবান পাথরের পুঁতি, ছাপাঙ্কিত মুদ্রা, মন্ত্রপূত কবচ, বাটখারা, পোড়ামাটির বস্তু, মৃৎপাত্র ও ধাতুর নানা জিনিসপত্র থেকে এখানে সমৃদ্ধ নগর ছিল বলে ধারণা করা হয়।
-------------------------------------
১ দেখুনঃ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, ঢাকা বিভাগ, ঢাকা কর্তৃক প্রকাশিত, উয়ারি-বটেশ্বর প্রত্নতাত্ত্বিক খনন প্রতিবেদন (২০১৬-২০১৭, ২০১৭-২০১৮ ও ২০১৮-২০১৯ অর্থবছর), প্রকাশ কাল ২০২০, পৃঃ ৪০।
২ দেখুনঃ সুফি মোস্তাফিজুর রহমান ও মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠান, উয়ারী-বটেশ্বরঃ শেকড়ের সন্ধানে, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা, ২০১২, পৃঃ ৬৪, ৬৫।
-------------------------------------
চন্দ্রকেতুগড় হল পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলায় বাংলার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থল। কলকাতা শহর থেকে ৩৫ কিলোমিটার উত্তরপূর্ব দিকে একদা ভাগীরথী নদীর অন্যতম প্রবাহ বিদ্যাধরী নদীর কূল ঘেঁসে এর অবস্থান। মোটামুটিভাবে এক বর্গমাইল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত আকৃতিতে আয়তাকার দুর্গপ্রাচীর দ্বারা মূল প্রত্নস্থলটি ঘেরা। এখানে উৎখননের মাধ্যমে পাঁচটি সাংস্কৃতিক স্তর বা পর্বের সন্ধান পাওয়া গেছে। প্রথম পর্ব থেকে প্রাক-উত্তরাঞ্চলীয় কালো মসৃণ মৃৎপাত্র (Pre-NBPW) সাংস্কৃতিক স্তর পাওয়া গেছে। দ্বিতীয় স্তরের সময়কাল হল ৪০০ থেকে ১০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত। এই সময়ে উত্তরাঞ্চলীয় কাল মসৃণ মৃৎপাত্র সংস্কৃতির সাক্ষ্য পাওয়া গেছে। তৃতীয় স্তরটি কুষাণ যুগের সমসাময়িক। চতুর্থ স্তরটি গুপ্ত ও গুপ্তোত্তর যুগের।
বগুড়া জেলার করোতোয়া নদীর তীরে মহাস্থানগড় ছিল প্রাচীন বাংলার পুণ্ড্রবর্ধন নগর। সেখানে খনন করে সেখানকার আদি স্তরে উত্তরাঞ্চলীয় কাল মসৃণ মৃৎপাত্র সংস্কৃতির সাক্ষ্য পাওয়া গেছে, যার সর্বপ্রাচীন স্তর প্রায় ৩০০ থেকে ২০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।১ পুণ্ডনগর ছিল মৌর্য সাম্রাজ্যের সময় একটি প্রধান বাণিজ্য ও প্রশাসনিক কেন্দ্র। এখানকার সর্বপ্রাচীন বসতিতে চারপাশ ঘেরা প্রাচীরের প্রমাণ পাওয়া গেছে।২ এই নগরটিতে প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে অনেক বার নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণের প্রমাণ পাওয়া যায়। এই নগরটির উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিমে ৮ কিলোমিটার ব্যাপী বিশাল উপশহর গড়ে উঠেছিল, যদিও প্রত্নতাত্ত্বিকরা এর কালানুক্রম নির্ধারণ করতে পারেন নাই।৩
-------------------------------------
১ দেখুনঃ J.F. Salles, Excavations at Mahasthangarh: New Evidence of Contacts with the Ganges Valley, in, Journal of Bengal Art, Volume 4, 1999, Published by the International Centre for Study of Bengal Art, Dhaka, p. 29.
২ দেখুনঃ Md. Shafiqul Alam and Jean-François Salles, France-Bangladesh Joint Venture Excavations at Mahasthangarh: First Interim Report: 1993-1999, Published by Department of Archaeology, Dhaka, 2001, p. 85.
৩ প্রাগুক্ত, পৃঃ ২২৬।
-------------------------------------
পাতা : ২
ভারতবর্ষে উত্তরাঞ্চলীয় কাল মসৃণ মৃৎপাত্র সংস্কৃতির বিস্তারের সাথে নগরের বিস্তারকে সম্পর্কযুক্ত করা হয়।১ খ্রীষ্টপূর্ব ষষ্ঠ-পঞ্চম শতাব্দী থেকে এই সংস্কৃতির সাথে বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তারকে সম্পর্কিত করা যায়। এই বিষয়টিকে বিবেচনায় নিলে এখন পর্যন্ত উৎখননকৃত বাংলার তিনটি নগর উয়ারী-বটেশ্বর (খ্রীষ্টপূর্ব ৫ম শতাব্দীতে), চন্দ্রকেতুগড় (৪০০-১০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে) ও মহাস্থানগড় বা প্রাচীন পুণ্ডবর্ধনে (খ্রীষ্টপূর্ব চতুর্থ-তৃতীয় শতাব্দীতে) বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব বিস্তার হওয়া সম্ভব। বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার সম্পর্কে রমেশচন্দ্র মজুমদার সম্পাদিত The History of Bengal গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে বলা হয়েছে অশোকের সময়ের পূর্বেই বৌদ্ধ ধর্ম উত্তর বঙ্গে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল।২
-------------------------------------
১ সিন্ধু থেকে গঙ্গাঃ এক সভ্যতার পথযাত্রা-এর খণ্ড ২-এ এই বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। দেখুনঃ শামসুজ্জোহা মানিক ও শামসুল আলম চঞ্চল, সিন্ধু থেকে গঙ্গাঃ এক সভ্যতার পথযাত্রা, খণ্ড ২, ওয়েবসাইটঃ https://www.bangarashtra.net/article/1593.html
২ গ্রন্থটিতে বলা হয়েছেঃ “… In the corresponding passage in the Sanskrit Vinaya, the eastern limit is stated to be the kingdom of Puṇḍravardhana. As Vinaya texts are generally believed to have preserved traditions of pre-Aśokan days, these passages may be taken to indicate that Buddhism had probably obtained a footing in North Bengal even before Aśoka’s time. The great missionary activity of Aśoka, and the traditions about him recorded in Divyāvadāna, and also by Hiuen Tsang, make it highly probable that Buddhism was not unknown in Bengal during the reign of that great emperor.” দেখুনঃ R.C. Majumder (ed.), The History of Bengal, Vol, I, Hindu Period, 1943, pp. 411, 412.
-------------------------------------
বৌদ্ধরা আসার আগে নদ-নদী, খাল, জলাশয় আর জঙ্গলাকীর্ণ বাংলা অঞ্চলের মানুষেরা ছিল প্রকৃতিপূজারী ও একই সাথে নানা স্থানীয় দেব-দেবীর পূজারী। বিশেষ করে মনসা, ওলাউঠা, শীতলা প্রভৃতি নামের লৌকিক দেব-দেবীদের পূজা এবং একই সাথে পাহাড়, বিশালাকৃতির গাছ, বা বৃহৎ কিছুর পূজা কিংবা সেগুলির প্রতি ভক্তি নিবেদন ছিল সাধারণ জনসমাজের ধর্ম।
আমরা দেখেছি সিন্ধু সভ্যতার ক্ষয়ের পর পূর্ব দিকে ক্রমশ ছড়িয়ে পড়া জনগোষ্ঠী পরবর্তী সময়ে নানা ধরনের সংস্কৃতি গড়ে তুলে। আমরা মনে করি উত্তরাঞ্চলীয় কাল মসৃণ মৃৎপাত্র সংস্কৃতির ধারক ও বাহক জনগোষ্ঠী ছিল এমনই একটি জনগোষ্ঠী যারা সিন্ধু সভ্যতার ভাষা ও সংস্কৃতিকে নূতন নূতন এলাকায় নানা পরিবর্তিত রূপে বহন করে নিয়ে যায়। সিন্ধু সভ্যতার বৈদিক ভাষা থেকে উদ্ভূত সংস্কৃত ভাষাকেও এই সকল জনগোষ্ঠী সাথে করে নিয়ে যায়। বাংলা ভাষায় সংস্কৃতের প্রভাব এই সময় থেকেই শুরু হয় বলে আমরা ধারণা করি। শুধু এই তিনটি নগরেই নয়, বাংলার আরো অনেক এলাকায় সিন্ধু সভ্যতার ভাষা ও সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী বহু সংখ্যক মানুষ বসতি স্থাপন করেছিল বলে আমরা মনে করি। আমরা জানি বাংলা ভাষায় ভারতীয় অন্যান্য ভাষার চেয়ে সবচেয়ে বেশী সংস্কৃত বা বৈদিক শব্দ আছে।
এছাড়া বাংলার অনেক নদ-নদীর নাম যেমন, গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, ধলেশ্বরী, বুড়িগঙ্গা, পুনর্ভবা, মধুমতি, কর্ণফুলী, ভৈরব, নবগঙ্গা, কপোতাক্ষ, কালীগঙ্গা, মহানন্দা, ইত্যাদি সংস্কৃত তথা সিন্ধু সভ্যতার ভাষা থেকে উদ্ভূত। এর কারণ নিশ্চয়ই প্রাচীন যুগে সিন্ধু সভ্যতার প্রভূত সংখ্যক অধিবাসী কিংবা তাদের প্রত্যক্ষ উত্তরাধিকার বহনকারী মানুষজনের এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন। ধারণা করা যায় তাদের আগমনের ফলে এই অঞ্চলে যখন প্রথম নগর সমাজ গড়ে উঠছিল তখনই এই নদ-নদীর নামগুলি দেওয়া হয়। অর্থাৎ আমরা অনুমান করি, যে জনগোষ্ঠী বাংলায় প্রথম বৌদ্ধ ধর্ম নিয়ে এসেছিল তারা সিন্ধু সভ্যতার ভাষা পরিবর্তিত রূপে এখানে নিয়ে এসেছিল। পরবর্তীকালে বাংলায় জৈন ধর্মও বিস্তার লাভ করেছিল। এর ঐতিহাসিক প্রমাণও আছে। জৈনরাও সিন্ধু সভ্যতার ভাষা ও সংস্কৃতিকে বাংলায় এনেছিল বলে ধারণা করা যায়।
অবশ্য আমরা সিন্ধু সভ্যতার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারী হিসাবে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মাবলম্বীদের বাংলায় আগমনের বিষয়ে উল্লেখ করলেও সিন্ধু সভ্যতার পতনের সময় থেকে সিন্ধু সভ্যতার অধিবাসীদের চতুর্দিক অভিমুখী যে মহাযাত্রা শুরু হয় সেই মহাযাত্রা যদি সুদূর ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত হয় তবে তুলনায় অনেক নিকটবর্তী বাংলাও যে তার বাইরে ছিল না সে কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। অর্থাৎ সিন্ধু সভ্যতার পতনের মূল সময় যদি খ্রীষ্টপূর্ব ১৯০০ শতাব্দী হয় তবে কমপক্ষে সেই সময় থেকে সিন্ধু সভ্যতার ভাষা, সংস্কৃতি ও বহুবিধ বিশ্বাস নিয়ে সেখানকার অধিবাসীদের যে বাংলায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় অভিবাসন ঘটেছিল সে কথাও বলা যায়। সিন্ধু সভ্যতার প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার থেকে এখন আমরা জানি এটা ছিল কত উন্নত সভ্যতা। এমনিতেই সভ্যতার একটা নিজস্ব শক্তি আছে।
এখন ভাবা যাক এমন এক সভ্যতার কথা যার আছে সিন্ধু সভ্যতার মতো সুউন্নত নগর পরিকল্পনা, বহু লক্ষ বর্গমাইল ব্যাপী বিস্তৃতি, বিস্ময়কর রকমভাবে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতি নির্ভর রাষ্ট্রশাসন এবং বৈদিক ভাষার মতো এক সুউন্নত ও শক্তিশালী ভাষা। তাহলে আমরা বুঝব এমন এক সভ্যতা ও তার অধিবাসীদের শক্তি কতটা হতে পারে। কোনও কারণে সভ্যতার ক্ষয় কিংবা পতন হলেও এই সভ্যতার স্মৃতি তথা ভাষা ও সংস্কৃতিকে ধারণ ক’রে তার অধিবাসীরা যেখানে যাবে সেখানকারই সমাজ কিংবা ভাষা ও সংস্কৃতির উপরে গভীর প্রভাব ফেলবে। ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবার হিসাবে পরিচিত ভাষাগোষ্ঠীর পৃথিবীর বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বিস্তার থেকে এই বিষয় সম্পর্কে আমরা সহজেই ধারণা করতে পারি। স্বাভাবিকভাবে তুলনায় সিন্ধু সভ্যতার অনেক নিকটবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত বাংলায় সিন্ধু সভ্যতার অধিবাসীদের নানাবিধ প্রভাব অনেক পূর্ব থেকেই পড়েছিল বলে আমরা ধারণা করতে পারি। সিন্ধু সভ্যতার সঙ্কট যখন থেকে শুরু হয়েছে সেই সময় থেকে অন্তত তার কিছু সংখ্যক অধিবাসীর এখানে আগমন সম্ভব ও একান্ত স্বাভাবিক। প্রত্নতাত্ত্বিক বিচারে সিন্ধু সভ্যতার পতন কাল বলা হয় ১৯০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দকে। সভ্যতায় ক্ষয় শুরু হয় তারও কিছু পূর্বকাল থেকে। যদি সেটা এক বা দুই শত বৎসরকাল হয় তবে ধরা যায় সিন্ধু সভ্যতার অধিবাসীদের বাংলায় আগমনের প্রবাহ চার হাজার বৎসর পূর্ব থেকেই ঘটতে শুরু করে।
সে ক্ষেত্রে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের উত্থানের অনেক পূর্ববর্তী কাল থেকেই বাংলায় সিন্ধু সভ্যতার অধিবাসীদের আগমন ও অভিবাসনের ফলে বাংলায় তাদের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রভাব পড়তে শুরু করেছিল। বাংলায় তার পূর্বে যে ধরনের ভাষা ও সংস্কৃতি থাকুক অনেক উন্নততর সভ্যতা হিসাবে গড়ে উঠা সিন্ধু সভ্যতার ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রভাব যে অন্তত এই সময় থেকে পড়তে শুরু করেছিল তাতে কোনও সন্দেহ নাই। সিন্ধু সভ্যতার সংস্কৃতি ও দর্শন চিন্তার উপর নির্ভর ক’রে অনেক পরবর্তী কালে গড়ে উঠা বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের মতো বিভিন্ন ধর্ম ও মতবাদসমূহ বাংলায় প্রভাব বিস্তার করেছে।
আমাদের অনুমান অনুযায়ী সিন্ধু সভ্যতায় ব্যাপকভাবে প্রতিষ্ঠিত ও জনপ্রিয় লোকায়ত দর্শনের মতো ধর্মবিরোধী তথা লোকবাদী দর্শন যেমন সিন্ধু সভ্যতার অধিবাসীদের উপর ভর ক’রে বাংলায় এসেছিল তেমন সিন্ধু সভ্যতার ধ্বংসকালে যে বৈদিক ধর্মের উত্থান ঘটে তার অনুসারীরাও বাংলায় এসেছিল। অনেক পরবর্তী কালে বৈদিক ধর্মের পুরোহিত গোষ্ঠী ব্রাহ্মণদের নেতৃত্বে গড়ে উঠা চতুর্বর্ণভিত্তিক(ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এই চার বর্ণে সমাজের বিভাজন) তথা বর্ণজাতিভেদভিত্তিক হিন্দু ধর্মের ভিত্তিও এভাবে যত ক্ষীণ আকারে হোক বাংলায় প্রতিষ্ঠিত হয় বলে আজ আমরা অনুমান করি।
যাইহোক, বাংলায় বসতি স্থাপন করতে আসা বহু সংখ্যক বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী মূলত বণিক ও কারিগর ছিল। ফলে প্রথমে তারা এখানে সমৃদ্ধ গ্রাম সমাজ গঠন করেছিল বলে মনে হয়। সমৃদ্ধির একটা পর্যায়ে কিছু গ্রাম শহরে রূপান্তরিত হয়ে থাকবে। অর্থাৎ আমরা মনে করি বাংলায় নগর সমাজ গঠনে প্রধানত বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর প্রবেশ ও ভূমিকা কাজ করেছিল।
মৌর্য যুগে ও পরবর্তী সময়ে ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চলে যেমন ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রভাব ছিল, বাংলায় তুলনায় তা অনেক কম ছিল। যদিও সাহিত্যের উপর ভিত্তি করে ঐতিহাসিকরা মনে করেন খ্রীষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে বাংলা বৈদিক তথা ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রভাবে আসে।১ তবে মনে রাখতে হবে যে, তখনকার ব্রাহ্মণরা ছিল বেদপন্থী ব্রাহ্মণ, তারা তখনও বর্ণজাতিভেদের প্রবর্তক হয় নাই ও গোবধের প্রতি নিষেধাজ্ঞা দেয় নাই।
-------------------------------------
১ আর,সি, মজুমদার সম্পাদিত The History of Bengal-এ বলা হয়েছে খ্রীষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে বাংলা তিনটি ধর্ম, যথা, বৈদিক, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের প্রভাবে এসেছিল। বৈদিক বলতে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের কথা বলা হয়েছে। দেখুনঃ প্রাগুক্ত, পৃঃ ৩৯৫।
-------------------------------------
পাতা : ৩
গুপ্ত শাসনকাল১ ছিল প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। খ্রীষ্টীয় তৃতীয় শতাব্দীর শেষ এবং চতুর্থ শতাব্দীর প্রথম দিকে প্রথম চন্দ্রগুপ্ত অথবা সমুদ্রগুপ্তের মাধ্যমে বাংলায় গুপ্ত শাসন সম্প্রসারিত হয়। গুপ্তদের আদি বাসস্থান ছিল মুর্শিদাবাদ অথবা উত্তর বঙ্গের বরেন্দ্রীতে, যদিও ঐতিহাসিকরা এবিষয়ে এখনো মতৈক্যে পৌঁছাতে পারেন নাই। গুপ্তদের রাজ্যের যখন সম্প্রসারণ শুরু হয় তখন বাংলায় ছোট ছোট স্বাধীন রাজ্য ছিল। গুপ্ত রাজারা বঙ্গ জয় করতে গেলে সেখানকার স্বাধীন রাজারা সম্মিলিত ও প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল বলে জানা যায়।২ ধারণা করা হয় সমতট সম্ভবত গুপ্তদের করদ রাজ্য ছিল। ষষ্ঠ শতাব্দীর শুরুতে সমতট সরাসরি গুপ্ত শাসনের অধীনে চলে আসে।৩ সমগ্র উত্তর বাংলা গুপ্তদের সাম্রাজ্যের সরাসরি অধীন ছিল। প্রথম কুমারগুপ্তের সময় (৪৩২-৪৪৮ খ্রীষ্টাব্দ) থেকে উত্তর বাংলা গুপ্ত সাম্রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক অঞ্চল হিসাবে গড়ে উঠে। তখন এর নাম ছিল পুণ্ড্রবর্ধন ভুক্তি।
-------------------------------------
১ গুপ্ত শাসনকাল ধরা হয় সাধারণভাবে চতুর্থ শতাব্দীর শুরু থেকে ষষ্ঠ শতাব্দীর প্রথম দিক পর্যন্ত।
২ দেখুনঃ R.C. Majumder (ed.), The History of Bengal, Vol, I, Hindu Period, 1943, p. 48.
৩ প্রাগুক্ত, পৃঃ ৫০।
-------------------------------------
ষষ্ঠ শতাব্দীর শুরুতে গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের লক্ষণ ফুটে উঠে। বৈন্যগুপ্ত সেই সময় পূর্ব বঙ্গে একটি স্বাধীন রাজা হিসাবে শাসন করতে থাকেন। মন্দসোর উৎকীর্ণলিপি থেকে জানা যায় যে, কান্যকুব্জরাজ যশোবর্মা ব্রহ্মপুত্র নদী পর্যন্ত জয়লাভ করেছিলেন। যশোবর্মার সাম্রাজ্য ছিল সংক্ষিপ্ত, এবং ষষ্ঠ শতাব্দীর মধ্যভাগের পর এর কোনো চিহ্ন পাওয়া যায় না। ইতিমধ্যে গুপ্ত সাম্রাজ্য হুনদের আক্রমণে দুর্বল হয়ে গিয়েছিল এবং যশোবর্মার পতনের আগেই তা ভেঙ্গে পড়ে। গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতন ও যশোবর্মার ব্যর্থতার পর উত্তর ভারতে রাজনৈতিকভাবে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নূতন ও স্বাধীন রাজ্যের উদ্ভব হয়। এই স্বাধীন রাজবংশগুলির মধ্যে ছিল থানেশ্বরের (Sthanvisvara or Thaneswar) পুষ্যভূতি, কোশলের বা অযোধ্যার মৌখরী এবং মগধ ও মালওয়ার পরবর্তী গুপ্তগণ।
আমরা জানি যে, হুনদের পিছন পিছন আরো কিছু যাযাবর জনগোষ্ঠী ভারতবর্ষে অনুপ্রবেশ করেছিল। এই সমস্ত যাযাবর গোষ্ঠী ভারতবর্ষে আসার পর শহর-নগর ও জৈন-বৌদ্ধ কেন্দ্রগুলির ধ্বংসসাধন করে। তারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় থেকে সমাজকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সংগঠিত করার চেষ্টা করে। এই সময় ব্রাহ্মণরা তাদের রাষ্ট্রশাসনকে স্বীকৃতি দিতে তাদের ক্ষত্রিয়ত্বের মর্যাদা দিয়ে ভারতীয় সমাজের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। আবার কোনো কোনো হুন রাজাকে জৈন ধর্ম গ্রহণ করতে দেখা যায়। জৈনগ্রন্থ কুবলয়মালায় বলা হয়েছে, হুনরাজ তোরমাণ শেষ জীবনে জৈনধর্ম গ্রহণ করে পাঞ্জাবের চন্দ্রভাগা নদীর তীরে পব্বৈয়া গ্রামে বাস করতেন।১ রাজা যশোবর্মার মন্দসোর অভিলেখে বলা হয়েছে, হুন রাজা মিহিরকুল শৈব ধর্মের ভক্ত ছিলেন। তাঁর মুদ্রায় বৃষের প্রতিকৃতি উৎকীর্ণ আছে। তার মুদ্রায় সংস্কৃত ভাষা ও ব্রাহ্মী লিপির ব্যবহার দেখা যায়। হুনরা পরবর্তী যুগে রাজপুতদের ছত্রিশটি বিশুদ্ধ শাখার একটি রূপে স্বীকৃতি লাভ করেছিল।২
-------------------------------------
১ দেখুনঃ দিলীপকুমার গঙ্গোপাধ্যায়, ভারত-ইতিহাসের সন্ধানে, আদি পর্ব: দ্বিতীয় খণ্ড, সাহিত্যলোক, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ২০০৭, দ্বিতীয় নতুন সংস্করণ ২০১১, পুনর্মুদ্রণ ২০১৪, পৃঃ ২৩।
২ প্রাগুক্ত, পৃঃ ২৩।
-------------------------------------
আমরা অনুমান করি হুন এবং ভারতে আসা অন্যন্য যাযাবর গোষ্ঠীসমূহ ব্রাহ্মণের নেতৃত্বে চতুর্বর্ণ কাঠামোর মধ্যে অঙ্গীভূত হওয়ায় হিন্দু ধর্মের শক্তিবৃদ্ধি হয়েছিল। এর আগে ভারতবর্ষে আসা শক ও কুষাণরাও ব্রাহ্মণের নেতৃত্বে চতুর্বর্ণের অঙ্গীভূত হওয়ায় হিন্দু ধর্মের উদ্ভব ঘটেছিল। অর্থাৎ বিদেশী যাযাবর আক্রমণকারীদের প্রথম অনুপ্রবেশ ও ভারতবর্ষের নগর-শহর সমূহের ধ্বংসের সাথে হিন্দু ধর্মের উদ্ভব ও পরবর্তী যাযাবরদের অনুপ্রবেশ ও একইভাবে নগর-শহর সমূহের ধ্বংসের সাথে হিন্দু ধর্মের শক্তিবৃদ্ধিকে সম্পর্কিত করা যায়।
খ্রীষ্টীয় ৫ম থেকে ১২শ শতক পর্যন্ত বাংলায় প্রচুর বৌদ্ধ স্তূপ, বিহার ও মন্দিরের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া যায়।১ পাল রাজারা বৌদ্ধ স্থাপত্য নির্মাণে পৃষ্টপোষকতা প্রদান করতেন। পাল যুগের শুরু খ্রীষ্টীয় অষ্টম শতকের মাঝামাঝি। প্রায় সমসাময়িক চন্দ্র রাজারাও বৌদ্ধ স্থাপত্য নির্মাণে পৃষ্টপোষকতা প্রদান করতেন। চন্দ্র রাজাদের শাসনাধীনে সেই সময়ে বাংলার সমগ্র পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণ বাংলার উপকূলীয় অঞ্চল ছিল। চন্দ্র রাজাদের রাজধানী ছিল বিক্রমপুর। তাদের শাসনকাল স্থায়ী ছিল একাদশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত। যদিও হিউয়েন সাং বাংলায় সম্রাট অশোকের পৃষ্টপোষকতায় বুদ্ধের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নির্মিত অনেক স্তূপ দেখেছিলেন, কিন্তু সেগুলির এখন পর্যন্ত কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক সাক্ষ্য পাওয়া যায় নাই। ঐতিহাসিক নিহাররঞ্জন রায় মনে করেন এইগুলি নির্দেশিক বা উদ্দেশিক স্তূপ, যা গৌতম বুদ্ধ ও বৌদ্ধ ধর্মের জীবনেতিহাসের সঙ্গে জড়িত কোনো স্থান বা ঘটনাকে উদ্দেশ্য করে বা তাকে নির্দেশ বা চিহ্নিত করার জন্য নির্মিত হয়েছিল।২ এখন আর এইগুলির কোনো চিহ্ন নাই। চন্দ্রকেতুগড়ে পাওয়া খ্রীষ্টপূর্ব ২-১ শতকের পোড়ামাটির ফলকে স্তূপের বেদিকা, তোরণ, ইত্যাদি অংশের ছবি দেখা যায়। এছাড়াও খ্রীষ্টপূর্ব ২য় শতাব্দীতে বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায় সাঁচী থেকে পাওয়া দুইটি নিবেদনমূলক লিপি থেকে যেখানে পুনবধনের দুই জন বাসিন্দাকে উপহার দিবার কথা বলা হয়েছে। পুনবধন নিঃসন্দেহে পুণ্ড্রবর্ধন, যা আজকের মহাস্থানগড়।৩
-------------------------------------
১ দেখুনঃ সুফি মোস্তাফিজুর রহমান (সম্পাদিত), প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ঢাকা, ২০০৭, পৃঃ ২৭১।
২ দেখুনঃ নিহাররঞ্জন রায়, বাঙ্গালীর ইতিহাসঃ অদিপর্ব, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, পুনর্মুদ্রণ ১৯৯৩, পৃঃ ৬৭৪, ৬৭৫।
৩ দেখুনঃ R.C. Majumder (ed.), The History of Bengal, Vol, I, Hindu Period, 1943, p. 412.
-------------------------------------
পাল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা গোপালের পুত্র ধর্মপাল (অনুমানিক ৭৭৫-৮১০ খ্রীষ্টাব্দ) তার রাজত্বকালে বিক্রমশীলা, ওদন্তপুরী মহাবিহারসহ ৫০টিরও বেশী মহাবিহার প্রতিষ্ঠা করেন।১ এছাড়া পরবর্তী পাল রাজারা জগদ্দল, হলুদ বিহার, ত্রৈকুট বিহারসহ অনেক বিহার ও মহাবিহার প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়া পাহাড়পুরের সবচেয়ে বড় একক মঠ পাল সম্রাট ধর্মপালের সময়ে ৮ম শতাব্দীর মধ্যভাগে নির্মাণ করা হয়েছিল। অন্যান্য কাঠামোর মতই এটিকে অনেকবার নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ করা হয়েছিল। পাহাড়পুর মঠের কাছে উত্তরে গোয়ালভিটা নামে একটি গ্রাম আছে। এই সমস্ত বিহার ও মঠগুলি ছিল জ্ঞান চর্চার কেন্দ্র।
-------------------------------------
১ দেখুনঃ ভিক্ষু সুনীথানন্দ, বাংলাদেশের বৌদ্ধ ভাস্কর্য, খ্রীষ্টীয় ৪র্থ হতে ১২শ শতক, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ, ঢাকা, ১৯৯৯, পৃঃ ৮২।
-------------------------------------
পাতা : ৪
বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলে প্রাচীন বাংলার সমতট রাজ্যের১ এক সময়ের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র লালমাই-ময়নামতী অঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বহু সংখ্যক ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে। এইগুলি হল শালবন বিহার, আনন্দ বিহার, কুটিলা মুড়া, চরপাত্র মুড়া, রূপবান মুড়া, ইটাখোলা মুড়া, ভোজ বিহার, রাণীর বাংলো, ইত্যাদি।
-------------------------------------
১ বেশ কিছু লিপির সাক্ষ্য, চীনা পরিব্রাজকদের বিবরণ ও লালমাই-ময়নামতীর প্রত্নস্থলে খননকার্যের মাধ্যমে এখন নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, মেঘনা পূর্ববর্তী অঞ্চলে কুমিল্লা-নোয়াখালী এলাকায় সমতটের অবস্থান ছিল। উত্তরে সিলেট সীমান্তের পাহাড়ী ও হাওড় অঞ্চল থেকে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত, পূর্ব দিকে ত্রিপুরার পাহাড়ী অঞ্চল থেকে পশ্চিমে মেঘনা (পদ্মা-মেঘনা-ব্রহ্মপুত্রের সম্মিলিত স্রোতধারা পর্যন্ত এর বিস্তৃতি ছিল।
-------------------------------------
চীনা পরিব্রাজক ফা হিয়েন খ্রীষ্টীয় পঞ্চম শতকের প্রথম দিকে ভারতবর্ষে আসেন। তিনি গঙ্গা নদী ধরে যাত্রা করে নদীটির দক্ষিণ তীরে চম্পা রাজ্যে১ পৌঁছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, সেখানকার বিহারে বৌদ্ধ সন্নাসীরা থাকত। এরপর তিনি আরো পূর্বে যাত্রা করে তাম্র্রলিপ্তিতে আসেন। এই অঞ্চলে তিনি বাইশটি মঠ থাকার কথা উল্লেখ করেছেন, যেগুলির সবকটিতে সন্ন্যাসীরা থাকত। তিনি আরো বলেছেন বুদ্ধের আইন সেখানে সমৃদ্ধি লাভ করেছিল।২ ফা হিয়েন এখানে দুই বৎসর ছিলেন। ফা হিয়েন বাংলার পশ্চিমাঞ্চলে ও দক্ষিণ-পশ্চিমের কিছু অংশ ভ্রমণ করেছিলেন। সেখানে তিনি কোনো হিন্দু মন্দির দেখার কথা বলেন নাই। তিনি বাংলার মধ্য, পূর্ব বা উত্তর অংশে ভ্রমণ করেন নাই। ফলে খ্রীষ্টীয় পঞ্চম শতকে সেই সমস্ত অঞ্চলে বৌদ্ধ, হিন্দু ও জৈন ধর্মীয় স্থাপত্য বা জনসংখ্যার কথা তার বিবরণী থেকে জানার উপায় নাই। তবে আরো প্রায় দুই শত বৎসরের কিছু বেশী সময় পরে খ্রীষ্টীয় সপ্তম শতকে হিউয়েন সাং একই অঞ্চল পরিভ্রমণ করে বৌদ্ধ, হিন্দু ও এমন কি জৈন ধর্মের মন্দির বা মঠ থাকার কথা বলেছেন।
-------------------------------------
১ চম্পা রাজ্যকে বিহারের বর্তমান ভাগলপুর জিলা বলে মনে করা হয়।
২ দেখুনঃ James Legge (Translated), A Record of Buddhistic Kingdoms Being an Account by the Chinese Monk Fâ-Hien of His Travels in India and Ceylon (A.D. 399-414), Oxford at the Clarendon Press, 1886, p. 100.
-------------------------------------
রাজা শশাংক খ্রীষ্টীয় সপ্তম শতাব্দীর শুরুতে গৌড়ের রাজা হন। তার রাজধানী ছিল কর্ণসুবর্ণে, যা মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুরের ছয় মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে রাঙ্গামাটি নামে একটি স্থান হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। শশাংক হিন্দু ধর্মের কঠোর অনুসারী ছিলেন ও বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি অসহিষ্ণুতার ও বিরোধিতার জন্য পরিচিত ছিলেন। হিউয়েন সাং বলছেন, গৌতম বুদ্ধ বিহারের বুধগয়ায় যে বৃক্ষের নীচে বুদ্ধত্ব লাভ করেছিলেন রাজা শশাংক সেই বোধি বৃক্ষকে কেটে ফেলেন ও মাটির যেখান থেকে তার মূল উদ্ভূত হয়েছিল সেই পর্যন্ত খুঁড়ে ফেলেন, কিন্তু মূলের নীচ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেন নাই। এরপর তিনি সম্পূর্ণ নষ্ট করার জন্য সেটি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলেন ও আখের রস ছিটিয়ে দেন এবং এর কোনো চিহ্ন রাখেন নাই।১ এছাড়া তিনি বৌদ্ধ মঠও ধ্বংস করেন। বুদ্ধের পদচিহ্ন-বিশিষ্ট পাথর যাকে বৌদ্ধরা পুজা করত, সেটি তিনি ধ্বংস করেছিলেন।২ এটি খুব আশ্চর্যজনক বিষয় যে, ভারতবর্ষ বা বাংলায় মুসলমান আক্রমণকারীদের আগমনের পূর্ব পর্যন্ত জানা ইতিহাসে এমন ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার দলিল পাওয়া যায় না।৩ খ্রীষ্টীয় সপ্তম শতকে বাংলায় বৌদ্ধ, জৈন ও হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন স্থাপত্য নিদর্শন ও এই সকল ধর্মের তৎকালীন অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাবার জন্য হিউয়েন সাং-এর বাংলা অঞ্চলের ভ্রমণের বর্ণনাটি প্রাসংগিক অংশ এখানে উল্লেখ করা হল।
-------------------------------------
১ দেখুনঃ Samuel Beal (Translated), Si-Yu-Ki: Buddhist Records of the Western World, Translated from the Chinese of Hiuen Tsiang (A.D. 629), Vol. II, Kegan Paul, Trench, Trübner & Co. Ltd., London, 1906, p. 118.
২ প্রাগুক্ত, পৃঃ ৯০, ৯১।
৩ কোনো কোনো ঐতিহাসিক হিউয়েন সাং নিজে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ছিলেন বলে তার এই বর্ণনাকে অতিরঞ্জিত বলে মনে করেন। কারণ অপর ধর্মের প্রতি অসহিষ্ণুতার এই ধরনের দৃষ্টান্ত ভারতবর্ষে আর একটিও পাওয়া যায় না।
-------------------------------------
ফা হিয়েনের মত চম্পা রাজ্যের কথা খ্রীষ্টীয় সপ্তম শতকে ভারতবর্ষে ভ্রমণকারী চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং-ও উল্লেখ করেছেন।১ তিনি এই অঞ্চলের ভূমি সমতল ও উর্বর বলেছেন। এখানকার ভূমি নিয়মিত চাষাবাদ করা হয় ও এটি উৎপাদনশীল। এখানে বহু দশগুণিতক সংখ্যক সংঘ বা মঠ থাকার কথা বলেছেন, যেগুলির বেশীরভাগই ধ্বংসপ্রাপ্ত ছিল। এই মঠগুলিতে ২০০ পুরোহিত বা শ্রমণ ছিল। তারা বৌদ্ধধর্মের হীনযান মতবাদ পালন করত। সেখানে কুড়িটির মত হিন্দুদের দেব মন্দির ছিল, যেগুলিতে সকল ধরনের ভক্তবৃন্দ সমবেত হত। সেখানকার রাজধানীর দেওয়াল ইটের তৈরী ও বহু দশগুণিতক সংখ্যক ফুট উঁচু। এই নগরের পূর্বে ১৪০ বা ১৫০ লি (প্রায় ২৩ বা ২৫ মাইল) দূরে, গঙ্গা নদীর দক্ষিণে একটি বিচ্ছিন্ন জল ঘেরা জায়গায় শৃঙ্গময় ও খাড়া একটি পাহাড়ের উপর একটি হিন্দু মন্দির ছিল। হিউয়েন সাং এরপর আরো পূর্বে ৪০০ লি (প্রায় ৬৭ মাইল) দূরত্ব অতিক্রম করে কজুঘির বা কজিঙ্ঘর২ নামে একটি রাজ্যে উপস্থিত হন। হিউয়েন সং-এর বর্ণনা থেকে বুঝা যায় এটি চম্পা ও পুণ্ড্রবর্ধনের মাঝখানে অবস্থিত ছিল। কজুঘির রাজ্যের পরিধি ২০০০ লি-এর (প্রায় ৩৩৩ মাইল) মত। এখানকার ভূমি সমতল ও মাটি দো-আঁশ, যা নিয়মিত চাষাবাদ করা হয়। এখানে পর্যাপ্ত ফসল উৎপাদন হয়। এখানকার তাপমাত্রা উষ্ণ। এখানকার লোকজন স্বভাবে সাধাসিধা। তারা উচ্চ মেধার মানুষদের অত্যন্ত শ্রদ্ধা করে ও শিক্ষা ও শিল্পের সম্মান দেয়। সেখানে ছয় বা সাতটি মঠ আছে যেখানে ৩০০ পুরোহিত ছিল। সেখানে দশটির মত হিন্দু মন্দির ছিল যেখানে সকল ধরনের ভক্তবৃন্দ সমবেত হত।৩ গত কয়েক শতাব্দী ধরে রাজকীয় বংশধরদের মৃত্যু হওয়ায় পার্শ্ববর্তী রাজ্য দ্বারা শাসিত হচ্ছে। এর ফলে শহরগুলি পরিত্যক্ত হয়েছে ও বেশীরভাগ লোকজন গ্রামে বা ক্ষুদ্র মহল্লায় ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি আরো লিখেছেন, এখানকার উত্তর সীমান্তে গঙ্গা নদী থেকে অদূরে ইট ও পাথরের তৈরী একটি উঁচু স্তম্ভ আছে। এর ভিত্তিটি প্রশস্ত ও অত্যুচ্চ, যা দুর্লভ ভাস্কর্য দিয়ে সজ্জিত। এই স্তম্ভের চারি পাশে বিভিন্ন প্রকোষ্ঠে ঋষি, দেবতা ও বুদ্ধের খোদাই করা মূর্তি আছে। এরপর হিউয়েন সাং পূর্ব দিকে গিয়ে গঙ্গা নদী পার হয়ে ৬০০ লি-এর (১০০ মাইল) মত যাবার পর পুণ্ড্রবর্ধন রাজ্যে উপস্থিত হন। এর রাজধানীর পরিধি ৩০ লি-এর (৫ মাইল) মত। এটি ঘনবসতিপূর্ণ ছিল। এই রাজ্যের জলবায়ু নাতিশীতোষ্ণ ও এখানকার মানুষজন শিক্ষাকে শ্রদ্ধা করত। এখানে কুড়িটির মত মঠ ও সাথে ৩,০০০ পুরোহিত থাকার কথা তিনি উল্লেখ করেছেন। তারা হীন ও মহাযান উভয় মতবাদেরই শিক্ষা গ্রহণ করত। সেখানে কয়েক শত দেব-মন্দির বা হিন্দু মন্দির ছিল, যেখানে বিভিন্ন মতবাদের ভক্তরা সমবেত হত। বহু সংখ্যক নগ্ন নির্গ্রন্থ (অর্থাৎ জৈন ধর্মাবলম্বী) সেখানে ছিল। রাজধানী থেকে পশ্চিম দিকে ২০ লি (প্রায় সাড়ে ৩ মাইল) বা তার মত হবে, সেখানে পো-চি-পো মঠ৪ অবস্থিত। এর অঙ্গনগুলি আলোকোজ্জ্বল ও প্রশস্ত। এর স্তম্ভসমূহ ও বহিরাঙ্গন অত্যুচ্চ। সেখানে ৭০০ পুরোহিত ছিল। তারা মহাযান মতবাদ অধ্যয়ন করত। ভারতের পূর্বাঞ্চলের অনেক পুরোহিত সেখানে থাকতেন।৫ তিনি আরো লিখেছেন, এখান থেকে অনতিদূরে সম্রাট অশোকের নির্মিত একটি স্তূপ আছে। এখান থেকে অল্প দূরে একটি বিহার আছে, যেখানে বুদ্ধের একটি মূর্তি আছে। এরপর তিনি পূর্ব দিকে ৯০০ লি (১৫০ মাইল) গিয়ে একটি বড় নদী অতিক্রম করে কামরূপ রাজ্যে পৌঁছান। যেখানে তিনি একটিও বৌদ্ধ মঠ বা স্তূপ দেখেন নাই। সেখানকার অধিবাসীরা দেবতার পুজা করত, অর্থাৎ হিন্দু ছিল। সেখানে ১০০-এর মত দেব-মন্দির দেখেন, যেখানে বহু সংখ্যক ভক্তবৃন্দের আগমন ঘটে থাকে। তিনি সেখানকার রাজা ভাস্করবর্মন বলে উল্লেখ করেছেন, যিনি ব্রাহ্মণ ছিলেন।৬
-------------------------------------
১ দেখুনঃ Samuel Beal (Trans.), Si-Yu-Ki: Buddhist Records of the Western World, Translated from the Chinese of Hiuen Tsiang (A.D. 629), Vol. II, 1906, pp. 191- 193.
২ মহাভারতে ভারতে পূর্বাঞ্চলের লোকজনের কাছে কজিঙ্ঘা নামে একটি দেশের নাম পরিচিত ছিল বলে উল্লেখ আছে। এছাড়া রেনেলের মানচিত্রে চম্পা থেকে ৯২ মাইল (৪৬০ লি) দূরে কজেরি নামে একটি গ্রামের নাম চিহ্নিত করা আছে।
৩ প্রাগুক্ত, পৃঃ ১৯৩-১৯৪।
৪ হিউয়েন সাং-এর অনুবাদক স্যামুয়েল বীল পাদটীকায় এটিকে ভাসিভা সংঘারাম (Vâśibhâsańghârâma) বা মঠ হিসাবে লিখেছেন। এটি ভাসু বিহার হওয়া সম্ভব।
৫ প্রাগুক্ত, পৃঃ ১৯৪-১৯৫।
৬ প্রাগুক্ত, পৃঃ ১৯৫-১৯৬।
-------------------------------------
পাতা : ৫
এরপর হিউয়েন সাং সমতটের কথা বলেছেন। এর রাজধানীর পরিধি ২০ লি (প্রায় সাড়ে ৩ মাইল)। সেখানে তিনি ভ্রান্ত (অর্থাৎ তার মত অনুযায়ী হিন্দু ধর্মীয় মতবাদ) এবং সত্য (অর্থাৎ বৌদ্ধ মতবাদ) মতাদর্শের বিশ্বাসীদের দেখতে পেয়েছিলেন। সেখানে ত্রিশ বা এই রকম সংখ্যক মঠ ছিল, যেখানে ২০০০-এর মত পুরোহিত ছিল। তারা সকলে স্থবির প্রতিষ্ঠানের। সেখানে কয়েক শত হিন্দু মন্দির ছিল যেখানে সব ধরনের ভক্তকুল থাকত। নির্গ্রন্থ নামে পরিচিত নগ্ন সন্ন্যাসীরা সেখানে সর্বাধিক সংখ্যক ছিল। এই নগর থেকে অদূরে একটি স্তূপ ছিল। এখান থেকে অল্প দূরে একটি মঠ ছিল যেখানে সবুজ রঙ্গের মণি দিয়ে তৈরী আট ফুট উঁচু একটি বৌদ্ধ মূর্তি ছিল।১
----------------------------
১ প্রাগুক্ত, পৃঃ ১৯৯।
----------------------------
তিনি এরপর আরো কিছু স্থানের নাম উল্লেখ করেছেন, যেগুলি চিহ্নিত করা কঠিন। তবে সেই সমস্ত স্থানে কোনো বৌদ্ধ বা হিন্দু মন্দির থাকার বিষয়টি অনুল্লেখিত রেখেছেন। এরপর তিনি তাম্র্রলিপ্তি পৌঁছেন। সেখানে তিনি বিরুদ্ধ মত (অর্থাৎ হিন্দু বা জৈন বা নির্গ্রন্থ) ও বিশ্বাসী (অর্থাৎ বৌদ্ধ) উভয়ই থাকার কথা বলেছেন। সেখানে প্রায় দশটি মঠ ছিল ও প্রায় ১০০০ পুরোহিত ছিল। এছাড়া সেখানে পঞ্চাশটি হিন্দু-মন্দির ছিল, যেখানে বিভিন্ন সম্প্রদায়ভুক্ত ভক্তরা থাকত। এই নগরের পাশে একটি স্তূপ ছিল।১
-------------------------------------
১ প্রাগুক্ত, পৃঃ ২০০, ২০১।
-------------------------------------
মোটামুটি এই ছিল খ্রীষ্টীয় সপ্তম শতকের প্রথম দিকে বাংলায় বিভিন্ন ধর্মের মঠ ও মন্দির ও অনুসারীদের সংখ্যা সম্পর্কে হিউয়েন সাং-এর বক্তব্য। এই বিবরণ থেকে ধারণা করা যায় যে, খ্রীষ্টীয় সপ্তম শতকে বাংলায় বৌদ্ধ ও জৈনদের চেয়ে হিন্দু ধর্মের অনুসারী বেশী ছিল ও একই সাথে তাদের মন্দিরের সংখ্যা অন্যগুলিকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। মনে রাখতে হবে এর আগে বাংলা চতুর্থ শতাব্দীর শুরুতে গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধীন হয়। সমতট ছাড়া বাকী সমগ্র অঞ্চল সমুদ্রগুপ্তের সময়ে গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধীন হয়েছিল। সমতট পরে গুপ্ত সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়।১ এছাড়াও হিউয়েন-সাং খ্রীষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে শুরু হওয়া বাংলার কিছু অঞ্চলে বিনগরায়নের বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন।
-------------------------------------
১ ষষ্ঠ শতাব্দীর শুরুতে সমতট সরাসরি গুপ্ত শাসনের অধীনে আসে। দেখুনঃ R.C. Majumder (ed.), The History of Bengal, Vol, I, Hindu Period, Published by the University of Dacca, Dacca, First edition 1943, p. 50.
-------------------------------------
চন্দ্রকেতুগড়ে পাওয়া আনুমানিক খ্রীষ্টীয় ২ শতকের কিছু পোড়া মাটির ফলকের চিত্র থেকে বাংলায় হিন্দু মন্দির নির্মাণের প্রাথমিক যুগ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।১ তবে খ্রীষ্টীয় ৫ম, ৬ষ্ঠ ও ৭ম শতাব্দীর বিভিন্ন লিপি থেকে বাংলায় হিন্দুদের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়। বিভিন্ন ফলকে উৎকীর্ণ লিপি ও অংকিত ছবি থেকেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়। গুপ্ত যুগে তাম্র্র-ফলকে উৎকীর্ণ লিপি থেকে জানা যায় যে, এই সময় বহু সংখ্যক ব্রাহ্মণ বাংলায় বসতি স্থাপন করে। এছাড়া বাংলার বিভিন্ন স্থানে পাওয়া তাম্র-শাসনে মন্দির-সম্পর্কিত কিছু তথ্য পাওয়া যায়। বগুড়া জেলার বৈগ্রামে প্রাপ্ত প্রথম কুমার গুপ্তের তাম্র্র-ফলকে (৪৪৭-৪৪৮ খ্রীষ্টাব্দ) সেই সময়ে নির্মিত গোবিন্দ-স্বামীর মন্দিরের উল্লেখ আছে। এছাড়া খ্রীষ্টীয় ছয় শতকে পাওয়া দমোদরপুর তাম্রশাসনে (৫৪৩ খ্রীষ্টাব্দ) শ্বেত বরাহ স্বামীর মন্দিরের উল্লেখ আছে। একই শতকে বৈন্যগুপ্তের গুনাইঘর অভিলেখে (৫০৭-৫০৮ খ্রীষ্টাব্দ) প্রদ্যুম্নেশ্বর মন্দিরের উল্লেখ করা হয়েছে।২ খ্রীষ্টীয় ৬ষ্ঠ শতকের একটি তাম্র-ফলক থেকে জানা যায় বিভিন্ন গোত্রের ২০৫ জন ব্রাহ্মণ সিলেট অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিল।৩ পাল রাজাদের যুগে হিন্দু ধর্মের প্রভাব আরো শক্তিশালী হতে থাকে।৪
-------------------------------------
১ যদিও The History of Bengal গ্রন্থটিতে সেই সময়ে বৈদিক সংস্কৃতির অনুপ্রবেশের কথা বলা হয়েছে, আমরা এটিকে হিন্দু ধর্ম ও তার সংস্কৃতির প্রভাব হিসাবে মনে করি।
৩ দেখুনঃ সুফি মোস্তাফিজুর রহমান (সম্পাদিত), প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য, ২০০৭, পৃঃ ২৮৪।
৪ দেখুনঃ R.C. Majumder (ed.), The History of Bengal, Vol, I, Hindu Period, Published by the University of Dacca, Dacca, First edition 1943, p. 396.
-------------------------------------
সমসাময়িক লিপিমালা, পাণ্ডুলিপি-চিত্র, তক্ষণশিল্প ও সাহিত্য থেকে প্রাচীন বাংলার কিছু হিন্দু মন্দিরের বর্ণনা ও প্রতিকৃতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এটি খুব তাৎপর্যপূর্ণ যে, বাংলায় খ্রীষ্টীয় দ্বিতীয় শতকে প্রথম পোড়া মাটির ফলকে হিন্দুদের মন্দিরের বর্ণনা বা চিত্র পাওয়া গেলেও বৌদ্ধ স্তূপের অংশবিশেষের চিত্র বাংলায় আরো আগে পাওয়া গিয়েছিল খ্রীষ্টপূর্ব ২-১ শতকে। শুধু তাই নয় খ্রীষ্টীয় পঞ্চম শতক থেকে বিভিন্ন বিবরণীতে মন্দিরের বর্ণনা পাওয়া গেলেও প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে হিন্দুদের মন্দিরের প্রথম ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায় খ্রীষ্টীয় একাদশ শতকে। ভাটেরা টিলা তাম্র-ফলকে (১০৪৯ খ্রীষ্টাব্দ) যে শিব-মন্দির নির্মাণের কথা বলা আছে, সিলেটের ভাটেরা টিলা ঢিবিকে এই শিব-মন্দিরের অবশেষ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।১ এই সমস্ত প্রমাণ থেকে ধারণা করা যায় বাংলায় হিন্দু ধর্মের অনেক আগে বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তার ও প্রাধান্য ঘটেছিল। প্রাচীন বাংলার কিছু শহর ও নগর খ্রীষ্টপূর্ব পঞ্চম-চতুর্থ শতাব্দীতে বৌদ্ধ ধর্ম ও সিন্ধু সভ্যতার সংস্কৃতির দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল, যা আগেই বলা হয়েছে। এই প্রবণতা গুপ্ত যুগের পূর্ব পর্যন্ত ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছিল এমনটা মনে হয়। বৌদ্ধ ধর্মের এই প্রাধান্যের সাথে সম্পর্কিত ছিল সমাজে শিল্প ও বাণিজ্যের প্রাধান্য ও সমৃদ্ধ নগর ও শহরের অস্তিত্ব।
-------------------------------------
১ দেখুনঃ সুফি মোস্তাফিজুর রহমান (সম্পাদিত), প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য, ২০০৭, পৃঃ ২৮৫।
-------------------------------------
আমরা অনুমান করি খ্রীষ্টপূর্ব প্রথম শতক থেকে শক, কুষাণ, প্রভৃতি যাযাবর জনগোষ্ঠী ভারতবর্ষের উত্তর-পশ্চিম থেকে কয়েকশ বৎসর ব্যাপী আক্রমণাভিযান পরিচালনা ক’রে সেই অঞ্চলের নগর ও শহর কেন্দ্রগুলিকে ধ্বংস করলে সেখানকার অধিবাসীরা নগর ও শহরগুলি পরিত্যাগ ক’রে প্রধানত ভারতের পূর্ব দিকে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়। এছাড়া ছিল আক্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামাঞ্চলেরও এক বৃহৎ উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠী। দক্ষিণ ভারত তথা দাক্ষিণাত্যেও হয়ত বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর একাংশ অভিগমন করেছিল। তবে এক্ষেত্রে প্রধান বাধা ছিল থর মরুভূমি, আরাবল্লী পর্বতমালা ও বিন্ধ্য পর্বতের প্রতিকূলতা। পূর্বদিকে গাঙ্গেয় অববাহিকার সমভূমি এ ধরনের দুরতিক্রম্য বাধা অর্পণ না করায় এবং গাঙ্গেয় অববাহিকার অরণ্যাচ্ছাদিত বিস্তীর্ণ সমভূমি উর্বর কৃষিভূমি হওয়ায় স্বাভাবিকভাবে উত্তর-পশ্চিম ভারত থেকে এই পূর্বদিকেই অভিগমনের প্রধান স্রোত প্রবাহিত হত। উত্তর-পশ্চিম ভারতের নগর ও শহরসমূহের বেশীর ভাগ অধিবাসী ছিল প্রধানত বৌদ্ধ ও কিছু জৈন, যাদের প্রধান পেশা ছিল ব্যবসা ও শিল্প। হয়ত এদের অনেকে তখনও ছিল সিন্ধু সভ্যতার লোকায়ত মতাদর্শে বিশ্বাসী। বাস্তুচ্যুত এই কারিগর ও বণিক শ্রেণী তাদের জীবিকার উৎস হারিয়ে নিকটবর্তী উত্তর ভারত এবং কিছু দূরবর্তী পূর্ব ভারতের নানা অঞ্চলে পালিয়ে আসে ও বসতি স্থাপন করে। এটা সহজে অনুমেয় যে, তাদের সঙ্গে ছিল বহুসংখ্যক কৃষিজীবী মানুষও।
পাতা : ৬
আমরা অনুমান করি সেই সময়ে কৃষিজীবীসহ এই কারিগর ও বণিক শ্রেণীর বেশ কিছু সংখ্যক মানুষ বাংলার পশ্চিমাঞ্চলে বসতি স্থাপন করে থাকবে। পলাতক, পরাজিত ও নূতন অচেনা ভূমিতে আগমনের পর এই জনগোষ্ঠীকে স্বাভাবিকভাবে পেশা পরিবর্তন করতে হয়েছিল বলে ধারণা করা যায়। তাদের একটি বড় অংশকে কৃষিকাজের সাথে যুক্ত হতে হয়েছিল বলে আমরা অনুমান করি। একদিকে পরাজিত ও উদ্বাস্তু মানুষের মনস্তত্ত্ব নিয়ে তারা যখন এখানে আগে থেকেই বিদ্যমান ধর্ম বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মের সংস্পর্শে আসে তখন তারা হিন্দু ধর্মকেই বেছে নিয়েছিল বলে ধারণা করা যায়। অর্থাৎ তাদের মনোবল আর পুরাতন ধর্ম বা মতাদর্শকে রক্ষা করার সপক্ষে ছিল না। আমরা মনে করি বাংলায় ও বিহারে গুপ্ত যুগে হিন্দু রাজারা এই সমাজভূমি পেয়েছিলেন বলে তাদের পক্ষে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া সহজতর হয়েছিল।
মানচিত্র ১: দক্ষিণ এশিয়ার ভৌগোলিক মানচিত্র (সৌজন্যে: Encyclopaedia Britannica)
ভারতবর্ষে সর্বশেষ হুনদের আক্রমণে ও ব্যাপক ধ্বংসকাণ্ডে উত্তর-পশ্চিম ভারতে নগরগুলি ধ্বংস বা পরিত্যক্ত হলে স্বাভাবিকভাবে বাংলাসহ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের বাণিজ্য ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এর সাথে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল মধ্য এশিয়া ও আফগানিস্তানের সাথে মধ্য ও দক্ষিণ ভারত ও বাংলার যে বাণিজ্য দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে উঠেছিল সেটিও। হুন রাজা মিহিরগুলের (মিহিরকুল) আক্রমণ, ধ্বংস ও হত্যাকাণ্ডের প্রায় একশ’ বৎসর পরে হিউয়েন সাং যখন ভারতবর্ষে আসেন তখন উত্তর-পশ্চিম ভারতের বহু বৌদ্ধ মঠ ও মন্দির পরিত্যক্ত অবস্থায় দেখেছিলেন। আমরা অনুমান করি খ্রীষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত সমগ্র ভারতবর্ষব্যাপী যে নগর ও শহর পরিত্যক্ত হবার প্রমাণ পাওয়া যায় সেটি ঘটেছিল হুনদের আক্রমণ ও ধ্বংসের ফলে হওয়া বাণিজ্যের ব্যাপক ক্ষতির জন্য। আমরা ‘সিন্ধু থেকে গঙ্গা : এক সভ্যতার পথযাত্রা’-র দ্বিতীয় খণ্ডে এই বিষয়টি আলোচনা করেছি যে, ভারতবর্ষের পশ্চিম দিক থেকে আসা শক, কুষাণ ও হুনরা ভারতবর্ষে এসে হিন্দু ধর্মের চতুর্বর্ণের অঙ্গীভূত হয়ে যায় ও ভারতীয় কৃষি সমাজের অন্তর্ভুক্ত হয়।১ হিন্দু ধর্মকে শক্তিশালী করার জন্য শক-হুনদের এই অন্তর্ভুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। হিন্দু ধর্ম শক্তিশালী হবার ফলে আবার এই বিনগরায়নও দীর্ঘস্থায়ী হয়। এর প্রধান কারণ হল হিন্দু ধর্ম মূলত নগরায়ন-বিমুখ কৃষি সমাজের ধর্ম। হিন্দু ধর্ম শক্তিশালী হওয়ার অর্থ হয়ে দাঁড়ায় নাগরিক সমাজের পরিবর্তে গ্রামীণ সমাজের শক্তিবৃদ্ধি।
-------------------------------------
১ দেখুন, শামসুজ্জোহা মানিক ও শামসুল আলম চঞ্চল, সিন্ধু থেকে গঙ্গাঃ এক সভ্যতার পথযাত্রা, দ্বিতীয় খণ্ড, ওয়েবসাইটঃ https://www.bangarashtra.net/article/1593.html
-------------------------------------
এই বিনগরায়নের কারণে বৌদ্ধ ধর্মানুসারী পাল রাজারা উত্তর ও মধ্য বাংলায় এত দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকার পরেও এবং একইভাবে বৌদ্ধ ধর্মানুসারী চন্দ্র রাজারা বাংলার দক্ষিণ ও পূর্ব বাংলায় শাসন করার পরেও তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক ভিত্তি ক্রমশ হ্রাসের ফলে বাংলায় বৌদ্ধ শাসনের আর কোনো বাস্তবতা ছিল না।
এটি খুব চমকপ্রদ বিষয় যে, পাল রাজাদের সেনাবাহিনীতে বাংলার বাইরে থেকে মানুষদের নেওয়া হত। ভাগলপুর তাম্রলিপিতে বলা হয়েছে যে, গৌড় ছাড়াও বিদেশ থেকে যেমন, খশ, মালব, হুন,১ কুলিক, কর্ণাটক ও লাত দেশ থেকে লোকজন সেনাবাহিনীতে ছিল।২ তবে রাজপুত বা মারাঠাদের কথা সেখানে বলা হয় নাই। পাল রাজাদের সময়কাল হল অষ্টম শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে প্রায় পরবর্তী চারশত বৎসর। খ্রীষ্টীয় দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ শতাব্দী পর্যন্ত ভারতবর্ষে হুনদের আক্রমণাভিযান, হত্যা ও ধ্বংসকাণ্ড যখন ভারতবর্ষের উত্তর-পশ্চিম অংশে পরিচালিত হয় তখন এই অঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্ম সমৃদ্ধ অবস্থায় ছিল।৩ হুনদের আক্রমণে সেখানকার শহর ও নগরসমূহ ধ্বংসপ্রাপ্ত অথবা ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেখানকার পরাজিত অধিবাসীরা বিশেষভাবে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা আত্মরক্ষার্থে পূর্ব দিকে চলে আসে। এমন হতে পারে সেখানকার পলাতক এক বৃহৎ জনগোষ্ঠী বিহার ও বাংলার পশ্চিম অংশে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। একই ধরনের পূর্বাভিমুখী অভিবাসন ঘটেছিল ইতিপূর্বেকার শক ও কুষাণদের আক্রমনের সময়েও। তিব্বতের বৌদ্ধ পণ্ডিত লামা তারানাথ বলেন যে, তুরুষ্ক অর্থাৎ হুনদের আক্রমণের ফলে বেশীরভাগ পণ্ডিত পূর্ব অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন।৪ এই মানুষজন প্রধানত নগরবাসী ছিল বলে ধারণা করা যায়। সেই সময় ভারতবর্ষের নগরবাসী মানুষেরা প্রধানত বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মাবলম্বী হওয়াতে আমরা অনুমান করি এই অভিবাসনকারী মানুষেরা প্রধানত বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মাবলম্বী হয়ে থাকবে। আগের শক ও কুষাণদের আক্রমণের মত এবারও পরাজিত ও পলাতক জনগোষ্ঠীর মনস্তত্ত্ব এই মানুষজন ধারণ করেছিল বলে তাদের পক্ষে আর নূতন নাগরিক সমাজ ও কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থার সহযোগী শক্তি হিসাবে ভূমিকা পালন করা সম্ভব ছিল না। ফলে তারা বৌদ্ধ বা জৈন সমাজের পশ্চাদভূমি থেকে কিংবা অনেকে সিন্ধু সভ্যতার লোকায়ত দর্শন-চিন্তা নিয়ে এলেও এই জনগোষ্ঠী বিহার ও বাংলা অঞ্চলে এসে এক সময় গ্রামীণ সমাজে মিশে যায় ও হিন্দু ধর্মের অঙ্গীভূত হয়ে যায়। আমরা মনে করি পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম শতাব্দীতে বাংলার হিন্দুকরণে এই জনগোষ্ঠী প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল।৫ ফলে অষ্টম শতাব্দীতে পাল রাজারা বৌদ্ধ জনগণের সামাজিক সমর্থনে ক্ষমতায় এলেও হিন্দু সমাজ তখন ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছিল। খ্রীষ্ঠীয় একাদশ শতাব্দীর দিকে পাল যুগের শেষ পর্যায়ে হিন্দু ধর্ম অনেকটা শক্তিশালী সামাজিক অবস্থান গ্রহণ করে। সম্ভবত এই কারণে বাংলায় খ্রীষ্টীয় পঞ্চম শতক থেকে বৌদ্ধ স্থাপত্য নিদর্শন (স্তূপ, চৈত্য, মঠ, মন্দির, ইত্যাদি) পাওয়া গেলেও হিন্দুদের স্থাপত্য নিদর্শন আরো অনেক পরে খ্রীষ্টীয় একাদশ শতকে পাওয়া গিয়েছিল। অষ্টম শতাব্দীর প্রথম দিকে আরেকবার বহিঃশক্তি দ্বারা ভারতবর্ষ আক্রান্ত হয়। সেই সময় সিন্ধু ও পাঞ্জাবের অংশ বিশেষে মুহাম্মদ কাসিমের মুসলিম বাহিনীর ভয়ংকর ধ্বংস, গণহত্যা ও দাসকরণের ফলে উত্তর-পশ্চিম ভারতের অনেক জনগোষ্ঠী বিহার ও বাংলার পশ্চিমাংশে পালিয়ে এসেছিল বলে ধারণা করা যায়।
-------------------------------------
১ খ্রীষ্টীয় দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ শতাব্দী পর্যন্ত হুনদের অনেক গোষ্ঠী ভারতবর্ষে বিভিন্ন স্রোতধারায় এসেছিল। শুধু তাই নয় হুনদের এই স্রোতধারার মধ্যে বাইরের অন্যান্য যাযাবর জনগোষ্ঠীও ভারতবর্ষে এসেছিল। যেহেতু কয়েকশ বৎসর ধরে হুনসহ নানা যাযাবর গোষ্ঠীর এই আক্রমণাভিযান চলেছিল সেহেতু এমন হতে পারে যে, পূর্বের যাযাবররা যখন স্থিতিশীল সমাজের অঙ্গীভূত হয় তখন অপর কোনো যাযাবর গোষ্ঠী তাদের পরাজিত ও বিতাড়ন করে। হতে পারে যে, এই সময়ের আগে আসা ও ভারতীয় সমাজের হিন্দু ধর্মের অন্তর্ভুক্ত হওয়া কিছু হুন জনগোষ্ঠীও নূতন যাযাবরদের আক্রমণের কারণে পালিয়ে বিহার ও বাংলায় বসতি স্থাপন করেছিল।
২ ভাগলপুর তাম্রলিপিতে হুনদের উল্লেখ সম্পর্কে দেখুনঃ C.V. Vaidya, History of Mediaeval Hindu India, Vol. II, Hindu Supremacy, Cosmo Publications, New Delhi, 1979, p. 244.
৩ হুনদের আক্রমণের আগে চীনা বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ও পরব্রিাজক ফা-হিয়েন যখন উত্তর ভারত ভ্রমণ করেন (তার ভারতবর্ষ ভ্রমণের সময় ৩৯৯ থেকে ৪১২ খ্রীষ্টাব্দ র্পযন্ত) তখন সেখানে বৌদ্ধ ধর্মের অত্যন্ত সমৃদ্ধি দেখতে পেয়েছিলেন। James Legge (tr.), A Record of Buddhistic kingdoms: Being an Account by the Chinese Monk Fâ-Hien of His Travels in India and Ceylon (A.D. 399-414), Oxford, At the clarendon Press, 1886, pp. 28, 30, 41, 42. ফা-হিয়েন উত্তর-পশ্চিম ভারত থেকে মধ্য ভারত পর্যন্ত ভ্রমণ করার সময় সকল অঞ্চলের রাজাদের বৌদ্ধ ধর্মে বিশ্বাসী হিসাবে বর্ণনা করেছেন। তার ভ্রমণ-বৃত্তান্তে বলা হয়েছে, “Everywhere, from the sandy Desert, in all the countries of India, the kings had been firm believers in that Law.” দেখুনঃ প্রাগুক্ত, পৃঃ ৪২।
৪ তারানাথ (১৫৭৫ – ১৬৩৪ খ্রীষ্টাব্দ) যে সমস্ত স্থানের নাম উল্লেখ করেছেন সেগুলির কিছু চিহ্নিত করা কঠিন। তবে এইটুকু পরিষ্কার যে, সেগুলি বাংলা ও বাংলার পূর্বাঞ্চলীয় দেশসমূহ। দেখুনঃ Lama Chimpa and Alaka Chattopadhyaya (tr.), Taranath’s History of Buddhism in India, Motilal Banarsidass Publishers Private Limited, Delhi, First Edition 1970, Reprinted 1990, p. 330.
৫ আর,সি, মজুমদার বলেছেন, ৫ম, ৬ষ্ঠ ও ৭ম শতাব্দীর উৎকীর্ণ লিপি থেকে বাংলায় বৈদিক সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ভালভাবে বুঝতে পারা যায়। দেখুনঃ R.C. Majumder (ed.), The History of Bengal, Vol, I, Hindu Period, 1943, p. 396.
-------------------------------------
পাতা : ৭
বড় ধরনের নির্মাণের জন্য কেবলমাত্র রাজা বা সম্পদশালী সামাজিক শ্রেণীর পক্ষেই পৃষ্ঠপোষকতা করা সম্ভব। অনুমান করা যায় যে, খ্রীষ্টীয় ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত সমগ্র ভারতবর্ষব্যাপী শিল্প ও বাণিজ্যে ক্ষয় ও একই সাথে বিনগরায়নের ফলে সমাজে বৌদ্ধ-শক্তির ভিত্তি হিসাবে ক্রিয়াশীল কারিগর ও বণিকরা তখন ক্ষয়িষ্ণু। একই সময়ে হিন্দু বর্ণাশ্রম ধর্ম ক্রমশ বৃদ্ধিশীল। সামাজিক এই বাস্তবতার কারণে পাল রাজাদেরকে বৌদ্ধ ও হিন্দু উভয় ধর্মের পৃষ্টপোষকতা করতে দেখা গেছে। ধর্মপাল রাজার মন্ত্রী একজন ব্রাহ্মণকে করা হয়েছিল, অনেক প্রজন্ম ধরে যারা একই পদে ছিলেন।১ এটিও সমাজে হিন্দুদের সামাজিক গুরুত্বকে প্রকাশ করে। এরপর ক্রমবর্ধমানভাবে হিন্দু বর্ণাশ্রম ধর্মের সমাজভূমি তৈরী হচ্ছিল গ্রামীণ বাংলায় হিন্দু ধর্মের প্রভাব বৃদ্ধির সাথে। মুসলমান আক্রমণকারী মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজীর আগমন পর্যন্ত বাংলায় ব্রাহ্মণ কেন্দ্রিক বর্ণাশ্রম ধর্মের প্রসার চলছিল। প্রত্নতাত্ত্বিক সাক্ষ্য এটি প্রমাণ করে যে, ৭৫০ খ্রীষ্টাব্দ থেকে ১২০০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত বাংলায় হিন্দু ধর্মের মূর্তি ও লিপি বৌদ্ধ ধর্মের চেয়েও সংখ্যায় প্রাধান্যশীল ছিল।২
-------------------------------------
১ দেখুনঃ R.C. Majumder (ed.), The History of Bengal, Vol, I, Hindu Period, 1943, pp. 115, 116.
২ প্রাগুক্ত, পৃঃ ৪২৫।
-------------------------------------
সেন রাজারা যখন বাংলায় রাষ্ট্র শাসন শুরু করেন তখন ১০৯৫ খ্রীষ্টাব্দ। সেন রাজাদের পরিবার দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক থেকে বাংলায় আসে। বাংলা, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, কর্ণাটক, প্রভৃতি অঞ্চল পাল রাজাদের অধীনে থাকার সময় এটি অসম্ভব নয় যে, কর্ণাটক থেকে কিছু রাজকর্মচারী রাজধানীর আশেপাশে বসতি স্থাপন করেছিল, যারা পরে কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব দুর্বল হলে স্বাধীন রাজা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। নৈহাটি তাম্র-ফলকে বর্ণিত বিবরণ অনুযায়ী সেনরা সামন্তসেনের অনেক আগেই রাঢ় অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিল।১ সেন রাজারা হিন্দু ধর্মের অনুসারী ছিলেন ও হিন্দু ধর্মকে পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। সেন রাজারা বৌদ্ধ ধর্মকে বিশেষ কোনো পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন বলে জানা যায় না।২ তবে মধুসেন নামে একজন বৌদ্ধ রাজার কথা জানা যায় যিনি ১২৮৯ খ্রীষ্টাব্দের দিকে শাসন করেছিলেন। তিনি সুপরিচিত সেন রাজ পরিবারের কিনা সেই বিষয়ে ঐতিহাসিকরা নিশ্চিত নন।৩
-------------------------------------
১ প্রাগুক্ত, পৃঃ ২০৮.
২ প্রাগুক্ত, পৃঃ ৪১৮।
৩ প্রাগুক্ত, পৃঃ ২২৮।
-------------------------------------
বাংলার রাজাদের বিভিন্ন ধর্মকে পৃষ্ঠপোষকতা করতে দেখা গেছে। বংশগতভাবে খড়গ রাজারা, চন্দ্র রাজারা ও পাল রাজারা এবং ব্যক্তিগতভাবে কান্তিদেব ও রণবঙ্কমল্লের মত রাজারা বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী ছিলেন। বৈন্যগুপ্ত, শশাংক, লোকনাথ, দোম্মনপাল এবং প্রথম দিককার সেন রাজারা যেমন বিজয়সেন ও বল্লালসেন শৈব ধর্মের অনুসারী ছিলেন। অন্যদিকে বর্মনরা, পরবর্তী সেন রাজারা এবং দেব পরিবার বৈষ্ণব ধর্মের অনুসারী ছিলেন।১ এই রকম ভিন্ন ধর্মের মধ্যে পাশাপাশি অবস্থান দেখা গেলেও সেখানে কোনো সম্প্রদায়গত ঈর্ষা বা সংঘাত হয়েছিল এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে আগেই বলা হয়েছে হিন্দু শৈব ধর্মের অনুসারী শশাংক বৌদ্ধ ধর্মের বিরুদ্ধে দমনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন।
-------------------------------
১ প্রাগুক্ত, পৃঃ ৪২৬।
-------------------------------
উপরের আলোচনা থেকে এই বিষয়টি বুঝা যাচ্ছে যে, বখতিয়ার খলজির মাধ্যমে যখন বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনা হয় তখন বাংলার মোটামুটি একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী হিন্দু ধর্মের কাঠামোভুক্ত হয়ে গেছে। তবে ধারণা করা যায় যে, বৃহত্তর ভারতবর্ষ তখন বিনগরায়নের প্রভাবে ছিল। অন্যদিকে বাংলার শহর ও নগরগুলিও এর প্রভাবে অনেকটা পরিত্যক্ত। তখনো সম্ভবত নগর-শহরের অবশেষ হিসাবে টিকে থাকা কিছু সংখ্যক বাসস্থানে বৌদ্ধ ধর্ম কিছু পরিমাণে টিকে ছিল। বখতিয়ার খলজীর নদীয়া জয় করার পর আরো প্রায় দেড় শত বৎসর লেগেছিল মুসলিমদের সিলেট, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ পর্যন্ত দখল করতে।১ ধারণা করা যায় যে, এই সময়ের মধ্যে বাংলার প্রায় সকল বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মীয় স্থাপনাসমূহ মুসলিম আক্রমণকারীরা ধ্বংস করে দেয়। বৌদ্ধ কিছু মঠ সম্ভবত আগেই পরিত্যক্ত হয়ে থাকতে পারে নগর পরিত্যক্ত হবার সাথে সাথে বা অল্প পরে। সমসাময়িক কালে কোনো ঐতিহাসিক দলিল না পাওয়াতে মুসলিম আক্রমণকারীদের দ্বারা বাংলার জনবসতি, শহর, বৌদ্ধ ও জৈন মঠ ও হিন্দু মন্দিরে কী পরিমাণ ধ্বংস ও লুটপাট পরিচালনা করা হয়েছিল তা জানার কোনো উপায় এখন আর নাই।
-------------------------------------
১ লখনৌতীর (লক্ষণাবতী) সুলতান শামস-উদ-দীন ফীরূজ শাহের সময়ে (সিংহাসন আরোহণ ১৩০১ খ্রীষ্টাব্দ থেকে ১৩২২ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত) বাংলায় মুসলিমদের সর্বাধিক রাজ্যবিস্তার হয়। তার সময়ে সোনারগাঁও, ময়মনসিং ও সিলেট সহ সমগ্র বাংলা মুসলিমদের অধিকারে আসে। পরে সোনারগাঁও-এর সুলতান ফখর-উদ-দীন মুবারক শাহের (সিংহাসন আরোহণ ১৩৩৮ থেকে ১৩৪৯ খ্রীষ্টাব্দ) সময়ে চট্টগ্রাম সর্বপ্রথম মুসলিম অধিকারে আসে। দেখুনঃ আবদুল করিম, বাংলার ইতিহাসঃ সুলতানী আমল, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ ২০০৭। পৃঃ ১৬০, ১৭৩।
-------------------------------------
পাতা : ৮
আমরা এই বিষয়টি এখন পরিশেষে বলতে পারি যে, বিদেশী আক্রমণকারীরা যখন ভারতবর্ষের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে আক্রমণ ও ধ্বংসকাণ্ড পরিচালনা করে তখন ঐ সমস্ত অঞ্চলের বহু মানুষ বিহার ও বাংলার পশ্চিম অংশে পালিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে। বাংলা এই উপমহাদেশের সবচেয়ে পূর্বে অবস্থিত হওয়ায় ও নদ-নদীর কারণে দুষ্প্রবেশ্য হওয়ায় এবং এখানকার জলবায়ু বাইরের মানুষের কাছে অসহনীয় হওয়ায় বাংলা পর্যন্ত বহুকাল বিদেশী আক্রমণকারীরা আসতে আগ্রহ বোধ করত না। তবে শক-কুষাণদের আক্রমণ থেকে শুরু করে হুন আক্রমণ ও শেষে বহিরাগত মুসলিমদের আক্রমণে বাংলা ছিল সবসময় ভারতবর্ষের আশ্রয়চ্যুত ও পলাতক জনগোষ্ঠীর আশ্রয়স্থল। ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চলের পলাতক ও আশ্রিত জনগোষ্ঠী তাই এখানকার ধর্ম ও সমাজের বহু কিছু নির্মাণে ভূমিকা রেখেছিল বলে ধারণা করা যায়।
বাংলার বাণিজ্য শেষ বার আঘাত প্রাপ্ত হয় মুহাম্মদ কাসিমের অষ্টম শতাব্দীর শুরুতে সিন্ধু ও পাঞ্জাবের কিছু অংশে ব্যাপক ধ্বংস, লুণ্ঠন ও হত্যাকাণ্ডের ফলে। এই আক্রমণের ফলে মধ্য এশিয়া ও আফগানিস্তানের সাথে সমগ্র ভারতবর্ষের স্থল পথের বাণিজ্য ও অর্থনীতির প্রচণ্ড ক্ষতি হয়। শুধু তাই নয় মুসলিম আক্রমণকারীদের ভয়ংকর নিষ্ঠুরতা, হত্যা ও ধ্বংসের ফলে এই সময় এই অঞ্চলে যে ব্যাপক মানবিক বিপর্যয় ঘটে তার ফলে বহু মানুষ ভারতবর্ষের নানান অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে বাধ্য হয়। তাদের কিছু অংশ যে বাংলায়ও এসেছিল তাতে সন্দেহ নাই। বাংলা তার সমৃদ্ধির কারণে জীবন-যাপন সহজ হওয়ায় যেমন বাইরের মানুষদের আকর্ষণ করেছে, আবার অন্য দিকে তারা তেমন এখানে অতি বৃষ্টিপাত, আর্দ্র, উষ্ণ ও অস্বাস্থ্যকর জলবায়ু এবং প্রচুর নদ-নদী ও জলাভূমির কারণে যোগাযোগের সমস্যার ফলে এখানে বসবাসের ব্যাপারে অনাগ্রহীও ছিল।
তারপরেও বাইরের মানুষ বাংলায় বসতি স্থাপন করতে বাধ্য হয়েছে, ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চলে আক্রমণ, লুঠতরাজ, যুদ্ধ, খরাজনিত ফসলহানী, ইত্যাদি কারণে। বাংলার ভূমির উর্বরতার কারণে বহু সংখ্যক মানুষকে স্থান দিবার মত সামর্থ্য ও ধারণ ক্ষমতাও ছিল। ফলে বাংলা বিপুল সংখ্যক বহিরাগতকে জায়গাও দিতে পেরেছে। বাংলায় বসতিস্থাপনকারী এই বহিরাগতরা প্রথম পর্যায়ে অর্থাৎ খ্রীষ্টপূর্ব প্রথম ও খ্রীষ্টীয় প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতাব্দীতে শক, কুষাণদের আক্রমণ এবং খ্রীষ্টীয় চতুর্থ, পঞ্চম শতাব্দীতে হুনদের আক্রমণের সময়ে প্রধানত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী, এবং অষ্টম শতাব্দীতে এবং একাদশ শতাব্দী থেকে ক্রমাগত মুসলিম আগ্রাসনের সময়ে প্রধানত হিন্দু ধর্মাবলম্বী ছিল বলে অনুমান করা যায়।
অবশ্য সিন্ধু সভ্যতার ক্ষয় ও ধ্বংসের কালে যে সেখান থেকে এক বৃহৎ জনগোষ্ঠী এখানে অভিবাসন করেছিল আমাদের এই অনুমানের কথাও আমরা ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি। তখনও জৈন বা বৌদ্ধ ধর্মের উদ্ভব বা উত্থান ঘটে নাই। এই দুই ধর্মের উত্থানের আরও প্রায় এক হাজার বৎসর পূর্বে সিন্ধু সভ্যতার পতন বা ধ্বংস ঘটে। অনুমান করা যায় বাংলায় এই অভিবাসন ঘটলেও এই অভিবাসীদের সামান্য কিছু অংশ ছিল বৈদিক ধর্মের অনুসারী আর বাকীরা প্রায় সকলে ছিল লোকায়ত দর্শনের অনুসারী।
সিন্ধু সভ্যতার নদীনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সঙ্কটের কারণে যে বৈদিক ধর্মের উত্থান ও পরিণতিতে সিন্ধু সভ্যতার ধ্বংস ঘটে এ সম্পর্কে আমরা ইতিপূর্বে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। এটা আমরা অনুমান করতে পারি যে, কৃষিজীবীদের একাংশের মধ্যে বৈদিক ধর্ম জনপ্রিয় ভিত্তি পেলেও নাগরিক সমাজের মধ্যে তার ভিত্তি ছিল দুর্বল। প্রত্নতাত্ত্বিক ও ভারতীয় সমাজের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য থেকে আমরা ধারণা করি যে, সিন্ধু সভ্যতার জনসমাজের গরিষ্ঠ অংশ ছিল ধর্মমুক্ত বা লোকায়ত চেতনা নির্ভর।
এই সিদ্ধান্ত আমাদের যে জায়গায় নিয়ে যায় সেটা হল এই যে, নিরীশ্বরবাদী লোকায়ত দর্শন শক্তিশালী সামাজিক ভিত্তি পেয়েছিল বলে পরবর্তী কালে নিরীশ্বরবাদী দুই ধর্ম বৌদ্ধ ও জৈন বাংলাসহ সমগ্র ভারতে এতটা জনভিত্তি পেয়েছিল। অর্থাৎ লোকায়ত চেতনার অধিকারী সিন্ধুবাসীরা সভ্যতার বিপর্যয়ের পর তাদের অভিগমন ও অভিবাসনের সময় তাদের নিরীশ্বরবাদী চেতনার মতো ভাষা ও সংস্কৃতির অনেক কিছুকে বহন করে নিয়ে গেছে। এর ফলে তাদের পরবর্তী সামাজিক জীবনেও আরও অনেক কাল সিন্ধু সভ্যতার ভাষা, সংস্কৃতি ও ধ্যন-ধারণার নানান ধরনের প্রভাব আমরা দেখতে পাই। অবশ্যই ভাষাগত বিচারে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের বিস্তার তেমনই একটা ঘটনা।
তবে সিন্ধুর বস্তুগত সভ্যতার পতনের পর মানুষের চেতনার জগতে যে বিরাট পশ্চাদমুখী যাত্রা শুরু হয় তাতে ধর্মের উত্থান ঘটা ছিল স্বাভাবিক। সুতরাং ক্রমে শুরু হল ধর্মের উত্থান ও বিকাশের যুগ। সিন্ধু সভ্যতার পতনকালেই ঘটল দুইটি সমান্তরাল ধর্মের উত্থান — একটা বৈদিক, অপরটা জরথুস্ট্রীয় বা পারসিক ধর্ম। আরও প্রায় হাজার বছর পরে জৈন ও বৌদ্ধ এই দুই জনপ্রিয় ধর্মের উত্থান ঘটল ভারতে। তবে ভারতের সীমানা পেরিয়ে বৌদ্ধ ধর্ম পরিণত হল একটি আন্তর্জাতিক ধর্মে। প্রাচীন পৃথিবীর সভ্যতার বস্তুগত শক্তি যখন বিভিন্ন কারণে নিঃশেষ হয়েছে তখন অনেকাংশে যেন তার জায়গা নিতে এসেছে ধর্ম। বাস্তব সভ্যতার শূন্যতা ও দুর্বলতা পূরণে এ হল অতিকল্পনা বা ‘ভাব’কে অবলম্বন করে মানুষ কর্তৃক ধর্মের আশ্রয় গ্রহণ।
বাংলার মানুষের ধর্ম গ্রহণ নির্ধারণে ও অর্থনৈতিক ক্রিয়ায় এই বহিরাগত ও পলাতক বসতিস্থাপনকারী মানুষদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গুপ্ত যুগের সমসাময়িক সময় থেকে ভারতবর্ষের সমগ্র উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ অংশ যখন বৌদ্ধ প্রভাব থেকে হিন্দু প্রভাবে চলে গেছে তখনও বাংলায় বৌদ্ধদের প্রভাব টিকে ছিল। এর প্রমাণ হল বৌদ্ধদের শেষ ঘাঁটি হিসাবে খ্রীষ্টীয় অষ্টম শতকের মাঝামাঝি বৌদ্ধ পাল রাজাদের উত্থান। এই সময় ভারতবর্ষের আর কোথায়ও বড় আকারের রাষ্ট্র পরিচালনায় বৌদ্ধদের দেখা যায় না। বৌদ্ধ পাল রাজবংশ খ্রীষ্টীয় দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত টিকে ছিল। এ থেকে অনুমান করা যায় যে, ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়েও বাংলায় বণিক ও কারিগর শ্রেণী শক্তিশালী ছিল। আরেকটি বিষয় হল বাংলায় যতদিন বৌদ্ধ পাল রাজারা টিকে ছিল ততদিন এখানে মুসলমানদের প্রবেশ ঘটে নাই।
বাংলায় হিন্দু সেন রাজাদের প্রবেশ ঘটে দ্বাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে। আর হিন্দু বর্মন রাজবংশের বাংলার দক্ষিণ-পূর্ব অংশে রাজত্ব শুরু হয় একাদশ শতাব্দীর শেষে। বর্মনরা দ্বাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যন্ত শাসন করেছিল। উভয় রাজবংশই বাংলায় বহিরাগত ছিল। ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথমে বখতিয়ার খলজীর আক্রমণাভিযানে সেন রাজা লক্ষণ সেনের পরাজয় ঘটে কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই। সেন রাজারা প্রথম দিকে শক্তিশালী অবস্থানে ছিল। এটি ধারণা করা যায় যে, সমাজের প্রতিরোধ শক্তি একেবারে নিঃশেষ হওয়ার ফলেই লক্ষণ সেনের এমন সামান্যতম প্রতিরোধ ছাড়া পলায়ন বা পরাজয় ঘটে। এই সময়ে বাংলার সমাজে বৌদ্ধ শক্তির অবশেষ তেমন আর ছিল না। যা ছিল তা কিছু নগর কেন্দ্রে সীমাবদ্ধ ও ক্ষয়িষ্ণু। আমরা দেখেছি এর আগে বাংলায় বৌদ্ধ রাজবংশ পাল ও চন্দ্রদের স্থান দখল করে বাইরে থেকে আসা দু’টি হিন্দু ব্রাহ্মণ্য রাজবংশ সেন ও বর্মনরা।১ বর্মনদের রাজধানী ছিল বিক্রমপুর।
-------------------------------------
১ দেখুনঃ R.C. Majumder (ed.), The History of Bengal, Vol, I, Hindu Period, 1943, p. 204.
-------------------------------------
পাতা : ৯
বাংলায় ইসলামের প্রবেশ ও ধর্মান্তরকরণের পটভূমি
আগের আলোচনায় দেখেছি যে, প্রাচীনকালে বাংলায় প্রথমত বৌদ্ধ ধর্ম প্রাধান্য বিস্তার করেছিল। এর পর খ্রীষ্টীয় ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শতক পর্যন্ত সমগ্র ভারতবর্ষব্যাপী যে বিনগরায়ন ঘটেছিল তার প্রভাবে বাণিজ্য ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়লে বৌদ্ধ ধর্মের মূল সামাজিক ভিত্তি বণিক ও কারিগর শ্রেণীও তাদের সামাজিক শক্তি হারায়। ফলত গ্রামীণ সমাজের শক্তি বৃদ্ধির ফলে হিন্দু ধর্মের সামাজিক ভিত্তি শক্তিশালী হয়। এই দুই কারণে বৌদ্ধ ধর্ম ভারতবর্ষ তথা বাংলা থেকে অনেকটা হারিয়ে যায়। কিছু কেন্দ্রে বৌদ্ধ ধর্ম তখনও টিকে ছিল যার সাক্ষ্য পাওয়া যায় বাংলার সংলগ্ন বিহারে নালন্দা, বিক্রমশীলা ও ওদন্তপুরীর মত কিছু বৌদ্ধ কেন্দ্র থেকে, যেগুলি বহিরাগত মুসলমান আক্রমণকারী মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজী লুটতরাজ, ধ্বংস ও গণহত্যা চালিয়ে অনেকটা ধ্বংস করে দেন। বখতিয়ার খলজী সম্পর্কে যেমন জানা যায় যে, তিনি মূর্তি-পূজকদের পূজার স্থান (বৌদ্ধ ও হিন্দু উভয়েরই) ধ্বংস করেছিলেন, তেমন পরবর্তী বাংলার অন্যান্য অঞ্চলে মুসলিম আক্রমণকারীদের বৌদ্ধ ও হিন্দু মঠ বা মন্দির ধ্বংস সম্পর্কে বিবরণ পাওয়া যায় না। তবু ধারণা করা যায় যে, বহিরাগত মুসলিম আক্রমণকারীরা বাংলার আরো বহু নগর, শহর, বন্দর ও বৌদ্ধ-হিন্দু ধর্মের স্থাপত্য নিদর্শনসমূহের মত বাংলাদেশের নওগাঁ জেলার পাহাড়পুর, বগুড়া জেলার মহাস্থানগড় অঞ্চল, দিনাজপুর, রাজশাহী, যশোর, ঢাকার সাভার ও পশ্চিমবঙ্গের জগজ্জীবনপুরের বৌদ্ধ স্থাপত্য এবং কুমিল্লার লালমাই-ময়নামতী অঞ্চলে অবস্থিত ১৮ কিলোমিটার অঞ্চল জুড়ে ছড়ানো অসাধারণ বৌদ্ধ স্থাপনাগুলি ধ্বংস করে দিয়েছিল।
সমগ্র ভারত জুড়ে বহিরাগত মুসলমানদের আক্রমণ ও ধ্বংস ছাড়াও আরো কিছু ঘটনা দ্বারা ভারতবর্ষের দূর বাণিজ্য ও সেই সাথে বণিক ও কারিগর শ্রেণীর শক্তি হ্রাস হয়। এইগুলি হল ব্যাপক মহামারী ও দুভিক্ষ। এই সমস্ত দুর্ভিক্ষের ফলে বহু সংখ্যক মানুষের যে স্থানান্তরগমণ ঘটেছিল তাতে কোনো সন্দেহ নাই। ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চলের দুর্ভিক্ষের প্রভাবে উর্বরতার জন্য পরিচিত বাংলাতেও যে বহিরাগত অনেক মানুষের উপস্থিতি ঘটেছিল সেটি ধারণা করা যায়। এর ফলে এখানকার সমাজে নানা ধরনের সমস্যা ও সংকট তৈরী হওয়া এবং নানাবিধ সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবর্তন দেখা দেওয়া স্বাভাবিক ছিল। আমাদের অনুমান ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চলে মুসলিমদের আক্রমণ ও ধ্বংসের ফলে বাংলায় ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চলের অনেক মানুষ অভিবাসন করায় কিছু সুদূর প্রসারী ফল সমাজে ফলেছিল। আমরা আগের অধ্যায়ে মুসলিম আক্রমণকারীদের ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় আক্রমণ, গণহত্যা, ধ্বংস, দাসকরণ ও ধর্ষণের বিষয়ে উল্লেখ করেছি। এখানে মুসলিম শাসনামলের শুরু থেকে ভারতবর্ষে যে অনেক প্রাকৃতিক বিপর্যয় যেমন, দুর্ভিক্ষ, মহামারী ও ভূমিকম্পের বিবরণ পাওয়া যায়, সেখান থেকে কিছু উল্লেখ করা হল।
কাশিম ফিরিশতা লিখেছেন, ৪২৪ হিজরীতে (১০৩৩ খ্রীষ্টাব্দে) পৃথিবীর অনেক জায়গা অনাবৃষ্টি ও দুর্ভিক্ষের জন্য স্মরণীয় হয়ে আছে। তখন দুর্ভিক্ষের পরে মহামারী হয়েছিল। তাতেও অগণিত মানুষ মারা গিয়েছিল। তিনি লিখেছেন, শুধু ইস্পাহানেই এক মাসে ৪০,০০০ মানুষ মারা গিয়েছিল। ভারতেও সেই সময় মহামারী দেখা গিয়েছিল। সমগ্র দেশ প্রায় জনশূন্য হয়ে গিয়েছিল। মসুল ও বাগদাদের নিকটবর্তী অঞ্চলে এমন ব্যাপক প্লেগের প্রাদুর্ভাব হয়েছিল যে, সেই অঞ্চলে এমন কোনো গৃহ ছিল না যেখানে এক জন লোক মারা যায় নাই।১
-------------------------------------
১ দেখুনঃ কাসিম ফিরিশতা, ভারতে মুসলিম বিজয়ের ইতিহাস, পৃঃ ৮৪।
-------------------------------------
সুলতান মুহাম্মদ তুঘলকের সময়ে মানুষের জীবনধারণের জন্য নিত্য-প্রয়োজনীয় সমস্ত জিনিসপত্রের উপর কর বসানো হয়েছিল। এছাড়া সেই সমস্ত কর এমন জুলুম করে আদায় করা হত যে, ব্যবসা-বাণিজ্য প্রায় অচল হয়ে পড়ল। এর ফলে মানুষের দুঃখ দুর্দশা চরমে পৌঁছাল। কৃষকরা বাড়ী-ঘর ছেড়ে জঙ্গলে পালিয়ে গেল ও লুটপাট করে জীবন নির্বাহ করতে লাগল। কৃষিখেত অনাবাদী পড়ে থাকল। কাসিম ফিরিশতা লিখেছেন, এর ফলে দেশে ভয়ানক দুভিক্ষ দেখা দিল ও প্রদেশগুলি জনশূন্য হয়ে পড়ল।১ তিনি আরো লিখেছেন, অনেক জনবহুল স্থান জনশূন্য হল। দিল্লীতে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ বিরাজ করছিল। ফিরিশতা আরো লিখেছেন, সেই সময় লোকেরা শহর ত্যাগ করে চলে যায়। হাজার হাজার লোক বাংলাদেশে এসে ভীড় জমাতে লাগল। এর আগেই বাংলাদেশ দিল্লীর অধীনতা থেকে মুক্ত হয়েছিল।২ ইবনে বতুতা এই দুর্ভিক্ষ সম্পর্কে বলছেন, শস্যের মণ ষাট দিরহাম, ও পরে এমন কি আরো বেশী হয়েছিল। সেই সময় সাধারণভাবে চরম দুর্দশা ও ভয়ানক কষ্ট চলছিল। তিনি লিখেছেন, একদিন তিনি দেখলেন তিন জন মহিলা এমন একটি মৃত ঘোড়ার চামড়া কেটে খাচ্ছিল যা বেশ কিছু মাস আগে মারা গিয়েছিল। চামড়া রান্না করা হত ও বাজারে বিক্রী করা হত এবং যখন গবাদিপশু হত্যা করা হত তখন লোকজন তার রক্ত সংগ্রহ করত ও তা খেত।৩
-------------------------------------
১ দেখুনঃ কাসিম ফিরিশতা, ভারতে মুসলিম বিজয়ের ইতিহাস, পৃঃ ৩২৯। এই দুর্ভিক্ষের কথা ইবনে বতুতাও উল্লেখ করেছেন তার গ্রন্থে। দেখুনঃ H.A.R. Gibb (Ed.), The Travels of Ibn Battuta, A.D. 1325-1354, Volume III, Published by the Syndics of the Cambridge University Press, London, 1971, p. 695.
২ দেখুনঃ কাসিম ফিরিশতা, ভারতে মুসলিম বিজয়ের ইতিহাস, পৃঃ ৩৪১।
৩ দেখুনঃ H.A.R. Gibb (Ed.), The Travels of Ibn Battuta, A.D. 1325-1354, Volume III, p. 234.
-------------------------------------
সুলতানী আমলে সুলতান সিকান্দার লোদীর সময়ে (শাসনকাল ১৪৮৯ থেকে ১৫১৭ খ্রীষ্টাব্দ) দেশে একবার ভীষণ খাদ্যাভাব সংঘটিত হবার কথা ফিরিশতা উল্লেখ করেছেন। খাদ্যশস্য স্থানান্তরে নিয়ে যাবার উপর কর রহিত করায় এই দুর্ভিক্ষ প্রশমিত হয়।১ সুলতান সিকান্দার লোদীর সময়ে একটি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কথাও তিনি বলেছেন। ৯১১ হিজরীতে (১৫০৫ খ্রীষ্টাব্দে) আগ্রায় এক প্রলয়ঙ্কর ভূমিকম্প হয়েছিল। এতে পাহাড়ের পাথরগুলির ভিত্তি পর্যন্ত নড়ে উঠেছিল। সুউচ্চ অট্টালিকাগুলি মাটিতে ভেংগে পড়ে ও কয়েক হাজার অধিবাসী ধ্বংসস্তূপের নীচে সমাধিস্থ হয়েছিল। আগে বা পরে এমন ভয়ানক ভূমিকম্পের কথা ভারতে হয়েছিল কিনা তা জানা যায় না।২ এছাড়াও ১০৭৮ হিজরীতে (১৬৬৮ খ্রীষ্টাব্দে) সম্রাট আওরঙ্গজেবের সময়ে সমাজি নামে একটি শহর ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়েছিল ও ত্রিশ হাজার বাড়ী ভূমিসাৎ হয়েছিল।৩
-------------------------------------
১দেখুনঃ কাসিম ফিরিশতা, ভারতে মুসলিম বিজয়ের ইতিহাস, পৃঃ ৪৫৬।
২ প্রাগুক্ত, পৃঃ ৪৬১।
৩ মা-আসির-ই ’আলমগিরী গ্রন্থে মুহাম্মদ সাকি মুস্তাইদ খান এই ঘটনার উল্লেখ করেছেন। দেখুনঃ H.M. Elliot and John Dowson, The History of India as Told by its Own Historians, The Muhammadan Period, Vol. VII, Trübner and Co., London, 1877, p. 183.
-------------------------------------
বাদাউনি তার রচিত মুনতাখাবু-ত-তাওয়ারিখে ৯৬২ হিজরীতে অর্থাৎ আকবরের ক্ষমতায় আরোহণের প্রথম বৎসরে ভারতবর্ষের কিছু অংশে, বিশেষভাবে আগ্রা, বাইয়ানা ও দিল্লীতে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন যে, এই দুর্ভিক্ষ এত তীব্র ছিল যে, এক সের জোয়ার শস্য আড়াই টংকা হয়েছিল, এবং এই দামেও বাস্তবে তা পাওয়া যাচ্ছিল না। সম্পদশালী ও সামাজিকভাবে উচ্চাবস্থানের লোকজনকে তাদের ঘরের দরজা বন্ধ করে দিতে হয়েছিল, এবং এক জায়গায় দশ, কুড়ি অথবা আরো বেশী মারা যেতে লাগল, যারা কবর বা শবাচ্ছাদনের বস্ত্র কোনোটাই পায় নাই। হিন্দুদেরও একই দুর্দশাপূর্ণ অবস্থা হল। লোকজন গণহারে বাবলা গাছের বীজ ও বন্য গুল্ম খেতে লাগল। এছাড়াও ধনীরা যে সমস্ত ষাঁড় জবাই করত ও মাঝে-মাঝে বিক্রী করত, লোকজন তার চামড়া খেতে লাগল। কিছুদিন পরে তাদের হাত ও পা ফুলে যেতে লাগল ও তারা মারা গেল।
পাতা : ১০
বাদাউনি লিখেছেন যে, এই ভয়ংকর দিনগুলিতে স্বচক্ষে তিনি মানুষকে তার স্বজাতির মানুষকে খেতে দেখেছেন। এই বিষয়গুলি এত ভীতিজনক ছিল যে, কারো পক্ষে এই ধরনের দৃশ্যে চোখ রাখার সাহস ছিল না। এই অঞ্চলের বৃহৎ অংশে বৃষ্টি ও শস্যদানার অভাব ও জনশূন্যতার সাথে ও অবিরাম সংঘাত ও অশান্তি ও দুই বৎসরের ধারাবাহিক নৈরাজ্য ও আতংকে কৃষকরা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, প্রজারা অন্তর্ধান করেছিল। ফলে অরাজক লোকজন মুসলমানদের শহরের উপর আক্রমণ চালাতে লাগল।১ ঐতিহাসিক শেখ আবু’ল ফজল তার আকবর-নামা গ্রন্থে লিখেন, আকবরের রাজত্বের প্রথম বৎসরে সমস্ত ভারতব্যাপী বড় ধরনের দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। কিছু অঞ্চলে বিশেষভাবে দিল্লী প্রদেশে এটি ভয়ানক আকার ধারণ করেছিল। যদিও লোকজন অর্থ সংগ্রহ করতে পারত, কিন্ত তারা খাদ্য-শস্যের দেখা পেত না। পরিস্থিতি এত চূড়ান্ত পর্যায়ে চলে গিয়েছিল যে মানুষরা পরস্পরকে খেতে লাগল ও কেউ কেউ দল তৈরী করে একাকী লোকজনদের ধরে নিয়ে গিয়ে খাবার হিসাবে কাজে লাগাল।২
-------------------------------------
১ দেখুনঃ Al-Badaoni, Muntakhabu-t-Tawarikh, Vol. I, pp. 549, 550.
২ আবু’ল ফজল লিখেছেন, “At this time there was great scarcity in the cities and villages of India, and there was a terrible famine in many parts, and especially in the province of Delhi. Though there were finding signs of gold, they could see no trace of corn. Man took to eating one another; some would join together and carry off a solitary man, and make him their food. Though this recompense of men’s acts lasted for two years, the intense distress was for one year.” দেখুনঃ Abu-l-Fazl, The Akbarnāmā, Vol. II, Translated from the Persian by H. Beveridge, The Asiatic Society, Calcutta, 1907, pp. 56, 57.
-------------------------------------
ঐতিহাসিক শেখ নুরু’ল হক্ক তার রচিত যুবদাতু’ত তাওয়ারিখ-এ ১০০৪ হিজরীতে আকবরের সময়ে সারা ভারতবর্ষ জুড়ে অনাবৃষ্টি থাকার কথা এবং তিন থেকে চার বৎসর ধরে এক ভীতিপ্রদ দুর্ভিক্ষের কথা উল্লেখ করেছেন। এই সময়ে প্লেগের মত (সম্ভবত বসন্ত রোগ) এক ধরনের অসুখের বিস্তারের ফলে আতংক আরো বেড়ে গিয়েছিল। সমস্ত বাড়ী-ঘর, পাড়া, গ্রাম ও নগর জনহীন হয়ে পড়েছিল। খাদ্য শস্যের অভাবে ও অত্যধিক ক্ষুধায় মানুষজন তাদের স্বজাতিকে খেয়েছিল। গলি ও রাস্তাসমূহ মৃতদেহের কারণে বন্ধ হয়েছিল, ও এগুলি সরানোর জন্য কোনো সহায়তাকারী পাওয়া যায় নাই।১
-------------------------------------
-------------------------------------
কাফি খান তার মুনতাখাবু’ল লুবাব গ্রন্থে আওরঙ্গজেবের ক্ষমতারোহণের সময় সারা দেশব্যাপী দুই বৎসর ধরে বিশেষভাবে পূর্ব ও উত্তর অংশে বিপুল সৈন্য পরিচালনা করার কারণে, এবং কিছু অংশে অনাবৃষ্টির কারণে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল বলে উল্লেখ করেছেন। সেই সময়ে যে সমস্ত ক্ষেত্রে কর রহিত করা হয়েছিল তার মধ্যে উল্লেখ করেছেন, সারা দেশব্যাপী দূর-দূরান্ত পর্যন্ত হওয়া হিন্দুদের যাত্রা বা মেলার কথা, যেগুলি হিন্দু মন্দিরের কাছে বৎসরে একবার হত ও যেখানে লক্ষ লক্ষ লোক সমবেত হত। এখানে সকল ধরনের জিনিসপত্র কেনা-বেচা হত।১
-------------------------------------
১ দেখুনঃ H.M. Elliot and John Dowson, The History of India as Told by its Own Historians, The Muhammadan Period, Vol. VII, Trübner and Co., London, 1877, p. 247.
-------------------------------------
বিখ্যাত ফরাসী পর্যটক ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়ের আওরঙ্গজেবের আমলে ভারতে প্রচণ্ড দুর্ভিক্ষের কথা উল্লেখ করেছেন।১ আওরঙ্গজেবের শাসনের তৃতীয় বৎসরে ১০৭০ হিজরীতে (১৬৬০ খ্রীষ্টাব্দে) দুর্ভিক্ষের কথা জানা যায়। কাফি খান তার মুনতাখাবু’ল লুবাব গ্রন্থে প্রতিকূল ঋতু ও বৃষ্টির অভাব, সাথে যুদ্ধ ও সেনাবাহিনীর চলাচলের জন্য শস্যের অত্যন্ত অভাব ও দুর্লভ হবার কথা বলেছেন।২ অনেক অঞ্চল সম্পূর্ণ জনশূন্য হয়েছিল ও সকল অঞ্চল থেকে রাজধানীতে মানুষজন ভীড় করতে লাগল। নগরের প্রত্যেক রাস্তা ও বাজার দরিদ্র ও অসহায় মানুষদের দ্বারা রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। ফলে নগরবাসীদের চলাচলে বিঘ্ন ঘটতে লাগল।
-------------------------------------
১ দেখুনঃ বিনয় ঘোষ, বাদশাহী আমল, ফরাসী পর্যটক ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়েরের ভ্রমণ-বৃত্তান্ত Travels in the Mogul Empire (1656 – 1668 A.D.), অবলম্বনে, ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েটেড পাবলিশিং কোং প্রাইভেট লিঃ, কলিকাতা, ১৮৭৯ শকাব্দ, পৃঃ ৬২।
-------------------------------------
আওরঙ্গজেবের সময়ে দাক্ষিণাত্যে সুরাট বন্দর পর্যন্ত এবং আহমদাবাদ নগরে ভয়ংকর প্লেগ ও মহামারী বিস্তার লাভ করেছিল, যা পরে বিজাপুর ও রাজকীয় তাঁবুতে ছড়িয়ে পড়ে। শহরে ও বাজারে সহায়-সম্বলহীন হাজার হাজার মানুষ মারা যেতে লাগল, যাদের খুব কমেরই কবর দিবার উপায় ছিল। এটি আওরঙ্গজেবের রাজত্বের সাতাশতম বৎসরে শুরু হয়েছিল ও সাত-আট বৎসর ছিল।১
-------------------------------------
১ মুনতাখাবু’ল লুবাব গ্রন্থে কাফি খান এর উল্লেখ করেছেন। দেখুনঃ H.M. Elliot and John Dowson, The History of India as Told by its Own Historians, The Muhammadan Period, Vol. VII, 1877, p. 337.
-------------------------------------
উপরে বর্ণিত এই সমস্ত মহামারী, দুর্ভিক্ষ ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় যেমন ভারতীয় সমাজকে দীর্ঘস্থায়ী বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখোমুখি করেছিল তেমন এর ফলে বহু মানুষের স্থানান্তরগমনও ঘটেছিল। বিশেষত বাংলায় এই দীর্ঘ সময় জুড়ে বিপুল সংখ্যক মানুষ অভিবাসন করেছিল বলে আমাদের অনুমানের কথা ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি। মুসলমান আক্রমণকারীদের আগমনের সম্পূর্ণ সময় জুড়ে অনবরত হামলা, লুঠতরাজ, হত্যা, দাসকরণ ও ধর্ষণ এবং দুর্ভিক্ষের মত প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর স্থানান্তরগমন ঘটাটা একান্ত স্বাভাবিক। এর ফলে এখানকার জনমিতিতে পরিবর্তন ঘটেছিল বলেও ধারণা করা যায়। খ্রীষ্টীয় একাদশ শতক থেকে ভারতবর্ষে মুসলিম আক্রমণকারীদের অভিযানের সূচনা ধরলে এই অভিবাসন মোগল যুগের পূর্ব পর্যন্ত ঘটে থাকবে। ভারতবর্ষের পশ্চিম ও মধ্য অংশে আগেই হিন্দুকরণ ঘটায় এই অভিবাসনকৃত জনসংখ্যার প্রায় সবই তখন হিন্দু থাকার কথা। বাংলায় হিন্দু ধর্মের সর্বশেষ শক্তিবৃদ্ধির জন্য এই জনগোষ্ঠী একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বলে ধারণা করা যায়।
ত্রয়োদশ শতকে মুসলমান শাসন শুরুর পর বাংলায় মন্দির নির্মাণের চর্চা অনেক কমে গিয়েছিল। এই সময়ে মন্দির প্রতিষ্ঠা ও মন্দিরকে কেন্দ্র করে শিল্প ও স্থাপত্যের আগের বিকশিত ধারা ক্ষীণ হতে থাকে।১ ১৫ শতকে বাংলায় আবার মন্দির-নির্মাণ চর্চা শুরু হয় ও মোগল আমলে এই ধারা বর্তমান ছিল। এই সময় সম্পর্কে ধারণা করা যায় যে, বাংলায় তখন বৌদ্ধরা প্রায় বিলুপ্ত অথবা সীমিত কিছু কেন্দ্রে অস্তিত্ব নিয়ে টিকে রয়েছিল। হিন্দু ধর্ম ইতিমধ্যে সমাজের সাধারণ বিভিন্ন পেশাজীবীদের ধর্ম হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। আর সমাজের বৃহৎ পশ্চাদপদ অংশ যারা কৃষিকাজের সাথে সরাসরি যুক্ত তারা, তাঁতী বা জোলা, তেলী, জেলে ও মাঝিরা কিছু করে ইসলাম ধর্মের অনুসারী হতে শুরু করেছে। অনুমান করা যায় যে, ভারবর্ষের অন্যন্য অঞ্চলের মত বাংলায়ও মুসলমান শাসকরা এখানকার মানুষদের ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করতে সেভাবে সফল হয় নাই। বাংলার পরবর্তী ইতিহাস প্রমাণ করে এখানে ইসলামে ধর্মান্তরকরণের অথবা অন্যভাবে বলা যায় হিন্দু-মুসলিম জনসংখ্যার অনুপাতে মুসলিম প্রাধান্য ব্রিটিশ যুগে ঘটেছিল।
-------------------------------------
১ দেখুনঃ সুফি মোস্তাফিজুর রহমান (সম্পাদিত), প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য, ২০০৭, পৃঃ ২৮৫।
-------------------------------------
পাতা : ১১
তৃতীয় অধ্যায়
ব্রিটিশ শাসনকাল
ভারতবর্ষে পুনরায় বিদেশী শাসনের পরিস্থিতি অনেক আগে থেকেই তৈরী হচ্ছিল মোগল সাম্রাজ্যের ক্ষয় ও অভ্যন্তরীণ শক্তির দুর্বলতার কারণে। এই রকম পরিস্থিতিতে ব্রিটিশরা মোগল সাম্রাজ্যের দুর্বলতার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বাংলাকে নিজ নিয়ন্ত্রণে নেয়। এরপর ক্রমশ সমগ্র ভারতবর্ষ ব্রিটিশ অধীনতায় চলে যায়। ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের ফল ছিল সুদূরপ্রসারী। তারা এখানে আধুনিক শিক্ষা ও প্রযুক্তি নিয়ে আসে, কিন্তু তাদের শাসন ও লুন্ঠনের স্বার্থে ধ্বংস করে দেয় মোগল যুগের শেষ থেকে উদীয়মান এদেশীয় সকল স্বাধীন শক্তি ও সম্ভাবনাকে। সেটা ভারতীয় স্থানীয় স্বশাসনের ক্ষেত্রে যেমন, তেমনি এখানকার স্বাধীন অর্থনীতি ও শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য ছিল।
ব্রিটিশদের দ্বারা ভারতবর্ষের স্বশাসনের ভিত্তি ধ্বংস-সাধন
প্রাচীনকাল থেকে ভারতবর্ষের গ্রাম স্বশাসিত ছিল। অর্থাৎ সেই সময় গ্রাম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক একক হিসাবে কাজ করত ও তার ভিত্তি ছিল গণতান্ত্রিক নীতি। এই নীতির মাধ্যমে ভারতবর্ষের প্রতিটি গ্রাম নিজেদের বিষয়ে পরিচালনা করার জন্য সম্পূর্ণ স্বাধীন ছিল। প্রতিটি গ্রামের নিজেদের একটি সভা থাকত যেখানে গ্রামের সংশ্লিষ্ট সকল বিষয়ে আলোচনা ও বিতর্ক হত। সভা ছিল গ্রামের বহুমুখী কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। এখানে ধর্ম ও সামাজিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হত। সাধারণ অপরাধের বিচারও এখানে হত এবং অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে গ্রামবাসী কর্তৃক তার শাস্তিও দেওয়া হত। গ্রামের সভা থেকে গ্রামবাসীদের নানা ধরনের আনন্দ-উৎসবের আয়োজন করা হত। গ্রামের পরিবারের প্রতিনিধিবৃন্দ, বয়স্করা, ও অন্যান্য অভিজ্ঞ মানুষজন সেখানে জমায়েত হত। রাষ্ট্রের যেই শাসক হোক না কেন এই গ্রামের তেমন কোনো যায় আসত না। তারা নিজেদের সভা দ্বারা শাসিত হত, যা ছিল একটি গ্রাম একক। ভারতবর্ষের মানুষজন এই স্বশাসিত প্রজাতন্ত্রের অধীনে স্বাধীনভাবে বসবাস করত।১ গ্রামের স্বশাসনের এই ব্যবস্থাটিই পঞ্চায়েত২ নামে পরিচিত ছিল। পঞ্চায়েত অর্থ হল পাঁচ জনের মধ্যে যা পরিব্যাপ্ত। গ্রামের কৃষি, খাজনা থেকে শুরু করে সকল বিষয় এই পঞ্চায়েত দ্বারা পরিচালিত হত। অর্থাৎ গ্রামের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও বিচার ব্যবস্থা গ্রাম পঞ্চায়েতের আওতাধীনে ছিল। গ্রামের সকল শ্রেণীর ও বর্ণের প্রতিনিধিত্ব থাকত এই পঞ্চায়েতে। ফলে বর্ণজাতিগত কোনো সমস্যাও এই পঞ্চায়েতে আলোচনা হত এবং কোনো সমস্যা উদ্ভূত হলে তার সমাধান হত। রাষ্ট্রের কর বা খাজনা পঞ্চায়েতের প্রতিনিধির মাধ্যমে রাজা বা রাষ্ট্র-শাসকের কাছে পৌঁছাত। এমনকি মৌর্য যুগে সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত যে বিশাল ও কেন্দ্রীভূত সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেখানেও তিনি প্রাচীন এই গ্রামীন সমাজের নিজস্ব শাসনের উপর হস্তক্ষেপ করেন নাই।
-------------------------------------
১ দেখুনঃ H.D. Malaviya, Village Panchayats in India, published by All India Congress Committee, New Delhi, 1956, p. 74.
২ পঞ্চায়েত ব্যবস্থার উদ্ভব যে সিন্ধু সভ্যতার সময়ে, তা আমরা সিন্ধু থেকে গঙ্গা : এক সভ্যতার পথযাত্রা-র প্রথম খণ্ডে আলোচনা করেছি।
-------------------------------------
শুধু গ্রামের স্থানীয় স্বশাসন ব্যবস্থা যে গ্রাম পঞ্চায়েতের মাধ্যমে পরিচালিত হত তাই নয়, শহরগুলিতেও রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত নিজস্ব পঞ্চায়েত ব্যবস্থা ছিল, যার মাধ্যমে শহরের সামাজিক বিষয়াদি এই পঞ্চায়েতের মাধ্যমে পরিচালিত হত। যেহেতু রাষ্ট্র শহরের অর্থনৈতিক বিষয়াদি, বিচার ও শাস্তি প্রদান, ইত্যাদি দেখত, কাজেই এর বাইরে সামাজিক বিষয়াদি দেখাশুনার দায়িত্ব বর্তাত শহর পঞ্চায়েতের উপর। শহরের আয়তন বড় হলে পঞ্চায়েত শহরের পাড়া বা মহল্লাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠত।
তুর্কী, আফগান ও মোগল যুগে শহরের প্রশাসনে পরিবর্তন এলেও সমগ্র গ্রামীণ ভারতবর্ষ এই স্বশাসিত পঞ্চায়েত ব্যবস্থা দ্বারা শাসিত হত। দেখা গেছে যে, মুসলিম যুগে শাসকরা শহরের শাসন ব্যবস্থা নিজেদের মত করে সংগঠিত করলেও সাধারণভাবে গ্রামীণ স্বশাসনের এই ব্যবস্থাকেও তারা মেনে নিতে বাধ্য হত। দৃষ্টান্ত হিসাবে বিজাপুরের শাসক আদিল শাহের সময়কার একটি বিচারের বিবরণ দেওয়া যেতে পারে।১ ইব্রাহীম আদিল শাহের সময়ে (রাজত্বকাল ১৫১২ থেকে ১৫৪৮ খ্রীষ্টাব্দ) সাতারা জিলার মসুর নামে একটি স্থানের নরসোজি জগদলে নামে এক হিন্দুর সাথে কারাদ নামে জায়গার বাপাজি মুসলমান নামে এক ব্যক্তির ঝগড়া লাগে। বিষয়টি প্রথমে মসুর নামে জায়গার পঞ্চায়েতে মীমাংসা করা হয় এবং জগদলের পক্ষে রায় দেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্তের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে বাদী বাপাজি মুসলমান কারাদের জিলা পঞ্চায়েতে আবেদন করে। এখানকার বিচারে নিম্ন পঞ্চায়েতের সিদ্ধান্তের প্রতি সমর্থন জানানো হয়। বাপাজি তখন সরাসরি বিজাপুর আদালতে যায় এবং সম্রাটের কাছে অভিযোগ করে যে কারাদের পঞ্চায়েত একই ধর্মের হওয়াতে তার প্রতিদ্বন্দ্বীর প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট, সুতরাং তাদের সিদ্ধান্ত খারিজ করা উচিত। একই ধর্মাবলম্বী মুসলিম বিচারকের কাছে বিচারের ব্যর্থতার এই অভিযোগের পরেও মুসলিম সম্রাটকে তার নিজের আদালতে পুনরায় বিচার করতে প্ররোচিত করতে পারে নাই। সম্রাট যা করলেন তা হল, তিনি এই বিষয়টি পৈথান বা প্রতিষ্ঠানের পঞ্চায়েতে পুনর্বিচারের জন্য নির্দেশ দিলেন। মাঝেমাঝেই বিভিন্ন বিষয়ের বিচারের জন্য পৈথানের পঞ্চায়েতে পাঠানো হত, কারণ পক্ষপাতিত্ব বা দুর্নীতি বিষয়ে তাদেরকে কখনো সন্দেহ করা হত না।
-------------------------------------
১ ঘটনাটির বিবরণের জন্য দেখুনঃ A.S. Altekar, A History of Village Communities in Western India, Oxford University Press, Madras, 1927, pp. 44, 45.
-------------------------------------
কিন্তু ব্রিটিশরা ভারতবর্ষে আসার পর তাদের শহরে যেমন তেমন গ্রামেও তাদের নিজস্ব শাসনব্যবস্থা চালু করল। তারা এক দিকে তাদের নিজস্ব আইন ও বিচার ব্যবস্থা এবং আইন প্রয়োগের জন্য নির্বাহী বা পুলিশী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করল এবং অন্য দিকে রাজস্ব সংগ্রহের জন্য একটি মধ্যস্বত্ত্বভোগী জমিদারী ব্যবস্থা চালু করল। এর ফলে সুপ্রাচীন কাল থেকে চলে আসা ভারতবর্ষের পঞ্চায়েত ভিত্তিক স্বশাসন ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যায়।১
-------------------------------------
১ ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার ১৮৮৬ খ্রীষ্টাব্দে তার লেখা The Imperial Gazetteer of India গ্রন্থে লিখেছেন, “The Municipalities at present existing in India are a creation of the Legislature; indeed, a recent branch of our system of administration. Their origin is to be traced, not to the native pancháyat, but to the necessity for relieving the District officer from some of the details of his work. The pancháyat or elective Council of Five is one of the institutions most deeply rooted in the Hindu mind. By it the village community was ruled, the head-man being only its executive official., not the legislator or judge. By it caste disputes were settled; by it traders and merchants were organized into powerful guilds, to the rules of which even European outsiders have had to submit. By a development of the pancháyat, the Sikh army of the khálsá was despotically governed, when the centralized system of Ranjít Singh fell to pieces at his death.” দেখুনঃ W.W. Hunter, The Imperial Gazetteer of India, Volume VI, Second Edition, 1886, Morrison & Gibb, Edinburg, pp. 455, 456.
-------------------------------------
ব্রিটিশরা শহরে পৌর প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করল। রাস্তা তৈরী ও সংরক্ষণ, শহরের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা রক্ষা ইত্যাদি হল পৌর প্রতিষ্ঠানের কাজ। এই পৌর প্রতিষ্ঠানের সাথে কার্যকর হল আইন প্রয়োগের জন্য পুলিশ, যা থাকল ব্রিটিশ সরকারের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে। ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার লিখেছেন, ১৮৭৬-৭৭ খ্রীষ্টাব্দে, তিনটি প্রেসিডেন্সীর রাজধানী বাদ দিলেও, ব্রিটিশ ভারতে ৮৯৪ টি পৌর প্রতিষ্ঠান ছিল, যার মোট জনসংখ্যা ১,২৩,৮১,০৫৯ জন, যা মোট জনসংখ্যার মাত্র শতকরা ৭ ভাগ।১
-------------------------------------
১ দেখুনঃ W.W. Hunter, The Imperial Gazetteer of India, Volume VI, Second Edition, 1886, p. 456.
-------------------------------------
তবে ব্রিটিশরা ভারতবর্ষে তাদের শাসনব্যবস্থা চাপিয়ে দিবার কাজটি একবারে না করে ধাপে ধাপে ও দীর্ঘ সময় নিয়ে প্রতিষ্ঠা ও বাস্তবায়ন করেছিল। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর সরকার প্রতিষ্ঠার প্রথম পৌনে একশ বৎসরের শাসন প্রধানত দুইটি ধারায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। প্রথমটি হল, মোগল শাসনতন্ত্রের ধ্বংসের উপর নূতন নীতিমালা প্রবর্তন করে একটি আমলাতান্ত্রিক প্রশাসন প্রতিষ্ঠা, এবং দ্বিতীয়টি হল, পর্যায়ক্রমে কোম্পানীর ক্ষমতা সংকুচিত করে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠা করা। রাজনৈতিক ক্ষমতার এই পরিবর্তন ধীর প্রক্রিয়ায় ঘটে। পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন আইন, যেমন ১৭৮৪ খ্রীষ্টাব্দের ভারত আইন (Pitt’s India Act), ১৭৯৩ খ্রীষ্টাব্দে কর্নওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, ১৮১৩, ১৮২৩, ১৮৩৩ ও ১৮৫৩ খ্রীষ্টাব্দের সাংবিধানিক আইনসমূহ দ্বারা ক্রমশ কোম্পানীর ক্ষমতা ক্ষীণ হতে থাকে। তবে ১৮৫৮ খ্রীষ্টাব্দে কোম্পানীর শাসনের বিলুপ্তি ঘটলেও প্রায় অক্ষত থাকে এর প্রবর্তিত শাসন কাঠামো।১ এর পরের আরো প্রায় একশ বৎসরের শাসন পদ্ধতি ও আইন পূর্ববর্তী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর শাসনকাঠামোর পরিবর্তিত রূপে বজায় ছিল। শুধু তাই নয় আজও অমরা সেই শাসনপদ্ধতির ধারাবাহিকতা কোনো না কোনো ভাবে বহন করছি।
-------------------------------------
১ সিরাজুল ইসলাম, বাংলার ইতিহাস : ঔপনিবেশিক শাসনকাঠামো, পৃঃ ৮৮।
-------------------------------------
পাতা : ১২
ব্রিটিশদের দ্বারা বাংলার অর্থনৈতিক ভিত্তি ধ্বংস-সাধন
প্রাচীনকাল থেকে বাংলা এমনিতেই কৃষিতে ও শিল্পে সমৃদ্ধ অঞ্চল ছিল। জৈন ধর্মের প্রাচীনতম গ্রন্থ আচারাঙ্গ সূত্র-র দ্বিতীয় পুস্তকে মূল্যবান বস্ত্রের তালিকায় বাংলার বস্ত্রের নাম উল্লেখ আছে।১ ধারণা করা হয় আচারাঙ্গ সূত্র-র দ্বিতীয় পুস্তকটি চতুর্থ খ্রীষ্টপূর্বাব্দের শেষ থেকে দ্বিতীয় খ্রীষ্টপূর্বাব্দে রচিত। বাংলা থেকে চিনি, বস্ত্র, ইত্যাদি বিভিন্ন যুগে শুধু যে বাংলার বাইরে যেত তাই নয়, তা মধ্য এশিয়া ও এমনকি ইউরোপেও যেত বলে জানা যায়। একাদশ খ্রীষ্টাব্দে ভারতবর্ষের উত্তর-পশ্চিম থেকে আগত মুসলিম যুগের শুরু থেকে ব্যাপক আক্রমণাভিযান, ধ্বংস ও লুণ্ঠনের ফলে উত্তর-পশ্চিম ভারতের নগরসমূহ ধ্বংস হলে স্বাভাবিকভাবে স্থলপথে পশ্চিমের বাণিজ্যপথ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর ভারতের অসংখ্য মানুষ ভারতবর্ষের পূর্বে ও দক্ষিণে অভিবাসন করতে বাধ্য হয় বলে ধারণা করা যায়।
-------------------------------------
১ জৈন ধর্মের গ্রন্থ আচারাঙ্গ সূত্রের পুস্তক ২, উপদেশ ৫, পাঠ ১-এ যে সমস্ত মূল্যবান বস্ত্র জৈন সন্ন্যাসী বা সন্ন্যাসিনীরা গ্রহণ করতে পারবে না তার তালিকায় বাংলার বস্ত্রের নাম আছে। দেখুনঃ Hermann Jacobi (Translated), Gaina Sûtras, Part I, The Sacred Books of the East Series, Volume XXII, Oxford at the Clarendon Press, 1884, p. 158.
-------------------------------------
এক দিকে বাণিজ্য পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া, অন্যদিকে উত্তর-পশ্চিম ও পরবর্তীতে মধ্য ভারত থেকে বাংলায় বিপুল সংখ্যক মানুষের আগমনের ফলে এখানকার বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ে। আর বাণিজ্য ভিত্তিক অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ায় বাংলার কৃষির উপরও বিরূপ প্রভাব পড়ে। বস্ত্রবয়নসহ বহু শিল্পের কাঁচামালের উৎস হল কৃষি। শিল্পের চাহিদা কমে গেলে স্বাভাবিকভাবে তা কৃষি অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। তবে মোগল যুগের শেষের দিক থেকে বাংলা পুনরায় সমৃদ্ধ একটি অঞ্চল হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেতে শুরু করে। এমনিতেই বাংলার মাটি ছিল কৃষির জন্য উর্বর। ফলে আগের শতাব্দীগুলিতে পরিচালিত হওয়া ভারতের অন্যান্য অংশে যুদ্ধ ও ধ্বংস এই সময়ে তুলনামূলকভাবে কমে যাওয়ায় আগের ব্যাপক অভিবাসনের ফলে বাংলার জনমিতিতে যে পরিবর্তন এসেছিল তা একটি স্থিতিশীলতা অর্জন করে। আর যুদ্ধ কমে যাওয়ায় বাণিজ্যও বৃদ্ধি পেতে থাকে।
সপ্তদশ খ্রীষ্টাব্দের দ্বিতীয়ার্ধে আওরঙ্গজেবের সময়ে ভারতবর্ষ ভ্রমণের সময়ে বিখ্যাত ফরাসী পর্যটক ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়ের বাংলার উর্বরতা ও সমৃদ্ধির কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘‘... আশ্চর্য হল, এত বড় বিশাল রাজ্যের (ভারতবর্ষ) অধিকাংশই অত্যন্ত উর্বরা। তার মধ্যে বাংলাদেশ হল অন্যতম। এরকম উর্বর দেশ পৃথিবীতে খুব অল্পই দেখা যায়। বাংলাদেশের সম্পদ ও ঐশ্বর্য অতুলনীয়। মিশরের সঙ্গে তুলনা করতে ইচ্ছা করে, কিন্তু বাংলার উর্বরতা মিশরের তুলনায় অনেক বেশী। মিশরে যে পরিমাণ শস্যাদি উৎপন্ন হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি হয় বাংলাদেশে, যেমন ধান, গম ইত্যাদি। এছাড়া আরও নানারকমের ফসল ও পণ্য-দ্রব্যাদি যা বাংলাদেশে প্রচুর পরিমাণে হয়, মিশরে তা হয় না — যেমন তুলো, রেশম, নীল ইত্যাদি।”১
-------------------------------------
১ দেখুনঃ বিনয় ঘোষ, বাদশাহী আমল, পৃঃ ৮০।
-------------------------------------
আওরঙ্গজেবের সময়ে ও তার পরেও বাংলা থেকে সবচেয়ে বেশী রাজস্ব রাজধানী দিল্লীতে যেত তার সম্পর্কে সিয়ারে মুতাখ্খিরীন গ্রন্থের লেখক সৈয়দ গোলাম হুসায়ন খান তাব্তাবায়ী উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন,‘বাঙ্গালা সাম্রাজ্যের সর্বাপেক্ষা পূর্ববর্তী প্রদেশ। কেবল উহাই ছিল সম্পূর্ণরূপে আলিসা বা খাসমহল দফতরের পরিচালনাধীন। বাদশাহ্ সেখান হইতেই সর্বাপেক্ষা অধিক রাজস্ব পাইতেন; তজ্জন্য ঐ প্রদেশের দেওয়ানী বা রাজস্বাধ্যক্ষ পদটি সাম্রাজ্যের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বলিয়া বিবেচিত হইত।’১
-------------------------------------
১ দেখুনঃ সৈয়দ গোলাম হুসায়ন খান তাব্তাবায়ী, সিয়ারে মুতাখ্খিরীন, প্রথম খণ্ড, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ ১৯৭৮, পৃঃ ৩৮।
-------------------------------------
ইতিহাস থেকে দেখা যায় যে, সপ্তদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে শুরু করে অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ পর্যন্ত এই একশত বৎসর ছিল বাংলার অর্থনৈতিক ইতিহাসের এক স্বর্ণযুগ। এই সময়ে ইউরোপের বিভিন্ন বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান বাংলার সাথে বাণিজ্য গড়ে তুলে ও বিপুল পুঁজি বিনিয়োগ করে। অভূতপূর্ব এই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ফলে একদিকে যেমন একটি শক্তিশালী পুঁজিপতি শ্রেণী গড়ে উঠে তেমনি এখানে কৃষি ও শিল্পের বিপুল প্রসার ঘটে। এটি খুব তাৎপর্যপূর্ণ যে, বাণিজ্যিক এই পুঁজিপতি শ্রেণীর প্রায় সকলে ছিল হিন্দুদের মধ্য থেকে আসা।
১৭৫৭ খ্রীষ্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের মধ্য দিয়ে সিরাজদ্দৌলার পতন হলে বাংলায় ব্রিটিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানীর১ শাসন শুরু হয়। এর ঠিক বার বৎসর পরে বাংলায় এক মহা-দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। ১৭৬৯-৭০ খ্রীষ্টাব্দের এই দুর্ভিক্ষ ছিল এত ব্যাপক, দীর্ঘস্থায়ী ও ভয়ংকর যে, এর আগের বা পরের অন্য কোনো জানা দুর্ভিক্ষের সাথে এর বীভৎসতার তুলনা করা যায় না।২ এই দুর্ভিক্ষের ফলে প্রায় এক কোটি লোক মারা যায়।৩ তার পরেও কোম্পানীর রাজস্ব সংগৃহীত হয়েছিল প্রায় আগের মতই। দুর্ভিক্ষের আগের বৎসর থেকে পরের বৎসর পর্যন্ত সরকারী রাজস্ব ছিল নিম্নরূপঃ৪
-------------------------------------
১ ১৫৯৯ খ্রীষ্টাব্দে লন্ডন শহরের আশি জন ফটকাবাজ সওদাগর সংঘবদ্ধ হয়ে ইস্ট্ ইন্ডিয়া কোম্পানী গঠন করে। তাদের প্রারম্ভিক পুঁজি ছিল মাত্র ত্রিশ হাজার পাউন্ড। ১৬০০ খ্রীষ্টাব্দে বৃটেনের রাণী এলিজাবেথ ভারত ও পূর্ব-ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে ব্রিটেনের পক্ষে একচেটিয়া বাণিজ্য করার জন্য একটি বাণিজ্য সনদ প্রদান করেন। দেখুন : সিরাজুল ইসলাম, বাংলার ইতিহাস : ঔপনিবেশিক শাসনকাঠামো, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ ১৯৮৪, পৃঃ ৩।
২ এই দুর্ভিক্ষ বাংলা সন হিসাবে “ছিয়াত্তরের মন্বন্তর” নামে পরিচিত।
৩ ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার তার The Annals of Rural Bengal গ্রন্থে লিখেছেন, দুর্ভিক্ষের দুই বৎসর পর ওয়ারেন হেস্টিংস বাংলা সম্পর্কে একটি বিস্তারিত রিপোর্ট প্রণয়ন করেন। তিনি দেশের বিরাট এলাকা সফর করেন এবং সর্বত্র নানাবিধ বিষয় সম্পর্কে তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদ করেন। দুর্ভিক্ষের ফলে মানুষের মৃত্যু সম্পর্কে তিনি তার রিপোর্টে বলেন যে, মোট জনসংখ্যার তিন ভাগের অন্তত একভাগ মারা গেছে। দেখুন : W.W. Hunter, The Annals of Rural Bengal, Smith, Elder and Co, London, 1868, pp. 33,34.
৪ দেখুন : সিরাজুল ইসলাম, বাংলার ইতিহাস : ঔপনিবেশিক শাসনকাঠামো, পৃঃ ৬৯।
-------------------------------------
|
বৎসর |
রাজস্ব সংগ্রহের পরিমাণ, টাকা |
|
১৭৬৮-৬৯ |
১৫,৮৭৩,৪৫৩ |
|
১৭৬৯-৭০ |
১৪,৩৪১,১৬৮ |
|
১৭৭০-৭১ |
১৪,০০৬,০৩০ |
|
১৭৭১-৭২ |
১৫,০২৩,২৬০ |
১৭৬৯-৭০ খ্রীষ্টাব্দের দুর্ভিক্ষ পূর্ববঙ্গের জেলাসমূহে তেমন অনুভূত হয় নাই। পশ্চিম ও উত্তরবঙ্গ এবং বিহার প্রদেশ ছিল দুর্র্ভিক্ষের কেন্দ্রস্থল। ওয়ারেন হেস্টিংস অনুমান করেন যে, ১৭৬৯-৭০ খ্রীষ্টাব্দের দুর্ভিক্ষে বাংলার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ না খেয়ে মারা যায়। ঠিক কত মানুষ মারা যায় এ সম্পর্কে কোনো সমসাময়িক জরিপ হয় নাই। তবে জানা যায় পূর্ণিয়া, বিষ্ণুপুর প্রভৃতি জেলায় লোকক্ষয় হয় সম্পূর্ণ জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশী। রাজশাহী জেলায় মৃত্যুর হার মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি ছিল। অন্যান্য উপদ্রুত এলাকায় মৃত্যুসংখ্যা এত বেশী ছিল না।১ এই দুর্ভিক্ষে যে সমস্ত অঞ্চলে প্রাদুর্ভাব বেশী ছিল সেই সমস্ত অঞ্চল থেকে লোকজন যে সমস্ত অঞ্চলে দুর্ভিক্ষের কম প্রাদুর্ভাব ছিল সেই সমস্ত অঞ্চলে অভিবাসন করে। এর ফলে দেখা যায় যে, বাংলার পশ্চিমাঞ্চল থেকে পূর্বাঞ্চলে অভিবাসন ঘটেছিল। আর বিহারের পশ্চিম অঞ্চল থেকে লোকজন বেনারস ও অযোধ্যায় অভিবাসন করে।২
-------------------------------------
১ ননী গোপাল চৌধুরী তার Cartier: Governor of Bengal, 1768-1772 গ্রন্থে বাংলার কিছু এলাকাকে নমুনা হিসাবে ধরে দেখান যে, রাজশাহী জেলার তৎকালীন চারটি মহকুমায় স্থানান্তর গমন ও মৃত্যুর কারণে শতকরা ৬৬ ভাগ পরিবারের সংখ্যা কমে যায়। এই ৬৬ ভাগ কমার মধ্যে ১৯ ভাগ স্থানান্তর গমনের জন্য ও ৪৭ ভাগ মৃত্যু জনিত কারণে কমে যায়। তিনি লিখেছেন, স্থান ত্যাগ ও মৃত্যুর এই শতকরা হার বাংলার সকল উপদ্রুত অঞ্চলের জন্য মোটামুটিভাবে প্রযোজ্য। দেখুনঃ Nani Gopal Chaudhuri, Cartier: Governor of Bengal, 1768-1772, Farma K.L. Mukhopadhyay, Calcutta, 1960, pp. 70, 71.
২ প্রাগুক্ত, পৃঃ ৬৮।
-------------------------------------
দুর্ভিক্ষের ফলে কৃষির সাথে সস্পর্কিত জনসংখ্যা কমে যাওয়ায় বিস্তীর্ণ কৃষি জমি অনাবাদী পড়ে থাকে ও জঙ্গলে পরিণত হয়। অথচ এর ফলে সরকারের রাজস্ব কমে নাই।
রেশম ও তাঁত শিল্পে জড়িত শ্রমিকদের মধ্যে অনাহারে মৃত্যুর হার ছিল সর্বোচ্চ। এই দুই শিল্পই শ্রমিকদের অভাবে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাজশাহী জেলায় রেশম শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিক ও কারিগরদের মধ্যে প্রায় অর্ধেক লোক মারা যায়। অভিজ্ঞ কারিগরদের মৃত্যুর ফলে রেশম শিল্প আগের উৎকৃষ্টতা হারায়। মৃত্যু ও অভিবাসনের ফলে তাঁত শিল্পের উৎপাদন আগের তুলনায় প্রায় অর্ধেক কমে যায়। বাংলার এই শিল্পের ভিত্তি ব্রিটিশদের দ্বারা ধ্বংস হবার পর বাংলা আর কখনো নিজস্ব শিল্পের ভিত্তির উপর দাঁড়াতে পারে নাই।
বাংলার শিল্পের ভিত্তিকে ধ্বংস করার পর শুরু হল প্রথমে বাংলা ও পরে সমগ্র ভারতবর্ষ থেকে ব্রিটিশদের প্রণালীবদ্ধভাবে লুণ্ঠন ও সম্পদ পাচার। প্রথমত লুণ্ঠনের ফলে নবাবের সম্পদের ভাণ্ডার খালি হয়ে যায়। ১৭৫৭ খ্রীষ্টাব্দের পর থেকে ভারতবর্ষে সোনা-রূপা আমদানী বন্ধ হয়ে যায়। শুধু তাই নয়, এই সময় থেকে দূর প্রাচ্যের সাথে বাণিজ্যে বাংলা থেকে সোনা-রূপা রপ্তানী করা হতে থাকে। এর ফলে বাংলা কোম্পানীর বাণিজ্যের পুঁজির যোগানদাতা হয় আর এর মুনাফা ভোগ করে ব্রিটেন। ব্রিটেন একচেটিয়া বাণিজ্য সুবিধা লাভ করার ফলে দেশীয় পুঁজিপতিরা ধ্বংস হয়ে যায়।
ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার পর দেশের প্রত্যেকটি জনবহুল শহর ও বন্দর ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে পুঁতিগন্ধময় নোংরা জঞ্জালে পরিণত হয়; কলেরা, বসন্ত, ম্যালেরিয়া প্রভৃতি মহামারীতে মৃত্যু ও শহর-নগর পরিত্যাগের ফলে নগরের জনসংখ্যা দ্রুত কমে যায়। বাংলার যে বস্ত্র ও রেশম শিল্প ছিল এক সময় বিশ্ব-বিখ্যাত, সেই সমস্ত শিল্পের পতন ঘটে পলাশীর যুদ্ধের পরে। বাংলা পরিণত হয় ব্রিটেনের গ্ল্যাসগো-ম্যানচেস্টারের নিয়ন্ত্রিত বাজারে।১
-------------------------------------
১ সিরাজুল ইসলাম, বাংলার ইতিহাস : ঔপনিবেশিক শাসনকাঠামো, পৃঃ ৩১।
-------------------------------------
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী সর্বাধিক মুনাফা করত তাঁত ও লবণ শিল্পের উপর প্রায় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে। এই শিল্পে নিয়োজিত লক্ষ লক্ষ মানুষ ছিল কোম্পানীর নির্যাতনমূলক মুনাফা নীতির শিকার। আগে বলা হয়েছে যে, ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের পর বাংলায় তাঁতীদের সংখ্যা অনেক কমে যায়। অন্য দিকে আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বের বাজারে বাংলার বস্ত্রের চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। চাহিদা বৃদ্ধির কারণে বস্ত্রের বাজার মূল্য বাড়বার কথা হলেও কোম্পানী বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে সচেষ্ট ছিল যাতে বস্ত্রের মূল্য বেড়ে না যায়। সূতার মূল্য বাড়লেও বস্ত্রের মূল্য বৃদ্ধি করতে কোম্পানী রাজী ছিল না। এদিকে অন্যান্য ইউরোপীয় ব্যবসায়ী একই মানের বস্ত্রের জন্য কোম্পানীর চেয়ে বেশী মূল্য দিতে প্রস্তুত ছিল। ফলে তাঁতীরা কোম্পানীর নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে স্বাধীনভাবে অন্যান্য ইউরোপীয় কোম্পানীর সাথে ব্যবসা করতে চেষ্টা করে। ১৭৯৩ খ্রীষ্টাব্দে ঢাকা, লক্ষ্মীপুর, শান্তিপুর, মালদহ প্রভৃতি অঞ্চলের তাঁতীরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর সাথে তালিকাভুক্ত থাকতে অস্বীকার করে। সেই সময় নেপোলিয়নের সাথে যুদ্ধের জন্য বাংলার কাপড়ের চাহিদা কমে যায়। অন্যান্য বিদেশী কোম্পানীগুলি বিনিয়োগ কমিয়ে দেয়। এই সময় ম্যানচেস্টার, গ্ল্যাসগো ও প্লেজলীতে যন্ত্রনির্মিত অধিকতর সূক্ষ্ম ও সস্তা কাপড় বিশ্বের বাজার দখল করতে থাকে। ঊনবিংশ শতকের গোড়া থেকে বাংলায় ব্রিটেনের তৈরী কাপড় আমদানী শুরু হয়। বাংলার তাঁতীরা প্রতিযোগিতায় হেরে যায়। ঊনবিংশ শতকের শুরু থেকে বাংলার ঐতিহাসিক তাঁতশিল্পের পতন শুরু হয়। এরপর তিন দশকের মধ্যে বাংলার বস্ত্র বিশ্ববাজার থেকে হারিয়ে যায়। ১৮২০-এর দশক থেকে ব্রিটেন থেকে লবণ আমদানী শুরু হয়। এই লবণ ছিল দেশী লবণের চেয়ে স্বচ্ছ ও সস্তা। ফলে বাংলার বাজার দখল করে নেয় ব্রিটেনের শিল্পজাত বস্ত্র ও লবণ।১
-------------------------------------
১ প্রাগুক্ত, পৃঃ ২৯০-২৯৩।
-------------------------------------
ব্রিটিশদের দেশীয় শিল্প ধ্বংসের কর্মনীতির ফলে বাংলায় তাঁতীদের সংখ্যা এত কমে গিয়েছিল যে, বিশ শতকের শুরুতে স্বদেশী আন্দোলনের সময় বাংলায় তাঁতের কাপড় উৎপাদনের জন্য আন্দোলনকারীরা উদ্যোগ নিলে দেখা গেল যে, বাংলায় তাঁতীদের সংখ্যা খুবই কম হওয়ায় পর্যাপ্ত কাপড় উৎপাদন করা যাচ্ছে না।
১৭৯৩ খ্রীষ্টাব্দে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথা চালু করার পর প্রাচীন জমিদারদের জমি কলকাতা ভিত্তিক অনাবাসিক নব্য জমিদারদের হাতে চলে যায়। নব্য জমিদার ও তাদের নায়েব-গোমস্তারা ভূমি রাজস্ব প্রতি বৎসর বাড়াতে থাকে। এক সরকারী তদন্ত রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে, ঘোষগাঁও, গুনাই, বনগাঁও ডোবা, বোরাক ও তেলিখালি এই পাঁচটি গ্রামে ১৭৯৩ থেকে ১৮২৫ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত রায়তদের উপর রাজস্ব বৃদ্বির পরিমাণ ছিল প্রায় তিন থেকে পাঁচ গুণ।১
-------------------------------------
১ সিরাজুল ইসলাম, বাংলার ইতিহাস : ঔপনিবেশিক শাসনকাঠামো, পৃঃ ২৮৮।
-------------------------------------
আগে মুর্শিদাবাদ ছিল বাংলার রাজধানী এবং তাকে কেন্দ্র করে বাংলার অর্থনীতি চালিত হত। ব্রিটিশরা কলকাতা শহরের পত্তন করার পর একটি মুৎসুদ্দী বা দালাল শ্রেণী তৈরী করে। পলাশীর যুদ্ধে তাদের বিজয়ের পর কলকাতা শহরে এই শ্রেণী দ্রুত সমৃদ্ধ হয়ে উঠে। এই শ্রেণীর নেতৃত্বেই কলকাতা কেন্দ্রিক বাঙ্গালী মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ। কলকাতা শহর ও সেই সাথে এই শহরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা বাঙ্গালী মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জন্ম ও উত্থান প্রক্রিয়ার এই বিষয়টি আমাদের মনে রাখা দরকার। এই শ্রেণী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ-উপনিবেশবাদের দালাল ও সুবিধাভোগী শ্রেণী ছাড়া আর কিছুই নয়। এর উৎপাদনের সাথে কোনো সম্পর্ক নাই। বিদেশীদের দালালী করে ও তাদের উচ্ছিষ্টভোগী হয়ে এরা মহৎ ও বৃহৎ কোনো সৃষ্টি করতে পারে নাই। যেহেতু এই নূতন শক্তি ব্রিটিশদের সৃষ্ট তাই তারা ব্রিটিশদের ভক্ত হবে তাতে কোনো সন্দেহ নাই। এদের সম্পর্কে বিনয় ঘোষ লিখেছেন, “... দেওয়ানী-বেনিয়ানি-দালালি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের বিপুল অর্থ নতুন বাঙালী ধনিকশ্রেণী বেশীরভাগ ভূসম্পত্তিতে নিয়োগ করেন, এবং ক্রমে নতুন এক কর্মহীন লক্ষ্যহীন জমিদারশ্রেণীতে পরিণত হন। এই নতুন জমিদারশ্রেণীই ব্রিটিশ শাসকদের ‘ডান হাত’ বলে গণ্য হতেন। সুতরাং ভূসম্পত্তি ছাড়াও দেশের ব্যবস্থাপরিষদের ও কৌন্সিলের ‘সভ্য’ হওয়া তাদেরও কাম্য ছিল।”১ এর ফল আমরা পরবর্তী বাংলা ও ভারতীয় ইতিহাসে দেখতে পাই।
-------------------------------------
১ দেখুনঃ বিনয় ঘোষ, কলকাতা শহরের ইতিবৃত্ত, দ্বিতীয় খণ্ড, প্রকাশ ভবন, কলকাতা, প্রথম সংস্করণ ১৯৭৫, তৃতীয় সংস্করণ ১৯৯৭, ষষ্ঠ মুদ্রণ ২০১৫, পৃঃ ৫৭।
-------------------------------------
পাতা : ১৪
এ,জে, উইলসন নামে একজন ব্রিটিশ মার্চ, ১৮৮৪ খ্রীষ্টাব্দের Fortnightly Review -এ লেখেন,১ “একভাবে ও বিভিন্নভাবে আমরা এই অভাগা দেশ থেকে এক বৎসরে সম্পূর্ণ ৩,০০,০০,০০০ পাউন্ড নিয়ে যাই, এবং দেশী মানুষদের বৎসরে গড় আয় হল ৫ পাউন্ড – যা ভারতের অনেক অংশেই আরো কম। সুতরাং, আমাদের ভারতে প্রদত্ত কর নীচ থেকে উপরের দিকে ষাট লক্ষ পরিবারের প্রধানের বা ধরা যাক তিন কোটি মানুষের সম্পূর্ণ আয়কে প্রকাশ করে। এর অর্থ হল আমাদের দ্বারা প্রতি বৎসর সমগ্র ভারতীয়ের এক-দশমাংশ জনসংখ্যার সম্পূর্ণ জীবিকা নিংড়ে নেওয়া।”
-------------------------------------
১ দেখুনঃ Romesh Dutt, Indian Famines: Their Causes and Prevention, P.S. King & Sons, London, 1901, p. 12.
-------------------------------------
বাংলায় ছিয়াত্তরের মন্বন্তর বা ১৭৬৯-৭০-এর ভয়ংকর দুর্ভিক্ষের বিষয়ে আগে আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু এর পরেও ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনকালে আরো দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। এর মধ্যে শুধুমাত্র ১৮৬০ থেকে ১৯০০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত এই চল্লিশ বৎসরে ভারতবর্ষে দশটি দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এই দুর্ভিক্ষগুলি হলঃ১
-------------------------------------
১ ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রমেশ দত্ত প্রণীত সরকারী তালিকা থেকে এটি গ্রহণ করা হয়েছে। দেখুনঃ Romesh Dutt, Indian Famines: Their Causes and Prevention, P.S. King & Sons, London, 1901, pp. 1, 2.
-------------------------------------
- ১৮৬০ খ্রীষ্টাব্দে উত্তর ভারতের দুভিক্ষ – এই দুর্ভিক্ষ সর্বব্যাপী ছিল, ও অনুমান করা হয় যে তখন ২০০,০০০ মানুষ মারা যায়।
- ১৮৬৬ খ্রীষ্টাব্দে উড়িষ্যার দুর্ভিক্ষ – মোট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ অর্থাৎ প্রায় দশ লক্ষ মানুষ এই দুর্ভিক্ষে মারা যায়।
- ১৮৬৯ খ্রীষ্টাব্দে উত্তর ভারতের দুর্ভিক্ষ – ধারণা করা হয় এই দুর্ভিক্ষে ১২,০০,০০০ মানুষ মারা গিয়েছিল।
- ১৮৭৪ খ্রীষ্টাব্দে বাংলার দূর্ভিক্ষ – এই সময় ভূমির খাজনা কম ছিল ও স্থায়ী বন্দোবস্ত সম্পন্ন হয়েছিল। এই সময়ে মানুষের হাতে সম্পদ থাকায় এই দুর্ভিক্ষে মানুষ মারা যায় নাই।
- ১৮৭৭ খ্রীষ্টাব্দে মাদ্রাজের দুর্ভিক্ষ – ভূমির খাজনা অনেক বেশী ছিল ও সময় সময় বাড়ানো হচ্ছিল ও লোকজন দরিদ্র ও সহায়-সম্পদহীন ছিল। পঞ্চাশ লক্ষ মানুষ এই দুর্ভিক্ষে মারা যায়।
- ১৮৭৮ খ্রীষ্টাব্দে উত্তর ভারতের দুর্ভিক্ষ – এই দুর্ভিক্ষে ১২,৫০,০০০ মানুষ মারা গিয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
- ১৮৮৯ খ্রীষ্টাব্দে মাদ্রাজ ও উড়িষ্যার দুর্ভিক্ষ – এই দুর্ভিক্ষে মৃত্যুর সংখ্যা অত্যন্ত বেশী ছিল। কিন্তু এর কোনো সরকারী হিসাব পাওয়া যায় নাই।
- ১৮৯২ খ্রীষ্টাব্দে মাদ্রাজ, বাংলা, বার্মা ও রাজপুতানার দুর্ভিক্ষ – মাদ্রাজে মানুষের মৃত্যুর হার বেশী ছিল। কিন্তু বাংলায় কোনো মৃত্যু ঘটে নাই।
- ১৮৯৭ খ্রীষ্টাব্দে উত্তর ভারত, বাংলা, বার্মা, মাদ্রাজ ও বোম্বের দুভিক্ষ – বাংলায় মৃত্যু প্রতিরোধ করা গিয়েছিল। কিন্তু মধ্য প্রদেশে সেই বৎসরে মৃত্যু হার গড়ে প্রতি হাজারে তেত্রিশ থেকে প্রতি হাজারে ঊনষাট হয়েছিল।
- ১৯০০ খ্রীষ্টাব্দে পাঞ্জাব, রাজপুতানা, মধ্য প্রদেশ ও বোম্বের দুর্ভিক্ষ – ভারতের সবচেয়ে সর্বব্যাপী দুর্ভিক্ষ ছিল। সবচেয়ে খারাপ মাসগুলিতে মৃত্যু ষাট লক্ষ পর্যন্ত উঠেছিল।
ব্রিটিশদের দ্বারা ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার ধ্বংস-সাধন
ভারতবর্ষে প্রাচীনকাল থেকেই শিক্ষার প্রধান ধারা হিসাবে ব্যক্তি শিক্ষকরা ভূমিকা পালন করতেন। প্রাচীন ভারতে খ্রীষ্টীয় যুগের প্রথম দিকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থা হিসাবে বৌদ্ধদের মঠগুলি গড়ে উঠেছিল। এর কয়েক শতাব্দী পরে এর অনুকরণে হিন্দু মন্দিরসমূহের সাথে মন্দির শিক্ষায়তন গড়ে উঠেছিল। যদিও এই সমস্ত মঠ ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় ও মন্দির শিক্ষায়তনগুলি নির্দিষ্ট কিছু বিখ্যাত কেন্দ্রে গড়ে উঠেছিল। তখনো গ্রাম সমাজে ব্যক্তি শিক্ষকরা শিক্ষা ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি ছিলেন।১ প্রতিজন শিক্ষিত ব্রাহ্মণই একেকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসাবে কাজ করত। সসাজে ব্রাহ্মণকেন্দ্রিক এই ব্যক্তি-শিক্ষকদের আর্থিকভাবে দেখার দায়িত্ব ছিল গ্রাম পঞ্চায়েতের। স্থানীয় স্বশাসনের রূপ হিসাবে টিকে থাকা পঞ্চায়েতের শক্তিশালী সামাজিক নেতৃত্ব ছিল এই শিক্ষাব্যবস্থার পিছনে।
----------------------------
১ ঐতিহাসিক অল্টেকার লিখেছেন, “He (private teachers) continued to be in its sole and undisputed possession till about the early centuries of the Christian era, when organized educational institutions came into existence in connection with the Buddhist monasteries. In a few centuries, Hinduism copied the Buddhist example and organised its own temple colleges. Monastic universities and temple colleges were however confined to some famous centres of learning; private teachers still continued to be the main stay of the educational system throughout the moffusil. In medieval times the Maṭhas of the various religious pontiffs (Āchāryas) used to organise small centres for higher education, which co-operated with the private teachers in rendering the valuable service of keeping the lamp of learning burning in a dark age, when society was often over-whelmed by anarchy, interneceine war and foreign rule.” দেখুনঃ A.S. Altekar, Education in Ancient India, Nand Kishore & Bros., Benares, 1944, p. 70.
----------------------------
প্রাচীনকালে তক্ষশীলা ও বেনারসের মত কেন্দ্রে বিখ্যাত পণ্ডিতদের সমাবেশ ঘটেছিল। তারা ব্যক্তিগত উদ্যোগে ছাত্রদের শিক্ষা দান করতেন। কিন্তু তারা কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেন নাই। এটি খুব চমকপ্রদ বিষয় যে, প্রাচীন এথেন্সের শিক্ষা ব্যবস্থা দীর্ঘকাল রাষ্ট্রের পরিবর্তে ব্যক্তি কেন্দ্রিক ছিল। পরবর্তীকালে ভারতবর্ষে বৌদ্ধদের মঠ-কেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠে। বুদ্ধ শিক্ষানবীশদের প্রণালীবদ্ধ শিক্ষা দানের উপর জোর দিতেন। সেখানে শুধু আত্মিক উন্নতির জন্য শিক্ষা দানই ছিল না সেই সাথে ছিল পালি ও সংস্কৃত, যুক্তিবিজ্ঞান ও অধিবিদ্যা শিক্ষা দান। অশোকের সময় থেকে পরবর্তী যুগে বৌদ্ধ মঠসমূহ শিক্ষার বৃহৎ প্রতিষ্ঠান হিসাবে বিকাশ লাভ করে। এর পাশাপাশি হিন্দুদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসাবে গুরুকুলও বিকাশ লাভ করে। তবে এটি লক্ষ্যণীয় যে, হিন্দু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরে (অর্থাৎ ৪০০ খ্রীষ্টাব্দের পরে) প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল।১ বৌদ্ধ মঠের সাথে যুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কোনো বিখ্যাত ভিক্ষুর অধীনে থাকত। তাকে সংঘের সদস্যরা নির্বাচন করত। চরিত্র, পাণ্ডিত্য ও বয়োজ্যেষ্ঠতাকে সাধারণত বিবেচনায় নেওয়া হত। হিন্দুদের মন্দির ভিত্তিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি সাধারণত মন্দিরের সংলগ্ন কোনো বড় ভবনে হত।
----------------------------
১ প্রাগুক্ত, পৃঃ ৭২।
----------------------------
পাতা : ১৫
মুসলিম শাসনের সাড়ে সাত শত বৎসরে মুসলিম শাসকরা মসজিদের সাথে শিক্ষার ক্ষেত্রে মাদ্রাসা ব্যবস্থা চালু করলেও প্রাচীন কাল থেকে গড়ে উঠা ভারতবর্ষের নিজস্ব শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে পারে নাই। মুসলিম আক্রমণের আঘাতে প্রধানত বৌদ্ধদের মঠ কেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা ও হিন্দুদের মন্দির কেন্দ্রিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ ধ্বংস হলেও সমগ্র ভারত জুড়ে ব্রাহ্মণদের দ্বারা পরিচালিত এবং সাধারণভাবে গ্রাম-সমাজের পৃষ্ঠপোষকতায় ও অর্থানুকূল্যে ব্রাহ্মণকে কেন্দ্র করে ভারতবর্ষের নিজস্ব শিক্ষা ব্যবস্থা চালু ছিল। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় ভূস্বামী বা রাজারাও এই সমস্ত শিক্ষায়তনকে ভূমি বা অর্থ সাহায্য করতেন। ব্রিটিশরা যখন ভারতবর্ষে আসে তখনও ভারতবর্ষের এই নিজস্ব শিক্ষাব্যবস্থা চালু ছিল। এই শিক্ষা ব্যবস্থায় ছাত্রদের কাছ থেকে বেতন নেওয়া হত না এবং বেতন নেওয়াকে খারাপ চোখে দেখা হত।১ ঐতিহাসিক সাক্ষ্য আছে যে, বৌদ্ধদের বিশ্ববিদ্যালয় ও মঠ এবং হিন্দুদের মন্দির ভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অগ্রহার প্রতিষ্ঠানসহ (রাজাদের পৃষ্টপোষকতায় শিক্ষিত ব্রাহ্মণদের গ্রামে এনে প্রতিষ্ঠিত করার ফলে যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠত) সকল প্রতিষ্ঠানই ছাত্রদের বিনা বেতনে শিক্ষাদান করত। হিন্দু সমাজে ব্রাহ্মণরা যারা সমাজের প্রাচীন সংস্কৃতি ও শিক্ষার ধারক ও বাহক ছিল কোনো বেতন ছাড়াই ছাত্রদের পড়াত। এটাই ভারতবর্ষের শিক্ষার মূল ধারা ছিল। তবে শিক্ষকদের কোনো যুগেই নিজের গ্রাসাচ্ছাদনের জন্য ভাবতে হত না। সাধারণভাবে ভারতবর্ষের পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় গ্রাম সমাজ, সচ্ছল অধিবাসী, ভূস্বামী, বা রাজারা এই সমস্ত শিক্ষকদের চলার জন্য বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য দান করত। প্রাচীন যুগের বিখ্যাত শিক্ষাকেন্দ্রগুলি হল তক্ষশীলা ও বেনারস। এছাড়া প্রাচীন ও মধ্য যুগের বৌদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্রসমূহ হল নালন্দা, বিক্রমশীলা, ওদন্তপুরী, বলভি, ইত্যাদি। আর হিন্দু মন্দির ভিত্তিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসাবে সালোতগি (Salotgi), এন্নাইরাম (Ennāyiram), বেনারস, তিরুমুক্কুদল (Tirumukkudal), তিরুবোরিউর (Tiruvorriyur), মালকাপুরম (Malkapuram) ছাড়াও আরো কিছু মন্দির ভিত্তিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম পাওয়া যায়। এই বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ যে, ভারতবর্ষে সমাজের উচ্চ শ্রেণীর মধ্যে শিক্ষার হার অনেক বেড়ে গিয়েছিল। অল্টেকার বলছেন, খ্রীষ্টীয় যুগের শুরুর দিকে এর হার সম্ভবত ৭৫% ভাগ হয়েছিল। সমসাময়িক যুগে পৃথিবীর কোনো দেশেই এত শিক্ষার বিস্তার ঘটে নাই।২
-------------------------------------
১ এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য দেখুন, .S. Altekar, Education in Ancient India, 1944, pp. 78 – 81.
২ দেখুনঃ A.S. Altekar, Education in Ancient India, 1944, p. 102.
-------------------------------------
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে স্থানীয় শিক্ষা ব্যবস্থা প্রায় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয় ও পাশ্চাত্যের জ্ঞানতত্ত্বের উপর ভিত্তি করে ইংরাজী মাধ্যমে নূতন শিক্ষা ব্যবস্থা চালু হয়।১ তারপরেও দেখা গেছে যে, ব্রিটিশ যুগের শেষেও বাংলা, বিহার ও বর্তমান উত্তর প্রদেশ ও উত্তরাখণ্ড জুড়ে বহু সংখ্যক টোল বা সংস্কৃত স্কুল চালু ছিল।২ এদেশে ব্রিটিশদের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল তাদের উপনিবেশিক শাসনের উপযোগী করে একটি শিক্ষিত শ্রেণী গড়ে তুলা যারা কেরাণীর কাজ করবে এবং মন ও মননে তাদের দাসানুদাস হবে।
-------------------------------------
১ দেখুনঃ Syed Nurullah and J.P. Naik, History of Education in India: During the British Period, Macmillan & Co., Ltd., Bombay, 1943, pp. xxii, xxiii.
২ দেখুনঃ A.S. Altekar, Education in Ancient India, 1944, p. 141.
-------------------------------------
ব্রিটিশ শাসনকালে ভাগ করো ও শাসন করো নীতির প্রয়োগ
১৮৫৭ খ্রীষ্টাব্দের সিপাহী বিদ্রোহের পরাজয়ের পর ভারতবর্ষের মুসলমান নেতৃত্ব বুঝতে পেরেছিল যে, হিন্দু ও মুসলমানের ঐক্য ছাড়া ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াই করা সম্ভব না। ১৮৮৪ খ্রীষ্টাব্দে মুসলমানদের তৎকালীন সম্মানিত নেতা স্যার সৈয়দ আহমদ খান বলেন, আমাদের (হিন্দু ও মুসলমানের) এক অন্তর ও এক আত্মা হতে ও এক সাথে কাজ করতে চেষ্টা করা উচিত। ... মনে রাখবেন হিন্দু ও মুসলমান শব্দ দুটি কেবলমাত্র ধর্মীয় পার্থক্য বুঝায় – নতুবা সকল ব্যক্তি হিন্দু বা মুসলমান, এমনকি খ্রীষ্টানরাও যারা এই দেশে বাস করে, সবাই এই বিবেচনায় এক ও একই জাতির অন্তর্ভুক্ত।১ ব্রিটিশরা হিন্দু ও মুসলমানের এই ঐক্যের প্রবণতা বুঝতে পারছিল। তারা বুঝছিল যে, এই দুই সম্প্রদায় ঐক্যবদ্ধ হলে তাদের অবস্থান দুর্বল হয়ে যাবে। এই দুই সম্প্রদায়কে বিভক্ত করার জন্য তারা সম্প্রদায় ভিত্তিক বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। এইগুলির মধ্যে ছিল ১৯০৯ খ্রীষ্টাব্দে মিন্টো-মুরলে সংস্কার, যা ছিল স্থানীয় ও পৌর কমিটিসমূহের নির্বাচন বিষয়ে। এই সংস্কার অনুযায়ী মুসলমানরা শুধুমাত্র মুসলমানদের ভোট দিবে ও হিন্দুরা শুধুমাত্র হিন্দুদের ভোট দিবে। এইভাবে ব্রিটিশরা তাদের গণতন্ত্রের ভিত্তিমূলে সাম্প্রদায়িকতাকে স্থাপিত করল। এর ফলে স্থানীয় নির্বাচন ব্যবস্থায় হিন্দু ও মুসলমানরা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হল।
-------------------------------------
১ দেখুনঃ Wali Khan, Facts are Facts: The Untold Story of India’s Partition, Translated by Dr Syeda Saiyidain Hameed, Vikas Publishing House Pvt Ltd, New Delhi, 1987, p. 4.
-------------------------------------
১৯০৫ খ্রীষ্টাব্দে বাংলাকে পূর্ব ও পশ্চিম এই দুই প্রদেশে ভাগ করলেও বাঙ্গালীদের প্রবল চাপের মুখে ১৯১১ খ্রীষ্টাব্দে ব্রিটিশরা তা রদ করে। তখন পর্যন্ত ভারত ও বিশেষত বাংলার জনসমাজে হিন্দু নেতৃত্বের প্রাধান্য ছিল। তাছাড়া তখনও হিন্দু-মুসলিম বিরোধ সেভাবে মাথা তুলে নাই। ফলে বাংলায় মুসলিমরা সেই সময় সংখ্যাগুরু হলেও বঙ্গভঙ্গ দ্বারা ব্রিটিশরা তাদের কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করতে পারে নাই। সুতরাং প্রধানত হিন্দু নেতৃত্ব বঙ্গভঙ্গ বা বাংলা ভাগের বিরুদ্ধে সমগ্র বাঙ্গালী সমাজকে তাদের নেতৃত্বে সমবেত করতে সক্ষম হয়। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলায় ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাব তীব্রতর হয়ে উঠতে থাকে এবং গড়ে উঠে বিচ্ছিন্ন ধরনের হলেও স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগ্রাম। বিপ্লবী সংগ্রাম করতে গিয়ে ১৯০৮ খ্রীষ্টাব্দে দুই তরুণ ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকীর মৃত্যু হয়। ঊনিশ বছর বয়সী ক্ষুদিরামের ফাঁসি হয় আর কুড়ি বছর বয়সী প্রফুল্ল চাকী পুলিশের হাতে ধরা না দিয়ে নিজ পিস্তল দিয়ে আত্মহত্যা করেন। বাংলার ক্রমবর্ধমান ক্ষোভ ও রোষকে প্রশমিত করতে চেয়ে ব্রিটিশ শাসকরা ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশরা ওসমানীয় সাম্রাজ্য ধ্বংস করতে চেষ্টা করে। ফলে কিছু দিন তারা মুসলমানদের পৃষ্ঠপোষকতা করলেও তখন তারা মুসলমানদের পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ করে দেয়। এই সময়ে তারা দ্বিতীয়বার সংস্কার করে যার নাম ছিল মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কার। এইবারও তারা সাম্প্রদায়িকতাকে নির্বচানের ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করে। ব্রিটিশরা তুরস্ককে আক্রমণ করলে মুসলমানরা এর বিরোধিতা করে। এই সময় মওলানা মোহাম্মদ আলী ও শওকত আলীর নেতৃত্বে খেলাফত আন্দোলন নামে পরিচিত এই আন্দোলনে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস ও গান্ধী যোগ দেন।
তবে বঙ্গভঙ্গ রদ হলেও এবং খেলাফত আন্দোলনকে কেন্দ্র করে মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্যের শক্তির প্রকাশ ঘটলেও ইতিহাসের গতিধারা ছিল ভিন্ন রকম। তাই ক্রমশ মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে রাজনৈতিক বিভেদ ও দ্বন্দ্ব প্রবলতর হয়ে উঠতে থাকে।
পাতা : ১৬
১৯০৬ খ্রীষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে ঢাকায় সর্ব-ভারতীয় মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষার ক্ষেত্রে মুসলমানদের অধিকারকে রক্ষা ও উন্নত করা।১ ঢাকার নবাব ভিকার-উল-মুল্ক এবং খাজা স্যার সলিমুল্লাহ ছিলেন প্রাথমিক প্রস্তাবক।২
-------------------------------------
১ ঢাকায় অনুষ্ঠিত নবাব ভিখার-উল-মুলক-এর সভাপতিত্বে ভারতের নেতৃস্থানীয় মুসলমানদের এই সভায় গৃহীত প্রধান প্রস্তাবের মধ্যে ছিল ‘‘(ক) ব্রিটিশ সরকারের প্রতি মুসলমানদের আনুগত্যের মনোভাব বৃদ্ধি করা এবং ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক গৃহীত কোন পদক্ষেপে সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে কোন ভুল বুঝাবুঝি সৃষ্টি হলে তা দূর করা।” দেখুনঃ জি অ্যালানা (মূল), পাকিস্তান আন্দোলনঃ ঐতিহাসিক দলিলপত্র, অনুবাদঃ কে এম ফিরোজ খান, G. Allana লিখিত Pakistan Movement: Historic Documents গ্রন্থের অনুবাদ, খান ব্রাদার্স অ্যন্ড কোম্পানি, ঢাকা, ২০০৮, পৃঃ ৩৩।
-------------------------------------
হিন্দুদের মধ্যে মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা বা বিদ্বেষ, বিশেষত বর্ণজাতিভেদবাদী চেতনার প্রভাবে মুসলমানদের দূরে ঠেলে দেওয়ার প্রবণতা, ইত্যাদি কারণে মুসলমানদের মধ্যেও হিন্দুদের সাথে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার মত পরিবেশ তৈরী হয় নাই। এমনকি যে সমস্ত হিন্দু শিক্ষিত ও আলোকিত হয়েছিল তারাও সব সময় এই সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত থাকতে পারে নাই।১
-------------------------------------
১ ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতাদের একজন মুজফ্ফর আহমদ লিখেছেন, ‘‘ব্যারিস্টার মিস্টার পি. মিত্র প্রভৃতির উদ্যোগে ‘অনুশীলন সমিতি’ নামে বিপ্লবী সংগঠন স্থাপিত হয়েছিল। এই সমিতি পরে খণ্ডিত হয়েছিল। অখণ্ডিত সমিতির একটা নিয়ম ছিল : “No one is to be admitted who is a non-Hindu or who has any spite against the Hindus.” (‘‘হিন্দু নয় কিংবা যার ভিতরে হিন্দুদের বিরুদ্ধে কোনো বিদ্বেষ আছে এমন কোনো ব্যক্তিকে [সমিতিতে] ভর্তি করা হবে না।”) দেখুনঃ মুজফ্ফর আহমদ, আমার জীবন ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি : ১৯২০-১৯২৯, খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানি, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ ১৯৭৭, তৃতীয় মুদ্রণ ২০১৩, পৃঃ ৪৬০।
-------------------------------------
বর্তমান পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে ১৯৩৭ খ্রীষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে মোল্লাদের দ্বারা মুসলিম লীগ গঠিত হয়। ব্রিটিশরা চেয়েছিল মুসলমানদের কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ভারতীয় রাজনীতিতে ব্যবহার করতে।১
-------------------------------------
১ এই বিষয়ে Facts are Facts: The Untold Story of India’s Partition গ্রন্থে ওয়ালী খানের বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি লিখেছেন, “The Indian experience taught the British that their purpose could only be fulfilled only if Islam was used to steer politics. The foundation of the Muslim League was laid in September 1937 at Abbottabad, by the Mullahs. The event was presided over by Maulana Shakirullah of Naushera, the President of Jamiat-ul-Ulema. He became the first President of the Muslim League. The Secretary was Maulana Mohammad Shuaib of Mardan, also the Secretary of the Jamiat-ul-Ulema.” দেখুনঃ প্রাগুক্ত, পৃঃ ৬০, ৬১।
-------------------------------------
রাষ্ট্র ক্ষমতা হারিয়ে একটা দীর্ঘ সময় হিন্দুদের তুলনায় মুসলমানরা প্রায় সবদিক থেকে পিছিয়েছিল। মুসলিম শাসনকালেও সেনা, প্রশাসনের উচ্চপদ ছাড়া আর কোনও সামাজিক ক্ষেত্রে মুসলমানদের দেখা পাওয়া কঠিন ছিল। কারণ তাদের মধ্যে শিক্ষা ছিল কম সংখ্যক মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এর খুব স্বাভাবিক ও সঙ্গত কারণ ছিল মধ্যপ্রাচ্য কিংবা মধ্যএশিয়া থেকে যেসব মুসলিম ভাগ্যান্বেষী উন্নত জীবন ও কর্মসংস্থানের আশায় ভারতে আসত তারা হত সাধারণত দরিদ্র ও নিরক্ষর। এইসব দরিদ্র ও নিরক্ষর ভাগ্যান্বেষীরা সেনাবাহিনী ছাড়া আর কোনও ক্ষেত্রে সেভাবে জায়গা পেত না। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে পিয়ন, চাপরাশির মতো পদগুলিতে তারা জায়গা পেত। অবশ্য রাষ্ট্র বহিরাগত মুসলিমদের দ্বারা গঠিত ও খুব বেশী যুদ্ধনির্ভর হওয়ায় বিশেষ করে বহিরাগত মুসলিম সামরিক কর্মকর্তারা রাষ্ট্রের উচ্চতর ও গুরুত্বপূর্ণ পদগুলিতে অধিষ্ঠান করত।
রাষ্ট্রভাষা তথা সরকারী কাজকর্মের ভাষা ছিল ফার্সী। শিক্ষানুরাগী উচ্চবর্ণের হিন্দুরা তা শিখে নিয়েছিল। ফলে যেসব সরকারী কাজে দলিলপত্রের ব্যবহার প্রয়োজন হত সেসব কাজে হিন্দুরা জায়গা করে নিত। স্বাভাবিকভাবে এর ফলে রাজস্ব বিভাগসহ রাষ্ট্রের বহুবিধ পদে হিন্দুদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। নওয়াবী আমলে এই বাস্তবতার বহিঃপ্রকাশ ঘটতে দেখা যায় রাজস্ব বিভাগে যেখানে দেওয়ান বা অর্থমন্ত্রীর পদ ব্যতিরেকে আর প্রায় সব পদে হিন্দুরা নিয়োগ পেত। মুসলিম রাষ্ট্র হওয়ায় প্রতীকী গুরুত্ব দিতে চেয়ে দেওয়ান পদে একজন মুসলমানকে নিয়োগ দেওয়া হত। তার নিম্নপর্যায়ের বাকীরা হত প্রায় সবাই হিন্দু।
অর্থাৎ সম্পূর্ণরূপে সামরিক রাষ্ট্রে উচ্চপদে আরোহণের প্রধান যোগ্যতা ছিল মুসলমান বিশেষত বহিরাগত মুসলমান হওয়া। রাষ্ট্রক্ষমতার অধিকারী মুসলমানরা পরিগণিত হত মুসলিম সমাজের আশরাফ বা অভিজাত হিসাবে।
অবশ্য মুসলিম সমাজে ইসলামী ধর্মীয় শিক্ষার বিশেষ গুরুত্ব ছিল। সুতরাং আরবী শিক্ষারও গুরুত্ব ছিল। বহু বিষয়ে ইসলামী বিধান মানা হত। বিশেষত বিচার বিভাগে ইসলামী বিধিবিধান বিশেষ গুরুত্ব বহন করত। এছাড়া ছিল নামায-রোযাসহ নিয়মিত ধর্মীয় অনুষ্ঠান। এসবের জন্য আরবী ভাষা শিক্ষা চর্চা করতে হত। সুতরাং মসজিদের ইমামসহ আরবী শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ মুসলিম সমাজে গুরুত্ব ও মর্যাদার অধিকারী হত। এরাও সমাজে আশরাফ বা অভিজাত শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হতে পারত। অবশ্য এ ধরনের শিক্ষার চর্চাও যে ব্যাপক বিস্তৃত ছিল তা নয়। সবচেয়ে বড় কথা ফার্সী বা আরবী যা-ই বলা যাক মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষার চর্চা এমনিতেই খুব কম ছিল। যেটা ঐতিহ্যিকভাবে হিন্দুদের মধ্যে যথেষ্ট পরিমাণে ছিল।
ফলে যখন রাষ্ট্র ক্ষমতায় পরিবর্তন এল এবং বিধর্মী ও বিজাতীয় ইংরেজরা রাষ্ট্র ক্ষমতা অধিকার করল তখন আগে থেকেই শিক্ষায় পিছিয়ে থাকা মুসলমানরা আরও পিছিয়ে গেল। এমনিতেই তারা ছিল শিক্ষার ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে থাকা; তার উপরে বিজাতীয় ও বিধর্মীদের ভাষা ইংরাজী শিক্ষার প্রতি তাদের যে অনীহা তা তাদেরকে আরও বহুগুণে পিছিয়ে দিল। আধুনিক সভ্যতার সঙ্গে ইংরাজী ভাষার যে সম্পর্ক তার গুরুত্ব ও তাৎপর্য বুঝতে তাদের অধিকাংশই অক্ষম হল। কিন্তু হিন্দুদের ক্ষেত্রে তেমনটা হল না। শাসকের শাসনকার্যের ভাষা ইংরাজীর গুরুত্ব বুঝতে তাদের সমস্যা হল না। অতীতে ফার্সী ছিল রাজভাষা, এখন সেটা হয়েছে ইংরাজী। এমনিতেই বিদ্যাশিক্ষায় অগ্রসর হিন্দুরা এখন নূতন শাসকদের ভাষা শিখে ব্রিটিশদের অধীনস্থ তথা একটু নীচের দিকের সরকারী সকল কাজকর্মে নিজেদের জায়গা করে নিল।
সুতরাং আগে থেকেই শিক্ষায় ও বাণিজ্যসহ সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকা মুসলমানরা রাষ্ট্রক্ষমতা হারিয়ে এবার সবদিক থেকেই হিন্দুদের থেকে পিছিয়ে পড়ল। এই অবস্থায় একটা পর্যায়ে ব্রিটিশরা হিন্দু-মুসলমানে বিভেদ ও দ্বন্দ্বের ব্যবহারকে তাদের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ রক্ষায় উপযোগী পন্থা হিসাবে গুরুত্ব দিল। ততদিনে মুসলমানদের উচ্চশ্রেণীর মধ্যেও যুগের ধারা মেনে নিয়ে ইংরাজী শিক্ষায় শিক্ষিত হবার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। আর এই শিক্ষা গ্রহণের মধ্য দিয়ে মুসলিম সমাজের মধ্যেও আধুনিক শিক্ষার আলোকপ্রাপ্ত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উত্থান ঘটতে থাকে। এরই পরিণতি হল বাংলা ও ভারতে মুসলিম সমাজের নেতৃত্বকারী শক্তি হিসাবে মুসলিম লীগের জন্ম ও উত্থান।
এটা নিশ্চয় তাৎপর্যপূর্ণ যে, মুসলিম লীগের জন্ম প্রক্রিয়ায় যাদেরই ভূমিকা থাকুক তার নেতৃত্ব গেল ইংরাজী শিক্ষায় শিক্ষিত বাংলা ও ভারতের নব উত্থিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর হাতে। এভাবে মুসলিম লীগের নেতৃত্বে এলেন পশ্চিম ও উত্তর ভারত থেকে জিন্নাহ্ এবং বাংলা থেকে সোহরাওয়ার্দী ও ফজলুল হকের মতো ব্যক্তিবর্গ।
বিশেষত বাংলার মুসলিম লীগ নেতৃত্বের চরিত্র ও ভূমিকা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা লাভের জন্য সংক্ষেপে হলেও ইংরেজসহ কিছু লেখকের মন্তব্য উল্লেখযোগ্য।
পাতা : ১৭
এক ঝলকে বাঙ্গালী মুসলিম নেতৃত্বের স্বরূপ দর্শন
ব্রিটিশ শাসনকালের বাংলায় মুসলিম নেতৃত্বে যে দুইজন ছিলেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার অধিকারী তারা হলেন সোহরাওয়ার্দী ও ফজলুল হক। দুইজনই অবিভক্ত বাংলা প্রদেশের প্রধান মন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছিলেন। তৎকালে বাংলার মুখ্যমন্ত্রীকে প্রধান মন্ত্রী বলা হত। ফজলুল হক প্রধান মন্ত্রী ছিলেন ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৩ খ্রীঃ এবং সোহরাওয়ার্দী ছিলেন ১৯৪৬ থেকে ১৯৪৭ খ্রীঃ পর্যন্ত। যাইহোক, সোহরাওয়ার্দী সম্পর্কে ফ্রিডম অ্যাট মিডনাইট গ্রন্থের লেখক যে মন্তব্য করেছেন তা প্রণীধানযোগ্য। তিনি লিখেছেন,১ “গান্ধীজী ধরেই নিয়েছিলেন যে স্বাধীনতা-উত্তর নবীন ভারতের প্রশাসন দখল করবে একদল দুর্নীতিপরায়ণ, ঘুষখোর মন্ত্রী। এদের কলুষ মলিন চেহারার যে ছবিটা তাঁর মনের মুকুরে ভাসতো তারই হবহু নকল হ’ল ৪৭ বছরের সুরাবর্দী। এই নীচ, লোভী অর্থবশ এবং হীনচরিত্রের মানুষটার একটাই রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল। যেন তেন প্রকারে নির্বাচনে জেতা এবং ক্ষমতা দখল করা। কারণ এদেশে একবার ক্ষমতা হাতে এলে চট করে তা হাতছাড়া হয় না। সুতরাং সর্বক্ষণ গদিতে থাকার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে গুণ্ডাবদমাশ পুষে সরকারী তহবিল থেকেই সে অর্থ ব্যয় করেছে যেন তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের মুখ বন্ধ করে রাখার এই দায় সরকারের।”
‘‘১৯৪২ সালে বাংলাদেশে যখন দুর্ভিক্ষ মহামারী শুরু হ’ল তখন অন্নহীন মানুষের জন্য পাঠানো হাজার হাজার মণ চাল কালোবাজারে বিক্রি করে কয়েক লাখ টাকা কামিয়ে নেয় লোকটা। তখন থেকেই রীতিমত ধনী ও বিলাসী হয়ে ওঠে সে। পোশাকে রুচিতে সে তখন সুবে বাংলার একমাত্র নবাব। দিনে দুবার ক্ষৌরি করা প্রতিবার বেরোবার আগে পোশাক বদলান ইত্যাদি বিলাসিতা করা তার নিত্যকর্ম হয়ে যায়। গান্ধীজী চারদশক ধরে আপ্রাণ চেষ্টা করে যখন যৌনবোধ নিঃশেষ করেছেন, তখন নির্বিচার নারীসঙ্গম করে একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে লোকটা। কলকাতার এমন কোন সুন্দরী বারবিলাসিনী ছিল না যার সঙ্গে সে যৌনাচার করে নি। গান্ধীজীর যেমন পানীয় ছিল লবণ আর সোডার জল, লোকটার হাতে তেমনি শোভা পেত ফিনফিনে কাঁচের গেলাসে সফেন মদিরা। গান্ধীজী খেতেন সয়াবিন সেদ্ধ আর দই। এটাই তাঁর নিত্য আহার্য। লোকটা খেত ঝাল মসলায় গরগরে মাংস আর মদ। ফলে বুক থেকে কোমর পর্যন্ত তার দেহকান্ডটা যেন মেদ ও চর্বির একটা পিন্ড হয়ে দাঁড়ায়।
“কিন্তু সবচেয়ে বীভৎস ছিল লোকটার খুনের নেশা। মানুষের রক্তে লাল হয়ে যায় লোকটার দুটো হাত তখন। জিন্না যখন আগস্ট মাসে ডাইরেক্ট এ্যাকশন ডে ঘোষণা করলেন, সুরাবর্দী তখন কৌশল করে দিনটাকে ছুটির দিন ঘোষণা করে এবং ঠারেঠোরে মুসলিম লীগ দলের সমর্থকদের জানিয়ে দেয় যে পুলিশবাহিনী অন্যত্র ব্যস্ত থাকবে। সেদিন এই সুযোগটা পেয়েই মুসলমানরা এই শহরের বুকে নির্বিচারে হিন্দু হত্যা করেছিল। ...”১
-------------------------------------
১ দেখুনঃ ল্যারি কলিন্স ও দোমিনিক লাপিয়ের (মূল), ফিডম অ্যাট মিডনাইট, অনুবাদ রবিশেখর সেনগুপ্ত, এম. সি. সরকার অ্যান্ড সন্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলিকাতা, প্রথম সংস্করণ ১৩৯৭ (বাংলা), পৃঃ ২৫৯, ২৬০।
-------------------------------------
ওয়াভেল যিনি ১৯৪৩ থেকে ফেব্রুয়ারী ১৯৪৭ পর্যন্ত ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় ছিলেন, সোহরাওয়ার্দী সম্পর্কে তার দিনলিপিতে যে মন্তব্য করেন, তা এখানে উল্লেখ করা যায়। তিনি লিখেছেন,১ “The chief (Commissioner of Police) points to my mind were Suhrwardy’s continual presence in the Control room on the first day with many Muslim League friends and his obvious communal bias; that the victims were almost entirely goondas and people of the poorest class; …” এছাড়াও চীফ সেক্রেটারী ওয়াকার ও তার সহকারী মার্টিনের মতামত সম্পর্কে দিনলিপিতে লিখেছেন যে, তারাও সোহরাওয়ার্দীর সাম্প্রদায়িক প্রবণতা সম্পর্কে ওয়াভেলকে জানিয়েছিলেন।
-------------------------------------
১ দেখুনঃ Penderel Moon (Ed.), Wavell: The Viceroy’s Journal, University Press Limited, First Bangladesh edition 1998, p. 339.
-------------------------------------
আগস্ট, ১৯৪২ খ্রীষ্টাব্দে বোম্বে শহরে সর্ব ভারতীয় কংগ্রেস কমিটি সভায় ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সূচনা করে। এরপর ব্রিটিশরা তাদের কার্যকরী কমিটির সকল সদস্যকে গ্রেফতার করে। তারা আন্দোলনকে ধ্বংস করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। গ্রামের উপর এবং মিছিলের উপর বিমান থেকে বোমা বর্ষণ করে।
ব্রিটিশরা কংগ্রেসের এই ব্রিটিশ বিরোধী নীতির ফলে মুসলিম লীগ ও মোল্লাদের কংগ্রেসের বিরুদ্ধে দাঁড় করাবার উদ্যোগ নেয়। উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের তৎকালীন গভর্নর জর্জ কানিংহামের ডায়েরী থেকে জানা যায় যে, কীভাবে সেখানকার মুসলমান ধর্মীয় মোল্লাদের টাকার বিনিময়ে কংগ্রেস ও রাশিয়ার কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে কাজে লাগায়।১ ব্রিটিশদের ভয় ছিল যে, সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানকে অধিকার করে ফেলবে। ফলে তারা আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশকে এই কাজে বেছে নেয়।
-------------------------------------
১ ওয়ালী খানের Facts are Facts : The Untold Story of India’s Partition গ্রন্থে এর বিস্তারিত বিবরণ আছে। দেখুনঃ প্রাগুক্ত, পৃঃ ৬১-৭০।
-------------------------------------
১৯৪৬ খ্রীষ্টাব্দে ফেব্রুয়ারী মাসে প্রাদেশিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কংগ্রেস তাৎপর্যপূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।
বাঙ্গালী মুসলমানের অস্থিতিশীল চরিত্রের সবচেয়ে ভাল প্রতিনিধি ছিলেন সম্ভবত এ,কে, ফজলুল হক। তার সম্পর্কে জিন্নাহর ব্যক্তিগত প্রতিনিধি এম,এ, এইচ, ইস্পাহানীর মূল্যায়ন উল্লেখ করা যায়। তিনি লিখেছেন, “I shall confine myself to a few remarks and recapitulation of a few facts concerning Mr. A. K. Fazlul Haq, the dynamic and unpredictable Muslim figure of Bengal. While I do so, I must in fairness to him state that Mr. Fazlul Haq, in spite of his frailties and inconsistencies, was very tender-hearted. He was always ready to help the poor, especially the needy stu”ents’ He would, at times, help them by borrowing money. Personally, he was very considerate to me. Suffice it to say that he was a troublesome factor and was, consciously or otherwise, queering the pitch of the Muslim League most of the time. In dealing with him, one did not know where he stood. He arrogated to himself the privilege of changing his mind ten times in as many hours. Consistency was not his forte. He could be easily influenced by friends and relations.”১
-------------------------------------
১ দেখুনঃ M.A.H. Ispahani, Qaid-E-Azam Jinnah as I Knew Him, 1967, p. 147.
-------------------------------------
পাতা : ১৮
ফজলুল হক সম্পর্কে ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় ওয়াভেল লিখেছেন, “Fazlul Huq, the most notorious crook of Bengal; …”|১
-------------------------------------
১ দেখুনঃ Penderel Moon (Ed.), Wavell: The Viceroy’s Journal, University Press Limited, First Bangladesh edition 1998, p. 337.
-------------------------------------
পেণ্ডেরাল মুন ছিলেন একজন আইসিএস ও ব্রিটিশ সরকারের আমলা। ভারত ভাগের সময়কার ঘটনাবলির যে বিবরণ তিনি দিয়েছেন তা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৬১ খ্রীষ্টাব্দে প্রকাশিত তার বই Divide and Quit থেকে সেই সময়ে ভারতবর্ষে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ পাওয়া যায়।১
-------------------------------------
১ তিনি লিখেছেন “During the first half of August ripples from disturbances elsewhere began to reach Bahawalpur. Quite suddenly, without notice or warning, 200—300 refugees arrived by train from Alwar and Bharatpur- two small States south of Delhi – and deposited themselves on a bit of open ground outside the city. They claimed that they had been forcibly driven from their homes, but there was no evidence of this and it appeared that they had been impelled to leave more by fear of what might happened than by anything that had actually taken place. Their arrival caused a mild stir in Bahawalpur city and various Muslim organizations began to busy themselves with their relief and to urge the Bahawalpur Government to make lavish arrangements for their further entertainment. We were not at all inclined to assume any responsibility for these uninvited guests; … …” দেখুনঃ Penderel Moon, Divide and Quit, Chatto & Windus, London, (No date), p.110.
-------------------------------------
বাংলায় স্বাধীন নেতৃত্ব গঠনে হিন্দু বাঙ্গালীর ব্যর্থতা
আমরা দেখেছি যে, খ্রীষ্টীয় সপ্তদশ শতকের শেষার্ধ ও অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধ — এই একশ বৎসর ছিল বাংলার ইতিহাসে এক অত্যুজ্জ্বল অধ্যায়। এই সময়ে বাংলার শিল্প অসাধারণ উন্নতি করে। এই শিল্পের উৎপাদিত পণ্য ইউরোপের বাজারে যেত বলে বিভিন্ন ইউরোপীয় বণিক ও বাণিজ্যিক সংস্থা এখানে বিপুল পুঁজি বিনিয়োগ করে। শুধু শিল্প নয়, কৃষিতেও বাংলা তখন যে উন্নতি করে তার তুলনা নাই। এই বাণিজ্যিক ক্রিয়াকাণ্ডের ফলে এখানে একটি শক্তিশালী বাণিজ্যিক পুঁজিপতি শ্রেণী তৈরী হয়। এই একশ বৎসর ছিল মোগল ও নবাবী আমল, অর্থাৎ দিল্লীতে আওরঙ্গজেবের শাসন আমল থেকে বাংলার আধা স্বাধীন আলীবর্দী-সিরাজদ্দৌলার নবাবী আমল পর্যন্ত। কিন্তু এটি তাৎপর্যপূর্ণ যে, এই সময় যে একটি শক্তিশালী ধনিক শ্রেণী তৈরী হয় তাদের প্রায় সকলেই ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের।১ ধারণা করা যায় দীর্ঘকাল এই বিপুল সমৃদ্ধির ফলে বাংলায় আত্মবিশ্বাসী ও উদ্যমী এক শক্তিমান শ্রেণী গড়ে উঠে।
-------------------------------------
১ দেখুন : সিরাজুল ইসলাম, বাংলার ইতিহাস : ঔপনিবেশিক শাসনকাঠামো, পৃঃ ১৪, ১৫।
-------------------------------------
কিন্তু এই শ্রেণীর হিন্দু নেতৃত্ব যারা সিরাজদ্দৌলার পতনে ভূমিকা রেখেছিল তারাও ক্রমশ ব্রিটিশদের কাছে গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। ফলে এক সময়ে এই পুরাতন অভিজাত ও ধনিক শ্রেণীর পতন ঘটে। ব্রিটিশরা পরিকল্পিতভাবে তাদের নূতন দালাল, মুৎসুদ্দী ও আমলা শ্রেণী গড়ে তুলল তাদের নূতন রাজধানী কলকাতাকে কেন্দ্র করে।
এটি খুব তাৎপর্যপূর্ণ যে, কৃত্রিমভাবে ব্রিটিশদের দ্বারা ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১৭৬৯-৭০ খ্রীষ্টাব্দ)-এর মত দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে বাংলার শিল্পের কারিগরসহ প্রায় এক কোটি মানুষ হত্যা করার পরেও এবং তারপর ধারাবাহিকভাবে এখানকার শিল্প, কৃষি ও বাণিজ্যকে ধ্বংস করার পরেও বাঙ্গালীর ভিতর যে শক্তি জন্ম নিয়েছিল তা পুরাপুরি ধ্বংস করা যায় নাই। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে সকল সীমাবদ্ধতা সত্তেও রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসুদন দত্ত, প্রভৃতি বাংলার দিকপালদের তখন উত্থান পর্ব চলছিল। এছাড়া সরকারী পৃষ্টপোষকতা ছাড়াই ১৮১৭ খ্রীষ্টাব্দে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল। এছাড়া ১৮২৪ খ্রীষ্টাব্দে সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠা আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল। কিন্তু এইগুলি প্রতিষ্ঠার পিছনে স্বাধীন শ্রেণী হিসাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা ছিল না, ছিল ইংরাজী শিখে ব্রিটিশদের সেবা করা ও নিজেদের আর্থিক প্রতিষ্ঠা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা।
এই বিষয়ে বিনয় ঘেষের মন্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলছেন,১ “ঊনিশ শতকের প্রথম পর্বে, বাঙালী বুদ্ধিজীবীর বিকাশ আরম্ভ হয়েছিল দুটি স্বতন্ত্র ও সুস্পষ্ট ধারায় – একটি ধারা দেশীয় ঐতিহ্যের, আর একটি ধারা পাশ্চাত্ত্য আদর্শের অনুগামী। ১৮১৭ সালে হিন্দু কলেজ এবং ১৮২৪ সালে সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠার পর এই দুই বুদ্ধিজীবীগোষ্ঠীর আরও দ্রুত বিকাশ হতে থাকে, এবং তাদের সামাজিক রূপটিও স্পষ্টতর হয়ে ওঠে। ইংরেজরা তখনও প্রকাশ্যে পাশ্চাত্যবিদ্যা বা ইংরেজিবিদ্যাকে তাদের শিক্ষানীতি হিসাবে ঘোষণা করতে পারেনি। দেশীয় ঐতিহ্য ও প্রথাকে, নিজেদের শাসনস্বার্থেই, তাঁরা হঠাৎ আঘাত করতে দ্বিধাবোধ করছিলেন। তাঁদের সিদ্ধান্তের অনেক আগেই এদেশের নূতন উচ্চশ্রেণীর লোকেরাই ইংরেজি শিক্ষার তৎকালিক শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান হিন্দু কলেজ স্থাপনের পরিকল্পনা করেছিলেন। তাঁরা সকলেই নূতন উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোক, এবং ইংরেজদের তুলনায় ইংরেজি শিক্ষার প্রতি এঁদের অনেক বেশি আগ্রহ ছিল। সেই আগ্রহের বশে, সরকারী পোষকতার মুখাপেক্ষী না হয়েই, তাঁরা হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আগ্রহের মূলে পাশ্চাত্য জীবনাদর্শের প্রেরণা বিশেষ ছিল বলে মনে হয় না, তার চেয়ে অনেক বেশি প্রখর ছিল তাঁদের সজাগ বাস্তববুদ্ধি। নূতন সমাজে সচল বিত্ত যেমন মূলধন হতে পারে, তেমনই ইংরেজিবিদ্যাও যে নবযুগের অর্থনৈতিক মূলধনের পরিপূরক হতে পারে, এ সত্য তাঁরা শ্রেণীগত চেতনা থেকেই অনেক আগে উপলব্ধি করেছিলেন। বর্ধমানের মহারাজা, শোভাবাজারের রাজপরিবারের গোপীমোহন দেব ও রাধাকান্ত দেব, ধনশালী রক্ষণশীল রাধামাধব অথবা রামকমল সেন ও রসময় দত্ত, এঁরা কেউ-ই নবযুগের হিউম্যানিস্ট আদর্শের সমর্থক ছিলেন না এবং তা উপলব্ধি করার মতো মানসিক গড়নও তাঁদের ছিল না। নূতন রাজার আমলে রাজবিদ্যাশিক্ষার আবশ্যকতা তাঁরা বণিকসুলভ স্বার্থবুদ্ধি থেকেই উপলব্ধি করেছিলেন।”
-------------------------------------
১ দেখুন : বিনয় ঘোষ, বাংলার বিদ্বৎসমাজ, প্রকাশ ভবন, কলকাতা, প্রথম সংস্করণ ১৯৭৩, ষষ্ঠ সংস্করণ ২০১২, পৃঃ ১৪৫, ১৪৬।
-------------------------------------
পাতা : ১৯
স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার অভাবের কারণে বাঙ্গালী হিন্দু নেতৃত্ব বাংলায় নবাবী আমলের শেষ পর্যায়ে তার দুর্বলতার সুযোগ নিতে ব্যর্থ হয়। ফলে তারা নওয়াবের প্রধান সেনাপতি মীর জাফরের হাত ধরে প্রভু পরিবর্তনের পথ বেছে নিল। এই কর্মধারার পরিণতি হল বহিরাগত মুসলিশ শাসনের পরিবর্তে বহিরাগত ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠা। এই ভুলের মূল্য হিন্দু বাঙ্গালীকে দিতে হয়েছে যুগ যুগ ধরে, এবং আজ অবধি সেই মূল্য দিতে হচ্ছে।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে ‘ইয়ং বেঙ্গল’ ও বিভিন্ন সভা-সমিতির মাধ্যমে বাংলায় যে সমস্ত মুক্তচিন্তার আন্দোলন হয় সেগুলি সবই ছিল পরাধীন ও রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্নে ব্যর্থ মানুষদের আন্দোলন। ফলে এইসব আন্দোলন স্বাধীন পথের কোনো দিশা দিতে পারে নাই। এই সীমাবদ্ধতা থেকে প্রথম যুগের ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মত বড় শিক্ষাবিদ ও সমাজসংস্কারকও মুক্ত ছিলেন না। তিনি চাইতেন শিক্ষাকে সমাজের উঁচু শ্রেণীগুলির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে।১ শুধু তাই নয় তিনি স্বাধীনভাবে বাঙ্গালীর নূতন নেতৃত্ব গড়ে তুলবার ব্যাপারে অনাগ্রহী ছিলেন। যখন ভাষা শিক্ষার প্রশ্ন আসল তখন তিনি হিন্দু কলেজে সংস্কৃত শিক্ষা চালু করার বিরোধিতা করলেন। অর্থাৎ ইংরাজির পাশাপাশি সংস্কৃতের মাধ্যমে এখানে এদেশীয় কোনো স্বাধীন শ্রেণী গড়ে উঠুক তা তিনি চান নাই।
-------------------------------------
১ ১৮৫৯ খ্রীষ্টাব্দে বাংলা সরকারের কাছে ঈশ্বরচন্দ্র লিখলেন, “আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে মনে হয় বাংলাদেশে শিক্ষাবিস্তারের সর্বোত্তম – এবং হয়ত একমাত্র – উপায় হিসাবে সরকারের উচিত উচ্চতর শ্রেণীগুলির মধ্যে ব্যাপক শিক্ষাপ্রসার করেই ক্ষান্ত থাকা।” দেখুন : বিনয় ঘোষ, বাংলার বিদ্বৎসমাজ, পৃঃ ২০৪।
-------------------------------------
বিশেষত বিদ্যাসাগরের এই মন্তব্য “বাংলাদেশে শিক্ষাবিস্তারের সর্বোত্তম – এবং হয়ত একমাত্র – উপায় হিসাবে সরকারের উচিত উচ্চতর শ্রেণীগুলির মধ্যে ব্যাপক শিক্ষাপ্রসার করেই ক্ষান্ত থাকা” ছিল নব্য ও উদীয়মান বাঙ্গালী মধ্যবিত্তের এক শ্রেষ্ঠ প্রাণপুরুষের শ্রেণী হিসাবে আত্মঘাতী চেতনার বহিঃপ্রকাশ। এটা ছিল প্রকৃতপক্ষে একটা স্বাধীন ও উন্নত বাঙ্গালী কিংবা ভারতীয় জাতি গঠনের দায়িত্বকে বিরোধিতার চেতনা সম্ভূত। অর্থাৎ তার শিক্ষা বিস্তারের মর্মে ছিল ইংরেজের অধীনস্থ একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর মধ্যে পাশ্চাত্য জ্ঞানকে সীমাবদ্ধ রেখে তাকে বাংলা কিংবা ভারতের সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে রাখবার আকাঙ্ক্ষা। বর্ণজাতির বিচারে বিদ্যাসাগর ব্রাহ্মণ হলেও তিনি কিন্তু সংকীর্ণ কোনও ধর্মবিশ্বাসী ব্যক্তি ছিলেন না। এমনকি ধর্মে তার কতটা বিশ্বাস ছিল সেই প্রশ্নও করা চলে।
প্রশ্ন করা সঙ্গত যে, এমন এক যুগমনস্ক ব্যক্তি কেন এমন সংকীর্ণতার গণ্ডীতে আবদ্ধ ছিলেন যে, তিনি আধুনিক শিক্ষাকে উচ্চতর শ্রেণীগুলির বাইরে নেওয়ার বিরুদ্ধে ছিলেন? ঊনবিংশ শতাব্দীর বাঙ্গালীর জাগরণের এক শ্রেষ্ঠ পুরুষের এই বক্তব্য থেকে একটা সমাজের বাস্তবতার অনেক কিছুই বেরিয়ে আসে। বুঝা যায়, বিদ্যাসাগর যে হিন্দু বাঙ্গালী সমাজ ও তার নেতৃত্বকারী ও উদীয়মান মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ভিত্তি থেকে উঠে এসেছেন এটা সেই সমাজ ও শ্রেণীর অন্তর্গত দুর্বলতা ও দেউলিয়াত্বের অভিব্যক্তি।
এই রকম এক দেউলিয়া নেতৃত্বের পূর্ববর্তী শ্রেণী নওয়াবী আমলে নিজেরা বহিরাগত মুসলিম শাসন উচ্ছেদ করে স্বাধীন হতে চায় নাই। বরং নওয়াব সিরাজউদ্দৌলার শাসন উচ্ছেদ করে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংগঠিত মীর জাফরের ষড়যন্ত্রের অংশীদার হয়েছিল। অর্থাৎ এ হল প্রভু পরিবর্তন করা। একদল বহিরাগত মুসলিম শাসকের পরিবর্তে অপর একদল বহিরাগত ইংরেজ শাসকের শাসনকে বরণ করতে চাওয়া। এরা হল মর্মগতভাবে জাত-চাকর বা জন্মদাস।
এই জন্মদাসদের উত্তরাধিকারী হলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর তথাকথিত নবজাগরণের কালের বাংলার ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রামমোহন রায়ের মতো দিকপালরা। ইংরেজ শাসনকালে বাঙ্গালীর যেটুকু উত্থান হয়েছিল তাতে তাদের বিরাট ভূমিকাকে স্বীকার করে নিয়েই আমাদের এই সত্যকে উপলব্ধি করতে হবে যে, এরা কেউই স্বাধীনতার মর্মবাণীকে যথাযথভাবে ধারণ করতে পারেন নাই। তারা ইউরোপের যত উন্নত চেতনাকে গ্রহণ করুন সেটা করেছিলেন অধীনস্থ দাসের মানসিকতা থেকে, বিদেশী প্রভুর প্রতি অন্ধ ভক্তি থেকে। মন ও মননে যারা পরাধীন তাদের কাছ থেকে জাতি কী পেতে পারে?
আসলে এটা হিন্দু বাঙ্গালী সমাজের ব্যর্থতা। এর পিছনে যত ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিক কারণ থাকুক না কেন প্রথমেই আমাদের এই ব্যর্থতাকে স্বীকার করে নিতে হবে। অথচ এমন নয় যে, মধ্যযুগে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর বাংলায় হিন্দু সমাজের জাগরণ কিংবা সংস্কারের জন্য আন্দোলন হয় নাই। এ প্রসঙ্গে ষোড়শ শতাব্দীতে চৈতন্য দেবের বৈষ্ণব আন্দোলনের কথা বলা যায়। আসলে ঐ কালে ভারতের বিভিন্ন স্থানে ইসলামকে প্রতিহত করার জন্য ভক্তি আন্দোলন হিসাবে হিন্দুদের মধ্যে বিভিন্ন ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন বিস্তার লাভ করেছিল। এই সব আন্দোলনের পরিণামে বহিরাগত ইসলামী আগ্রাসন ও শাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক আন্দোলন ও সশস্ত্র সংগ্রাম গড়ে উঠে। ধর্ম সংস্কারক হিসাবে কবীর, তুকারাম, চৈতন্য, নানক এমন কয়েকটি নাম, সেকালে যাদের প্রভাব জনমনে ছিল প্রবল।
এই ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনের প্রভাবে মহারাষ্ট্রে যেমন শিবাজীর নেতৃত্বে মারাঠা রাষ্ট্রের উত্থান ঘটে তেমন পাঞ্জাবে ঘটে নানকের নেতৃত্বে প্রথমে শিখ ধর্মের উত্থান এবং অতঃপর শিখ রাষ্ট্রের উত্থান। কিন্তু এমন কোনও রাজনৈতিক শক্তির উত্থান বাংলায় ঘটে নাই। এখানে চৈতন্যের ধর্মসংস্কার আন্দোলন কিংবা বাউল জাতীয় অন্য কোনও সামাজিক আন্দোলনও এমন কোনও সামাজিক গতি ও শক্তি লাভ করে নাই যা একটা প্রবল রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটাতে পারে। অর্থাৎ সে কালে হিন্দু ধর্মের গোঁড়ামির বিরুদ্ধে উদার ধর্মীয় চিন্তা সমাজকে যতই প্রভাবিত করুক স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের চিন্তা বাংলার সমাজকে অনুপ্রাণিত করতে পারে নাই।
বিশেষত যখন সমগ্র ভারতব্যাপী মোগল সাম্রাজ্য ভেঙ্গে পড়ছে এবং বাংলায় মোগলদের অধীনস্থ নওয়াবী শাসনও দুর্বল ও ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়ছে সেটা ছিল হিন্দু তথা দেশজ জনগণের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিবার এক শ্রেষ্ঠ সময়। কিন্তু চিন্তা থাকলে তবে না উদ্যোগ নিবে! চিন্তাই যেখানে নাই সেখানে উদ্যোগ আসবে কোথা থেকে? অথচ এটা ছিল সব বিচারেই বাংলায় বাঙ্গালীর রাষ্ট্র গঠনের এক শ্রেষ্ঠ সময়।
প্রথমত, তখনও মুসলিমরা বাংলায় ছিল অত্যন্ত সংখ্যালঘু একটা জনগোষ্ঠী।১ ১৮৭২ সালে ব্রিটিশ শাসকরা প্রথম যে লোকগণনা করেছিল তখনও মুসলিমরা বাংলায় সংখ্যালঘু ও হিন্দুরা সংখ্যাগুরু ছিল। কিন্তু পরবর্তী লোকগণনাগুলিতে হিন্দু-মুসলিম সংখ্যানুপাতের এই হার বদলে যেতে থাকে। ১৮৭১ থেকে ১৯৪১ পর্যন্ত বাংলায় হিন্দু ও মুসলমানের জনসংখ্যার হিসাব নীচে দেওয়া হল২:
|
সম্প্রদায় |
১৮৭১ |
১৮৮১ |
১৮৯১ |
১৯০১ |
১৯১১ |
১৯২১ |
১৯৩১ |
১৯৪১ |
|
বাংলার হিন্দু (সংখ্যা, মিলিয়নে) |
১৮.১ |
১৭.২৫ |
১৮.০৬ |
১৯.৮১ |
২০.৫৭ |
২০.৪১ |
২১.৭৯ |
২৫.৩১ |
|
বাংলার মুসলমান (সংখ্যা, মিলিয়নে) |
১৭.৬ |
১৭.৮৬ |
১৯.৫৮ |
২১.৫৭ |
২৩.৮১ |
২৫.০০ |
২৭.২৮ |
৩২.৭৪ |
-------------------------------------
১ এমন কি ১৭৬৯ খ্রীষ্টাব্দে যে বাংলায় মহা দুর্ভিক্ষ হয় তাতে কারিগরদের প্রায় অর্ধেক মারা যায়। যেহেতু কারিগরদের প্রায় সবাই হিন্দু ছিল, সুতরাং এর ফলে ব্যপক হিন্দু জনগোষ্ঠী মারা যাওয়ায় বাংলার জনমিতিতে স্বাভাবিকভাবে হিন্দু-মুসলমান জনসংখ্যার অনুপাতে পার্থক্য কমে গিয়েছিল। বাংলার নদী বিধৌত পূর্বাঞ্চলে এই দুর্ভিক্ষের তেমন প্রভাব না পড়ায়, এখানকার জনগোষ্ঠী যাদের অনেকেই মুসলমান ছিল তাদের জনসংখ্যা সেভা্বে কমে নাই। তারপরেও সেই সময় সমগ্র বাংলায় মুসলমান জনগোষ্ঠী যে অনেক কম ছিল তা বুঝা যায় কিছু পরে ব্রিটিশদের বিভিন্ন বিবরণ থেকে। ১৮২০ খ্রীষ্টাব্দে ওয়াল্টার হ্যামিল্টন ব্রিটেনে জর্জ ক্যানিং-কে যে বিবরণ দেন তাতে তিনি বাংলায় মুসলামানদের গড় সংখ্যা সমগ্র জনসংখ্যার এক সপ্তমাংশ হতে পারে বলে উল্লেখ করেছেন। দেখুনঃ Walter Hamilton, A Geographical, Statistical, and Historical Description of Hindostan, and the Adjacent Countries, Volume I, John Murray, Albemarle Street, London, 1820, p. 108.
২ দেখুনঃ আকবর আলি খান, বাংলায় ইসলাম প্রচারে সাফল্যঃ একটি ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা, ২০১৯, পৃঃ ৩০।
-------------------------------------
পাতা : ২০
এখানে আমাদের মূল বক্তব্য এই যে, মুসলিম শাসনকালে বাংলায় বহিরাগত ও ধর্মান্তরিতসহ সব মিলিয়ে মুসলিম জনসংখ্যা ছিল অত্যল্প। সেটা মোগল যুগে বার্নিয়েরের বিবরণ থেকে যেমন ধারণা করা যায় তেমন ব্রিটিশ শাসন কালের সামাজিক চিত্র থেকেও ধারণা করা যায়। মুসলিমরা ছিল শুধু যে সংখ্যাল্প তা-ই নয়, উপরন্তু রাষ্ট্রশাসনের বাইরে খুব সংখ্যাল্প। ব্যবসা-বাণিজ্যে হিন্দুদের ছিল নিরঙ্কুশ প্রাধান্য। কুটীর শিল্পের বিভিন্ন ক্ষেত্রেও হিন্দুদের প্রাধান্য ছিল খুব বেশী। বস্তুত রাষ্ট্রের উপর তলার কিছু ক্ষেত্র বাদে মুসলিমদের তেমন অবস্থান ছিল না। তবে এরা ছিল বহিরাগত কিংবা তাদের বংশধর, যাদের অধিকাংশই আবার দেশজ ধর্মান্তরিত নারীদের গর্ভজাত। অবশ্য রাজস্ব বিভাগে যেমন তেমন তার উপর তলাতেও হিন্দুদের প্রাধান্য ছিল। এ বিষয়ে আমরা ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি।
বাংলার দেশজ তথা ধর্মান্তরিত মুসলিমরা ছিল মূলত নদীভাঙ্গা ও চরাঞ্চলের মানুষ, ব্রিটিশ শাসনপূর্ব কালে যারা ছিল খুব সংখ্যাল্প। এবং এরা ছিল অনেকটাই সভ্যতা বহির্ভূত জীবনের অধিকারী। নদীর অবিরাম ভাঙ্গন ও চর গঠন ও ভাঙ্গনের প্রক্রিয়ায় তাদের জীবন ছিল অস্থিতিশীল।
সব মিলে যেটা দাঁড়াচ্ছে সেটা হল এই যে, প্রাক-ব্রিটিশ কালে হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং সমাজ ও এমনকি রাষ্ট্রেরও বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রাধান্যশীল হলেও তাদের মধ্যে রাষ্ট্র গঠন বা প্রতিষ্ঠার চিন্তা ছিল না। রাজনীতিতে তাদের চিন্তা বড় জোর প্রভু পরিবর্তন পর্যন্ত ছিল। সুতরাং তারা সিরাজউদ্দৌলা নেতৃত্বাধীন বহিরাগত মুসলিম শাসনের পরিবর্তে মীর জাফরের অনুগত হয়ে ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠাকামী হল। অবশ্য সে কাজের ভারটাও তারা ছেড়ে দিল মীর জাফর নেতৃত্বাধীন বহিরাগত মুসলিম শাসকদেরই অপর অংশের হাতে। অর্থাৎ বাংলার হিন্দু সমাজ সেকালে ছিল যথেষ্ট পরিমাণে নির্বিবাদী বা শান্তিপ্রিয় এবং শক্তিমানের প্রতি আনুগত্যপরায়ণ।
এই সমাজের তৎকালীন নেতৃত্বে ছিলেন জগৎ শেঠ, রাজবল্লভ, রায়দুর্লভ, উমিচাঁদ ও নন্দকুমারের মতো ব্যক্তিবর্গ। জগৎ শেঠ ছিলেন সেকালের বাংলার এমন এক ধনশালী ব্যক্তি যার হাতে ছিল নওয়াবের টাকশালের দায়িত্ব। নওয়াবী শাসনের অবসান হলেও পুরাতন শাসন ও আধিপত্যকারী শ্রেণীগুলির লাভ হল না। ইংরেজরা ক্ষমতা দখল করে প্রতিষ্ঠিত মুসলিম শাসক শ্রেণীকে যেমন ধ্বংস করল তেমন মুসলিমদের অধীনস্থ হলেও প্রতিষ্ঠিত হিন্দু শ্রেণীকেও ধ্বংস করল। সুতরাং কিছুদিনের মধ্যে ইংরেজদের অধীনস্থ মীর জাফরের নওয়াবী যেমন গেল তেমন জগৎ শেঠ-রাজদুর্লভ ইত্যাদির নামনিশানাও অল্পদিনের ভিতর মুছে গেল।
আসলে মুসলমান ও হিন্দু নির্বিশেষে পুরাতন ও প্রতিষ্ঠিত শাসক শ্রেণীগুলিকে ইংরেজরা ধ্বংস ক’রে এ দেশে তাদের সম্পূর্ণ অধীনস্থ সমাজ ও তার নেতৃত্ব গঠনের কাজে হাত দিল। এই কাজ করতে গিয়ে তারা বাংলার সমাজ ও অর্থনীতিকে লণ্ডভণ্ড করে দিল। এর ফলে ১৭৬৯-’৭০-এর মহাদুর্ভিক্ষে বাংলার একতৃতীয়াংশ মানুষের মৃত্যু হল। এই মৃত্যুর সংখ্যা ছিল এক কোটি।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে রাজা রামমোহন রায় কিংবা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতো ব্যক্তিদের নেতৃত্বে বাঙ্গালীর যে উত্থান আমরা দেখতে পাই তার পিছনের এই ধ্বংসযজ্ঞের ইতিহাসকে যেন আমরা ভুলে না যাই এবং সেই সঙ্গে ভুলে না যাই এই ধ্বংসাত্মক উপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রতি অনুগত এবং তাদের আশ্রয়ে ও প্রশ্রয়ে বাঙ্গালী মধ্যবিত্ত হিসাবে পরিচিত এই শ্রেণীর গড়ে উঠবার বাস্তবতাকে। ইংরেজ শাসন প্রবর্তনের পর বাংলায় মূলত হিন্দুদের নিয়ে গঠিত এই শ্রেণী বাঙ্গালী মধ্যবিত্ত হিসাবে আমাদের নিকট পরিচিত। এদের কেন্দ্র হল উপনিবেশিক শাসন কেন্দ্র কলকাতা।
উপনিবেশিক শাসনের অধীনে জন্মপ্রাপ্ত এই বাঙ্গালী মধ্যবিত্ত তার অন্তর্গত দুর্বলতা সমগ্র ব্রিটিশ শাসনকাল ধরে বয়ে নিয়ে চলল। এটা ঠিক যে, উপনিবেশিক শাসনের শেষ পর্যায়ে বাঙ্গালী হিন্দুদের মধ্য থেকে স্বাধীনতার জন্য একটা জাগরণ দেখা গেল। ক্ষুদিরাম, বাঘা যতীন, সূর্য সেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের মত বহু সংখ্যক বাঙ্গালী মুক্তিযোদ্ধা স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করতে গিয়ে প্রাণ দিলেন। কিন্তু সেসব প্রয়াস সমগ্র সমাজদেহকে সেভাবে নাড়া দিল না। এই মুক্তিযোদ্ধাদের শেষ ও শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি হিসাবে চল্লিশের দশকে সুভাষচন্দ্র বসু আবির্ভূত হলেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ে তিনি জাপানের সাহায্য নিয়ে আজাদ হিন্দ্ ফৌজ গঠন করে ভারতের বাইরে থেকে ভারতের স্বাধীনতা যুদ্ধ সংগঠিত করলেন। কিন্তু আজাদ হিন্দ্ ফৌজের ভারতের ভিতরে প্রবেশের পূর্বে ১৯৪৫ খ্রীষ্টাব্দে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে জার্মানী ও জাপানের পরাজয়ের সঙ্গে তার নেতৃত্বাধীন স্বাধীনতা যুদ্ধের অবসান হল এবং এক রহস্যজনক বিমান দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হল।
সুভাষ বসুর মৃত্যু হলেও তার আত্মদান বৃথা গেল না। মহাযুদ্ধ শেষ হলে ভারতে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি সৃষ্টি হল। ১৯৪৬ সালে মুম্বাইতে ভারতীয় নৌবাহিনীর সৈনিকরা বিদ্রোহ করল। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইংরেজরা ক্ষমতা হস্তান্তর করে দ্রুত ভারত ছেড়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিল এবং মুসলিম লীগের দাবী অনুযায়ী ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান এই দুই রাষ্ট্রে ভারতকে ভাগ করে চলে গেল।
এই বিভাজন অনুযায়ী ধর্মের ভিত্তিতে শুধু ভারত নয়, বাংলাও দ্বিধাবিভক্ত হল। এই বিভক্তির সঙ্গে পাকিস্তানে তো বটেই ভারতেও হিন্দু বাঙ্গালীর নেতৃত্বমূলক ভূমিকা রাখবার সুযোগ শেষ হল। বস্তুত সুভাষ বসুই ছিলেন হিন্দু সম্প্রদায়ের ভিতর থেকে উদ্ভূত শুধু বাঙ্গালী জাতির নয়, অধিকন্তু সমগ্র ভারতীয় জনসমাজেরও শেষ এবং শ্রেষ্ঠ বিপ্লবী নেতা। তার অকাল মৃত্যু থেকে অনেক কিছু বুঝবার আছে। সেকালে সামগ্রিকভাবে ভারতীয়রা যে যুদ্ধের জন্য সেভাবে প্রস্তুত ছিল না সেটা তার সেনাবাহিনী আজাদ হিন্দ্ ফৌজের দ্রুত ভারতে প্রবেশের অক্ষমতা থেকেও বুঝা যায়।
আসলে ধর্মভিত্তিক পরিচয় নিয়ে তখন ভারতবাসী গভীরভাবে বিভক্ত। ভারতব্যাপী সংখ্যাগুরু সম্প্রদায় হিসাবে হিন্দুদের ভিতর স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা বিস্তৃত হলেও মুসলিমদের মধ্যে তখন মুসলিম পরিচয় ভিত্তিক স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবী প্রবল রূপ নিয়েছিল। মুসলিম নেতৃত্বের বেশীর ভাগই ভারতের স্বাধীনতা নিয়ে মাথা ঘামাতে রাজী ছিল না। তাদের দাবী তখন মুসলমানদের রাষ্ট্র হিসাবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা। হিন্দুদের মধ্যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা বিস্তৃত হলেও সামরিক চেতনার মাত্রাতিরিক্ত ঘাটতি ও পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতা, যেটা তাদের ভিতরে ঐতিহাসিকভাবেই ক্রিয়াশীল ছিল, সেটা ছিল ভারতব্যাপী স্বাধীনতা যুদ্ধ গড়ে তুলবার ক্ষেত্রে বাধা। হিন্দু ধর্ম ও সমাজের ভিতরে অবস্থিত এই অসামরিক প্রবণতা ও বিশেষত বর্ণজাতিভেদভিত্তিক পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতার কারণে সুদীর্ঘ কাল ভারতীয় সমাজ বিদেশী আগ্রাসন ও শাসনের অধীনে থাকতে বাধ্য হয়েছে।
পাতা : ২১
যেসব সামরিক প্রতিরোধ হয়েছে সেগুলি হয়ে থেকেছে সাধারণভাবে স্থানিক কিংবা তুলনামূলকভাবে ক্ষুদ্র পরিসরে সীমাবদ্ধ। এটা মোগল শাসনকালে সংঘটিত মহারাষ্ট্রে মারাঠা উত্থান কিংবা পাঞ্জাবে শিখ উত্থান সম্পর্কেও প্রযোজ্য। সফল হলেও এ দু’টির কোনোটিই ক্ষুদ্র জাতি (মারাঠা) কিংবা ধর্মসম্প্রদায়ের (শিখ) গণ্ডী অতিক্রম করে বৃহত্তর ভারতীয় সমাজকে তার অন্তর্ভুক্ত করতে পারে নাই।
বিশেষ করে মহারাষ্ট্রের বাইরে মারাঠা যোদ্ধারা অত্যাচার, হত্যা, নারী ধর্ষণ ও লুণ্ঠনের ভয়ঙ্কর দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। বাংলায় নওয়াবী আমলে মারাঠাদের এই হামলাগুলি বর্গীর হাঙ্গামা হিসাবে বাঙ্গালীদের মনে আজও জাগরূক হয়ে আছে। তাদের আক্রমণে পশ্চিম বঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চল বিরাণভূমিতে পরিণত হয়েছিল। লক্ষ লক্ষ নিরীহ ও অপ্রতিরোধী মানুষ নিহত হয়েছিল। অগণিত নারী ধর্ষিত হয়েছিল। শুধুমাত্র আনন্দ লাভের জন্য অগণিত নিরস্ত্র ও নিরীহ মানুষকে হাত, পা, নাক, কান কেটে অথবা চোখ তুলে বিকলাঙ্গ করা হয়েছিল এবং ধ্বংস অথবা লুণ্ঠন করা হয়েছিল অগণিত বাসগৃহ। এ যেন বাংলার বুকে নবরূপে মুহাম্মদ বিন কাসিম, সুলতান মাহমুদ ও নাদির শাহদের ধ্বংসযজ্ঞ পরিচালনা। অথচ পাঞ্জাবের শিখ ধর্মাবলম্বীদের উত্থানের প্রক্রিয়ায় আমরা এমন ধ্বংসাত্মক অমানবিকতা দেখতে পাই না। বুঝা যায় সংকীর্ণতা ও দুর্বলের উপর নিগ্রহের এই প্রেরণার উৎস হিন্দু ধর্মের ভিতরে আছে।
ফলে তেমন মৌলিক সংস্কার ব্যতিরেকে হিন্দু ধর্মকে আশ্রয় করতে গিয়ে শিবাজী পরবর্তী মারাঠা নেতারা এমন ঘৃণিত ও ভয়ঙ্কর রূপে নিজেদের শক্তির প্রকাশ ঘটিয়েছিলো। মজার ব্যাপার হচ্ছে বর্গী নামে পরিচিত মারাঠা লুঠেরারা বাংলার যে জনগোষ্ঠীর উপর এমন বীভৎস অত্যাচার চালিয়েছিল তাদের বিপুল সংখ্যাগুরুই ছিল হিন্দু। এই সঙ্গে এটাও উল্লেখ করা উচিত যে, শিবাজী কিন্তু এমন অত্যাচার, নারী ধর্ষণ ও লুঠতরাজের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে যান নাই। বুঝা যায় তখনও সেভাবে শক্তি না হওয়ায় হিন্দু সমাজের ভিতর শান্তি ও সহিষ্ণুতার দিকটা প্রাধান্যে ছিল। কিন্তু শিবাজীর মৃত্যু পরবর্তী কালে যখন শক্তির ভারসাম্য পক্ষে এসেছে তখন হিন্দু ধর্মের নিকৃষ্ট দিকগুলি প্রাধান্যে আসতে পেরেছে। সুতরাং এই ধর্মের অনুসারীরা এমন বীভৎস হানাদারদের রূপ নিয়ে একই ধর্মাবলম্বী হলেও ভিন্ন ভাষা ও জাতির মানুষদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে।
যাইহোক, ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা বৃহত্তর ভারতের হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর এক বিরাট আঘাত ছিল। বিশেষত পাঞ্জাবের বিভক্তি দ্বারা সেখানকার হিন্দু ও শিখ ধর্মসম্প্রদায় ভয়ানকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু পশ্চিম পাঞ্জাব থেকে বিতাড়িত শিখ ও হিন্দুরা ভারতের অন্তর্ভুক্ত পূর্ব পাঞ্জাবে অভিবাসন করে নিজেদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানকে সুসংহত করতে সমর্থ হয়। এ ক্ষেত্রে শিখদের সাফল্য অধিকতর দৃষ্টিগ্রাহ্য।
কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানভুক্ত হিন্দু সম্প্রদায় হল বিপর্যস্ত। পশ্চাদ্ভূমি হারিয়ে অবিভক্ত বাংলার রাজধানী কলকাতাও হল ভয়ানকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। ইংরেজদের অধীনে কলকাতাকে কেন্দ্র করে যে হিন্দু বাঙ্গালী মধ্যবিত্ত নেতৃত্বের উত্থান ঘটেছিল তা এই দেশভাগের ধাক্কায় প্রায় ধ্বংস হল বললে বেশী বাড়িয়ে বলা হয় না। একদিকে কলকাতা ও পশ্চিম বাংলা হারালো তার পশ্চাদ্ভূমি পূর্ব বাংলা, অপর দিকে, ধর্মসাম্প্রদায়িক নির্যাতন, হামলা ও নিরাপত্তাবোধহীনতার কারণে লক্ষ লক্ষ পূর্ব বাংলার উদ্বাস্তু হিন্দুর স্রোত কলকাতা ও পশ্চিম বাংলার সমাজ ও অর্থনীতির উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করল। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের এই ধাক্কা পশ্চিম বাংলাকে আজও সহ্য করতে হচ্ছে। কারণ পূর্ব বাংলা থেকে আজও হিন্দুদের উদ্বাস্তু হয়ে ভারতে যাবার গতিধারা কম-বেশী অব্যাহত রয়েছে। পূর্ব বাংলা তথা আজকের বাংলাদেশ-রাষ্ট্রে হিন্দুর সংখ্যা অনেক কমলেও এখনও তারা এ দেশে জনসংখ্যার প্রায় ৯ অথবা সাড়ে ৮ শতাংশ। সংখ্যাটা একেবারে কম নয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে তাদের দেশত্যাগের ধারা আজও অব্যাহত রয়েছে।
এই রকম এক বাস্তবতা বাংলাদেশে তো বটেই এমনকি পশ্চিম বাংলায়ও হিন্দু বাঙ্গালীদের পক্ষে কোনও নির্ধারক কিংবা নেতৃত্বমূলক ভূমিকা গ্রহণকে সুকঠিন করে তুলেছে। আসলে সঠিক সময়ে সঠিক ভূমিকা নিতে না পারার মূল্য এভাবে দিতে হয়। নওয়াবী আমলে যে সুবর্ণ সুযোগ তাদের সামনে এসেছিল সেটার সদ্ব্যবহার করতে না পারার মূল্য তাদের উত্তরসূরিদেরকে আজ এভাবেই দিতে হচ্ছে।
এ ঘটনা আমাদের একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয় যে, শুধু সম্পদ বা সমৃদ্ধি কোনও সমাজ বা জাতিকে রক্ষা দিতে পারে না। এটা বুঝতে হবে যে, যে কোনও জাতি বা জনগোষ্ঠীর সম্পদ রক্ষার জন্য তার যুদ্ধের সক্ষমতাকে রক্ষা করতে হয়। ভিন্ন সমাজ বা রাষ্ট্রের আক্রমণ ও আগ্রাসন থেকে আত্মরক্ষার ক্ষমতা না থাকলে যে কোনও সময় একটা সমাজ আক্রান্ত, অধীনস্থ ও লুণ্ঠিত হয়ে নিঃস্ব কিংবা এমনকি ধ্বংসও হতে পারে।
আমরা কিছু পূর্বে বলেছি যে, সপ্তদশ শতাব্দীর শেষার্ধ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যন্ত একশত বৎসর ছিল বাংলার ইতিহাসের উজ্জ্বল সময়। এই সময় কৃষির পাশাপাশি কুটীর শিল্পেও বাংলার বিস্ময়কর উত্থান ঘটেছিল। ব্যবসার পাশে এই শিল্পেও ছিল হিন্দু বাঙ্গালীর অগ্রগণ্য ভূমিকা। আসলে তখন বাঙ্গালী জাতির প্রায় সবটাই ছিল হিন্দু। ব্রিটিশ শাসনকালেও কুটীর শিল্পসহ বিভিন্ন সামাজিক-অর্থনৈতিক বৃত্তিতে হিন্দুদের প্রাধান্য থেকে আমরা এই বাস্তবতা সম্পর্কে সহজেই ধারণা করতে পারি।
কিন্তু এমন একটা শক্তিশালী আর্থ-সামাজিক ভিত্তির অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও হিন্দু বাঙ্গালী রাষ্ট্র গঠনে কোনও প্রকার ভূমিকা রাখতে পারে নাই স্বাধীনভাবে দাঁড়াবার আকাঙ্ক্ষার অভাবের কারণে, যার মূলে ছিল যুদ্ধকে ভয়। যে কথা বলেছি এর খেসারত তাদের বংশধরদেরকে দিতে হয়েছে।
বস্তুত ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা ও বাংলা ভাগের সঙ্গে বাঙ্গালী জাতির ক্ষেত্রে উদ্যোগী ও নেতৃত্বমূলক ভূমিকা নিবার সক্ষমতা হিন্দু বাঙ্গালীর হাত থেকে মুসলিম বাঙ্গালীর হাতে চলে গেছে। এভাবে কলকাতার ভূমিকা যেমন এক অর্থে শেষ হল তেমন পূর্ব বাংলার রাজধানী হিসাবে ঢাকার ভূমিকাও শুরু হল। এক অর্থে এটা মুসলিম বাঙ্গালীর উত্থান প্রক্রিয়ার সূচনা। কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হল ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা ও বাংলা ভাগের মাধ্যমে মুসলিম বাঙ্গালী সমাজের যে যাত্রা শুরু হল সেটা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রায় পর পরই পরিণত হল ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা নয় বরং মুসলিম বাঙ্গালীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের যাত্রায়। এই যাত্রা তাকে যে লক্ষ্যে নিতে চলেছে সেটা হল ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে বাঙ্গালী সত্তাকে আবিষ্কার করতে গিয়ে ধর্মমুক্ত জাতিসত্তা ও ব্যক্তিসত্তার আবিষ্কার। এই আবিষ্কার ইতিহাসের পথ পরিক্রমায় তাকে যে জায়গাতে নিতে চলেছে সেটা হল বর্তমান সমকালীন বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সিন্ধু সভ্যতার লোকায়ত ও গণতান্ত্রিক চেতনার পুনঃপ্রতিষ্ঠা। কীভাবে, এখন আমরা সেই বিষয়েই যাব।
তবে এ প্রসঙ্গে যাবার পূর্বে বাঙ্গালী মুসলিম মধ্যবিত্তের উত্থান ও বিকাশ প্রক্রিয়া সম্পর্কে একটা সংক্ষিপ্ত আলোচনা করাটা উচিত হবে বলে মনে হয়। তাহলে এ বঙ্গে বা বাংলাদেশে মুসলিম মধ্যবিত্তের উত্থান ও ভূমিকার বিষয়টিকে বুঝা আমাদের জন্য সহজতর হবে। সংক্ষিপ্ত আলোচনাটিকে আমরা নিম্নে দুইটি পরিচ্ছেদে বিভক্ত করব। প্রথমত, (বাাঙ্গালী মুসলিম মধ্যবিত্তের উত্থান ও বিকাশ), দ্বিতীয়ত, (খ) পাকিস্তান পর্ব : বাঙ্গালী মুসলমান মধ্যবিত্তের উত্থানের নব অধ্যায়। এরপর আমরা ষাটের দশকের বিপ্লবী তরুণ প্রজন্মের উত্থানের গুরুত্ব ও তাৎপর্যকে আমাদের আলোচনায় এনে এ গ্রন্থের সমাপ্তি টানার চেষ্টা করব।
পাতা : ২২
চতুর্থ অধ্যায় : ব্রিটিশ শাসনের অবসান ও মুসলিম বাঙ্গালীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পথে যাত্রা
(ক) বাঙ্গালী মুসলিম মধ্যবিত্তের উত্থান ও বিকাশ
(খ) পাকিস্তান পর্ব : বাঙ্গালী মুসলমান মধ্যবিত্তের উত্থানের নব অধ্যায়
(ক) বাঙ্গালী মুসলিম মধ্যবিত্তের উত্থান ও বিকাশ
অনেকে মুসলিম হিসাবে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙ্গালীদেরকে চিহ্নিত করার প্রয়াসে আপত্তি করতে পারেন। কারণ অনেকে বাঙ্গালী জাতির বিকাশ প্রক্রিয়া সম্পর্কে নির্মোহ অনুসন্ধানকে অপছন্দ করেন। কিন্তু অনেক সময় শুধু বাঙ্গালী বললে অনেক সত্য গুলিয়ে যায় বা আড়াল হয় বলে অনেক সময়ই আমাদের এই আলোচনায় ধর্মীয় বিভাজনের এই বাস্তবতা দিয়ে সত্যটাকে বুঝতে চাই।
বাঙ্গালী জাতি যে দুইটি প্রধান ধর্ম-সম্প্রদায়ে বিভক্ত এটা একটা বাস্তবতা। এই বিভক্তি শুধু সামাজিক বা সাম্প্রদায়িক নয়, রাজনৈতিকও। তার বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছে বাঙ্গালী জাতির মূল বাসভূমি বঙ্গ বা বাংলার দুইটি রাষ্ট্রে বিভাজনের মধ্য দিয়ে। ব্রিটিশ শাসনের অবসান কালে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিম বঙ্গ যোগ দিয়েছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু অধ্যুষিত ভারত-রাষ্ট্রে। আর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব বঙ্গ যোগ দিয়েছিল মুসলিমদের রাষ্ট্র হিসাবে পাকিস্তানে। এটা এই বাস্তবতাকে উপস্থিত করে যে, অভিন্ন ভাষা এবং সেই সঙ্গে সংস্কৃতিরও অনেক অভিন্নতা সত্ত্বেও বাঙ্গালী জাতির বিকাশ অভিন্ন ধারায় না হয়ে অনেক বেশী ভিন্ন ধারায় হয়ে চলেছে, যে ধারার মর্মে কাজ করে চলেছে ধর্ম তথা ধর্মীয় বিভাজন।
আধুনিক কালে বাঙ্গালী জাতির এই বিকাশের নায়ক যে শ্রেণী তাকে আমরা সাদামাঠা ভাষায় মধ্যবিত্ত শ্রেণী বলি। বাঙ্গালী মুসলিম সমাজের বিকাশ প্রক্রিয়া ধর্মীয়, রাজনৈতিক এবং আরও নানা কারণে হিন্দু সমাজ থেকে অনেক ভিন্ন হয়েছে। সে সম্পর্কে বিস্তারিত না হলেও কিছু আলোচনা এখানে করব।*
-------------------------------------
* শামসুজ্জোহা মানিক তার বিভিন্ন লেখায় এ সম্পর্কে আলোচনার চেষ্টা করেছেন। আগ্রহী পাঠক সেগুলি পাঠ করতে পারেন। যেমন বাঙ্গালী মধ্যবিত্তের উত্থান(http://bangarashtra.net/article/414.html), বাঙ্গালী জাতির সঙ্কটের উৎস ও তার প্রতিকার সন্ধান(http://bangarashtra.net/article/399.html), বাঙ্গালীর সমাজ ও জাতি গঠনের গতিধারা : একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা(http://bangarashtra.net/article/1365.html), বাংলাদেশের সঙ্কট ও উত্তরণের পথ(http://bangarashtra.net/article/406.html), ইত্যাদি। ফলে এখানে সেসব গ্রন্থের বক্তব্যের কিছু পুনরুক্তি ঘটতে পারে।
-------------------------------------
যাইহোক, বাঙ্গালী মুসলিম মধ্যবিত্তের বিকাশের পটভূমিতে যেতে হলে আমাদেরকে যেতে হবে মুসলিম শাসন পর্বে। তখন মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতা এবং উদ্যোগে বঙ্গে ইসলামীকরণ শুরু হয়। তবে তখনও মুসলিমরা বঙ্গে যথেষ্ট সংখ্যালঘু ছিল। অনুমান করা চলে সংখ্যার এই ভারসাম্য ব্রিটিশ শাসনকালের মাঝামাঝি সময় থেকে দ্রুত বদলাতে থাকে। ১৮৭২-এর প্রথম আদমশুমারীতেও আমরা মুসলমানদেরকে বঙ্গে সংখ্যলঘু দেখতে পাই। কিন্তু পরবর্তী আদমশুমারী বা লোকগণনা থেকে এই চিত্র বদলাতে থাকে। ১৮৮১ খ্রীষ্টাব্দে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় লোকগণনা থেকেই অবিভক্ত বঙ্গে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা ঘটতে শুরু করে।
যাইহোক, ব্রিটিশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পূর্বে বহিরাগত ব্রিটিশ শাসন কালের মত বহিরাগত মুসলিম শাসনও ছিল সম্পূর্ণরূপে মুষ্টিমেয় সংখ্যক বহিরাগতদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এ দেশের হিন্দু এবং নব ধর্মান্তরিত মুসলিম সবার থেকেই তাদের ছিল যোজন যোজন দূরত্ব। আশরাফ হিসাবে কথিত এই মুসলিম শাসকদের নিকট দেশজ ধর্মান্তরিত সাধারণ মুসলিমরা ছিল আতরাফ হিসাবে ঘৃণিত এবং উপেক্ষিত। সুতরাং অভিজাত হিসাবে পরিচিত বা চিহ্নিত বহিরাগত অভিজাত আশরাফ মুসলিম এবং ছোটলোক বা নীচু শ্রেণীর মানুষ হিসাবে বিবেচিত আতরাফ মুসলিমদের ভিতর ছিল প্রায় অনতিক্রম্য ব্যবধান। আশরাফ মুসলিমরা পারিবারিক ক্ষেত্রে এবং সামাজিক ক্ষেত্রে নিজেদের মধ্যে ভাববিনিময়ের জন্য সাধারণভাবে ব্যবহার করত উর্দূ ভাষা আর আতরাফ মুসলিমরা ব্যবহার করত নানান ধরনের আঞ্চলিক ভাষা যেগুলিকে এখন আমরা বুঝার সুবিধার জন্য বলতে পারি মধ্যযুগীয় বাংলা ভাষার বিভিন্ন আঞ্চলিক রূপ।
১৭৫৭ খ্রীষ্টাব্দে ইংরেজদের বিজয় এবং শাসন আশরাফদেরকে ক্ষমতাচ্যুত করায় তারা কালক্রমে আতরাফদের কাতারে অধঃপতিত হতে বাধ্য হয়। এরই একটা বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে দেশজ ভাষা হিসাবে ক্রমবিকশিত বাংলা ভাষার নিকট তাদের মাতৃভাষা হিসাবে ব্যবহৃত উর্দূর পরাজয়। অনেক ক্ষেত্রে উর্দূর প্রস্থান এবং বাংলার প্রতিষ্ঠা এক অথবা দুই প্রজন্মের মধ্যেই সম্পন্ন হতে দেখা গেছে।*
-------------------------------------
* এ প্রসঙ্গে এ গ্রন্থের অন্যতম লেখক শামসুজ্জোহা মানিকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করা যায়। পাকিস্তান কালের প্রথম দিকে তার শৈশব বা বালক বয়সে তিনি এমন ঘটনা দেখেছিলেন যে, আশরাফ পরিবারের প্রথম প্রজন্ম যেখানে উর্দূভাষী ছিল সেখানে তাদের দ্বিতীয় প্রজন্ম অর্থাৎ তাদের ছেলেমেয়েরা অনেকে উর্দূ বলা দূরের কথা সেটা বুঝতেও পারতেন না। অথচ তাদের মা, খালা বা ফুপু, মামা, চাচা ইত্যাদি যখন একত্র হতেন তখন তাদের নিজেদের মধ্যে শুরু হয়ে যেত উর্দূতে কথা। তার সেই ছেলেবেলায় তিনি এতে বেশ কৌতুক অনুভব করতেন। যে ভাষার প্রায় কিছুই তিনি বুঝতেন না সেই ভাষায় তাদের মধ্যে উচ্ছ্বাস প্রকাশের বহর দেখে কখনও বা তার হাসিও পেত।
-------------------------------------
অবশ্য বাংলাভাষীদের সঙ্গে মিশ্র বিবাহও ছিল দ্বিতীয় প্রজন্মে উর্দূ ভাষার হারিয়ে যাবার একটা কারণ। তবে সব মিলিয়ে বাংলা ভাষার আবেষ্টনের প্রভাবকে এ ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। এভাবে যেটা অপ্রতিহত গতিতে এগিয়ে চলেছিল সেটা হচ্ছে ভাষাকে কেন্দ্র করে বাঙ্গালী জাতি গঠনের প্রক্রিয়া। যাইহোক, এটা একটা চমৎকার আলোচনার বিষয় হতে পারে, যাকে এই মুহূর্তে আমরা এই আলোচনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করছি না।
আশরাফ-আতরাফ বিভাজনের প্রশ্নে আর একটা ঘটনাকে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, প্রায় সাড়ে পাঁচশত বছরের মুসলিম শাসনের সময় যে সব বহিরাগত মুসলিম এদেশে এসেছিল তারা যে সবাই স্ত্রীদের সঙ্গে করে আনত তা নয়। বরং বিপুল অধিকাংশই আসত একা। ফলে তারা এখানে এসে বাধ্য হত এখানকার নারীদের বিবাহ করতে। এইসব নারী বিবাহের আগে হোক আর বিবাহের সময় বা পরে হোক ইসলামে ধর্মান্তরিত হত। এটা বুঝা যায় যে, এই ধর্মান্তরিত নারীদের বেশীর ভাগ না হলেও অনেকে আসত নিম্নশ্রেণী থেকে। অন্যদিকে যেসব বহিরাগত সাধারণ মুসলিম সাধারণ সৈনিক বা হতদরিদ্র ও নিম্নশ্রেণীর হত তাদেরও অধিকাংশ যে আশরাফ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হতে পারত না সেটাও সহজবোধ্য। ফলে এরাও ধর্মান্তরিত সংখ্যালঘু আতরাফ মুসলিমদের শ্রেণীভুক্ত হত। অর্থাৎ বহিরাগত মুসলিম বা তাদের বংশধর হলেই যে আশরাফ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হওয়া যেত না সেটাও বুঝতে হবে। বস্তুত আশরাফ শ্রেণী গঠনের সবচেয়ে বড় শর্ত ছিল রাষ্ট্র ক্ষমতার অধিকারী কিংবা অংশ হওয়া অথবা ধর্মীয় জ্ঞান ও চর্চা ইত্যাদি দ্বারা মুসলিম উচ্চবর্গে আরোহণের সুযোগ।
ব্রিটিশ শাসনকালে বাংলার মুসলিমদের স্বাভাবিক সামাজিক নেতা ছিল পূর্ববর্তী মুসলিম শাসকদের উত্তরাধিকারী স্বরূপ আশরাফ শ্রেণীর মুসলিমরা, যারা ছিল সাধারণত পশ্চিম থেকে আগত ব্যক্তিবৃন্দ অথবা তাদের বংশধর এবং যাদের অনেকে ছিল অনেক দিন পর্যন্ত পারিবারিকভাবে উর্দূভাষী। ইংরেজদের অধীনে যখন মুসলিমরা আধুনিক শিক্ষা গ্রহণ করে নূতন উদীয়মান মধ্যবিত্তের রূপ নিতে থাকে এবং এই মধ্যবিত্ত যখন নিজেদের ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য সম্পর্কে সচেতন হয়ে এবং তাকে প্রাধান্য দিয়ে রাজনৈতিক ধারায় আত্মবিকাশের পথ খুঁজতে শুরু করে তখন আমরা বাংলায় এই বাস্তবতার প্রকাশ দেখতে পাই মুসলিম রাজনৈতিক নেতৃত্ব গঠনে।
পাতা : ২৩
১৯০৬ খ্রীষ্টাব্দে বাংলায় মুসলিম লীগ গঠনের প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন ঢাকার নওয়াব সলিমুল্লাহ্। এরা ছিলেন বহিরাগত আশরাফ শ্রেণীর উত্তরাধিকারী। বাংলায় বাস করলেও এরা আচার-ব্যবহারে ও ভাষায় ছিলেন উর্দূভাষী এবং অবাঙ্গালী। এদেরই আর এক প্রতিনিধি পরবর্তী প্রজন্মের মুসলিম লীগ নেতা এবং এক সময়কার অবিভক্ত বাংলার প্রধান মন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, যার ভাষা এবং সংস্কৃতির সঙ্গে বাংলার তেমন কোনও সংযোগই ছিল না।
বাংলা তখন পরিণত হয়েছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে। অথচ এই মুসলিম বাঙ্গালী এবং তাদের প্রতিনিধিত্বকারী মুসলিম নেতৃত্ব অখণ্ড বঙ্গ বা বাংলা না চেয়ে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রতিই আগ্রহী ছিল। এমনকি ১৯৪০ সালে মুসলিম লীগ যখন ভারতের পূর্বাঞ্চলকে নিয়ে স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবী তুলল তখন সেটা তুলা হল মুসলিম গরিষ্ঠ অঞ্চল হিসাবে। অর্থাৎ বাংলার মুসলিম নেতৃত্বের নিকট বাঙ্গালী জাতীয়তার প্রশ্ন গুরুত্ব পায় নাই। বরং সেখানেও দাবী উত্থাপিত হয়েছিল মুসলিম পরিচয়ের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে।
কিন্তু কেন? সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে মুসলিমরা সহজেই বাংলায় প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করতে পারত। ফলে অখণ্ড বাংলার অর্থনৈতিক বলা যাক রাজনৈতিক বলা যাক সবদিক থেকেই মুসলিমরা হিন্দুদের চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থায় থাকতে পারত। হিন্দুদের বরং অখণ্ড স্বাধীন বাংলায় ভয় থাকতে পারত। কারণ তাদের ধর্মসম্প্রদায় হিসাবে কোণঠাসা হবার ভয় ছিল। কিন্তু মুসলিমদের তো সেই ভয় থাকার কারণ ছিল না। কিন্তু জাতি হিসাবে অখণ্ড বঙ্গরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চিন্তা মুসলিমদের মধ্যে সেভাবে গুরুত্ব পায় নাই। কারণ তাদের নেতৃত্বকারী শক্তি মধ্যবিত্ত শ্রেণী এ ধরনের কোনও চিন্তাকে প্রশ্রয় দেয় নাই। আর তাই এই চিন্তা কখনও জন্ম নিলেও সেটা কখনই প্রাধান্যে আসে নাই কিংবা টিকে নাই।
কারণটা কী? সেটা বুঝতে হলে যে মুসলিম জনসমাজ থেকে এখানকার মধ্যবিত্ত শ্রেণী উঠে এসেছে সেই ব্যাপক সংখ্যক আমজনতাকে বুঝতে হবে। এটা বুঝতে হবে যে এ দেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণী গঠনে আমজনতার ভূমিকা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রসঙ্গে হিন্দু সমাজের সঙ্গে মুসলিম সমাজের পার্থক্যকে বুঝতে হবে। বর্ণজাতিভেদের স্তরবিন্যাসের কারণে উচ্চবর্গের সঙ্গে নিম্নবর্গের অনতিক্রম্য দূরত্বের কারণে নীচ তলার শ্রমজীবী কিংবা আমজনতার প্রভাব হিন্দু উচ্চবর্গের উপর অনেকটা ধীরগতিতে পড়ে। আবার বঙ্গের বাইরে অন্যান্য অঞ্চলে মুসলিম অভিজাত শ্রেণীর সঙ্গে নিম্নবর্গের মুসলমানদের যে ধরনের সামাজিক ব্যবধান থাকে বঙ্গের ক্ষেত্রে সেটা সেভাবে থাকে নাই। এর একটা বড় কারণ শুধু ইংরেজদের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতাচ্যুতি নয়, কিংবা নয় বর্ণজাতিভেদের ন্যায় কোনও অনতিক্রম্য সামাজিক স্তরবিন্যাসের অভাব, বরং সেই কারণ হল এখানকার নদী ভাঙ্গন তথা ভূপ্রকৃতির অস্থিরতার কারণে সমাজ বিন্যাসের অস্থিরতা এবং অবিরাম পরিবর্তনশীলতা। এক কালের জনপ্রিয় গানের ভাষায় বললে ‘এ কূল ভাঙ্গে ও কূল গড়ে, এই তো নদীর খেলা, সকাল বেলায় আমীর রে ভাই, ফকির সন্ধ্যা বেলা।’
আমাদের মনে হয় না এ দেশের সমাজ গঠনের গতিপ্রকৃতিকে এত সংক্ষেপে এবং এত প্রাঞ্জলভাবে আর কোনওভাবে বলা যায়। এটা ঠিক যে ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসা নদী শাসন এবং জলবায়ুগত কিছু পরিবর্তনেরও কারণে ঠিক আগের মত অবস্থা নাই। কিন্তু এটা তো সাম্প্রতিক কালের কথা। তার পূর্বেকার শত শত কিংবা হাজার হাজার বৎসরের অভিজ্ঞতার যে প্রভাব চেতনে-অবচেতনে এই জনগোষ্ঠী ধারণ করেছে আমাদেরকে সেই বিষয়টিকেও হিসাবে নিতে হবে।
আমাদেরকে মনে রাখতে হবে সমগ্র বঙ্গে বাঙ্গালী বাস করলেও ইসলামে দীক্ষিত বাঙ্গালীর সংখ্যা পশ্চিম বঙ্গের তুলনায় নদী বিধৌত এবং নদীভাঙ্গন দ্বারা অনেক বেশী প্রভাবিত পূর্ব বঙ্গেই বেশী। অর্থাৎ প্রধানত মুসলমান হয়েছে তারা যারা এ বঙ্গের প্রধানতই নদীভাঙ্গা এবং এ চর থেকে ও চরে বসত গাড়া মানুষ। আর তাই বাংলার মুসলিম শাসন-কেন্দ্র মুর্শিদাবাদের নিকটবর্তী পশ্চিম বঙ্গের তুলনায় দূরবর্তী পূর্ব বঙ্গের নদীভাঙ্গনপ্রবণ বৃহত্তর বরিশাল, ফরিদপুর, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, পাবনা ইত্যাদি অঞ্চলের মানুষ এত বৃহৎ সংখ্যায় ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়েছিল। এদের জীবিকার প্রধান উপায় ছিল কৃষি।
ব্রিটিশ আমলে আধুনিক শিক্ষার প্রসারের সঙ্গে প্রধানত কৃষিজীবী এই আমজনতার মধ্য থেকে মধ্যবিত্তের বিকাশ ঘটতে থাকে। প্রধানত ধনী কৃষক এবং জোতদার শ্রেণীর সন্তানরা আধুনিক শিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী হলে ব্রিটিশ আমলেই মুসলমানদের মধ্যে দ্রুত একটা মধ্যশ্রেণী গড়ে উঠে। অথচ এ ধরনের শিক্ষাগত কিংবা সাংস্কৃতিক কোন ঐতিহ্যই সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে এর পূর্বে ছিল না। নওয়াবী আমলেও আমরা শিক্ষায় হিন্দুদেরকে অগ্রণী দেখতে পাই। নওয়াবদের প্রশাসনিক বিভাগগুলি সচল রাখা হত প্রধানত হিন্দুদের সাহায্যে, যারা তৎকালীন রাজভাষা ফার্সী শিখে নিয়েছিল। আর বহিরাগতরা প্রধানত প্রশাসনের উচ্চপদগুলি দখল করে থাকত। তবে যে সেনাবাহিনীর সাহায্যে তারা এ দেশ দখল করেছিল সেটাই ছিল তাদের মনোযোগ ও চর্চার প্রধান ক্ষেত্র। কিন্তু সাধারণ ধর্মান্তরিত মুসলমান রাষ্ট্রশাসন এবং তার সঙ্গে সম্পর্কিত জায়গাগুলি থেকে অনেক দূরে অবস্থান করত। এমনকি সভ্য সমাজ বলতে আমরা যা বুঝি তা থেকেও তাদের অবস্থান ছিল অনেক দূরবর্তী। এরা ছিল মূলত দুর্গম ও অস্থিতিশীল চরাঞ্চলের অধিবাসী। অনেকাংশে সভ্য সমাজ বহির্ভূত জীবনে ছিল তাদের অধিষ্ঠান। আর তাই কৃষির বাইরে আর প্রায় কোনও পেশায় সাধারণত মুসলমানদেরকে দেখা যেত না। ব্যাপক গ্রামাঞ্চলে কামার, কুমার, কাঁসারী (কাঁসা-পিতলের তৈজসপত্র নির্মাতা), ধোপা, নাপিত, কাঠমিস্ত্রী বা ছুতার ইত্যাদি বহুবিধ পেশার মানুষ ছিল সাধারণভাবে হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরেও অনেক দিন পর্যন্ত এই বাস্তবতার কথা এখনও অনেকে স্মরণ করতে পারেন।*
-------------------------------------
* এ গ্রন্থের অন্যতম লেখক মানিক তার নিজের কথা বলতে পারেন যে, পাকিস্তান কালেও বহুদিন পর্যন্ত তিনি এই অবস্থা চলতে দেখেছেন।
-------------------------------------
তবে এই অবস্থার পরিবর্তন শুরু হয় ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর। হিন্দু পেশাজীবীরা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর দেশত্যাগ করতে থাকলে তাদের শূন্যতা পূরণে মুসলমানরা কিছু করে এগিয়ে আসতে থাকে। অবশ্য মুসলমানদের মধ্যে কোন কোন অঞ্চলে তাঁতী দেখা যেত, যাদেরকে অনেক জায়গায় জোলা বলা হত। মুষ্টিমেয় শহর বা কলকাতার নগরবাসী বাদে এই ছিল ব্যাপক গ্রাম বাংলার চিত্র। অর্থাৎ খাদ্য উৎপাদনের জন্য কৃষি, আর কাপড় পরার জন্য বস্ত্র বয়ন এই দুই পেশার মধ্যেই বহুকাল পর্যন্ত সাধারণ বাঙ্গালী মুসলমানের জীবন সীমাবদ্ধ ছিল। আর সামান্য কিছু সংখ্যক মানুষকে তেল ভাঙ্গানোর পেশায় দেখা যেত, যাদের বলা হত তেলী। রান্নার জন্য বিশেষত সরিষার তেলের চাহিদা পূরণ করত তেলীরা। প্রকৃতপক্ষে, গ্রাম বাংলার মুসলমানের সর্বোচ্চ চাওয়া ছিল কোন রকমে খেয়ে আর পরে বেঁচে থাকা।
এই জীবন থেকে সে প্রথম বের হতে শুরু করে ব্রিটিশ শাসন কালে এসে, যখন তার সামনে এল উন্নততর জীবনের হাতছানি। এই জীবনে প্রবেশের সহজ চাবিকাঠি সেই কালে ছিল ব্রিটিশ প্রবর্তিত আধুনিক শিক্ষা। সুতরাং মাদ্রাসা শিক্ষার পরিবর্তে সে লুফে নিল আধুনিক শিক্ষাকে। এইভাবে এক অর্থে চর থেকে উঠে আসা বাঙ্গালী মুসলমান উন্নততর আধুনিক জীবনের পথে যাত্রা শুরু করে। এবং সেটা অবিশ্বাস্য দ্রুত গতিতে।
এই গতি অর্জনকে অবশ্য শক্তি দান করেছিল একদিকে কলকাতাকে কেন্দ্র করে বাজার অর্থনীতির প্রসার যেটা বিশেষ করে কৃষি সমৃদ্ধ পূর্ব বঙ্গের কৃষকের হাতে প্রচুর কাঁচা পয়সা এনে দিয়েছিল। তবে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে বিভিন্ন কারণে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পাটের বিপুল চাহিদা সৃষ্টি হয়। যুদ্ধে বন্দুকে বুলেটের ব্যবহার শুরু হলে তার বিরুদ্ধে পাটের বস্তার চাহিদা সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে ১৯০৫ সালে রুশ-জাপান যুদ্ধ এবং ১৯১৪-১৮-তে প্রথম মহাযুদ্ধে পাটের বস্তার জন্য পাটের চাহিদা বিপুলভাবে বৃদ্ধি পায়। পাট চাষের প্রধান ক্ষেত্র ছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব বঙ্গ। ফলে অত্যন্ত দ্রুত একটি সমৃদ্ধ ধনী কৃষক শ্রেণী গড়ে উঠল। তারা আরও উচ্চাকাঙ্ক্ষী হয়ে তাদের ছেলেদেরকে স্কুল-কলেজে পাঠাতে শুরু করল। এভাবে প্রকৃত অর্থে চর থেকে উঠা তথা চইরা বাঙ্গালী মুসলমানদের মধ্য থেকে একটি নূতন শ্রেণী গড়ে উঠতে শুরু করল। এবং সেটা ঝড়ের বেগে। এটা দ্রুত জলোচ্ছ্বাসের মত জেগে উঠে এ দেশের রাজনীতির গতিধারাকে বদলে দিল। জেগে উঠল পাকিস্তান আন্দোলন, যেটা দ্রুত হয়ে উঠল সমগ্র বাঙ্গালী মুসলমানের প্রাণের দাবী। কারণ সে তার অধিকতর এবং দ্রুততর বিকাশ বা সুযোগ-সুবিধা লাভের পথে প্রধান বাধা হিসাবে হিন্দুদের দেখতে পেল। এই বাধার বিরুদ্ধে লড়াই করাও সহজতর এবং প্রকৃতপক্ষে ঝুঁকিহীন। কারণ রাষ্ট্র ক্ষমতা যাদের হাতে সেই শাসক ব্রিটিশদের প্রশ্রয় ছিল তাতে। সুতরাং সহজিয়া চইরা বাঙ্গালী যে চিরকালই সহজ পথের পথিক এ ক্ষেত্রেও সহজ পথের পথিক হল। বাঙ্গালী জাতি কিংবা ভারত বিভাজনের রাজনীতি তখন তার জন্য সবদিক থেকেই অধিকতর লাভজনক।
পাতা : ২৪
এখানে উচিত-অনুচিত, সঠিক-বেঠিক খুঁজাটা অর্থহীন। নগদ লাভটাই প্রধান নির্ধারক উপাদান। এ দেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর চইরা বৈশিষ্ট্য যারা বুঝেন না তারা বাঙ্গালী মুসলমানের মানস অবতলে কখনই ঢুকতে পারবেন না। প্রকৃতপক্ষে বাঙ্গালী মুসলিম জনগোষ্ঠীর মেরুদণ্ডই গঠন করেছে নদী ভাঙ্গা তথা চর থেকে চরে বসত গাড়া মানুষেরা। এদের চরিত্র সম্পর্কে কোনও ধারণা না থাকার ফলে এ দেশের ইসলামীকরণ সম্পর্কে নানান হাস্যকর ব্যাখ্যা আজও দেখতে বা শুনতে হয়। যেমন হিন্দুদের বর্ণজাতিভেদের যাঁতাকলে নিষ্পিষ্ট মানুষেরা ইসলামের সাম্যের মহিমায় মুগ্ধ হয়ে দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। এই ধরনের উদ্ভট ও হাস্যকর ব্যাখ্যা যারা আজও দিয়ে চলেছেন তাদের মনে কখনও এই প্রশ্ন জাগে না যে, তাহলে বঙ্গের তুলনায়ও যে উত্তর ভারতে বর্ণাশ্রমের প্রভাব অনেক বেশী প্রবল ছিল সুদীর্ঘ ইসলামী শাসন কেন্দ্র সেখানে থাকা সত্ত্বেও কেন সেখানে ইসলাম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রবেশ করতে ব্যর্থ হল। উত্তর ভারতে বর্ণাশ্রমের প্রতাপ সম্পর্কে এখানে আর নূতন করে ব্যাখ্যা দিতে চাই না। যাদের জানা নাই তারা একটু খোঁজ নিলেই সে সম্পর্কে জানতে পারবেন।
অথচ তুলনায় বঙ্গ বা বাংলায় বর্ণাশ্রম অনেক দুর্বল ছিল। এখানে হিন্দু শাসন কালও ছিল স্বল্পকাল স্থায়ী। একশত বৎসরও নয়। তার আগে চার শতাধিক বৎসরব্যাপী (৭৫০ খ্রীঃ – ১১৬১ খ্রীঃ) ছিল পাল শাসনকাল। পালরা ছিল বৌদ্ধ এবং একটা সময় প্রায় সমগ্র উত্তর ভারত ব্যাপী তাদের ছিল বৃহৎ সাম্রাজ্য। তাদের প্রজারা তখন সাধারণভাবে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী কিংবা বৌদ্ধ ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত ছিল। বলা হয় এই বৌদ্ধরা হিন্দু সেন শাসনকালে এমনই নিপীড়নের শিকার ছিল যে বহিরাগত মুসলিম হানাদাররা এলে তাদের ধর্মের মাহাত্ম্যে মুগ্ধ হয়ে দলে দলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে।
কত সহজ পাটিগণিতের সূত্রে ফেলে সমাজ ও ইতিহাসের ব্যাখ্যা! যারা এসব ব্যাখ্যা দেন তাদের মাথায় এ কথা ঢুকে না যে যারা আগে বৌদ্ধ হয়েছিল তারা বৌদ্ধ কেন হয়েছিল আর কেনই বা মুসলমানরা আসার পর হঠাৎ ক’রে ধর্ম ত্যাগ ক’রে মুসলমান হতে শুরু করল। অথচ এমন কোনও ঘটনাই উত্তর ভারতে ঘটে নাই; কিংবা দক্ষিণ ভারতেও নয়, যেখানে ব্রাহ্মণ এবং বর্ণজাতিভেদের দাপট কোনও অংশেই উত্তর ভারতের চেয়ে কম নয়। এ কথা ঠিক যে, একটা দীর্ঘ সময় বৌদ্ধরা উত্তর ভারতে প্রভাব বিস্তার করেছিল এবং হর্ষবর্ধন এবং পরবর্তী কালে বঙ্গকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠিত পাল রাজবংশের রাজারাও ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী। একটু আগেই বলেছি যে, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পাল রাজারা এক সময় উত্তর ভারতেও তাদের সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিল। তবু এটা মোটামুটি স্পষ্ট যে, সেখানে দীর্ঘকাল ধরে হিন্দুধর্ম শক্তিশালী এবং বিকাশমান ছিল, এমনকি সেটা বৌদ্ধ ধর্মের উত্থানের সমান্তরালেই। একটা সময়ে জন্মগত অসাম্যভিত্তিক এবং বর্ণজাতিভেদমূলক সমাজ বিন্যাসের ক্রমিক প্রসার এবং এই বিন্যাসের মধ্যে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদরকে অন্তর্ভুক্তকরণের মধ্য দিয়ে হিন্দুধর্ম প্রাধান্যে চলে আসে। বলা যায় কাজটা প্রধানত শান্তিপূর্ণভাবেই ঘটে।
অবশ্য উত্তর-পশ্চিম ভারতে এক সময়ে প্রাধান্য প্রতিষ্ঠাকারী বৌদ্ধ ধর্মের পতন ও হিন্দু ধর্মের উত্থানকে এত সহজে বা এক কথায় ব্যাখ্যা করা যায় না। এক্ষেত্রে বিশেষ করে হুন আক্রমণ এবং তার পরবর্তী মুসলিম আক্রমণের ভূমিকা নিয়ে স্বতন্ত্রভাবে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন যে বিষয়ে আমরা পূর্ববর্তী বিভিন্ন সময়ে করার চেষ্টা করেছি। তবে এখানে এটুকু বলা যায় যে বৈদেশিক আক্রমণগুলি বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম যা এককালে প্রাধান্যে ছিল সেগুলির স্থাপনা অর্থাৎ মঠ, বিহার, গ্রন্থাগার, বিদ্যালয়-বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদিকে ধ্বংস ক’রে এই ধর্মগুলির ভিত্তিকে ধ্বংস করে। হিন্দু ধর্মের ব্যাপারটা এ ধরনের প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক নয়। বরং ব্রাহ্মণ পুরোহিত কেন্দ্রিক, যারা বংশপরাম্পরায় ধর্মকে চর্চা ও সংরক্ষণ করে। এই কারণে মন্দির ধ্বংস করলেও হিন্দু ধর্মের ভিত্তিকে ধ্বংস করা সম্ভব নাও হতে পারে।
যাইহোক, সংক্ষেপে বললে এভাবে বলা যায় যে, বৈদেশিক আক্রমণে যখন দেশীয় রাষ্ট্রশক্তির পরাজয় এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে তখন শূন্যস্থান পূরণ করেছে হিন্দু ধর্ম। উত্তর ও পশ্চিমসহ সমগ্র ভারতে হিন্দু ধর্মের প্রসার ও প্রতিষ্ঠাকে এভাবে দেখলে বুঝতে অনেক সুবিধা হয়। এ কারণে এক কালে বৌদ্ধ ধর্মের এত ব্যাপক প্রতিষ্ঠার পরেও সেখানে হিন্দুধর্মের নিকট বৌদ্ধ ধর্মের পরাজয় ঘটেছে মূলত শান্তিপূর্ণভাবে। এটাই যৌক্তিক মনে হয় যে, মঠকে কেন্দ্র করে শ্রমণ-শ্রমণাদের নিয়ে গড়ে উঠা কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানের অভাবে খুব ধীরগতিতে হলেও বর্ণজাতিভেদ ব্যবস্থার মধ্যে প্রবেশের মধ্য দিয়ে বৌদ্ধ কিংবা সেই সঙ্গে জৈন সমাজও এক সময়ে হিন্দু সমাজে পরিণত হয়েছে। এই বর্ণজাতিভেদমূলক ব্যবস্থার শক্তি বিশেষত উত্তর ও দক্ষিণ ভারতে হিন্দু ধর্ম ও সমাজকে যে রক্ষা-ব্যবস্থা দান করে তার ফলে হিন্দু ধর্ম শুধু যে বৌদ্ধ ধর্মের স্থান দখল করতে সক্ষম হয় তা-ই নয়, উপরন্তু ইসলামকেও অনেকাংশে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়।
তবে বঙ্গে বা বাংলায় ইসলাম ধর্মের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার রহস্য বুঝবার জন্য এ দেশের ভূ-প্রকৃতিকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে আমাদেরকে চইরা বাঙ্গালীর দুর্বল, সহজিয়া, পরনির্ভর এবং নগদবাদী চরিত্রকে বুঝতে বা চিনতে পারতে হবে। হাজার হাজার বৎসর ধরে অনিশ্চিত ও অস্থিতিশীল ভূ-প্রকৃতির আবেষ্টনে বসবাসকারী এই মানুষদের সমাজ যেমন অল্পকাল পূর্ব পর্যন্তও ছিল অস্থির, অনিশ্চিত, শিথিল এবং পরিবর্তনশীল তেমন তাদের মনোজগতও সেভাবে গড়ে উঠেছে। তাদের ভিতর যে অবিশ্বাস্য দুর্বলতা থাকে তাকে তারা পূরণ করে শক্তিমানের প্রতি বশ্যতা দ্বারা। যে শক্তিকে তারা নিজেদের ভিতর পায় না সেটাকে তারা পেতে চায় অন্যদের কাছ থেকে, যারা শক্তিমান তাদের কাছ থেকে। যেহেতু তারা নিজেরা শক্তি গড়ে না বা গড়তে পারে না সেহেতু তারা বাইরের শক্তির বশ্য হতে পছন্দ করে।
সুতরাং রাজা যখন বৌদ্ধ পালরা হয় তখন তারা দলে দলে বৌদ্ধ হয়। কারণ দীর্ঘকাল ধরে এটাই ছিল রাজধর্ম। এরপর আসে হিন্দু সেন শাসন। কিন্তু সেটা দীর্ঘস্থায়ী না হবার কারণে হিন্দুকরণ সেভাবে হতে পারে নাই। তবু স্বল্পকাল স্থায়ী সেন শাসন কালেই যে হিন্দুধর্মের বর্ণাশ্রম প্রথা এই বাংলায় অনেকটা দৃঢ়বদ্ধ হয় সেটা নিয়ে কোনও বিতর্ক নাই। বাংলায় অন্তত আধুনিক কালের হিন্দু ধর্ম সেন রাজাদের নিকট খুব বেশী রকম ঋণী। অবশ্য ভুমিসংলগ্ন বিহারসহ হিন্দু-প্রধান উত্তর ভারতের প্রভাবও এখানে হিন্দুধর্মের বিকাশে ভূমিকা রেখেছিল।
সেনদের পর মুসলমান বিজয়ীরা এসে বাংলার রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করল। এবং তারা কয়েক শতাব্দী ধরে বাংলা শাসন করল দোর্দণ্ড প্রতাপে। আনুমানিক ১২০০-১২০৪ সালে বখতিয়ার খলজীর বিজয় দিয়ে যদি শুরু করা যায় তবে ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে ইংরেজদের হাতে সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় পর্যন্ত প্রায় সাড়ে পাঁচশত বৎসর মুসলিম শাসনের অধীনে ছিল বাংলা। এর পরেও চইরা বাঙ্গালী শক্তিমানের ধর্ম ইসলাম গ্রহণ করবে না এটা কি ভাবা যায়? সুফীবাদ বা আরও কিছু ব্যাখ্যা দিয়ে ইতিহাসের কিছু ফাঁক হয়ত পূরণ করা যায়, কিন্তু সবটা এমন কি বেশীর ভাগটাই যায় না। আসলে বাংলায় ইসলামীকরণের মূল ভিত্তি গঠন করেছে বাংলার ব্যাপক বিস্তৃত চরাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষরা, যারা চিরকালই ছিল সভ্য সমাজ এবং রাষ্ট্র থেকে অনেকটা দূরবর্তী বা প্রান্তবর্তী এবং ছিল খুবই দুর্বল মন ও চরিত্রের।
নদী বিধৌত বাংলার চরাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষদের সমাজ সংগঠন ছিল চিরকালই খুব শিথিল বা দুর্বল। একটা নদীর পাড় বা চরে অনেকটা ছাড়া ছাড়া বাড়ী নিয়ে যেসব পল্লী বা গ্রাম গড়ে উঠত সেগুলি দৃঢ়বদ্ধ কোনও সমাজের চিত্র দেয় না। কারণ নদী যখন এসব বসতি ভাঙ্গতে শুরু করত তখন ভাঙ্গন কবলিত বাসিন্দারা যার যার সুবিধা মত নূতন কোনও নদীর পাড়ে কিংবা নদীর মধ্যকার দ্বীপসম চরে গিয়ে ঘর তুলে বসতি করত। এভাবে অনবরত বসতির ছত্রভঙ্গ হবার প্রবণতা দৃঢ়বদ্ধ সমাজ গঠনের পথে ছিল বিরাট বাধা। এটা আজও নদীভাঙ্গন কবলিত এলাকাগুলির একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য।*
-------------------------------------
* সহলেখক শামসুজ্জোহা মানিক যখন পাকিস্তান কালে ষাটের দশকে কৃষক আন্দোলন ও সংগঠনের কাজে গ্রামাঞ্চলে ছিলেন তখন এ দেশের গ্রাম বা বসতি এবং সমাজ গঠনের এই গতিধারা তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। তিনি এমন বহু গ্রাম বা পল্লীর ভাঙ্গন এবং গঠন পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। এটা তার কাছে বিস্ময়কর মনে হত যে, আপন ভাই বা নিকট জনেরাও যে সর্বদা একত্রে এক জায়গায় গিয়ে নূতন করে বসতি করত তা নয়। কারণ নদী সব সময় সবার বাড়ী এক সঙ্গে ভাঙ্গত না। ফলে নূতন জায়গায় বসতি করার জন্য এক সঙ্গেও যাওয়া হত না। এর ফলে এক অর্থে বাংলার নদী বিধৌত অঞ্চলের জীবন যাযাবর বা ভাসমান বা চলমান। কিন্তু যাযাবর উপজাতীয় সমাজে যে দৃঢ় সমাজ শৃঙ্খলা থাকে তার কিছুই বাংলার এই মানুষদের জীবনে ছিল না। এখানে এক অর্থে প্রত্যেকেই একা। দলবদ্ধতা বা সমাজ গঠন খুব সাময়িক। যে কোনও সময় তা ভেঙ্গে যেতে পারে। সুতরাং বাংলার জীবনের অস্থায়ী এবং অনিশ্চিত এই বাস্তবতায় বৃহৎ নির্মাণ হবে কী করে?
-------------------------------------
এটা ঠিক যে, ব্রিটিশ শাসনকাল থেকে শুরু করে দীর্ঘদিন ধরে বাঁধ, সেতু, রেলপথ ইত্যাদি নির্মাণের ফলে নদীগুলির পূর্বের প্রমত্ততা এবং ভাঙ্গন ক্ষমতা নাই। এর সঙ্গে যোগ করতে হবে ভারতের ভিতর দিয়ে আগত নদীগুলির উজানে বাঁধ বা ব্যারেজ নির্মাণ দ্বারা জলপ্রবাহের বিপুল অংশকে ভারতের ভিতরে জলসেচের জন্য অপসারণের ঘটনাকে। ভারতের ভিতরে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করে এককালের প্রমত্ত ও বিরাট পদ্মা নদীকে এখন শীত-বসন্তসহ বৎসরের এক উল্লেখযোগ্য সময়ের জন্য শীর্ণ নদীতে পরিণত করা হয়েছে। সর্বোপরি জলবায়ুগত পরিবর্তনের প্রভাবকেও আমাদেরকে হিসাবে নিতে হবে। বেশ কিছুকাল যাবত জলবায়ুগত পরিবর্তনের ফলে বাংলায় বৃষ্টিপাতও পূর্বের তুলনায় কমেছে। উপরে বর্ণিত ঘটনাগুলির সামষ্টিক প্রভাবের ফলে গ্রাম, শহর এবং বসতির পূ্র্বের মত ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়াও এখন আর এ বাংলার প্রধান বৈশিষ্ট্য নয়। তা সত্তেও এখনও ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, পদ্মা, মেঘনা — এমন সব বৃহৎ নদীর অববাহিকা অঞ্চলে আমরা আজও এই বাস্তবতা কম-বেশী দেখতে পাই।
বাংলার জনমানস গঠনে বাৎসরিক নিয়মিত ঝড় এবং বন্যার প্রমত্ততাকেও আমাদেরকে হিসাবে নিতে হবে। বৃষ্টিপাত পূর্বের তুলনায় যতই কমুক ঝড় এবং বন্যার প্রমত্ততা এ বাংলার জন্য প্রতিবছরের নিয়মিত ঘটনা।
পাতা : ২৫
যাইহোক, আমাদের ধারণা এ দেশের জনচরিত্রের বৈশিষ্ট্য ও সমস্যাগুলিকে বুঝতে হলে বিশেষত বাংলার ভূমি গঠনে নদীর ভূমিকাকে বুঝতে হবে। প্রায় পুরা বাংলাই সমুদ্রতল থেকে নদীর পলিসঞ্চয়ে গড়ে উঠেছে। এবং আজও তা বঙ্গোপসাগরের গর্ভে নদীবাহিত পলিসঞ্চয়ের মাধ্যমে ভূমি গঠন করে চলেছে। এভাবে বিশেষ করে বাংলাদেশের বিরাট দক্ষিণাঞ্চলে এখনও ঘটে চলেছে সাগর এবং নদীগুলির ভাঙ্গাগড়ার খেলা।
বাঙ্গালীকে বুঝতে হলে এই ভাঙ্গন প্রবণ এবং অস্থিতিশীল ভূ-প্রকৃতির আবেষ্টনে গড়ে উঠা মানুষকে চিনতে পারতে হবে। এর সঙ্গে হিসাবে নিতে হবে নিয়মিত ঝড় ও বন্যার প্রমত্ততাকে। এই মানুষ খুবই হুজুগে হয়। খুব সুবিধাবাদী এবং ফলত নীতিহীন হতে পারে। তার প্রায় সবই স্বল্পস্থায়ী বা অস্থিতিশীল। সে একান্ত প্রয়োজনে দলবদ্ধ হয়ে বাস করে। কিন্তু সে জানে যে এই দল যে কোনও সময় ভেঙ্গে যেতে পারে। ফলে সে মনের ভিতরে খুব নিঃসঙ্গ। তার এই একাকীত্ববোধ তাকে ভীরু করে। অথচ এই অস্থির ভূ-প্রকৃতিতে বাস করার ফলে সে হয় প্রচণ্ড গতিশীল বা সচল। সে রক্ষণশীল না হয়ে যে কোনও নূতন জিনিসকে লাভজনক মনে হলে গ্রহণ করে নেয়। এ ক্ষেত্রে তার মধ্যে ধীরস্থির বিচার-বুদ্ধির চেয়ে হুজুগ বা আবেগের তাৎক্ষণিক তাড়না অনেক বেশী কাজ করে।
আমরা ধারণা করি বাংলার চইরা মানুষদের এই বৈশিষ্ট্যগুলিকে হিন্দুরা অনেকটা কাটিয়ে উঠেছিল তাদের বর্ণজাতিভেদ মূলক সমাজ সংস্থার দৃঢ়বদ্ধতা দ্বারা। আমাদের অনুমান যে, নির্দিষ্ট পেশার ক্ষুদ্র কিন্তু দৃঢ়বদ্ধ কাঠামোর মধ্যে অবস্থান তাদের সমাজকে ছত্রভঙ্গ হওয়া থেকে অনেকটা রক্ষা করেছিল।*
-------------------------------------
* সহলেখক শামসুজ্জোহা মানিক এখনও তার ছেলেবেলার স্মৃতি থেকে মুসলমানদের গ্রাম এবং হিন্দুদের গ্রামের মধ্যকার পার্থক্য মনে করতে পারেন। হিন্দুদের বাসগৃহ কিংবা পল্লী মুসলমানদের বাসগৃহ কিংবা পল্লীর তুলনায় সাধারণভাবে পরিচ্ছন্ন এবং সুসম্বদ্ধ হত। বস্তুত পল্লীর প্রবেশের মুখে বাড়ীঘরের চেহারা দেখেই অধিকাংশ সময় বলে দেওয়া যেত এটা মুসলমান পল্লী নাকি হিন্দু পল্লী। অবশ্য এর মানে এই নয় যে, হিন্দুরা বাংলার ভূ-প্রকৃতির প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পেরেছিল। তা নয়। তবে মুসলমানদের তুলনায় তারা যে সভ্য এবং স্থিতিশীল জীবনে অনেকটা এগিয়েছিল সে কথা বলা যায়।
-------------------------------------
যারা পাকিস্তান আমলের গ্রাম সমাজ সম্পর্কে কিছুটা ধারণা রাখেন তারা জানেন যে তখনও কৃষি এবং বস্ত্রবয়নের বাইরের বৃত্তি বা পেশাগুলিতে বিশেষ করে ব্যাপক গ্রামাঞ্চলের মুসলমানদেরকে সাধারণত দেখা যেত না। বস্তুত বহুদিন পর্যন্ত কামার, কুমার, কাসারী, ছুতার বা বিভিন্ন ধরনের কারিগর, ধোপা, নাপিত ইত্যাদি পেশায় মুসলমানদের প্রায় দেখাই যেত না। এটা কোন সত্যের দিকে ইঙ্গিত দেয়? বস্তুত এটা এই সত্যকে তুলে ধরে যে, সভ্যতার বাইরের মানুষরাই সাধারণত মুসলমান ছিল। কৃষি না করলে না খেয়ে থাকতে হবে, সুতরাং ব্যাপক সংখ্যক মুসলমান ছিল কৃষক। আর কাপড় না বুনলে ল্যাংটা বা উলঙ্গ থাকতে হবে, সুতরাং কিছু সংখ্যক মুসলমান ছিল তাঁতী। কৃষি যন্ত্রপাতি যেমন কাস্তে, কোদাল এবং রান্না ও খাবারের জন্য মাটির হাড়ি, বাসন, কলসী কিংবা অন্যান্য কাজের জন্য দা, কুড়াল ইত্যাদি তৈরীর প্রয়োজন কী? এর জন্য তো সভ্য গ্রামজীবনের অধিকারী বিভিন্ন বৃত্তিজীবী হিন্দু আছেই। হাটে-বাজারে গিয়ে ধান বা শস্যের বিনিময়ে সেগুলি কিনে আনলেই তো চলে! হ্যাঁ, শুধু শুনে যে লেখক মানিক এ কথা বলতে পারেন তা নয়, অধিকন্তু তার নিজ অভিজ্ঞতা থেকেও এ কথা বলতে পারেন। বস্তুত বহুকাল পর্যন্ত ব্যাপক গ্রামাঞ্চলে জমি চাষ এবং কাপড় বুনার বাইরে আর কোনও পেশায় মুসলমানদের তিনি খুব কম দেখতেন।
যাইহোক, সঙ্গত কারণে আমরা অনুমান করি যে, বাংলার অধিকাংশ মানুষ কোনও কালেই ইসলামে ধর্মান্তরিত হয় নাই। বরং তুলনায় খুব সংখ্যালঘু একটা জনগোষ্ঠীই ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়েছিল। তারা হল সভ্য সমাজ বহির্ভূত চরাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষ। কোথায়ও এদেরকে চরুয়া, কোথায়ও বা এদেরকে চইরা বলে। এখানে আমরা এদেরকে চইরা নামে অভিহিত করছি।*
-------------------------------------
* এর একটা প্রধান কারণ সহলেখক যেসব গ্রামাঞ্চল বা চরাঞ্চলে কাজ করেছিলেন সেই সব অঞ্চলে এই শব্দই বেশী ব্যবহার করা হত।
-------------------------------------
যাইহোক, শক্তির পূজারী এবং সভ্য সমাজ বহির্ভূত এই চইরা মানুষগুলিই প্রধানত মুসলমান হয়। অবশ্য এরা নিজেদের পরিচয় মুসলমান বললেও এরা ইসলাম সম্পর্কে যেমন ছিল অজ্ঞ তেমন আল্লাহয় বিশ্বাসের পাশাপাশি বিভিন্ন লোকজ দেব-দেবীর পূজা যেমন করত তেমন বহু লোকজ বিশ্বাসকেও মেনে চলত। দীর্ঘদিন এরা ছিল বাংলার সংখ্যাল্প মানুষ। এদের সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটতে শুরু করে ব্রিটিশ শাসনকালে এসে।
কেন এদের সংখ্যা ব্রিটিশ শাসনকালে এসে এভাবে বৃদ্ধি হল এ নিয়ে কিছু কাজ একেবারে হয় নাই তা নয়। যেমন ডঃ আতিউর রহমান এবং ডঃ লেনিন আজাদের লিখা ‘ভাষা আন্দোলন : অর্থনৈতিক পটভূমি’ নামক গ্রন্থের কথা উল্লেখ করা যায় যেখানে মুসলমানদের সংখ্যাবৃদ্ধির জন্য পাটচাষ নির্ভর অর্থনীতির বিকাশের উপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।* এটা অংশত সঠিক হলেও আমাদের বিবেচনায় মুসলিম জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধির সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল ব্রিটিশ শাসকদের দ্বারা এ দেশে আধুনিক চিকিৎসার প্রবর্তন। বাংলায় হিন্দু-মুসলমানের জনসংখ্যার ভারসাম্য পরিবর্তনে আরও কিছু কারণ ক্রিয়াশীল ছিল। তবে আমরা ধারণা করি মুসলিম সংখ্যাবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় কারণ তাদের জন্মহারের পাশাপাশি বৃটিশ কর্তৃক আনীত আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের সুবিধা।
-------------------------------------
* মুসলমান মধ্যবিত্তের উত্থানের পটভূমি রচনায় পাট চাষের ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য পড়ুনঃ আতিউর রহমান ও লেনিন আজাদ, ভাষা আন্দোলনঃ অর্থনৈতিক পটভূমি, ইউনিভার্সিটি প্রেস লিঃ (ইউপিএল), ১৯৯১।
-------------------------------------
এ প্রসঙ্গে এ গ্রন্থের সহলেখক শামসুজ্জোহা মানিকের পাকিস্তান কালের প্রথম দিকে তার ছেলেবেলার অভিজ্ঞতার কথা বলা যায় এবং পরবর্তী সময়ে কৃষক আন্দোলন করতে গিয়ে গ্রাম বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল পরিভ্রমণের সময়ও তার অভিজ্ঞতার কথা বলা যায় যখন তিনি দেখতেন যে, ব্যাপক সংখ্যক মানুষ নদী, খাল, বিল এবং পুকুরের কাঁচা পানি পান করত। হিন্দুদের বাড়ীতে ইন্দারা বা পাকা কুয়া কিছু পরিমাণে দেখা গেলেও মুসলমান কৃষকদের মধ্যে এ ধরনের দৃশ্য কম দেখা যেত। তুলনায় হিন্দুরা মুসলমানদের চেয়ে স্বাস্থ্য সচেতন ছিল। যাইহোক, আমরা ধারণা করতে পারি যে, চর কিংবা নদী অববাহিকার মুসলমানদের মধ্যে কলেরা এবং টাইফয়েড ইত্যাদি দূষিত পানিবাহিত রোগে মৃত্যুর সংখ্যা খুব বেশী ছিল। এ ছাড়া আর একটি রোগে মৃত্যুর হার খুব বেশী ছিল। সেটি হল ম্যালেরিয়া। বাংলার জলাভূমি ছিল মশাবাহিত ম্যালেরিয়ার লালন ভুমি। এছাড়া ছিল গুটিবসন্তের প্রকোপ। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের কল্যাণে এসব রোগে মৃত্যুর হার যথেষ্ট হ্রাস পায়।
এর ফলে মুসলমানদের মধ্যে জনসংখ্যার বিস্ফোরণ ঘটে। এমন নয় যে পূর্বে মুসলমানদের মধ্যে জন্মহার কম ছিল। বরং হিন্দুদের তুলনায় জন্মহার তাদের মধ্যে অনেক বেশী। আর বিশেষত চর এবং নদীভাঙ্গন কবলিত মুসলমানদের মধ্যে এটা খুব বেশী। মানিক অবশ্য সমগ্র গ্রাম বাংলায় এই বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করেছেন। এর বহুবিধ কারণের মধ্যে মুসলমানদের মধ্যে যৌন প্রবণতার আধিক্য প্রধান বলে তার মনে হয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক উৎসব ও অনুষ্ঠান হিন্দুদের মনকে যেভাবে বিভিন্ন মুখী করে মুসলমানদের মধ্যে তেমনটা না ঘটে যৌনতা অভিমুখী করে। তিনি তার দশ বৎসরের গ্রামীণ জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে খুব কাছে থেকে এটা প্রত্যক্ষ করেছেন। তিনি দেখতেন যে, কয়েকজন মুসলিম যুব কৃষক এক জায়গায় হলে তাদের গল্পের একটা প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়াত আদি রসাত্মক বা যৌনতা বিষয়ক আলোচনা। অথচ হিন্দু যুবকরা অন্যসব বিষয় নিয়ে অনেক বেশী আলোচনা করত। বরং যৌনতা কিংবা নারী ও কাম বিষয়ক আলোচনা তাদেরকে তিনি খুব কমই করতে দেখতেন। হিন্দু এবং মুসলমানদের মধ্যে এই পার্থক্যের বিষয়টা তাকে ভাবতে বাধ্য করত।
এক সময় মুসলমানদের মধ্যে বহু বিবাহ বেশ প্রচলিত ছিল। কোথায়ও কোথায়ও এটার রূপ কদর্য ছিল। যেমন পটুয়াখালী, বরগুনা ইত্যাদি অঞ্চলে এক সময় একটা প্রথা ছিল যে, ফসল উঠবার পূর্বে সমৃদ্ধ মুসলমান কৃষক বা জোতদাররা বহুসংখ্যক নারীকে ধানের মওসুমে কাজ করাবার জন্য বিয়ে করত। তারপর মওসুম শেষ হলে তাদেরকে স্বল্প দেনমোহরানার টাকা দিয়ে তালাক দিত। সেই নারীরা গর্ভবতী হলে সন্তানদের দায়িত্ব মায়েদের ঘাড়েই গিয়ে পড়ত। মোট কথা মুসলমানরা যে বংশবৃদ্ধিতে অন্য যে কোনও সমাজের চেয়ে অনেক বেশী পারঙ্গম এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। সুতরাং ব্রিটিশ আমলে সভ্যতার প্রান্তসীমার চরাঞ্চলের বাসিন্দা মুসলমানরা যে সভ্যতায় অনেক অগ্রসর তাদের প্রতিবেশী হিন্দুদেরকে বংশবৃদ্ধির দ্রুতগতি দিয়ে দ্রুত ছাড়িয়ে যাবে তাতে অবাক হবার কী আছে?
পাতা : ২৬
বস্তুত এই সংখ্যাবৃদ্ধির সঙ্গে ইসলামের মাহাত্ম্যে আকৃষ্ট হয়ে দলে দলে ইসলাম গ্রহণের কোনও সম্পর্ক নাই। চরাঞ্চল এবং নদীভাঙ্গন কবলিত যে সব অঞ্চলের মানুষরা শক্তির পূজারী হবার কারণে একটা কালে মুসলমান শাসকদের ধর্মের অনুসারী হতে চেয়েছিল এবং যারা ছিল একটা উল্লেখযোগ্য কাল বাংলার জনসংখ্যার সংখ্যালঘু অংশ বিট্রিশ শাসনের শেষ ভাগে এসে দ্রুত বংশবৃদ্ধির জোরে তারা সংখ্যাগুরু জনসংখ্যায় পরিণত হল। ফলে আমরা বাংলায় ১৮৭২ সালের লোকগণনায়ও যেখানে হিন্দুদের যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখতে পাই সেটা ১৮৮১ সালের লোকগণনা থেকে বদলাতে শুরু করে।
বাঙ্গালী মুসলমানদের সংখ্যাবৃদ্ধি কীভাবে ঘটেছে একটা হিসাব দিলেই সেটা স্পষ্ট হবে। ১৯৪৭-এ পাকিস্তান হবার অনেকদিন পর পর্যন্ত আমরা ছেলেবেলায় জানতাম এ বঙ্গের জনসংখ্যা সোয়া চার কোটি। সেটা ১৯৭০-এর পূর্বকালে সাত কোটিতে পৌঁছালো। এখন সেটা কত? ২০১১-এর লোকগণনার হিসাব ধরে লাভ নাই। ষোলো কোটি অনেক আগেই ছাড়িয়ে গেছে। কেউ বলেন এখন জনসংখ্যা আঠারো কোটি। কারও মতে এটা কুড়ি কোটি। পাঁচ-সাত বৎসর আগে দায়িত্বশীল মহল থেকে আমরা শুনেছিলাম পরিসংখ্যান বিভাগের গোপন সূত্রের হিসাব অনুযায়ী এই সংখ্যা বাইশ কোটি। অর্থাৎ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অর্ধশতাব্দীর মধ্যে বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় তিনগুণ হয়েছে। অবশ্য এতে ভয়ের কারণ নাই। কেউ কেউ স্মরণ করতে পারেন, কয়েক বৎসর আগে বাংলাদেশের বর্তমানে ক্ষমতাচ্যুত ও পলাতক প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে জনসংখ্যার আরও বৃদ্ধির প্রয়োজন তুলে ধরেছিলেন। তার মতে আমাদের নাকি আরও জনসংখ্যার প্রয়োজন আছে!
যাইহোক, জনসংখ্যা বিস্ফোরণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে বিশেষত গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র, অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত এবং পশ্চাৎপদ মানুষরা। এদের খুব বড় একটা অংশই আবার চরাঞ্চল বা নদীভাঙ্গন কবলিত এলাকাগুলির অধিবাসী। এদেরই একটা বড় অংশ ঢাকার মত বড় নগর ও শহরগুলিতে জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে উঠে এসে এখানকার জনসংখ্যার আয়তন দ্রুত ও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করছে। এভাবে অব্যাহতভাবে সভ্যতার প্রান্তসীমা থেকে মানুষরা উঠে এসে সভ্যতার কেন্দ্রে নানানভাবে জায়গা করছে। এরা তো মূলত অস্থিতিশীল চরের মানুষ। সুতরাং যেখানে যায় এরা চরের বসতই গড়ে। এখন চরের কাঁচা বা বাঁশ-খড় দিয়ে তৈরী বাড়ীর পরিবর্তে তারা পাকা দালান তুলছে। কিন্তু গড়ছে সেই অগোছালো, অপরিকল্পিত, ঘিঞ্জি-গলি সমাকীর্ণ নগর বসতি। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাকে এখন একটা মহাকায় পাকা বস্তি বা পাকা ‘স্লাম’ ছাড়া আর কী বলা যায়?
এটা ঠিক যে, ইদানীং সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য শুধু শিক্ষিত মুসলমানদের মধ্যে নয়, অধিকন্তু শহর ও গ্রামের অনেক অর্ধশিক্ষিত কিংবা অশিক্ষিতের মধ্যেও জন্মনিরোধকের ব্যবহার ইত্যাদি কারণে জন্মহার পূর্বের চেয়ে অনেকটা কমেছে। কিন্তু সমাজের এক বিরাট জনগোষ্ঠীর মধ্যে সেই বালাই নাই। বিশেষত নদীবিধৌত ও সমুদ্র তীরবর্তী চরাঞ্চল ও গভীর গ্রামগুলিতে এখনও এই অবস্থা অনেকাংশে বিদ্যমান। মুসলমানদের জন্মহার এখনও কেমন তার একটা ঘনীভূত চিত্র তুলে ধরছে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীরা। এক এক জন নারী দশ, বারো বা চৌদ্দ সম্তান জন্মদানের কৃতিত্বের অধিকারী। এক সময় না হয় মৃত্যুর আধিক্য বিশেষত শিশুমৃত্যু দিয়ে প্রকৃতি জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণ করত। কিন্তু এখন আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের কল্যাণে জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে মৃত্যুর আধিক্য দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কাজেই মুসলমানদের সংখ্যাবৃদ্ধির জন্য ইসলামের সাম্যের বাণীতে আকৃষ্ট হয়ে ব্রাহ্মণ্যবাদ ও বর্ণজাতিভেদের যাঁতাকলে নিষ্পিষ্ট নিম্নবর্ণের মানুষদের দলে দলে ইসলাম গ্রহণের গালগল্প নিয়ে মাতামাতি না করে এখন একটু মাথা খাটিয়ে সত্যটাকে উদ্ঘাটনের চেষ্টা করা উচিত।
যাইহোক, মুসলিম যুগে সভ্য সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রান্তসীমায় থাকা এই মানুষরা ছিল আধা মুসলমান, আধা ‘পেগান’। ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্র ক্ষমতা হারিয়ে আশরাফ শ্রেণী নিজস্ব শক্তি বৃদ্ধির প্রয়োজনে এদের দিকে দৃষ্টি দিতে বাধ্য হয়। ফলে ওয়াহাবী, ফরায়জী ইত্যাদি নানান ধর্মীয় সংস্কার আ্ন্দোলন গড়ে উঠে, যেগুলির উদ্দেশ্য ছিল নামে মুসলমানদেরকে ইসলামের রীতিনীতি অনুযায়ী একটি সংহত সামাজিক এবং রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করা। এইসব আন্দোলনের পরিণতি বা পরবর্তী রূপ হচ্ছে মুসলিম লীগ নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান আন্দোলন।
তবে এটা লক্ষ্যণীয় যে মুসলিম লীগের নেতৃত্বে যারা ছিল তারা যে ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতি খুব অনুগত ছিল তা নয়। ধর্ম তাদের নিকট আচার-অনুষ্ঠানের তুলনায় ইসলামে বিশ্বাস অনুযায়ী একটা পরিচিতিকে তুলে ধরার জন্য অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যে কারণে দেখা যায় মুসলিম লীগের নেতৃত্বে ধর্মীয় নেতাদের স্থান বা গুরুত্ব খুব কম ছিল অথবা প্রায় ছিল না। জিন্নাহ্, লিয়াকত আলী, সোহরাওয়ার্দীর মত আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত মধ্যশ্রেণীর লোকরাই ছিলেন নেতা।
এই শ্রেণী ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে দাঁড়াতে চাইলেও পাশ্চাত্যই কিন্তু তাদের মডেল বা আদর্শ, ইসলামী পরিচিতিকে রক্ষা করেই যার সুবিধা তারা পেতে চায়। বুঝতে হবে এরা মসজিদ-মাদরাসা থেকে উঠে আসে নাই, বরং আধুনিক ও ধর্মমুক্ত শিক্ষার সূতিকাগার স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই উঠে এসেছে। তারা জানত যে ধর্মশিক্ষা দিয়ে তাদের বৈষয়িক লাভ হবে না। সুতরাং আধুনিক শিক্ষার প্রতি এই আগ্রহ।বিশেষ করে বাংলার মুসলমানদের চরিত্র বৈশিষ্ট্য অনুধাবন এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই মুসলমানরা নগদ সুবিধায় বেশী বিশ্বাসী, যে সুবিধা ধর্মীয় শিক্ষার বদলে আধুনিক শিক্ষা দিতে পারত। সবচেয়ে বড় কথা এ দেশে এই শিক্ষার প্রবর্তক এবং পৃষ্ঠপোষক শক্তিমান ও বিজয়ী ইংরেজরা। এই বাস্তবতায় বাংলার মুসলমানরা বিস্ময়কর দ্রুত গতিতে আধুনিক শিক্ষাকে গ্রহণ করে নিল। অথচ এমন কোনও উত্তরাধিকার নদীভাঙ্গা এবং চরে চরে বসতগাড়া মূলত কৃষিজীবী এই মানুষদের ছিল না।
তারা মধ্যবিত্ত শ্রেণীতে আরোহণের পর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে হিন্দুদেরকে দেখতে পেল। প্রাক-ব্রিটিশ কাল থেকেই শিক্ষায়, সম্পদে, বাণিজ্যে এবং শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পেশায় এগিয়ে থাকা হিন্দুদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় যে শ্রম ও সময় দিতে হয় সেটা দেওয়ার মত মন এই শ্রেণীর কোথায়?
সহজ পথে নগদ লাভ যাদের ধ্যান-জ্ঞান তাদের কাছ থেকে এসব আশা করাই মূর্খতা। সুতরাং ভাষাভিত্তিক জাতি পরিচয়ের ভিত্তিতে বাঙ্গালীর রাষ্ট্র গঠন কিংবা বৃহত্তর সংস্কৃতি ও বহুজাতি-ভিত্তিক ভারতীয় রাষ্ট্র গঠনের পরিবর্তে মুসলমানের রাষ্ট্র পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাতেই তারা লাভ দেখতে পেয়েছে। হিন্দুদের সম্পদ, সম্পত্তি, চাকুরী সবকিছুই সহজে করায়ত্ত করার জন্য যে রাজনীতির দরকার ছিল তারই রূপায়ণ হল পাকিস্তান। এর জন্য বিদেশী শাসক ইংরেজদের বিরুদ্ধে কোনও ধরনের লড়াইয়ের ঝুঁকি নেওয়ারও প্রয়োজন ছিল না, বরং শাসক ইংরেজদের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল পলিসি’র সহায়ক হয়ে তাদের আশ্রয় ও প্রশ্রয়ে থেকে হিন্দু প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে সংঘাতে লিপ্ত থাকাই যথেষ্ট ছিল। উদ্দেশ্য ছিল ইংরেজ প্রভু এবং প্রতিবেশী হিন্দুর কাছ থেকে যত বেশী সম্ভব সুবিধা আদায় করা। এই সুবিধার আদায়েরই সর্বোচ্চ পরিণতি হল পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা।
এই জনগোষ্ঠী এবং তার শ্রেণীটাকে বুঝতে হলে বুঝতে হবে যে এরা সর্বদা শক্তিমানের পূজারী কিংবা অনুসারী। এদের পূর্ব প্রজন্ম যদি এক সময় বৌদ্ধ হয়ে থাকে তবে সেটা এইজন্য যে দীর্ঘকাল শাসকরা ছিল বৌদ্ধ। একই ভাবে এদের পূর্ব প্রজন্ম মুসলমান হয়েছিল মহৎ কোনও প্রেরণায় অনুপ্রাণিত হয়ে নয়, বরং বিজয়ী শাসকদের ধর্ম ইসলাম ছিল বলেই শক্তিমানের পরিচয়ের সঙ্গে একাত্মতা খুঁজে পেতে চেয়ে তারা গ্রহণ করেছিল তাদের ধর্ম ইসলাম।
এরপর এসেছিল ইংরেজরা। কিন্তু তাদের ধর্ম নিয়ে কোনও প্রকার মাথা ব্যথা ছিল না। সেটা থাকলে এরা কী করত সেটা বলা কঠিন। তবে ইংরেজ শাসন এবং তার বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে সরকারী-বেসরকারী চাকুরী, আইন ব্যবসা ইত্যাদি নানান পেশার যে বিরাট নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছিল তার সুবিধা পাবার একটাই উপায় মূলত খোলা থাকল সেটা হচ্ছে আধুনিক শিক্ষা গ্রহণ। হিন্দুরা আগে থেকেই সভ্যতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পেশাগুলিতে এগিয়ে থাকায় ইংরেজ শাসনের পর ইংরাজী শিক্ষার সুযোগও তারা সর্বাগ্রে গ্রহণ করল। তার সুফলও তারা পেয়েছিল।
এই প্রতিযোগিতায় মুসলমানরা যোগ দিল দেরীতে। তবে নদীভাঙ্গন কবলিত বাংলার চর থেকে চরে বসতগাড়া মানুষগুলি যারা প্রধানত কিংবা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় মুসলমান তারা প্রবল উদ্যমে আধুনিক শিক্ষার সুযোগ নিতে শুরু করল। এ প্রসঙ্গে একটু আগেই বলেছি। এটাও বলেছি যে এরা হিন্দুদেরকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে দেখতে পেয়ে ইংরেজদের বিদায়ের পর মুসলিম স্বাতন্ত্র্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পেতে চাইল। ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে নয়, বরং হিন্দুদের বিরুদ্ধে দাঙ্গা করে তারা ইংরেজদের দান স্বরূপ ১৯৪৭ খ্রীষ্টাব্দে পাকিস্তান পেল। এই পাকিস্তানের নেতৃত্ব পশ্চিমা অবাঙ্গালীদের হাতে থাকলেও পাকিস্তান আন্দোলনের মূল শক্তিভিত্তি যে ছিল বাঙ্গালী মুসলমানরা আশা করি এ নিয়ে এখানে ব্যাখ্যার কোনও প্রয়োজন হবে না। পাকিস্তান আন্দোলনের ইতিহাস জানা প্রতিটি ব্যক্তি এ সম্পর্কে অবগত।
পাতা : ২৭
(খ) পাকিস্তান পর্ব : বাঙ্গালী মুসলিম মধ্যবিত্তের উত্থানের নব অধ্যায়
এটা হচ্ছে পাকিস্তান পর্বে এই শ্রেণীর বিকাশ ধারার কাহিনী। আলোচনাকে সংক্ষিপ্ত রাখতে চেয়ে আমরা অনেক বিষয় এড়িয়ে গিয়ে শুধু মূল এবং একান্ত প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয় সম্পর্কে এই পর্বে আলোচনা করব।
এই পর্বে বাঙ্গালী মুসলমানদের কর্মধারা দুইটি মূল ধারায় বিভক্ত। একটি হচ্ছে মাঝে মাঝে সাম্প্রদায়িক হামলা আর অব্যাহত নির্যাতনের মাধ্যমে পাকিস্তানভুক্ত পূর্ব বঙ্গ থেকে হিন্দুদেরকে বিতাড়ন। আর এভাবে হিন্দুদের জমি-বাড়ী-সম্পদ-সম্পত্তি দখল। অনেক সময় বিনামূল্যে, কখনও বা স্বল্পমূল্যে। এছাড়া হিন্দুদের চাকুরী, ব্যবসা-বাণিজ্যের শূন্য জায়গাগুলি সহজে বা স্বল্পায়াসে পূরণের ব্যাপার তো আছেই। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১-এর যুদ্ধ সমাপ্তি পর্যন্ত সময়কে ধরলেও প্রায় ২৫ বৎসরের মধ্যে এভাবে পর্যায়ক্রমে কয়েক কোটি হিন্দুর সম্পদ-সম্পত্তি-বাসগৃহ-কর্মস্থান-পেশা দখল একটা সমাজ ও তার শ্রেণীর অত্যন্ত দ্রুত অস্বাভাবিক স্ফীতি ঘটালো। এ হল কর্মধারার একদিক।
বস্তুত পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা ছিল বাঙ্গালী হিন্দুর সঙ্গে বাঙ্গালী মুসলমানের দ্বন্দ্বের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি। এরপর এ দেশ থেকে তাদের বিলুপ্তি বা বহিষ্কার বাকী ছিল। সেটাই ক্রমাগত করা হল। যে দেশে ১৯৪১ সালের লোকগণনার হিসাব অনুযায়ী হিন্দুর সংখ্যা ছিল জনসংখ্যার ২৮% বা প্রায় ৩০ শতাংশ সেটা ২০১১-এর লোকগণনা অনুযায়ী ৮.৫০% বা সাড়ে আট শতাংশ হল।
কিন্তু কর্মধারার অপর একটা দিক এবার বাঙ্গালী মুসলমানদের সামনে চলে এল সেটা হল পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বন্দ্ব নিরসনের দিক। এখন সামনে এল পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসন ক্ষমতা যাদের হাতে ছি্ল সেই পশ্চিমা তথা অবাঙ্গালী মুসলমান শাসকদের সঙ্গে এই দ্রুত বিকাশমান বাঙ্গালী মুসলমান এবং তাদের নেতৃত্বকারী মধ্যবিত্তের দ্বন্দ্ব। পাকিস্তান পর্বে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র ক্ষমতার কর্তৃত্ব বা ভাগ নিয়ে বাঙ্গালী-অবাঙ্গালী মুসলমানদের দ্বন্দ্ব যেটা ছিল সেটা ক্রমে প্রবল হয়ে উঠল।
পাকিস্তান আন্দোলনের নেতৃত্ব ছিল অবাঙ্গালী, আরও বিশেষ করে উর্দূভাষীদের হাতে। আসলে এরা ছিল ব্রিটিশ পূর্ববর্তী বহিরাগত মুসলিম শাসক আশরাফ বা অভিজাতদের বংশধর। এরা সারা ভারতে ছড়ানো থাকলেও এদের কেন্দ্রীভবন ছিল উত্তর ভারতে। বাংলায়ও এদের একটা শক্ত অবস্থান ছিল। এরা ছিল নানানভাবে এখানকার মুসলমানদের সামাজিক নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত। এটাই পরবর্তী সময়ে মুসলিম লীগের নেতৃত্বে রাজনৈতিক রূপ নেয়। মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠাতা ঢাকার নওয়াব সলিমুল্লাহ্ এবং পরবর্তী কালে তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার প্রধান মন্ত্রী (তখন ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতের একটি প্রদেশ হলেও বাংলার মুখ্যমন্ত্রীকে প্রধান মন্ত্রী বলা হত) এবং মুসলিম লীগ নেতা সোহরাওয়ার্দী এমন দুইজন উল্লেখ্য ব্যক্তিত্ব। অবশ্য পাকিস্তান আন্দোলনে ফজলুল হকেরও অবদান উল্লেখ্য। বস্তুত ১৯৪০ সালে মুসলিম লীগের লাহোর প্রস্তাবের উপস্থাপক ছিলেন তিনি। এটা ছিল মুসলমানদের পরিচয় ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার তত্ত্ব। অর্থাৎ ধর্মের ভিত্তিতে ভারতবর্ষকে বিভাজনের দ্বি-জাতিতত্ত্বের প্রথম প্রস্তাবক তাকেই বলা যায়। বুঝা যায় পাকিস্তান আন্দোলনের উত্থান ও বিকাশে বাঙ্গালী মুসলমানের ভূমিকা কতখানি ছিল।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বাংলার বাইরের মুসলিম লীগ নেতারা সাধারণভাবে ভারত ত্যাগ করে পশ্চিম পাকিস্তানকে তাদের আবাস ভূমিতে পরিণত করে। সেখানে গিয়ে তারা প্রধানত পাঞ্জাবী মুসলমান উচ্চ শ্রেণীর সঙ্গে ঐক্যের ভিত্তিতে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ক্ষমতা কব্জা করে নেয়। এতে বাংলায় বসবাসকারী মুসলিম অভিজাতরা ক্ষমতা বঞ্চিত হল। বাংলার মুসলমানদের নেতা সোহরাওয়ার্দী প্রথমে পশ্চিম পাকিস্তানে গিয়ে রাজনীতিতে দাঁড়াবার চেষ্টা করেন। কিন্তু তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়ে বুঝলেন যে নিজে উর্দূভাষী এবং মুসলিম লীগ নেতা হলেও পশ্চিমারা তাকে জায়গা দিবে না। সুতরাং তিনি তার শক্তিভিত্তি খুঁজে পেতে চেয়ে পূর্ব বঙ্গে এলেন এবং অতঃপর এই বঙ্গের বাঙ্গালীর নেতা হিসাবে রাজনীতি শুরু করলেন। তিনি এখানে এসে পেলেন মওলানা ভাসানীকে, যার উদ্যোগে ও নেতৃত্বে ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আওয়ামী মুসলিম লীগ। আওয়ামী মুসলিম লীগকে অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ দলের রূপ দেওয়ার জন্য মওলানা ভাসানীর উদ্যোগে ১৯৫৫ সালে মুসলিম শব্দ বাদ দিয়ে দলের নাম করা হয় আওয়ামী লীগ। সোহরাওয়ার্দী প্রথম দিকে ভাসানীর এই উদ্যোগের বিরোধিতা করলেও পরে মেনে নেন। এভাবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর আসাম থেকে আগত এবং আসাম মুসলিম লীগ সভাপতি মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে পূর্ব বঙ্গের বাঙ্গালী মুসলমানের নূতন পথে যাত্রা শুরু হল। বস্তুত এই যাত্রায় মূল প্রেরণা এবং শক্তি এসেছিল ছাত্রদের নেতৃত্বে পরিচালিত ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে, যার সূচনা ১৯৪৮ থেকে হলেও পরিণতি ১৯৫২-তে ছাত্র-যুবকদের প্রাণদানের বিনিময়ে ঘটে।
তবে প্রসঙ্গান্তরে যাবার আগে ভাসানী প্রসঙ্গে এ কথা বলে রাখা যেতে পারে রাজনৈতিক নেতা হিসাবে ভাসানীর উত্থান ব্রিটিশ শাসনকালের আসামে হলেও তিনি ছিলেন এ বঙ্গের মানুষ। সিরাজগঞ্জের নিভৃত পল্লী নিবাসী মক্তব পড়া দরিদ্র এবং অনাথ এই ছেলেটি অল্প বয়সে আসাম অঞ্চলে গমন করে সেখানকার জলাজঙ্গল এবং চরাঞ্চলে বসতগাড়া এ বঙ্গের প্রধানত নদীভাঙ্গা এবং দরিদ্র অভিবাসী বাঙ্গালী মুসলমান কৃষকদের ধর্মীয় নেতা হন। পরবর্তী কালে তাদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের মাধ্যমে তিনি পরিণত হন একজন রাজনৈতিক নেতায়। এই ব্যক্তির জীবনের দিকে যখন দৃষ্টি দেওয়া যায় তখন আমরা যেন বাঙ্গালী মুসলমানের উত্তরণের একটা প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই। চর থেকে চরে বসতগাড়া মানুষ, অতঃপর আধা মুসলমান এবং পরবর্তীতে মুসলমান এবং অতঃপর ধর্মীয় পরিচয় থেকে বেরিয়ে এসে বাঙ্গালী জাতি হয়ে উঠতে থাকা একটা জনগোষ্ঠী যেন ভাসানীর মধ্য দিয়ে অনেকাংশে অভিব্যক্ত হয়। স্বাভাবিকভাবে এই জনগোষ্ঠীর বিস্ময়কর অনেক স্ববিরোধও তার মধ্য দিয়ে অভিব্যক্ত হয়েছে। তবে তিনি এই জনগোষ্ঠীর এখন পর্যন্ত প্রাধান্যে থাকা নিকৃষ্টতার পরিবর্তে তার উৎকৃষ্ট দিকগুলির একজন শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি। কিন্তু অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করা সত্ত্বেও এ দেশের রাজনীতির ইতিহাসে তিনি অনেকাংশে একজন বিস্মৃত, উপেক্ষিত এবং কোণঠাসা চরিত্র। তবে তার প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনার জায়গা এটি নয়।
যাইহোক, পাকিস্তানভুক্ত পূর্ব বঙ্গের বাঙ্গালীর সঙ্গে পাকিস্তানের অবাঙ্গালী শাসক শ্রেণীর দ্বন্দ্বের প্রথম প্রকাশ ঘটল ভাষার প্রশ্নকে কেন্দ্র করে। এটা স্বাভাবিক যে পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার প্রশ্নকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে অবাঙ্গালীরা উর্দূ ভাষাকে অগ্রাধিকার দিতে এবং তাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করতে চাইবে। কিন্তু বাঙ্গালীরা ভাষার প্রশ্নে পাকিস্তানী শাসক শ্রেণীর একভাষা তত্ত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেল। এখানেও স্বাজাত্যবোধ কিংবা মহৎ কোনও আদর্শ বা চেতনার পরিবর্তে কাজ করেছিল নেহায়েৎ নগদ বৈষয়িক বা বস্তুগত স্বার্থবুদ্ধি। উর্দূভাষা পশ্চিম পাকিস্তানেরও সংখ্যাগুরু মানুষের ভাষা ছিল না। সুতরাং পাকিস্তানের সকল জাতির মধ্যে ঐক্যের বন্ধনকে দৃঢ়তর করার জন্য ভারতবর্ষের বিশেষ করে ঐতিহ্যিক মুসলিম শাসক শ্রেণী তথা আশরাফ শ্রেণীর পারিবারিক ভাষা উর্দূকে সমগ্র পাকিস্তানের জন্য মেনে নেওয়া অযৌক্তিক হত না। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ভারত থেকে পূর্ব বঙ্গে আগত সাধারণ বা নিম্নশ্রেণীর উর্দূভাষী মোহাজেরদের কথা বাদ দিলেও পূর্ব বঙ্গে বসবাসকারী আশরাফ শ্রেণীর কিংবা দেশভাগের পর ভারত থেকে পূর্ব বঙ্গে সোহরাওয়ার্দীর মত অভিবাসনকারী আশরাফ শ্রেণীর মুসলমানদের এতে আপত্তি করার কারণ ছিল না। কিন্তু এখানকার শিক্ষিত শ্রেণীর মুসলমানরা এবং আরও বিশেষত তাদের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া সন্তানরা বাংলাকে বাদ দিয়ে উর্দূকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালো এবং তারা দাবী তুলল উর্দূর পাশে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার। এই দাবী ১৯৪৮ সাল থেকেই উঠল এবং ছাত্রদের সংগ্রাম ও আত্মদানের মধ্য দিয়ে ১৯৫২ সালে এ বঙ্গের বাঙ্গালীর প্রাণের দাবী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হল। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসক শ্রেণীও এই দাবীকে মেনে নিতে বাধ্য হল।
যৌক্তিক-অযৌক্তিক কিংবা ন্যায়-অন্যায় যা-ই বলা যাক না কেন এটা ছিল একটা যুগান্তকারী ঘটনা। পাকিস্তান-রাষ্ট্রের ধ্বংসের বীজ বপন হল। এবং জন্মের মাত্র ২৫ বছরের মধ্যে বাঙ্গালীর একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য নয়মাস কালব্যাপী এক প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে এখানে পাকিস্তান-রাষ্ট্রটি ধ্বংস হল। বিস্ময়ের ব্যাপার হল ইসলাম ধর্মীয় পরিচয় ভিত্তিক মুসলমানদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য যে বাঙ্গালী মুসলমানদের এত উদগ্র আগ্রহ ছিল পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মুহূর্ত থেকেই সেই মুসলমানরা ধর্মীয় পরিচয় থেকে সরে গিয়ে জাতি পরিচয় ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চিন্তার দিকে ঝুঁকে পড়তে শুরু করল। হ্যাঁ, এটা একমাত্র চইরা বাঙ্গালী মুসলমানদের পক্ষেই সম্ভব। তার মত বদলাতে কিংবা পক্ষ পরিবর্তন করতে মুহূর্ত লাগতে পারে। এ ক্ষেত্রে নগদ সুবিধা এবং অসুবিধার বিচারটাই মুখ্য।
দ্রুত এবং নগদ সুবিধার জন্য যেমন এক সময় তাদের অখণ্ড ভারত কিংবা বাঙ্গালীর জাতি-রাষ্ট্রের পরিবর্তে মুসলমানের ধর্মসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র পাকিস্তানের দরকার ছিল তেমন দ্রুত এবং নগদ সুবিধার জন্য তাদের আবার এক সময় জাতি-রাষ্ট্রের লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ চাইতে হল।
তবে তার আগে ব্যাখ্যা করা যাক কেন তাদের জন্য রাষ্ট্রভাষা বাংলার এত প্রয়োজন ছিল। এটা বুঝতে হবে এই বাঙ্গালী চর ও দুর্গম গ্রাম থেকে এসে তাদের আঞ্চলিক কথ্য বাংলার পরিবর্তে কেবল প্রমিত বা স্ট্যান্ডার্ড বাংলা এবং সেই সঙ্গে ইংরাজী শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে। এখন সেই বাঙ্গালীর উপর যদি আবার চাপানো যায় উর্দূর বোঝা তবে কি প্রতিযোগিতায় তারা পশ্চিমাদের তুলনায় পিছিয়ে যাবে না? চাকুরীর বাজারে তারা কেবল প্রবেশ করছে আধুনিক শিক্ষা গ্রহণ ক’রে। প্রমিত বাংলাই তারা ভালো করে বলতে বা লিখতে পারে না। তার উপর আছে ইংরাজী শিক্ষার যন্ত্রণা! এখন সেই বাঙ্গালীকেই বলা হচ্ছে চাকুরীর বাজারে উর্দূভাষীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে। তাও আবার তাদের নিজ এলাকাতেও অর্থাৎ এই বাংলা বা পূর্ব বাংলাতেই। সুতরাং তারা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবে না তো কী করবে?
পাতা : ২৮
পশ্চিম পাকিস্তানীরাও ছিল নগদ সুবিধাবাদী। সুতরাং এই বাঙ্গালী মুসলমানদেরকে শাসন ক্ষমতা এবং শাসন ক্ষমতা সঞ্জাত সুযোগ-সুবিধার ভাগ দিতে রাজী হয় নাই। সুবিধার কিছু ভাগ দিলে যে পাকিস্তানের রাজনীতির গতিধারা অনেকটা ভিন্ন হতে পারত তা আমরা বুঝতে পারি ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৭ পর্যন্ত সময়ে আওয়ামী লীগ নেতা সোহরাওয়ার্দী এবং তার অনুসারী শেখ মুজিবের ভূমিকায়। ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট বিপুল ভোটাধিক্যে জয়ী হয়। এটা যুক্তফ্রন্টের প্রধান শরীক হিসাবে আওয়ামী লীগকে বিরাট শক্তি এবং মর্যাদা দেয়। এই অবস্থায় ১৯৫৪ সালে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভায় আইন মন্ত্রী হিসাবে সোহরাওয়ার্দী যোগদানের সুযোগ পান। সেই সময় তিনি পাকিস্তানের সংবিধান প্রণয়নের দায়িত্ব পান। যুক্তফ্রন্টের একটি প্রধান দাবী ছিল পূর্ব বঙ্গের স্বায়ত্তশাসন। কিন্তু সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে রচিত সংবিধান যেটা ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের সংবিধান হিসাবে আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হল সেখানে স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নকে এড়িয়ে যাওয়া হল। শুধু তা-ই নয়, পশ্চিম পাকিস্তানের প্রদেশগুলির বিলুপ্তি ঘটিয়ে সেখানে এক ইউনিট বা একটি প্রদেশ প্রতিষ্ঠা দ্বারা সেখানকার সংখ্যালঘু প্রধান চারটি জাতি যথা সিন্ধী, বালুচ এবং পাখতুন বা পাঠানদেরকে পাঞ্জাবীদের পদতলে নিক্ষেপ করা হল। পাকিস্তানী পশ্চিমা শাসক শ্রেণীর নিকট থেকে সোহরাওয়ার্দী তার এই ভূমিকার পুরস্কার পেলেন সত্বর। তাকে ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রধান মন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত করা হল।
স্বায়ত্তশাসনের দাবীর প্রশ্নে সোহরাওয়ার্দীর কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, যিনি নীতির প্রশ্নে রইলেন অবিচল। সুতরাং সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে তার বিরোধ দেখা দিল। এই প্রশ্নে সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভার সদস্য শেখ মুজিবুর রহমানও সোহরাওয়ার্দীকে সমর্থন দিলেন।
সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে আর একটি প্রশ্নে ভাসানীর তীব্র মতবিরোধ দেখা দিল। সেটা হচ্ছে পররাষ্ট্র নীতি স্বাধীন ও জোট নিরপেক্ষ হবে নাকি মার্কিন পক্ষভুক্ত হবে। সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধান মন্ত্রী হবার পূর্বে আওয়ামী লীগের একটি কর্মসূচী ছিল পাকিস্তানের জন্য স্বাধীন ও জোট নিরপেক্ষ পররাষ্ট্র নীতি প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু পাকিস্তানের প্রধান মন্ত্রী হবার পর সোহরাওয়ার্দী আওয়ামী লীগের গৃহীত কর্মসূচীকে প্রত্যাখ্যান করলেন এবং পাকিস্তানকে মার্কিন সামরিক জোটের অন্তর্ভুক্ত রাখার পক্ষে মত দিলেন। এ প্রশ্নে তার সেই বিখ্যাত উক্তিকে আজও কেউ কেউ স্মরণ করতে পারেন যে, শূন্যের সঙ্গে যত শূন্য যোগ করা যাক যোগফল শূন্যই হয়। পাকিস্তান যেহেতু একটা দুর্বল রাষ্ট্র সেহেতু নিরাপত্তার জন্য তাকে পরাশক্তি আমেরিকার সঙ্গে থাকতে হবে। এই প্রশ্নেও মুজিব সোহরাওয়ার্দীকে সমর্থন দিলেন।
এভাবে আওয়ামী লীগের মধ্যে কর্মসূচী এবং নীতির প্রশ্নে তীব্র মতবিরোধ দেখা দিল। তখন পাকিস্তানের প্রধান মন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী। সুতরাং রাষ্ট্র ক্ষমতাকে ব্যবহার করে অর্থ-বিত্ত এবং নানাবিধ সুবিধা করায়ত্ত করার সুযোগ তার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের হাতে। এমন অবস্থায় নীতি-আদর্শের প্রশ্নকে জলাঞ্জলি দিয়ে লীগ নেতৃত্বের বেশীর ভাগ অংশ সোহরাওয়ার্দীকে সমর্থন জানালো। ফলে নীতি-আদর্শের প্রশ্নে অটল ভাসানী তার নিজ হাতে গড়া দলেই সংখ্যালঘুতে পরিণত হলেন। এই অবস্থায় ভাসানী তার আদর্শের পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরে রাখতে চেয়ে ১৯৫৭ সালে আওয়ামী লীগ পরিত্যাগ করে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বা সংক্ষেপে ন্যাপ গঠন করতে বাধ্য হলেন।
এভাবে বাঙ্গালী মুসলমানের স্বরূপ স্পষ্ট হল। বস্তুত এটাই বাঙ্গালী মুসলমান জনগোষ্ঠীর ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠের মূল চরিত্র। সুতরাং তাদের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিনিধিত্বকারী দল হল এ দেশে আওয়ামী লীগ। যখন যে কথা বললে জনগণ সমর্থন করবে অথবা যে কথা জনগণ শুনতে পছন্দ করে তখন সেটা বলতে সমস্যা কী? ক্ষমতায় যাবার জন্য, জনতুষ্টির জন্য যে কোনও কথা বলতে বা প্রতিশ্রুতি দিতে সমস্যা কী? ক্ষমতায় গেলে যে সেই কথা রাখতে হবে তার কী মানে আছে? এই নীতিরই একনিষ্ঠ অনুসারী এই দল।
বস্তুত এই চরিত্রই এই দল অর্জন করেছে তার পূর্বসূরি মুসলিম লীগের নিকট থেকে, এক সময় যেটা পরিণত হয়েছিল বাঙ্গালী মুসলমানের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং প্রায় একচেটিয়া প্রতিনিধিত্বকারী দলে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পশ্চিম পাকিস্তানীদের সঙ্গে স্বার্থের দ্বন্দ্ব ঘটলে পূর্ব বঙ্গে এই দলের প্রায় পুরাটাই প্রথমে আওয়ামী মুসলিম লীগ এবং অতঃপর আওয়ামী লীগে পরিণত হল। কিন্তু এ সবই সাপের খোলসের মত খোলস পরিবর্তন। মূল শরীর তো একই থাকল। অর্থাৎ বাঙ্গালী মুসলিম জনগোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গী, চরিত্র, আকাঙ্ক্ষা এবং তাদের নেতৃত্বকারী শ্রেণীর স্বার্থের প্রতিনিধিত্বকারী হিসাবে প্রথমে যেটা মুসলিম লীগ নাম নিয়ে দল হিসাবে জন্ম নিয়েছিল মূলত সেটাই পরবর্তী কালে নাম বদল করে হল আওয়ামী লীগ। স্বাভাবিক নিয়মে নূরুল আমীনের মত কিছু মার্কামারা মুসলিম লীগ নেতার পক্ষে এই নাম পরিবর্তন স্বরূপ দল পরিবর্তন করা সম্ভব ছিল না। কারণ তাদের অবস্থা হয়েছিল সাপের পুরাতন পরিত্যাজ্য খোলসের মত। ফলে সামান্য কিছু সংখ্যক নেতা বাদ দিয়ে পূর্ব বঙ্গের মুসলিম লীগের প্রায় সম্পূর্ণ অংশ ভাসানীর নেতৃত্বে গঠন করল আওয়ামী লীগ।
অসাম্প্রদায়িক নাম এবং ভূমিকার কারণে এ বঙ্গের হিন্দুরাও ক্রমে আওয়ামী লীগে অংশ নিতে শুরু করে। তবে ন্যাপ গঠনের পর প্রথম দিকে হিন্দুদের পছন্দের দলে পরিণত হয় ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বা ন্যাপ। ন্যাপ গঠনে অবশ্য গোপন কম্যুনিস্ট পার্টির বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এ দেশে পাকিস্তান আমলের একেবারে প্রথম দিকের সামান্য কিছু সময় বাদ দিলে প্রায় সমস্ত সময় জুড়ে কম্যুনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ কিংবা গোপন ছিল।
বাঙ্গালী মুসলিম জন-চরিত্রের লোভ এবং সহজে সবকিছু পেতে চাওয়ার বৈশিষ্ট্য থেকে কম্যুনিস্টরা ছিল অনেক ভিন্ন। সে কালে যারা কম্যুনিস্ট রাজনীতি করত, বলা যায় চরিত্রগত বিচারে তারা ছিল এ সমাজের শ্রেষ্ঠ মানুষ। ন্যাপ যে আওয়ামী লীগ থেকে চরিত্রগতভাবে অনেক শ্রেষ্ঠ হল তার প্রধান কারণ এই কম্যুনিস্টদের প্রভাব। আর তাই আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠাতা ভাসানীকে আদর্শ ও সত্যনিষ্ঠার তাগিদে তার নিজ দল আওয়ামী লীগ পরিত্যাগ করে ন্যাপ গঠনে ঐক্য করতে হল মূলত গোপন কম্যুনিস্ট পার্টির সঙ্গে। কম্যুনিস্ট পার্টির একটা প্রকাশ্য প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজন ছিল। সে কাজে আওয়ামী লীগে যথেষ্ট সীমাবদ্ধতা ছিল। কারণ সেখানে ছিল সোহরাওয়ার্দী-মুজিবের মত নেতাদের প্রবল কম্যুনিস্ট-বিরোধিতা। কিন্তু ন্যাপ গঠনে ভাসানীর প্রধান সহায় হল গোপন কম্যুনিস্ট পার্টি, যার একটি মোটামুটি শক্ত ভিত্তি ছিল তৎকালীন পূর্ব বঙ্গে। ভাসানীর সঙ্গে ঐক্য ন্যাপকে ক্রমে প্রভূত শক্তি যোগালো, যা ১৯৬০-এর দশকে প্রবল রূপে দৃশ্যমান হল।
এখানে আর একটা বিষয় উল্লেখ করা উচিত হবে যে, এ দেশে কম্যুনিস্ট আন্দোলনের নেতৃত্ব এবং মেরুদণ্ড যারা গঠন করেছিলেন তারা ছিলেন প্রধানত হিন্দু সমাজ থেকে আগত মানুষ। এই মানুষরা সঠিক ছিলেন কি ভুল ছিলেন অর্থাৎ যে তত্ত্ব নিয়ে তারা কাজ করেছিলেন তা যুগোপযোগী এবং দেশোপযোগী ছিল কিনা কিংবা থাকলেও তা কতটা ছিল সেসব নিয়ে বিতর্ক না করেও এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, নিজেদের জন্য কোনও নগদ বৈষয়িক স্বার্থ এবং লাভালাভের দিকে না তাকিয়ে তারা দেশ ও মানুষের কল্যাণ এবং মুক্তির কথা ভেবে তাদের সমগ্র জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন। পুনরায় এ প্রসঙ্গে মুসলিম জনচরিত্র থেকে হিন্দু বাঙ্গালীর জনচরিত্রের ভিন্নতা ও শ্রেষ্ঠত্বের প্রসঙ্গ চলে আসে। তবে প্রাসঙ্গিক না হলে এখানে আমরা হিন্দু চরিত্র নিয়ে তেমন একটা আলোচনা করব না। ফলে তার সমস্যাগুলিও সেভাবে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনায় আসবে না। কারণ আমাদের এখনকার এই আলোচনার মুখ্য চরিত্র মুসলমান বাঙ্গালী। তার রাজনীতির গতিপ্রকৃতি ও সমস্যাগুলিকে বুঝতে চেয়ে মূলত সমাপ্তি পর্বের এই আলোচনা। বিশেষত ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে পশ্চিম বঙ্গ ও পূর্ব বঙ্গে বাঙ্গালী জাতির দ্বিধাবিভক্তির পর থেকে হিন্দু বাঙ্গালীর রাজনীতির সমস্যা ও গতিপ্রকৃতি বুঝতে হলে আমাদেরকে মূলত হিন্দু সংখাগরিষ্ঠ পশ্চিম বঙ্গের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে যাকে আমরা আমাদের এই আলোচনার জন্য এই মুহূর্তে ততটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করছি না।
যাইহোক, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাবার সুবাদে বৈষয়িক বা বস্তুগত বিচারে বাঙ্গালী মুসলমানদের উত্থান আরও ত্বরান্বিত হল। লাইসেন্স-পারমিট-ঠিকাদারি এবং রাষ্ট্র ক্ষমতা থেকে আসা নানান সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তি বাঙ্গালী মুসলমান মধ্যবিত্তকে অর্থ-সম্পদে অধিকতর বলীয়ান করল। এভাবে একটা শক্তিশালী মধ্যবিত্তের বিকাশ প্রক্রিয়া এগিয়ে চলল। অবশ্য এর সঙ্গে ন্যায়-নীতি, নিয়মের সম্পর্ক খুঁজবার চেষ্টা যেন কেউ না করেন। প্রথমত লাগাতারভাবে নানান পদ্ধতিতে বিপুল সংখ্যক হিন্দু বিতাড়নের মাধ্যমে তাদের সহায়-সম্পদ এবং অবস্থান কব্জা করে এবং অতঃপর রাষ্ট্র ক্ষমতার যথেচ্ছ ব্যবহার করে একটা শক্তিশালী এবং অধিকতর উচ্চাভিলাষী মধ্যবিত্ত শ্রেণী প্রতিষ্ঠার কাজটাই এভাবে অত্যন্ত দ্রুত প্রথমে মুসলিম লীগ এবং তারপর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে এগিয়ে চলল।
১৯৫৬-’৫৭ পর্যন্ত বেশ ভালোই চলল। কিন্তু পশ্চিমা শাসকরা এতটা পছন্দ করছিল না। বিশেষত পশ্চিম পাকিস্তানী উচ্চাভিলাষী সেনাকর্তারা ক্ষমতার মসনদ থেকে দূরে থাকতে চাইছিল না। তারা পিছন থেকে কলকাঠি নাড়তে থাকল। এবং অবশেষে পাকিস্তানের শাসন ক্ষমতায় ক্রমবর্ধমান বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে ১৯৫৮ সালে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে সরাসরি ক্ষমতা দখল করল। এভাবে জেনারেল আইয়ুবের দীর্ঘ দশ বৎসরের শাসন পাকিস্তানের উপর চেপে বসল। আইয়ুবের শাসন ১৯৬৯ সালে বিশেষ করে পূর্ব বঙ্গে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে সংগঠিত এক প্রলয়ঙ্করী গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে উৎখাত হল।
আইয়ুবের দশ বছরের শাসন শুধু যে প্রথমে সরাসরি সেনাশাসন এবং পরবর্তী সময়ে নির্বাচনের আবরণে সেনার ছত্রছায়ায় পরিচালিত শাসন ছিল তা-ই নয়, উপরন্তু পূর্ব বঙ্গের বাঙ্গালীদের জন্য এটা ছিল পাঞ্জাবীদের প্রাধান্য বিশিষ্ট পশ্চিম পাকিস্তানীদের শাসন। এই শাসন ব্যবস্থায় বাঙ্গালী আমলা কিংবা উদীয়মান মধ্যবিত্তের ভূমিকা ছিল একেবারে অধস্তনের এবং অতীব নগণ্য। বরং পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর ছত্রছায়ায় পূর্ব বঙ্গকে পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকদের শাসনক্ষেত্র এবং পশ্চিম পাকিস্তানী ধনী শিল্পপতি-ব্যবসায়ীদের বাজারে পরিণত করা হল।
পাতা : ২৯
স্বাভাবিকভাবে এই অবস্থায় পূর্ব বঙ্গের বাঙ্গালী মুসলমানদের মনে ক্ষোভ বৃদ্ধি পেল। শেখ মুজিবসহ যে আওয়ামী লীগ নেতারা এক সময় সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে ক্ষমতার আশ্রয় নিয়ে দ্রুত অর্থ-বিত্ত সংগ্রহের মোহে স্বায়ত্তশাসনের প্রতি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছিলেন সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর সেই আওয়ামী লীগের প্রধান নেতা হয়ে শেখ মুজিব স্বায়ত্তশাসনের কর্মসূচী হিসাবে ১৯৬৬ সালে ৬ দফা দাবী দিলেন। ৬ দফা দাবী ছিল পূর্ব বাংলার রাজনীতির জন্য একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এটা ছিল প্রকৃতপক্ষে ১৯৪০ সালে মুসলিম লীগের গৃহীত লাহোর প্রস্তাবের ভাবপ্রেরণার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। সুতরাং ছয় দফার ১ নং দফাতেই বলা হচ্ছে, ‘দেশের শাসনতান্ত্রিক কাঠামো এমনি হতে হবে যেখানে পাকিস্তান হবে একটি ফেডারেশন ভিত্তিক রাষ্ট্রসংঘ এবং তার ভিত্তি হবে লাহোর প্রস্তাব।’
লাহোর প্রস্তাবের মূল ভিত্তি কী ছিল সেটা সর্বজন বিদিত। সেটা হচ্ছে ধর্মীয় দ্বি-জাতিতত্ত্ব। এই তত্ত্বের মূল কথা হল ভারতের হিন্দু এবং মুসলমানরা দুইটি ভিন্ন জাতি। সুতরাং তাদের জন্য ভিন্ন রাষ্ট্র প্রয়োজনীয়। এ ক্ষেত্রে ভারতের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিম এবং পূর্ব অঞ্চলের মুসলমানদের জন্য স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহের দাবী তুলে ধরা হয়েছিল। অর্থাৎ লাহোর প্রস্তাব অনুযায়ী ভারতের মুসলমানদের জন্য প্রকারান্তরে দুইটি ভিন্ন রাষ্ট্রের দাবী তুলে ধরা হয়েছিল। তবে ছয় দফায় পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যেই পূর্ব বাংলার বাঙ্গালী মুসলমানদের জন্য অধিকতর স্বায়ত্তশাসনের দাবী তুলে ধরা হয়েছিল যার ফলে পূর্ব বাংলা সব বিষয়ে না হলেও অনেক বিষয়েই প্রায় স্বাধীন একটি রাষ্ট্রের মর্যাদা ভোগ করতে পারত।
সুতরাং ছয় দফার মধ্যে অসাম্প্রদায়িক কিংবা ধর্মীয় চেতনার ঊর্ধ্বে থাকা বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী তথা জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেতনা খুঁজে বেড়ানোর চেষ্টাটা হাস্যকর একটা চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়। অথচ এই চেষ্টাই এ দেশে এ যাবত কাল বহুজনই করে এসেছেন।
অবশ্য এ কথা মানতে হবে যে, ছয় দফা পাকিস্তানের রাষ্ট্রকাঠামোর দৃঢ়বদ্ধতাকে দুর্বল ক’রে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের জাগরণ ও বিস্তারের কাজকে সহজতর করেছিল। ছয় দফার ইতিবাচক এই দিককে অস্বীকার করা ভুল হবে। তখনকার জনচেতনার মানের প্রেক্ষিতে লাহোর প্রস্তাবের ভাবপ্রেরণার আশ্রয় নেওয়ার গুরুত্ব বা প্রয়োজন ছিল। এটার আড়াল নিয়ে ধর্মমুক্ত জাতীয়তাবাদী চেতনার জাগরণটাকে অনেক বেশী সহজসাধ্য করা সম্ভব ছিল। শেষ পর্যন্ত ১৯৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধে সেই রকমই একটা ঘটনা ঘটল। যে যুদ্ধ ঘটল সেটা মোটেই তৎকালীন পূর্ব বঙ্গের মুসলমানদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে হল না। বরং স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সব দল ও মতের জনসাধারণ পূর্ব বঙ্গে বাঙ্গালীর একটা ধর্মমুক্ত জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতি অঙ্গীকার নিয়ে সেই সময় যুদ্ধ করতে বাধ্য হল।
কিন্তু ভারতের আশ্রয় ও সাহায্যে যে আওয়ামী লীগ যুদ্ধের উপর নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয়েছিল তারা যে ছয় দফার চেতনার ঊর্ধ্বে কোনও কালেই উঠতে পারে নাই সেটা স্বাধীনতার পর থেকে আজ অবধি তাদের সকল কর্মকাণ্ড দ্বারা স্পষ্ট করেছে। আসলে তারা কোনও কালেই ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে বাঙ্গালী হয় নাই। তারা বাঙ্গালী মুসলমান কিংবা বড়জোর মুসলমান বাঙ্গালী হয়ে থেকেছে। সুতরাং চেতনার বিচারে ছয় দফা থেকে তারা কখনই ধর্মনিরপেক্ষ বাঙ্গালীত্বে নিজেদের উত্তরণ ঘটাতে পারে নাই। তাদের নেতা শেখ মুজিবও নিজের বাঙ্গালী পরিচয় দিবার পাশাপাশি সর্বদাই যে মুসলমান হিসাবে নিজের পরিচয় তুলে ধরতেন সেই কথা আশা করি সকলেই স্বীকার করবেন। এমনকি তিনি অনেক সময় তার মুসলমান পরিচয়কে বাঙ্গালী জাতি পরিচয়ের উপরেও স্থান দিতেন। অনেকে হয়ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশে ফিরবার পর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারী তারিখে ঢাকার জনসভায় তার দেওয়া বক্তৃতার সেই কথা স্মরণ করতে পারবেন যেখানে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি আগে মুসলমান, তারপর বাঙ্গালী।’
তাহলে প্রশ্ন আসবে এমন একটা বাস্তবতায় ছয় দফার আন্দোলন থেকে বাঙ্গালীর একটা ধর্মমুক্ত চেতনাযুক্ত জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যুদ্ধে উত্তরণ ঘটল কীভাবে। ছয় দফা দেওয়ার পর থেকে ১৯৭১-এর মার্চের পূর্ব পর্যন্ত এমন কোনও যুদ্ধের জন্য যে আওয়ামী লীগ কিংবা শেখ মুজিব বাঙ্গালী জাতিকে প্রস্তুত করেছিলেন তার কোনও প্রমাণ আমরা পাই না। বাঙ্গালীর জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য আওয়ামী লীগের কোনও ধরনের আদর্শিক এবং রাজনৈতিক প্রস্তুতি কোনও কালেই ছিল না বলেই কাগজে-কলমে প্রথম দিকে যা-ই বলা হোক বাস্তবে বাংলাদেশ-রাষ্ট্র যে পথ ধরে এগিয়েছে সেটা হচ্ছে স্বাধীনতা যুদ্ধের সেক্যুলার চেতনা এবং অঙ্গীকারকে ক্রমবর্ধমানভাবে ছাঁটাই বা বর্জন করে ইসলামী ধর্ম-সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে উত্তরণ ঘটানো। সুতরাং আজকের বাংলাদেশ-রাষ্ট্রটি বাস্তবে বাঙ্গালী মুসলমানদের একটি ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র। এর সঙ্গে ’৭১-এর বাঙ্গালীর জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ বা স্বাধীনতা যুদ্ধের আদর্শ বা চেতনা — এর কোনও সম্পর্ক নাই।
সুতরাং বাঙ্গালী মুসলমানের প্রধান প্রতিনিধিত্বকারী আওয়ামী লীগকে চিনতে হবে এমন একটি দল রূপে যা প্রয়োজনে যে কোনও কথা বলতে বা কাজ করতে পারে যেটা তার তাৎক্ষণিক প্রয়োজন বা বাধ্যতা থেকে করা। যুদ্ধেও তারা বাধ্য হয়ে গিয়েছিল। এবং সেই যুদ্ধেও তারা গিয়েছিল ভারতের নিরাপদ আশ্রয় পাবার পরই। ভারতের আশ্রয় পাবার পর ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল অস্থায়ী প্রবাসী সরকার গঠনের পর তারা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। অথচ দেশের ভিতরে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়েছিল আরও আগেই। কিছু করে ২৫ মার্চের পূর্ব থেকে আর ব্যাপক আয়তনে তা শুরু হয় ২৫ মার্চ রাত থেকে পাক-বাহিনী কর্তৃক আক্রমণ বা দমন অভিযান শুরুর পর থেকেই। সেখানে আওয়ামী লীগ দূরের কথা জাতীয় পর্যায়ের কোনও দলেরই নেতৃত্বকারী কোনও ভূমিকা ছিল না। এটা ছিল মূলত একটা স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ যুদ্ধ, যাতে মূল ভূমিকায় ছিল আওয়ামী লীগ এবং ভাসানী নেতৃত্বাধীন ন্যাপের সঙ্গে থাকা ছাত্র-যুবরা এবং সেই সঙ্গে বিদ্রোহী বাঙ্গালী সৈনিক, ইপিআর এবং পুলিশ সদস্যরা।
এখানে আমরা যে প্রশ্নের সম্মুখীন হই তা হল একটা মোটামুটি দীর্ঘ রাজনৈতিক ও আদর্শিক প্রস্তুতি ছাড়া কি কোনও জনগোষ্ঠীর পক্ষে এভাবে কোনও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া সম্ভব? ১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ছয় দফার ম্যান্ডেট নিয়ে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে। কিন্তু ছয় দফার মধ্যে না ছিল জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার রাজনীতি, না ছিল যুদ্ধের রাজনীতি। প্রকৃতপক্ষে নির্বাচনী রাজনীতি এবং ছয় দফার পাকিস্তানী ধর্মীয় চেতনা থেকে বাঙ্গালী জাতির স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য ’৭১-এর জাতীয় মুক্তি যুদ্ধ একটা মৌলিক বিচ্যুতি। হয়ত অনেকে এটাকে বিচ্যুতি বলতে না চেয়ে উত্তরণ বলবেন। এখন বিচ্যুতি বলা যাক আর উত্তরণ বলা যাক সেটা কীভাবে সম্ভব হল যার ফলে এত বড় একটা যুদ্ধ হল যা বাঙ্গালী জাতির ইতিহাসেও অভূতপূর্ব?
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে আমাদের দেশে এই প্রশ্নকে সর্বদাই মূলধারার বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা বা আলোচনায় এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। অথচ এই প্রশ্নের সদুত্তর ছাড়া স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যাভিমুখী যুদ্ধ সংগঠনের গতিধারার কোনও কিছুকেই বুঝা সম্ভব নয়। আর আজ যখন আমরা নূতন করে সে প্রশ্নের উত্তর সন্ধান করব তখন উঠে আসবে মুসলিম বাঙ্গালী সমাজ থেকে আসা ষাটের দশকের বিপ্লবী তথা বামপন্থী তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা, যে ভূমিকা দ্বারা তারা ষাটের দশকে বাঙ্গালী মুসলমানের স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনকে পিছনে ফেলে রেখে তাকে বাঙ্গালী জাতির স্বাধীন ও লোকবাদী তথা সেকিউলার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যুদ্ধে পরিণত করেছিল, আর এভাবে তারা প্রথমে বাংলা এবং অতঃপর উপমহাদেশব্যাপী একটি সমাজতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক বিপ্লবের চেতনার ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছিল।
এই প্রজন্মের বিপ্লবী চেতনার সর্বোচ্চ অভিব্যক্তি ঘটেছিল রাশেদ খান মেনন নেতৃত্বাধীন ধারায় সংগঠিত তৎকালীন ‘পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন’ কর্তৃক ঘোষিত ১১ দফা কর্মসূচীর মাধ্যমে। এটি সংগঠন কর্তৃক ঢাকার পল্টন ময়দানের জনসভায় ১৯৭০ সালের ২২ ফেব্রুয়ারী তারিখে ঘোষণা করা হয়। এতে বক্তৃতা দেন তৎকালীন সাবেক ছাত্রনেতা কাজী জাফর আহমদ, সাবেক ছাত্রনেতা রাশেদ খান মেনন, তৎকালীন ছাত্রনেতা মোস্তফা জামাল হায়দার ও মাহবুব উল্লাহ্ প্রমূখ। অবশ্য এই ঘোষণার প্রেক্ষিতে পাকিস্তানের সামরিক আদালত তাদেরকে বিভিভন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডাদেশ দেয়। যাইহোক, সে প্রসঙ্গ নিয়ে এখন কালক্ষেপণ না করে এই কর্মসূচীর তাৎপর্য বুঝার জন্য আমরা আজ অর্ধশতাব্দীরও অধিককাল পর সেই কর্মসূচীর প্রতি দৃষ্টিপাত করতে পারি।
এটা ঠিক যে, এই কর্মসূচী তৈরীতে ভূমিকা রেখেছিলেন ছাত্র ও তরুণদের পাশাপাশি পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির পুরাতন নেতৃত্ব। ফলে তাদের গোঁড়ামি বা চিন্তার কিছু সীমাবদ্ধতার ছাপও চোখে পড়তে পারে। তা সত্ত্বেও ছাত্রদের দ্বারা ঘোষিত স্বাধীন জন-গণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলার ১১ দফা কর্মসূচী ছিল ঐ সময়ে একটি যুগান্তকারী ঘটনা, যা ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ সংগঠিত ও অনিবার্য করায় নির্ধারক ভূমিকা রেখেছিল বলে আমরা মনে করি। এটা ঠিক যে, এই কর্মসূচী ঘোষণার বৎসর কাল পরই স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু হলেও তাতে বিপ্লবী তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা রাখার সুযোগ শেষ পর্যন্ত থাকে নাই, যুদ্ধের সামগ্রিক পরিস্থিতি ও ভারতের ভূমিকার কারণে। কিন্তু ছাত্র ইউনিয়নের ভূমিকার গুরুত্বকে খাটো করে দেখার কারণ নাই। আজ অর্ধশতাব্দী কাল পরে এই কর্মসূচী পড়লেই বুঝা যাবে কতখানি গুরুত্ববহ ও তাৎপর্যপূর্ণ ছিল মেনন নেতৃত্বাধীন ধারায় গড়ে উঠা ‘পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের’ স্বাধীন জন-গণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলার ১১ দফা কর্মসূচী। সুতরাং নিম্নে এই কর্মসূচীর পুরাটাই দেওয়া হল।
পাতা : ৩০
পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন)-এর ১১ দফা [২২ ফেব্রুয়ারী ১৯৭০]
স্বাধীন জন-গণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা প্রতিষ্ঠার ১১ দফা কর্মসূচী
১। সাম্রাজ্যবাদ বিশেষত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও বৃহৎ পুঁজির (যাহার চরিত্র আমলা মুৎসু্দ্দি) এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার উচ্ছেদ সাধন করিয়া পূর্ব বাংলায় স্বাধীন সার্বভৌম জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েম করা। এই ব্যবস্থায় পূর্ব বাংলার দেশরক্ষা, অর্থনীতি, শাসন ব্যবস্থা, সংস্কৃতি তথা সর্বময় কর্তৃত্ব পূর্ব বাংলার জনগণের হাতে থাকিবে। সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও বৃহৎ পুঁজির জাতীয় নিপীড়ন ও শ্রেণী শোষণের কবলমুক্ত এই ব্যবস্থায় জনগণের নিরঙ্কুশ অধিকার প্রতিষ্ঠিত হইবে ও জনতার গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হইবে।
২। (ক) আঠারো ও তদূর্ধ বয়স্ক-বয়স্কা নর-নারীর ভোট ও প্রত্যক্ষ নির্বাচনের ভিত্তিতে জনগণ-পরিষদ নির্বাচিত হইবে। কোন নির্বাচনী এলাকার জনগণ ইচ্ছা করিলে যে কোন সময় তাদের প্রতিনিধি প্রত্যাহার করিতে পারিবে।
(খ) জনতার গণতান্ত্রিক অধিকার নিরঙ্কুশ করিবার জন্য সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও বৃহৎ পুঁজির দালাল ও সমর্থক যে কোন শ্রেণী ও ব্যক্তিকে ভোটাধিকার হইতে বঞ্চিত করা হইবে।
৩। (ক) হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান, বাংগালী-অবাংগালী, জাতি-উপজাতি, বর্ণ নির্বিশেষে সকল সম্প্রদায়ের জনগণের সমান রাজনৈতিক অধিকার থাকিবে।
(খ) নারী জাতির সমান অধিকার এবং মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হইবে।
(গ) জনগণের সকল প্রকার মৌলিক অধিকার, বাকস্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মতাদর্শের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হইবে।
(ঘ) জনগণের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হইবে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সহিত সরকারের সম্পর্ক হইবে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার ভিত্তিতে। ধর্মের ব্যবহার করিয়া সকল প্রকার শোষণ উচ্ছেদ করা হইবে।
৪। স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলার সার্বভৌমত্ব রক্ষাকল্পে একটি গণবাহিনী থাকিবে। শ্রমিক, কৃষক, মেহনতী জনতার সমবায়ে এই গণবাহিনী গঠিত হইবে। ইহা ছাড়াও সমগ্র জাতি বিশেষ করিয়া শ্রমিক, কৃষক, মেহনতী জনতাকে সামরিক শিক্ষায় শিক্ষিত করিয়া তোলা হইবে এবং তাহাদের লইয়া গণ-মিলিশিয়া গঠন করা হইবে।
৫। জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার নিরঙ্কুশ করিবার জন্য আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনিক ব্যবস্থার সম্পূর্ণ উচ্ছেদ সাধন করিয়া প্রশাসনিক ও বিচার বিভাগকে আমূল পরিবর্তন করা হইবে। জনগণের নির্বাচনের মাধ্যমে প্রশাসনিক ব্যবস্থায় জড়িত ব্যক্তিদের নির্বাচিত করা হইবে। বিচার বিভাগের মূল ভিত্তি হইবে গণ-আদালত।
৬। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে পিন্ডি, ওয়াশিংটন, মস্কো, নয়াদিল্লীর সরকারের বিরোধিতা করা হইবে। যে কোন বন্ধুদেশের বশ্যতা স্বীকার করা হইবে না। সমাজতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী দেশসমূহের সহিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপিত হইবে। দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য পরিচালিত হইবে পারস্পরিক লাভ ও মুনাফার ভিত্তিতে। পৃথিবীর দেশে দেশে জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের প্রতি সকল প্রকার প্রত্যক্ষ ও সক্রিয় সাহায্য ও সমর্থন প্রদান করা হইবে।
৭। (ক) জোতদারী, মহাজনী, ইজারাদারী তথা সকল প্রকার সামন্তবাদী শোষণ ব্যবস্থার উচ্ছেদ ঘটানো হইবে। “কৃষকদের হাতে জমি” এই নীতির ভিত্তিতে ভূমিহীন ও গরীব কৃষকদের মধ্যে জোতদার, মহাজনদের উদ্বৃত্ত বাজেয়াপ্ত জমি বন্টন করা হইবে।
(খ) টাকা ও পণ্যে আদায়কৃত খাজনা প্রথার অবসান করা হইবে।
(গ) কৃষকের অর্থকরী ফসল ধান, পাট, ইক্ষু, ইত্যাদির ন্যায্যমূল্য প্রদান করা হইবে। এই সকল ফসলের মূল্য নির্ধারিত হইবে চাউলের সঙ্গে বিনিময়ের ভিত্তিতে।
(ঘ) কৃষিজাত উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য কৃষকদেরকে বিনাসুদে ঋণ দেওয়া হইবে। কৃষককে বকেয়া খাজনা ও ঋণের বোঝা হইতে মুক্ত করিয়া উন্নত চাষাবাদ করিবার জন্য সকল প্রকার উৎসাহ ও সুবিধাদি প্রদান করা হইবে।
৮। বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য স্থায়ী ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে এবং জল সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের জন্য সেচ ব্যবস্থা প্রণয়ন করা হইবে।
৯। (ক) বিদেশী মালিকানায় পরিচালিত সমস্ত শিল্প-ব্যবসা ও প্রতিষ্ঠানসমূহ বাজেয়াপ্ত করিয়া জনগণের সম্পত্তি হিসাবে ঘোষণা করা হইবে।
(খ) বৃহৎ পুঁজির শোষণ হইতে জনগণকে মুক্ত করিবার জন্য বৃহৎ বাইশ পুঁজি বাজেয়াপ্ত করা হইবে।
(গ) ব্যাংক, বীমা, পাটশিল্প, পাট ব্যবসা ও অর্থনীতির মূল নিয়ন্ত্রণকারী ব্যবসাসমূহ জাতীয়করণ করা হইবে।
(ঘ) বৈদেশিক বাণিজ্য রাষ্ট্রায়ত্ত করা হইবে।
(ঙ) সকল প্রকার পরোক্ষ কর প্রথা বাতিল করা হইবে। আয়ের হারের ভিত্তিতে কর ধার্য করা হইবে।
(চ) জনগণ বিরোধী অসৎ ব্যক্তি ও আমলাদের অসদুপায়ে অর্জিত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হইবে।
(ছ) পুঁজি নিয়ন্ত্রণ নীতির সহিত সামঞ্জস্য রাখিয়া দেশপ্রেমিক জাতীয় ধনিকদের শিল্প ব্যবসায়ে আনুকূল্য প্রদান করা হইবে।
১০। (ক) প্রত্যেক ফ্যাক্ট্রীর শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরী, বাসস্থান, চিকিৎসা এবং সার্বিক সুবিধাদির ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিশ্চয়তা দান করা হইবে। শ্রমিকদের সন্তান-সন্ততির শিক্ষার ব্যবস্থা করা হইবে।
(খ) দেশে ব্যাপক শিল্পায়নের মাধ্যমে সকল প্রকার বেকার লোকদের কর্মসংস্থান করা হইবে।
১১। (ক) সাম্প্রদায়িক ও প্রতিক্রিয়াশীল শিক্ষা ব্যবস্থা বাতিল করিয়া গণমুখী, বৈজ্ঞানিক ও ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা হইবে। দশম শ্রেণী পর্যন্ত অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা ব্যবস্থা কার্যকর হইবে।
(খ) সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে গণসংস্কৃতিকে সর্বাধিক মর্যাদা দেওয়া হইবে এবং কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও সাম্প্রদায়িক ধ্যান-ধারণার কবল হইতে জনগণকে মুক্ত করা হইবে।*
-------------------------------------
* উপরে প্রদত্ত কর্মসূচীর উৎস : বাংলাদেশের রাজনীতি : প্রকৃতি ও প্রবণতা, ২১ দফা থেকে ৫ দফা। সমাজ বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র, ঢাকা, জুন ১৯৮৭।
-------------------------------------
পাতা : ৩১
স্বাধীন জন-গণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা প্রতিষ্ঠার ১১ দফা কর্মসূচীর একটি সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন
সামগ্রিকভাবে বিচার করলে ১১ দফা কর্মসূচীর ঘোষণা ছিল একটি যুগান্তকারী ঘটনা। কারণ এটাই পাকিস্তানের কাঠামোভুক্ত মুসলমান বাঙ্গালীর স্বায়ত্তশাসন তথা স্বাধিকার আন্দোলনকে ধর্মমুক্ত তথা লোকবাদী বাঙ্গালী জাতির স্বাধীনতা আন্দোলন ও যুদ্ধের অভিমুখ দিয়েছিল। এরপর যুদ্ধ ছিল সময়ের অনিবার্যতা মাত্র। সেটা কীভাবে হবে, কখন হবে সেটাই ছিল দেখবার বিষয়।
এ পর্যন্ত ঠিক আছে। কিন্তু আমাদের বিবেচনায় লোকবাদী বা সেকিউলার পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার কর্মসূচী প্রকাশ্যে ঘোষণার জন্য সময়টা ছিল ভুল। আসলে তরুণ প্রজন্মের আবেগের চাপে এ দেশের তৎকালীন পুরাতন বামপন্থী নেতৃত্ব নতি স্বীকার করলেও কর্মসূচী নির্ধারণের ব্যাপারে মোটেই আন্তরিক ও সতর্ক ছিল না। এই ধরনের কর্মসূচী আসা উচিত ছিল আরও আগে। সেই সময়টা ছিল ১৯৬৯, যখন প্রলয়ঙ্করী এক গণ-অভ্যুত্থানে আইয়ুব সরকারের পতন হয়ে দেশে জেনারেল ইয়াহিয়ার নেতৃত্বে সামরিক শাসন জারী হয়েছিল। অর্থাৎ পাকিস্তানী সেনার নেতৃ্ত্বে একটা প্রতিবিপ্লবী সামরিক হস্তক্ষেপ ঘটায় তার মোকাবিলায় পাল্টা বিপ্লবী হস্তক্ষেপ রূপে দেখা দিত এটা। সেটা হত বাঙ্গালীর সশস্ত্র জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম শুরুর উপযুক্ত মুহূর্ত। এটা সশস্ত্র সংগ্রামকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে যৌক্তিকতা দিত।
কিন্তু তার আগে স্বায়ত্তশাসনের একটা ধারাবাহিক আন্দোলন বামপন্থীদের দিক থেকে থাকতে হত। সেটা কি ছিল? ছিল না। ১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিব স্বায়ত্তশাসনের কর্মসূচী হিসাবে ছয় দফা ঘোষণা করলেও বামপন্থীদের পক্ষ থেকে বাস্তবে তেমন কোনও কর্মসূচী ছিল না। সেটা ছিল পুরাতন বামপন্থী নেতাদের এক ভয়ঙ্কর মতিচ্ছন্নতার কাল। অন্ধ চীনপন্থার কারণে তারা ছিল তৎকালে আইয়ুব সরকারের সঙ্গে চীনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ফলে আইয়ুব সরকার বিরোধী কোনও আন্দোলনে যাওয়ার বিরোধী। তাদের দ্বারা আবদ্ধ থাকায় মওলানা ভাসানীও স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে অনেক দিন পর্যন্ত সঠিক ভূমিকা নিতে ব্যর্থ হলেন। পুরাতন বামপন্থী তথা কমিউনিস্ট নেতৃত্বকে অস্বীকার করে তিনি যখন ১৯৬৮-এর ৬ ডিসেম্বরে আইয়ুব সরকার বিরোধী আন্দোলন শুরু করলেন তখন অনেক দেরী হয়ে গিয়েছিল। এই আন্দোলন ১৯৬৯-এ যখন গণ-অভ্যুত্থানের প্রচণ্ড রূপ ধারণ করল তখন সেটা শেখ মুজিব নেতৃত্বাধীন ৬ দফা ভিত্তিক স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের অংশ হয়ে গেল।
আসলে সময়ের কাজ সময়ে করতে হয়। যদি ১৯৬৬ সালেও মুজিবের সমান্তরালে ভাসানী প্রকাশ্যে স্বায়ত্তশাসনের কর্মসূচী নিয়ে মাঠে থাকতেন আর তরুণ প্রজন্ম গোপনে স্বাধীনতা আন্দোলন গড়ত তাহলে ভিন্ন পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারত। গণ-অভ্যুত্থানকে দমাবার উদ্দেশ্যে সামরিক শাসন জারীর সাথে সাথে তরুণ প্রজন্ম স্বাধীনতার কর্মসূচী ঘোষণা করে যুদ্ধ শুরু করলে ঘটনাধারা সম্পূর্ণরূপে ভিন্ন দিকে মোড় নিতে পারত। তখন বামপন্থী তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হতে পারত।
তরুণ প্রজন্ম হয়ত প্রথম পর্যায়ে সীমাবদ্ধ আকারে হলেও ভারতের সাহায্য পেত। কারণ ভারতের প্রয়োজন ছিল পাকিস্তানকে ভাঙ্গা। তবে এখানে বিপ্লবের বিজয় ভারতের কাম্য হবার কারণ ছিল না। সুতরাং শেষ পর্যন্ত ভারত ও আওয়ামী লীগের ঐক্য ঘটাটা স্বাভাবিক ছিল। ফলে ঘটনা পরবর্তী কালে যেভাবে ঘটেছে হুবহু সেভাবে না হলেও অনেকটা কাছাকাছি হতে পারত।
আসলে কালটা এ দেশে বিপ্লবের সাফল্যের অনুকূল ছিল না। পূর্ব বাংলায় বিপ্লবের বিরুদ্ধে অভিন্ন অবস্থানে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন। এতসব বাধাকে অতিক্রম করে বিপ্লবকে জয়যুক্ত করা সেই সময়টাতে কতটা সম্ভব ছিল সেই প্রশ্ন করা চলে। তবে তরুণ প্রজন্মের ভূমিকায় যদি আরও কিছু বেশী পরিপক্বতা ঘটত তাহলে তাদের ভূমিকা আজ আরও অনেক বেশী উজ্জ্বল হয়ে দেখা দিতে পারত। সেটা হয় নাই। তারপরেও তাদের ভূমিকাকে উপেক্ষা করা যাবে না। বাংলাদেশে যেটুকু অগ্রগতি ঘটেছে সেটা মূলত তাদের ভূমিকার অবদান। আসলে পূর্বজ বা অগ্রজরা এভাবে উত্তরসূরিদের জন্য সাফল্যের ভিত্তি তৈরী করে রেখে যেতে পারে। ষাটের দশকের বিপ্লবী তরুণ প্রজন্মও এভাবে তা করে রেখে গেছে।
২০২৪-এর জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে মাফিয়া-সন্ত্রাসী, লুটেরা ও স্বৈরশাসক হাসিনার পতন তেমন একটা বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত দেয়। এ দেশে বারবার বিশেষত ছাত্র অভ্যুথান হয়েছে। সেদিক থেকে দেখলে এই অভ্যুত্থানে নূতন কিছু নাই। কিন্তু অন্যদিক থেকে দেখলে এ ধরনের অভ্যুত্থান এ দেশ আগে কখনও দেখে নাই। এ দেশে ছাত্রদের নেতৃত্বে এই প্রথম এমন একটা অভ্যুত্থান হয়েছে যার নেতৃত্বে শুধুমাত্র ছাত্ররা ছিল। ছাত্রদের নেতৃত্বে সংগঠিত এই অভ্যুত্থানে জনতার সকল অংশের অংশগ্রহণ ঘটলেও এর নেতৃত্ব প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ছাত্র ও তরুণদের হাতে রয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ এটা ছিল এমন এক আন্দোলন বা অভ্যুত্থান যাতে পুরাতন রাজনৈতিক দল বা নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ ছিল না।
এটা ছিল এক বিস্ময়কর ঘটনা, যার তাৎপর্য অপরিমেয়। এটা ঠিক যে, বিগত ছাত্র অভ্যুত্থানের বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে তাদের অনভিজ্ঞতার কারণে। কিন্তু এটা আবার তাদের শক্তিরও উৎস হয়েছে। কারণ এদেশে পুরাতন রাজনৈতিক নেতৃত্ব অতীতে সঠিক দিশা দেখাতে বারবার ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষত যারা বিপ্লবের পথ দেখাবার দাবীদার হয়েছে তাদের ব্যর্থতা ও অযোগ্যতা ছিল সীমাহীন। ভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা ও তত্ত্বের প্রতি অন্ধ আনুগত্য এবং নিজ সমাজ ও দেশের বাস্তবতা অনুযায়ী স্বাধীনভাবে কর্মপন্থা নির্ধারণের অক্ষমতা তাদেরকে সর্বদা পথভ্রষ্ট করেছে। এভাবে তারা এ দেশে তাদের অনুসারীদেরও পথভ্রষ্ট করেছেন।
যাইহোক, নূতন প্রজন্মের উত্থান সম্পর্কে আশাবাদ ব্যক্ত করা গেলেও এ সম্পর্কে চূড়ান্ত কথা বলার সময় এখনও আসে নাই। এখনও এ দেশে আমরা একটা দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছি।
পাতা : ৩২
উপসংহার : বৃহত্তর সিন্ধু উপত্যকা থেকে গাঙ্গেয় সমভূমি
সিন্ধু সভ্যতার অনেকটা এখন আমাদের নিকট ধরা দিলেও এখনও অনেক কিছু রহস্যের আড়ালে অধরা রয়েছে। প্রায় চার হাজার বছর আগে বিলুপ্ত এই সভ্যতার অনেক কিছুই এখনও অনাবিষ্কৃত। সবচেয়ে বড় কথা লিপিমালা পাওয়া গেলেও আজও তার পাঠোদ্ধার হয় নাই। প্রাচীন সভ্যতার কিছু ভগ্নাবশেষ, প্রাচীন সাহিত্য স্বরূপ বিশেষ করে ঋগ্বেদ এবং সিন্ধু সভ্যতার পতন-পরবর্তী কালে বিভিন্ন মতবাদ ও ধর্মীয় আন্দোলনের দলিলাদি এক সুমহান সভ্যতা ও তার পরবর্তী সমাজ সম্পর্কে আমাদের ধারণার উৎস হিসাবে কাজ করে।
এটা বিস্ময়কর ঘটনা যে, চার হাজার বছর আগেও ভারতীয় উপমহাদেশের এক বিস্তীর্ণ ভূভাগে এমন এক সভ্যতা জন্ম ও বিকাশ লাভ করেছিল যে, আজ অবধি তার তুলনা নাই। সিন্ধু সভ্যতার সুউন্নত নগর পরিকল্পনা, তার পয়োনিষ্কাষণ ও জলসরবরাহ ব্যবস্থার ব্যাপকতা বিস্ময় জাগায়। আজও যেখানে উপমহাদেশে ব্যাপক সংখ্যক সাধারণ মানুষ খোলা মাঠ বা ঝোপঝাড়ের আড়ালে মলমূত্র ত্যাগে অভ্যস্ত সেখানে আজ থেকে চার হাজার বছর আগে সাধারণ নগর ও গ্রাম বাসী কীভাবে এমন সভ্য, সুশৃঙ্খল ও স্বাস্থ্যকর জীবনধারায় অভ্যস্ত ছিল এবং সেটাই ছিল সমগ্র সভ্যতায় জীবনধারার সাধারণ নিয়ম সে কথা ভাবলে অবাক হতে হয়।
জীবন ও প্রকৃতির নিয়মে সব সভ্যতার যেমন জন্ম আছে তেমন তার মৃত্যু বা অবসান কিংবা ধ্বংসও আছে। সুতরাং এমন এক বিস্ময়কর মহাসভ্যতাও এক সময়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে বিস্মৃতির অন্ধকারে হারিয়ে গিয়েছিল। অবশেষে প্রায় চার হাজার বছর পর এই সভ্যতা এখন কিছু করে আমাদের মনশ্চক্ষুতে উঁকি দিতে শুরু করেছে। কিন্তু এটা শুরু মাত্র। জানবার ও বুঝবার অনেক কিছুই এখনও বাকী আছে। তবু এই সভ্যতা সম্পর্কে যেটুকু আমরা ধারণা করতে পারি সেটুকুই আমাদেরকে অভিভূত করার জন্য যথেষ্ট। কীভাবে আমাদের পূর্বপুরুষরা সেই বিস্মৃত প্রাচীন কালে এমন এক অত্যুন্নত সভ্যতা নির্মাণ করেছিলেন তাও আবার প্রায় সম্পূর্ণরূপে বিনারক্তপাতে ও গণতান্ত্রিক পন্থায় সে কথা ভাবলে বিস্ময়াভিভূত হতে হয়! এবং সেটাও আবার বিস্তৃত ছিল আফগানিস্তান, আজকের সম্পূর্ণ পাকিস্তান ও সম্পূর্ণ পশ্চিম ভারতের ১০ থেকে ১২ লক্ষ বর্গকিলোমিটার ব্যাপী বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে। এমন কোনও দৃষ্টান্তই পৃথিবীতে নাই। সর্বত্র সভ্যতা নির্মাণে মানুষের যেখানে এত নির্দয়তা ও হিংস্রতা সেখানে কীভাবে নম্রতা ও অহিংসার ভিত্তিতে এমন একটি বৃহৎ সভ্যতা নির্মাণ সম্ভব? হ্যাঁ, সেই অসম্ভবপ্রায় ঘটনাটাই ঘটেছিল এই সভ্যতার জন্ম ও বিকাশ ধারায়। এটা ঠিক যে, প্রত্নতত্ত্বের সাক্ষ্য ও ঋগ্বেদের বিবরণ অনুযায়ী এই সভ্যতার শেষ সময়ে তথা ধ্বংসের সময়ে কিছু যুদ্ধ ও হিংসার ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু প্রত্নতত্ত্বের সাক্ষ্য অনুযায়ী সেসবও ব্যাপকায়তন কিছু নয়। বুঝা যায় যে, যখন শান্তিপূর্ণ ধারায় সভ্যতা আর অগ্রসর হতে পারে নাই তখন কিছু যুদ্ধ বা সহিংসতার চর্চার মধ্য দিয়ে সভ্যতার অবসান হয়েছে। এবং সেই যুদ্ধ বা সহিংসতাও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে প্রধানত ধর্মকে অবলম্বন করে। এভাবে সিন্ধু সভ্যতার যুক্তিভিত্তিক লোকায়ত চেতনা পরাজিত হল ধর্মের নিকট। এরপরের ভারতবর্ষের যাত্রা ক্রমবর্ধমানভাবে অন্ধবিশ্বাস নির্ভর ধর্মের পথ ধরে।
এটা বিস্ময়কর মনে হলেও সত্য যে, প্রত্নতত্ত্বের সাক্ষ্য অনুযায়ী অহিংস সিন্ধু সভ্যতার শুরু থেকে প্রায় শেষ পর্যন্ত বৈদেশিক আক্রমণ ছিল না। তাই যুদ্ধের সাক্ষ্যও সেভাবে পাওয়া যায় না। এটা কীভাবে সম্ভব যে, এমন বিশাল ভূভাগব্যাপী বিস্তৃত ও এমন সমৃদ্ধ একটা সভ্যতা বহিরাক্রমণকারীদের আক্রমণাভিযানে প্রলুব্ধ করত না? অর্থাৎ সিন্ধু সভ্যতায় প্রতিরক্ষার এমন বিস্ময়কর ব্যবস্থা ছিল যা বহিরাক্রমণকারীদের প্রতিহত করায় সক্ষম ছিল। এটা ধারণা করা যায় যে, আপাতত শান্তিপূর্ণ বা অহিংস মনে হলেও সিন্ধু সভ্যতা বহিরাক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার জন্য এমন একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল যা তাকে সুদীর্ঘ কাল প্রায় নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা দান করেছিল। কী সেই ব্যবস্থা হতে পারে কিংবা কীভাবে সেটাকে এমন সফলভাবে ও সুদীর্ঘ কাল বহাল রাখা গিয়েছিল সেটা নিয়ে ভাবা যেতে পারে বৈকি। তবে এ কথা বলা যায় যে, ব্যবহারিক বুদ্ধির উপর নির্ভর করেই সিন্ধু সভ্যতার মতো একটি সুউন্নত সভ্যতা যুদ্ধ ও হিংসা সমাকীর্ণ পৃথিবীর এক প্রান্তে যুদ্ধ ও হিংসাকে যতটা সম্ভব পরিহার করে যথেষ্ট বৃহদায়তনে মানুষের জন্য মোটামুটি শান্তিময় এক আবাস নির্মাণ করেছিল। যাইহোক, পূর্ববর্তী একটি অধ্যায়ে এ সম্পর্কে কিছু ধারণা করার চেষ্টা করেছি।
এটা আমাদের নিকট স্পষ্ট যে, সিন্ধু সভ্যতার উত্থান ও বিকাশের প্রধান উৎস নিহিত ছিল সমগ্র অঞ্চলব্যাপী বিস্তৃত নদীনিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থার ভিতরে। সুতরাং যতদিন নদীনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর ছিল ততদিন সভ্যতার জন্য অভ্যন্তরীণভাবে তেমন কোনও সঙ্কট ছিল না। তবে বহিঃশত্রুর আক্রমণের বিরুদ্ধে সিন্ধু সভ্যতা কী ধরনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল সেটা এখনও একটা প্রশ্ন হয়ে আছে। প্রতিরক্ষার সক্ষমতাহীন একটা সভ্যতা যে এ পৃথিবীতে রক্ষা পেতে পারে না এটা বুঝার জন্য বেশী বুদ্ধির প্রয়োজন হয় না। সিন্ধু সভ্যতার যে সকল রহস্য আমাদের আজ অবধি অভিভূত করে তার মধ্যে এটিও একটি। তবে আশা করি এই প্রশ্নেরও এক সময় স্পষ্ট উত্তর মিলবে।
ভারতবর্ষে সুদূর অতীতে সিন্ধু থেকে কিংবা তারও পূ্র্বে সমুদ্রোপকূলীয় অঞ্চল থেকে সভ্যতার পথ ধরে মানুষের যে যাত্রা সেটা অনেক চড়াই-উৎরাই পার হয়ে আজ গাঙ্গেয় অববাহিকার পূর্ব প্রান্তে এসে আগামীতে কোন্ পথের দিকে যেতে পারে সেটা নিয়ে কিছু অনুমান করলেও নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়। উপমহাদেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিচার করে আমরা্ এটুকু বলতে পারি যে, যে অবস্থায় আজ আমরা তাকে দেখতে পাচ্ছি সেটাতে যে ধরনের হোক পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে ভারতবর্ষের আজকের রাষ্ট্র বিন্যাসে পরিবর্তন ঘটাটা স্বাভাবিক।
আজকের যুগের দাবী পূরণ করতে গিয়ে উপমহাদেশের সমাজ জীবনে ধর্মকে সরিয়ে দিয়ে লোকায়ত দর্শন পুনরায় নূতন রূপ নিয়ে আবির্ভূত হবে বলে আমরা ধারণা করি। এ ক্ষেত্রে সিন্ধু সভ্যতার লোকায়ত চেতনার পুনরুজ্জীবন আধুনিক যুগে তাকে নবতর শক্তি ও প্রেরণা যোগাবে।
তবে আমাদের বিশ্বাস আজকের উন্নত প্রযু্ক্তির ব্যাপক বিস্তারের যুগে সিন্ধু সভ্যতার অহিংস ও গণতান্ত্রিক চেতনা মানব জাতির আগামী পথযাত্রায় দিকনির্দেশক হয়ে দেখা দিবে। বিশেষ করে পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী রাষ্ট্রসমূহকে নিজেদের অস্তিত্বের স্বার্থেই যুদ্ধের বিকল্প পথের কথা ভাবতে হবে। প্রকৃতপক্ষে, পরমাণু প্রযুক্তির এই যুগে ব্যাপকায়তন যুদ্ধের কাল শেষ হয়েছে। ক্ষুদ্র আয়তনে বা সীমিত ক্ষেত্রে যুদ্ধ হতে পারে। কিন্তু সেটাও ক্রমবর্ধমানভাবে সবার জন্যই বিপজ্জনক হতে পারে। এমতাবস্থায় মানব জাতির সামনে সিন্ধু সভ্যতা ক্রমবর্ধমানভাবে নূতন গুরুত্ব ও তাৎপর্য নিয়ে দেখা দিবে। সব দিক বিচার করে আমরা আজ বলতে পারি সিন্ধু সভ্যতা হবে আগামী মানব সভ্যতার বাতিঘর।
পাতা : ৩৩
(সমাপ্ত)